আল কুরআন


সূরা আল-হাশর (আয়াত: 9)

সূরা আল-হাশর (আয়াত: 9)



হরকত ছাড়া:

والذين تبوءوا الدار والإيمان من قبلهم يحبون من هاجر إليهم ولا يجدون في صدورهم حاجة مما أوتوا ويؤثرون على أنفسهم ولو كان بهم خصاصة ومن يوق شح نفسه فأولئك هم المفلحون ﴿٩﴾




হরকত সহ:

وَ الَّذِیْنَ تَبَوَّؤُ الدَّارَ وَ الْاِیْمَانَ مِنْ قَبْلِهِمْ یُحِبُّوْنَ مَنْ هَاجَرَ اِلَیْهِمْ وَ لَا یَجِدُوْنَ فِیْ صُدُوْرِهِمْ حَاجَۃً مِّمَّاۤ اُوْتُوْا وَ یُؤْثِرُوْنَ عَلٰۤی اَنْفُسِهِمْ وَ لَوْ کَانَ بِهِمْ خَصَاصَۃٌ ؕ۟ وَ مَنْ یُّوْقَ شُحَّ نَفْسِهٖ فَاُولٰٓئِکَ هُمُ الْمُفْلِحُوْنَ ۚ﴿۹﴾




উচ্চারণ: ওয়াল্লাযীনা তাবাওওয়াউদ্দা-রা ওয়াল ঈমা-না মিন কাবলিহিম ইউহিববূনা মান হা-জারা ইলাইহিম ওয়ালা-ইয়াজিদূ না ফী সুদূ রিহিম হা-জাতাম মিম্মাউতূওয়া ইউ’ছিরূনা ‘আলা আনফুছিহিম ওয়ালাও কা-না বিহিম খাসা-সাতুও ওয়া মাইঁ ইঊকা শুহহা নাফছিহী ফাউলাইকা হুমুল মুফলিহূন।




আল বায়ান: আর মুহাজিরদের আগমনের পূর্বে যারা মদীনাকে নিবাস হিসেবে গ্রহণ করেছিল এবং ঈমান এনেছিল (তাদের জন্যও এ সম্পদে অংশ রয়েছে), আর যারা তাদের কাছে হিজরত করে এসেছে তাদেরকে ভালবাসে। আর মুহাজরিদেরকে যা প্রদান করা হয়েছে তার জন্য এরা তাদের অন্তরে কোন ঈর্ষা অনুভব করে না। এবং নিজেদের অভাব থাকা সত্ত্বেও নিজেদের ওপর তাদেরকে অগ্রাধিকার দেয়। যাদের মনের কার্পণ্য থেকে রক্ষা করা হয়েছে, তারাই সফলকাম।




আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৯. আর তাদের জন্যও, মুহাজিরদের আগমনের আগে যারা এ নগরীকে নিবাস হিসেবে গ্ৰহণ করেছে ও ঈমান গ্রহণ করেছে, তারা তাদের কাছে যারা হিজরত করে এসেছে তাদের ভালবাসে এবং মুহাজিরদেরকে যা দেয়া হয়েছে তার জন্য তারা তাদের অন্তরে কোন (না পাওয়াজনিত) হিংসা অনুভব করে না, আর তারা তাদেরকে নিজেদের উপর অগ্ৰাধিকার দেয় নিজের অভাবগ্ৰস্ত হলেও।(১) বস্তুতঃ যাদেরকে অন্তরের কার্পণ্য থেকে মুক্ত রাখা হয়েছে, তারাই সফলকাম।(২)




তাইসীরুল ক্বুরআন: (আর এ সম্পদ তাদের জন্যও) যারা মুহাজিরদের আসার আগে থেকেই (মাদীনাহ) নগরীর বাসিন্দা ছিল আর ঈমান গ্রহণ করেছে। তারা তাদেরকে ভালবাসে যারা তাদের কাছে হিজরাত করে এসেছে। মুহাজিরদেরকে যা দেয়া হয়েছে তা পাওয়ার জন্য তারা নিজেদের অন্তরে কোন কামনা রাখে না, আর তাদেরকে (অর্থাৎ মুহাজিরদেরকে) নিজেদের উপর অগ্রাধিকার দেয়- নিজেরা যতই অভাবগ্রস্ত হোক না কেন। বস্তুত: যাদেরকে হৃদয়ের সংকীর্ণতা থেকে রক্ষা করা হয়েছে তারাই সফলকাম।




আহসানুল বায়ান: (৯) আর তাদের (মুহাজিরদের আগমনের) পূর্বে যারা এ নগরী (মদীনা)তে বসবাস করেছে[1] ও বিশ্বাস স্থাপন করেছে, তারা মুহাজিরদেরকে ভালবাসে এবং মুহাজিরদেরকে যা দেওয়া হয়েছে, তার জন্য তারা অন্তরে ঈর্ষা পোষণ করে না,[2] বরং নিজেরা অভাবগ্রস্ত হলেও তারা (তাদেরকে) নিজেদের উপর প্রাধান্য দেয়।[3] আর যাদেরকে নিজ আত্মার কার্পণ্য হতে মুক্ত রাখা হয়েছে, তারাই সফলকাম। [4]



মুজিবুর রহমান: মুহাজিরদের আগমনের পূর্বে যারা এই নগরীতে বসবাস করেছে ও ঈমান এনেছে তারা মুহাজিরদেরকে ভালবাসে এবং মুহাজিরদেরকে যা দেয়া হয়েছে তার জন্য তারা অন্তরে বিদ্বেষ পোষণ করেনা, আর তারা তাদেরকে নিজেদের উপর প্রাধান্য দেয় নিজেরা অভাবগ্রস্ত হলেও; যারা কার্পণ্য হতে নিজেদেরকে মুক্ত করেছে তারাই সফলকাম।



ফযলুর রহমান: (তাদের জন্যও) যারা এই মোহাজেরদের আগে এ নগরীতে (মদীনায়) বসবাস করেছে ও ঈমান এনেছে (অর্থাৎ আনসারদের জন্যও)। তাদের কাছে যারা হিজরত করে এসেছে তারা তাদেরকে ভালবাসে; তাদেরকে যা দেওয়া হয়েছে তার জন্য তারা অন্তরে কোন চাহিদা পোষণ করে না এবং নিজেরা অভাবগ্রস্ত হলেও নিজেদের ওপর (তাদেরকে) অগ্রাধিকার দেয়। আর মনের কার্পণ্য থেকে যাদেরকে মুক্ত রাখা হয়েছে তারাই সফলকাম।



মুহিউদ্দিন খান: যারা মুহাজিরদের আগমনের পূর্বে মদীনায় বসবাস করেছিল এবং বিশ্বাস স্থাপন করেছিল, তারা মুহাজিরদের ভালবাসে, মুহাজিরদেরকে যা দেয়া হয়েছে, তজ্জন্যে তারা অন্তরে ঈর্ষাপোষণ করে না এবং নিজেরা অভাবগ্রস্ত হলেও তাদেরকে অগ্রাধিকার দান করে। যারা মনের কার্পণ্য থেকে মুক্ত, তারাই সফলকাম।



জহুরুল হক: আর যারা তাদের পূর্বেই বাড়িঘর ও ধর্মবিশ্বাস সুপ্রতিষ্ঠিত করেছিল তারা ভালবাসে তাদের যারা তাদের কাছে হিজরত করে এসেছে, আর তারা তাদের অন্তরে কোনো প্রয়োজন বোধ করে না তাদের যা দেওয়া হয়েছে তার জন্য, আর তারা তাদের নিজেদের চেয়েও অগ্রাধিকার দেয় যদিও বা তারা স্বয়ং অভাবগ্রস্ত রয়েছে। আর যে কেউ তার অন্তরের কৃপণতা থেকে মুক্ত রেখেছে তারাই তাহলে খোদ সফলকাম।



Sahih International: And [also for] those who were settled in al-Madinah and [adopted] the faith before them. They love those who emigrated to them and find not any want in their breasts of what the emigrants were given but give [them] preference over themselves, even though they are in privation. And whoever is protected from the stinginess of his soul - it is those who will be the successful.



