সূরা আল-ওয়াকিয়া (আয়াত: 75)
হরকত ছাড়া:
فلا أقسم بمواقع النجوم ﴿٧٥﴾
হরকত সহ:
فَلَاۤ اُقْسِمُ بِمَوٰقِعِ النُّجُوْمِ ﴿ۙ۷۵﴾
উচ্চারণ: ফালাউকছিমুবিমাওয়া-কি‘ইননুজূম।
আল বায়ান: সুতরাং আমি কসম করছি নক্ষত্ররাজির অস্তাচলের,
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৭৫. অতঃপর(১) আমি শপথ করছি নক্ষত্ররাজির অস্তাচলের(২),
তাইসীরুল ক্বুরআন: উপরন্তু আমি শপথ করছি তারকারাজির অস্তাচলের।
আহসানুল বায়ান: (৭৫) আমি শপথ করছি নক্ষত্র রাজির অস্তাচলের। [1]
মুজিবুর রহমান: আমি শপথ করছি নক্ষত্র রাজির অস্তাচলের!
ফযলুর রহমান: আমি তারকাদের পতনস্থলসমূহের (অস্তাচলসমূহের) শপথ করছি,
মুহিউদ্দিন খান: অতএব, আমি তারকারাজির অস্তাচলের শপথ করছি,
জহুরুল হক: না, আমি কিন্তু শপথ করছি নক্ষত্ররাজির অবস্থানের, --
Sahih International: Then I swear by the setting of the stars,
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ৭৫. অতঃপর(১) আমি শপথ করছি নক্ষত্ররাজির অস্তাচলের(২),
তাফসীর:
(১) বাক্যের শুরুতে এখানে একটি لا ব্যবহৃত হয়েছে। যার অর্থ, ‘না’। কোন কোন মুফাস্সির এটাকে অতিরিক্ত বলেছেন। কিন্তু এ মতটি সঠিক নয়। পবিত্র কুরআনে অতিরিক্ত কিছু নেই। বরং এটি আরবদের একটি সাধারণ বাকপদ্ধতি। যেমন বলা হয় لا والله এরূপ বাকপদ্ধতি আরবদের নিকট সুবিদিত। এরূপ স্থলে لا সম্বোধিত ব্যক্তির ধারণা খণ্ডনের জন্যে ব্যবহৃত হয়। অর্থাৎ তোমরা যা মনে করে বসে আছো ব্যাপার তা নয়। কুরআন যে আল্লাহর পক্ষ থেকে সে বিষয়ে কসম খাওয়ার আগে এখানে لا শব্দের ব্যবহার করায় আপনা থেকেই একথা প্ৰকাশ পায় যে, এই পবিত্ৰ গ্ৰন্থ সম্পর্কে মানুষ মনগড়া কিছু কথাবার্তা বলছিলো। সেসব কথার প্রতিবাদ করার জন্যই এ কসম খাওয়া হচ্ছে। [ফাতহুল কাদীর; কুরতুবী]
(২) مواقع শব্দটি موقع এর বহুবচন। এর এক অর্থ তারকারাজি ও গ্রহসমূহের অবস্থানস্থল, তাদের মনযিল ও তাদের কক্ষপথসমূহ। অন্য অর্থ নক্ষত্রের অস্তাচল অথবা অস্তের সময়, বা চোখের আড়ালে চলে যাওয়া। [ফাতহুল কাদীর] এ আয়াতে নক্ষত্রের অস্ত যাওয়ার সময়ের শপথ করা হয়েছে; যেমন সূরা নজমেও (وَالنَّجْمِ إِذَا هَوَىٰ) বলে তাই করা হয়েছে।
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (৭৫) আমি শপথ করছি নক্ষত্র রাজির অস্তাচলের। [1]
তাফসীর:
[1] فَلاَ أُقْسِمُ তে لا অক্ষরটি অতিরিক্ত। এটা তাকীদ স্বরূপ এসেছে। অথবা এটা অতিরিক্ত নয়, বরং পূর্বের কোন জিনিসের অস্বীকৃতি জ্ঞাপনের জন্য এসেছে। অর্থাৎ, এই কুরআন জ্যোতিষ বা কাব্যগ্রন্থ নয়। বরং আমি তারকারাজির অস্তাচলের শপথ করে বলছি যে, এই কুরআন সম্মানিত---। مَوَاقِعُ النُّجُوْمِ থেকে উদ্দেশ্য তারকারাজির উদয়াচল ও অস্তাচল এবং তাদের গন্তব্যস্থল ও কক্ষপথ। কেউ কেউ অনুবাদ করেছেন, ‘‘শপথ করছি আয়াতসমূহের অবতরণের পয়গম্বরদের অন্তরে।’’ (মুঅয্যিহুল কুরআন) অর্থাৎ, نجوم এর অর্থ কুরআনের আয়াতসমূহ এবং مواقع এর অর্থ, নবীদের অন্তর। আবার কেউ কেউ এর অর্থ নিয়েছেন, কুরআন মাজীদের ধীরে ধীরে পর্যায়ক্রমে অবতীর্ণ হওয়া। কেউ বলেছেন, এর অর্থ হল, কিয়ামতের দিন তারকারাজির ঝরে পড়া। (ইবনে কাসীর)
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ৭৫-৮২ নম্বর আয়াতের তাফসীর :
فَلَآ أُقْسِمُ এখানে لا আরবী অক্ষরটি কতক মুফাসসিরদের মতে অতিরিক্ত। মূল বাক্য হল
(أُقْسِمُ بِمَوَاقِعِ النُّجُوْمِ)।
আর কতক মুফাসসিরগণ বলেছেন : এখানে لا অক্ষরটি অতিরিক্ত না, তবে তার কোন অর্থ এখানে হবে না। বরং এরূপ নিয়ে আসা হয় তখন, যখন না বোধক বিষয়ে শপথ করা হয়। এরূপ সূরা কিয়ামার শুরুতে আছে।
(بِمَوَاقِعِ النُّجُوْمِ)
এর অর্থ নিয়ে কয়েকটি মতামত পাওয়া যায়। যেমন : ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন : এর অর্থ হল কুরআনের অবতরণ। কুরআন কদরের রাতে ঊর্ধ্বাকাশ থেকে দুনিয়ার আকাশে একত্রে অবতীর্ণ হয়। অতঃপর প্রয়োজন মত দুনিয়াতে অবতীর্ণ হতে থাকে। এভাবে কয়েক বছরে পূর্ণ কুরআন অবতীর্ণ হয়। তারপর ইবনু আব্বাস (রাঃ) এ আয়াত তেলাওয়াত করেন। মুজাহিদ (রহঃ) বলেন : আকাশে নক্ষত্ররাজির অস্তাচল। যেমন বলা হয়
مطالعها ومشارقها
হাসান বাসরী ও কাতাদাহ (রহঃ) এ কথা বলেছেন। ইবনু জারীর (রহঃ) এ মত পছন্দ করেছেন।
অন্যত্র হাসান বাসরী (রহঃ) বলেন : এর দ্বারা উদ্দেশ্য হল কিয়ামতের দিন যখন তারকা ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়বে। (ইবনু কাসীর)
এখানে مَوَاقِعِ দ্বারা উদ্দেশ্য তারকারজির উদয়াচল ও অস্তাচল এবং তাদের গন্তব্যস্থল ও কক্ষপথ।
(وَإِنَّه۫ لَقَسَمٌ لَّوْ تَعْلَمُوْنَ عَظِيْمٌ)
অর্থাৎ অবশ্যই এটা এক মহা শপথ। কেননা, তারকার উদয় অস্তর গন্তব্য ও চলার কক্ষপথ একটি সীমাহীন বড় ধরণের নিদর্শন।
(إِنَّه۫ لَقُرْاٰنٌ كَرِيْمٌ)
