আল কুরআন


সূরা আল-মায়েদা (আয়াত: 36)

সূরা আল-মায়েদা (আয়াত: 36)



হরকত ছাড়া:

إن الذين كفروا لو أن لهم ما في الأرض جميعا ومثله معه ليفتدوا به من عذاب يوم القيامة ما تقبل منهم ولهم عذاب أليم ﴿٣٦﴾




হরকত সহ:

اِنَّ الَّذِیْنَ کَفَرُوْا لَوْ اَنَّ لَهُمْ مَّا فِی الْاَرْضِ جَمِیْعًا وَّ مِثْلَهٗ مَعَهٗ لِیَفْتَدُوْا بِهٖ مِنْ عَذَابِ یَوْمِ الْقِیٰمَۃِ مَا تُقُبِّلَ مِنْهُمْ ۚ وَ لَهُمْ عَذَابٌ اَلِیْمٌ ﴿۳۶﴾




উচ্চারণ: ইন্নাল্লাযীনা কাফারূ লাও আন্না লাহুম মা-ফিল আরদিজামী‘আওঁ ওয়া মিছলাহূমা‘আহূলিইয়াফতাদূবিহী মিন ‘আযা-বি ইয়াওমিল কিয়া-মাতি মা-তুকুব্বিলা মিনহুম ওয়া লাহুম ‘আযা-বুন আলীম।




আল বায়ান: নিশ্চয় যারা কুফরী করেছে, যদি যমীনে যা আছে তার সব ও তার সাথে সমপরিমাণও তাদের জন্য থাকে, যাতে তারা তার মাধ্যমে কিয়ামতের আযাব থেকে রক্ষার মুক্তিপণ দিতে পারে, তাহলেও তাদের থেকে তা গ্রহণ করা হবে না এবং তাদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক আযাব।




আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৩৬. নিশ্চয় যারা কুফর করেছে, কিয়ামতের দিন শাস্তি থেকে মুক্তির জন্য পণস্বরূপ যমীনে যা কিছু আছে যদি সেগুলোর সবটাই তাদের থাকে এবং তার সাথে সমপরিমাণও থাকে, তবুও তাদের কাছ থেকে সেসব গৃহীত হবে না এবং তাদের জন্য রয়েছে কষ্টদায়ক শাস্তি।(১)




তাইসীরুল ক্বুরআন: যারা কুফরী করেছে দুনিয়ায় যা কিছু আছে সব যদি তাদের হয় এবং আরো সমপরিমাণও হয় ক্বিয়ামাত দিবসের শাস্তি থেকে পরিত্রাণের মুক্তিপণ হিসেবে, তবুও তা তাদের থেকে গ্রহণ করা হবে না; তাদের জন্য আছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি।




আহসানুল বায়ান: (৩৬) যারা অবিশ্বাস করেছে পৃথিবীতে যা কিছু আছে, যদি তাদের তার সমস্ত থাকে এবং তার সাথে সমপরিমাণ আরো থাকে এবং কিয়ামতের দিন শাস্তি হতে মুক্তির জন্য পণস্বরূপ তা দিতে চায়, তবুও তাদের নিকট হতে তা গৃহীত হবে না এবং তাদের জন্য মর্মন্তুদ শাস্তি বর্তমান। [1]



মুজিবুর রহমান: নিশ্চয়ই যারা কাফির, যদি তাদের কাছে বিশ্বের সমস্ত সম্পদও থাকে এবং ওর সাথে তৎপরিমান আরও থাকে, এবং এগুলোর বিনিময়ে কিয়ামাতের শাস্তি থেকে মুক্তি পেতে চায়, তবুও এই সম্পদ তাদের থেকে কবূল করা হবেনা, আর তাদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি।



ফযলুর রহমান: পৃথিবীতে যা কিছু আছে তা সব এবং তার সাথে আরো সমপরিমাণ সম্পদ যদি কাফেরদের হয় এবং তারা রোয কেয়ামতের শাস্তি থেকে নিষ্কৃতি পাওয়ার জন্য এগুলো বিনিময় হিসেবে দিতে চায় তবুও তাদের কাছ থেকে তা গ্রহণ করা হবে না। তাদের জন্য যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি অবধারিত আছে।