তাফসীরে যাকারিয়া

অনুবাদ: ৯. আর তাদের জন্যও, মুহাজিরদের আগমনের আগে যারা এ নগরীকে নিবাস হিসেবে গ্ৰহণ করেছে ও ঈমান গ্রহণ করেছে, তারা তাদের কাছে যারা হিজরত করে এসেছে তাদের ভালবাসে এবং মুহাজিরদেরকে যা দেয়া হয়েছে তার জন্য তারা তাদের অন্তরে কোন (না পাওয়াজনিত) হিংসা অনুভব করে না, আর তারা তাদেরকে নিজেদের উপর অগ্ৰাধিকার দেয় নিজের অভাবগ্ৰস্ত হলেও।(১) বস্তুতঃ যাদেরকে অন্তরের কার্পণ্য থেকে মুক্ত রাখা হয়েছে, তারাই সফলকাম।(২)


তাফসীর:

(১) এখানে আনসারগণের কিছু বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করা হয়েছে। তারা মদীনায় অবস্থান গ্রহণ করেছেন এবং ঈমানে খাঁটি ও পাকাপোক্ত হয়েছেন। সুতরাং আনসারদের একটি গুণ এই যে, যে শহর আল্লাহ তা'আলার কাছে ‘দারুল হিজরত’ ও ‘দারুল ঈমান হওয়ার ছিল, তাতে তাদের অবস্থান ও বসতি মুহাজিরগণের পূর্বেই ছিল। মুহাজিরগণের এখানে স্থানান্তরিত হওয়ার পূর্বেই তারা ঈমান কবুল করে পাকাপোক্ত হয়ে গিয়েছিলেন।

আনসারদের দ্বিতীয় গুণ বৰ্ণনা প্রসংগে বলা হয়েছে যে, “তারা তাদেরকে ভালবাসে, যারা হিজরত করে তাদের শহরে আগমন করেছেন।” এটা দুনিয়ার সাধারণ মানুষের রুচির পরিপন্থী। সাধারণত: লোকেরা এহেন ভিটে-মাটিহীন দুৰ্গত মানুষকে স্থান দেয়া পছন্দ করে না। সর্বত্রই দেশী ও ভিনদেশীর প্রশ্ন উঠে। কিন্তু আনসারগণ কেবল তাদেরকে স্থানই দেননি, বরং নিজ নিজ গৃহে আবাদ করেছেন, নিজেদের ধন-সম্পদে অংশীদার করেছেন এবং অভাবনীয় ইযযত ও সম্ভ্রমের সাথে তাদেরকে স্বাগত জানিয়েছেন। এক একজন মুহাজিরকে জায়গা দেয়ার জন্য কয়েকজন আনসারী আবেদন করেছেন। ফলে শেষ পর্যন্ত লটারীর মাধ্যমে এর নিস্পত্তি করতে হয়েছে। [দেখুন-ইবন কাসীর, ফাতহুল কাদীর,বাগাভী] হাদীসে এসেছে, আনসারগণ এসে বললেন, আমাদের মধ্যে ও আমাদের মুহাজির ভাইদের মধ্যে খেজুরের বাগানও ভাগ করে দিন। রাসূল বললেন, না, তা করা যাবে না। তখন তারা মুহাজিরগণকে বললেন, তাহলে আপনারা আমাদের খেজুর বাগানের পরিচর্যায় শরীক হোন আমরা আপনাদেরকে ফলনে শরীক করবো, তারা বললেন, হ্যাঁ। আমরা তা শুনলাম ও মেনে নিলাম। [বুখারী: ২৩২৫]

অন্য এক হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মদীনা হিজরত করার পর মুহাজিরগণ এসে তাকে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমরা যাদের কাছে এসেছি তাদের মত আমরা কাউকে দেখিনি। তারা বেশী থাকলে সবচেয়ে বেশী দানশীল আর কম থাকলে তাতে সহানুভূতির সাথে বন্টন করে দেয়। তারা আমাদেরকে খরচের ব্যাপারে যথেষ্ট করে দিয়েছে। তারা তাদের পেশাতেও আমাদেরকে শরীক করে নিয়েছে। আমরা ভয় পাচ্ছি যে, এরা আমাদের সব সওয়াব নিয়ে যাবে। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, “না, যতক্ষণ তোমরা তাদের জন্য আল্লাহর কাছে দো'আ করছ এবং তাদের প্রশংসা করছ।” [তিরমিযী: ২৪৮৭, মুস্তাদরাকে হাকিম: ২/৩৬]

আনসারদের তৃতীয় গুণ (وَلَا يَجِدُونَ فِي صُدُورِهِمْ حَاجَةً مِمَّا أُوتُوا) অর্থাৎ ‘মুহাজিরদেরকে যা দেয়া হয়েছে তার জন্য তারা তাদের অন্তরে কোন (না পাওয়া জনিত) হিংসা অনুভব করে না’ এই বাক্যের সম্পর্ক একটি বিশেষ ঘটনার সাথে, যা বনু নদীর গোত্রের নির্বাসন এবং তাদের বাগান ও গৃহের উপর মুসলিমদের দখল প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সময় সংঘটিত হয়েছিল। অর্থ এই যে, এ বন্টনে যা কিছু মুহাজিরদেরকে দেয়া হল, মদীনার আনসারগণ সানন্দে তা গ্ৰহণ করে নিলেন; যেন তাদের এসব জিনিসের প্রয়োজন ছিল না। মুহাজিরগণকে দেয়াটা খারাপ মনে করা অথবা অভিযোগ করার তো সামান্যতম কোন সম্ভাবনাই ছিল না। এর মুকাবিলায় “যখন বাহরাইন বিজিত হল, তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর প্রাপ্ত ধন-সম্পদ সম্পূর্ণই আনসারদের মধ্যে বিলি-বন্টন করে দিতে চাইলেন; কিন্ত তারা তাতে রাযী হলেন না, বরং বললেন, আমরা ততক্ষণ পর্যন্ত কিছুই গ্ৰহণ করব না, যতক্ষণ পর্যন্ত আমাদের মুহাজির ভাইগণকেও এই ধন-সম্পদ থেকে অংশ না দেয়া হয়।” [বুখারী: ৩৭৯৪]

আনসারগণের চতুর্থ গুণ হচ্ছে, (وَيُؤْثِرُونَ عَلَىٰ أَنْفُسِهِمْ وَلَوْ كَانَ بِهِمْ خَصَاصَةٌ) অর্থাৎ আনসারগণ নিজেদের উপর মুহাজিরগণকে অগ্ৰাধিকার দিতেন। নিজেদের প্রয়োজন মেটানোর আগে তাদের প্রয়োজন মেটাতেন; যদিও নিজের অভাবগ্ৰস্ত ও দারিদ্রপীড়িত ছিলেন। এটাই মূলত: উত্তম সাদাকাহ। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, “সবচেয়ে উত্তম সাদাকাহ হচ্ছে, কষ্টে অর্জিত অল্প সম্পদ থেকে দান করা” [আবু দাউদ: ১৬৭৭, মুসনাদে আহমাদ: ২/৩৫৮, সহীহ ইবনে খুজাইমাহঃ ২৪৪৪, ইবনে হিব্বান: ৩৩৪৬, মুস্তাদরাকে হাকিম: ১/৪১৪]

