আল কুরআন


সূরা আল-মুজাদালা (আয়াত: 1)

সূরা আল-মুজাদালা (আয়াত: 1)



হরকত ছাড়া:

قد سمع الله قول التي تجادلك في زوجها وتشتكي إلى الله والله يسمع تحاوركما إن الله سميع بصير ﴿١﴾




হরকত সহ:

قَدْ سَمِعَ اللّٰهُ قَوْلَ الَّتِیْ تُجَادِلُکَ فِیْ زَوْجِهَا وَ تَشْتَکِیْۤ اِلَی اللّٰهِ ٭ۖ وَ اللّٰهُ یَسْمَعُ تَحَاوُرَکُمَا ؕ اِنَّ اللّٰهَ سَمِیْعٌۢ بَصِیْرٌ ﴿۱﴾




উচ্চারণ: কাদ ছামি‘আল্লা-হু কাওলাল্লাতী তুজা-দিলুকা ফী যাওজিহা-ওয়া তাশতাকীইলাল্লা-হি ওয়াল্লা-হু ইয়াছমা‘উ তাহা-উরাকুমা- ইন্নাল্লা-হা ছামী‘উম বাসীর।




আল বায়ান: আল্লাহ অবশ্যই সে রমনীর কথা শুনেছেন যে তার স্বামীর ব্যাপারে তোমার সাথে বাদানুবাদ করছিল আর আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ করছিল। আল্লাহ তোমাদের কথোপকথন শোনেন। নিশ্চয় আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা।




আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ১. আল্লাহ অবশ্যই শুনেছেন সে নারীর কথা; যে তার স্বামীর বিষয়ে আপনার সাথে বাদানুবাদ করছে এবং আল্লাহর কাছেও ফরিয়াদ করছে। আল্লাহ তোমাদের কথোপকথন শুনেন; নিশ্চয় আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বদ্ৰষ্টা।(১)




তাইসীরুল ক্বুরআন: আল্লাহ তার কথা শুনেছেন যে নারী (খাওলাহ বিনত সা‘লাবাহ) তার স্বামীর বিষয়ে তোমার সাথে বাদানুবাদ করছে আর আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ জানাচ্ছে, আল্লাহ তোমাদের দু’জনের কথা শুনছেন, আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা।




আহসানুল বায়ান: (১) (হে রসূল!) অবশ্যই আল্লাহ শুনেছেন সেই নারীর কথা, যে তার স্বামীর বিষয়ে তোমার সাথে বাদানুবাদ করছে এবং আল্লাহর নিকট ফরিয়াদ করছে। আল্লাহ তোমাদের কথোপকথন শুনেন।[1] নিশ্চয় আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা।



মুজিবুর রহমান: (হে রাসূল) আল্লাহ শুনেছেন সেই নারীর কথা যে তার স্বামীর বিষয়ে তোমার সাথে বাদানুবাদ করেছে এবং আল্লাহর নিকট ফরিয়াদ করেছে। আল্লাহ তোমাদের কথোপকথন শোনেন; আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা।



ফযলুর রহমান: যে মহিলা (খাওলাহ বিনতে ছাজ্ঞলাবাহ) তার স্বামী (আওস ইবনে ছামিত) সম্বন্ধে তোমার সাথে বাদানুবাদ করছে এবং আল্লাহর কাছে অভিযোগ পেশ করছে, আল্লাহ তার কথা শুনেছেন। আল্লাহ তোমাদের দুজনের কথাবার্তাই শুনছেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ সবকিছু শোনেন, সবকিছু দেখেন।



মুহিউদ্দিন খান: যে নারী তার স্বামীর বিষয়ে আপনার সাথে বাদানুবাদ করছে এবং অভিযোগ পেশ করছে আল্লাহর দরবারে, আল্লাহ তার কথা শুনেছেন। আল্লাহ আপনাদের উভয়ের কথাবার্তা শুনেন। নিশ্চয় আল্লাহ সবকিছু শুনেন, সবকিছু দেখেন।



জহুরুল হক: আল্লাহ্ আলবৎ তার কথা শুনেছেন যে তার স্বামী সন্বন্ধে তোমার কাছে অনুযোগ করছে আর আল্লাহ্‌র নিকট ফরিয়াদ করছে, আর আল্লাহ্ তোমাদের দুজনের কথোপকথন শুনেছেন। নিশ্চয় আল্লাহ্ সর্বশ্রোতা, সম্যক দ্রষ্টা।



Sahih International: Certainly has Allah heard the speech of the one who argues with you, [O Muhammad], concerning her husband and directs her complaint to Allah. And Allah hears your dialogue; indeed, Allah is Hearing and Seeing.