মুহিউদ্দিন খান: যারা কাফের, যদি তাদের কাছে পৃথিবীর সমুদয় সম্পদ এবং তৎসহ আরও তদনুরূপ সম্পদ থাকে আর এগুলো বিনিময়ে দিয়ে কিয়ামতের শাস্তি থেকে পরিত্রান পেতে চায়, তবুও তাদের কাছ থেকে তা কবুল করা হবে না। তাদের জন্যে যন্ত্রনাদায়ক শাস্তি রয়েছে।



জহুরুল হক: নিঃসন্দেহ যারা অবিশ্বাস পোষণ করে -- পৃথিবীতে যা আছে সে-সমস্তই যদি তাদের হতো এবং তার সাথে সেই পরিমাণে, যার বিনিময়ে তারা মুক্তি কামনা করতো কিয়ামতের দিনের শাস্তি থেকে, তাদের কাছ থেকে তা কবুল হতো না, আর তাদের জন্য রয়েছে ব্যথাদায়ক শাস্তি।



Sahih International: Indeed, those who disbelieve - if they should have all that is in the earth and the like of it with it by which to ransom themselves from the punishment of the Day of Resurrection, it will not be accepted from them, and for them is a painful punishment



তাফসীরে যাকারিয়া

অনুবাদ: ৩৬. নিশ্চয় যারা কুফর করেছে, কিয়ামতের দিন শাস্তি থেকে মুক্তির জন্য পণস্বরূপ যমীনে যা কিছু আছে যদি সেগুলোর সবটাই তাদের থাকে এবং তার সাথে সমপরিমাণও থাকে, তবুও তাদের কাছ থেকে সেসব গৃহীত হবে না এবং তাদের জন্য রয়েছে কষ্টদায়ক শাস্তি।(১)


তাফসীর:

(১) জাবের ইবনে আবদুল্লাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, এ আয়াত কাফেরদের ব্যাপারে নাযিল হয়েছে। [ইবনে হিব্বান, (আল-ইহসান) ১৬/৫২৭, ৭৪৮৩]


তাফসীরে আহসানুল বায়ান

অনুবাদ: (৩৬) যারা অবিশ্বাস করেছে পৃথিবীতে যা কিছু আছে, যদি তাদের তার সমস্ত থাকে এবং তার সাথে সমপরিমাণ আরো থাকে এবং কিয়ামতের দিন শাস্তি হতে মুক্তির জন্য পণস্বরূপ তা দিতে চায়, তবুও তাদের নিকট হতে তা গৃহীত হবে না এবং তাদের জন্য মর্মন্তুদ শাস্তি বর্তমান। [1]


তাফসীর:

[1] হাদীসে বর্ণিত হয়েছে যে, জাহান্নামের একটি লোককে জাহান্নাম থেকে বের করে আল্লাহর সামনে হাযির করা হবে। তারপর আল্লাহ তাকে জিজ্ঞাসা করবেন, ‘তুমি তোমার বাসস্থান কেমন পেয়েছ?’ সে উত্তরে বলবে; ‘অত্যন্ত খারাপ জায়গা।’ তারপর আল্লাহ আবার বলবেন, ‘তুমি কি এর থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য পৃথিবী পূর্ণ স্বর্ণ প্রদানে সম্মত আছ?’ সে উত্তরে বলবে, ‘হ্যাঁ।’ তারপর আল্লাহ বলবেন, ‘আমি তো তোমার নিকট পৃথিবীতে এর চেয়েও বহু কম চেয়েছিলাম। কিন্তু তুমি সেটাও দাওনি বা পরোয়া করনি।’ অতঃপর পুনরায় তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে।

(মুসলিম, কিয়ামত অধ্যায় ও বুখারী রিক্বাক ও আম্বিয়া অধ্যায়)


তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ


তাফসীর: ৩৫-৩৭ নং আয়াতের তাফসীর:



আল্লাহ তা‘আলা মু’মিনদেরকে নির্দেশ দিচ্ছেন তাঁকে ভয় করার এবং তাঁর কাছে ওসীলা বা নৈকট্য অন্বেষণ করার।



الوسيلة ওসীলা-এর আভিধানিক অর্থ হল মাধ্যম ও নৈকট্য। (আন-নিহায়াহতু ফী গারীবিল হাদীস ওয়াল আসার ৫/১৮৫, লিসানুল আরব ১১/৭২৪)