যে সম্পদের প্রয়োজন তার নিজের খুব বেশী তা থেকে দান করতে সক্ষম হওয়া খুব উচু মনের অধিকারী ব্যক্তি ব্যতীত আর কারও পক্ষে সম্ভব হয় না।  অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন, “তারা খাবারের মহব্বত থাকা সত্বেও তা অন্যদের খাওয়ায়”। [সূরা আল-ইনসান: ৮] অন্যত্র আল্লাহ্ আরো বলেছেন, “আর সম্পদের প্রতি মহব্বত থাকা সত্বেও তা দান করা”। সূরা আল-বাকারাহ: ১৭৭]

সুতরাং দান বা সাদাকাহ করার সর্বোচ্চ পর্যায় হচ্ছে, নিজের প্রয়োজন থাকা সত্বেও নিজের প্রয়োজনের উপর অন্যের প্রয়োজনকে প্রাধান্য দিয়ে তা দান বা সাদাকাহ করা। আনসারগণ ঠিক এ কাজটিই করতেন। হাদীসে এসেছে, এক লোক রাসূলের দরবারে এসে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! ক্ষুধা আমাকে খুব কষ্ট দিচ্ছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজের স্ত্রীদের কাছে খাবার চেয়ে পাঠালেন কিন্তু তাদের কাছে কিছুই পেলেন না। তখন তিনি বললেন, এমন কোন লোককি পাওয়া যাবে যে, আজ রাতে এ লোকটিকে মেহমানদারী করবে? আল্লাহ তাকে রহমত করবেন। আনসারী এক লোক দাঁড়িয়ে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমি। লোকটি তার স্ত্রীর নিকট গিয়ে তাকে বললেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মেহমান, সুতরাং কোন কিছু বাকী না রেখে সবকিছু দিয়ে হলেও মেহমানদারী করবে। মহিলা বললেন, আল্লাহর শপথ, আমার কাছে তো কেবল বাচ্চার খাবারই অবশিষ্ট আছে। আনসারী বললেন, ঠিক আছে, রাতের খাবারের সময় হলে বাচ্চাকে ঘুম পাড়িয়ে দিও, তারপর আমরা বাতি নিভিয়ে দিব, এ রাতটি আমরা কষ্ট করে না খেয়েই কাটিয়ে দিব, যাতে মেহমান খেতে পারে। কথামত তাই করা হলো, সকালে যখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে আনসার লোকটি আসলেন, তখন রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে বললেন, “মহান আল্লাহ গতরাত্রে তোমাদের কাণ্ড দেখে হোসেছেন অথবা বলেছেন, আশ্চর্যাম্বিত হয়েছেন।” আর তখনই এ আয়াত নাযিল হয়েছিল [বুখারী: ৩৭৯৮, ৪৮৮৯, মুসলিম: ২০৫৪]


(২) আনসারগণের আত্মত্যাগ ও আল্লাহ্ তা'আলার পথে সবকিছু বিসর্জন দেয়ার কথা বর্ণনা করার পর সাধারণ বিধি হিসেবে বলা হয়েছে যে, যারা মনের কার্পণ্য থেকে আত্মরক্ষা করতে পারে, তারাই আল্লাহ তা’আলার কাছে সফলকাম। আয়াতে বৰ্ণিত شح শব্দের অর্থ কৃপণতা। [বাগভী] কুরআন ও হাদীসে এর নিন্দা করা হয়েছে। বলা হয়েছে, তোমরা কৃপণতা থেকে বেঁচে থাক; কেননা কৃপণতা তোমাদের পূর্বের লোকদেরকে ধ্বংস করেছিল। তাদেরকে কৃপণতা অন্যায় রক্ত প্রবাহে উদ্ধৃদ্ধ করেছিল এবং হারামকে হালাল করতে বাধ্য করেছিল। [মুসলিম: ২৫৭৮] অন্য হাদীসে এসেছে, “ঈমান ও কৃপণতা কোন বান্দার অন্তরে এক সাথে থাকতে পারে না।” [মুসনাদে আহমাদ ২/৩৪২]


তাফসীরে আহসানুল বায়ান

অনুবাদ: (৯) আর তাদের (মুহাজিরদের আগমনের) পূর্বে যারা এ নগরী (মদীনা)তে বসবাস করেছে[1] ও বিশ্বাস স্থাপন করেছে, তারা মুহাজিরদেরকে ভালবাসে এবং মুহাজিরদেরকে যা দেওয়া হয়েছে, তার জন্য তারা অন্তরে ঈর্ষা পোষণ করে না,[2] বরং নিজেরা অভাবগ্রস্ত হলেও তারা (তাদেরকে) নিজেদের উপর প্রাধান্য দেয়।[3] আর যাদেরকে নিজ আত্মার কার্পণ্য হতে মুক্ত রাখা হয়েছে, তারাই সফলকাম। [4]


তাফসীর:

[1] এ থেকে আনসারী সাহাবাদেরকে বুঝানো হয়েছে। যাঁরা মুহাজির সাহাবাদের মদীনা আসার পূর্ব থেকেই মদীনার বাসিন্দা ছিলেন এবং মুহাজিরদের হিজরত করে মদীনা আসার পূর্বেই তাঁদের অন্তরে ঈমান প্রতিষ্ঠা লাভ করেছিল। তবে এর অর্থ এই নয় যে, মুহাজির সাহাবাদের ঈমান আনার পূর্বেই আনসারী সাহাবাগণ ঈমান এনেছিলেন। কেননা, তাঁদের অধিকাংশই মুহাজির সাহাবাদের ঈমান আনার পর ঈমান এনেছেন। অর্থাৎ, مِنْ قَبْلِهِمْ (তাদের পূর্বে)এর অর্থ, مِنْ قَبْلِ هِجْرَتِهِمْ (তাঁদের হিজরত করার পূর্বে)। আর الدَارٌ বলতে دَارُ الْهِجْرَةِ অর্থাৎ, মদীনাকে বুঝানো হয়েছে।

[2] অর্থাৎ, মুহাজির সাহাবীদেরকে আল্লাহর রসূল (সাঃ) যা কিছু দিতেন তাতে তাঁরা না হিংসা করতেন, আর না মনে কোন প্রকার সংকীর্ণতা অনুভব করতেন। যেমন, ‘মালে ফাই’ পাওয়ার প্রথম অধিকারী তাঁদেরকেই গণ্য করা হয়। এতে আনসার সাহাবীগণ কিছুই মনে করেননি।

[3] অর্থাৎ, নিজেদের তুলনায় মুহাজিরদের প্রয়োজনকে অগ্রাধিকার দিতেন। নিজেরা ক্ষুধার্ত থাকতেন, কিন্তু মুহাজিরদেরকে খাওয়াতেন। যেমন, হাদীসে একটা ঘটনা বর্ণিত হয়েছে যে, একদা নবী (সাঃ)-এর নিকট একজন মেহমান এল। কিন্তু রসূল (সাঃ)-এর ঘরে কিছুই ছিল না। সুতরাং একজন আনসারী সাহাবী তাঁকে নিজের বাড়ীতে নিয়ে গেলেন। ঘরে গিয়ে স্ত্রীকে জানালে স্ত্রী বললেন, ‘ঘরে তো কেবল ছেলেদের খাবার মত সামান্য কিছু আছে।’ পরে উভয়ে পরামর্শ করলেন যে, ছেলেদেরকে আজ (ভুলিয়ে-ভালিয়ে) ক্ষুধার্ত রেখেই ঘুম পাড়িয়ে দাও এবং আমরা নিজেরাও কিছু না খেয়েই ঘুমিয়ে যাব। তবে মেহমানকে খাওয়ানোর সময় (ছল করে) বাতিটা নিভিয়ে দেবে, যাতে সে আমাদের ব্যাপারে জানতে না পারে যে, আমরা তার সাথে খাবার খাচ্ছি না। সকালে যখন এই সাহাবী রসূল (সাঃ)-এর নিকট উপস্থিত হলেন, তখন তিনি তাঁকে বললেন যে, মহান আল্লাহ তোমার ও তোমার স্ত্রীর ব্যাপারে এই আয়াত অবতীর্ণ করেছেন। ﴿وَيُؤْثِرُونَ عَلَى أَنْفُسِهِمْ﴾ (সহীহ বুখারী, সূরা হাশরের তফসীর) তাঁদের ত্যাগের একটি বিস্ময়কর দৃষ্টান্ত এও যে, একজন আনসারী সাহাবীর নিকট দু’জন স্ত্রী ছিল। তিনি তাঁর মুহাজির ভাইকে প্রস্তাব দিলেন যে, আমি তোমার জন্য আমার একজন স্ত্রীকে তালাক দেব। ইদ্দত অতিবাহিত হওয়ার পর তুমি তাকে বিবাহ করে নেবে! (বুখারী, বিবাহ অধ্যায়)