তাফসীরে যাকারিয়া

অনুবাদ: ১. আল্লাহ অবশ্যই শুনেছেন সে নারীর কথা; যে তার স্বামীর বিষয়ে আপনার সাথে বাদানুবাদ করছে এবং আল্লাহর কাছেও ফরিয়াদ করছে। আল্লাহ তোমাদের কথোপকথন শুনেন; নিশ্চয় আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বদ্ৰষ্টা।(১)


তাফসীর:

(১) শরীআতের পরিভাষায় এই বিশেষ মাসআলাটিকে ‘যিহার’ বলা হয়। এই সূরার প্রাথমিক আয়াতসমূহে যিহারের শরীআতসম্মত বিধান বর্ণনা করা হয়েছে। এতে আল্লাহ তা’আলা খাওলা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহার ফরিয়াদ শুনে তার জন্য তার সমস্যা সমাধান করে দিয়েছেন। তার খাতিরে আল্লাহ তা'আলা পবিত্র কুরআনে এসব আয়াত নাযিল করেছেন। আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেনঃ সেই সত্তা পবিত্র, যার শোনা সবকিছুকে শামিল করে। যিনি সব আওয়ায ও প্রত্যেকের ফরিয়াদ শুনেন; খাওলা বিনতে সালাবাহ যখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছে তার স্বামীর ব্যাপারে অভিযোগ করছিল, তখন আমি সেখানে উপস্থিত ছিলাম। কিন্তু এত নিকটে থাকা সত্বেও আমি তার কোনো কোনো কথা শুনতে পারিনি। অথচ আল্লাহ তা’আলা সব শুনেছেন এবং বলেছেনঃ (قَدْ سَمِعَ اللَّهُ قَوْلَ الَّتِي تُجَادِلُكَ فِي زَوْجِهَا وَتَشْتَكِي إِلَى اللَّهِ وَاللَّهُ) [বুখারী: ৭৩৮৫, নাসায়ী: ৩৪৬০]।

তাই সাহাবায়ে কেরাম এই মহিলার প্রতি অত্যন্ত সম্মান প্রদর্শন করতেন। একদিন খলীফা ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু একদল লোকের সাথে গমনরত ছিলেন। পথিমধ্যে এই মহিলা সামনে এসে দণ্ডায়মান হলে তিনি দাঁড়িয়ে তার কথাবার্তা শুনলেন। কেউ কেউ বললঃ আপনি এই বৃদ্ধার খাতিরে এতবড় দলকে পথে আটকিয়ে রাখলেন। খলিফা বললেনঃ জান ইনি কে? এ সেই মহিলা, যার কথা আল্লাহ তা’আলা সপ্ত আকাশের উপরে শুনেছেন। অতএব, আমি কি তার কথা এড়িয়ে যেতে পারি? আল্লাহর কসম, তিনি যদি স্বেচ্ছায় প্রস্থান না করতেন, তবে আমি রাত্রি পর্যন্ত তার সাথে এখানেই দাঁড়িয়ে থাকতাম। [ইবনে কাসীর]


তাফসীরে আহসানুল বায়ান

অনুবাদ: (১) (হে রসূল!) অবশ্যই আল্লাহ শুনেছেন সেই নারীর কথা, যে তার স্বামীর বিষয়ে তোমার সাথে বাদানুবাদ করছে এবং আল্লাহর নিকট ফরিয়াদ করছে। আল্লাহ তোমাদের কথোপকথন শুনেন।[1] নিশ্চয় আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা।


তাফসীর:

[1] এখানে খাওলা বিনতে মালেক বিন সা’লাবা (রাঃ) র ঘটনার প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে। তাঁর স্বামী তাঁর সাথে ‘যিহার’ করেছিল। ‘যিহার’ মানে স্ত্রীকে এই বলা যে, ‘তুমি আমার কাছে আমার মায়ের পিঠের মত।’ জাহেলী যুগে যিহারকে তালাক গণ্য করা হত। সুতরাং খাওলা (রাঃ)  বড়ই অস্থির হয়ে পড়েন। আর তখন যিহারের ব্যাপারে কোন বিধান অবতীর্ণ হয়নি। ফলে তিনি রসূল (সাঃ)-এর কাছে এলেন। তিনিও এ ব্যাপারে একটু নীরবতা অবলম্বন করলেন এবং খাওলা (রাঃ)  তাঁর সাথে বাদানুবাদ করেই যাচ্ছিলেন। ঠিক এ সময়ই এই আয়াতগুলো নাযিল হয়। এতে যিহারের মাসআলা, তার বিধান এবং তার কাফফারার কথা বর্ণনা করে দেওয়া হয়েছে। (আবূ দাউদ তালাক অধ্যায়ঃ যিহার পরিচ্ছেদ) আয়েশা (রাঃ)  বলেন, মহান আল্লাহ কিভাবে মানুষের কথা শুনে থাকেন যে, একটি মহিলা রসূল (সাঃ)-এর সাথে বাদানুবাদ করছিল এবং তাঁর স্বামীর বিরুদ্ধে অভিযোগ পেশ করছিল। আমি তার কথা শুনতে পাইনি, কিন্তু মহান আল্লাহ সাত আসমানের উপর থেকে তার কথা শুনে নিয়েছেন। (ইবনে মাজাহঃ ভূমিকা, বুখারীতেও বিনা সনদে সংক্ষিপ্তভাবে তাওহীদ অধ্যায়ে এ বর্ণনা রয়েছে)


তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ


তাফসীর: নামকরণ :



الْمُجَادَلَةُ শব্দটি ক্রিয়ামূল। শব্দের অর্থ হল : বাদানুবাদ করা, কথা কাটাকাটি করা। এ সূরার প্রথম আয়াতে উক্ত ক্রিয়ামূলের উল্লিখিত ক্রিয়া تجادلك থেকে সূরার নামকরণ করা হয়েছে।



সূরার শুরুর দিকে যিহারের বিধান ও কাফফারা, যারা আল্লাহ তা‘আলা ও রাসূলের বিরুদ্ধাচরণ করে তাদের দুনিয়া ও আখেরাতের অবস্থা সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। তারপর বলা হয়েছে যারা ইসলামের শত্রু তারা ইসলাম ও মুসলিমদের বিরুদ্ধে পরস্পর গোপন পরামর্শ করে থাকে, তাদের এ ব্যাপারে ভীতি প্রদর্শন করে মু’মিনদেরকে দীনী বিষয়ে পরামর্শ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অতঃপর মজলিস ও রাসূলের সাথে মুআমালাতের আদবের বিবরণ তুলে ধরা হয়েছে। সবশেষে বলা হয়েছে যারা মুনাফিক তারাই ইসলামের শত্রুদের সাথে সম্পর্ক রাখে, মু’মিনরা কখনো ইসলামের শত্রুদের সাথে সম্পর্ক রাখে না, যদিও তারা নিকটাত্মীয় হয়।



শানে নুযূল :



উম্মুল মু’মিনীন আয়িশাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত তিনি বলেন : বরকতময় সে আল্লাহ যার শ্রবণশক্তি সবকিছু বেষ্টন করে নিয়েছে। আমি খাওলা বিনতু সা‘লাবাহর কথা শুনতে ছিলাম। তবে কিছু কিছু আমার কাছে অস্পষ্ট ছিল (একই রুমে ছিলাম তবুও ফিসফিস করে বলার কারণে শুনতে পাইনি) কিন্তু আল্লাহ তা‘আলা সাত আকাশের ওপর থেকে শুনে নিলেন। সে মহিলা রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নিকট তার স্বামীর ব্যাপারে অভিযোগ করে বলছে : হে আল্লাহর রাসূল! আমার স্বামী আমার সম্পদ খেয়ে ফেলেছে, আমার জীবন তার সাথেই কেটেছে। এখন আমি বুড়ি হয়ে গেছি, আমার সন্তান জন্ম দানের ক্ষমতা লোপ পেয়েছে, এমতাবস্থায় আমার স্বামী আমার সাথে যিহার করেছে, হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে অভিযোগ পেশ করছি। আয়িশাহ (রাঃ) বললেন : একটু পরে জিবরীল (আঃ) (قَدْ سَمِعَ اللّٰهُ قَوْلَ الَّتِيْ تُجَادِلُكَ) আয়াত নিয়ে অবতরণ করেন। তার স্বামীর নাম আউস বিন সামেত। (ইবনু মাযাহ হা. ১৮৮, ২০৬৩, নাসায়ী হা. ৩৪৬০, ইমাম বুখারী কিতাবুত তাওহীদে সনদ ছাড়া নিয়ে এসেছেন)।



