আল কুরআন


সূরা আর-রাহমান (আয়াত: 52)

সূরা আর-রাহমান (আয়াত: 52)



হরকত ছাড়া:

فيهما من كل فاكهة زوجان ﴿٥٢﴾




হরকত সহ:

فِیْهِمَا مِنْ کُلِّ فَاکِهَۃٍ زَوْجٰنِ ﴿ۚ۵۲﴾




উচ্চারণ: ফীহিমা-মিন কুল্লি ফা-কিহাতিন যাওজা-ন।




আল বায়ান: উভয়ের মধ্যে প্রত্যেক ফল থেকে থাকবে দু’ প্রকারের।




আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৫২. উভয় উদ্যানে রয়েছে প্ৰত্যেক ফল দুই দুই প্রকার।(১)




তাইসীরুল ক্বুরআন: উভয় বাগানে আছে প্রত্যেকটি ফলের দু’টি প্রকার।




আহসানুল বায়ান: (৫২) উভয় (বাগানে) রয়েছে প্রত্যেক ফল দুই প্রকার। [1]



মুজিবুর রহমান: উভয় উদ্যানে রয়েছে প্রত্যক ফল, জোড়ায় জোড়ায়।



ফযলুর রহমান: সে দুটিতে প্রত্যেক প্রকারের ফল জোড়ায় জোড়ায় রয়েছে।



মুহিউদ্দিন খান: উভয়ের মধ্যে প্রত্যেক ফল বিভিন্ন রকমের হবে।



জহুরুল হক: এ দুটোয় রয়েছে প্রত্যেক ফলমূলের জোড়া জোড়া।



Sahih International: In both of them are of every fruit, two kinds.



তাফসীরে যাকারিয়া

অনুবাদ: ৫২. উভয় উদ্যানে রয়েছে প্ৰত্যেক ফল দুই দুই প্রকার।(১)


তাফসীর:

(১) এখানে প্রথমোক্ত উদ্যানদ্বয়ের বিশেষণে (مِنْ كُلِّ فَاكِهَةٍ زَوْجَانِ) বলে ব্যক্ত করা হয়েছে যে, এগুলোতে সর্বপ্রকার ফল থাকবে। এর বিপরীতে শেষোক্ত উদ্যানদ্বয়ের বর্ণনায় শুধু فَاكِهَة বলা হয়েছে। زَوْجَان এর অর্থ এই যে, প্রত্যেক ফলের দুটি করে প্রকার হবে - শুষ্ক ও আর্দ্র। অথবা সাধারণ স্বাদযুক্ত ও অসাধারণ স্বাদযুক্ত। অথবা, উভয় বাগানের ফলই হবে সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের এবং স্বতন্ত্র বৈশিষ্টপূর্ণ। এক বাগানে গেলে গাছের শাখা প্রশাখায় প্রচুর ফল দেখতে পাবে। অপর বাগানে গেলে সেখানকার ফলের অবস্থা সম্পূর্ণ ভিন্ন দেখতে পাবে। অথবা, এর প্রতিটি বাগানের এক প্রকারের ফল হবে তার পরিচিত। তার সাথে সে দুনিয়াতেও পরিচিত ছিল-যদিও তা স্বাদে দুনিয়ার ফল থেকে অনেক শ্রেষ্ঠ হবে। আর আরেক প্রকার ফল হবে বিরল ও অভিনব জাতের-দুনিয়ায় যা সে কোন সময় কল্পনাও করতে পারেনি। [দেখুন: ইবন কাসীর; কুরতুবী]


তাফসীরে আহসানুল বায়ান

অনুবাদ: (৫২) উভয় (বাগানে) রয়েছে প্রত্যেক ফল দুই প্রকার। [1]


তাফসীর:

[1] অর্থাৎ, স্বাদ ও মজার দিক দিয়ে প্রতিটি ফল হবে দুই প্রকার। আর তা হবে বিশেষ অনুগ্রহের অতিরিক্ত একটি চিত্র। কেউ কেউ বলেছেন, এক প্রকার হবে শুকনো ফলের এবং অপরটি হবে টাটকা ফলের মজা।


তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ


তাফসীর: ৪৬-৭৮ নম্বর আয়াতের তাফসীর :



পূর্বের আয়াতে জাহান্নামীদের দুর্ভোগের কথা আলোচনার পর এখানে জান্নাতীদের পরম সুখ সাচ্ছন্দ্যের কথা তুলে ধরেছেন।