[4] হাদীসে আছে যে, কৃপণতা হতে দূরে থাক। কারণ, এই কৃপণতাই তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদেরকে ধ্বংস করে দিয়েছে। এই কৃপণতাই তাদেরকে নিজেদের রক্তপাত করতে এবং হারামকে হালাল করে নিতে প্ররোচিত করেছিল। (মুসলিমঃ নেকী অধ্যায়, পরিচ্ছেদঃ অত্যাচার করা হারাম)


তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ


তাফসীর: ৮-১০ নম্বর আয়াতের তাফসীর :



ফাঈ ও গনীমতের মাল সে সকল দরিদ্র মুহাজিরদের জন্য যারা আল্লাহ তা‘আলার সন্তুষ্টি লাভের জন্য এবং আল্লাহ তা‘আলা ও তাঁর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে সহযোগিতা করার জন্য নিজেদের বাড়ি-ঘর, সহায় সম্পদ ছেড়ে হিজরত করে চলে এসেছে।



(وَالَّذِيْنَ تَبَوَّئُوا)



‘এবং মুহাজিরদের (আগমনের) পূর্বে যারা এ নগরীতে (মদীনায়) বসবাস করেছে’ এ থেকে আনসারী সাহাবীদেরকে বুঝানো হয়েছে। যারা মুহাজিরদের মদীনায় আসার পূর্বেই মদীনার বাসিন্দা ছিলেন এবং মুহাজিরদের হিজরত করে আসার পূর্বেই তাদের অন্তরে ঈমান প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে। তবে এর অর্থ এই নয় যে, মুহাজির সাহাবীদের ঈমান আনার পূর্বেই আনসারীগণ ঈমান এনেছিলেন। কেননা তাদের অধিকাংশ মুহাজির সাহাবীদের ঈমান আনার পর ঈমান এনেছেন। এখানে (مِنْ قَبْلِهِمْ) বলতে



من قبل هجرتهم



অর্থাৎ তাদের হিজরত করার পূর্বে বুঝানো হয়েছে।



دار الهجرة বলতে মদীনাকে বুঝানো হয়েছে। উমার (রাঃ) বলেন : আমি আমার পরবর্তী খলীফাকে উপদেশ দিচ্ছি প্রথম শ্রেণির মুহাজিরদের সাথে উত্তম আচরণ করার জন্য। তাঁকে আমি আনসারদের সাথেও উত্তম আচরণের উপদেশ দিচ্ছি যারা নাবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর হিজরতের পূর্বে ঈমান এনেছিল ও মদীনায় বসবাস করত। তাদের মধ্যে যারা উত্তম আচরণকারী তাদের প্রতি এগিয়ে যাওয়ার এবং যারা মন্দ আচরণকারী তাদেরকে ক্ষমা করে দেওয়ার উপদেশ প্রদান করছি। (সহীহ বুখারী হা. ৪৮৮৮)



(وَلَا يَجِدُوْنَ فِيْ صُدُوْر)



অর্থাৎ মুহাজিরদের আল্লাহ তা‘আলা যে মর্যাদা প্রদান করেছেন এবং নাবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যা কিছু দিতেন তাতে তাঁরা হিংসা করত না, আর মনে কোন প্রকার সংকীর্ণতা অনুভব করত না।



(وَيُؤْثِرُوْنَ عَلٰٓي أَنْفُسِهِمْ)



অর্থাৎ নিজেদের সকল প্রয়োজনের ওপর মুহাজিরদের প্রয়োজনকে প্রাধান্য দিত। এমনকি নিজেরা ক্ষুধার্ত থাকলেও মুহাজিরদেরকে খাওয়াতেন। যেমন হাদীসে একটা ঘটনা বর্ণিত হয়েছে যে, একদা একজন আনসারী সাহাবী এক মুহাজিরকে নিজের বাড়িতে নিয়ে গেলেন। ঘরে গিয়ে স্ত্রীকে জানালে স্ত্রী বললেন : ঘরে তো কেবল ছেলেদের খাওয়ার মত সামান্য কিছু আছে। পরে উভয়ে পরামর্শ করলেন যে, ছেলেদেরকে আজ (ভুলিয়ে-ভালিয়ে) ক্ষুধার্ত রেখেই ঘুম পাড়িয়ে দাও এবং আমরা নিজেরাও কিছু না খেয়ে ঘুমিয়ে যাব। তবে মেহমানকে খাওয়ানোর সময় (ছল করে) বাতিটা নিভিয়ে দেবে, যাতে সে আমাদের ব্যাপারে জানতে না পারে যে, আমরা তার সাথে খাচ্ছি না। সকালে যখন এ সাহাবী রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নিকট উপস্থিত হলেন, তখন তিনি তাঁকে বললেন : মহান আল্লাহ তোমার ও তোমার স্ত্রীর ব্যাপারে এ আয়াত অবতীর্ণ করেছেন-



وَيُؤْثِرُوْنَ عَلٰٓي أَنْفُسِهِمْ وَلَوْ كَانَ بِهِمْ خَصَاصَةٌ।



(সহীহ বুখারী, সূরা হাশরের তাফসীর)।



তাদের ত্যাগের একটি বিস্ময়কর দৃষ্টান্ত এও যে, একজন আনসারী সাহাবীর নিকট দুজন স্ত্রী ছিল। তিনি তার মুহাজির ভাইকে প্রস্তাব দিলেন যে, আমি তোমার জন্য আমার একজন স্ত্রীকে ত্বালাক দেব। ইদ্দত অতিবাহিত হওযার পর তুমি তাকে বিবাহ করে নেবে। (সহীহ বুখারী, বিবাহ অধ্যায়)।



(وَمَنْ يُّوْقَ شُحَّ نَفْسِه۪)- شُحَّ



অর্থ কৃপণ আর بخل অর্থও কৃপণ। তবে দুয়ের মাঝে পার্থক্য হল شُحَّ হলো নিজে কৃপণতা করে অন্যের কাছে পাওয়ার আশা করে, আর بخل শুধু কৃপণতা করা। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন : তোমরা কৃপণতা থেকে বেঁচে থাক, কারণ কৃপণতা তোমাদের পূর্ববর্তীদের ধ্বংস করেছে। এ কৃপণতা তাদেরকে নিজেদের রক্তপাত করতে এবং হারামকে হালাল করে নিতে প্ররোচিত করেছিল। (সহীহ মুসলিম হা. ৬৭৪১)



(وَالَّذِيْنَ جَا۬ءُوْ مِنْۭ بَعْدِهِمْ)