একদা উমার (রাঃ) এ মহিলার পাশ দিয়ে অতিক্রম করে যাচ্ছিলেন, সাথে সাহাবীরাও ছিলেন। তখন এ মহিলা উমার (রাঃ)-কে দীর্ঘ সময় দাঁড় করিয়ে কথা বলতে লাগলেন এবং অনেক নসীহত করলেন এবং বললেন : হে উমার! তোমাকে মানুষ উমাইর (ছোট উমার অর্থাৎ অল্প বয়সের ছেলে) বলে ডাকত, তারপর মানুষ উমার বলে ডাকতে লাগল, অতঃপর এখন মানুষ তোমাকে আমীরুল মু’মিনীন বলে ডাকে। হে উমার! তুমি আল্লাহ তা‘আলাকে ভয় কর। কারণ যে ব্যক্তি জানে মৃত্যু অবধারিত তার মাঝে দুনিয়া ছেড়ে যাওয়ার ভয় বিদ্যমান থাকে, যে ব্যক্তি বিশ্বাস করে তাকে হিসাব দিতে হবে সে আযাবকে ভয় করে। উমার (রাঃ) দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে এসব কথা শুনছিলেন। মানুষ উমার (রাঃ)-কে বলল : হে আমীরুল মু’মিনীন! এ জায়গায় একজন বৃদ্ধা মহিলার জন্য দাঁড়িয়ে আছেন? তিনি বললেন : এ মহিলা যদি দিনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত আমাকে দাঁড় করিয়ে রাখে আমি ফরয সালাতের সময় বাদে তার জন্য দাঁড়িয়ে থাকব। তোমরা কি জান কে এ বৃদ্ধা মহিলা? তিনি হচ্ছেন খাওলা বিনতে ছা‘লাবাহ, যার কথা আল্লাহ তা‘আলা সাত আকাশের ওপর থেকে শুনেছেন। আল্লাহ তা‘আলা তার কথা শুনবেন আর আমি তার কথা শুনব না? (তাফসীর কুরতুবী)



১-৪ নম্বর আয়াতের তাফসীর :



আলোচ্য আয়াতগুলোতে যিহারের বিধান ও পদ্ধতি এবং কাফফারা সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। যিহার হল স্ত্রীকে বা স্ত্রীর কোন অঙ্গকে যাদের সাথে বিবাহ হারাম তাদের সাথে তুলনা করা। (সহীহ ফিকহুস সুন্নাহ ৩/৩৬৯)



মূলত যিহার হল স্বামী তার স্ত্রীকে বলবে : তুমি আমার মায়ের পিঠের মত, কেননা যিহার শব্দটি যহরুন থেকে গৃহীত যার অর্থ পিঠ। তাই অনেক মনীষী বলেছেন : স্ত্রীকে মায়ের পিঠের সাথে তুলনা করলেই যিহার হবে অন্যথায় হবে না। সঠিক কথা হল যেকোন মাহরাম মহিলার যে কোন অঙ্গের সাথে তুলনা করলেই যিহার হবে। যিহারের হুকুম হল যদি কেউ তার স্ত্রীর সাথে যিহার করে তাহলে কাফফারা না দেওয়া পর্যন্ত স্ত্রীর সাথে সহবাস করা তার জন্য হারাম হয়ে যাবে। যিহারের কাফফারা ৩-৪ নম্বর আয়াতে উল্লেখ রয়েছে। শুধু কাফফারা দিলেই হবে না সাথে সাথে মৌখিকবভাবে উক্ত কথা প্রত্যাহার করে নিতে হবে। কারণ আল্লাহ তা‘আলা বলছেন ‘পরে তারা ফিরে আসে যা তারা বলেছে’। এ সম্পর্কে সূরা আহযাবের শুরুতে আলোচনা করা হয়েছে।



(مَّا هُنَّ أُمَّهٰتِهِمْ ط إِنْ أُمَّهٰتُهُمْ إِلَّا الّٰـ۬ئِيْ وَلَدْنَهُمْ)



‘তাদের স্ত্রীগণ তাদের মাতা নয়। তাদের মাতা তো কেবল তারাই যারা তাদেরকে জন্মদান করেছেন।’ অর্থাৎ স্ত্রীকে মায়ের মাথে তুলনা করলেই স্ত্রী মা হয়ে যায় না, বরং কেবল জন্মদাতাই মা।