(وَلِمَنْ خَافَ مَقَامَ رَبِّه۪ جَنَّتٰنِ)



‘আর যে ব্যক্তি আল্লাহর সামনে উপস্থিত হওয়ার ভয় রাখে, তার জন্য রয়েছে দু‘টি জান্নাত’ ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন : যে ব্যক্তি এ ভয় করে যে, কিয়ামতের দিন স্বীয় প্রতিপালকের সামনে দাঁড়িয়ে হিসাব দিতে হবে সে আল্লাহ তা‘আলার অবাধ্য কাজ হতে বিরত থাকে এবং নিজেকে কু-প্রবৃত্তি হতে হেফাযত করে, দুনিয়াকে প্রাধান্য না দিয়ে আখিরাতকে প্রাধান্য দেয় এবং সে জানে আখিরাতই শ্রেষ্ঠ। ফলে শরীয়তের ফরযগুলো যথাযথ আদায় করে, হারাম কাজ থেকে বিরত থাকে তার জন্য কিয়ামত দিবসে দু’টি জান্নাত। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন : দু’টি জান্নাত হবে রৌপ্যের এবং তার আসবাবপত্রসহ তার ভেতরে যা কিছু আছে সব।



আর দুটি জান্নাত হবে স্বর্ণের এবং তার আসবাবপত্র ও তার ভেতরে যা আছে সব। জান্নাতবাসী ও আল্লাহর দীদারের মাঝে কোন প্রতিবন্ধকতা থাকবে না কেবলমাত্র তাঁর কিবরিয়ার চাঁদর যা তাঁর চেহারার ওপর, থাকবে। এটা থাকবে আদন নামক জান্নাতে। (সহীহ বুখারী হা. ৪৮৮০, সহীহ মুসলিম, অনুচ্ছেদ : মু’মিনরা কিয়ামতের দিন আল্লাহকে দেখবে)



আবূ দারদা (রাঃ) একদা নাবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে মিম্বারে বর্ণনা করতে শুনলেন



(وَلِمَنْ خَافَ مَقَامَ رَبِّه۪ جَنَّتٰنِ)



‘আর যে ব্যক্তি আল্লাহর সামনে উপস্থিত হওয়ার ভয় রাখে, তার জন্য রয়েছে দু‘টি জান্নাত’ আমি বললাম : হে আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)! সে যদি ব্যভিচার করে ও চুরি করে? রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) দ্বিতীয়বার উক্ত আয়াত তেলাওয়াত করলেন। আমি দ্বিতীয়বার বললাম : হে আল্লাহর রাসূল! সে যদি ব্যভিচার করে ও চুরি করে? রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তৃতীয়বার প্রাগুক্ত আয়াত তেলাওয়াত করলেন। আমি তৃতীয়বার বললাম : হে আল্লাহর রাসূল! সে যদি ব্যভিচার করে ও চুরি করে? তিনি বলেন, যদিও আবূ দারদার নাক ধূলায় ধূসরিত হয়। (সনদ সহীহ, আহমাদ হা. ৮৬৮৩)



(ذَوَاتَآ أَفْنَانٍ) ‘উভয়টি বহু শাখাপল্লববিশিষ্ট বৃক্ষে ফলমূল দ্বারা ভরপুর’ أَفْنَانٍ শব্দটি فن এর বহুবচন, অর্থ ডালপালা। এখানে ইঙ্গিত করা হয়েছে যে, তাতে ছায়া হবে ঘন ও সুনিবিড়। অনুরূপ ফলও হবে অধিক হারে। প্রতিটি ডাল ফলে পরিপূর্ণ থাকার কারণে ডালগুলো ঝুঁকে পড়বে। (ইবনু কাসীর)



রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন : নিশ্চয়ই জান্নাতে একটি গাছ রয়েছে, একজন আরোহী দ্রুতগতিসম্পন্ন একটি ঘোড়ায় চড়ে ১০০ বছর চলেও তা অতিক্রম করতে পারবে না। অন্য বর্ণনায় রয়েছে একজন আরোহী তার ছায়ার নীচ দিয়ে একশত বছর অতিক্রম করেও শেষ করতে পারবে না। (সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিম হা. ২৮২৮, ২৮২৬)



(فِيْهِمَا عَيْنَانِ تَجْرِيٰنِ)