উপরে উল্লেখিত উভয় অর্থেই ওসীলা শব্দটি ব্যবহার হয়। তবে সাহাবী, তাবেঈ ও বিশিষ্ট মুফাসসিরগণ এ আয়াতে ওসীলা শব্দটিকে মাধ্যম অর্থে ব্যবহার না করে “নৈকট্য” অর্থে ব্যবহার করেছেন। ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন: الوسيلة অর্থ القربة বা নৈকট্য। ক্বাতাদাহ (রাঃ) বলেন:



تقربوا إليه بطاعته والعمل بما يرضيه



আল্লাহ তা‘আলার আনুগত্য ও যেসব কাজে তিনি খুশি হন, তার দ্বারা তাঁর নৈকট্য হাসিল কর। (ইবনু কাসীর, ৩/১২৪)



তাই আয়াতের অর্থ হল: হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহ তা‘আলাকে ভয় কর এবং তাঁর আনুগত্য ও সৎ আমলের মাধ্যমে নৈকট্য অন্বেষণ কর।



কুরআনে বর্ণিত ‘ওসীলা’শব্দের অপব্যাখ্যা:



এক শ্রেণির নামধারী মুসলিম ইসলামকে ব্যবসার বস্তু বানিয়ে নিজের জীবনোপকরণ হিসেবে গ্রহণ করে নিয়েছে। আর অপর শ্রেণি ধর্মীয় জ্ঞানের অভাবে তাদের ব্যবসাকে ভাল মনে করে নিজেদেরকে সম্পৃক্ত করে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। সহজ কথায় ওসীলার দোহাই দিয়ে পীর-মুরিদীর ব্যবসা চালু করেছে।



সেসব নামধারী ধর্মীয় ব্যবসায়ীগণ বলে: শুধু ঈমান ও আমলের দ্বারা সাধারণ মানুষের পক্ষে আল্লাহ তা‘আলার নৈকট্য হাসিল করা সম্ভব নয় বরং একজন পীরের হাতে বাইআত নিতে হবে।



বান্দা যখন গুনাহ করতে করতে চরম পর্যায়ে চলে যায় তখন আল্লাহ তা‘আলা ও বান্দার মাঝে আড়াল সৃষ্টি হয়ে যায়। আল্লাহ তা‘আলা সে বান্দার গুনাহ ক্ষমা করতে চান না। পীর সাহেবের অনুনয়-বিনিয়ের কারণে আল্লাহ তা‘আলা তাকে ক্ষমা করে দেন। জনৈক পীর সাহেব অত্র আয়াতের তাফসীরে তার বইতে লিখেছেন: “আল্লাহ তা‘আলার নৈকট্য লাভের জন্য একজন পীরের হাতে বাইআত কর।”(নাউযুবিল্লাহ)



মূলত কোন পীর, গাউস-কুতুব, বাবা, খাজার হাতে বাইআত করা অথবা মাজারে গিয়ে ওসীলা তালাশ করা সম্পূর্ণ শির্কী ও বিদ‘আতী কাজ। যা মক্কার তৎকালীন মুশরিকরা করত। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(مَا نَعْبُدُهُمْ إِلَّا لِيُقَرِّبُونَآ إِلَي اللّٰهِ زُلْفٰي)



“আমরা তো এদের উপাসনা এজন্য করি, যেন তারা আমাদেরকে আল্লাহর নৈকট্যে পৌঁছে দেয়।”(সূরা যুমার ৩৯:৩)



শরীয়তসম্মত ওসীলা তিন প্রকার:



১. আল্লাহ তা‘আলার সুন্দর নাম ও গুণাবলীর ওসীলায় দু‘আ করা। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(وَلِلہِ الْاَسْمَا۬ئُ الْحُسْنٰی فَادْعُوْھُ بِھَا)



“আল্লাহর জন্য রয়েছে সুন্দর সুন্দর নাম। অতএব তোমরা তাঁকে সে সকল নামেই ডাক।”(সূরা আরাফ ৭:১৮০) অনুরূপ সহীহ হাদীসে এসেছে:



يا حَيُّ يا قَيُّومُ بِرَحْمَتِكَ أَسْتَغِيثُ



হে চিরঞ্জীব! হে সবকিছুর ধারক! আমি তোমার রহমতের ওসীলায় সাহায্য কামনা করছি। (নাসায়ী হা: ৩৫২৪, সহীহ)