(مُنْكَرًا مِّنَ الْقَوْلِ وَزُوْرًا)



‘তারা তো একটি অসঙ্গত ও মিথ্যা কথাই বলছে’ অর্থাৎ স্ত্রীকে মায়ের সাথে তুলনা করা একটি খারাপ ও মিথ্যা কথা, যা বলা কখনো সঙ্গত নয়। সুতরাং এরূপ কথা ও আচরণ থেকে মু’মিনরা সতর্ক ও বিরত থাকবে।



(مِّنْ قَبْلِ أَنْ يَّتَمَآسَّا)



‘একে অপরকে স্পর্শ করার পূর্বে’ এখানে স্পর্শ করার অর্থ হল সহবাস করা। অর্থাৎ সহবাসের পূর্বে যিহারের কাফফারা আদায় করতে হবে। কেউ কাফফারা আদায়ের পূর্বে সহবাস করে ফেললে সে ব্যক্তি গুনাহগার হবে ও আল্লাহ তা‘আলার নির্দেশের অবাধ্য হবে, তাকে অবশ্যই তাওবা করতে হবে, তবে কাফফারা মাফ হবে না।



আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয় :



১. আল্লাহ তা‘আলা মানুষের উচুঁ স্বরের ও নীচু স্বরেরসহ সকল কথা শুনতে পান এমনকি তিনি অন্তর্যামী।

২. বান্দার প্রতি আল্লাহ তা‘আলার অনুগ্রহ। তিনি মহিলা সাহাবীর অভিযোগ শুনলেন এবং সুন্দর সুষ্ঠু সমাধান দিলেন আর বিধানটি সকলের জন্য প্রযোজ্য করে দিলেন।

৩. যিহার শুধু স্ত্রীর সাথে হয়, অন্য কোন নারীর সাথে হয় না।

৪. যদি স্ত্রীকে মা অথবা এমন কোন নারীর অঙ্গের সাথে তুলনা করা হয় যার সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়া হারাম তাহলে যিহার বলে গণ্য হবে।

৫. স্ত্রীকে মাহরাম নারীদের সম্বোধনে ডাকা নিষেধ। যেমন স্ত্রীকে এরূপ বলা যে, হে আমার মা, হে আমার বোন ইত্যাদি।

৬. স্ত্রীর সাথে সহবাস করার পূর্বেই উল্লিখিত তিনটির কোন একটি কাফফারা প্রদান করা ওয়াজিব।

৭. কেউ যিহারের কাফফারাস্বরূপ মিসকীনকে খাওয়াতে চাইলে অবশ্যই ষাট জন মিসকিনকে খাওয়াতে হবে। ষাট জনের খাবার একত্রিত করে একজন বা একাধিক জনকে দিলে শরীয়ত সিদ্ধ হবে না। (তাফসীর সা‘দী)।


তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)


তাফসীর: হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “সমস্ত প্রশংসা আল্লাহরই জন্যে যাঁর শ্রবণশক্তি সমস্ত শব্দকে পরিবেষ্টন করে রেখেছে। এই বাদানুবাদকারিণী মহিলাটি এসে নবী (সঃ)-এর সাথে এতো চুপে চুপে কথা বলতে শুরু করে যে, আমি ঐ ঘরেই থাকা সত্ত্বেও মোটেই শুনতে পাইনি যে, সে কি বলছে! কিন্তু আল্লাহ্ তা'আলা ঐ গুপ্ত কথাও শুনে নেন এবং এই আয়াত অবতীর্ণ করেন।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ), ইমাম বুখারী (রঃ), ইমাম নাসাঈ (রঃ), ইমাম ইবনে
মাজাহ (রঃ), ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) এবং ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন)

