আল কুরআন


সূরা আত-তূর (আয়াত: 21)

সূরা আত-তূর (আয়াত: 21)



হরকত ছাড়া:

والذين آمنوا واتبعتهم ذريتهم بإيمان ألحقنا بهم ذريتهم وما ألتناهم من عملهم من شيء كل امرئ بما كسب رهين ﴿٢١﴾




হরকত সহ:

وَ الَّذِیْنَ اٰمَنُوْا وَ اتَّبَعَتْهُمْ ذُرِّیَّتُهُمْ بِاِیْمَانٍ اَلْحَقْنَا بِهِمْ ذُرِّیَّتَهُمْ وَ مَاۤ اَلَتْنٰهُمْ مِّنْ عَمَلِهِمْ مِّنْ شَیْءٍ ؕ کُلُّ امْرِیًٴۢ بِمَا کَسَبَ رَهِیْنٌ ﴿۲۱﴾




উচ্চারণ: ওয়াল্লাযীনা আ-মানূওয়াত্তাবা‘আতহুম যুররিইইয়াতুহুম বিঈমা-নিন আলহাকনা-বিহিম যুররিইইয়াতাহুম ওয়ামাআলাতনা-হুম মিন ‘আমালিহিম মিন শাইয়িন কুল্লুমরিইম বিমাকাছাবা রাহীন।




আল বায়ান: আর যারা ঈমান আনে এবং তাদের সন্তান-সন্ততি ঈমানের সাথে তাদের অনুসরণ করে, আমরা তাদের সাথে তাদের সন্তানদের মিলন ঘটাব এবং তাদের কর্মের কোন অংশই কমাব না। প্রত্যেক ব্যক্তি তার কামাইয়ের ব্যাপারে দায়ী থাকবে।




আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ২১. আর যারা ঈমান আনে, আর তাদের সন্তান-সন্ততি ঈমানে তাদের অনুগামী হয়, আমরা তাদের সাথে মিলিত করব তাদের সন্তান-সন্ততিকে(১) এবং তাদের কর্মফল আমরা একটুও কমাবো না(২); প্ৰত্যেক ব্যক্তি নিজ কৃতকর্মের জন্য দায়ী।(৩)




তাইসীরুল ক্বুরআন: যারা ঈমান আনে আর তাদের সন্তান সন্ততিরা ঈমানের সাথে পিতামাতাকে অনুসরণ করে, আমি তাদের সাথে তাদের সন্তান সন্ততিকে মিলিত করব। তাদের ‘আমালের কোন কিছু থেকেই আমি তাদেরকে বঞ্চিত করব না। প্রত্যেক ব্যক্তিই নিজ কৃতকর্মের জন্য দায়বদ্ধ।




আহসানুল বায়ান: (২১) যারা বিশ্বাস করে আর তাদের সন্তুান-সন্ততি বিশ্বাসে তাদের অনুগামী হয়, তাদের সাথে মিলিত করব তাদের সন্তান-সন্ততিকে এবং তাদের কর্মফল আমি কিছুমাত্র হ্রাস করব না।[1] প্রত্যেক ব্যক্তি নিজ কৃতকর্মের জন্য দায়বদ্ধ। [2]



মুজিবুর রহমান: এবং যারা ঈমান আনে আর তাদের সন্তান-সন্ততি ঈমানে তাদের অনুগামী হয়, তাদের সাথে মিলিত করাব তাদের সন্তান-সন্ততিকে এবং তাদের কর্মফল আমি কিছুমাত্র হ্রাস করবনা, প্রত্যেক ব্যক্তি নিজ কৃতকর্মের জন্য দায়ী।



ফযলুর রহমান: যারা ঈমান আনে এবং তাদের সন্তানেরা ঈমানের সাথে তাদের অনুসরণ করে, তাদের সাথে আমি তাদের সন্তানদের মিলন ঘটাব এবং তাদের আমল একটুও হ্রাস করব না। প্রত্যেক ব্যক্তিই নিজের কৃতকর্মের সাথে দায়বদ্ধ।