২. সৎ আমলের দ্বারা ওসীলা করা। যেমন ঈমান, সালাত, যাকাত, সিয়াম, হজ্জ ইত্যাদি।



সহীহ হাদীসে এসেছে- একদা বানী ইসরাঈলের তিন ব্যক্তি পথে চলছিল, ঝড় বৃষ্টির কারণে তারা একটি পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত গুহায় আশ্রয় নেয়। পাহাড়ের চূড়া থেকে একটি পাথর গড়িয়ে পড়ে তাদের গুহার মুখ বন্ধ হয়ে গেলে তারা পরস্পর বলতে লাগল:



إِنَّهُ لَا يُنْجِيْكُمْ مِنْ هَذِهِ الصَّخْرَةِ إِلَّا أَنْ تَدْعُوا اللّٰهُ بِصَالِحِ أَعْمَالِكُمْ



তোমাদের সৎ আমলের ওসীলায় আল্লাহ তা‘আলাকে আহ্বান না করা ব্যতীত এ পাথর থেকে তোমাদের মুক্তির কোন উপায় নেই। (সহীহ বুখারী হা: ২২৭২, সহীহ মুসলিম হা: ২৭৪৩) মানুষ তার কৃত শরীয়তসম্মত আমলের ওসীলায় আল্লাহ তা‘আলার কাছে মুক্তি ও সাহায্য চাইবে।



৩. কোন ব্যক্তির দু‘আর মাধ্যমে ওসীলা করা। তবে শর্ত হল:

(১) ব্যক্তি জীবিত থাকতে হবে।

(২) ব্যক্তি নেককার ও মুত্তাকী হতে হবে।

(৩) উপস্থিত থাকতে হবে।



যেমন সাহাবীগণ রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর ইনতেকালের পর তাঁর চাচা আব্বাস (রাঃ)-এর দু‘আর ওসীলায় আল্লাহ তা‘আলার কাছে বৃষ্টি প্রার্থনা করতেন। (সহীহ বুখারী হা: ১০১০)



অতএব কোন মৃত ব্যক্তির ওসীলা গ্রহণ করা, নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর স্বত্ত্বা দ্বারা ওসীলা তালাশ করা, তার সম্মান ও মর্যাদা দ্বারা ওসীলা তালাশ করা ও কোন বুজুর্গ ব্যক্তি, কবর বা মাজারের ওসীলা তালাশ করা বিদআত এবং পর্যায়ক্রমে তা শির্কে পৌঁছে দেয়া।



আয়াত থেকে শিক্ষণীয় বিষয়:



১. সর্বদা আল্লাহ তা‘আলাকে ভয় করা আবশ্যক।

২. ঈমান ও সৎ আমল দ্বারা ওসীলা গ্রহণ করা শরীয়তসম্মত।

৩. শর্ত সাপেক্ষে জীবিত ব্যক্তির ওসীলা গ্রহণ বৈধ।

৪. সমাজে প্রচলিত ওসীলার অপব্যাখ্যা ও পীর-মুরিদীর অসারতা সম্পর্কে জানলাম।

৫. কিয়ামতের দিন শাস্তি থেকে বাঁচার জন্য কোন প্রকার বিনিময় দেয়া যাবে না।


তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)


তাফসীর: ৩৫-৩৭ নং আয়াতের তাফসীর:

এখানে তাকওয়া ও সংযমশীলতার নির্দেশ দেয়া হচ্ছে এবং সেটাও আবার আনুগত্যের সাথে মিশ্রিতভাবে। ভাবার্থ এই যে, মানুষ যেন আল্লাহ পাকের নিষেধকৃত কাজ থেকে বিরত থাকে এবং তাঁর নৈকট্য লাভের চেষ্টা করে। ‘ওয়াসীলা'র অর্থ হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে এটাই বর্ণিত আছে। হযরত মুজাহিদ, হযরত আবু ওয়ায়েল, হযরত হাসান, হযরত যায়েদ (আল্লাহ তাঁদের সকলের প্রতি সদয় হোন) প্রমুখ মুফাসৃসিরগণ হতেও এটাই বর্ণিত আছে।

