সূরা আল-মুজাদালা (আয়াত: 12)
হরকত ছাড়া:
يا أيها الذين آمنوا إذا ناجيتم الرسول فقدموا بين يدي نجواكم صدقة ذلك خير لكم وأطهر فإن لم تجدوا فإن الله غفور رحيم ﴿١٢﴾
হরকত সহ:
یٰۤاَیُّهَا الَّذِیْنَ اٰمَنُوْۤا اِذَا نَاجَیْتُمُ الرَّسُوْلَ فَقَدِّمُوْا بَیْنَ یَدَیْ نَجْوٰىکُمْ صَدَقَۃً ؕ ذٰلِکَ خَیْرٌ لَّکُمْ وَ اَطْهَرُ ؕ فَاِنْ لَّمْ تَجِدُوْا فَاِنَّ اللّٰهَ غَفُوْرٌ رَّحِیْمٌ ﴿۱۲﴾
উচ্চারণ: ইয়াআইয়ুহাল্লাযীনা আ-মানূইযা-না-জাইতুমুর রাছূলা ফাকাদ্দিমূবাইনা ইয়াদাই নাজওয়া-কুম সাদাকাতান যা-লিকা খাইরুল্লাকুম ওয়া আতহারু ফাইল্লাম তাজিদূ ফাইন্নাল্লা-হা গাফূরুর রাহীম।
আল বায়ান: হে মুমিনগণ, তোমরা যখন রাসূলের সাথে একান্তে কথা বলতে চাও, তখন তোমাদের এরূপ কথার পূর্বে কিছু সদাকা পেশ কর। এটি তোমাদের জন্য শ্রেয়তর ও পবিত্রতর; কিন্তু যদি তোমরা সক্ষম না হও তবে আল্লাহ পরম ক্ষমাশীল, অতিশয় দয়ালু।
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ১২. হে ঈমানদারগণ! তোমরা যখন রাসূলের সাথে চুপি চুপি কথা বলতে চাও, তখন তোমাদের এরূপ কথার পূর্বে কিছু সাদাকাহ পেশ করা, এটাই তোমাদের জন্য শ্রেয় ও পরিশোধক(১); কিন্তু যদি তোমরা অক্ষম হও, তবে নিশ্চয় আল্লাহ্ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।
তাইসীরুল ক্বুরআন: হে মু’মিনগণ! তোমরা যখন রসূলের সঙ্গে গোপনে কথা বল, তখন গোপনে কথা বলার আগে সদাক্বাহ দাও, এটাই তোমাদের জন্য উত্তম ও অতি পবিত্র পন্থা। আর যদি সদাক্বাহ জোগাড় করতে না পার, তাহলে আল্লাহ অতি ক্ষমাশীল, অতি দয়ালু।
আহসানুল বায়ান: (১২) হে বিশ্বাসীগণ! তোমরা রসূলের সাথে চুপিচুপি কথা বলতে চাইলে তার পূর্বে কিছু সাদকা প্রদান কর।[1] এটাই তোমাদের জন্য শ্রেয় ও পবিত্রতর;[2] যদি তাতে অক্ষম হও, তাহলে নিশ্চয় আল্লাহ চরম ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।
মুজিবুর রহমান: হে মু’মিনগণ! তোমরা রাসূলের সাথে চুপি চুপি কথা বলতে চাইলে উহার পূর্বে সাদাকাহ প্রদান করবে, এটাই তোমাদের জন্য শ্রেয় ও পরিশোধক। যদি তাতে অক্ষম হও তাহলে এ জন্য তোমাদেরকে অপরাধী গণ্য করা হবেনা। কেননা আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।
ফযলুর রহমান: হে ঈমানদারগণ! তোমরা যখন রসূলের সাথে একান্তে কথা বলতে চাইবে তখন তোমাদের একান্ত কথার পূর্বে কিছু সদকা দেবে। এটা তোমাদের জন্য ভাল ও পবিত্রতর। তবে যদি (সদকা করার মত কিছু) না পাও তাহলে (ক্ষতি নেই, কারণ) আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।
মুহিউদ্দিন খান: মুমিনগণ, তোমরা রসূলের কাছে কানকথা বলতে চাইলে তৎপূর্বে সদকা প্রদান করবে। এটা তোমাদের জন্যে শ্রেয়ঃ ও পবিত্র হওয়ার ভাল উপায়। যদি তাতে সক্ষম না হও, তবে আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।