মুহিউদ্দিন খান: যারা ঈমানদার এবং যাদের সন্তানরা ঈমানে তাদের অনুগামী, আমি তাদেরকে তাদের পিতৃপুরুষদের সাথে মিলিত করে দেব এবং তাদের আমল বিন্দুমাত্রও হ্রাস করব না। প্রত্যেক ব্যক্তি নিজ কৃত কর্মের জন্য দায়ী।



জহুরুল হক: আর যারা ঈমান আনে, এবং যাদের সন্তানসন্ততি ধর্মবিশ্বাসে তাদের অনুসরণ করে -- আমরা তাদের সঙ্গে মিলন ঘটাব তাদের ছেলেমেয়েদের, আর আমরা তাদের ক্রিয়াকর্ম থেকে কোনো কিছুই তাদের জন্য কমিয়ে দেব না। প্রত্যেক ব্যক্তিই সে যা অর্জন করেছে সেজন্য দায়ী।



Sahih International: And those who believed and whose descendants followed them in faith - We will join with them their descendants, and We will not deprive them of anything of their deeds. Every person, for what he earned, is retained.



তাফসীরে যাকারিয়া

অনুবাদ: ২১. আর যারা ঈমান আনে, আর তাদের সন্তান-সন্ততি ঈমানে তাদের অনুগামী হয়, আমরা তাদের সাথে মিলিত করব তাদের সন্তান-সন্ততিকে(১) এবং তাদের কর্মফল আমরা একটুও কমাবো না(২); প্ৰত্যেক ব্যক্তি নিজ কৃতকর্মের জন্য দায়ী।(৩)


তাফসীর:

(১) অর্থাৎ যারা ঈমানদার এবং তাদের সন্তানগণও ঈমানে তাদের অনুগামী, আমরা তাদের সন্তানদেরকে জান্নাতে তাদের সাথে মিলিত করে দেব। [মুয়াসসার] পবিত্র কুরআনের অন্যান্য স্থানেও এ ওয়াদা করা হয়েছে। যেমন, সূরা আর রা'দ এর ২৩ এবং সূরা গাফির এর ৮ নং আয়াত। ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা বলেন, আল্লাহ তা'আলা সৎকর্মপরায়ণ মুমিনদের সন্তান-সন্ততিকেও তাদের সম্মানিত পিতৃপুরুষদের মর্তবায় পৌঁছিয়ে দেবেন, যদিও তারা কর্মের দিক দিয়ে সেই মর্তবার যোগ্য না হয়- যাতে সম্মানিত মুরব্বীদের চক্ষুশীতল হয়।

সায়ীদ ইবন-জুবায়ের রাহেমাহুল্লাহ বলেন, ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা বলেছেন, জান্নাতী ব্যাক্তি জান্নাতে প্ৰবেশ করে তার পিতামাতা, স্ত্রী ও সন্তানদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করবে যে, তারা কোথায় আছে? জওয়াবে বলা হবে যে, তারা তোমার মর্তবা পর্যন্ত পৌছতে পারেনি। তাই তারা জান্নাতে আলাদা জায়গায় আছে। এই ব্যক্তি আরয করবে, হে রব! দুনিয়াতে নিজের জন্যে ও তাদের সবার জন্যে আমল করেছিলাম। তখন আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে আদেশ হবে, তাদেরকেও জান্নাতের এই স্তরে একসাথে রাখা হোক।

এসব বর্ণনা থেকে প্রমাণিত হয় যে, আখেরাতে সৎকর্মপরায়ণ পিতৃপুরুষ দ্বারা তাদের সন্তানরা উপকৃত হবে এবং আমলে তাদের মর্তবা কম হওয়া সত্বেও তাদেরকে পিতৃপুরুষদের মর্তবায় পৌঁছিয়ে দেয়া হবে। অপরদিকে সৎকর্মপরায়ণ সন্তান-সন্ততি দ্বারা তাদের পিতা-মাতার উপকৃত হওয়াও হাদীসে প্রমাণিত আছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, আল্লাহ তা’আলা কোন কোন নেকবান্দার মর্তবা তার আমলের তুলনায় অনেক উচ্চ করে দেবেন। সে প্রশ্ন করবে, হে রব! আমাকে এই মর্তবা কিরূপে দেয়া হল? আমার আমল তো এই পর্যায়ের ছিল না। উত্তর হবে, তোমার সন্তান-সন্ততি তোমার জন্যে ক্ষমাপ্রার্থনা ও দো'আ করেছে। এটা তারই ফল। [মুসনাদে আহমাদ: ২/৫০৯]


