সূরা আল-মায়েদা (আয়াত: 1)
হরকত ছাড়া:
يا أيها الذين آمنوا أوفوا بالعقود أحلت لكم بهيمة الأنعام إلا ما يتلى عليكم غير محلي الصيد وأنتم حرم إن الله يحكم ما يريد ﴿١﴾
হরকত সহ:
یٰۤاَیُّهَا الَّذِیْنَ اٰمَنُوْۤا اَوْفُوْا بِالْعُقُوْدِ ۬ؕ اُحِلَّتْ لَکُمْ بَهِیْمَۃُ الْاَنْعَامِ اِلَّا مَا یُتْلٰی عَلَیْکُمْ غَیْرَ مُحِلِّی الصَّیْدِ وَ اَنْتُمْ حُرُمٌ ؕ اِنَّ اللّٰهَ یَحْکُمُ مَا یُرِیْدُ ﴿۱﴾
উচ্চারণ: ইয়াআইয়ূহাল্লাযীনা আ-মানূআওফূবিল‘উকূদি উহিল্লাত লাকুম বাহীমাতুল আন‘আ-মি ইল্লা-মা-ইউতলা-‘আলাইকুম গাইরা মুহিলিলসসাইদি ওয়া আনতুম হুরুমুন ইন্নাল্লা-হা ইয়াহকুমুমা-ইউরীদ।
আল বায়ান: হে মুমিনগণ, তোমরা অঙ্গীকারসমূহ পূর্ণ কর। তোমাদের জন্য গৃহপালিত চতুস্পদ জন্তু হালাল করা হয়েছে, তোমাদের নিকট যা বর্ণনা করা হচ্ছে তা ছাড়া। তবে ইহরাম অবস্থায় শিকারকে হালাল করবে না। নিশ্চয় আল্লাহ যা ইচ্ছা বিধান দেন।
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ১. হে মুমিনগন(১)! তোমরা অঙ্গীকারসমূহ(২) পূর্ণ করবে(৩)। যা তোমাদের নিকট বর্ণিত হচ্ছে(৪) তা ছাড়া গৃহপালিতা(৫) চতুষ্পদ জন্তু(৬) তোমাদের জন্য হালাল করা হল, তবে ইহরাম অবস্থায় শিকার করাকে বৈধ মনে করবে না(৭)। নিশ্চয়ই আল্লাহ্ যা ইচ্ছে আদেশ করেন।(৮)
তাইসীরুল ক্বুরআন: ওহে মু’মিনগণ! তোমরা অঙ্গীকারসমূহ পূর্ণ কর। তোমাদের জন্য গৃহপালিত চতুস্পদ জন্তু হালাল করা হল- সেগুলো ছাড়া যেগুলোর বিবরণ তোমাদেরকে দেয়া হচ্ছে, আর ইহরাম অবস্থায় শিকার করা অবৈধ। আল্লাহ যা চান হুকুম দেন।
আহসানুল বায়ান: (১) হে বিশ্বাসীগণ! তোমরা অঙ্গীকার (ও চুক্তিসমূহ) পূর্ণ কর।[1] যে সব জন্তুর কথা তোমাদের উপর পাঠ করা হচ্ছে[2] তা ছাড়া (ক্ষুরবিশিষ্ট) চতুষ্পদ জন্তু তোমাদের জন্য বৈধ করা হল,[3] তবে ইহরাম অবস্থায় শিকারকে বৈধ মনে করবে না। নিশ্চয় আল্লাহ নিজ ইচ্ছামত আদেশ প্রদান করে থাকেন।
মুজিবুর রহমান: হে মু’মিনগণ! তোমরা তোমাদের ও‘য়াদাগুলি পূর্ণ কর। তোমাদের জন্য চতুস্পদ জন্তু হালাল করা হয়েছে। তবে যেগুলি হারাম হওয়া সম্পর্কে তোমাদের উপর পবিত্র কুরআনের আয়াতগুলি অবতীর্ণ হয়েছে সেগুলি এবং ইহরাম বাঁধা অবস্থায় তোমাদের শিকার করা জন্তুগুলি হালাল নয়। নিশ্চয়ই আল্লাহ তাঁর ইচ্ছা অনুযায়ী হুকুম করে থাকেন।
ফযলুর রহমান: হে ঈমানদারগণ! তোমরা অঙ্গীকারসমূহ পূরণ কর। তোমাদের জন্য চতুষ্পদ জন্তু হালাল করা হল, সেগুলো ব্যতীত যেগুলো তোমাদের কাছে উল্লেখ করা হবে (এই সূরার
মুহিউদ্দিন খান: মুমিনগণ, তোমরা অঙ্গীকারসমূহ পূর্ন কর। তোমাদের জন্য চতুষ্পদ জন্তু হালাল করা হয়েছে, যা তোমাদের কাছে বিবৃত হবে তা ব্যতীত। কিন্তু এহরাম বাধাঁ অবস্থায় শিকারকে হালাল মনে করো না! নিশ্চয় আল্লাহ তা’আলা যা ইচ্ছা করেন, নির্দেশ দেন।
জহুরুল হক: ওহে যারা ঈমান এনেছ! তোমাদের অঙ্গীকারসমূহ প্রতিপালন করো। তোমাদের জন্য বৈধ করা গেল গবাদি পশু -- তোমাদের কাছে যা বর্ণনা করা হয়েছে তা ব্যতীত, শিকার বিধিসংগত নয় যখন তোমরা হারামে থাকো। নিঃসন্দেহ আল্লাহ্ হুকুম করেন যা তিনি মনস্থ করেন।
Sahih International: O you who have believed, fulfill [all] contracts. Lawful for you are the animals of grazing livestock except for that which is recited to you [in this Qur'an] - hunting not being permitted while you are in the state of ihram. Indeed, Allah ordains what He intends.
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ১. হে মুমিনগন(১)! তোমরা অঙ্গীকারসমূহ(২) পূর্ণ করবে(৩)। যা তোমাদের নিকট বর্ণিত হচ্ছে(৪) তা ছাড়া গৃহপালিতা(৫) চতুষ্পদ জন্তু(৬) তোমাদের জন্য হালাল করা হল, তবে ইহরাম অবস্থায় শিকার করাকে বৈধ মনে করবে না(৭)। নিশ্চয়ই আল্লাহ্– যা ইচ্ছে আদেশ করেন।(৮)
তাফসীর:
(১) আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, যখন শুনবে যে, আল্লাহ্ তাআলা ‘ইয়া আইয়ুহাল্লাযীনা আমানু’ বা ‘হে ঈমানদারগণ’ বলছে তখন সেটাকে কান লাগিয়ে শুন। কেননা, এর মাধ্যমে কোন কল্যানের নির্দেশ আসবে বা অকল্যাণ থেকে নিষেধ করা হবে। [ইবন কাসীর]
(২) আয়াতে মুমিনগণকে ওয়াদা-অঙ্গীকার পূর্ণ করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এ কারণেই সূরা মায়েদার অপর নাম ‘সূরা উকুদ’ তথা ওয়াদা- অঙ্গীকারের সূরা। চুক্তি-অঙ্গীকার ও লেন-দেনের ক্ষেত্রে এ সূরাটি বিশেষ করে এর প্রথম আয়াতটি সবিশেষ গুরুত্বের অধিকারী। এ কারণেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন আমর ইবন হাযমকে ঐ আমলের শাসনকর্তা নিযুক্ত করে প্রেরণ করেন এবং একটি ফরমান লিখে তাঁর হাতে অর্পণ করেন, তখন এ ফরমানের শিরোনামে উল্লেখিত আয়াতটিও লিপিবদ্ধ করে দেন। [দেখুন, নাসায়ী: ৪৮৫৬; আল খাতীবুল বাগদাদী, আল ফাকীহ ওয়াল মুতাফাককিহ হাদীস নং ৩১৮ (হাদীসটির সনদ হাসান); দেখুন, আদেল ইউসুফ আল-আযযাযীর টিকা এবং ইরউয়াউল গালীল ১ম খণ্ড পৃষ্ঠা নং ১৫৮-১৬১]
(৩) عُقُودٌ শব্দটি عقد শব্দের বহুবচন। এর শাব্দিক অর্থ বাঁধা, আবদ্ধ করা। চুক্তিতে যেহেতু দুই ব্যক্তি অথবা দুই দল আবদ্ধ হয়, এজন্য এটাকেও عقد বলা হয়েছে। এভাবে عقود এর অর্থ হয়- عهود অর্থাৎ চুক্তি ও অঙ্গীকার। [তাবারী] বস্তুত: দুই পক্ষ যদি ভবিষ্যতে কোন কাজ করা অথবা না করার বাধ্য-বাধকতায় একমত হয়ে যায়, তবে তাকেই আমরা আমাদের পরিভাষায় চুক্তি বলে অভিহিত করে থাকি। অতএব, উপরোক্ত বাক্যের সারমর্ম এই যে, পারস্পরিক চুক্তি পূর্ণ করাকে জরুরী ও অপরিহার্য মনে কর। [আহকামুল কুরআন লিল জাসসাস]
তবে এ আয়াতে চুক্তি বলে কোন ধরনের চুক্তিকে বুঝানো হয়েছে এ ব্যাপারে তফসীরবিদগণের বিভিন্ন উক্তি রয়েছে। আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা বলেনঃ আল্লাহ তা'আলা বান্দাদের কাছ থেকে ঈমান ও ইবাদত সম্পর্কিত যে সব অঙ্গীকার নিয়েছেন অথবা আল্লাহ্ তা'আলা বান্দাদের কাছ থেকে স্বীয় নাযিলকৃত বিধি-বিধান হালাল ও হারাম সম্পর্কিত যেসব অঙ্গীকার নিয়েছেন, আয়াতে সেগুলোকেই বুঝানো হয়েছে। তাফসীরকার যায়দ ইবনে আসলাম বলেনঃ এখানে ঐসব চুক্তিকে বুঝানো হয়েছে, যা মানুষ পরস্পরে একে অন্যের সাথে সম্পাদন করে। যেমন, বিবাহ-শাদী ও ক্রয়-বিক্রয় চুক্তি ইত্যাদি। মুজাহিদ, রবী, কাতাদা প্রমুখ বলেনঃ এখানে ঐসব শপথ ও অঙ্গীকারকে বুঝানো হয়েছে যা জাহেলিয়াত যুগে একজন অন্যজনের কাছ থেকে পারস্পরিক সাহায্য সহযোগিতার ক্ষেত্রে সম্পাদন করতো। [বাগভী]
প্রকৃতপক্ষে এ সব উক্তির মধ্যে কোন বিরোধিতা নাই। কারণ, উপরোক্ত সব চুক্তি ও অঙ্গীকারই এ শব্দের অন্তর্ভুক্ত এবং কুরআন সবগুলোই পূর্ণ করার নির্দেশ দিয়েছে। ইমাম আবুল লাইস আস-সামারকান্দী বলেনঃ চুক্তির যত প্রকার রয়েছে, সবই এ শব্দের অন্তর্ভুক্ত। তিনি আরো বলেনঃ এর প্রাথমিক প্রকার তিনটি। (এক) পালনকর্তার সাথে মানুষের অঙ্গীকার। উদাহরণতঃ ঈমান ও ইবাদতের অঙ্গীকার অথবা হারাম ও হালাল মেনে চলার অঙ্গীকার। (দুই) নিজের সাথে মানুষের অঙ্গীকার। যেমন, নিজ যিম্মায় কোন বস্তুর মান্নত মানা অথবা শপথ করে কোন কাজ নিজের উপর জরুরী করে নেওয়া। (তিন) মানুষের সাথে মানুষের সম্পাদিত চুক্তি। এছাড়া সে সব চুক্তিও এর অন্তর্ভুক্ত, যা দুই ব্যক্তি, দুই দল বা দুই রাষ্ট্রের মধ্যে সম্পাদিত হয়। বিভিন্ন সরকারের আন্তজাতিক চুক্তি অথবা পারস্পরিক সমঝোতা, বিভিন্ন দলের পারস্পরিক অঙ্গীকার এবং দুই ব্যক্তির মধ্যকার সর্বপ্রকার লেন-দেন,বিবাহ, ব্যবসা, শেয়ার, ইজারা ইত্যাদিতে পারস্পরিক সম্মতিক্রমে যে সব বৈধ শর্ত স্থির করা হয়, আলোচ্য আয়াতদৃষ্টে তা মেনে চলা প্রত্যেক পক্ষের অবশ্য কর্তব্য। তবে শরীআত বিরোধী শর্ত আরোপ করা এবং তা গ্রহণ করা কারও জন্যে বৈধ নয়। [তাফসীর আবুল লাইস আস-সামারকান্দী]