‘নিশ্চয়ই এটা সম্মানিত কুরআন’ এ আয়াতটি পূর্বের আয়াতের শপথের জবাব। অর্থাৎ আল্লাহ তা‘আলা তারকার উদয় ও অস্তাচলের শপথ করে বলছেন যে, নিশ্চয়ই এ কুরআন একটি সম্মানিত কুরআন, এটা সাধারণ কোন বিদ্যা নয়। এতে যা কিছু রয়েছে তাতে কোন সংশয় নেই, তা আল্লাহর কালাম- নাবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর জন্য চিরস্থায়ী মু‘জিযাহ।
مَّكْنُوْنٍ অর্থ مستور عن عين الخلق
বা মানুষের দৃষ্টির আড়াল। ইবনুল কায়্যিম (রহঃ) বলেন : এর উদ্দেশ্য কী তা নিয়ে একাধিক মত পাওয়া যায়, কেউ বলেন : এর দ্বারা উদ্দেশ্য হল লাওহে মাহফূজ। অর্থাৎ এ কুরআন লাওহে মাহফুজে লিপিবদ্ধ, সংরক্ষিত। সঠিক কথা হল : ফেরেশতাদের হাতে যে কিতাব রয়েছে এখানে সে কিতাব উদ্দেশ্য। যেমন আল্লাহ তা‘আলা অন্যত্র বলেন :
(فِیْ صُحُفٍ مُّکَرَّمَةٍﭜﺫ مَّرْفُوْعَةٍ مُّطَھَّرَةٍۭﭝبِاَیْدِیْ سَفَرَةٍﭞکِرَامٍۭ بَرَرَةٍ)
“তা সম্মানিত কিতাবে (লাওহ মাহফূজে) লিপিবদ্ধ যা উচ্চ মর্যাদা সম্পন্ন পবিত্র। এমন লেখকদের হাতে থাকে। যারা সম্মানিত ও সৎ।” (সূরা আবাসা ৮০ : ১৩-১৬)
(لَّا یَمَسُّھ۫ٓ اِلَّا الْمُطَھَّرُوْنَ)
পূতপবিত্রগণ ছাড়া অন্য কেউ তা স্পর্শ করে না। আয়াতের তাফসীরে বিভিন্ন মুফাসসিরদের মতামত তুলে ধরা হল :
১. তাফসীর মুয়াসসারে বলা হয়েছে : মাত্র ঐসকল ফেরেশতারাই কুরআন স্পর্শ করে যাদেরকে আল্লাহ তা‘আলা সকল প্রকার আপদ-বিপদ (أفات) ও গুনাহ থেকে পবিত্র করে রেখেছেন। অনুরূপভাবে এ কুরআনকে যারা শিরক ও অপবিত্রতা থেকে মুক্ত তারাই স্পর্শ করবে। (তাফসীর মুয়াসসার)
২. আয়সারুত তাফাসীরে বলা হয়েছে : কুরআন চাই লাওহে মাহফূজে হোক আর কপি আকারে আমাদের হাতে থাকুক তা ছোট-বড় সকল প্রকার অপবিত্রতা থেকে মুক্ত ব্যক্তিরাই স্পর্শ করবে। (আয়সারুত তাফাসীর)
৩. আল্লামা সা‘দী (রহঃ) বলেন : কুরআন সম্মানিত ফেরেশতা ছাড়া কেউ স্পর্শ করতে পারবে না, যাদেরকে আল্লাহ তা‘আলা বিপদ, গুনাহ ও ত্র“টি থেকে মুক্ত রেখেছেন। সুতরাং যখন পবিত্র ফেরেশতা ছাড়া তা স্পর্শ করতে পারবে না তখন শয়তান ও অপবিত্র কেউ স্পর্শ করার কোন প্রশ্নই আসে না। এ আয়াত (সতর্ককারীস্বরূপ) প্রমাণ করছে যে, কুরআন পবিত্র ব্যক্তি ছাড়া স্পর্শ করতে পারবে না। (তাফসীর সা‘দী)
ইবনু আব্বাস (রাঃ)-সহ প্রমুখ সাহাবী ও তাবেয়ী বলেন : আয়াতে কিতাব দ্বারা আকাশে যে কিতাব আছে তা উদ্দেশ্য, আর পবিত্রগণ দ্বারা ফেরেশতা উদ্দেশ্য।