(২) আয়াতের অর্থ এইঃ সন্তান-সন্ততিকে তাদের সম্মানিত পিতৃপুরুষদের সাথে মিলিত করার জন্যে এই পন্থা অবলম্বন করা হবে না যে, সম্মানিত পিতৃপুরুষদের আমল কিছু হ্রাস করে সন্তানদের আমল পূর্ণ করা হবে। বা পিতৃপুরুষদের পদাবনতির মাধ্যমে সমান করা হবে। বরং আল্লাহ তা'আলা নিজ কৃপায় তাদেরকে সমান করে দেবেন। [ইবন কাসীর]


(৩) অর্থাৎ প্রত্যেক ব্যক্তি তার আমলের জন্যে দায়ী হবে। অপরের গোনাহের বোঝা তার মাথায় চাপানো হবে না। পূর্ববর্তী আয়াতে নেককর্মের বেলায় সৎকর্মশীল পিতৃপুরুষদের খাতিরে সন্তান-সন্ততির আমল বাড়িয়ে দেয়ার কথা আছে। কিন্তু গোনাহের বেলায় এরূপ করা হবে না। একজনের গোনাহের প্রতিক্রিয়া অপরের উপর প্রতিফলিত হবে না। [ইবন কাসীর]


তাফসীরে আহসানুল বায়ান

অনুবাদ: (২১) যারা বিশ্বাস করে আর তাদের সন্তুান-সন্ততি বিশ্বাসে তাদের অনুগামী হয়, তাদের সাথে মিলিত করব তাদের সন্তান-সন্ততিকে এবং তাদের কর্মফল আমি কিছুমাত্র হ্রাস করব না।[1] প্রত্যেক ব্যক্তি নিজ কৃতকর্মের জন্য দায়বদ্ধ। [2]


তাফসীর:

[1] অর্থাৎ, যাদের পিতারা নিজেদের আন্তরিকতা, আল্লাহভীরুতা, সৎকর্ম ও সচ্চরিত্রের ভিত্তিতে জান্নাতের সুউচ্চ মর্যাদা লাভে ধন্য হবে, মহান আল্লাহ তাদের ঈমানদার সন্তান-সন্ততিদের মর্যাদাও বাড়িয়ে দিয়ে তাদেরকে তাদের পিতাদের সাথে মিলিত করবেন। এ রকম করবেন না যে, তাদের পিতাদের মর্যাদা কম করে তাদেরকে তাদের সন্তানদের নিম্নমানের মর্যাদায় তাদেরকে নিয়ে আসবেন। অর্থাৎ, মু’মিনদের প্রতি তিনি দ্বিগুণ অনুগ্রহ করবেন। প্রথমতঃ বাপ ও বেটাদেরকে পরস্পর মিলিত করবেন। যাতে তাদের চক্ষু শীতল হয়। তবে শর্ত হল যে, উভয়েই যেন ঈমানদার হয়। দ্বিতীয়তঃ এই যে, নিম্ন মর্যাদার অধিকারীদেরকে উচ্চ মর্যাদা দান করবেন। তাছাড়া উভয়কে মিলিত করার পদ্ধতি এটাও হতে পারত যে, প্রথম শ্রেণীর লোকদেরকে দ্বিতীয় শ্রেণী দেবেন। কিন্তু যেহেতু এটা তাঁর দয়া ও অনুগ্রহ থেকে অনেক হীন ও নীচ ব্যাপার তাই তিনি এ রকম করবেন না। বরং তিনি দ্বিতীয় শ্রেণীর অধিকারীদেরকে প্রথম শ্রেণী দান করবেন। এটা হল আল্লাহর সেই অনুগ্রহ, যা তিনি পিতাদের নেক আমলের বর্কতে সন্তানদের প্রতি করবেন। আর হাদীসে এসেছে যে, সন্তানদের দু’আ ও ক্ষমা প্রার্থনা করার কারণে পিতাদের মর্যাদা বর্ধিত হয়। জান্নাতে এক ব্যক্তির মর্যাদা উচ্চ করা হলে, সে আল্লাহকে এর কারণ জিজ্ঞাসা করলে, মহান আল্লাহ বলবেন যে, তোমার সন্তানের তোমার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করার কারণে। (মুসনাদে আহমাদ ২/৫০৯) এর সমর্থন ঐ হাদীস দ্বারাও হয়, যাতে এসেছে যে, ‘‘মানুষ মারা গেলে তার আমলের ধারাবাহিকতা ছিন্ন হয়ে যায়। তবে তিনটি জিনিসের সওয়াব মৃত্যুর পরও জারী থাকে। সাদকায়ে জারিয়াহ, এমন জ্ঞান যার দ্বারা মানুষ উপকৃত হতে থাকে, আর এমন সুসন্তান, যে তার জন্য দু’আ করে।’’ (মুসলিম অসিয়ত অধ্যায়)