অর্থাৎ যারা আনসার ও মুহাজিরদের পরে আগমন করে তারা নিজেদের জন্য ও সকল মু’মিনদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে। এটা হল মু’মিনদের বৈশিষ্ট্য। আয়িশাহ (রাঃ) বলেন : তোমাদেরকে মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সাহাবীদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু তোমরা তাদেরকে গালি দিচ্ছো। নাবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে বলতে শুনেছি : এ জাতি ততক্ষণ পর্যন্ত ধ্বংস হবে না তাদেরকে যতক্ষণ না তাদের পরবর্তীগণ পূর্ববর্তী লোকদের অভিসম্পাত করবে। (মুসান্নফ ইবনু আবি শায়বাহ ১৫/১২৫, মুখতাসার তাফসীর বাগাভী ৬/৯৪৩) এ আয়াত প্রমাণ করছে সাহাবীদেরকে ভালবাসা ওয়াজিব। ইমাম মালেক (রহঃ) বলেন; যে ব্যক্তি মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর কোন সাহাবীর সাথে বিদ্বেষ পোষণ করবে অথবা অন্তরে কোন প্রকার হিংসা রাখবে তার জন্য মুসলিমদের ফাঈ মালে কোন হক নেই, তারপর তিনি এ আয়াত পাঠ করেন (কুরতুবী)।



সুতরাং আমাদের পূর্বে যারা ঈমান নিয়ে বিদায় নিয়েছে তাদের জন্য আমরা ক্ষমা প্রার্থনা করব, কখনো তাদের ভুল বা অন্যায়ের কারণে অশালীন মন্তব্য ও বিদ্বেষমূলক কোন কথা বলব না। তাদের ভাল-মন্দ সকল কর্মের হিসাব আল্লাহ তা‘আলার কাছে।



আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয় :



১. আনসার ও মুহাজিরদের ফযীলত অবগত হলাম।

২. একজন মু’মিন অন্য মু’মিনকে ভালবাসবে, কোন হিংসা বিদ্বেষ রাখবে না-এটাই ঈমানের দাবী।

৩. নিজের ওপর অন্যকে প্রাধান্য দেওয়ার ফযীলত অবগত হলাম।

৪. কৃপণতা নিন্দনীয়।

৫. সাহাবীদের গালি দেওয়া কুফরী কাজ, তাদের জন্য ক্ষমা চাওয়া ও সম্মানের সাথে স্মরণ ঈমানী দাবী।

৬. মুসলিমদের ঈমানী ভ্রাতৃত্ব রক্তের সম্পর্কের চেয়ে সুদৃঢ়।


তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)


তাফসীর: ৮-১০ নং আয়াতের তাফসীর:

উপরে বর্ণিত হয়েছিল যে, ফায় এর মাল অর্থাৎ কাফিরদের যে মাল যুদ্ধক্ষেত্রে বিনা যুদ্ধেই মুসলমানদের অধিকারে আসে তা বিশিষ্টভাবে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর মাল বলে গণ্য হয়। তিনি ঐ মাল কাকে প্রদান করবেন এটাও উপরে বর্ণিত হয়েছে। এখন এই আয়াতগুলোতেও ওরই আরো হকারদের বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যে, এই মালের হকদার হলো ঐ দরিদ্র মুহাজিরগণ যারা আল্লাহ্ তা'আলাকে সন্তুষ্ট করার জন্যে নিজেদের সম্প্রদায়কে অসন্তুষ্ট করেছেন। এমনকি তাদেরকে তাদের প্রিয় জন্মভূমি ও নিজেদের হাতে অর্জিত সম্পদ ছেড়ে চলে যেতে হয়েছে। তারা আল্লাহর দ্বীন ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর সাহায্যে সদা নিমগ্ন থেকেছেন। তারা আল্লাহর অনুগ্রহ ও সন্তুষ্টি কামনা করেছেন। তাঁরাই তো সত্যাশ্রয়ী। তাঁরা তাঁদের কাজকে তাঁদের কথা অনুযায়ী সত্য করে দেখিয়েছেন। এই গুণাবলী মহান মুহাজিরদের মধ্যে বিদ্যমান ছিল।

এরপর আনসারদের প্রশংসা করা হচ্ছে। তাদের ফযীলত, শরাফত ও বুযুর্গী প্রকাশ করা হচ্ছে। তাদের অন্তরের প্রশস্ততা, আন্তরিকতা, ঈসার (নিজের প্রয়োজনের চেয়ে অপরের প্রয়োজনকে বেশী প্রাধান্য দেয়া এবং দানশীলতার বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যে, তাঁরা মুহাজিরদের আগমনের পূর্বে এই নগরীতে (মদীনায়) বসবাস করেছেন ও ঈমান এনেছেন, তাঁরা মুহাজিরদেরকে ভালবাসেন এবং মুহাজিরদেরকে যা দেয়া হয়েছে তার জন্যে তারা অন্তরে আকাক্ষা পোষণ করেন না এবং তারা তাদেরকে (মুহাজিরদেরকে) নিজেদের উপর প্রাধান্য দেন নিজেরা অভাবগ্রস্ত হলেও।

হযরত উমার (রাঃ) বলেনঃ “আমি আমার পরবর্তী খলীফাকে উপদেশ দিচ্ছি প্রথম শ্রেণীর মুহাজিরদের সাথে উত্তম অচরণের, অর্থাৎ তিনি যেন তাঁদের অগ্রাধিকারের প্রতি লক্ষ্য রাখেন। তাঁকে আমি আনসারদের সাথেও উত্তম আচরণের উপদেশ দিচ্ছি। সুতরাং তাদের মধ্যে যারা উত্তম আচরণকারী তাঁদের প্রতি এগিয়ে যাওয়ার এবং তাদের মধ্যে যারা মন্দ আচরণকারী তাদেরকে ক্ষমা করে দেয়ার উপদেশ দিচ্ছি।”

হযরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একদা মুহাজিরগণ বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! দুনিয়ায় আমরা আনসারদের মত এমন ভাল মানুষ আর দেখিনি। অল্পের মধ্যে অল্প এবং বেশীর মধ্যে বেশী তারা বরাবরই আমাদের উপর খরচ করছেন। বহুদিন যাবত তারা আমাদের সমুদয় বহন করছেন। তাঁরা এসব করছেন অত্যন্ত সন্তুষ্টচিত্তে ও উৎফুল্লভাবে। কখনো তাদের চেহারায় অসন্তুষ্টির ভাব পরিলক্ষিত হয় না। তারা এমন আন্তরিকতার সাথে আমাদের খিদমত করছেন যে, আমাদের ভয় হচ্ছে না জানি হয়তো তারা আমাদের সমস্ত সৎ আমলের প্রতিদান নিয়ে নিবেন!” তাদের এ কথা শুনে নবী (সঃ) বললেনঃ “না, না, যে পর্যন্ত তোমরা তাদের প্রশংসা করতে থাকবে এবং তাদের জন্যে আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করতে থাকবে।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)

হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) একদা আনসারদেরকে ডাক দিয়ে বলেনঃ “আমি বাহরাইল এলাকাটি তোমাদের নামে লিখে দিচ্ছি।” এ কথা শুনে তাঁরা বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! যে পর্যন্ত আপনি আমাদের মুহাজির ভাইদেরকে এই পরিমাণ না দিবেন সেই পর্যন্ত আমরা এটা গ্রহণ করবে না।” তখন রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) তাদেরকে বলেনঃ “তাহলে আগামীতেও তোমরা সবর করতে থাকবে। আমার পরে এমন এক সময় আসবে যে, অন্যদেরকে দেয়া হবে এবং তোমাদেরকে ছেড়ে দেয়া হবে।” (এ হাদীসটি ইমাম বুখারী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)

হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, আনসারগণ বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমাদের খেজুরের বাগানগুলো আমাদের মধ্যে এবং আমাদের মুহাজির ভাইদের মধ্যে বন্টন করে দিন!” রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) উত্তরে বললেনঃ “না, বরং বাগানে কাজকর্ম তোমরাই করবে এবং উৎপাদিত ফলে আমাদেরকে শরীক করবে।” আনসারগণ জবাব দিলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমরা আনন্দিত চিত্তে এটা মেনে নিলাম।”

এরপর আল্লাহ্ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলেনঃ এই আনসারগণ মুহাজিরদের মান-মর্যাদা ও বুযুর্গী দেখে অন্তরে হিংসা পোষণ করে না। মুহাজিরগণ যা লাভ করে তাতে তারা মোটেই ঈর্ষা করে না। এই অর্থেরই ইঙ্গিত বহন করে নিম্নের হাদীসটিঃ

হযরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা একদা রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর সাথে বসেছিলাম এমন সময় রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বললেনঃ “দেখো, এখনই একজন জান্নাতী লোক আগমন করবে।” অল্পক্ষণ পরেই একজন আনসারী (রাঃ) বাম হাতে তার জুতা ধারণ করে নতুনভাবে অযু করা অবস্থায় আগমন করলেন। তাঁর দাড়ি হতে টপ-টপ করে পানি পড়ছিল। দ্বিতীয় দিনও আমরা অনুরূপভাবে বসেছিলাম, তখনও তিনি (নবী সঃ) ঐ কথাই বললেন এবং ঐ লোকটিই ঐ ভাবেই আসলেন। তৃতীয় দিনেও ঐ একই ব্যাপার ঘটলো। অতঃপর রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) যখন মজলিস হতে উঠে গেলেন তখন হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আস (রাঃ) তাঁর (আগন্তুকের) পশ্চাদানুসরণ করলেন। তিনি তাকে বললেনঃ “জনাব! আজ আমার মধ্যে ও আমার পিতার মধ্যে কিছু বচসা হয়েছে। তাই আমি শপথ করে বসেছি যে, তিন দিন পর্যন্ত আমি বাড়ীতে প্রবেশ করবে না। সুতরাং যদি দয়া করে আপনি আমাকে অনুমতি দেন তবে এই দিনগুলো আমি আপনার বাড়ীতে কাটিয়ে দিবো।” তিনি বললেনঃ “বেশ, ঠিক আছে।” অতএব, তিন দিন আমি তার সাথে তার বাড়ীতে অতিবাহিত করলাম। দেখলাম যে, তিনি রাত্রে তাহাজ্জুদের নামাযও পড়লেন না। শুধু এতোটুকু করলেন যে, জেগে ওঠে বিছানায় শুয়ে শুয়েই আল্লাহর যিক্র ও তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব বর্ণনা করতে থাকলেন। হ্যাঁ, তবে এটা অবশ্যই ছিল যে, আমি তার মুখে ভাল কথা ছাড়া আর কিছুই শুনিনি। তিন রাত্রি অতিবাহিত হলে তাঁর আমল আমার কাছে হাল্কা লাগলো। অতঃপর আমি তাকে বললামঃ জনাব! আমার মধ্যে ও আমার পিতার মধ্যে কোন বচসাও হয়নি এবং অসন্তুষ্টির কারণে আমি বাড়িও ছাড়িনি। বরং প্রকৃত ব্যাপার এই যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) উপর্যুপরি তিন দিন বলেন যে, এখনই একটি জান্নাতী লোক আসবে। আর তিন দিনই আপনারই আগমন ঘটে। তাই আমি ইচ্ছা করলাম যে, কয়েকদিন আপনার সাহচর্যে আমি কাটিয়ে দিবে। অতঃপর এটা লক্ষ্য করবে যে, আপনি কি এমন আমল করেন যার কারণে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) জীবিতাবস্থাতেই আপনার জান্নাতী হওয়ার সুসংবাদ আমাদেরকে প্রদান করলেন! তাই আমি এই কৌশল অবলম্বন করেছিলাম এবং তিন দিন পর্যন্ত আপনার খিদমতে থাকলাম, যেন আপনার আমল দেখে আমিও ঐরূপ আমল করে জান্নাতবাসী হতে পারি। কিন্তু আমি তো আপনাকে কোন নতুন ও গুরুত্বপূর্ণ আমল করতে দেখলাম না এবং ইবাদতেও তো অন্যদেরকে ছাড়িয়ে যেতে দেখলাম না। এখন আমি আপনার নিকট হতে বিদায় গ্রহণ করছি। কিন্তু বিদায় বেলায় আপনার নিকট আমি জানতে চাই যে, আর কি এমন আমল করেন যার কারণে স্বয়ং রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) আপনার জান্নাতী হওয়ার কথা বললেন? উত্তরে তিনি আমাকে বললেনঃ “তুমি আমাকে যে আমল করতে দেখেছো, এ ছাড়া অন্য কোন বিশেষ ও গোপনীয় আমল আমি করি না।” তাঁর এ জবাব শুনে আমি তাঁর নিকট হতে বিদায় গ্রহণ করে চলতে শুরু করলাম। অল্প দূরে গিয়েছি ইতিমধ্যে তিনি আমাকে ডাক দিয়ে বললেনঃ “আমার আর একটি আমল রয়েছে, তা এই যে, আমি কখনো কোন মুসলমানের প্রতি হিংসা ও শত্রুতা পোষণ করিনি এবং কখনো কোন মুসলমানের অমঙ্গল কামনা করিনি। আমি তার এ কথা শুনে বললামঃ হ্যাঁ, এবার আমার জানা হয়ে গেছে যে, আপনার এই আমলই আপনাকে এই মর্যাদায় পৌছিয়ে দিয়েছে এবং এটা এমনই এক আমল যে, অনেকেই এটার ক্ষমতা রাখে না।” (এ হাদীসটি মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত হয়েছে। ইমাম নাসাঈও (রঃ) তাঁর নামক গ্রন্থে এ হাদীসটি আনয়ন করেছেন)

মোটকথা, আনসারদের মধ্যে এই বিশেষণ ছিল যে, মুহাজিরগণ মাল ইত্যাদি লাভ করলে এবং তারা তা না পেলে তাঁরা মনক্ষুন্ন হতেন না। বানী নাযীর গোত্রের মাল মুহাজিরদের মধ্যে বন্টিত হলে কোন একজন আনসারী সমালোচনা করেন। ঐ সময় (আরবী) -এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) আনসারদেরকে বলেনঃ “তোমাদের মুহাজির ভাইগণ ধন-দৌলত ও সন্তান-সন্ততি ছেড়ে তোমাদের কাছে এসেছে।” তাঁরা তখন বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমাদের মাল-ধন আপনি তাদের মধ্যে ও আমাদের মধ্যে বন্টন করে দিন!” তিনি উত্তরে বললেনঃ “তোমরা কি এর চেয়েও বেশী ত্যাগ স্বীকার করতে পার না?” তারা জবাব দিলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! বলুন, কি ত্যাগ স্বীকার আমাদেরকে করতে হবে?” তিনি বললেনঃ “মুহাজিরগণ ক্ষেত-খামারের কাজ জানে না। সুতরাং তোমরাই তোমাদের ক্ষেতে ও বাগানে কাজ করবে এবং উৎপাদিত ফল-শস্যাদি হতে তাদেরকে অংশ দিবে।” আনসারগণ সন্তুষ্ট চিত্তে এতে সম্মতি জানালেন।

এরপর মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ তারা (আনসাররা) তাদেরকে (মুহাজিরদেরকে) নিজেদের উপর প্রাধান্য দেয় নিজেরা অভাগ্রস্ত হলেও।

সহীহ্ হাদীসেও রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বলেছেনঃ “যার কাছে (মালের) স্বল্পতা রয়েছে এবং নিজেরই প্রয়োজন আছে, এতদ্সত্ত্বেও সাদকা করে, তার সাদকা হলো উত্তম সাদকা।” এই মর্যাদা ঐ লোকদের মর্যাদার চেয়েও অগ্রগণ্য যাদের সম্পর্কে অল্লিাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আহার্যের প্রতি আসক্তি সত্ত্বেও তারা অভাবগ্রস্ত, ইয়াতীম এবং বন্দীকে খাদ্য ভক্ষণ করিয়ে থাকে।” (৭৬:৮) আর এক জায়গায় আছেঃ (আরবী) অর্থাৎ `মালের প্রতি আসক্তি সত্ত্বেও তারা তা দান করে। কিন্তু এই লোকগুলো অর্থাৎ আনসারদের নিজেদের প্রয়োজন ও অভাব থাকা সত্ত্বেও তারা দান করে থাকেন। মালের প্রতি আসক্তি থাকে এবং প্রয়োজন থাকে না ঐ সময়ের দান-খয়রাত ঐ মর্যাদায় পৌছে না যে, প্রয়োজন ও অভাব থাকা সত্ত্বেও দান করা হয়।