‘উভয়টিতে রয়েছে সদা প্রবহমান দু‘টি ঝর্ণাধারা’ দু’টি প্রস্রবণের একটি হলো “তাসনীম” অপরটি হলো “সাল সাবিল” এ উক্তি হাসান বাসরী (রহঃ)। (ইবনু কাসীর)



(فِيْهِمَا مِنْ كُلِّ فَاكِهَةٍ زَوْجٰنِ)



‘উভয় বাগানে রয়েছে প্রত্যেক ফল দুই প্রকার’ অর্থাৎ প্রত্যেক শ্রেণির ফল হবে দুপ্রকারের। প্রত্যেকটির স্বাদ ও রং হবে ভিন্ন তবে সবই সুস্বাদু ও মিষ্টি। ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন, দুনিয়াতে কোন মিষ্টি বা টক গাছ নেই যার অনুরূপ জান্নাতে নেই এমনকি মাকালফল গাছও জান্নাতে থাকবে তবে তাও মিষ্টি হবে (কুরতুবী)।



(مُتَّكِئِيْنَ عَلٰي فُرُشٍۭ بَطَآئِنُهَا....)



‘সেখানে তারা হেলান দিয়ে বসবে” এটা হলো জান্নাতীদের জন্য তৈরি করে রাখা বিছানার বৈশিষ্ট্য। জান্নাতীরা আরাম ও আয়েশের জন্য সে সব বিছানায় রাজা বাদশাদের মতো হেলান দিয়ে বসে থাকবে- এখানে জান্নাতী বিছানার শুধু ভেতরের সৌন্দর্যের কথা বলা হয়েছে। বাহ্যিক সৌন্দর্য কেমন হবে তা আল্লাহ তা‘আলা ছাড়া কেউ জানে না। শব্দটি بطانة এর বহুবচন, যা অভ্যন্তরে থাকে, ভেতর দিক। মোটা রেশমী কাপড়কে إِسْتَبْرَقٍ বলা হয়।



(وَجَنَي الْجَنَّتَيْنِ دَانٍ)



অর্থাৎ জান্নাতের ফল এত নিকটবর্তী হবে যে, বসে বসে এমনকি শুয়ে শুয়ে পাড়তে পারবে। আল্লাহ বলেন :



(وَدَانِيَةً عَلَيْهِمْ ظِلَالُهَا وَذُلِّلَتْ قُطُوْفُهَا تَذْلِيْلًا)



“জান্নাতের বৃক্ষছায়া তাদের ওপর ঝুঁকে থাকবে এবং ওর ফলমূল সম্পূর্ণরূপে তাদের আয়ত্তাধীন থাকবে।” (সূরা দাহর ৭৬ : ১৪)



যেমন আল্লাহ বলেন : (قُطُوْفُهَا دَانِيَةٌ)



“যার ফল-ফলাদি অতি নিকটে নাগালের মধ্যে থাকবে।” (সূরা হাক্কাহ্ ৬৯ : ২৩)



(فِيْهِنَّ قٰصِرٰتُ الطَّرْفِ.....)



‘‘সেখানে রয়েছে বহু আনতনয়না স্ত্রীগণ....” সে সকল বিছানায় রয়েছে এমন নারী যারা তাদের দৃষ্টিকে নিজ স্বামী ছাড়া অন্যদের থেকে অবনত রাখে। ইবনু জায়েদ বলেন : বর্ণিত আছে যে, জান্নাতী প্রত্যেক নারী তার স্বামীকে লক্ষ্য করে বলবে : আল্লাহর শপথ! আপনার চেয়ে উত্তম জান্নাতে আর কিছু দেখছি না। জান্নাতে আপনার চেয়ে আমার নিকট প্রিয় আর কিছুই নেই। তাই আল্লাহ তা‘আলার প্রশংসা যিনি আপনাকে আমার ভাগে দিয়েছেন। (ইবনু কাসীর)



(لَمْ يَطْمِثْهُنَّ إِنْسٌ.....)