জহুরুল হক: ওহে যারা ঈমান এনেছ! তোমরা যখন রসূলের সঙ্গে ব্যক্তিগত পরামর্শ কর তখন তোমাদের পরামর্শের আগে দান-খয়রাত আগবাড়াবে, এইটি তোমাদের জন্য শ্রেয় ও পবিত্রতর। কিন্ত যদি তোমরা না পাও তবে নিঃসন্দেহ আল্লাহ্ পরিত্রাণকারী, অফুরন্ত ফলদাতা।
Sahih International: O you who have believed, when you [wish to] privately consult the Messenger, present before your consultation a charity. That is better for you and purer. But if you find not [the means] - then indeed, Allah is Forgiving and Merciful.
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ১২. হে ঈমানদারগণ! তোমরা যখন রাসূলের সাথে চুপি চুপি কথা বলতে চাও, তখন তোমাদের এরূপ কথার পূর্বে কিছু সাদাকাহ পেশ করা, এটাই তোমাদের জন্য শ্রেয় ও পরিশোধক(১); কিন্তু যদি তোমরা অক্ষম হও, তবে নিশ্চয় আল্লাহ্– ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।
তাফসীর:
(১) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জনশিক্ষা ও জন-সংস্কারের কাজে দিবারাত্র মশগুল থাকতেন। সাধারণ মজলিসসমূহে উপস্থিত লোকজন তাঁর অমিয় বাণী শুনে উপকৃত হতো। এই সুবাদে কিছু লোক তাঁর সাথে আলাদাভাবে গোপন কথাবার্তা বলতে চাইলে তিনি সময় দিতেন। বলাবাহুল্য প্রত্যেক ব্যক্তিকে আলাদা সময় দেয়া যেমন সময়সাপেক্ষ, তেমনি কষ্টকর ব্যাপার। এতে মুনাফিকদের কিছু দুষ্টামিও শামিল হয়ে গিয়েছিল। তারা খাঁটি মুসলিমদের ক্ষতি সাধনের উদ্দেশ্যে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছে একান্তে গমন ও গোপন কথা বলার সময় চাইত এবং দীর্ঘক্ষণ পর্যন্ত কথাবার্তা বলত। কিছু অজ্ঞ মুসলিমও স্বভাবগত কারণে কথা লম্বা করে মজলিসকে দীর্ঘায়িত করত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর এই বোঝা হালকা করার জন্যে আল্লাহ তা'আলা প্রথমে এই আদেশ অবতীর্ণ করলেন যে, যারা রাসূলের সাথে একান্তে কানকথা বলতে চায়, তারা প্রথমে কিছু সদকা প্ৰদান করবে। এ নির্দেশের পর অনেকেই কানকথা বলা থেকে বিরত থেকেছিল। এর পরই আল্লাহ তা’আলা পরবর্তী আয়াত নাযিল করে মুমিনদেরকে তা থেকে অব্যাহতি দিলেন। ফলে কারা সত্যিকার মুমিন আর কারা কপট তা ধরা পড়ে গেল। [তাবারী]
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (১২) হে বিশ্বাসীগণ! তোমরা রসূলের সাথে চুপিচুপি কথা বলতে চাইলে তার পূর্বে কিছু সাদকা প্রদান কর।[1] এটাই তোমাদের জন্য শ্রেয় ও পবিত্রতর;[2] যদি তাতে অক্ষম হও, তাহলে নিশ্চয় আল্লাহ চরম ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।
তাফসীর:
[1] প্রত্যেক মুসলিম নবী (সাঃ)-এর সাথে নির্জনে কথা বলার আশা রাখত। এতে রসূল (সাঃ)-এর বেশ কষ্ট হত। কেউ কেউ বলেন, মুনাফিকবরা খামখা নবী করীম (সাঃ)-এর সাথে চুপিচুপি কথোপকথনে ব্যস্ত থাকত; যাতে মুসলিমরা কষ্ট অনুভব করতেন। এই জন্য মহান আল্লাহ এই নির্দেশ অবতীর্ণ করলেন। যাতে নবী করীম (সাঃ)-এর সাথে চুপিচুপি কথা বলার প্রবণতা শেষ হয়ে যায়।
[2] শ্রেয় ও উত্তম এই জন্য যে, সাদকায় তোমাদেরই অন্যান্য গরীব মুসলিম ভাইদের উপকার হয়। আর পবিত্রতর এই জন্য যে, এটা হল এক সৎকর্ম এবং আল্লাহর আনুগত্য, যার দ্বারা মানুষের আত্মা পরিশুদ্ধ হয়। এ থেকে এটাও জানা গেল যে, এ নির্দেশ ছিল ‘মুস্তাহাব’ (যা করা ভাল, না করলে কোন দোষ হয় না)এর পর্যায়ভুক্ত, ওয়াজেব ছিল না।
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ১১-১৩ নম্বর আয়াতের তাফসীর :
(یٰٓاَیُّھَا الَّذِیْنَ اٰمَنُوْٓا.... وَاللہُ بِمَا تَعْمَلُوْنَ خَبِیْرٌ)
এখানে আল্লাহ তা‘আলা মু’মিনদেরকে মজলিসের আদব শিক্ষা দিচ্ছেন এবং জ্ঞানীদের মর্যাদার কথা বর্ণনা করছেন।
যখন মু’মিনরা কোন মজলিসে একত্রিত হবে তখন যদি আগত লোকদের জন্য মজলিসে জায়গা করে দেওয়ার প্রয়োজন হয় তাহলে নড়েচড়ে বসে মজলিসে জায়গা করে দেবে। কেননা আগত লোকজন এসে দাঁড়িয়ে থাকবে বা কোন বসা লোককে উঠিয়ে দিয়ে বসতে হবে এমন যেন না হয়। কারণ এ দুটিই আদবের খেলাফ। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, কোন ব্যক্তি যেন অন্য কোন ব্যক্তিকে তার স্থান থেকে উঠিয়ে দিয়ে সেখানে না বসে। বরং মজলিসের জায়গাকে প্রশস্ত করে দাও। (সহীহ বুখারী হা. ৬২৬৯)
অন্যত্র তিনি বলেন : কোন ব্যক্তি তার জায়গা থেকে চলে গিয়ে ফিরে আসলে সে ব্যক্তি উক্ত জায়গার বেশি হকদার। (সহীহ মুসলিম হা. ২১৭৯)
আল্লাহ তা‘আলা এর প্রতিদানস্বরূপ তোমাদেরকে জান্নাতে অতীব প্রশস্ত স্থান দান করবেন। অথবা যেখানেই প্রশস্ততা কামনা করবে সেখানেই তিনি তা দান করবেন। যেমন বাড়িতে প্রশস্ততা, রুযীতে প্রশস্ততা এবং কবরে প্রশস্ততা ইত্যাদি।
(وَإِذَا قِيْلَ انْشُزُوْا)
‘যখন বলা হয়, তোমরা উঠে যাও’ অর্থাৎ জিহাদের জন্য, সালাতের অথবা কোন ভাল কাজের জন্য যেতে বলা হয়, তখন সত্বর উঠে চলে যাও। আব্দুর রহমান বিন জায়েদ বলেন : সাহাবায়ে কেরাম যখন রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নিকট আসতেন তখন প্রত্যেকেই চাইতেন যে, তিনি সবশেষে যাবেন। কখনো কখনো রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর প্রয়োজন থাকত; ফলে তাঁর জন্য এটা কষ্টকর হয়ে যেত। তাই নির্দেশ দেওয়া হল যখন চলে যেতে বলা হবে তখন যেন তারা চলে যায়।
যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন :
(وَإِنْ قِيْلَ لَكُمُ ارْجِعُوْا فَارْجِعُوْا هُوَ أَزْكٰي لَكُمْ ط وَاللّٰهُ بِمَا تَعْمَلُوْنَ عَلِيْمٌ)
“যদি তোমাদেরকে বলা হয়, ‘ফিরে যাও’, তবে তোমরা ফিরে যাবে, এটাই তোমাদের জন্য উত্তম এবং তোমরা যা কর সে সম্বন্ধে আল্লাহ সবিশেষ অবহিত।” (সূরা নূর ২৪ : ২৮)
( يَرْفَعِ اللّٰهُ الَّذِيْنَ اٰمَنُوْا مِنْكُمْ لا وَالَّذِيْنَ أُوْتُوا الْعِلْمَ دَرَجٰتٍ)
অর্থাৎ ঈমানদারদের মর্যাদা বেঈমানদারদের ওপর এবং (ঈমানদার) শিক্ষিতদের মর্যাদা অশিক্ষিত সাধারণ ঈমানদারদের থেকে অনেক বেশি। ঈমানদার আলেমদেরকে আখিরাতে নেকী অনেক বেশি দেওয়া হবে আর দুনিয়াতে অনেক মর্যাদা দেওয়া হবে। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন : আলেমের মর্যাদা ইবাদতকারীর ওপর তেমন যেমন পূর্ণিমার রাতের চাঁদের মর্যাদা সমস্ত তারকার ওপর। (আবূ দাঊদ হা. ৩৬৪১)
অন্যত্র নাবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন :
الْعُلَمَاءُ وَرَثَةُ الْأَنْبِيَاءِ
আলেমরাই নাবীদের ওয়ারিশ। এছাড়া আলেমদের মর্যাদা সম্পর্কে অনেক সহীহ হাদীস রয়েছে।
(یٰٓاَیُّھَا الَّذِیْنَ اٰمَنُوْٓا اِذَا نَاجَیْتُمُ الرَّسُوْلَ..... وَاَطْھَرُﺚ فَاِنْ لَّمْ تَجِدُوْا فَاِنَّ اللہَ غَفُوْرٌ رَّحِیْمٌ)
নাবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সাথে প্রত্যেক মু’মিন নির্জনে কথা বলার আশা করত। কিন্তু সবার সাথে নির্জনে কথা বলার সুযোগ দেওয়া তো একা নাবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর পক্ষে সম্ভব নয়। আবার কেউ কেউ বলেছেন : অনেক মুনাফিকরা নাবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সাথে চুপিচুপি কথা বলতে গিয়ে সময় নষ্ট করত। এ জন্য আল্লাহ তা‘আলা নির্দেশ জারী করে দিলেন যে, যারাই নাবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সাথে নির্জনে কথা বলতে চাইবে তারাই যেন সদকা প্রদান করে। এটা তাদের জন্য উত্তম অর্থাৎ সদকাহ প্রদান করে কথা বলা। কেননা এর মাধ্যমে তাদের অনেক কল্যাণ হাসিল হবে। কিন্তু এ নির্দেশ সাহাবীদের জন্য কষ্টকর হয়ে গেলে আল্লাহ তা‘আলা বিধানটি হালকা করে দিলেন। তাই পরবর্তী আয়াতটি পূর্ববর্তী আয়াতকে রহিত করে দিয়েছে। (ইবনু কাসীর)
ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন : মুসলিমরা রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে বেশি বেশি জিজ্ঞাসাবাদ করত, এমনকি রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে মুশকিলে নিপতিত করত। আল্লাহ তা‘আলা চাইলেন এ সমস্যা থেকে নাবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে উত্তরণ করতে, তাই তিনি পরবর্তী আয়াত নাযিল করলেন (কুরতুবী)। এছাড়াও এ সম্পর্কে আরো বর্ণনা রয়েছে।