(৪) যা বর্ণিত হচ্ছে বলে যা বোঝানো হয়েছে, তা এখানে বর্ণিত হয় নি। পরবর্তী ৩ নং আয়াতে সেটার বিস্তারিত বর্ণনা এসেছে। [আদওয়াউল বায়ান]
(৫) আয়াতে বর্ণিত أنعام শব্দটি نعم এর বহুবচন। এর অর্থ পালিত পশু। যেমন- উট, গরু, মহিষ, ছাগল ইত্যাদি। সূরা আল-আন'আমে এদের আটটি প্রকার বর্ণনা করা হয়েছে। এদের সবাইকে أنعام বলা হয়। এখন আয়াতের অর্থ দাঁড়িয়েছে এই যে, গৃহপালিত পশু আট প্রকার তোমাদের জন্যে হালাল করা হয়েছে। পূর্বেই বর্ণিত হয়েছে যে, عقود শব্দ বলে যাবতীয় চুক্তি-অঙ্গীকার বুঝানো হয়েছে। তন্মধ্যে একটি ছিল ঐ অঙ্গীকার, যা আল্লাহ তা'আলা হালাল ও হারাম মেনে চলার ব্যাপারে বান্দার কাছ থেকে নিয়েছেন। আলোচ্য বাক্যে এই বিশেষ অঙ্গীকারটিই বর্ণিত হয়েছে যে, আল্লাহ তা'আলা তোমাদের জন্যে উট, ছাগল, গরু, মহিষ ইত্যাদিকে হালাল করে দিয়েছেন। শরীআতের নিয়ম অনুযায়ী তোমরা এগুলোকে যবেহ করে খেতে পার। [কুরতুবী]
(৬) এখানে সব ধরনের জন্তু বুঝানো হয়নি। বরং সুনির্দিষ্ট কিছু জন্তু বোঝানো হয়েছে। তাদের সম্পর্কে বলা হয়েছে بَهِيمَةٌ যেসব জীব-জন্তুকে সাধারণভাবে নির্বোধ মনে করা হয়, সেগুলোকে بَهِيمَةٌ বলা হয়। কেননা, মানুষ অভ্যাসগতভাবে তাদের ভাষা বুঝে না। ফলে তাদের বক্তব্য مُبْهَم তথা অস্পষ্ট থেকে যায়। এখানে ‘বাহীমা’ বলে কোন কোন সাহাবীর মতে, জবাইকৃত প্রাণীর উদরে যে বাচ্ছা পাওয়া যায় সেটাকে বোঝানো হয়েছে। [তাফসীরে কুরতুবী; সা’দী, বাগভী; ফাতহুল কাদীর]
(৭) ইহরাম অবস্থায় শিকার করতে নিষেধ করার মাধ্যমে এটাও উদ্দেশ্য হতে পারে যে, পূর্বে বর্ণিত ‘বাহীমাতুল আন’আম’ বলতে সে সমস্ত প্রাণীকেও বোঝাবে, যেগুলোকে সাধারণত শিকার করা হয়। যেমন, হরিণ, বন্য গরু, খরগোশ ইত্যাদি। কারণ, ইহরাম অবস্থায় শিকার করা হারাম হওয়ার অর্থ স্বাভাবিক অবস্থায় হালাল হওয়া। [সা’দী]
(৮) আল্লাহ সার্বভৌম কর্তৃত্বের অধিকারী একচ্ছত্র শাসক। তিনি নিজের ইচ্ছেমত যে কোন হুকুম দেয়ার পূর্ণ ইখতিয়ার রাখেন। কাতাদা বলেন, তিনি তাঁর সৃষ্টির ব্যাপারে যা ইচ্ছে বিধান প্রদানের অধিকারী। তিনি তাঁর বান্দাদের জন্য যা ইচ্ছা তা বর্ণনা করেন, ফরয নির্ধারিত করেন, সীমা ঠিক করে দেন। আনুগত্যের নির্দেশ দেন ও অবাধ্যতা থেকে নিষেধ করেন। [আত-তাফসীরুস সহীহ] তার সমস্ত বিধান জ্ঞান, প্রজ্ঞা, যুক্তি, ন্যায়-নীতি ও কল্যাণের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত হলেও ঈমানদার শুধু এ জন্যই তার আনুগত্য করে না; বরং একমাত্র সর্বশক্তিমান প্রভু আল্লাহর হুকুম বলেই তার আনুগত্য করে। তাই কোন বস্তুর হালাল ও হারাম হবার জন্য আল্লাহর অনুমোদন ও অননুমোদন ছাড়া আর দ্বিতীয় ভিত্তির আদৌ কোন প্রয়োজন নেই। তারপরও সেগুলোতে অনেক হেকমত নিহিত থাকে। যেমন তোমাদেরকে তিনি অঙ্গীকার পূর্ণ করার নির্দেশ দিয়েছেন, কারণ, এতে রয়েছে তোমাদের স্বার্থ। আর এর বিপরীত হলে, তোমাদের স্বার্থহানী হবে। তোমাদের জন্য কিছু প্রাণী হালাল করেছেন সম্পূর্ণ দয়ার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে। আবার কিছু প্রাণী থেকে নিষেধ করেছেন ক্ষতিগ্রস্ততা থেকে মুক্ত রাখার জন্য। অনুরূপভাবে তোমাদের জন্য ইহরাম অবস্থায় শিকার করা নিষেধ করেছেন, তার সম্মান রক্ষার্থে। [সা'দী]
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (১) হে বিশ্বাসীগণ! তোমরা অঙ্গীকার (ও চুক্তিসমূহ) পূর্ণ কর।[1] যে সব জন্তুর কথা তোমাদের উপর পাঠ করা হচ্ছে[2] তা ছাড়া (ক্ষুরবিশিষ্ট) চতুষ্পদ জন্তু তোমাদের জন্য বৈধ করা হল,[3] তবে ইহরাম অবস্থায় শিকারকে বৈধ মনে করবে না। নিশ্চয় আল্লাহ নিজ ইচ্ছামত আদেশ প্রদান করে থাকেন।
তাফসীর:
[1] ‘عقود’ এটা ‘عقد’ এর বহুবচন। যার আভিধানিক অর্থ গিরা লাগানো। এ শব্দ কোন বস্তু (দড়ি, সূতা, চুল ইত্যাদি)-তে গিরা বাঁধার অর্থেও ব্যবহার হয়; যেমন অঙ্গীকার ও চুক্তি করার অর্থেও ব্যবহার হয়। এখানে এর অর্থ, আল্লাহ প্রদত্ত বিধি-বিধান যা মানুষের উপর আরোপ করা হয়েছে। অনুরূপ লোকেরা ব্যবহারিক জীবনে নিজেদের মধ্যে যে অঙ্গীকার ও চুক্তি করে, তাকেও বুঝানো হয়েছে। উভয়ই পালন ও পূর্ণ করা আবশ্যিক।
[2] بهيمة চতুষ্পদ জন্তুকে বলা হয়। بهم ـ إبهام ধাতু থেকে এর উৎপত্তি। কেউ কেউ বলেন, এদের বাকশক্তি, জ্ঞান ও বোধশক্তিতে যেহেতু إبهام (রুদ্ধতা) আছে, তার জন্য এদেরকে بهيمة বলা হয়েছে। أَنْعاَمٌ উট, গরু, ছাগল ও ভেঁড়া বা দুম্বাকে বলা হয়। কেননা এদের গতি ও চালচলনে نعومة (নম্রতা) থাকে। بهيمة الأنعام (চতুষ্পদ জন্তু) নর ও মাদী মিলে আট প্রকার; যা সূরা আনআম ১৪৩নং আয়াতে বিস্তারিত আকারে বর্ণিত হয়েছে। এ ছাড়া যে সব পশুকে অহ্শী, জংলী, বন্য বা বুনো বলা হয়; যেমন হরিণ, নীল গাই ইত্যাদি, যেগুলো সাধারণতঃ শিকার করা হয়, সেগুলোও বৈধ। কিন্তু ইহরাম অবস্থায় এগুলো ও অন্যান্য পাখী শিকার করা নিষেধ। সুন্নাহতে বর্ণিত নীতি অনুসারে যে পশু শিকারী দাঁতবিশিষ্ট এবং যে পাখী শিকারী নখবিশিষ্ট নয় তা হালাল। যেমন সূরা বাক্বারার ১৭৩নং আয়াতের টীকায় এর বিস্তারিত বিবরণ উল্লিখিত হয়েছে। শিকারী দাঁতবিশিষ্ট পশু বলতে সেই পশু উদ্দিষ্ট, যে তার শিকারী বা ছেদক দাঁত দ্বারা শিকার ধরে ও ফেড়ে খায়; যেমন বাঘ (সিংহ, চিতা, নেকড়ে), কুকুর প্রভৃতি। আর শিকারী নখবিশিষ্ট পাখী বলতে সেই পাখী উদ্দিষ্ট, যে তার ধারালো নখর দ্বারা শিকার ধরে; যেমন শকুনি, বাজ, ঈগল, চিল, কাক ইত্যাদি।
[3] এর বিস্তারিত বিবরণ ৩নং আয়াতে আসছে।
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: নামকরণ ও অবতীর্ণের সময়কাল:
الْمَائِدَةُ (আল মায়িদাহ) শব্দের অর্থ: দস্তরখানা, খাদ্য ইত্যাদি। অত্র সূরার ১১৪ নং আয়াতে আল মায়িদাহ (الْمَائِدَةُ) শব্দটি থেকে সূরার নামকরণ করা হয়েছে। তাছাড়া এ সূরাতে খাদ্য হিসেবে কোন্ প্রাণী ও বস্তু খাওয়া হালাল বা হারাম সে সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে।
সূরা আল-মায়িদাহ সম্পূর্ণ মদীনায় অবতীর্ণ হয়। মদীনায় অবতীর্ণ হওয়া সূরাসমূহের মধ্যে এটি শেষ দিকের সূরা। এমনকি কেউ কেউ এটাকে কুরআনের সর্বশেষ অবতীর্ণ সূরা বলেও আখ্যায়িত করেছেন। (আল মাবাহিস ফী উলুমুল কুরআন, মান্নাউল কাত্তান পৃঃ ৬৬)।
শানে নুযূল ও ফযীলত:
আবদুল্লাহ বিন আমর (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বাহনের ওপর আরোহী অবস্থায় সূরা মায়িদাহ অবতীর্ণ হয়। তখন বাহন তাঁকে বহন করতে অক্ষম হলে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বাহন হতে নেমে পড়লেন। (মুসনাদ আহমাদ হা: ৬৬৪৩, সনদ হাসান, ইবনে কাসীর ৩/৫)
যুবাইর বিন নুফাইর (রাঃ) বলেন: একদা আমি হজ্জ আদায়ের জন্য গমন করি। অতঃপর আমি আয়িশাহ (রাঃ)-এর সাথে সাক্ষাত করার জন্য তার কাছে প্রবেশ করি। তখন আয়িশাহ (রাঃ) বললেন: হে যুবাইর! তুমি কি সূরা মায়িদাহ তেলাওয়াত কর? উত্তরে বললাম: হ্যাঁ। তখন বললেন: এটা সর্বশেষ অবতীর্ণ সূরা। সুতরাং এতে যা কিছু হালাল হিসেবে পাও তা হালাল হিসেবে গ্রহণ কর আর যা হারাম হিসেবে পাও তা হারাম হিসেবেই গ্রহণ কর। (হাকিম: ২/৩১১, ইমাম হাকিম বলেন: এ হাদীসটি বুখারী ও মুসলিমের শর্তানুপাতে কিন্তু তারা নিয়ে আসেননি)
রূহুল মা‘আনী গ্রন্থকার- আতিয়্যা বিন কায়েস থেকে এর সমর্থনে একটি বর্ণনা নিয়ে এসেছেন:
المائدة من آخر القرآن نزولا فأحلوا حلالها وحرموا حرامها
সূরা আল-মায়িদাহ কুরআনের সর্বশেষ অবতীর্ণ সূরাসমূহের অন্তর্ভুক্ত। সুতরাং এর হালালগুলোকে হালাল হিসেবে ও হারামগুলোকে হারাম হিসেবে গ্রহণ করে নাও। (আহকামূল কুরআন ৪/১৬১)