মুসনাদে ইবনে আবি হাতিমে হাদীসটি নিম্নরূপে বর্ণিত আছেঃ

হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেনঃ “আল্লাহ্ কল্যাণময় যিনি উঁচু-নীচু সব শব্দই শুনেন। এই অভিযোগকারিণী মহিলাটি ছিল হযরত খাওলা বিনতে সা’লাবাহ (রাঃ)। যখন সে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর নিকট হাযির হয় তখন এতো ফিসফিস করে কথা বলে যে, তার কোন কোন শব্দ আমার কানে আসছিল বটে, কিন্তু অধিকাংশ কথাই আমার কানেও পৌছেনি। অথচ আমি ঐ ঘরেই বিদ্যমান ছিলাম। সে তার স্বামীর বিরুদ্ধে অভিযোগ করে বলেঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমার যৌবন তো তার সাথেই কেটেছে। এখন আমি বুড়ি হয়ে গেছি এবং আমার সন্তান জন্মদানের যোগ্যতা লোপ পেয়েছে, এমতাবস্থায় আমার স্বামী আমার সাথে যিহার [যাহেলী যুগে আরব সমাজে যদি কোন লোক তার স্ত্রীকে (আরবী) (তুমি আমার জন্যে আমার মাতার পৃষ্ঠ সদৃশ) এ কথা বলতো তাহলে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে
যেতো। এভাবে বিবাহ বন্ধন ছিন্ন করাকে যিহার বলে] করেছে। হে আল্লাহ! আমি আপনার সামনে দুঃখের কান্না কাঁদছি।” তখনো মহিলাটি ঘর হতে বের হয়নি ইতিমধ্যেই হযরত জিবরাঈল (আঃ) আয়াত নিয়ে অবতীর্ণ হন। তার স্বামীর নাম ছিল হযরত আউস ইবনে সামিত (রাঃ)।

কখনো কখনো তার মাথা খারাপ হয়ে যেতো, ঐ সময় তিনি তাঁর স্ত্রীর সাথে যিহার করে ফেলতেন। তারপর যখন জ্ঞান ফিরে আসতো তখন এমন হতেন যে, যেন কিছুই হয়নি। তার স্ত্রী রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট ফতওয়া নিতে এবং আল্লাহ্ তা'আলার নিকট আবেদন জানাতে আসলে আল্লাহ্ তা'আলা এই আয়াত অবতীর্ণ করেন।

হযরত যায়েদ (রাঃ) বলেন যে, হযরত উমার (রাঃ) তাঁর খিলাফতের আমলে লোকদের সাথে পথ চলছিলেন, পথে একটি মহিলার সাথে সাক্ষাৎ হয়। মহিলাটি তাকে ডেকে থামতে বলে। হযরত উমার (রাঃ) তৎক্ষণাৎ থেমে যান এবং মহিলাটির কাছে গিয়ে আদব ও মনোযোগের সাথে মাথা ঝুঁকিয়ে দিয়ে তার কথা শুনতে থাকেন। নিজের ফরমায়েশ মুতাবেক কাজ করিয়ে নিয়ে মহিলাটি ফিরে যায় এবং হযরত উমার (রাঃ) তার লোকদের কাছে ফিরে আসেন। তখন একটি লোক বলে ওঠেঃ “হে আমীরুল মুমিনীন! একটি বৃদ্ধা মহিলার কথায় আপনি থেমে গেলেন এবং আপনার কারণে এতোগুলো লোককে এতক্ষণ ধরে অপেক্ষা করতে হলো।” একথা শুনে হযরত উমার (রাঃ) বললেনঃ “আফসোস! এই মহিলাটি কে তা কি তুমি জান?” উত্তরে লোকটি বলেঃ “জ্বী, না। তখন তিনি বলেনঃ “ইনি ঐ মহিলা যার আবেদন আল্লাহ্ তা'আলা সপ্তম আকাশের উপর হতে শুনেন। ইনি হলেন হযরত খাওলা বিনতে সা'লাবাহ (রাঃ)। যদি তিনি আজ সকাল হতে সন্ধ্যা পর্যন্ত, এমনকি কিছু রাত্রি পর্যন্তও কথা বলতে থাকতেন তবুও আমি তার খিদমত হতে সরতাম না। হ্যাঁ, তবে নামাযের সময় নামায আদায় করতাম এবং তারপর আজ্ঞাবহ রূপে তাঁর খিদমতে হাযির হয়ে যেতাম।” (এ হাদীসটির সনদ ছেদকাটা। তবে অন্য ধারাতেও এটা বর্ণিত আছে)

অন্য একটি রিওয়াইয়াতে আছে যে, মহিলাটি ছিলেন খাওলা বিনতে সামিত (রাঃ) এবং তাঁর মাতার নাম ছিল মুআযাহ্ (রাঃ), যার ব্যাপারে (আরবী) (২৪:৩৩) এই আয়াতটি অবতীর্ণ হয়েছিল। কিন্তু সঠিক কথা এটাই যে, মহিলাটি ছিলেন আউস ইবনে সামিত (রাঃ)-এর স্ত্রী খাওলা (রাঃ)।





সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।