অর্থাৎ তারা হবে কুমারী, নব-যুবতী ও অবিবাহিতা যাদের সাথে কোন পুরুষ বা জিন সহবাস করেনি। এ আয়াত প্রমাণ করছে যে, জিন মু‘মিনরাও জান্নাতে যাবে, যেমন মানুষ মু’মিনরা জান্নাতে যাবে।



এ সকল জান্নাতী নারীদের আরো বৈশিষ্ট্য হল :



(كَأَنَّهُنَّ الْيَاقُوْتُ وَالْمَرْجَانُ)



অর্থাৎ মণিমুক্তা যেমন পরিস্কার স্বচ্ছ, তারাও ঠিক এমন।



রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন : জান্নাতী নারীরা এমন যে, তার পদনালীর শুভ্রতা সত্তরটি রেশমের হুল্লার (পোশাক বিশেষ) মধ্য হতেও দেখা যাবে, এমনকি ভেতরের মজ্জাও দৃষ্টি-গোচর হবে। (তিরমিযী হা. ২৫৩৩, সহীহ)



অতঃপর তিনি



(كَأَنَّهُنَّ الْيَاقُوْتُ وَالْمَرْجَانُ)



‘তারা যেন হীরা ও মতি’ আয়াতটি তিলাওয়াত করেন এবং বলেন : ইয়াকুত একটি পাথর বটে কিন্তু যদি ওর মধ্যে সুতো পরিয়ে দেয়া হয় তবে বাইরে থেকে তা দেখা যাবে। (তিরমিযী হা. ২৫৩৩, হাসান সহীহ)



এ ছাড়াও জান্নাতী নারীদের সৌন্দর্য ও স্বামীর প্রতি তাদের ভালবাসার গভীরতার ব্যাপারে অনেক সহীহ হাদীস রয়েছে।



(هَلْ جَزَا۬ءُ الْإِحْسَانِ)



‘উত্তম কাজের পুরস্কার উত্তম (জান্নাত) ব্যতীত আর কী হতে পারে?’ আয়াতের প্রথম إحسان ইহসান এর অর্থ হলো : সৎ কর্ম ও আল্লাহ তা‘আলার আনুগত্য। আর দ্বিতীয় إحسان এর অর্থ হলো : প্রতিদান। অর্থাৎ যারা সৎকর্ম ও আল্লাহ তা‘আলার আনুগত্য করে তাদের জন্য উত্তম প্রতিদান ছাড়া আরো কিছু আছে কি? না, তাদের জন্য উত্তম প্রতিদানই রয়েছে।



(وَمِنْ دُوْنِهِمَا جَنَّتٰنِ)



অর্থাৎ এ জান্নাত দু’টি মর্যাদা ও ফযীলতের দিক দিয়ে সমান, এছাড়াও আরো দু’টি জান্নাত রয়েছে। যেমন ৪৬ নম্বর আয়াতের তাফসীরে হাদীস গত হয়েছে। অন্য একটি বর্ণনায় বলা হয়েছে স্বর্ণের জান্নাত مقربين তথা নৈকট্যশীলদের জন্য আর রৌপ্যের জান্নাত ডানপন্থীদের জন্য।



আব্দুল্লাহ ইবনু কায়েস (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন : রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন : (জান্নাতের মধ্যে) দুটি বাগান থাকবে। এ দুটির সকল পাত্র এবং এর ভেতর সকল বস্তু রৌপ্য নির্মিত হবে এবং (জান্নাতে) আরো দুটি বাগান থাকবে- এ দুটির সকল পাত্র এবং ভেতরের সকল বস্তু স্বর্ণের তৈরি হবে। জান্নাতে আদনের মধ্যে জান্নাতী লোকেরা তাদের প্রতিপালকের দর্শন লাভ করবে। এ জান্নাতবাসী এবং তাদের প্রতিপালকের এ দর্শনের মাঝে আল্লাহ তা‘আলার সত্তার ওপর জড়ানো তাঁর বড়ত্বের চাদর ছাড়া আর কোন অন্তরাল থাকবে না। (সহীহ বুখারী হা. ৪৮৭৮, সহীহ মুসলিম হা. ৭৪৪৪)



(مُدْهَآمَّتٰنِ)



অর্থাৎ অত্যধিক সতেজ ও সবুজ হওয়ার কারণে তা কালোর মতো দেখাবে।



(نَضَّاخَتٰنِ) অর্থাৎ فوارثان বা উচ্ছলিত।



(فِيْهِنَّ خَيْرَاتٌ حِسَانٌ)



‘সে সকলের মাঝে রয়েছে উত্তম চরিত্রের সুন্দরীগণ’ অধিকাংশ বিদ্বান বলেন : সতী সাধ্বী মহিলা যারা উত্তম চরিত্র ও অবয়বের অধিকারিণী। আবার বলা হয় জান্নাতে অনেক কল্যাণ রয়েছে (ইবনু কাসীর)।