সূরা আল-মায়িদাহ সূরা নিসার মত বিধি-বিধান সম্বলিত একটি গুরুত্বপূর্ণ সূরা। এ কারণেই রূহুল মা‘আনীর গ্রন্থকার বলেন: বিষয়বস্তুর দিক দিয়ে যেমন সূরা আল-বাক্বারাহ ও সূরা আলি-ইমরান এক ও অভিন্ন তেমনি সূরা নিসা ও সূরা মায়িদাহ বিষয়বস্তুর দিক দিয়ে এক ও অভিন্ন; কেননা এ দু’টি সূরায় প্রধানত বিভিন্ন বিধি-বিধান বিস্তারিত আলোচিত হয়েছে এবং মৌলিক বিধান প্রসঙ্গক্রমে বর্ণিত হয়েছে।
এ সূরায় যে সকল জীব-জন্তু খাওয়া হালাল ও যেগুলো হারাম, শত্রু“ হলেও তার প্রতি ন্যায় বিচার করা, ভাল কাজে সহযোগিতা করা ও অন্যায় কাজে সহযোগিতা না করা, ওযূ ও তায়াম্মুমের পদ্ধতি, বানী ইসরাঈলের প্রতি আল্লাহ তা‘আলার অনুগ্রহ, ইয়াহূদী ও খ্রিস্টানদের আল্লাহ তা‘আলার প্রিয়পাত্র হওয়ার দাবী, চোরের বিধান, ইসলামদ্রোহীদের বিধান, কুরআন ও সুন্নাহ ছাড়া অন্য বিধান দ্বারা বিচার-ফায়সালা করার হুকুম, দীনের কোন বিধান নিয়ে ঠাট্টা না করে বরং তার প্রতি আনুগত্য করা এবং যারা ত্রিত্ববাদে বিশ্বাসী তাদের বিধানসহ আরো অনেক মাসআলাহ বর্ণনা করা হয়েছে।
১-২ নং আয়াতের তাফসীর:
অত্র সূরার প্রথমেই আল্লাহ তা‘আলা মু’মিনদেরকে সম্বোধন করে অঙ্গীকার পূর্ণ করার নির্দেশ প্রদান করেছেন। عقود শব্দটি عقد এর বহুবচন। অর্থ হল عهد বা চুক্তি, অঙ্গীকার, ইত্যাদি।
ইমাম জাসসাস (রহঃ) বলেন: দু’জন ব্যক্তি যদি ভবিষ্যতে কোন কাজ করা অথবা না করার ওপর একমত হয় তবে তাকেই عقد , عهد ও معاهدة বলে। আমরা যাকে চুক্তি বলি।
ইবুন আব্বাস (রাঃ) বলেন: আল্লাহ তা‘আলা কুরআনে যা কিছু হালাল, হারাম, ফরয ও সীমা নির্ধারণ করে দিয়েছেন সবই এ অঙ্গীকারের অন্তভুর্ক্ত। অতএব তা ভঙ্গ ও খেলাফ কর না। অন্যত্র আল্লাহ তা‘আলা কঠিনভাবে হুশিয়ার করে বলেন:
(وَالَّذِيْنَ يَنْقُضُوْنَ عَهْدَ اللّٰهِ مِنْۭ بَعْدِ مِيْثَاقِه۪ وَيَقْطَعُوْنَ مَآ أَمَرَ اللّٰهُ بِه۪ٓ أَنْ يُّوْصَلَ وَيُفْسِدُوْنَ فِي الْأَرْضِ ج أُولٰ۬ئِكَ لَهُمُ اللَّعْنَةُ وَلَهُمْ سُوْءُ الدَّارِ)
“যারা আল্লাহর সাথে দৃঢ় অঙ্গীকারে আবদ্ধ হবার পর সেটা ভঙ্গ করে, যে সম্পর্ক অক্ষুণœ রাখতে আল্লাহ আদেশ করেছেন তা ছিন্ন করে এবং পৃথিবীতে অশান্তি সৃষ্টি করে বেড়ায় তাদের জন্য লা‘নত এবং তাদের জন্য আছে মন্দ আবাস।”(সূরা রা‘দ ১৩:২৫)
যহহাক (রহঃ)
(أَوْفُوْا بِالْعُقُوْدِ)
‘তোমরা অঙ্গীকারসমূহ পূর্ণ কর’এর ব্যাখ্যায় বলেন: আল্লাহ তা‘আলা যেসব বিষয় বৈধ ও অবৈধ করেছেন এবং তার কিতাব ও নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর ওপর বিশ্বাস সংক্রান্ত আবশ্যকীয় যে কাজগুলো করার ওয়াদা নিয়েছেন عقود দ্বারা সেগুলো বুঝানো হয়েছে। এছাড়াও এ সম্পর্কে অনেক বর্ণনা পাওয়া যায়। (ইবনে কাসীর, ৩/৯)
আল্লাহ তা‘আলা ও বান্দার মাঝে যে অঙ্গীকার- বান্দা একমাত্র আল্লাহ তা‘আলার ইবাদত করবে, তাঁর সকল হক আদায় করবে; রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ও তাঁর উম্মাতের মাঝে যে অঙ্গীকার- উম্মাতেরা রাসূলের আনুগত্য করবে; সন্তান তার পিতা-মাতা ও আত্মীয়-স্বজনদের পরস্পরের মাঝে যে অঙ্গীকার- তারা পিতা-মাতা ও আত্মীয়-স্বজনদের সাথে সদ্ব্যবহার করবে এবং তাদের সাথে সম্পর্ক বজায় রাখবে। এছাড়াও মানুষ তার অন্যান্য সঙ্গী সাথীদের সাথে ব্যবসা-বাণিজ্যসহ জীবনের বৈষয়িক বিষয়ে যত অঙ্গীকার করে সব এতে শামিল। (তাফসীর সা‘দী, অত্র আয়াতের তাফসীর)
এ কারণেই ইমাম রাগেব (রহঃ) বলেন: যত প্রকার চুক্তি রয়েছে, সবই এর অন্তর্ভুক্ত। অতঃপর তিনি বলেন: প্রধানত চুক্তি তিন প্রকার: (১) আল্লাহ তা‘আলার সাথে মানুষের অঙ্গীকার, যেমন ঈমান ও ইবাদতের অঙ্গীকার অথবা হালাল-হারাম মেনে চলার অঙ্গীকার। (২) নিজের সাথে মানুষের অঙ্গীকার। (৩) মানুষের সাথে মানুষের সম্পাদিত চুক্তি, বিবাহ, ব্যবসায়, লেন-দেন ইত্যাদি।
(بَهِيْمَةُ الْأَنْعَامِ)
‘চতুষ্পদ জন্তু’ নর ও মাদী মিলে চতুষ্পদ জন্তু আট প্রকার। সূরা আন‘আমের ১৪৩ ও ১৪৪ নং আয়াতে উল্লেখ করা হয়েছে। সেগুলো হলো: গরু, উট, ছাগল, মেষ এদের নর ও মাদী। এ ছাড়াও আরো অনেক প্রাণী রয়েছে যা খাওয়া হালাল। এক্ষেত্রে সূত্র হল: কুরআন ও সহীহ সুন্নাহ যা হারাম করেছে তা হারাম, বাকি সব হালাল। কতক সাহাবী এ আয়াত দ্বারা মাদী পশু জবাই করার পর গর্ভে ভ্রুণ পাওয়া গেলে তা হালাল বলেছেন। এ সম্পর্কে সাহাবী আবূ সাঈদ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন: আমরা বললাম; হে আল্লাহর রাসূল! আমরা উটনী ও গাভী অথবা ছাগল জবাই করি আর তাদের পেটে ভ্রুণ পাই, আমরা কি ফেলে দেব, না খাব? তিনি বললেন: তোমাদের ইচ্ছা হলে খাও; কেননা তার মাকে জবাই করাই হল তাকে জবাই করা। (আবূ দাঊদ হা: ২৮২৭, তিরমিযী হা: ৩১৯৯, সহীহ)
(إِلَّا مَا يُتْلٰي عَلَيْكُمْ)
‘যা তোমাদের নিকট বর্ণিত হয়েছে তা ব্যতীত’ অর্থাৎ যা তেলাওয়াত করে শুনানো হবে তা ব্যতীত সব হালাল। ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন: অর্থাৎ মৃত প্রাণী, রক্ত, শূকরের গোশত। কাতাদাহ বলেন: রক্ত ও যে পশু যবাই করার সময় আল্লাহ তা‘আলার নাম নেয়া হয় না। এ অংশটুকুর তাফসীর ৩ নং আয়াতে উল্লেখ করা হবে ইনশা-আল্লাহ।
(غَيْرَ مُحِلِّي الصَّيْدِ)
‘তবে ইহরাম অবস্থায় শিকার করা অবৈধ’অর্থাৎ হজ্জের ইহরাম অবস্থায় এসব প্রাণী শিকার করা বা হত্যা করা হারাম। তবে ইহরাম অবস্থাতেও যেসব প্রাণী হত্যা করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে তা ব্যতীত। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন: পাঁচটি প্রাণী মুহরিম ব্যক্তি হত্যা করলে কোন অপরাধ হবে না। কাক, চিল, ইঁদুর, বিচ্চু ও কালো কুকুর। (সহীহ বুখারী হা: ৩৩১৫)
(إِنَّ اللّٰهَ يَحْكُمُ مَا يُرِيْدُ)
‘নিশ্চয়ই আল্লাহ যা ইচ্ছা হুকুম করেন।’অর্থাৎ আল্লাহ তা‘আলা যে কোন বিধান দেয়ার ক্ষমতা রাখেন। তিনি যা ইচ্ছা তাই করতে পারেন, তাঁর ইচ্ছার কোন প্রতিরোধকারী নেই এবং কারো কাছে তাঁর জবাবদিহিও করতে হয় না। তবে তাঁর সকল আদেশ-নিষেধ সত্য ও ন্যায়সঙ্গত এবং সৃষ্টির জন্য কল্যাণকর ও উপকারী।
(شَعَا۬ئِرَ اللّٰهِ) ‘আল্লাহর নিদর্শন’ শব্দটি شعيرة এর বহুবচন। অর্থ হল চিহ্ন, নিদর্শন। ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন: এখানে আল্লাহ তা‘আলার নিদর্শন বলতে হাজ্জের নিদর্শনাবলীকে বুঝানো হয়েছে। মুজাহিদ বলেন: এর দ্বারা সাফা ও মারওয়াকে বুঝানো হয়েছে।
মোটকথা হল, এর দ্বারা আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ থেকে নিষিদ্ধ ও সম্মানীত সকল বস্তু শামিল যা আল্লাহ তা‘আলা পালন করার ও সম্মান করার নির্দেশ দিয়েছেন এবং লংঘন করতে নিষেধ করেছেন। (তাফসীরে সা‘দী, অত্র আয়াতের তাফসীর)
الشَّهْرَ الْحَرَامَ
‘হারাম মাস’অর্থাৎ হারাম মাসের সম্মান নষ্ট করতে নিষেধ করা হয়েছে। অন্যত্র আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(يَسْأَلُوْنَكَ عَنِ الشَّهْرِ الْحَرَامِ قِتَالٍ فِيْهِ ط قُلْ قِتَالٌ فِيْهِ كَبِيْرٌ)
“তারা আপনাকে নিষিদ্ধ মাসে যুদ্ধ করা সম্পর্কে প্রশ্ন করে; আপনি বলুন, তাতে যুদ্ধ করা বড় অপরাধ।”(সূরা বাকারাহ ২:২১৭)
হারাম মাসসমূহ হল: যুলকাদা, যুলহাজ্জ, মুহাররম ও রজব। (সহীহ বুখারী হা: ৩১৯৭)
(وَلَا الْهَدْيَ وَلَا الْقَلَا۬ئِدَ)
‘কুরবানীর জন্য কা‘বায় প্রেরিত পশু, গলায় পরিহিত চিহ্নবিশিষ্ট পশু’হাদী ঐ পশুকে বলা হয়, যা কুরবানী দেয়ার জন্য হাজীগণ সঙ্গে করে হারামে নিয়ে আসেন।