[2] رَهِيْنٌ এর অর্থ, مَرْهُوْنٍ (বন্ধক রাখা বস্তু)। প্রত্যেক ব্যক্তি তার আমলের দায়ে দায়বদ্ধ। আর এ কথাটি ব্যাপক; যাতে মু’মিন ও কাফের উভয়ই শামিল। অর্থ হল, যে ব্যক্তিই (ভাল-মন্দ) যেমন আমল করবে, সেই অনুযায়ী সে (ভাল-অথবা মন্দ) ফল পাবে। অথবা এ থেকে কাফেদেরকে বুঝানো হয়েছে। তারা নিজেদের কর্মের জন্য বন্দী থাকবে। যেমন অন্যত্র বলেন, {إِلَّكُلُّ نَفْسٍ بِمَا كَسَبَتْ رَهِينَةٌ،  اأَصْحَابَ الْيَمِين} অর্থাৎ, প্রত্যেক ব্যক্তি তার আমলের জন্য দায়ী। তবে ডানহাত-ওয়ালারা নয়। (সূরা মুদ্দাসসির ৩৮-৩৯ আয়াত)


তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ


তাফসীর: ২১-২৮ নম্বর আয়াতের তাফসীর :



যে-সকল ঈমানদার তাদের তাক্বওয়া ও সৎ আমলের মাধ্যমে জান্নাতের সুউচ্চ মর্যাদা লাভে ধন্য হবে, তাদের সন্তান-সন্তুতিরাও যদি বাপ-দাদার ঈমানের অনুসারী হয়ে সঠিক আমল করে তাহলে এসব সন্তানেরা বাপ-দাদার সাথে জান্নাতে থাকবে। যদিও সৎ আমলে পিতৃ পুরুষদের সমতুল্য না হয় কিন্তু আল্লাহ তা‘আলা তাদের সৎ আমলকে বাড়িয়ে দেবেন যাতে সন্তানদেরকে দেখে পিতৃ পুরুষদের চক্ষু শীতল হয়। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন : নিশ্চয়ই আল্লাহ তা‘আলা মু’মিনদের সন্তানদেরকে জান্নাতে মু’মিনদের সমমর্যাদা দান করবেন যদিও আমলে তাদের সমপর্যায়ে না পৌঁছে। যাতে তাদের সন্তানদের দেখে চক্ষু শিতল হয়। তারপর এ আয়াত তেলাওয়াত করলেন। (সিলসিলা সহীহাহ হা. ২৪৯০)



(وَمَا أَلَتْنَاهُمْ) অর্থাৎ আমি তাদের সৎ আমলের প্রতিদান কম করে দেব না।



رَهِينٌ -এর অর্থ مرهون অর্থাৎ আবদ্ধ। প্রত্যেক ব্যক্তি তার আমলের জন্য দায়বদ্ধ থাকবে।



