সূরা আল-হাদীদ (আয়াত: 25)
হরকত ছাড়া:
لقد أرسلنا رسلنا بالبينات وأنزلنا معهم الكتاب والميزان ليقوم الناس بالقسط وأنزلنا الحديد فيه بأس شديد ومنافع للناس وليعلم الله من ينصره ورسله بالغيب إن الله قوي عزيز ﴿٢٥﴾
হরকত সহ:
لَقَدْ اَرْسَلْنَا رُسُلَنَا بِالْبَیِّنٰتِ وَ اَنْزَلْنَا مَعَهُمُ الْکِتٰبَ وَ الْمِیْزَانَ لِیَقُوْمَ النَّاسُ بِالْقِسْطِ ۚ وَ اَنْزَلْنَا الْحَدِیْدَ فِیْهِ بَاْسٌ شَدِیْدٌ وَّ مَنَافِعُ لِلنَّاسِ وَ لِیَعْلَمَ اللّٰهُ مَنْ یَّنْصُرُهٗ وَ رُسُلَهٗ بِالْغَیْبِ ؕ اِنَّ اللّٰهَ قَوِیٌّ عَزِیْزٌ ﴿۲۵﴾
উচ্চারণ: লাকাদ আরছালনা-রুছুলানা-বিলবাইয়িনা-তি ওয়া আনযালনা-মা‘আহুমুল কিতা-বা ওয়াল মীযা-না লিইয়াকূমান্না-ছুবিলকিছতি ওয়া আনযালনাল হাদীদা ফীহি বা’ছুন শাদীদুওঁ ওয়া মানা-ফি‘উ লিন্না-ছি ওয়া লিইয়া‘লামাল্লা-হু মাইঁ ইয়ানসুরুহূওয়া রুছুলাহূবিলগাইবি ইন্নাল্লা-হা কাবিইয়ুন ‘আযীয।
আল বায়ান: নিশ্চয় আমি আমার রাসূলদেরকে স্পষ্ট প্রমাণাদিসহ পাঠিয়েছি এবং তাদের সাথে কিতাব ও (ন্যায়ের) মানদন্ড নাযিল করেছি, যাতে মানুষ সুবিচার প্রতিষ্ঠা করে। আমি আরো নাযিল করেছি লোহা, তাতে প্রচন্ড শক্তি ও মানুষের জন্য বহু কল্যাণ রয়েছে। আর যাতে আল্লাহ জেনে নিতে পারেন, কে না দেখেও তাঁকে ও তাঁর রাসূলদেরকে সাহায্য করে। অবশ্যই আল্লাহ মহাশক্তিধর, মহাপরাক্রমশালী।
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ২৫. অবশ্যই আমরা আমাদের রাসূলগনকে পাঠিয়েছি স্পষ্ট প্রমাণসহ(১) এবং তাদের সঙ্গে দিয়েছি কিতাব ও ন্যায়ের পাল্লা, যাতে মানুষ সুবিচার প্রতিষ্ঠা করে।(২) আমরা আরও নাযিলকরেছি লোহা যাতে রয়েছে প্রচণ্ড শক্তি এবং রয়েছে মানুষের জন্য বহুবিধা কল্যাণ।(৩) এটা এ জন্যে যে, আল্লাহ প্রকাশ করে দেন কে গায়েব অবস্থায়ও তাকে ও তাঁর রাসূলগণকে সাহায্য করে। নিশ্চয় আল্লাহ মহা শক্তিমান, পরাক্রমশালী।
তাইসীরুল ক্বুরআন: আমি আমার রসূলদেরকে সুস্পষ্ট প্রমাণসহ পাঠিয়েছি আর তাদের সঙ্গে অবতীর্ণ করেছি কিতাব ও (সত্য মিথ্যার) মানদন্ড যাতে মানুষ ইনসাফ ও সুবিচারের উপর প্রতিষ্ঠিত হতে পারে। আমি অবতীর্ণ করেছি লোহা যাতে আছে প্রচন্ড শক্তি আর মানুষের জন্য নানাবিধ উপকার যাতে আল্লাহ পরীক্ষা করতে পারেন আল্লাহকে না দেখেই তাঁকে আর তাঁর রসূলদেরকে কারা (এই লোহার শক্তি দিয়ে ও যাবতীয় উপায়ে) সাহায্য করে। আল্লাহ বড়ই শক্তিমান, মহাপরিক্রমশালী।