قلائد শব্দটি قلادة এর বহুবচন। যার অর্থ গলায় ঝুলানো হয় এমন হার, মালা ও সুতা। এখানে হজ্জ ও উমরায় কুরবানীর জন্য নিয়ে আসা পশুকে বুঝানো হয়েছে, যাদের গলায় আলামত বা চিহ্ন স্বরূপ জুতা বা ফিতা বেধে দেয়া হয়। এর দ্বারা উদ্দেশ্য হল, ঐ সমস্ত পশুকে কেউ যেন ছিনতাই না করে এবং মাসজিদুল হারাম পর্যন্ত পৌঁছার ব্যাপারে কোন প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি না করে।
এসব হাদী ও চিহ্নিত পশুকে হালাল মনে করে তার ওপর আক্রমণ বা হস্তক্ষেপ করো না; বরং তাদের সম্মান রক্ষা করবে, এসব নিদর্শনকে সম্মান দেখানো তাক্বওয়ার পরিচায়ক।
আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(ذٰلِكَ وَمَنْ يُّعَظِّمْ شَعَا۬ئِرَ اللّٰهِ فَإِنَّهَا مِنْ تَقْوَي الْقُلُوْبِ)
“এটা আল্লাহর বিধান এবং কেউ আল্লাহর নিদর্শনাবলীকে সম্মান করলে নিশ্চয়ই এটা তার হৃদয়ের তাক্বওয়ার পরিচয়।”(সূরা হজ্জ ২২:৩২)
(وَلَآ اٰ۬مِّیْنَ الْبَیْتَ الْحَرَامَ ........وَرِضْوَانًاﺚ)
‘নিজ প্রতিপালকের অনুগ্রহ ও সন্তোষ লাভের আশায় পবিত্র গৃহ অভিমুখে যাত্রী’ অর্থাৎ যারা হজ্জ করার জন্য কাবা ঘরের উদ্দেশ্যে রওনা করেছে তাদের সাথে যুদ্ধ করা বৈধ মনে কর না, যাদের উদ্দেশ্য আল্লাহ তা‘আলার সন্তুষ্টি অর্জন করা এবং জীবনোপকরণ স্বরূপ তাঁর অনুগ্রহ অনুসন্ধান করা।
কোন কোন মুফাসসিরের নিকট এ বিধান ঐ সময়ের জন্য ছিল, যখন মুসলিম ও মুশরিকগণ একত্রে হজ্জ ও উমরা আদায় করত। কিন্তু যখন এ আয়াত অবতীর্ণ হল:
(أَيُّهَا الَّذِيْنَ اٰمَنُوْآ إِنَّمَا الْمُشْرِكُوْنَ نَجَسٌ فَلَا يَقْرَبُوا الْمَسْجِدَ الْحَرَامَ بَعْدَ عَامِهِمْ هٰذَا)
“হে মু’মিনগণ! নিশ্চয়ই মুশরিকরা অপবিত্র; সুতরাং এ বৎসরের পর তারা যেন মাসজিদুল হারামের নিকট না আসে।”(সূরা তাওবাহ ৯:২৮)
তখন থেকে মুশরিকদের জন্য মাসজিদে হারামে প্রবেশ করা হারাম হয়ে গেল। আবার কেউ বলেছেন: এ আয়াতের বিধান রহিত নয় বরং এ হুকুম মুসলিমদের জন্য প্রযোজ্য। (ফাতহুল কাদীর, ২/২)
(وَإِذَا حَلَلْتُمْ فَاصْطَادُوْا)
‘যখন তোমরা ইহরামমুক্ত হবে তখন শিকার করতে পার।’ অর্থাৎ যখন ইহরাম থেকে হালাল হয়ে যাবে তখন শিকার কর। এখানে (فاصطادوا শিকার কর) ক্রিয়া আদেশসূচক হলেও মূলত আদেশ করা উদ্দেশ্য নয়, বরং শিকার করার অনুমতি বা বৈধতা প্রদান করা যেমন শিকার করা বৈধ ছিল ইহরামের পূর্বে। অর্থাৎ ইহরাম থেকে হালাল হবার পর শিকার করা কোন অপরাধ নয় যেমন ইহরামের পূর্বে শিকার করা অপরাধ ছিল না।
(وَلَا يَجْرِمَنَّكُمْ شَنَاٰنُ قَوْمٍ)
‘কোন সম্প্রদায়ের প্রতি বিদ্বেষ তোমাদেরকে যেন কখনই সীমালঙ্ঘনে প্ররোচিত না করে।’অর্থাৎ কোন জাতির সাথে শত্র“তা, ক্রোধ ও তোমাদের ওপর সীমালংঘন ইত্যাদির কারণে তোমরাও তাদের ওপর সীমালংঘন করবে এটা যেন না হয়। যেমন ষষ্ঠ হিজরীতে মক্কার মুশরিকরা তোমাদেরকে উমরা থেকে বারণ করতে মাসজিদে হারামে পৌঁছতে বাধা দিয়েছিল। সুতরাং এখন তোমরা তাদের ওপর জুলুম করবে বা সীমালঙ্ঘন করবে তা যেন না হয়।
(....وَتَعَاوَنُوْا عَلَي الْبِرِّ)
‘সৎকর্ম ও তাক্বওয়ার কাজে তোমরা পরস্পর সহযোগিতা কর’অত্র আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা মু’মিনদেরকে সৎকাজে পরস্পর সহযোগিতা করার ও অসৎ কাজে সহযোগিতা না করার নির্দেশ প্রদান করেছেন।
যে ব্যক্তি সৎ কাজ করে আর যে সহযোগিতা করে উভয় প্রতিদানের দিক দিয়ে সমান। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন:
مَنْ دَلَّ عَلَي خَيْرٍ فَلَهُ مِثْلُ أَجْرِ فَاعِلِهِ
সৎ কাজে দিকনির্দেশনাদানকারী প্রতিদানের দিক দিয়ে সৎ কাজ সম্পাদনকারীর মত। (আবূ দাঊদ হা: ৫১২৯, তিরমিযী হা: ২৬৭০, হাসান)
অন্যত্র রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন: যে ব্যক্তি মানুষকে সৎ পথে আহ্বান করে আর ঐ সৎ পথ যত ব্যক্তি অনুসরণ করবে, কিয়ামতের দিন পর্যন্ত সে ব্যক্তি তাদের সমান নেকী পাবে। তাতে তাদের নেকীর কোন কমতি হবে না। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি মানুষকে অসৎ পথে আহ্বান করে আর তার আহ্বানে ঐ অসৎ পথে যত ব্যক্তি চলবে, কিয়ামতের দিন পর্যন্ত সে ব্যক্তি তাদের সমান গুনাহগার হবে। তাতেও তাদের পাপের কোন কমতি হবে না। (সহীহ মুসলিম হা: ৪৬০৯, তিরমিযী হা: ২৬৭৪)
সর্বোপরি আল্লাহ তা‘আলা মানুষকে তাক্বওয়ার নির্দেশ প্রদান করে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন, তোমরা যা কিছু করছ সব কিছুর তিনি তরিৎ হিসাব নেবেন। সুতরাং কোনক্রমেই অন্যের প্রতি জুলুম করো না এবং মানুষকে খারাপ কাজে সহযোগিতা করো না।
আয়াত থেকে শিক্ষণীয় বিষয়:
১. আল্লাহ তা‘আলা ও মানুষের মাঝে পরস্পর অঙ্গীকার ও চুক্তি পূর্ণ করা ওয়াজিব।
২. আল্লাহ তা‘আলা কিছু চতুষ্পদ জন্তু হালাল করে দিয়েছেন, তবে তা আল্লাহ তা‘আলার নামে ও তাঁর উদ্দেশ্যে জবাই করতে হবে।
৩. ইহরাম অবস্থায় শিকার করা হারাম। তবে ইহরামের পরে বৈধ।
৪. আল্লাহ তা‘আলার নিদর্শনাবলীর সম্মান করা ওয়াজিব।
৫. সীমালঙ্ঘন করা হারাম, এমনকি কাফিরদের সাথেও।
৬. সৎ কাজে পরস্পর সহযোগিতা করা ওয়াজিব। আর অসৎ কাজে সহযোগিতা হারাম।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল একটি হাদীসের উল্লেখ করে বলেছেন যে, আসমা বিনতে ইয়াযীদ বর্ণনা করেছেন, আমি একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর আযরা নাম্নী উন্ত্রীর লাগাম ধারণ করেছিলাম। তখন হঠাৎ তার উপর সম্পূর্ণ সূরা মায়িদাহ্অবতীর্ণ হয়। এ সূরার ভারে তখন উন্ত্রীর পায়ের উপরিভাগ ভেঙ্গে চুরমার হবার উপক্রম হয়। আসেম আল আইওয়াল বর্ণনা করেন যে, আমর তাঁর চাচার নিকট থেকে তাঁর নিকট একটি হাদীস বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেন যে, তাঁর চাচা একদা রাসূলল্লাহ (সঃ)-এর সাথে এক সফরে ছিলেন। সে সময় রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উপর সূরা মায়িদাহ অবতীর্ণ হয়। সূরা মায়িদাহর। ভারে তাঁর বাহনের ঘাড় ভেঙ্গে চুরমার হবার উপক্রম হয়। আবার আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রাঃ) বর্ণনা করেন যে, রাসূলে কারীম (সঃ) যখন তাঁর বাহনের উপর উপবিষ্ট ছিলেন তখন তার উপর সূরা মায়িদাহ্ অবতীর্ণ হয়, এর ফলে বাহনটি তাকে বহন করতে অসমর্থ হয়ে পড়ে। তখন তিনি তাঁর বাহন হতে অবতরণ করেন। এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল একাই বর্ণনা করেছেন। ইমাম তিরমিযী হাদীসটিকে একটু অন্যভাবে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন যে, আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রাঃ) বর্ণনা করেছেন, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উপর অবতীর্ণ সূরাগুলোর মধ্যে সূরা মায়িদাহ' ও সূরা আল-ফাতহ সর্বশেষ সূরা। এরপর ইমাম তিরমিযী (রঃ) এ হাদীসটি সম্পর্কে মন্তব্য করেছেন যে, হাদীসের সংজ্ঞানুযায়ী এটা একটা গারীব’ ও ‘হাসান হাদীস। তিনি ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর উদ্ধৃতি দিয়ে আরও বলেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উপর অবতীর্ণ সর্বশেষ সূরা হলোঃ (আরবী) (১১০:১)
হাকিম তার মুসতাদরিক’ গ্রন্থে তিরমিযীর বর্ণনার ন্যায় আবদুল্লাহ ইবনে ওয়াহাবের সনদের মাধ্যমে একটি হাদীস বর্ণনা করেছেন। এরপর তিনি হাদীসটি সম্পর্কে মন্তব্য করেছেন যে, এটা ইমাম বুখারী (রঃ) ও ইমাম মুসলিম (রঃ) কর্তৃক আরোপিত শর্তানুযায়ী একটি সহীহ হাদীস। কিন্তু ইমাম বুখারী (রঃ) ও ইমাম মুসলিম (রঃ) কেউই এ হাদীসটিকে তাদের গ্রন্থে লিপিবদ্ধ করেননি। হাকিম আরও বর্ণনা করেন যে, যুবাইর ইবনে নুফাইর (রাঃ) বর্ণনা করেছেন, আমি একদা হজ্বে গমন করি। এরপর আমি হযরত আয়েশা (রাঃ)-এর সাথে দেখা করি। তখন তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করেনঃ “হে যুবাইর (রাঃ)! তুমি কি সূরা মায়িদাহ্ পড়?' আমি উত্তরে বললামঃ হ্যা। তখন তিনি বললেনঃ “এটাই রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উপর অবতীর্ণ শেষ সূরা। সুতরাং তোমরা তার মাধ্যমে যেসব বিষয় বৈধ হিসেবে পাও সেগুলোকে বৈধ হিসেবে গ্রহণ কর। আর যেগুলোকে অবৈধ হিসেবে পাও সেগুলোকে অবৈধ হিসেবে গ্রহণ কর।” অতঃপর হাকিম এ হাদীসটি সম্পর্কে মন্তব্য করেন যে, এটা ইমাম বুখারী (রঃ) ও ইমাম মুসলিম (রঃ) কর্তৃক আরোপিত শর্তানুযায়ী একটি সহীহ হাদীস। কিন্তু হাদীসটিকে তারা তাদের গ্রন্থে স্থান দেননি।
ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল আবদুর রহমান ইবনে মাহদীর সনদের মাধ্যমে মুআবিয়া ইবনে সালেহ হতে উক্ত হাদীসটি বর্ণনা করেন এবং কিছু বেশী অংশ যোগ করেন। এ বেশী অংশটুকু নিম্নরূপঃ
যুবাইর ইবনে নুফাইর (রাঃ) বলেনঃ “আমি একদা হযরত আয়েশা (রাঃ)-কে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর চরিত্র সম্পর্কে জিজ্ঞেস করি। তখন তিনি বলেন যে, পবিত্র কুরআনই তাঁর চরিত্র।” ইমাম নাসাঈও (রঃ) এ হাদীসটিকে আবদুর রহমান ইবনে মাহ্দীর সনদের মাধ্যমে বর্ণনা করেছেন।
১-২ নং আয়াতের তাফসীর:
মা'আন অথবা আউফ হতে বর্ণিত আছে যে, একটি লোক হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ)-এর নিকট আগমন করেন এবং তাঁকে কিছু উপদেশ দিতে অনুরোধ করেন। তখন আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেনঃ “যখন তুমি (আরবী) কথাটি শ্রবণ কর তখন তার জন্যে তোমার কানকে সতর্ক করে দিও। কারণ, হয়তো তা দ্বারা আল্লাহ তা'আলা মুমিনদেরকে কোন ভাল কাজের আদেশ ও মন্দ কাজ হতে নিষেধ করছেন। আবার যুহরী হতে বর্ণিত আছে যে, যখন আল্লাহ (আরবী) বলে কোন কাজের নির্দেশ দেন তখন তোমরা ঐ কাজ কর। কারণ, উক্ত সম্বোধনের মধ্যে যারা রয়েছেন তাঁদের মধ্যে আল্লাহর নবীও (সঃ) আছেন। আবার খাইসুমা হতে বর্ণিত আছে যে, পবিত্র কুরআনে যে অবস্থায় (আরবী) বলে সম্বোধন করা হয়েছে সেই অবস্থায় পবিত্র তাওরাত গ্রন্থে (আরবী) বলে সম্বোধন করা হয়েছে। যায়েদ ইবনে ইসমাঈল তাঁর সনদের মাধ্যমে একটি হাদীস বর্ণনা করেছেন। হাদীসটির মূল রাবী ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ “পবিত্র কুরআনে উল্লিখিত (আরবী) দ্বারা যাদেরকে সম্বোধন করা হয়েছে, হযরত আলী (রাঃ) তাঁদের মধ্যে নেতৃস্থানীয় ও সম্মানিত। কারণ, পবিত্র কুরআনে একমাত্র হযরত আলী (রাঃ) ছাড়া অন্যান্য সকল সাহাবীকে ভৎসনা করা হয়েছে। হযরত আলী (রাঃ)-কে কুরআনের কোথাও ভর্সনা করা হয়নি।” তাফসীরকারক ইবনে কাসীর মন্তব্য করেন যে, হাদীসের সংজ্ঞানুযায়ী এ হাদীসটি গারীব’। এ হাদীসের মধ্যে কতগুলো অশোভনীয় শব্দ রয়েছে এবং এর সনদ সম্পর্কেও মন্তব্য করার অবকাশ আছে। এ হাদীসের একজন রাবী ঈসা ইবনে রাশেদ সম্পর্কে ইমাম বুখারী (রঃ) মন্তব্য করেছেন যে, তিনি একজন অপরিচিত ব্যক্তি এবং হাদীসের সংজ্ঞানুযায়ী তাঁর হাদীস মুনকার'। ইবনে কাসীর (রঃ) উক্ত হাদীসের একজন রাবী আলী ইবনে বুজাইমা সম্পর্কে বলেন যে, যদিও তিনি একজন বিশ্বস্ত রাবী, কিন্তু তিনি শিয়া মতাবলম্বী। তার থেকে বর্ণিত এ ধরনের হাদীসের মধ্যে সন্দেহের অবকাশ থাকায় এটা গ্রহণযোগ্য নয়। এ হাদীসে উল্লেখ আছে যে, পবিত্র কুরআনে আলী (রাঃ) ছাড়া আর সকল সাহাবীকে ভৎসনা করা হয়েছে। অবশ্য এর দ্বারা পবিত্র কুরআনের ঐ আয়াতের প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে যে আয়াতে সাহাবীদেরকে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে আলাপ করার পূর্বে সাদকা’ দেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছিল। একাধিক ব্যক্তি উল্লেখ করেছেন যে, একমাত্র আলী (রাঃ) ছাড়া আর কেউই এ আয়াত অনুযায়ী কাজ করেননি। আর এ সাদকা দেয়ার ব্যাপারে আল্লাহ পাক পরবর্তীতে এ আয়াতটি অবতীর্ণ করেন“তোমরা কি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে আলোচনা করার পূর্বে সাদকা দিতে ভয় পাও? যখন তোমরা তা করনি তখন আল্লাহ তোমাদেরকে ক্ষমা করে দিয়েছেন।”
এ আয়াতের দ্বারা যে ভৎর্সনার প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে সে সম্পর্কেও মন্তব্যের অবকাশ আছে। কেননা, কেউ কেউ বলেছেন যে, সাদকা দেয়ার নির্দেশটি মুস্তাহাব ছিল, ওয়াজিব ছিল না। আর তাছাড়া কার্যকরী করার পূর্বেই ততা আয়াতের নির্দেশকে তাদের জন্যে মওকুফ করা হয়েছে। অতএব দেখা যাচ্ছে যে, সাহাবীদের কারও নিকট থেকেই এ আয়াতের নির্দেশের বিপরীত কোন কাজ প্রকাশ পায়নি। আর এ ছাড়া পবিত্র কুরআনে হযরত আলী (রাঃ)-কে কখনই ভৎসনা করা হয়নি বলে রাবী যে মন্তব্য করেছেন সে সম্পর্কেও মন্তব্যের অবকাশ আছে। কেননা, যুদ্ধবন্দীদের মুক্তি দিয়ে মুক্তিপণ গ্রহণের ব্যাপারে সূরা আনফালে যে আয়াতটি আছে তার ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে যে, যারা মুক্তিপণ গ্রহণের ব্যাপারে মত দিয়েছিলেন তাদের সকলের ক্ষেত্রেই এ আয়াতটি প্রযোজ্য। হযরত উমার (রাঃ) ছাড়া আর কেউই এ তিরস্কার হতে মুক্ত নন। অতএব, পূর্বাপর ঘটনা হতে বুঝা যায় যে, উক্ত হাদীসটি দুর্বল। তবে আল্লাহ পাকই ভাল জানেন।
মুহাম্মাদ ইবনে মুসলিম হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেছেন, রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমর ইবনে হাকামকে যখন নাজরানে পাঠিয়েছিলেন তখন তিনি তাঁকে যে চিঠিটি দিয়েছিলেন সেই চিঠিটি আমি পড়েছি। উক্ত চিঠিটি পরবর্তীকালে আবু বকর ইবনে হাযমের নিকট ছিল। চিঠির প্রথমাংশ নিম্নরূপঃ
এটা আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর নিকট হতে বর্ণনা-হে ঈমানদারগণ! তোমরা ওয়াদাগুলো পূরণ কর।' এরপর তিনি সূরা মায়িদাহ’র (আরবী) ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ হিসাব গ্রহণে অত্যন্ত তৎপর’ (৫৪ ৪) পর্যন্ত লিখেন। আবদুল্লাহ তার পিতা আবু বকর থেকে বর্ণনা করেছেন যে, এটা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সেই চিঠি যা তিনি আমর ইবনে হাযমকে দিয়েছিলেন। যখন তিনি তাঁকে ইয়ামান বাসীদেরকে জ্ঞান দান, তার শিক্ষাদান এবং সাদকা আদায়ের জন্যে পাঠিয়েছিলেন। তখন তিনি এ চিঠিটি লিখে দিয়েছিলেন। উক্ত চিঠিতে তিনি তাঁকে কতগুলো উপদেশ এবং তাঁর কার্যাবলী সম্বন্ধে কতগুলো নির্দেশ দিয়েছিলেন। চিঠির শুরুতে তিনি লিখেনঃ দয়াময় পরম দয়ালু আল্লাহর নামে। এটা আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর পক্ষ হতে চিঠি।' অতঃপর তিনি সূরা মায়িদাহ্র নিম্নের আয়াত দ্বারা শুরু করেনঃ
“হে মুমিনগণ! তোমরা প্রতিজ্ঞাগুলো পূরণ কর। যখন তিনি আমর ইবনে • হাযমকে ইয়ামানে পাঠান তখন তিনি তাকে একটি অঙ্গীকারনামা প্রদান করেন। উক্ত অঙ্গীকারনামায় তিনি তাঁকে তাঁর প্রতিটি কাজে আল্লাহকে ভয় করার নির্দেশ দেন। কারণ আল্লাহ পরহেযগার ও সৎকর্মশীলদের সাথে থাকেন।