এতে মু’মিন ও কাফির সবাই শামিল। যে ভাল আমল করবে সে ভাল প্রতিদান পাবে আর যে খারাপ আমল করবে সে খারাপ প্রতিদান পাবে। অথবা এর দ্বারা শুধু কাফিররা উদ্দেশ্য।



আল্লাহ তা‘আলা অন্যত্র বলেন :



(کُلُّ نَفْسٍۭ بِمَا کَسَبَتْ رَھِیْنَةٌﭵاِلَّآ اَصْحٰبَ الْیَمِیْنِ)



“প্রত্যেক ব্যক্তি নিজ কৃতকর্মের কাছে দায়বদ্ধ, তবে দক্ষিণপার্শ্বস্থ ব্যক্তিরা (ডান হাতে আমলনামা প্রাপ্তগণ) নয়।” (সূরা মুদ্দাস্সির ৭৪ :৩৮-৩৯)



অতঃপর জান্নাতীদের জন্য জান্নাতে যা প্রস্তুত করে রাখা হয়েছে তার বিবরণ দেয়া হচ্ছে।



(وَأَمْدَدْنَاهُمْ)



অন্যত্র এ ফলমূল ও গোশত সম্পর্কে আল্লাহ তা‘আলা বলেন :



(وَّفَاكِهَةٍ كَثِيْرَةٍ لا ‏ لَّا مَقْطُوْعَةٍ وَّلَا مَمْنُوْعَةٍ)ا ‏



“আর প্রচুর ফলমূল, যা শেষ হবে না ও যা নিষিদ্ধও হবে না।” (সূরা ওয়া-ক্বি‘আহ্ ৫৬ :৩২-৩৩)



সূরা আল ওয়াকিয়াহ্-তে এ সম্পর্কে আলোচনা আরো বিস্তারিত আসবে।

(لَا لَغْوٌ فِيهَا وَلَا تَأْثِيمٌ)



অন্যত্র আল্লাহ তা‘আলা বলেন :



(يُطَافُ عَلَيْهِمْ بِكَأْسٍ مِّنْ مَّعِيْنٍملا‏ بَيْضَا۬ءَ لَذَّةٍ لِّلشّٰرِبِيْنَ ج ‏ لَا فِيْهَا غَوْلٌ وَّلَا هُمْ عَنْهَا يُنْزَفُوْنَ)‏



“তাদেরকে ঘুরে ফিরে পরিবেশন করা হবে বিশুদ্ধ সরাবে পূর্ণ পানপাত্র। তা শুভ্র উজ্জ্বল, পানকারীদের জন্য খুব সুস্বাদু। তাতে ক্ষতির উপাদানও থাকবে না এবং তাতে তারা মাতালও হবে না।” (সূরা সা-ফ্ফাত ৩৭ :৪৫-৪৭)



(كَأَنَّهُمْ لُؤْلُؤٌ مَكْنُونٌ) কিশোরদের দেখতে এত সুন্দর যেন তারা মুক্তার মতো।



অন্যত্র আল্লাহ তা‘আলা বলেন :



(يَطُوْفُ عَلَيْهِمْ وِلْدَانٌ مُّخَلَّدُوْنَ لابِأَكْوَابٍ وَّأَبَارِيْقَ لا وَكَأْسٍ مِّنْ مَّعِيْنٍ لا لَّا يُصَدَّعُوْنَ عَنْهَا وَلَا يُنْزِفُوْنَ)



“তাদের সেবায় ঘোরাফেরা করবে চির কিশোররা। পানপাত্র, ঘটি ও শরাবে পরিপূর্ণ পেয়ালা নিয়ে, (এরা হাজির হবে। সেই সূরা পানে তাদের মাথা ব্যথা হবে না, তারা জ্ঞান হারাও হবে না।” (সূরা ওয়াকিআহ্ ৫৬ :১৭-১৯)



يَتَسَا۬ءَلُونَ অর্থাৎ আপোষে তারা পরস্পর দুনিয়ার অবস্থার কথা জিজ্ঞাসা করবে।



(إِنَّا كُنَّا قَبْلُ فِي أَهْلِنَا)