আল্লামা সা‘দী (রহঃ) বলেন : আয়াতটি রহিত হয়নি, বরং নাবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সম্মানার্থে হুকুমটি বলবৎ আছে। তবে কেউ সদকাহ না দিলে আল্লাহ পাকড়াও করবেন না। (তাফসীর সা‘দী)
তাই ফরয সালাত, যাকাত ও আল্লাহ তা‘আলা ও রাসূলের আনুগত্য করলেই সদকার পরিবর্তে যথেষ্ট হয়ে যাবে।
আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয় :
১. মাজলিসের আদব জানতে পারলাম।
২. আলেমদের মর্যাদা সাধারণ লোকদের থেকে অনেক বেশি যদি সেই আলেম ইলম অনুযায়ী আমল করে।
৩. ইসলামী শরীয়তের আদেশ-নিষেধের হিকমত জানতে পারলাম।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: ১২-১৩ নং আয়াতের তাফসীর:
আল্লাহ্ তা'আলা মুমিনদেরকে নির্দেশ দিচ্ছেন যে, যখন তারা রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর সাথে চুপি-চুপি কথা বলতে চাইবে তখন যেন কথা বলার পূর্বে তাঁর পথে সাদকা প্রদান করে, যাতে তাদের অন্তর পবিত্র হয় এবং তোমরা তাঁর নবী (সঃ)-এর সাথে পরামর্শ করার যোগ্য হতে পার। হ্যাঁ, তবে যদি কেউ দরিদ্র হয় তাহলে তার প্রতি আল্লাহ তা'আলার দয়া ও ক্ষমা রয়েছে। অর্থাৎ তার উপর এ হুকুম প্রযোজ্য নয়। এ হুকুম শুধুমাত্র ধনীদের উপর প্রযোজ্য।
এরপর আল্লাহ্ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলেনঃ তোমরা কি চুপে-চুপে কথা বলার পূর্বে সাদকা প্রদানকে কষ্টকর মনে কর এবং ভয় কর যে, এই নির্দেশ কত দিনের জন্যে রয়েছে? যাক, তোমরা যদি এই সাদকা প্রদানকে কষ্টকর ও অসুবিধাজনক মনে করে থাকো তবে তোমাদেরকে এজন্যে কোন চিন্তা করতে হবে না। আল্লাহ্ তোমাদের প্রতি অত্যন্ত ক্ষমাশীল ও দয়ালু। তিনি তোমাদেরকে ক্ষমা করে দিলেন। এখন আর তোমাদেরকে এ জন্যে সাদকা প্রদান করতে হবে না। এখন তোমরা নামায সুপ্রতিষ্ঠিত কর, যাকাত দিতে থাকো এবং আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর আনুগত্য কর।
কথিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর সাথে গোপন পরামর্শ করার পূর্বে সাদকা প্রদান করার গৌরব শুধুমাত্র হযরত আলী (রাঃ)-ই লাভ করেন। তারপর এ হুকুম উঠে যায়। এক দীনার (স্বর্ণমুদ্রা) সাদকা করে তিনি রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর সাথে চুপি-চুপি কথা বলেন। তিনি তাঁকে দশটি মাসআলা জিজ্ঞেস করেন। অতঃপর এ হুকুম রহিত হয়ে যায়। হযরত আলী (রাঃ) হতেও এ ঘটনাটি বিস্তারিতভাবে বর্ণিত আছে। তিনি বলেনঃ “এই আয়াতের উপর না কেউ আমার পূর্বে আমল করেছে না পরে কেউ আমল করতে পেরেছে। আমার কাছে একটি মাত্র দীনার ছিল। আমি ওটাকে ভাঙ্গিয়ে দশ দিরহাম পাই। এ দিরহাম আমি আল্লাহর নামে কোন একজন মিসকীনকে দান করি। তারপর আমি রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর খিদমতে হাযির হয়ে তাঁর সাথে চুপে-চুপে কথা বলি। তারপর এ হুকুম উঠে যায়। সুতরাং আমার পূর্বেও কেউ এ আয়াতের উপর আমল করেনি এবং পরেও কেউ আমল করতে পারেনি।” অতঃপর তিনি (আরবী)-এ আয়াতটি পাঠ করেন।