(আরবী) তাফসীরকারক এ অংশের ব্যাখ্যায় বলেন যে, ইবনে আব্বাস (রাঃ), মুজাহিদ (রাঃ) এবং আরও অনেকে বলেছেন - শব্দের দ্বারা অঙ্গীকারকে বুঝানো হয়েছে। ইবনে জাবির (রঃ) বর্ণনা করেছেন যে -এর অর্থের ব্যাপারে তাফসীরকারকগণ একমত। তিনি বলেন যে, কোন কিছুর ব্যাপারে পরস্পরের শপথ বা অঙ্গীকারকে (আরবী) বলা হয়ে থাকে। আলী ইবনে আবু তালহা (রঃ) ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে এ আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন যে, (আরবী)-এর দ্বারা (আরবী) বা অঙ্গীকারকে বুঝানো হয়েছে। অর্থাৎ আল্লাহ পাক যেসব বিষয় বৈধ ও অবৈধ ঘোষণা করেছেন, যেসব বিষয় অবশ্যকরণীয় করেছেন এবং যেসব বিষয় সম্পর্কে পবিত্র কুরআনে। (আরবী) বলে সাবধান করেছেন, (আরবী) দ্বারা সেসব বিষয়কে বুঝানো হয়েছে। এরপর আল্লাহ এ সম্পর্কে আরও কঠোর ভাষায় বলেনঃ “আল্লাহর সাথে ওয়াদা করার পর যারা উক্ত ওয়াদা ভঙ্গ করে এবং তিনি যে সম্পর্ক অক্ষুন্ন রাখতে বলেছেন তা ছিন্ন করে..........তাদের জন্যে জঘন্য আবাসস্থল রয়েছে। আবার যহহাক (রঃ) (আরবী)-এর ব্যাখ্যায় বলেন যে, আল্লাহ পাক যেসব বিষয় বৈধ ও অবৈধ করেছেন এবং তাঁর কিতাব ও নবী (সঃ)-এর উপর বিশ্বাস স্থাপনকারীদের নিকট হতে তিনি বৈধ ও অবৈধ সংক্রান্ত বিভিন্ন আবশ্যকীয় যে কাজগুলো করার ওয়াদা নিয়েছেন (আরবী) দ্বারা সেগুলোকে বুঝায়। যায়েদ ইবনে আসলাম (রঃ)-এর ব্যাখ্যায় বলেন যে, (আরবী) দ্বারা ছয়টি বস্তুকে বুঝানো হয়েছে। (ক) আল্লাহর সাথে ওয়াদা, (খ) শপথ করা, চুক্তি করা, (গ) অংশীদারী সংক্রান্ত ওয়াদা, (ঘ) ক্রয়-বিক্রয় সংক্রান্ত ওয়াদা, (ঙ) বিবাহ বন্ধন এবং (চ) কসম খাওয়া। মুহাম্মাদ ইবনে কা'ব (রঃ) বলেন যে, (আরবী) বলতে পাঁচটি বস্তুকে বুঝানো হয়েছে। ওগুলোর একটি হচ্ছে অজ্ঞতার যুগে কৃত চুক্তিনামা। আর অন্যটি হচ্ছে অংশীদারী সংক্রান্ত চুক্তি। ক্রয়-বিক্রয়ের চুক্তি সম্পাদিত হওয়ার পর উক্ত স্থানে অবস্থানকালেও উক্ত বস্তু গ্রহণ করা বা না করার কোন ইখতিয়ার ক্রেতা বা বিক্রেতার থাকে না। এ মতে যারা বিশ্বাসী তারা (আরবী) দ্বারা তাঁদের পক্ষে দলীল গ্রহণ করেছেন। তাঁরা বলেন যে, এ আয়াতটি উক্ত স্থানে থাকা অবস্থায়ও চুক্তিটিকে প্রতিষ্ঠিত ও অবশ্যপালনীয় করার প্রতি ইঙ্গিত করে এবং উক্ত স্থানে থাকা অবস্থায়ও বস্তু গ্রহণ করা না করার ইখতিয়ারকে অস্বীকার করে। এটাই ইমাম আবু হানীফা (রঃ) ও ইমাম মালিক (রঃ)-এর মত। কিন্তু ইমাম শাফিঈ (রঃ), ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল (রঃ) এবং অধিকাংশ আলেম এ ব্যাপারে দ্বিমত পোষণ করেন। এ প্রসঙ্গে তাঁরা সহীহ বুখারী ও মুসলিমে গৃহীত আবদুল্লাহ ইবনে উমার (রাঃ)-এর একটি হাদীসকে দলীল হিসেবে পেশ করেন। হাদীসটি নিম্নরূপঃ
রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “বিক্রয়স্থল ত্যাগ করার পূর্বপর্যন্ত ক্রেতা ও বিক্রেতার বস্তু গ্রহণ করা বা না করার ইখতিয়ার আছে।” সহীহ বুখারীতে অন্যভাবেও হাদীসটি এসেছে। তা নিম্নরূপঃ
“যখন দু’জন লোক ক্রয়-বিক্রয় করে তখন বিক্রয়স্থল ত্যাগ করার পূর্বপর্যন্ত ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয়ের বস্তুটি গ্রহণ করা বা না করার ইখতিয়ার আছে।” তাফসীরকারক ইবনে কাসীর (রঃ) মন্তব্য করেন যে, এ হাদীসটি ক্রয়-বিক্রয়ের চুক্তি সম্পাদনের পরেও উক্ত স্থানে থাকা অবস্থায় বস্তুটি গ্রহণ করা বা না করার ইখতিয়ারকে প্রতিষ্ঠিত করার ব্যাপারে প্রকাশ্য দলীল। উক্ত ইখতিয়ারের প্রশ্নটি চুক্তি সম্পাদিত হওয়ার পরে আসে। অতএব এই ইখতিয়ার চুক্তি সম্পাদিত হওয়াকে অস্বীকার করে না, বরং চুক্তিকে আইনগতভাবে কার্যকরী করে। অতএব চুক্তিটি প্রতিষ্ঠিত হওয়ার অর্থই হচ্ছে অঙ্গীকারকে পূর্ণ করা। (আরবী) -এ আয়াতের ব্যাখ্যায় তাফসীরকারক বলেন যে, চতুষ্পদ জন্তু বলতে এখানে উট, গরু ও বকরীকে বুঝানো হয়েছে। আবুল হাসান, কাতাদা এবং আরও অনেকের এটাই মত। ইবনে জারীর (রঃ) বলেন। যে, আরবদের ভাষা অনুযায়ী চতুষ্পদ জন্তু বলতে এটাই বুঝানো হয়। ইবনে উমার (রাঃ), ইবনে আব্বাস (রাঃ) এবং আরও অনেকে এ আয়াত হতে দলীল গ্রহণ করেছেন যে, যবেহকৃত গাভীর পেটে যদি মৃত বাচ্চা পাওয়া যায় তাহলে ঐ মৃত বাচ্চার গোশত খাওয়া মুবাহ। এ প্রসঙ্গে হাদীসের সুনান গ্রন্থসমূহে বহু হাদীস এসেছে। যেমন আবু দাউদ (রঃ), তিরমিযী (রঃ) এবং ইবনে মাজাহ (রঃ) আবূ সাঈদ (রাঃ) হতে একটি হাদীস বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেনঃ আমরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করলাম, আমরা উট, গাভী এবং বকরী যবেহ করি। ওগুলোর পেটের মধ্যে কখনও কখনও বাচ্চা পাই। আমরা কি তা ফেলে দেবো, না ভক্ষণ করবো? উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “তোমরা ইচ্ছে করলে তা খেতে পার। কেননা, তার মাকে যবেহ করাই হচ্ছে তাকেও যবেহ করা।” ইমাম তিরমিযী (রঃ) হাদীসটি সম্পর্কে মন্তব্য করেন যে, হাদীসের সংজ্ঞানুযায়ী এটি একটি হাসান হাদীস। ইমাম আবু দাউদ (রঃ) হযরত জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “মাকে যবেহ করাই হচ্ছে বাচ্চাকেও যবেহ করা।” এ হাদীসটিকে ইমাম আবু দাউদ (রঃ) একাই তাঁর হাদীস গ্রন্থে স্থান দিয়েছেন।
(আরবী) আলী ইবনে আবি তালহা ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে এ আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন যে, এর দ্বারা মৃত পশু, রক্ত এবং শূকরের মাংসকে বুঝানো হয়েছে। কাতাদা (রঃ) বলেন যে, এর দ্বারা মৃত পশু এবং যে পশুকে যবেহ করার সময় আল্লাহর নাম নেয়া হয়নি তাকে বুঝানো হয়েছে। আল্লাহই এর সঠিক অর্থ সম্পর্কে সমধিক জ্ঞাত। তবে প্রকাশ্যভাবে বুঝা যায় যে, এর দ্বারা (আরবী) (৫:৩)-এ আয়াতের দিকেই ইঙ্গিত করা হয়েছে। অর্থাৎ “তোমাদের জন্যে হারাম করা হয়েছে , মৃত পশু, রক্ত, শূকরের মাংস, আল্লাহ ছাড়া অপরের নামে উৎসর্গীকৃত পশু, গলা টিপে মারা পশু, প্রহারে মৃত পশু, শিং-এর আঘাতে মৃত পশু এবং হিংস্র পশুতে খাওয়া জন্তু”। যদিও এগুলো চতুষ্পদ জন্তুর অন্তর্ভুক্ত তবুও উল্লিখিত কারণে সেগুলোকে হারাম করা হয়েছে। এ জন্যে আল্লাহ বলেছেনঃ “তবে তোমরা যেগুলোকে যবেহ দ্বারা পবিত্র করেছ সেগুলো হালাল এবং যেগুলোকে মূর্তিপূজার বেদীর উপর বলি দেয়া হয়েছে সেগুলোও হারাম।” অর্থাৎ উক্ত পশুগুলোকে এজন্যে হারাম করা হয়েছে যে, তাদেরকে আর পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে আনা যাবে না এবং হালাল পশুর সাথে আর যুক্ত করা যাবে না। আর এ কারণেই আল্লাহ পাক বলেছেনঃ “তোমদের জন্যে চতুষ্পদ জন্তুকে হালাল করা হয়েছে। তবে যেগুলো হারাম হওয়া সম্পর্কে তোমাদের উপর কুরআনের আয়াত নাযিল হয়েছে সেগুলো হারাম।” অর্থাৎ এসব পশুর মধ্য হতে বিশেষ অবস্থায় কোন কোন পশুর হারাম হওয়া সংক্রান্ত আয়াত অতিসত্বর তোমাদের উপর অবতীর্ণ হবে।
(আরবী) কোন কোন ব্যাকরণবিদের মতে এ বাক্যটি (আরবী) হওয়ার কারণে হালাতে নাসাবীতে আছে। আনআম বলতে উট, গরু, ছাগল প্রভৃতি গৃহপালিত পশু এবং হরিণ, গাভী, গাধা প্রভৃতি বন্য পশুকে বুঝানো হয়। আর গৃহপালিত হালাল পশুগুলোর মধ্যে উক্ত পশুগুলোকে এবং বন্য হালাল পশুগুলোর মধ্য হতে ইহরাম বাঁধা অবস্থায় শিকার করা পশুগুলোকে হারাম বলে পৃথক করা হয়েছে। কোন কোন তাফসীরকারক বলেছেন যে, এর অর্থ হচ্ছে-আমরা তোমাদের জন্য চতুষ্পদ জন্তুকে হালাল করেছি। তবে জন্তুগুলো হতে যেগুলোকে হারাম বলে ঘোষণা দেয়া হয়েছে। সেগুলো হালাল নয়। আর এ নির্দেশ ঐ ব্যক্তির জন্যেই প্রযোজ্য যে ইহরাম অবস্থায় শিকার করাকে হারাম বলে গ্রহণ করেছে। যেহেতু আল্লাহ তাআলা অন্যত্র বলেছেনঃ “তবে যে মৃতপ্রায় অথচ অন্যায়কারী ও সীমালংঘনকারী নয়, তার জন্যে অবৈধ জানোয়ার খাওয়া হালাল। আল্লাহ ক্ষমাশীল ও পরম দয়ালু”। অর্থাৎ উক্ত আয়াতের ন্যায় এখানেও আল্লাহ বলেনঃ আমরা যেভাবে সর্বাবস্থায় চতুষ্পদ জন্তুকে হালাল করেছি, ঠিক সেভাবে ইহরাম অবস্থায় শিকার করাকে হারাম মনে কর। কারণ আল্লাহ পাকই এ নির্দেশ দিয়েছেন। আর তিনি যা করা বা না করার নির্দেশ দেন সেগুলোর সবকিছুই হিকমতে পরিপূর্ণ। এজন্যেই তিনি বলেছেন যে, নিশ্চয়ই আল্লাহ তাঁর ইচ্ছামত হুকুম করেন।