(حُوْرٌ مَّقْصُوْرَاتٌ فِي الْخِيَامِ)



‘তাঁবুতে থাকবে সুরক্ষিত হূর’ রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন : জান্নাতে মতির তাঁবু হবে। তার প্রস্থ হবে ৬০ মাইল। তার প্রতি কোণে থাকবে জান্নাতী স্ত্রী। এক কোণের লোকদের অপর কোণের লোকেরা দেখতে পাবে না। মু’মিনরা তাতে বিচরণ করবে। (সহীহ বুখারী হা. ৩২৪৩)



( مُتَّكِئِيْنَ عَلٰي رَفْرَفٍ.....)



‘তারা হেলান দিয়ে বসবে এমন সবুজ আসনে এবং সুন্দর গালিচা’ অর্থ মসনদ, বালিশ, গালিচা অথবা এ ধরণের উৎকৃষ্ট বিছানা।



عَبْقَرِيٍّ প্রত্যেক উৎকৃষ্ট ও মূল্যবান জিনিসকে বলা হয়। নাবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ‘উমার (রাঃ)-এর ক্ষেত্রে এ শব্দ ব্যবহার করেছিলেন। আমি কোন প্রভাবশালী ব্যক্তি এমন দেখিনি যে, ‘উমারের মতো কাজ করতে পারে। (সহীহ বুখারী হা. ৩৬৮২, সহীহ মুসলিম, অনুচ্ছেদ : ‘উমার (রাঃ)-এর ফযীলত) অর্থাৎ জান্নাতীরা এমন আসনে হেলান দিয়ে উপবেশন করবে, যার ওপর সবুজ রঙের মসনদ, গালিচা এবং কারুকার্য খচিত উৎকৃষ্টমানের বিছানা বিছানো থাকবে।



(تَبَارَكَ اسْمُ رَبِّكَ ذِي الْجَلَالِ وَالْإِكْرَامِ)



‘বরকতময় তোমার প্রতিপালকের নাম যিনি মহিমান্বিত ও সম্মানিত’ ‘আয়িশাহ্ (রাঃ) বলেন : রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সালাত শেষে এ দু‘আ পরিমাণ বসতেন :



اللّٰهُمَّ أَنْتَ السَّلَامُ وَمِنْكَ السَّلَامُ، تَبَارَكْتَ ذَا الْجَلَالِ وَالْإِكْرَامِ



হে আল্লাহ তা‘আলা আপনি সালাম (শান্তি) আপনার পক্ষ থেকেই শান্তি আসে, আপনি বরকতময় হে মহিমান্বিত ও সম্মানিত। (সহীহ মুসলিম হা. ৫৯১)



সুতরাং প্রত্যেক মু‘মিন ব্যক্তির অবশ্যই এমন নেয়ামতপূর্ণ জান্নাতে প্রবেশ আশা করা উচিত। শুধু আশা করলেই হবে না, সাথে সাথে সে নেয়ামতপূর্ণ জান্নাতের পাথেয় সংগ্রহ করতে হবে। আল্লাহ তা‘আলা আমাদেরকে তাঁর নেয়ামতপূর্ণ জান্নাতে প্রবেশের পাথেয় সংগ্রহ করার তাওফীক দান করুন! আমীন।



আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয় :



১. নেয়ামতে ভরপুর জান্নাতের বিবরণ পেলাম।

২. জান্নাতীদের আরাম-আয়েশ ইত্যাদি সম্পর্কে অবগত হলাম।

৩. জান্নাতী নারীদের বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে জানলাম।

৪. দুনিয়াতে ঈমানের সাথে সৎ আমল করলে আখিরাতে এ নেয়ামতপূর্ণ জান্নাত লাভ করবে।

৫. মহিয়ান গরিয়ান বরকতময় আল্লাহ তা‘আলা প্রদত্ত আমাদের ওপর প্রতিনিয়ত অসংখ্য নেয়ামতের শুকরিয়া আদায় করা উচিত।


তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)


তাফসীর: ৪৬-৫৩ নং আয়াতের তাফসীর:

ইবনে শাওযিব (রঃ) ও আতা খুরাসানী (রঃ) বলেন যে, (আরবী)-এ আয়াতটি হযরত আবু বকর (রাঃ)-এর ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়। হযরত আতিয়্যা ইবনে কায়েস (রঃ) বলেন যে, এ আয়াতটি ঐ লোকটির ব্যাপারে অবতীর্ণ হয় যে বলেছিলঃ “তোমরা আমাকে আগুনে পুড়িয়ে ফেলবে, তাহলে সম্ভবতঃ আল্লাহ তা'আলা আমাকে খুঁজে পাবেন না।” একথাটি বলার পর লোকটি একদিন ও এক রাত ধরে তাওবা করে এবং আল্লাহ তাআলা তার তাওবা কবূল করেন ও তাকে জান্নাতে নিয়ে যান। কিন্তু সঠিক কথা এই যে, আয়াতটি সাধারণ। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর উক্তি এটাই। ভাবার্থ এই যে, যে ব্যক্তি কিয়ামতের দিন স্বীয় প্রতিপালকের সামনে দাঁড়ানোর ভয় করে এবং নিজেকে কুপ্রবৃত্তি হতে বাঁচিয়ে রাখে, হঠকারিতা করে না, পার্থিব জীবনের পিছনে পড়ে আখিরাত হতে উদাসীন থাকে না, বরং আখিরাতের চিন্তাই বেশী করে এবং ওটাকে উত্তম ও চিরস্থায়ী মনে করে, ফরয কাজগুলো সম্পাদন করে এবং হারাম কাজগুলো হতে দূরে থাকে, কিয়ামতের দিন তাকে একটি নয়, বরং দু’টি জান্নাত দান করা হবে।

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে কায়েস (রাঃ) তাঁর পিতা হতে বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “দু'টি জান্নাত চাদির হবে এবং ওর সমস্ত আসবাবপত্রও চাদিরই হবে। আর দুটো জানাত হবে স্বর্ণ নির্মিত। ওর বরতন এবং ওতে যা কিছু রয়েছে সবই হবে সোনার। ঐ জান্নাতবাসীদের মধ্যে ও আল্লাহর দীদারের (দর্শনের) মধ্যে কোন প্রতিবন্ধকতা থাকবে না, থাকবে শুধু তাঁর কিবরিয়ার চাদর যা তার চেহারার উপর থাকবে। এটা থাকবে জান্নাতে আদনে।” (এ হাদীসটি ইমাম বুখারী (রঃ) বর্ণনা করেছেন। সহীহ হাদীস গ্রন্থগুলোর মধ্যে সুনানে আবি দাউদ ছাড়া অন্যান্য সব গ্রন্থেই এ হাদীসটি বর্ণিত হয়েছে)

এ হাদীসের বর্ণনাকারী হযরত হাম্মাদ (রঃ) বলেনঃ আমার ধারণায় তো এ হাদীসটি মার। এটা (আরবী) এবং (আরবী)-এর তাফসীর।

স্বর্ণ নির্মিত জান্নাত দুটি আল্লাহ তা'আলার নৈকট্যলাভকারী লোকেদের জন্যে এবং চাদি বা রৌপ্য নির্মিত জান্নাত দুটি আসহাবে ইয়ামীন বা ডান দিকের লোকদের জন্যে।

হযরত আবু দারদা (রাঃ) বলেনঃ “একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ)। আয়াতটি পাঠ করেন। তখন আমি বললামঃ যদিও সে ব্যভিচার করে ও চুরি করে? আবার তিনি এ আয়াতটি পাঠ করলেন এবং আমিও আবার ঐ প্রশ্নটি করলাম। পুনরায় তিনি আয়াতটি পাঠ করলেন এবং আমিও পুনরায় ঐ প্রশ্নই করলাম। তখন তিনি বললেনঃ “যদি আবু দারদা (রাঃ)-এর নাক ধুলায় ধূসরিত হয়। (এ হাদীসটি ইমাম নাসাঈ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)

কোন কোন সনদে এ রিওয়াইয়াতটি মাওকুফ রূপেও বর্ণিত আছে এবং আবু দারদা (রাঃ) হতে এটাও বর্ণিত আছে যে, যার অন্তরে আল্লাহর সামনে দণ্ডায়মান হওয়ার ভয় রয়েছে তার দ্বারা ব্যভিচার ও চুরি অসম্ভব।

এ আয়াতটি সাধারণ, দানব ও মানব উভয়ই এর অন্তর্ভুক্ত এবং এটা একথার স্পষ্ট প্রমাণ যে, জ্বিনদের মধ্যে যারা ঈমান আনয়ন করবে এবং আল্লাহর ভীতি অন্তরে রাখবে তারাও জান্নাতে যাবে। এ জন্যেই এরপরে দানব ও মানবকে সম্বোধন করে বলা হয়েছেঃ “সুতরাং তোমরা উভয়ে তোমাদের প্রতিপালকের কোন অনুগ্রহ অস্বীকার করবে?”