কাতাদাহ (রাঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছে- আল্লাহ পাকের আনুগত্য স্বীকার করে এবং তার মর্জি মুতাবিক আমল করে তাঁর নৈকট্য লাভ করা। ইবনে যায়েদ (রঃ) নিম্নের আয়াতটিও পাঠ করেনঃ (আরবী) অর্থাৎ তারা তো ওরাই যারা তাদের প্রভুর নৈকট্য অনুসন্ধান করে থাকে। (১৭:৫৭) এ ইমামগণ শব্দটির যে অর্থ করেছেন তার উপর সমস্ত মুফাসসিরেরই ইজমা রয়েছে। তাঁদের কেউ এর বিপরীত অর্থ করেননি। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) এর উপর একটি আরবী কবিতাও পেশ করেছেন, যাতে ওয়াসীলাহ্ শব্দটি নৈকট্যের অর্থেই ব্যবহৃত হয়েছে। ওয়াসীলাহ-এর অর্থ ঐ জিনিস যার দ্বারা আকাংখিত বস্তু লাভ করা যায়। ওয়াসীলাহ্ জান্নাতের ঐ উচ্চ ও মনোরম জায়গার নাম যা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর জায়গা এবং সেটা আরশের অতি নিকটে। সহীহ বুখারীতে হযরত জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি আযান শুনে (আরবী)-এ দু'আটি পাঠ করে তার জন্যে কিয়ামতের দিন আমার শাফাআত হালাল হয়ে যাবে।” সহীহ মুসলিমে একটি হাদীস বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যখন তোমরা আযান শুনবে তখন মুআযযিন যা বলে তোমরাও তা-ই বল, তারপর আমার উপর দরূদ পাঠ কর, এক দরূদের বিনিময়ে তোমাদের উপর আল্লাহ দশটি রহমত নাযিল করবেন। এরপর আমার জন্যে তোমরা আল্লাহর নিকট ওয়াসীলা যাজ্ঞা কর। ওটা হচ্ছে জান্নাতের একটি মনযিল যা শুধু একটি বান্দা লাভ করবে। আশা করি যে, ঐ বান্দা আমিই। সুতরাং যে ব্যক্তি আমার জন্যে ওয়াসীলা প্রার্থনা করলো তার জন্যে আমার শাফাআত ওয়াজিব হয়ে গেল।” হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যখন তোমরা আমার উপর দরূদ পাঠ করবে তখন আমার জন্যে ওয়াসীলাও প্রার্থনা করবে।” তখন জিজ্ঞেস করা হলোঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! ওয়াসীলা কি? উত্তরে তিনি বললেনঃ “ওটা হচ্ছে জান্নাতের একটি উঁচু স্থান যা একটিমাত্র লোক লাভ করবে। আমি আশা করি যে, সেই লোকটি আমিই।` (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন) হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমরা আমার জন্যে আল্লাহর নিকট ওয়াসীলা যা কর। যে ব্যক্তি দুনিয়ায় আমার জন্যে এ প্রার্থনা করবে, আমি কিয়ামতের দিন তার জন্যে সাক্ষী ও সুপারিশকারী হয়ে যাব।” অন্য একটি হাদীসে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “জান্নাতে ওয়াসীলা অপেক্ষা বড় জায়গা আর নেই। অতএব, তোমরা আল্লাহর নিকট আমার জন্যে ওয়াসীলা প্রাপ্তির প্রার্থনা কর।` একটি গারীব ও মুনকার হাদীসে এতটুকু বেশীও রয়েছে যে, জনগণ রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করলোঃ এই ওয়াসীলায় আপনার সাথে আর কে থাকবেন? উত্তরে তিনি হযরত ফাতিমা (রাঃ) এবং হযরত হাসান (রাঃ) ও হযরত হুসাইন (রাঃ)-এর নাম উচ্চারণ করেন। আর একটি অত্যন্ত গারীব হাদীসে আছে যে, একদা হযরত আলী (রাঃ) কুফার মসজিদের মিম্বরে দাঁড়িয়ে বলেনঃ জান্নাতে দু’টি মুক্তা রয়েছে, একটি সাদা ও অপরটি হলদে। হলদেটি তো আরশের নীচে রয়েছে। আর মাকামে মাহমুদ হচ্ছে সাদা মুক্তার তৈরী, যাতে সত্তর হাজার প্রাসাদ রয়েছে, যেগুলোর প্রত্যেকটি তিন মাইলের সমান। ওর দরজা, জানালা, আসন ইত্যাদি যেন একই মূলের তৈরী। ওরই নাম হচ্ছে ওয়াসীলা। ওটাই হচ্ছে মুহাম্মাদ (সঃ) এবং তার আহূলে বায়তের জন্যে।