(আরবী) ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, (আরবী) শব্দের দ্বারা হজ্বের নিদর্শনাবলীকে বুঝানো হয়েছে। আর মুজাহিদ বলেন যে, এর দ্বারা সাফা, মারওয়া, কুরবানীর পশু ও উটকে বুঝানো হয়েছে। কেউ কেউ বলেছেন যে, এর দ্বারা আল্লাহ পাক যে সমস্ত বস্তুকে হারাম করেছেন সেগুলোকে বুঝানো হয়েছে। অর্থাৎ তোমরা আল্লাহ কর্তৃক হারাম ঘোষিত বস্তুগুলোকে হালাল মনে করো না। এ জন্যে আল্লাহ পাক বলেছেনঃ “নিষিদ্ধ মাসগুলোকেও তোমরা অবমাননা করো না।” অর্থাৎ মাসগুলোর প্রতি সম্মান প্রদর্শন কর এবং তোমরা এ মাসে শত্রুর সাথে যুদ্ধ করার মত নিষিদ্ধ কাজগুলো পরিহার কর। যেমন অল্লাহ পাক অন্যত্র বলেছেনঃ হে নবী (সঃ)! তারা তোমাকে নিষিদ্ধ মাসে যুদ্ধ করা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে। তুমি বল- ঐ মাসে যুদ্ধ করা বড় গুনাহ। আল্লাহ পাক অন্যত্র আরও বলেছেনঃ “আল্লাহর নিকট মাসের সংখ্যা ১২টি।” সহীহ বুখারীতে আবু বকর (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বিদায় হজ্বের ভাষণে বলেছিলেনঃ “আসমান ও যমীন সৃষ্টি করার দিন আল্লাহ যামানাকে যেরূপ সৃষ্টি করেছিলেন এখন তা সেরূপে ফিরে এসেছে। ১২ মাসে একটি বছর হয়। এর মধ্যে ৪টি মাস নিষিদ্ধ। তার মধ্যে ৩টি মাস পরস্পর সংযুক্ত। যেমন যুলকাদা, যুলহাজ্বা এবং মুহাররম। আর অন্যটি হলো মুজার গোত্র কর্তৃক কথিত রজব মাস। এ মাসটি জমাদিউস্সানী এবং শাবান মাসের মাঝখানে অবস্থিত। এর থেকে প্রমাণিত হয় যে, এ মাসগুলোর এ জাতীয় সম্মান কিয়ামত পর্যন্ত থাকবে। ইবনে আব্বাস (রাঃ) (আরবী) -এর ব্যাখ্যায় বলেনঃ “তোমরা নিষিদ্ধ মাসে যুদ্ধ করাকে বৈধ মনে করো না।” মুকাতিল ইবনে হাইয়ান, আবদুল করীম ইবনে মালিক আলজারী এবং ইবনে জারীরও এ মতই পোষণ করেন। কিন্তু অধিকাংশ আলেমের মত এই যে, আয়াতটির নির্দেশ রহিত হয়ে গেছে এবং উক্ত নিষিদ্ধ মাসগুলোতে কাফিরদের বিরুদ্ধে প্রথমে যুদ্ধ ঘোষণা করা এখন বৈধ। কুরআনের নিম্নের আয়াতটি তাদের দলীলঃ
“যখন নিষিদ্ধ মাসগুলো অতীত হয়ে যায় তখন তোমরা মুশরিকদেরকে যেখানে পাও সেখানেই হত্যা কর।` এর অর্থ এই যে, মাসগুলোর অতীত সম্মান যখন অতিক্রান্ত হয়ে গেছে তখন তোমরা কাফিরদের সাথে সব সময় জিহাদ করতে থাক। এটা এখন তোমাদের জন্যে বৈধ হয়ে গেল। পবিত্র কুরআন এরপর আর কোন মাসকে নিষিদ্ধ বলে ঘোষণা করেনি। ইমাম আবু জাফর এ পর্যায়ে আলেমদের ইজমার উল্লেখ করে বলেন যে, আল্লাহ পাক যে কোন সময় এবং যে কোন মাসে জিহাদ করা বৈধ রেখেছেন। তিনি আলেমদের আর একটি ইজমার উল্লেখ করে বলেছেন যে, যদি কোন মুশরিক হারাম শরীফের যাবতীয় বৃক্ষের ছাল দ্বারা নিজেকে আবৃত করে এবং পূর্ব থেকে কোন মুসলমান তাকে নিরাপত্তা প্রদান না করে থাকে তবে সে নিরাপত্তা পাবে না। এ বিষয়টি এখানে বিস্তারিতভাবে বর্ণন করা সম্ভব নয়।
(আরবী) অর্থাৎ তোমরা কা'বা গৃহের দিকে কুরবানীর পশু পাঠানো হতে বিরত থেকো না। কারণ এতে আল্লাহর নিদর্শনের প্রতি সম্মান প্রকাশ পায়। আর তোমরা কুরবানীর পশুর গলায় কালাদা (চেইন) পরানো হতে বিরত থেকো না। কারণ এর দ্বারা এ পশুগুলোকে অন্যান্য পশু হতে পৃথক করা হয়। আর এর দ্বারা এটাও প্রকাশ পায় যে, পশুগুলো কুরবানীর উদ্দেশ্যে কা'বা গৃহে পাঠানো হয়েছে। ফলে মানুষ এ পশুগুলোর ক্ষতি করা হতে বিরত থাকে। আর পশুগুলোকে দেখে অন্যান্যরা এ জাতীয় পশু কুরবানী পাঠাতে উদ্বুদ্ধ হবে। আর যে ব্যক্তি অন্যকে কুরবানী করার প্রতি উৎসাহদান করে, তাকে তার অনুসরণকারীর অনুরূপ প্রতিদান দেয়া হয়। অথচ অনুসরণকারীর পুরষ্কার কোন অংশেই কম করা হয় না। এ কারণেই রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁর বিদায় হজ্বের সময় যুলহুলাইফাতে রাত্রি যাপন করেন। এ যুলহুলাইফাকে ওয়াদিউল আকীকও বলা হয়। অতঃপর তিনি সকাল বেলা তার ৯ জন স্ত্রীর নিকট গমন করেন এবং গোসল শেষে খোশবু ব্যবহার করেন ও দু'রাকআত নফল নামায আদায় করেন। অতঃপর কুরবানীর পশুর চুটি ক্ষত করেন এবং ওর গলায় কালাদা (চেইন) পরান। এরপর হজ্ব এবং উমরার জন্যে তিনি ইহরাম বাঁধেন। তাঁর কুরবানীর পশুর সংখ্যা ছিল ষাটটির অধিক। তাদের গায়ের রং ও শারীরিক গঠন ছিল অতি উত্তম। যেমন আল্লাহ পবিত্র কুরআনে বলেনঃ “যদি কোন ব্যক্তি আল্লাহর নিদর্শনাবলীর প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে তবে সেটা তার অন্তরের তাকওয়া প্রকাশ করে। কেউ কেউ সম্মান প্রদর্শন শব্দটির দ্বারা কুরবানীর পশুকে উত্তম স্থানে রাখা, ভাল খাওয়ানো এবং তাকে মোটা তাজা করানোর প্রতি ইঙ্গিত দিয়েছেন। হযরত আলী ইবনে আবি তালিব (রাঃ) বলেনঃ “রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাদেরকে কুরবানীর পশুর চোখ ও কানকে ভালভাবে লক্ষ্য করতে নির্দেশ দিয়েছেন।` মুকাতিল ইবনে হাইয়ান বলেনঃ (আরবী) দ্বারা জাহেলিয়া যুগের লোকদের মত কালাদা ব্যবহার করাকে হালাল মনে করো না। কারণ জাহেলিয়া যুগে হারাম শরীফের বাইরে বসবাসকারী আরবরা যখন নিষিদ্ধ মাস ব্যতীত অন্য মাসে তাদের গৃহ হতে বের হতো তখন তারা তাদের গলায় কালাদা স্বরূপ পশম ও চুল ব্যবহার করতো। আর হারাম শরীফের মুশকির অধিবাসীগণ যখন তাদের গৃহ হতে বের হতো তখন তারা তাদের গলায় কালাদা স্বরূপ হারাম শরীফের গাছের ছাল ব্যবহার করতো। এর ফলে লোকেরা তাদেরকে নিরাপত্তা প্রদান করতো। ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, সূরা মায়িদাহ্র দু’টি আয়াত মানসূখ হয়ে গেছে। একটি কালাদার আয়াত, আর অপরটি হচ্ছে (আরবী) (৫:৪২)-এ আয়াতটি। ইবনে আউফ (রঃ) বলেনঃ আমি হাসান (রঃ)-কে জিজ্ঞেস করেছিলাম- সূরা মায়িদাহ্র কি কোন অংশ মানসূখ বা রহিত হয়েছে? তিনি উত্তরে বলেছিলেন :“না।” আতা (রঃ) বলেন যে, হারাম শরীফের অধিবাসীগণ বৃক্ষের ছাল দ্বারা কালাদা ব্যবহার করতো। ওটা দ্বারা তারা নিরাপত্তা লাভ করতো, ফলে আল্লাহ পাক হারাম শরীফের বৃক্ষ কাটা নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন। মুতরাফ ইবনে আবদুল্লাহ ও মত পোষণ করেন।
(আরবী) -এ অংশের ব্যাখ্যায় তাফসীরকারক বলেন যে, আল্লাহর ঘরের উদ্দেশ্যে যারা রওয়ানা হয় তাদের সাথে যুদ্ধ করা হালাল মনে করো না। কারণ, ঐ ঘরে যে ব্যক্তি প্রবেশ করে সে শত্রু হতে নিরাপত্তা লাভ করে। এমনিভাবে যে ব্যক্তি আল্লাহর দয়া ও সন্তুষ্টি পাওয়ার উদ্দেশ্যে বের হয়, তোমরা তাকে বাধা দিও না, বিরত রেখো না এবং কোন প্রকার কুৎসা রটনা করো না। কাতাদা, মুজাহিদ, আতা প্রমুখ মুফাসিরদের মতে আল্লাহর অনুগ্রহ অন্বেষণের অর্থ ব্যবসা করা। পবিত্র কুরআনের পূর্ববর্তী আয়াত (আরবী) (২:১৯৮) দ্বারাও ব্যবসাকে বুঝানো হয়েছে। আর শব্দের ব্যখ্যায়-ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, হজ্বে গমনকারী ব্যক্তিগণ হজ্বের মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি কামনা করে থাকেন। ইকরামা ও ইবনে জারীর প্রমুখ তাফসীরকারকগণ বলেন যে, এ আয়াতটি হাতিম ইবনে হিন্দ আল বাকরীর ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়। একদা সে মদীনার একটি চারণভূমি লুণ্ঠন করে এবং পরবর্তী বছর সে বায়তুল্লাহ জিয়ারতের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়। এ সময় কোন কোন সাহাবী পথিমধ্যে তাকে বাধা দেয়ার মনস্থ করলে আল্লাহ পাক এ আয়াত নাযিল করেন। ইবনে জারীর আলেমদের ইজমার কথা উল্লেখ করে বলেন যে, কোন মুশরিক ব্যক্তিকে যদি কোন মুসলমান কর্তৃক নিরাপত্তা প্রদান করা না হয় তবে তাকে হত্যা করা বৈধ হবে। যদিও সে বায়তুল্লাহ বা বায়তুল মুকাদ্দাসের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়। কেননা, উল্লিখিত আয়াতের নির্দেশ মুশরিকদের ব্যাপারে প্রযোজ্য নয়। এমনিভাবে যে ব্যক্তি নাফরমানী, শিরক ও কুফরী করার উদ্দেশ্যে কাবা শরীফের দিকে রওয়ানা হয় তাকেও বাধা দেয়া বৈধ। যেমন আল্লাহ পাক বলেনঃ “হে মুমিনগণ! নিশ্চয়ই মুশরিকরা অপবিত্র। অতএব তারা যেন এ বছরের পর আর কখনও কা'বা গৃহের