আহসানুল বায়ান: (২৫) নিশ্চয়ই আমি আমার রসূলদেরকে প্রেরণ করেছি স্পষ্ট প্রমাণসহ এবং তাদের সঙ্গে অবতীর্ণ করেছি কিতাব ও তুলাদন্ড (ন্যায়-নীতি);[1] যাতে মানুষ সুবিচার প্রতিষ্ঠা করে। আর আমি লোহা অবতীর্ণ করেছি;[2] যাতে রয়েছে প্রচন্ড শক্তি[3] ও রয়েছে মানুষের জন্য বহুবিধ কল্যাণ,[4] আর যাতে আল্লাহ জানতে পারেন যে, কে না দেখেও তাঁকে ও তাঁর রসূলদেরকে সাহায্য করে।[5] নিশ্চয় আল্লাহ শক্তিমান, পরাক্রমশালী। [6]
মুজিবুর রহমান: নিশ্চয়ই আমি আমার রাসূলদেরকে প্রেরণ করেছি স্পষ্ট প্রমাণসহ এবং তাদের সঙ্গে দিয়েছি কিতাব ও ন্যায় নীতি, যাতে মানুষ সুবিচার প্রতিষ্ঠা করে। আমি লৌহও দিয়েছি যাতে রয়েছে প্রচন্ড শক্তি এবং রয়েছে মানুষের জন্য বহুবিধ কল্যাণ; এটা এ জন্য যে, আল্লাহ প্রকাশ করে দিবেন কে প্রত্যক্ষ না করেও তাঁকে ও তাঁর রাসূলদেরকে সাহায্য করে। আল্লাহ সর্বশক্তিমান, পরাক্রমশালী।
ফযলুর রহমান: আমি স্পষ্ট নিদর্শনসহ আমার রসূলদেরকে পাঠিয়েছি এবং তাদের সাথে কিতাব ও (ন্যায়ের) মানদণ্ড দিয়েছি, যাতে মানুষ ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করে। আমি লোহাও দিয়েছি, যার মধ্যে (যুদ্ধের জন্য সহায়ক) প্রচণ্ড শক্তি ও মানুষের অনেক কল্যাণ আছে; এজন্য যে, আল্লাহ জানতে (যাচাই করতে) চান, কে না দেখেও তাঁকে ও তাঁর রসূলদেরকে সাহায্য করে। নিশ্চয়ই আল্লাহ শক্তিধর, পরাক্রমশালী।
মুহিউদ্দিন খান: আমি আমার রসূলগণকে সুস্পষ্ট নিদর্শনসহ প্রেরণ করেছি এবং তাঁদের সাথে অবতীর্ণ করেছি কিতাব ও ন্যায়নীতি, যাতে মানুষ ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করে। আর আমি নাযিল করেছি লৌহ, যাতে আছে প্রচন্ড রণশক্তি এবং মানুষের বহুবিধ উপকার। এটা এজন্যে যে, আল্লাহ জেনে নিবেন কে না দেখে তাঁকে ও তাঁর রসূলগণকে সাহায্য করে। আল্লাহ শক্তিধর, পরাক্রমশালী।
জহুরুল হক: আমরা তো আমাদের রসূলগণকে পাঠিয়ে দিয়েছিলাম সুস্পষ্ট প্রমাণাদি দিয়ে, আর তাঁদের সঙ্গে আমরা অবতারণ করেছিলাম ধর্মগ্রন্থ ও মানদন্ড যাতে লোকেরা ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে পারে, আর আমরা লোহা পাঠিয়েছি যাতে রয়েছে বিরাট শক্তিমত্তা ও মানুষের জন্য উপকারিতা, আর যেন আল্লাহ্ জানতে পারেন কে তাঁকে ও তাঁর রসূলগণকে অগোচরেও সাহায্য করে। নিঃসন্দেহ আল্লাহ্ মহাবলীয়ান, মহাশক্তিশালী।
Sahih International: We have already sent Our messengers with clear evidences and sent down with them the Scripture and the balance that the people may maintain [their affairs] in justice. And We sent down iron, wherein is great military might and benefits for the people, and so that Allah may make evident those who support Him and His messengers unseen. Indeed, Allah is Powerful and Exalted in Might.
