সূরা আত-তূর (আয়াত: 30)
হরকত ছাড়া:
أم يقولون شاعر نتربص به ريب المنون ﴿٣٠﴾
হরকত সহ:
اَمْ یَقُوْلُوْنَ شَاعِرٌ نَّتَرَبَّصُ بِهٖ رَیْبَ الْمَنُوْنِ ﴿۳۰﴾
উচ্চারণ: আম ইয়াকূলূনা শা-‘ইরুন নাতারাব্বাসুবিহী রাইবাল মানূন।
আল বায়ান: তারা কি বলছে, ‘সে (মুহাম্মাদ) একজন কবি? আমরা তার মৃত্যুর প্রতীক্ষা করছি।’
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৩০. নাকি তারা বলে, সে একজন কবি? আমরা তার মৃত্যুর প্রতীক্ষা করছি।
তাইসীরুল ক্বুরআন: তারা কি বলে সে একজন কবি, যার জন্য আমরা কালচক্রের (বিপদাপদের) অপেক্ষা করছি।
আহসানুল বায়ান: (৩০) তারা কি বলতে চায় যে, ‘সে একজন কবি? আমরা তার জন্য কালের বিপর্যয়ের (মৃত্যুর) প্রতীক্ষা করছি।’ [1]
মুজিবুর রহমান: তারা কি বলতে চায় যে, সে একজন কবি, আমরা তার জন্য কালের বিপর্যয়ের প্রতীক্ষা করছি।
ফযলুর রহমান: নাকি তারা বলে, “সে একজন কবি, আমরা যার বিপদের প্রতীক্ষায় আছি?”
মুহিউদ্দিন খান: তারা কি বলতে চায়ঃ সে একজন কবি আমরা তার মৃত্যু-দুর্ঘটনার প্রতীক্ষা করছি।
জহুরুল হক: অথবা তারা কি বলে -- "একজন কবি, আমরা বরং তার জন্য অপেক্ষা করি কালের কবলে পড়ার দরুন?
Sahih International: Or do they say [of you], "A poet for whom we await a misfortune of time?"
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ৩০. নাকি তারা বলে, সে একজন কবি? আমরা তার মৃত্যুর প্রতীক্ষা করছি।
তাফসীর:
-
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (৩০) তারা কি বলতে চায় যে, ‘সে একজন কবি? আমরা তার জন্য কালের বিপর্যয়ের (মৃত্যুর) প্রতীক্ষা করছি।” [1]
তাফসীর:
[1] رَيْبٌ এর অর্থ, বিপর্যয়, দুর্ঘটনা। مَنُوْنٌ মৃত্যুর নামসমূহের একটি নাম। আয়াতের তাৎপর্য হল, মক্কার কুরাইশগণ এই অপেক্ষায় ছিল যে, হয়তো মুহাম্মাদ কালের কোন দুর্ঘটনায় মারা যাবে, আর আমরা স্বস্তি লাভ করব; যে স্বস্তি তার তাওহীদের দাওয়াত আমাদের কাছে থেকে ছিনিয়ে নিয়েছে।
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ২৯-৪২ নম্বর আয়াতের তাফসীর :
এ আয়াতগুলোর শুরুতে নাবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর উপর কাফির-মুশরিক কর্তৃক আরোপ করা তিনটি খারাপ বৈশিষ্ট্য অপনোদন করছেন-
(১) রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তিনি গণক নন। (২) তিনি উন্মাদও নন এবং (৩) তিনি কোন কবিও না।
আল্লাহ তা‘আলা বলেন :
(وَمَا عَلَّمْنٰھُ الشِّعْرَ وَمَا یَنْۭبَغِیْ لَھ۫ﺚ اِنْ ھُوَ اِلَّا ذِکْرٌ وَّقُرْاٰنٌ مُّبِیْنٌ)
“আমি তাঁকে (রাসূলকে) কবিতা শিক্ষা দেইনি এবং তা তাঁর জন্য শোভনীয়ও নয়। এটা কেবল এক উপদেশ এবং সুস্পষ্ট কুরআন। ” (সূরা ইয়া-সীন ৩৬ :৬৯)