নিকটবর্তী না হয়।” এ জন্যেই রাসূলুল্লাহ (সঃ) নবম হিজরীতে যখন হযরত আবু বকর (রাঃ)-কে আমীরুল ইজ্ব হিসেবে পাঠান তখন হযরত আলী (রাঃ)-কে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর প্রতিনিধি হিসেবে পাঠান এবং তাকে এ ঘোষণা করতে। নির্দেশ দেন যে, মুসলমান ও মুশরিক একে অপর থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত, এ বছরের পর যেন কোন মুশরিক হজ্ব করতে না আসে এবং কোন ব্যক্তি যেন উলঙ্গ অবস্থায় বায়তুল্লাহ তাওয়াফ না করে। ইবনে আব্বাস (রাঃ) এ আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন যে, প্রথমে ঈমানদার ও মুশরিকগণ একত্রে হজ্ব করতো এবং আল্লাহ পাক কাফিরদেরকে বাধা প্রদান না করতে ঈমানদারদের প্রতি নির্দেশ দেন। কিন্তু পরবর্তী সময়ে (আরবী) (৯:২৮)-এ, আয়াত দ্বারা কাফিরদেরকে হজ্ব করতে নিষেধ করেন। আল্লাহ পাক অন্য জায়গায় বলেনঃ “যারা আল্লাহ ও পরকালের প্রতি বিশ্বাস রাখে একমাত্র তারাই আল্লাহর ঘরকে আবাদ করবে।” অতএব উক্ত আয়াতগুলো দ্বারা মুশরিকদেরকে মসজিদুল হারামে প্রবেশ করতে নিষেধ করা হয়েছে। কাতাদা বর্ণনা করেন যে, (আরবী)-এ আয়াতটি মানসূখ বা রহিত হয়ে গেছে। অজ্ঞতার যুগে যখন কোন ব্যক্তি হজ্বের উদ্দেশ্যে তার গৃহ হতে বের হতো তখন সে বৃক্ষের ছাল দ্বারা কালাদা পরিধান করতো। ফলে কেউ তাকে কষ্ট দিতো না। আবার ঘরে ফেরার সময় চুলের তৈরী কালাদা পরিধান করতো। এর ফলে কোন লোক তাকে কষ্ট দিতো না। ঐ সময় মুশরিকদেরকে হজ্ব করতে নিষেধ করা হতো না। আর মুসলমানদেরকে নিষিদ্ধ মাসসমূহে এবং কা'বা গৃহের আশে পাশে যুদ্ধ না করার নির্দেশ দেয়া হয়েছিল। অতঃপর এ আয়াতের নির্দেশকে আল্লাহর অপর আয়াত (আরবী) (৯:৫) দ্বারা মানসূখ করা হয়েছে। ইবনে জারীর এ মত পোষণ করেন যে, (আরবী) দ্বারা যদি মুশরিকরা হারামেরু বৃক্ষের ছাল দ্বারা কালাদা ব্যবহার করে তবে তোমরা তাদেরকে নিরাপত্তা প্রদান কর’- এটাই বুঝানো হয়েছে। তিনি আরও বলেন যে, এ জন্যেই যে ব্যক্তি এ নির্দেশের অবমাননা করতো আরবরা তাকে সর্বদাই লজ্জা দিতো। তিনি এ পর্যায়ে হত্যাকারীদের প্রতি একজন কবির ব্যাঙ্গোক্তির উল্লেখ করেছেন।
(আরবী)-এ আয়াতের ব্যাখ্যায় তাফসীরকারক বলেন যে, যখন তোমরা তোমাদের ইহরাম খুলে ফেল এবং মুক্ত হয়ে যাও তখন তোমাদের জন্যে পূর্বে ইহরাম অবস্থায় যা হারাম ছিল এখন তা হালাল করা হলো। অর্থাৎ এখন শিকার করা হালাল ও হালাল হওয়ার এ নির্দেশটি অবৈধ ঘোষিত হওয়ার পর আবার বৈধ ঘোষিত হয়েছে। আর এ ব্যাপারে সঠিক মত এই যে, কোন বস্তু অবৈধ ঘোষিত হওয়ার পর বৈধ ঘোষিত হলে তা অবৈধ ঘোষিত হওয়ার পূর্বাবস্থা (বৈধতা) ফিরে পাবে। সুতরাং পূর্বে যা ওয়াজিব ছিল পরে তা ওয়াজিব হবে, মুস্তাহাব মুস্তাহাব হবে এবং মুবাহ মুবাহ হবে। কারও মতে নির্দেশটি শুধু ওয়াজিবের জন্যে এবং কারও মতে শুধু মুবাহ কাজের জন্যে প্রযোজ্য। কিন্তু এ উভয় মতেরই বিপক্ষে পবিত্র কুরআনে যথেষ্ট আয়াত রয়েছে। সুতরাং আমরা যা বর্ণনা করেছি সেটাই সঠিক মত। আর এ সম্পর্কে পবিত্র কুরআনে যথেষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়। কোন কোন উসুলবিদও এ মত পোষণ করেন।
(আরবী) তাফসীরকারক এ আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেনঃ যে জাতি তোমাদেরকে হুদায়বিয়ার বছর কা'বা গৃহে যেতে বাধা দিয়েছিল, তোমরা তাদের প্রতি শত্রুতা পোষণ করে প্রতিশোধ গ্রহণ করতে গিয়ে আল্লাহর হুকুম লংঘন করো না, বরং আল্লাহ তোমাদেরকে যেভাবে প্রত্যেকের সাথে ন্যায় বিচার করার নির্দেশ দিয়েছেন তা পালন কর। আর পবিত্র কুরআনের আর একটি আয়াতও এ অর্থ বহন করে। যেমন আল্লাহ পাক বলেনঃ কোন জাতির শত্রুতা তোমাদেরকে যেন ন্যায় বিচার না করতে উৎসাহিত না করে, বরং তোমরা ন্যায় বিচার কর। আর এটাই তাকওয়ার অতি নিকটবর্তী।' অর্থাৎ কোন সম্প্রদায়ের হিংসা-বিদ্বেষ যেন তোমাদেরকে ন্যায় বিচার না করতে উৎসাহিত না করে। কারণ, যে ন্যায় বিচার করা প্রত্যেকের উপর ওয়াজিব, ওটা যে কোন অবস্থায়ই প্রত্যেকের উপর ওয়াজিব। পূর্ববর্তী আলেমদের মধ্যে কেউ কেউ বলেছেন যে, যদি কোন ব্যক্তি তোমার ব্যাপারে আল্লাহর নাফরমানী করে তবে তোমার উচিত হবে তার ব্যাপারে আল্লাহর আনুগত্যমূলক কাজ করা। ন্যায়-নীতির উপরই আসমান-যমীন প্রতিষ্ঠিত ইবনে আবি হাতিম যায়েদ ইবনে আসলাম থেকে বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) এবং তাঁর সাহাবীগণ যখন মুশরিকগণ কর্তৃক বাধাপ্রাপ্ত হয়ে হুদায়বিয়া প্রান্তরে কষ্টকর অবস্থায় কালাতিপাত করছিলেন তখন পূর্বাঞ্চলীয় একদল মুশরিক কাবা ঘর জিয়ারতের উদ্দেশ্যে তাদের পাশ দিয়ে যাচ্ছিল।
এমতাবস্থায় সাহাবীগণ রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বললেনঃ “আমরা এ লোকগুলোকে কা'বা গৃহে যেতে বাধা দেবো যেমন তাদের সাথীরা আমাদেরকে বাধা দিয়েছে। তখন আল্লাহ তাআলা এ আয়াতটি নাযিল করেন। এখানে শব্দ দ্বারা হিংসা-বিদ্বেষকে বুঝানো হয়েছে। এটাই ইবনে আব্বাস (রাঃ) ও অন্যান্যদের মত। ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, কোন কোন আরব (আরবী)-এর (আরবী) কে (আরবী) এর পরিবর্তে (আরবী) দিয়ে পড়েছেন এবং আরবী কবিতায়ও এ জাতীয় পঠনের রীতি দেখা যায়। অবশ্য কোন কারী এভাবে পড়েছেন কি-না তা আমাদের জানা নেই।
(আরবী) আল্লাহ পাক এ আয়াতের দ্বারা তাঁর মুমিন বান্দাদেরকে উত্তম কাজে পরস্পরকে সাহায্য করতে এবং খারাপ কাজ পরিহার করে নৈকট্য ও পরহেযগারী অর্জন করতে নির্দেশ দিচ্ছেন। তিনি তাদেরকে শরীয়ত পরিপন্থী কাজ, পাপ কাজ এবং অবৈধ কাজে পরস্পরকে সাহায্য করতে নিষেধ করছেন। ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, আল্লাহ যে কাজ করতে আদেশ করেছেন তা পরিহার করাকেই পাপ কাজ বলা হয় এবং (আরবী) বা সীমালংঘন করার দ্বারা ধৈর্যের নির্দষ্ট সীমা অতিক্রম করা এবং নিজের ও অন্যের ব্যাপারে অবশ্যকরণীয় কাজের সীমালংঘন করাকেই বুঝানো হয়েছে। ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল (রঃ) আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তুমি তোমার ভাইকে সাহায্য কর যদিও সে অত্যাচারী বা অত্যাচারিত হয়।” তখন কোন কোন সাহাবী রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! অত্যাচারিত ভাইকে সাহায্য করার অর্থ তো আমরা বুঝলাম, কিন্তু অত্যাচারী ভাইকে কি করে আমরা সাহায্য করবো?” তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “তুমি তাকে অত্যাচার করা হতে বাধা প্রদান কর ও নিষেধ কর। আর এটাই তাকে সাহায্য করা হবে।” ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল (রঃ) একজন সাহাবী হতে বর্ণনা করেন যে, যে ঈমানদার ব্যক্তি মানুষের সাথে মেলামেশা করে এবং তাদের দেয়া কষ্ট সহ্য করে সেই ব্যক্তি ঐ ঈমানদার ব্যক্তি হতে অধিক প্রতিদান পাবে যে মানুষের সাথে মেলামেশা করে না এবং তাদের দেয়া কষ্টও সহ্য করে না। এ হাদীসটি মুসনাদে আহমাদে অন্য একটি সনদেও এসেছে। ইমাম তিরযিমীও (রঃ) হাদীসটিকে অন্য আর একটি সনদে তাঁর গ্রন্থে স্থান দিয়েছেন। আবু বকর আল বাযযার তাঁর হাদীস গ্রন্থে আবদুল্লাহ হতে বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে সকাজের প্রতি পথ-প্রদর্শন করে সে সকর্মকারীর ন্যায় প্রতিদান পাবে।” ইবনে কাসীর (রঃ) বলেন যে, এ হাদীসের অনুরূপ আর একটি সহীহ হাদীস আছে। তা হচ্ছে- “যে ব্যক্তি মানুষকে সৎপথে আহ্বান করে তাকে কিয়ামত পর্যন্ত ঐ সৎপথ যত ব্যক্তি অনুসরণ করবে তাদের সকলের প্রতিদানের অনুরূপ প্রতিদান দেয়া হবে। অথচ এ ব্যাপারে সৎপথ অনুসরণকারীদের প্রতিদান কমানো হবে ন
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।