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ২৫. অবশ্যই আমরা আমাদের রাসূলগনকে পাঠিয়েছি স্পষ্ট প্রমাণসহ(১) এবং তাদের সঙ্গে দিয়েছি কিতাব ও ন্যায়ের পাল্লা, যাতে মানুষ সুবিচার প্রতিষ্ঠা করে।(২) আমরা আরও নাযিলকরেছি লোহা যাতে রয়েছে প্রচণ্ড শক্তি এবং রয়েছে মানুষের জন্য বহুবিধা কল্যাণ।(৩) এটা এ জন্যে যে, আল্লাহ প্রকাশ করে দেন কে গায়েব অবস্থায়ও তাকে ও তাঁর রাসূলগণকে সাহায্য করে। নিশ্চয় আল্লাহ মহা শক্তিমান, পরাক্রমশালী।
তাফসীর:
(১) بينات শব্দের আভিধানিক অর্থ সুস্পষ্ট বিষয়। উদ্দেশ্য সুস্পষ্ট বিধানাবলীও হতে পারে; তাছাড়া এর উদ্দেশ্য মু'জিযা এবং রেসালতের সুস্পষ্ট প্রমাণাদিও হতে পারে; কারণ পরবর্তী বাক্যে কিতাব নাযিলের আলাদা উল্লেখ রয়েছে। সুতরাং بينات বলে মু'জিযা ও প্রমাণাদি বোঝানো হয়েছে এবং বিধানাবলীর জন্যে কিতাব নাযিল করার কথা বলা হয়েছে। [ফাতহুল কাদীর; কুরতুবী]
(২) আয়াতে কিতাবের ন্যায় মিযানের বেলায়ও নাযিল করার কথা বলা হয়েছে। কিতাব নাযিল হওয়া এবং ফেরেশতার মাধ্যমে নবী-রাসূলগণ পর্যন্ত পৌছা সুবিদিত। কিন্তু মিযান নাযিল করার অর্থ কি? এ সম্পর্কে বিভিন্ন তাফসীরে বিভিন্ন উক্তি এসেছে, কোন কোন মুফাসসির বলেন, মীযান নাযিল করার মানে দাঁড়িপাল্লার ব্যবহার ও ন্যায়বিচার সম্পর্কিত বিধানাবলী নাযিল করা। কারও কারও মতে, প্রকৃতপক্ষে কিতাবই নাযিল করা হয়েছে, কিন্তু এর সাথে দাঁড়িপাল্লা স্থাপন ও আবিষ্কারকে সংযুক্ত করে দেয়া হয়েছে। কাজেই আয়াতের অর্থ যেন এরূপ আমি কিতাব নাযিল করেছি ও দাড়িপাল্লা উদ্ভাবন করেছি। তাছাড়া আয়াতে কিতাব ও মিযানের পর লৌহ নাযিল করার কথা বলা হয়েছে। এখানেও নাযিল করার মানে সৃষ্টি করা হতে পারে। পবিত্র কুরআনের এক আয়াতে চতুষ্পদ জন্তুদের বেলায়ও নাযিল করা শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। [সূরা আয-যুমার: ৬] অথচ চতুষ্পদ জন্তু আসমান থেকে নাযিল হয় না-পৃথিবীতে জন্মলাভ করে। সেখানেও সৃষ্টি করার অর্থ বোঝানো হয়েছে। তবে সৃষ্টি করাকে নাযিল করা শব্দে ব্যক্ত করার মধ্যে ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে, সৃষ্টির বহুপূর্বেই লওহে-মাহফুযে লিখিত ছিল—এ দিক দিয়ে দুনিয়ার সবকিছুই আসমান থেকে অবতীর্ণ। [কুরতুবী; ফাতহুল কাদীর]
(৩) এতে আল্লাহ তা'আলা মানুষের জন্যে বহুবিধ কল্যাণ নিহিত রেখেছেন। দুনিয়াতে যত শিল্প-কারখানা ও কলকজা আবিস্কৃত হয়েছে এবং ভবিষ্যতে হবে, সবগুলোর মধ্যে লৌহের ভূমিকা সর্বাধিক। লৌহ ব্যতীত কোনো শিল্প চলতে পারে না। [কুরতুবী; ইবন কাসীর; ফাতহুল কাদীর]