কাতাদাহ (রহঃ) বলেন : আল্লাহ তা‘আলার কাছে যে কিতাব আছে তা পবিত্রগণ ছাড়া কেউ স্পর্শ করতে পারে না। আর দুনিয়ায় যে কুরআন আছে তা অপবিত্র অগ্নিপূজক, মুনাফিক সবাই স্পর্শ করে থাকে। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) রোম ও পারস্যসহ বিভিন্ন অমুসলিম রাষ্ট্র প্রধানের কাছে কুরআনের আয়াত সম্বলিত চিঠি প্রেরণ করেছেন। তারা তা স্পর্শ করেছে। বিশিষ্ট তাবেয়ী আবুল আলিয়া (রহঃ) উক্ত মতকে সমর্থন করে বলেন : এ আয়াত দ্বারা তোমরা পাপাচারীরা উদ্দেশ্য না। ইবনু জায়েদ (রহঃ) বলেন : কুরাইশদের কাফিররা ধারণা করত এ কুরআন শয়তান নিয়ে এসেছে। তাই আল্লাহ তা‘আলা বলে দিলেন, এ কুরআন পবিত্রগণ ছাড়া কেউ স্পর্শ করে না। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন :
(وَمَا تَنَزَّلَتْ بِھِ الشَّیٰطِیْنُﰡوَمَا یَنْۭبَغِیْ لَھُمْ وَمَا یَسْتَطِیْعُوْنَﰢ اِنَّھُمْ عَنِ السَّمْعِ لَمَعْزُوْلُوْنَ)
“শয়তানরা (এ কুরআন) তাসহ অবতীর্ণ হয়নি। তারা এ কাজের যোগ্য নয় এবং তারা এটার সামর্থ্যও রাখে না। তাদেরকে (ওয়াহী) শ্রবণের সুযোগ হতে দূরে রাখা হয়েছে।” ( সূরা শুয়ারা ২৬ : ২১০-২১২)
ইবনু কাসীর (রহঃ) বলেন : এ কথাটা উত্তম, তবে এ কথা পূর্বের কথাগুলোর বিপরীত নয়।
অন্যান্যরা বলেন : যারা ছোট ও বড় সকল প্রকার অপবিত্রতা থেকে মুক্ত তারাই এ কুরআন স্পর্শ করবে। এমতাবস্থায় لَّا یَمَسُّھ۫ٓ সংবাদসূচক বাক্যটির অর্থ হবে নিষেধসূচক, অর্থাৎ পবিত্রতা ছাড়া কুরআনের কপি স্পর্শ কর না। যেমন নাবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন : পবিত্রতা ছাড়া কুরআন স্পর্শ করবে না। (আবূ দাঊদ (মারাসিল) হা. ৯৪, সহীহুল জামে হা. ৭৭৮০)
উক্ত আলোচনা থেকে বুঝা গেল উক্ত আয়াতটি যদিও লাওহে মাহফূজে অবস্থিত কুরআন ও ফেরেশতাদের ব্যাপারে বলা হয়েছে কিন্তু মানুষেরাও এ সম্বোধনের অন্তর্ভুক্ত। তাই মুসলিমদের পবিত্র অবস্থা ছাড়া কুরআনকে স্পর্শ করা উচিত নয়। আল্লাহ তা‘আলা ভাল জানেন।
(أَفَبِهٰذَا الْحَدِيْثِ)
এখানে حديث দ্বারা কুরআন উদ্দেশ্য।
مُّدْهِنُوْنَ - এর এখানে অর্থ হল : মিথ্যাপ্রতিপন্ন করা। অর্থাৎ তোমরা এ সম্মানিত কুরআন যা পবিত্র ফেরেশতা ছাড়া কোন শয়তান স্পর্শ করতে পারে না তাকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করছ?
(وَتَجْعَلُوْنَ رِزْقَكُمْ...)