এরপর আল্লাহ তা'আলা জান্নাত দুটির গুণাবলী বর্ণনা করছেন যে, উভয় জান্নাতই বহু শাখা-পল্লব বিশিষ্ট বৃক্ষে পূর্ণ। নানা প্রকারের সুস্বাদু ফল তথায় বিদ্যমান রয়েছে। সুতরাং দানব ও মানবের উচিত নয় যে, তারা তাদের প্রতিপালকের কোন অনুগ্রহকে অস্বীকার করে। (আরবী) বলা হয় শাখা বা ডালকে। এগুলো বহু সংখ্যক রয়েছে এবং একটি অপরটির সাথে মিলিতভাবে আছে। এগুলো ছায়াদার হবে, যেগুলোর ছায়া দেয়ালগুলোর উপরও উঠে থাকবে। এই শাখাগুলো সোজা হবে ও ছড়িয়ে থাকবে। ওগুলো রঙ বেরঙ এর হবে। ভাবার্থ এও বর্ণনা করা হয়েছে যে, ওগুলো বিভিন্ন প্রকারের ফল থাকবে।

হযরত আসমা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) সিদরাতুল মুনতাহার বর্ণনা করতে গিয়ে বলেনঃ “ওর শাখাগুলোর ছায়া এতো দীর্ঘ হবে যে, একজন অশ্বারোহীর এক শত বছর পর্যন্ত ঐ ছায়ায় চলে যাবে।” অথবা বলেছেনঃ “একশ জন অশ্বারোহী ওর নীচে ছায়া গ্রহণ করতে পারবে।” সোনার ফড়িংগুলো তাতে ছেয়েছিল। ওর ফলগুলো ছিল বড় বড় মটকার মত অত্যন্ত বড় ও গোল।” (হাদীসটি ইমাম তিরমিযী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)

ঐ জান্নাতদ্বয়ের মধ্য দিয়ে দুটি প্রস্রবণ প্রবাহিত হচ্ছে যাতে ঐ উদ্যানগুলোর গাছ ও শাখা সজীব ও সতেজ থাকে এবং অধিক ও উন্নত মানের ফল দান করে। তাই মহান আল্লাহ বলেনঃ অতএব হে দানব ও মানব! তে প্রতিপালকের কোন অনুগ্রহ অস্বীকার করবে?

প্রস্রবণ দুটির একটির নাম তাসনীম এবং অপরটির নাম সালসাবীল। এ দুটি প্রস্রবণ পূর্ণভাবে প্রবাহিত রয়েছে। একটি হলো স্বচ্ছ ও নির্মল পানির এবং অপরটি হলো সুস্বাদু সুরার যাতে নেশা ধরবে না।

মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ উভয় উদ্যানে রয়েছে প্রত্যেক ফল দুই প্রকার। আরো বহু ফল রয়েছে যেগুলোর আকৃতি তোমাদের নিকট পরিচিত কিন্তু স্বাদ মোটেই পরিচিত নয়। কেননা, তথাকার নিয়ামত না কোন চক্ষু দেখেছে, না কোন কর্ণ শুনেছে, না মানুষের অন্তরে ওর কল্পনা জেগেছে। সুতরাং তোমরা উভয়ে তোমাদের প্রতিপালকের কোন নিয়ামত অস্বীকার করবে?

হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, দুনিয়ায় যত প্রকারের তিক্ত ও মিষ্ট ফল আছে এগুলোর সবই জান্নাতে থাকবে, এমনকি হানযাল ফলও থাকবে। যা, এ তবে দুনিয়ার এই জিনিসগুলো এবং জান্নাতের ঐ জিনিসগুলোর নামে তো মিল থাকবে বটে, কিন্তু স্বাদ হবে সম্পূর্ণ পৃথক। এখানে তো শুধু নাম রয়েছে, মূলতত্ব তো রয়েছে জান্নাতে। এই মর্যাদার পার্থক্য ওখানে যাবার পরেই জানা যেতে পারে, পূর্বে জানা সম্ভব নয়।





সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।