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (২৫) নিশ্চয়ই আমি আমার রসূলদেরকে প্রেরণ করেছি স্পষ্ট প্রমাণসহ এবং তাদের সঙ্গে অবতীর্ণ করেছি কিতাব ও তুলাদন্ড (ন্যায়-নীতি);[1] যাতে মানুষ সুবিচার প্রতিষ্ঠা করে। আর আমি লোহা অবতীর্ণ করেছি;[2] যাতে রয়েছে প্রচন্ড শক্তি[3] ও রয়েছে মানুষের জন্য বহুবিধ কল্যাণ,[4] আর যাতে আল্লাহ জানতে পারেন যে, কে না দেখেও তাঁকে ও তাঁর রসূলদেরকে সাহায্য করে।[5] নিশ্চয় আল্লাহ শক্তিমান, পরাক্রমশালী। [6]
তাফসীর:
[1] ميزان (তুলাদন্ড) বলতে ন্যায়নীতি বুঝানো হয়েছে। অর্থাৎ, আমি লোকদেরকে সুবিচার করার নির্দেশ দিয়েছি। কেউ কেউ এর অনুবাদ করেছেন দাঁড়িপাল্লা। দাঁড়িপাল্লা অবতীর্ণ করার অর্থ হল, আমি দাঁড়িপাল্লার দিকে মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেছি যে, এর দ্বারা ওজন করে মানুষকে পুরো পুরো প্রাপ্য দিয়ে দাও।
[2] এখানে অবতীর্ণ করার অর্থ সৃষ্টি করা ও তার শিল্পকাজ শিখানো। লোহা থেকে অসংখ্য জিনিস তৈরী হয়। এসব আল্লাহর প্রেরণা দান ও তাঁর দিগ্দর্শনের ফল; যা তিনি মানুষের প্রতি করেছেন।
[3] অর্থাৎ, লোহা থেকে যুদ্ধাস্ত্র তৈরী হয়। যেমন, তরবারি, বর্শা, বন্দুক এবং আধুনিক এ্যাটম বোম, তোপ-কামান, যুদ্ধ-বিমান, ডুবোজাহাজ, রকেট ও ট্যাঙ্ক ইত্যাদি অনেক জিনিস। যার দ্বারা শত্রুর উপর আক্রমণও করা যায় এবং নিজেদের প্রতিরক্ষাও করা যায়।
[4] অর্থাৎ, যুদ্ধাস্ত্র ছাড়া লোহা থেকে আরো এমন অনেক জিনিষ তৈরী হয়, যা বাড়িতেও বিভিন্ন সাংসারিক কাজে আসে। যেমন, ছুরি, চাকু, কাঁচি, হাতুড়ি, সূচ, অনুরূপ চাষী, ছুতার ও রাজমিস্ত্রীর কাজের আসবাব-পত্র সহ ছোট-বড় অসংখ্য মেশিন ও জিনিস-পত্র। (এই লোহা থেকে গাড়ি তৈরী হয় এবং তারই উপর তা চলে।)
[5] এর সংযোগ হল لِيَقُوْمَ এর সাথে। অর্থাৎ, রসূলদেরকে এই জন্য প্রেরণ করেছেন যে, যাতে তিনি জেনে নেন কে তাঁর রসূলদের উপর আল্লাহকে না দেখেই ঈমান নিয়ে আসে এবং তাঁদের সাহায্য করে।
[6] তাঁর এর প্রয়োজন নেই যে, মানুষ তাঁর দ্বীনের এবং তাঁর রসূলগণের সাহায্য করুক। বরং তিনি চাইলে কারো সাহায্য ছাড়াই তাঁদেরকে জয়ী করতে পারেন। কিন্তু মানুষদেরকে তিনি তাঁদের সাহায্য করার নির্দেশ কেবল তাদেরই মঙ্গলার্থে দিয়েছেন। এইভাবে যাতে তারা আল্লাহকে সন্তুষ্ট করে তাঁর ক্ষমা ও করুণার অধিকারী হয়ে যায়।