ইবনু আব্বাস (রাঃ) এ আয়াতের তাফসীর করে বলেন : তোমরা আল্লাহ তা‘আলার নেয়ামতের শুকরিয়া আদায় না করে মিথ্যে প্রতিপন্ন কর ও কুফরী কর। (ইবনু কাসীর) যেমন বৃষ্টি পাওয়া একটি নেয়ামত। তোমরা আল্লাহ তা‘আলার এ নেয়ামতের শুকরিয়া আদায় না করে বলে থাক, অমুক তারকার কারণে বৃষ্টি পেয়েছি বা অমুক কারণে বৃষ্টি পেয়েছি। মূলত তোমাদের উচিত ছিল আল্লাহ তা‘আলার এ নেয়ামতের শুকরিয়া আদায় করা। তোমরা তা না করে অমুক অমুক কথা বলছ।
জায়েদ বিন খালেদ (রাঃ) বলেন : একদা রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) রাতের বৃষ্টি শেষে হুদায়বিয়াতে আমাদের নিয়ে ফজরের সালাত আদায় করেন। সালাত শেষে সাহাবীদের মুখোমুখি হয়ে তিনি বলেন : তোমরা কি জান, তোমাদের প্রতিপালক কী বলেন? তারা বলল : আল্লাহ তা‘আলা ও তাঁর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ভাল জানেন। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, আল্লাহ তা‘আলা বলেন : আমার একশ্রেণির বান্দা সকাল করে মু’মিন অবস্থায়, আরেক শ্রেণি সকাল করে কাফির অবস্থায়। যারা বলে : আল্লাহ তা‘আলার রহমতে বৃষ্টি অবতীর্ণ হয়েছে তারা আমার প্রতি ঈমানদার তারকার প্রতি কাফির। আর যারা বলে : অমুক অমুক তারকার কারণে বৃষ্টি হয়েছে তারা আমার প্রতি কাফির তারকার প্রতি বিশ্বাসী।
সুতরাং একজন মু’মিন যে কোন প্রকার রিযিক পেয়ে আল্লাহ তা‘আলার শুকরিয়া আদায় করবে, রিযিক পেয়ে বলবে না যে, অমুক কারণে এ রিযিক পেয়েছি।
আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয় :
১. কুরআনের সম্মান ও মর্যাদা জানলাম।
২. কুরআন পবিত্র অবস্থায় ধরা ও পাঠ করা আবশ্যক।
৩. কোন তারকা উদয়ের কারণে বৃষ্টি হয় না বরং বৃষ্টি আল্লাহ তা‘আলার একটি নেয়ামত যখন ইচ্ছা তা দিয়ে থাকেন। তাই সকল নেয়ামতের জন্য একমাত্র তাঁরই শুকরিয়া আদায় করা উচিত।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: ৭৫-৮২ নং আয়াতের তাফসীর:
হযরত যহ্হাক (রঃ) বলেন যে, আল্লাহ তা'আলার এই কসমগুলো কালাম শুরু করার জন্যে হয়ে থাকে। কিন্তু এই উক্তিটি দুর্বল। জমহুর বলেন যে, এটা আল্লাহ তা'আলার কসম, তিনি তার মাখলুকের মধ্যে যার ইচ্ছা কসম খেতে পারেন এবং এর দ্বারা ঐ জিনিসের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণিত হয়। কোন কোন মুফাসসিরের উক্তি এই যে, এখানে (আরবী) অতিরিক্ত এবং.... (আরবী) হলো কসমের জবাব। এটা ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) সাঈদ ইবনে জুবায়ের (রঃ) হতে বর্ণনা করেছেন। অন্যেরা বলেন যে, এখানে (আরবী)-কে অতিরিক্ত বলার কোন প্রয়োজনই নেই। কালামে আরবের প্রথা হিসেবে এটা কসমের শুরুতে এসে থাকে। যখন কোন জিনিসের উপর কসম খাওয়া হয় এবং ওটাকে অস্বীকার করা উদ্দেশ্য হয় তখন কসমের শুরুতে এই এসে থাকে। যেমন হযরত আয়েশা (রাঃ)-এর নিম্নের উক্তিতে রয়েছেঃ (আরবী)