তাই আল্লাহ তা‘আলা নাবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) থেকে উক্ত তিনটি খারাপ বৈশিষ্ট্য অপনোদন করার পর দা‘ওয়াতী কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিচ্ছেন।
رَيْبَ -এর অর্থ : বিপর্যয়, দুর্ঘটনা। مَمْنُوْنِ মৃত্যুর নামসমূহের একটি নাম। আয়াতের তাৎপর্য হলো : মক্কার কুরাইশরা এ অপেক্ষায় ছিল যে, হয়তো মুহাম্মাদ কালের কোন দুর্ঘটনায় মারা যাবে, আর আমরা স্বস্তি লাভ করব।
(فَإِنِّيْ مَعَكُمْ مِّنَ الْمُتَرَبِّصِيْنَ)
অর্থাৎ আমিও তোমাদের সাথে অপেক্ষায় রয়েছি। দেখ, কার মৃত্যু আগে আসে। তারপর আল্লাহ তা‘আলা ৩২-৪৩ নম্বর আয়াত পর্যন্ত অস্বীকৃতিসূচক কাফিরদেরকে প্রশ্ন করছেন, যার না-বোধক উত্তর আসবে।
প্রথমেই আল্লাহ তা‘আলা তাদের এই চলমান কৃতকর্মের কারণ জিজ্ঞাসা করছেন যে, তারা এরূপ কেন করছে? তারা কি তাদের বিবেক-বুদ্ধি অনুযায়ী এ কাজ করছে? আল্লাহ নিজেই উত্তর দিচ্ছেন যে, না- বিবেক তো আমিই তাদের দিয়েছি, বিবেক খাটিয়ে যদি তারা কাজ করতো তাহলে তারা সঠিক পথ পেত। আসলে তারা হলো অবাধ্য ও সীমালঙ্ঘনকারী সম্প্রদায়।
অতঃপর আল্লাহ তা‘আলা কুরআন নিয়ে তাদের মন্তব্য ও তার বিপরীতে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছেন। আল্লাহ বলেন, তারা কি বলতে চায় যে, এ কুরআন মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নিজের রচনা করা গ্রন্থ? যদি তারা তাই মনে করে তাহলে তারাও তার মতোই একটি গ্রন্থ রচনা করে নিয়ে আসুক। এ ব্যাপারে পূর্বে সূরা বাকারাসহ অন্যান্য স্থানে আলোচনা করা হয়েছে।
তারপর আল্লাহ তা‘আলা তাদের ক্ষমতা কতটুকু তার প্রতি ইঙ্গত দিচ্ছেন যে, তারা কি এমনিতেই সৃষ্ট না তাদের কোন স্রষ্টা রয়েছে? আসলে স্রষ্টা ব্যতীত যে কোন কিছু সৃষ্টি হয় না তারই কথা আল্লাহ জানালেন। আল্লাহ তা‘আলা আরো বললেন, তারা কি নিজেরাই নিজেদের স্রষ্টা? তারা কি আসমানসমূহ ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছে? তাদের নিকট কি তাদের রবের ভাণ্ডার রয়েছে, নাকি তার নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব তাদের রয়েছে যে, তারা তা নিয়ন্ত্রণ করছে? নাকি তাদের জন্য আসমানে উঠার সিঁড়ি রয়েছে? যদি থাকে তাহলে তাদের মধ্যে যে ঐ সিঁড়ি বেয়ে আসমানে উঠে সেখান থেকে কিছু শুনেছে তা দলিল হিসাবে পেশ করুক।
প্রকৃত কথা এই যে, উল্লেখিত কোন কিছুর মালিকই তারা নয়, তবে তারা কিসের অহংকার করছে? যদি তাদের কোন কিছু করার ক্ষমাত না-ই থাকে তাহলে তাদের উচিত আত্মসমর্পণ করা।
এরপর মুশরিকদের একটা ভ্রান্ত বিশ্বাসের বিষয়ে বলছেন যে, তারা বলে : ফিরিশ্তারা আল্লাহর কন্যা। অথচ কন্যা সন্তান তাদেরই অপছন্দের বস্তু। তাই আল্লাহ তা‘আলা বলেন, কন্যা সন্তান আল্লাহর জন্য আর পুত্র সন্তান তোমাদের জন্য? এ কেমন বণ্টন?