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ২৫ নম্বর আয়াতের তাফসীর :
بِالْبَيِّنٰتِ (প্রমাণসমূহ) অর্থাৎ মুজিযাহ, দলীল-প্রমাণাদি ও ঐসব আলামত যা রাসূলের সত্যতার প্রমাণ বহন করে তা দিয়ে রাসূল প্রেরণ করছি।
وَالْمِيْزَانَ (তুলাদণ্ড) বলতে ন্যায়নীতি বুঝানো হয়েছে। অর্থাৎ আল্লাহ তা‘আলা লোকদের মাঝে সুবিচার করার নির্দেশ দিয়েছেন। কেউ কেউ বলেছেন, এর অর্থ হল দাড়িপাল্লা। দাঁড়িপাল্লা অবতীর্ণ করার অর্থ হল মানুষের মাঝে সঠিক ওজন প্রতিষ্ঠা করা।
(وَأَنْزَلْنَا الْحَدِيْدَ)
হাসান বাসরী (রহঃ) বলেন : এখানে انزال অর্থ সৃষ্টি করা, তৈরি করা। যেমন সূরা আন‘আমের ১৪৩ নম্বর আয়াতে انزال দ্বারা সৃষ্টি করার অর্থে ব্যবহার করা হয়েছে। ভাষাবিদগণ বলেন : খনিজ থেকে লোহা বের করেছেন, অতঃপর ওয়াহীর মাধ্যমে তা তৈরির জ্ঞান দান করেছেন। (ইবনু কাসীর)
হাদীদ শব্দটি কুরআনে ৬ জায়গায় ব্যবহার হয়েছে। সূরা ইসরার ৫০ নম্বর, সূরা কাহফের ৯৬ নম্বর, সূরা হাজ্জের ২১ নম্বর, সূরা সাবার ১০ নম্বর, সূরা ক্বাফের ২২ নম্বর এবং সূরা হাদীদের অত্র আয়াত। প্রত্যেকটিতেই লোহার উপরকরণ অর্থে ব্যবহার হয়েছে। তবে সূরা ক্বাফের আয়াতে প্রত্যক্ষ করা অর্থে ব্যবহার হয়েছে।
অত্র আয়াতের তাফসীরে ইবনু কাসীর (রহঃ) বলেন : যাদের কাছে প্রমাণ পৌঁছার পরেও সত্য গ্রহণে অবাধ্য হবে এবং সত্যের বিরোধিতা করবে তাদের প্রতিরোধক হিসাবে লোহা দিয়েছেন। এজন্য নাবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নবুওয়াত পাওয়ার পর তের বছর মক্কায় অবস্থান করে তাওহীদের দাওয়াত দিয়ে সত্যের প্রমাণ প্রতিষ্ঠিত করেছেন। তারপর হিজরত করার অনুমতি দিয়েছেন এবং কেউ ইসলামের বিরোধিতা করলে তাদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণের বিধান দিয়েছেন।
(وَّمَنَافِعُ لِلنَّاسِ)
অর্থাৎ মানুষের জীবন-যাপনে এর অনেক উপকারিতা রয়েছে, যেমন লোহা দ্বারা কৃষি কাজের উপকরণ তৈরি করা, দৈনন্দিন কাজে ব্যবহৃত দা, চাকু ইত্যাদি তৈরি করা। যুদ্ধ-জিহাদের অস্ত্র তৈরি হয় এ লোহা দ্বারাই। (ইবনু কাসীর)
আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয় :
১. আল্লাহ লোহা অবতীর্ণ করেছেন মানুষের নানাবিধ উপকারের জন্য।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ আমি আমার রাসূলদেরকে (আঃ) মু'জিযা দিয়ে, স্পষ্ট প্রমাণ প্রদান করে এবং পূর্ণ দলীলসমূহ দিয়ে দুনিয়ায় প্রেরণ করেছি। সাথে সাথে তাদেরকে কিতাবও প্রদান করেছি যা খাটি, পরিষ্কার ও সত্য। আর দিয়েছি আদল ও হক, যা দ্বারা প্রত্যেক জ্ঞানী ব্যক্তি তাদের কথাকে কবুল করে নিতে স্বাভাবিকভাবেই বাধ্য হয়। হ্যাঁ, তবে যাদের অন্তরে রোগ রয়েছে এবং বুঝেও বুঝতে চায় না তারা এর থেকে বঞ্চিত রয়ে যায়। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেনঃ (আরবী)