অর্থাৎ “আল্লাহর কসম! রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর হাত কখনো কোন স্ত্রীলোকের হাতকে স্পর্শ করেনি।” অর্থাৎ বায়আত গ্রহণের সময় রাসূলুল্লাহ (সঃ) কখনো কোন নিঃসম্পর্ক স্ত্রীলোকের সাথে মুসাফাহা বা করমর্দন করেননি। অনুরূপভাবে এখানেও। কসমের শুরুতে নিয়ম অনুযায়ী এসেছে, অতিরিক্ত হিসেবে নয়। তাহলে কালামের ভাবার্থ হবেঃ কুরআন কারীম সম্পর্কে তোমাদের যে ধারণা আছে যে, এটা যাদু, এটা সম্পূর্ণ ভুল ধারণা। বরং এ পবিত্র কিতাবটি আল্লাহর কালাম। কোন কোন আরব বলেন যে, (আরবী) দ্বারা তাদের কালামকে অস্বীকার করা হয়েছে। অতঃপর আসল বিষয়ের স্বীকৃতি শব্দে রয়েছে।
(আরবী) দ্বারা উদ্দেশ্য হলো কুরআন কারীম ক্রমান্বয়ে অবতীর্ণ হওয়া। লাওহে মাহফুয হতে তো কদরের রাত্রিতে কুরআন কারীম একই সাথে প্রথম আসমানে অবতীর্ণ হয়। তারপর প্রয়োজন মত অল্প অল্প করে সময়ে সময়ে অবতীর্ণ হতে থাকে।
এই ভাবে কয়েক বছরে পূর্ণ কুরআন অবতীর্ণ হয়। মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, আসমানের সূর্যোদয়ের জায়গাকে বুঝানো হয়েছে। (আরবী) দ্বারা (আরবী) উদ্দেশ্য। হাসান (রঃ) বলেন যে, কিয়ামতের দিন ঐগুলো বিক্ষিপ্ত হয়ে যাওয়া উদ্দেশ্য। যহাক (রঃ) বলেন যে, এর দ্বারা ঐ তারকাগুলোকে বুঝানো হয়েছে যেগুলো সম্পর্কে মুশরিকদের আকীদা বা বিশ্বাস ছিল যে, অমুক অমুক তারকার কারণে তাদের উপর বৃষ্টি বর্ষিত হয়েছে।
এরপর ঘোষিত হচ্ছেঃ অবশ্যই এটা এক মহাশপথ! কেননা, যে বিষয়ের উপর শপথ করা হচ্ছে তা খুবই বড় বিষয়। অর্থাৎ এই কুরআন বড়ই সম্মানিত কিতাব। এটা বড়ই মর্যাদা সম্পন্ন, সুরক্ষিত ও সুদৃঢ় কিতাবে রয়েছে।
মহান আল্লাহ বলেনঃ যারা পূতঃপবিত্র তারা ব্যতীত অন্য কেউ তা স্পর্শ করে না। অর্থাৎ শুধু ফেরেশতারাই এটা স্পর্শ করে থাকেন। হ্যাঁ, তবে দুনিয়ায় এটাকে সবাই স্পর্শ করে সেটা অন্য কথা।
হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ)-এর কিরআতে (আরবী) রয়েছে। হযরত আবুল আলিয়া (রঃ) বলেন যে, এখানে পবিত্র দ্বারা উদ্দেশ্য মানুষ নয়, মানুষ তো পাপী। এটা কাফিরদের জবাবে বলা হয়েছে। তারা বলতো যে, এই কুরআন নিয়ে শয়তান অবতীর্ণ হয়ে থাকে। যেমন আল্লাহ তা'আলা অন্য জায়গায় পরিষ্কারভাবে বলেনঃ (আরবী)
অর্থাৎ “এটা নিয়ে শয়তানরা অবতীর্ণ হয় না, না তাদের এই যোগ্যতা বা শক্তি আছে, এমনকি তাদেরকে তো এটা শ্রবণ হতেও দূর করে দেয়া হয়।” (২৬:২১০-২১২) এ আয়াতের তাফসীরে এ উক্তিটিই মনে বেশী ধরছে। তবে অন্যান্য উক্তিগুলোও এর অনুরূপ হতে পারে। ফারা (রঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছে এই যে, এর স্বাদ ও মজা শুধুমাত্র ঈমানদার লোকেরাই পেতে পারে। কেউ কেউ বলেন যে, এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো অপবিত্রতা হতে পবিত্র হওয়া। যদিও এটা খবর, কিন্তু উদ্দেশ্য হলো ইনশা। কুরআন দ্বারা এখানে মাসহাফ উদ্দেশ্য। ভাবার্থ হলো এই যে, মুসলমান অপবিত্র অবস্থায় কুরআন কারীমে হাত লাগাবে না। একটি হাদীসে এসেছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) কুরআন কারীমকে সাথে নিয়ে হারবী কাফিরদের দেশে যেতে নিষেধ করেছেন। কেননা, হতে পারে যে, শত্রুরা এর কোন ক্ষতি সাধন করবে।” (এ হাদীসটি ইমাম মুসলিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)