এই প্রকারের দান ছিল হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রাঃ)-এর দান। তিনি তার সমস্ত মাল নিয়ে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর দরবারে হাযির হন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে জিজ্ঞেস করেনঃ “হে আবু বকর (রাঃ)! তোমার পরিবারবর্গের জন্যে কি রেখে এসেছো?” উত্তরে তিনি বলেনঃ “তাদের জন্যে আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-কে রেখে এসেছি।” অনুরূপভাবে ঐ ঘটনাটিও এরই অন্তর্ভুক্ত যা ইয়ারমূকের যুদ্ধে হযরত ইকরামা (রাঃ) এবং তাঁর সঙ্গীদের ব্যাপারে ঘটেছিল। যুদ্ধের ময়দানে মুজাহিদগণ (রাঃ) আহত অবস্থায় পড়ে রয়েছেন। পিপাসায় কাতর হয়ে তাঁরা ছটফট করছেন এবং পানি পানি’ করে চীৎকার করছেন! এমন সময় একজন মুসলমান পানির মশক কাঁধে নিয়ে আসলেন। ঐ পানি তিনি আহত মুজাহিদদের সামনে পেশ করলেন। কিন্তু একজন বললেনঃ ঐ যে, ঐ ব্যক্তিকে দাও। তিনি ঐ দ্বিতীয় মুজাহিদের নিকট গেলেন। তিনি তখন তার পার্শ্ববর্তী আর এক ব্যক্তিকে দেখিয়ে দিলেন। ঐ মুসলমানটি তখন তৃতীয় মুজাহিদের নিকট গিয়ে দেখেন যে, তাঁর প্রাণরায়ু নির্গত হয়ে গেছে! দৌড়িয়ে তিনি দ্বিতীয় মুজাহিদের নিকট ফিরে গিয়ে দেখতে পান যে, তাঁরও প্রাণ পাখী। উড়ে গেছে। তারপর তিনি প্রথম মুজাহিদের নিকট ফিরে গিয়ে দেখেন যে, তিনিও এই নশ্বর জগত হতে বিদায় গ্রহণ করে মহান আল্লাহর কাছে হাযির হয়ে গেছেন! আল্লাহ্ তাঁদের প্রতি সন্তুষ্ট থাকুন ও তাদেরকে সন্তুষ্ট রাখুন!”

হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একটি লোক রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট এসে বলেঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমি খুবই অভাবগ্রস্ত ব্যক্তি। মেহেরবানী করে আমার জন্যে কিছু খাবারের ব্যবস্থা করুন!” রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন তাঁর স্ত্রীদের বাড়ীতে লোকে পাঠান। কিন্তু তাঁদের কারো বাড়ীতেই কিছুই পাওয়া গেল না। তিনি তখন জনগণকে লক্ষ্য করে বললেনঃ “রাত্রে আমার এই মেহমানকে নিয়ে যাবে এমন কেউ আছে কি?” একজন আনসারী (রাঃ) দাড়িয়ে গিয়ে বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমি (আছি)।” অতঃপর তিনি লোকটিকে সাথে নিয়ে বাড়ী চললেন। বাড়ী গিয়ে স্ত্রীকে বললেনঃ “দেখো, ইনি রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর মেহমান! আজ যদি আমরা নিজেরা কিছুই খেতে না পাই তবুও যেন এ মেহমান অনাহারে না থাকে।” এ কথা শুনে তাঁর স্ত্রী বললেনঃ “আল্লাহর কসম! বাড়ীতে আজ শিশুদের খাবার ছাড়া আর কিছুই নেই।” আনসারী তখন তাঁর স্ত্রীকে বললেনঃ “শিশুদের না খাইয়েই শুইয়ে দাও। আর আমরা দু'জন (স্বামী-স্ত্রী) তো পেটে কাপড় বেঁধে অনাহারেই রাত্রি কাটিয়ে দিবো। মেহমানের খাওয়ার সময় তুমি প্রদীপটি নিভিয়ে দিবে। তখন মেহমান। মনে করবে যে, আমরা খেতে আছি।” স্ত্রী তাই করলেন। সকালে লোকটি রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর দরবারে হাযির হলে তিনি বলেনঃ “মহামহিমান্বিত আল্লাহ্ এই ব্যক্তির এবং তার স্ত্রীর রাত্রের কাজ দেখে খুশী হয়েছেন এবং হেসেছেন।” ঐ ব্যাপারেই (আরবী)-এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। (এ হাদীসটি ইমাম বুখারী (রঃ) বর্ণনা করেছেন। সহীহ মুসলিমে ঐ আনসারীর নাম দেয়া হয়েছে হযরত আবূ তালহা (রাঃ)। ইমাম তিরমিযী (রঃ) এবং ইমাম নাসাঈও (রঃ) হাদীসটি বর্ণনা করেছেন)

এরপর আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলেনঃ যারা কার্পণ্য হতে নিজেদেরকে মুক্ত করেছে তারাই সফলকাম।

হযরত জাবির ইবনে আবদিল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বলেছেনঃ “হে জনমণ্ডলী! তোমরা যুলুম হতে বেঁচে থাকো। কেননা, এই যুলুম কিয়ামতের দিন যুলমত বা অন্ধকারের কারণ হবে। হে লোক সকল! তোমরা কার্পণ্য ও লোভ-লালসাকে ভয় কর। কেননা, এটা এমন একটা জিনিস যা ততামাদের পূর্ববর্তী লোকদেরকে ধ্বংস করে ফেলেছে। এরই কারণে তারা পরস্পর খুনাখুনি করেছে এবং হারামকে হালাল করে নিয়েছে।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন। সহীহ মুসলিমেও এটা বর্ণিত হয়েছে)

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমরা যুলম হতে দূরে থাকো। কেননা, যুলম কিয়ামতের দিন অন্ধকার রূপ ধারণ করবে। আর তোমরা কটুবাক্য প্রয়োগ করা হতে বিরত থাকো। জেনে রেখো যে, আল্লাহ্ তা'আলা অশ্লীলভাষীকে ও নির্লজ্জতাপূর্ণ। কাজকে ভালবাসেন না। তোমরা লোভ-লালসা ও কার্পণ্য হতে বিরত থাকো। কেননা, একারণেই তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদেরকে ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে। তারা জনগণকে যুলম করার নির্দেশ দিতো তখন তারা যুলম করতো, তারা পাপাচারের হুকুম করতো ফলে তারা পাপাচার করতো এবং তারা আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করার নির্দেশ দিতো, তাই তারা আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করতো।” (ইমাম আ’মাশ (রঃ) ও ইমাম শু'বা (রঃ) এটা বর্ণনা করেছেন)

হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলতে শুনেছেনঃ “আল্লাহর পথের ধুলো-বালি এবং জাহান্নামের ধূয়া কোন বান্দার পেটে একত্রিত হতে পারে না (অর্থাৎ আল্লাহর পথের ধুলো যার উপরে পড়েছে সে জাহান্নামের আগুন হতে মুক্ত হয়ে গেছে)।”
(ইমাম আহমাদ (রঃ), ইমাম আবু দাঊদ (রঃ) এবং ইমাম নাসাঈ (রঃ) এ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন)