অর্থাৎ “যে ব্যক্তি তার প্রতিপালকের পক্ষ হতে আয়াত বা দলীল-প্রমাণের উপর রয়েছে এবং যার অনুসরণ করে তার প্রেরিত সাক্ষী।” (১১:১৭) আর এক জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “এটাই আল্লাহর প্রকৃতি, যার উপর তিনি মানুষকে সৃষ্টি করেছেন।” (৩০:৩০) আল্লাহ তা'আলা আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবী)
অর্থাৎ “তিনি আকাশকে করেছেন সমুন্নত এবং স্থাপন করেছেন মানদণ্ড।” (৫৫:৭) সুতরাং এখানে তিনি বলেনঃ এটা এই জন্যে যে, যেন মানুষ সুবিচার প্রতিষ্ঠা করে। অর্থাৎ রাসূল (সঃ)-এর আনুগত্য করে এবং তার আদেশ পালন করে। তারা যেন রাসূল (সঃ)-এরই সমস্ত কথাকে সত্য বলে বিশ্বাস করে। কেননা, তার কথার মত অন্য কারো কথা সরাসরি সত্য নয়। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী)
অর্থাৎ “তোমার প্রতিপালকের কথা পূর্ণ হয়েছে যিনি স্বীয় খবর প্রদানে সত্যবাদী এবং স্বীয় আহকামে ন্যায়পরায়ণ।” (৬:১১৫) কারণ এটাই যে, যখন মুমিনরা জান্নাতে প্রবেশ করবে এবং পুরোপুরিভাবে আল্লাহর নিয়ামতের অধিকারী হবে তখন তারা বলবেঃ (আরবী)
অর্থাৎ “সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্যে যিনি আমাদেরকে এর জন্যে পথ প্রদর্শন করেছেন, যদি আল্লাহ আমাদেরকে পথ প্রদর্শন না করতেন তবে আমরা পথ পেতাম না, আমাদের নিকট রাসূলগণ সত্যসহ এসেছিলেন।” (৭:৪৩)।
এরপর আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলেনঃ আমি সত্য অস্বীকারকারীদেরকে দমন করার লক্ষ্যে লোহা তৈরী করেছি। অর্থাৎ প্রথমে কিতাব, রাসূল এবং হকের মাধ্যমে হুজ্জত কায়েম করেছি। অতঃপর বক্র অন্তর বিশিষ্ট লোকদের বক্রতা দূর করার জন্য আমি লোহা সৃষ্টি করেছি যে, যেন এর দ্বারা অস্ত্র-শস্ত্র তৈরী করা যায় এবং এর মাধ্যমে আল্লাহ ভক্ত বান্দারা তারা শত্রুদের অন্তরের কাঁটা বের করে আনে। এই নমুনাই রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর জীবদ্দশায় সম্পূর্ণরূপে প্রকাশিত হয়। মক্কা শরীফে তিনি সুদীর্ঘ তেরো বছর মুশরিকদেরকে বুঝাতে, তাওহীদ ও সুন্নাতের দাওয়াত প্রদানে এবং তাদের বদ আকীদা সংশোধনকরণে কাটিয়ে দেন। তারা