হযরত আমর ইবনে হাযাম (রাঃ)-কে রাসূলুল্লাহ (সঃ) যে পত্রটি লিখে দিয়েছিলেন তাতে এও ছিলঃ “পবিত্র ব্যক্তি ছাড়া যেন কেউ কুরআন স্পর্শ না করে।” (এ হাদীসটি ইমাম মালিক (রঃ) স্বীয় মুআত্তা গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন)
মারাসীলে আবি দাউদে রয়েছে যে, যুহরী (রঃ) বলেনঃ “আমি স্বয়ং পত্রটি দেখেছি এবং তাতে এই বাক্যটি পাঠ করেছি।” যদিও এ রিওয়াইয়াতটির বহু সনদ রয়েছে কিন্তু প্রত্যেকটির বিষয়েই চিন্তা-ভাবনার অবকাশ আছে। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।
এরপর ইরশাদ হচ্ছেঃ এই কুরআন কবিতা, যাদু অথবা অন্য কোন বিষয়ের গ্রন্থ নয়, বরং এটা সরাসরি সত্য। কারণ এটা জগতসমূহের প্রতিপালকের নিকট হতে অবতীর্ণ। এটাই সঠিক ও সত্য কিতাব। এটা ছাড়া এর বিরোধী সবই মিথ্যা এবং সম্পূর্ণরূপে প্রত্যাখ্যাত। তবুও কি তোমরা এই বাণীকে তুচ্ছ গণ্য করবে? এর জন্যে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কি এটাই হবে যে, তোমরা একে অবিশ্বাস করবে?
ইযদ গোত্রের ভাষায় (আরবী)-এর অর্থ (আরবী) বা কৃতজ্ঞতা এসে থাকে। মুসনাদের একটি হাদীসেও (আরবী) -এর অর্থ (আরবী) করা হয়েছে। অর্থাৎ তোমরা বলে থাকো যে, অমুক তারকার কারণে তোমরা পানি পেয়েছো বা অমুক তারকার কারণে অমুক জিনিস পেয়েছো।
হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, বৃষ্টির সময় কোন কোন লোক কুফরী কালেমা বলে ফেলে। তারা বলে থাকে যে, বৃষ্টির কারণ হলো অমুক তারকা।
হযরত যায়েদ ইবনে খালিদ জুহনী (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “আমরা হুদায়বিয়ায় অবস্থান করছিলাম, রাত্রে খুব বৃষ্টি বর্ষিত হয়েছিল। ফজরের নামাযের পর রাসূলুল্লাহ (সঃ) জনগণের দিকে মুখ করে বলেনঃ “আজ রাত্রে তোমাদের প্রতিপালক কি বলেছেন তা তোমরা জান কি?” জনগণ বললেনঃ “আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলই (সঃ) ভাল জানেন।” তখন তিনি বললেন, আল্লাহ তা'আলা বলেছেনঃ “আজ আমার বান্দাদের মধ্যে অনেকে কাফির হয়েছে এবং অনেকে মুমিন হয়েছে। যে বলেছে যে, আল্লাহর ফযল ও করমে বৃষ্টি বর্ষিত হয়েছে, সে আমার প্রতি বিশ্বাস স্থাপনকারী এবং তারকাকে অস্বীকারকারী। আর যে বলেছে যে, অমুক অমুক তারকার কারণে বৃষ্টি বর্ষিত হয়েছে, সে আমার সাথে কুফরী করেছে এবং তারকার উপর ঈমান এনেছে।” (এ হাদীসটি ইমাম মালিক (রঃ) স্বীয় মুআত্তা গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম মুসলিমও (রঃ) তাঁর সহীহ গ্রন্থে এটা বর্ণনা করেছেন)
হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আকাশ হতে যে বরকত নাযিল হয় তা কারো ঈমানের এবং কারো কুফরীর কারণ হয়ে থাকে (শেষ পর্যন্ত)।” (এ হাদীসটি ইমাম মুসলিম বর্ণনা করেছেন) হ্যাঁ, তবে এটা লক্ষ্যণীয় বিষয় যে, একবার হযরত উমার (রাঃ) হযরত আব্বাস (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করেছিলেনঃ “সুরাইয়া তারকা উদিত হতে কত দিন বাকী আছে?” তারপর তিনি বলেনঃ “জ্যোতির্বিদদের ধারণা এই যে, এই তারকা লুপ্ত হয়ে যাওয়ার এক সপ্তাহ পর আবার দিগন্তে প্রকাশিত হয়ে থাকে। বাস্তবে এটাই হয় যে, এই প্রশ্নোত্তর ও ইসতিসকার (পানির জন্যে প্রার্থনার) সাত দিন অতিক্রান্ত হতেই বৃষ্টি বর্ষিত হয়। তবে এ ঘটনাটি স্বভাব এবং অভিজ্ঞতার ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত। এটা নয় যে, ঐ তারকাকেই তিনি বৃষ্টি বর্ষণের কারণ মনে করতেন। কেননা, এ ধরনের আকীদা তো কুফরী! হ্যাঁ, তবে অভিজ্ঞতাবলে কোন কিছু জেনে নেয়া বা কোন কথা বলে দেয়া অন্য জিনিস। এই ব্যাপারে বহু হাদীস (আরবী) অর্থাৎ আল্লাহ মানুষের জন্যে যে রহমত খুলে দেন তা কেউ বন্ধ রাখতে পারে না। (৩৫:২) এই আয়াতের তাফসীরে গত হয়েছে।
রাসূলুল্লাহ (সঃ) একটি লোককে বলতে শুনেনঃ ‘অমুক তারকার প্রভাবে বৃষ্টি বর্ষিত হয়েছে। তখন তিনি বলেনঃ “তুমি মিথ্যা কথা বলেছে। এ বৃষ্টি তো আল্লাহ তাআলাই বর্ষণ করেছেন! এটা আল্লাহর রিযক।” (এটা ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন)
হযরত আবু উমামা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “যখনই রাত্রে কোন কওমের উপর বৃষ্টি বর্ষিত হয়েছে তখনই সকালে ঐ কওম ওর সাথে কুফরীকারী হয়েছে।” তারপর আল্লাহ তা'আলার নিম্নের উক্তিটি তিনি উদ্ধৃত করেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তোমরা মিথ্যারোপকেই তোমাদের উপজীব্য করে নিয়েছে।” অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন যে, তাদের মধ্যে কোন উক্তিকারী উক্তি করেঃ “অমুক অমুক তারকার প্রভাবে আমাদের উপর বৃষ্টি বর্ষিত হয়েছে। (এ হাদীসটিও ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন)
হযরত আবু সাঈদ (রাঃ) হতে মারফু' রূপে বর্ণিত আছেঃ “সাত বছর পর্যন্ত যদি মানুষ দুর্ভিক্ষের মধ্যে পতিত থাকে, তারপর যদি তাদের উপর বৃষ্টি বর্ষণ করা হয়, তবে তখনো তারা বলে বসবে যে, অমুক তারকা বৃষ্টি বর্ষণ করেছে।”
‘তোমরা মিথ্যারোপকেই তোমাদের উপজীব্য করে নিয়েছে। আল্লাহ পাকের এ উক্তি সম্পর্কে মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হলোঃ তোমরা এ কথা বলো না যে, অমুক প্রাচুর্যের কারণ হলো অমুক জিনিস, বরং বললঃ সব কিছুই আল্লাহ তাআলার পক্ষ হতে এসে থাকে। সুতরাং ভাবার্থ এটাও। আবার ভাবার্থ এও হতে পারে যে, কুরআনে তাদের কোনই অংশ নেই, বরং তাদের অংশ এটাই যে, তারা এই কুরআনের উপর মিথ্যারোপ করে থাকে। এই ভাবার্থের পৃষ্ঠপোষকতা করে নিম্নের আয়াতদ্বয়ঃ (আরবী)
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।