এরপর আল্লাহ তাদের অস্বীকৃতির কারণ হিসেবে জিজ্ঞাসা করছেন, তুমি কি তাদের কাছে কোন পারিশ্রমিক চাচ্ছ, যে কারণেই তারা তোমার কথা শুনতে চাচ্ছে না? আসল বাস্তবতা তাও নয়। নাকি তারা অদৃশ্যের খরব রাখে, যেজন্য তুমি যা বলছ তা তারা অস্বীকার করছে যে, তুমি যা বলছ তা মিথ্যা যার ফলে তারা বিশ্বাস করে যে, তোমার কথা ঠিক নয়; নাকি তারা ইচ্ছাকৃতই কোন ষড়যন্ত্র করছে আর বাস্তব কথা সেটাই। তাদের জেনে রাখ দরকার যে, তারাই তাদের ষড়যন্ত্রে ধ্বংশ হয়ে যাবে।
আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয় :
১. রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কোন গণক, জাদুকর বা পাগল নন যা কাফেররা বলে থাকে। দায়ীদের এ থেকে শিক্ষা নিতে হবে। কেননা এমন কথা তাদের ক্ষেত্রেও বলা হতে পারে, তাই ধৈর্য ধারন করতে হবে।
২. আল্লাহর মুখলেস বান্দাদের তিনি সবসময় সাহায্য করে থাকেন।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: ২৯-৩৪ নং আয়াতের তাফসীর:
আল্লাহ তাআলা স্বীয় নবী (সঃ)-কে নির্দেশ দিচ্ছেন যে, তিনি যেন তার রিসালাত তাঁর বান্দাদের নিকট পৌছাতে থাকেন। সাথে সাথে দুষ্ট লোকেরা তাকে যে দোষে দোষী করছে তা হতে তাঁকে তিনি মুক্ত ও পবিত্র বলে ঘোষণা করছেন। কাহেন বা গণক ঐ ব্যক্তিকে বলে যার কাছে মাঝে মাঝে কোন জ্বিন কোন খবর পৌছিয়ে থাকে। তাই আল্লাহ পাক তাঁর নবী (সঃ)-কে বলছেনঃ হে নবী (সঃ)! তুমি উপদেশ দান করতে থাকো। তোমার প্রতিপালক আল্লাহর অনুগ্রহে তুমি গণকও নও এবং পাগলও নও।
এরপর কাফিরদের উক্তি উদ্ধৃত করা হচ্ছে যে, তারা বলেঃ “মুহাম্মাদ (সঃ) একজন কবি ছাড়া কিছুই নন। তিনি ইন্তেকাল করলে কেই বা তাঁর মত হবে এবং কেই বা তার দ্বীন রক্ষা করবে? তাঁর মৃত্যুর সাথে সাথেই তার দ্বীন বিদায় গ্রহণ করবে। তাদের একথার জবাবে মহান আল্লাহ বলেনঃ হে নবী (সঃ)! তুমি তাদেরকে বলে দাও- তোমরা প্রতীক্ষা কর, আমিও তোমাদের সাথে প্রতীক্ষা করছি। ভাল পরিণাম এবং চিরস্থায়ী সফলতা লাভ কার হয় তা দুনিয়া শীঘ্রই জানতে পারবে।
দারুন নাদওয়াতে কুরায়েশরা পরামর্শ করে যে, অন্যান্য কবিদের মত মুহাম্মাদ (সঃ) একজন কবি। সুতরাং তাকে বন্দী করা হোক, যাতে তিনি সেখানে ধ্বংস হয়ে যান। যেমন পরিণাম হয়েছিল কবি যুহায়ের ও কবি নাবেগার, অনুরূপ পরিণাম তারও হবে। তখন এই আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়।
অতঃপর আল্লাহ্ তা'আলা বলেন যে, তবে কি তাদের বুদ্ধি-বিবেক তাদেরকে এই বিষয়ে প্ররোচিত করে, না তারা এক সীমালংঘনকারী সম্প্রদায়। অর্থাৎ প্রকৃত ব্যাপার এই যে, এরা বড়ই হঠকারী, উদ্ধত এবং বিভ্রান্ত সম্প্রদায়। হিংসা ও শক্রতার কারণেই তারা জেনে শুনে নবী (সঃ)-এর উপর মিথ্যা আরোপ করছে। তারা বলে যে, এই কুরআন মুহাম্মাদ (সঃ) স্বয়ং রচনা করেছেন। কিন্তু প্রকৃত ব্যাপার তো তা নয়। কিন্তু তাদের কুফরী তাদের মুখ দিয়ে এই মিথ্যা কথা বের করছে। তারা যদি তাদের এ কথায় সত্যবাদী হয় তবে এর সদৃশ কোন রচনা উপস্থিত করুক না! এই কাফির কুরায়েশরা শুধু নয়, বরং যদি তাদের সাথে সারা বিশ্বের সমস্ত জ্বিন এবং মানুষও যোগ দেয় তবুও তারা এই কুরআনের অনুরূপ কিতাব পেশ করতে অক্ষম হয়ে যাবে। গোটা কুরআন নয়, বরং এর মত দশটি সূরা, এমনকি একটি সূরাও কিয়ামত পর্যন্ত তারা আনতে পারবে না।
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।