স্বয়ং তাঁর উপর যেসব বিপদ আপদ চাপিয়ে দেয় তা তিনি সহ্য করেন। কিন্তু যখন এই হুজ্জত শেষ হয়ে গেল তখন শরীয়ত মুসলমানদেরকে হিজরত করার অনুমতি দিলো। তারপর আল্লাহ তাআলা নির্দেশ দিলেন যে, এখন ইসলাম প্রচারে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে নিয়মিতভাবে যুদ্ধ ঘোষণা করা হোক। তাদের গর্দান উড়িয়ে দিয়ে যমীনকে আল্লাহর অহীর বিরুদ্ধাচরণকারীদের হতে পবিত্র করা হোক।
হযরত ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “কিয়ামতের পূর্বেই আমি তরবারীসহ প্রেরিত হয়েছি যে পর্যন্ত না শরীক বিহীন এক আল্লাহরই ইবাদত করা হয়। আর আমার রিক আমার বর্শার ছায়ার নীচে রেখে দেয়া হয়েছে এবং লাঞ্ছনা ও অবমাননা ঐ লোকদের, যারা আমার হুকুমের বিরুদ্ধাচরণ করে। যে ব্যক্তি কোন কওমের সহিত সাদৃশ্য যুক্ত হয় সে তাদেরই একজন। (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)
সুতরাং লৌহ দ্বারা অস্ত্রশস্ত্র তৈরী করা হয়। যেমন তরবারী, বর্শা, ছুরি, তীর, বর্ম ইত্যাদি। এছাড়া এর দ্বারা জনগণ আরো বহু উপকার লাভ করে থাকে। যেমন এই লৌহ দ্বারা তারা কুড়াল, কোদাল, দা, আরী, চাষের যন্ত্রপাতি, বয়নের যন্ত্রপাতি, রান্নার পাত্র, রুটির তাওয়া ইত্যাদি নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র তৈরী করে থাকে।
হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, হযরত আদম (আঃ) তিনটি জিনিসসহ জান্নাত হতে এসেছিলেন। (এক) নেহাই, (দুই) বাঁশী এবং (তিন) হাতুড়ী। (এটা ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) ও ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)
এরপর মহান আল্লাহ বলেনঃ এটা এই জন্যে যে, আল্লাহ প্রকাশ করে দিবেন। কে প্রত্যক্ষ না করেও তাকে ও তাঁর রাসূল (সঃ)-কে সাহায্য করে। অর্থাৎ এই অস্ত্র-শস্ত্রগুলো উঠিয়ে নেক নিয়তে কে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-কে সাহায্য করতে চায় তা আল্লাহ পরীক্ষা করতে চান। আল্লাহ তো শক্তিমান, পরাক্রমশালী। তাঁর দ্বীনের যে সাহায্য করবে সে নিজেরই সাহায্য করবে। প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ তা'আলা নিজেই নিজের দ্বীনকে শক্তিশালী করেন। তিনি তো জিহাদের ব্যবস্থা দিয়েছেন বান্দাদেরকে শুধু পরীক্ষা করার জন্যে। বান্দার সাহায্যের তাঁর কোনই প্রয়োজন নেই। বিজয় ও সাহায্য তো তাঁরই পক্ষ থেকে এসে থাকে।
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।