হযরত আলী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) তাকে জিজ্ঞেস করেনঃ “সাদকার পরিমাণ কি এক দীনার নির্ধারণ করা উচিত?” হযরত আলী (রাঃ) উত্তরে বলেনঃ “এটা তো খুব বেশী হয়ে যাবে।” তিনি বললেনঃ “তাহলে অর্ধ দীনার?” তিনি জবাব দেনঃ “প্রত্যেকের এটাও আদায় করার ক্ষমতা নেই।” তখন রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বললেনঃ “আচ্ছা, তাহলে কত নির্ধারণ করতে হবে তুমিই বল?” তিনি বললেনঃ “এক যব বরাবর সোনা নির্ধারণ করা হোক।” তার এ কথা শুনে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) খুশী হয়ে বললেনঃ “বাঃ বাঃ! তুমি তো একজন সাধক ব্যক্তি।” হযরত আলী (রাঃ) বলেনঃ “সুতরাং আমারই কারণে আল্লাহ্ তা'আলা এই উম্মতের উপর (কাজ) সহজ ও হালকা করে দেন।” (এ হাদীসটি ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন। জামে তিরমিযীতেও এটা বর্ণিত হয়েছে এবং ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে হাসান গারীব বলেছেন)
হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, মুসলমানরা বরাবরই রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর সাথে চুপি-চুপি কথা বলার পূর্বে সাদকা করতো। কিন্তু যাকাত ফরয হওয়ার পর এ হুকুম উঠে যায়। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, সাহাবীগণ (রাঃ) রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-কে খুব বেশী বেশী প্রশ্ন করতে শুরু করেন, ফলে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর উপর তা কঠিন বোধ হয়। তখন আল্লাহ্ তাবারাকা ওয়া তা'আলা পুনরায় এ হুকুম জারী করেন। ফলে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর উপর হালকা হয়ে যায়। কেননা, এরপর জনগণ প্রশ্ন করা ছেড়ে দেয়। অতঃপর পুনরায় আল্লাহ্ তা'আলা মুসলমানদের উপর প্রশস্ততা আনয়ন করেন এবং এ হুকুম রহিত করে দেন। হযরত ইকরামা (রাঃ) ও হযরত হাসান বসরীরও (রঃ) উক্তি এটাই যে, এ হুকুম রহিত হয়ে যায়। হযরত কাতাদাহ্ (রঃ) ও হযরত মুকাতিলও (রঃ) এ কথাই বলেন। হযরত কাতাদাহ (রঃ) বলেন যে, শুধু দিনের কয়েক ঘন্টা পর্যন্ত এ হুকুম বাকী থাকে। হযরত আলীও (রাঃ) এ কথাই বলেন যে, এই হুকুমের উপর শুধু আমিই আমল করতে সক্ষম হই এবং এ হুকুম নাযিল হওয়ার পর খুব অল্প সময়ের জন্যেই এটা বাকী থাকে, অতঃপর এটা মানসূখ হয়ে যায়।
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।