হযরত আসওয়াদ ইবনে হিলাল (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একটি লোক হযরত আবদুল্লাহ্ (রাঃ)-এর নিকট এসে বলেঃ “হে আবু আবদির রহমান (রাঃ)! আমি তো ধ্বংস হয়ে গেছি।” তিনি তার একথা শুনে বলেনঃ “কেন, ব্যাপার কি?” লোকটি উত্তরে বলেঃ “যারা কার্পণ্য হতে নিজেদেরকে মুক্ত করেছে তারাই সফলকাম। আর আমি তো একজন কৃপণ লোক। আমি তো আমার মালের কিছুই খরচ করতে চাই না!” তখন হযরত আবদুল্লাহ্ (রাঃ) তাকে বললেনঃ “এখানে কার্পণ্য দ্বারা উদ্দেশ্য এই যে, তুমি তোমার কোন মুসলমান ভাই-এর মাল যুলম করে ভক্ষণ করবে। হ্যাঁ, তবে কার্পণ্যও নিঃসন্দেহে খুবই খারাপ জিনিস।” (এটা ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)

হযরত আবুল হাইয়াজ আসাদী (রঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রায়তুল্লাহ্র তাওয়াফ করা অবস্থায় আমি দেখলাম যে, একটি লোক শুধু -এই দু'আটি পাঠ করছেন অর্থাৎ “হে আল্লাহ! আপনি আমাকে আমার জীবনের কার্পণ্য ও লোভ-লালসা হতে রক্ষা করুন!” শেষ পর্যন্ত আমি থাকতে না পেরে তাকে জিজ্ঞেস করলামঃ জনাব! আপনি শুধু এই প্রার্থনাই কেন করছেন? তিনি উত্তরে বললেনঃ “যদি এটা হতে রক্ষা পাওয়া যায় তবে ব্যভিচার হবে না, চুরি হবে না এবং অন্য কোন খারাপ কাজও হতে পারে না।” অতঃপর আমি তার দিকে ভাল করে চেয়ে দেখলাম। তখন দেখি যে, তিনি হলেন হযরত আবদুর রহমান ইবনে আউফ (রাঃ)।” (এটা হযরত সুফইয়ান সাওরী (রঃ) ও হযরত ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন)

হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি যাকাত আদায় করলো, মেহমানদারী করলো এবং আল্লাহর পথের জরুরী কাজে (মাল) প্রদান করলো সে তার নফসের কার্পণ্য ও লোভ-লালসা হতে দূর হয়ে গেল।

মহান আল্লাহ বলেনঃ যারা তাদের (মুহাজির ও আনসারদের) পরে এসেছে, তারা বলেঃ হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদেরকে এবং ঈমানে অগ্রণী আমাদের ভ্রাতাগণকে ক্ষমা করুন এবং মুমিনদের বিরুদ্ধে আমাদের অন্তরে হিংসা-বিদ্বেষ রাখবেন না। হে আমাদের প্রতিপালক! আপনি তো দয়ার্দ্র, পরম দয়ালু। (এটাও ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন)

এঁরা হলেন ফায়-এর মালের তৃতীয় প্রকার হকদার। মুহাজির ও আনসারদের দরিদ্রদের পরে তাদের অনুসারী হলেন তাদের পরবর্তী লোকেরা। এই লোকদের মিসকীনরাও এই ফায়-এর মালের হকদার। এঁরা আল্লাহ্ তা'আলার নিকট এঁদের পূর্ববর্তী ঈমানদার লোকদের জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করে থাকেন। যেমন সূরায়ে বারাআতে রয়েছেঃ (আরবী)

অর্থাৎ “মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে যারা প্রথম অগ্রগামী এবং যারা নিষ্ঠার সাথে তাদের অনুসরণ করে আল্লাহ্ তাদের প্রতি প্রসন্ন এবং তারাও তাতে সন্তুষ্ট।” (৯:১০০) অর্থাৎ এই পরবর্তী লোকেরা ঐ পূর্ববর্তী লোকদের পদাংক অনুসরণকারী এবং তাদের উত্তম চরিত্রের অনুসারী ও ভাল দু'আর মাধ্যমে তাদেরকে স্মরণকারী। যেন তাদের ভিতর ও বাহির পূর্ববর্তীদের অনুসারী। এজন্যেই আল্লাহ্ তা'আলা এই আয়াতে কারীমায় বলেনঃ যারা তাদের পরে এসেছে তারা বলেঃ হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদেরকে এবং ঈমানে অগ্রণী আমাদের ভ্রাতাদেরকে ক্ষমা করুন এবং মুমিনদের বিরুদ্ধে আমাদের অন্তরে হিংসা-বিদ্বেস রাখবেন না। হে আমাদের প্রতিপালক! আপনি তো দয়ার্দ্র, পরম দয়ালু।

এই দু'আ দ্বারা হযরত ইমাম মালিক (রঃ) কতই না পবিত্র দলীল গ্রহণ করেছেন। তিনি বলেন যে, রাফেযী সম্প্রদায়ের কোন লোককে যেন সেই সময়ের নেতা ফায়-এর মাল হতে কিছুই প্রদান না করেন। কেননা, তারা রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর সাহাবীদের জন্যে দু'আ করার পরিবর্তে তাদেরকে গালি দিয়ে থাকে।

হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রাঃ) বলেনঃ “ঐ লোকদের প্রতি তোমরা লক্ষ্য কর যে, কিভাবে তারা কুরআনের বিরুদ্ধাচরণ করছে! কুরআন হুকুম করছে যে, মানুষ যেন মুহাজির ও আনসারদের জন্যে দু'আ করে, অথচ এ লোকগুলো (রাফেযীরা) তাদেরকে গালি দেয়।” অতঃপর তিনি...(আরবী)-এ আয়াতটি পাঠ করেন। (এটা ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)
হযরত মাসরূক (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেনঃ “রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর সাহাবীদের জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করার তোমাদেরকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে, অথচ তোমরা তাদেরকে গালি দিচ্ছ! আমি তোমাদের নবী (সঃ)-কে বলতে শুনেছিঃ “এই উম্মত শেষ হবে না যে পর্যন্ত না তাদের পরবর্তীরা পূর্ববর্তীদেরকে লা'নত করবে।” (এ হাদীসটি ইমাম বাগাভী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)

হযরত উমার (রাঃ) বলেন যে, (আরবী)-এই আয়াতে যে ফায়-এর মালের বর্ণনা দেয়া হয়েছে ওটা তো রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর জন্যে খাস। তারপর পরবর্তী (আরবী)-এই আয়াতে যে মালের কথা বলা হয়েছে তা আম বা সাধারণ করে দেয়া হয়েছে এবং সমস্ত মুসলমান এর অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এখন একজন মুসলমানও এমন নেই যার এই মালের অধিকার নেই, শুধু গোলামদের ছাড়া। (এটা ইমাম আবু দাউদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন। কিন্তু এ হাদীসের সনদটি ছেদকাটা)

হযরত মালিক ইবনে আউস ইবনে হাসান (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত উমার ইবনে খাত্তাব (রাঃ) (আরবী) (৯:৬০)-এই আয়াতটি পাঠ করে বলেনঃ “যাকাতের হকদার তো হলো এই লোকগুলো।” তারপর তিনি (আরবী) (৮:৪১) -এ আয়াতটি পাঠ করেন। অতঃপর বলেনঃ “গানীমাতের হকদার তো হলো এই লোকগুলো।” এরপর তিনি (আরবী) এ আয়াতগুলো পাঠ করে বলেনঃ “ফায়-এর মালের হকদারদের বর্ণনা দেয়ার পর এই আয়াত সমস্ত মুসলমানকে এই ফায়-এর মালের হকদার বানিয়ে দিয়েছে। সবাই এই মালের হকদার। যদি আমি জীবিত থাকি তবে তোমরা দেখবে যে, গ্রাম-পল্লীর রাখালদেরকেও আমি এর অংশ প্রদান করবে যাদের কপালে এই মাল লাভ করার জন্যে ঘর্মও দেখা দেয়নি।” (এটা ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন)





সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।