(আরবী) তাকওয়া অর্থাৎ নিষিদ্ধ বিষয়গুলো হতে বিরত থাকা এবং আদিষ্ট বিষয়গুলো মেনে চলার নির্দেশ দেয়ার পর আল্লাহ পাক বলেনঃ তোমরা আল্লাহর পথে জিহাদ কর। মুশরিক, কাফির অর্থাৎ যারা তার শত্রু, যারা তার দ্বীন থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে এবং তাঁর সরল সঠিক পথ থেকে সরে পড়েছে, তোমরা তাদেরকে হত্যা কর। আর এসব মুজাহিদ হচ্ছে সফলকাম। কৃতকার্যতা, সৌভাগ্য এবং মর্যাদা তাদেরই। জান্নাতের উচ্চ উচ্চ অট্টালিকা এবং আল্লাহর অসংখ্য নিয়ামত তাদেরই জন্যে। তাদেরকে এ জান্নাতে প্রবেশ করানো হবে, যেখানে মৃত্যু ও ধ্বংস নেই, যেখানে ঘাটতি ও লোকসান নেই, যেখানে রয়েছে চির যৌবন, অটুট স্বাস্থ্য এবং চিরস্থায়ী সুখ ও শান্তি।

স্বীয় প্রিয়পাত্রদের উত্তম পরিণাম বর্ণনা করার পর এখন আল্লাহ পাক তার শক্রদের মন্দ পরিণামের বর্ণনা দিতে গিয়ে বলছেন- তাদেরকে এমন কঠিন ও জঘন্য শাস্তি দেয়া হবে যে, সেই সময় যদি তারা সারা বিশ্বের অধিপতি হয়ে যায় এমনকি আরও এরই সমান হয় এবং এমতাবস্থায় সেই কঠিনতম শাস্তি থেকে বাচার জন্যে বিনিময় হিসেবে এ সবগুলো দিতেও চায় তবুও তাদের থেকে সেগুলো গ্রহণ করা হবে না। বরং যে শাস্তি তাদের উপর হবে তা হবে চিরস্থায়ী শাস্তি। তা হতে কোনক্রমেই রক্ষা পাওয়া যাবে না। অন্য জায়গায় রয়েছেজাহান্নামীরা যখন জাহান্নাম হতে বের হতে চাইবে তখন পুনরায় তাদেরকে ওরই মধ্যে ফিরিয়ে আনা হবে। জ্বলন্ত অগ্নিশিখার সাথে যখন তারা উপরে উঠে আসবে তখন তাদেরকে লোহার হাতুড় মেরে মেরে পুনরায় জাহান্নামের গর্তে নিক্ষেপ করা হবে। মোটকথা তাদের সেই চিরস্থায়ী শাস্তি থেকে বের হওয়া অসম্ভব। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “জাহান্নামের একটি লোককে আনয়ন করা হবে। তারপরে তাকে জিজ্ঞেস করা হবে-হে আদম সন্তান! তোমার জায়গা কেমন পেয়েছো?` সে উত্তরে বলবেঃ ‘আমার জায়গা অত্যন্ত খারাপ পেয়েছি।` আবার তাকে জিজ্ঞেস করা হবেঃ “তুমি কি এর থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্যে পৃথিবী পূর্ণ স্বর্ণ প্রদানে সম্মত আছ?” সে উত্তর দেবেঃ “হে আমার প্রভু! হ্যা (আমি সম্মত আছি।)” তখন আল্লাহ তাআলা বলবেনঃ “তুমি মিথ্যা বলছে। আমি তো তোমার কাছে এর চেয়েও বহু কম চেয়েছিলাম, কিন্তু তুমি সেটাও দাওনি।” অতঃপর তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। (এ হাদীসটি ইমাম মুসলিম ও ইমাম নাসাঈ হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হতে
মাররূপে বর্ণনা করেছেন) হযরত জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “এক দল লোককে জাহান্নাম থেকে বের করে জান্নাতে প্রবেশ করানো হবে।” বর্ণনাকারী হযরত ইয়াযীদ ফকীর (রঃ) বলেনঃ আমি যখন হযরত জাবির (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করলাম, তাহলে (আরবী) অর্থাৎ তারা জাহান্নাম থেকে বের হতে চাইবে কিন্তু তা থেকে তারা বের হতে পারবে না-এ আয়াতের অর্থ কি হবে? তখন তিনি বললেনঃ এর পূর্বের আয়াতটি (আরবী) পাঠ কর। এর দ্বারা স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হচ্ছে যে, এরা কাফির। সুতরাং কখনও জাহান্নাম হতে বের হতে পারবে না। অন্য বর্ণনায় রয়েছে-হযরত ইয়াযীদেরও এ বিশ্বাস ছিল যে, জাহান্নাম থেকে কেউই বের হতে পারবে না, কাজেই উপরোক্ত হাদীসটি শুনে তিনি হযরত জাবির (রাঃ)-এর নিকট গিয়ে বললেন, আমার অন্য লোকের উপর তো কোন দুঃখ নেই। আমার দুঃখ শুধু আপনাদের ন্যায় সাহাবীদের উপর যে, আপনারাও কুরআন কারীমের বিপরীত কথা বলে থাকেন? ঐ সময় আমার খুব রাগও হয়েছিল। আমার এ কথা শুনে হযরত জাবির (রাঃ)-এর সঙ্গীগণ আমাকে খুব ধমক দেন। কিন্তু হযরত জাবির (রাঃ) অত্যন্ত সহিষ্ণু ছিলেন বলে আমাকে বুঝিয়ে বললেনঃ “কুরআন কারীমে যাদের জাহান্নাম থেকে বের না হওয়ার বর্ণনা রয়েছে তারা হচ্ছে কাফির। তুমি কি কুরআন পড়নি?” আমি উত্তরে বললামঃ হ্যা, পড়েছি। আমার সম্পূর্ণ কুরআন মুখস্থ আছে। তখন তিনি বলেনঃ তাহলে তোমার কি কুরআনের (আরবী) (১৭:৭৯)-এ আয়াতটি স্মরণ নেই? এ আয়াতে মাকামে মাহমুদের উল্লেখ রয়েছে। আর এটা হচ্ছে শাফাআতের জায়গা। আল্লাহ তাআলা কতক লোককে তাদের পাপের কারণে জাহান্নামে নিক্ষেপ করবেন এবং যতদিন ইচ্ছা জাহান্নামে রাখবেন। তারপর যখন ইচ্ছা তাদেরকে তিনি জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেবেন। হযরত ইয়াযীদ (রঃ) বলেন-এরপর থেকে আমার ধারণা শুধরে যায়। (এটা হাফিয ইবনে মিরদুওয়াই (রঃ) বর্ণনা করেছেন)

হযরত তলাক ইবনে হাবীব (রঃ) বলেনঃ “আমিও জাহান্নামীদের জন্যে শাফাআতের অস্বীকারকারী ছিলাম। শেষ পর্যন্ত আমি হযরত জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রাঃ)-এর সাথে সাক্ষাৎ করি। অতঃপর আমার দাবী সাব্যস্তকরণে যেসব আয়াতে জাহান্নামে চির অবস্থানের বর্ণনা রয়েছে সেগুলো পাঠ করে শুনাই। তিনি শুনে বলেনঃ “হে তলাক! তুমি কি আল্লাহর কিতাব ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর সুন্নাতের ইলমের বিষয়ে নিজেকে আমার চেয়ে শ্রেষ্ঠ মনে কর? জেনে রেখো যে, যেসব আয়াত তুমি পাঠ করে শুনালে সেগুলো হচ্ছে জাহান্নামের অধিবাসী অর্থাৎ মুশরিকদের ব্যাপারে প্রযোজ্য। কিন্তু যারা জাহান্নাম থেকে বের হবে তারা ঐসব লোক যারা মুশরিক নয়, তবে পাপী। পাপ অনুযায়ী শাস্তি ভোগের পর তাদেরকে জাহান্নাম থেকে বের করা হবে।” হযরত জাবির (রাঃ) এসব বলার পর স্বীয় হাত দুটি দ্বারা স্বীয় কান দু'টির দিকে ইশারা করে বলেনঃ আমি যদি আল্লাহর রাসূল (সঃ) থেকে শুনে না থাকি যে, জাহান্নামে প্রবেশের পরও মানুষকে তা থেকে বের করা হবে তবে আমার এ দু'টি (কান) বধির হয়ে যাক। আল-কুরআনের আয়াতগুলো যেমন তোমরা পড় তেমন আমিও পড়ি। (এ হাদীসটি ইবনে মিরদুওয়াই বর্ণনা করেছেন)





সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।