অর্থ জান্নাতিরা পরস্পর জিজ্ঞাসাবাদে বলবে, আমরা দুনিয়াতে আল্লাহ তা‘আলার আযাব সম্পর্কে শংকিত ছিলাম।



এজন্য আমরা শাস্তি থেকে বাঁচার জন্য যতœবান ছিলাম। তাই আল্লাহ তা‘আলা আমাদেরকে অনুগ্রহ করেছেন এবং শাস্তি থেকে রক্ষা করেছেন।



السَّمُومِ সামূম বলা হয় লু-হওয়া কে, যা ঝলসে দেয় এমন গরম হাওয়াকে বুঝায়।



نَدْعُوهُ অর্থাৎ আমরা একমাত্র তাঁর ‘ইবাদত করতাম তাঁর সাথে কাউকে শরীক করতাম না। জাহান্নাম থেকে বাঁচার জন্য কেবল তাঁরই কাছে প্রার্থনা করতাম।



আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয় :



১. ঈমানদার পিতৃপুরুষ ও সন্তানাদির ফযীলত।

২. প্রত্যেক ব্যক্তি তার আমলের জন্য দায়বদ্ধ থাকবে।

৩. দুনিয়াতে আল্লাহ তা‘আলার শাস্তিকে ভয় করার ফযীলত।


তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)


তাফসীর: ২১-২৮ নং আয়াতের তাফসীর:

আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা স্বীয় ফল ও করম এবং স্নেহ ও করুণার বর্ণনা দিচ্ছেন যে, যেসব মুমিনের সন্তানরা ঈমানের ব্যাপারে বাপ-দাদাদের অনুসারী হয়, কিন্তু সৎ কর্মের ব্যাপারে তাদের পিতৃপুরুষদের সমতুল্য হয় না, আল্লাহ তা'আলা তাদের সৎ আমলকে বাড়িয়ে দিয়ে তাদের পূর্বপুরুষদের সমপর্যায়ে পৌছিয়ে দিবেন, যাতে পূর্বপুরুষরা তাদের উত্তরসূরীদেরকে তাদের পার্শ্বে দেখে শান্তি লাভ করতে পারে। আর উত্তরসূরীরাও যেন পূর্বসূরীদের পার্শ্বে থাকতে পেরে সুখী হতে পারে। মুমিনদের আমল কমিয়ে দিয়ে যে তাদের সন্তানদের আমল বাড়িয়ে দেয়া হবে তা নয়, বরং অনুগ্রহশীল ও দয়ালু আল্লাহ তার পরিপূর্ণ ভাণ্ডার হতে তা দান করবেন। এই বিষয়ের একটি মারফু হাদীসও আছে।

অন্য একটি রিওয়াইয়াতে আছে যে, জান্নাতীরা যখন জান্নাতে চলে যাবে এবং তাদের স্ত্রী ও সন্তানদেরকে সেখানে পাবে না তখন তারা আরয করবেঃ “হে আল্লাহ! তারা কোথায়?” উত্তরে আল্লাহ তা'আলা বলবেনঃ “তারা তোমাদের মর্যাদায় পৌছতে পারেনি। তারা তখন বলবেঃ “হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা তো নিজেদের জন্যে ও সন্তানদের জন্যে নেক আমল করেছিলাম!” তখন মহান আল্লাহর নির্দেশক্রমে এদেরকেও ওদের সমমর্যাদায় পৌছিয়ে দেয়া হবে।

এও বর্ণিত আছে যে, জান্নাতীদের যেসব সন্তান ঈমান আনয়ন করেছে তাদেরকে তো তাদের সাথে মিলিত করা হবেই, এমনকি তাদের যেসব সন্তান শৈশবেই মৃত্যুবরণ করেছে তাদেরকেও তাদের কাছে পৌছিয়ে দেয়া হবে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ), হযরত শাবী (রঃ), হযরত সাঈদ ইবনে জুবাইর (রঃ), হযরত ইবরাহীম (রঃ), হযরত কাতাদা (রঃ), হযরত আবূ সালেহ (রঃ), হযরত রাবী’ ইবনে আনাস (রঃ) এবং হযরত যহহাকও (রঃ) একথাই বলেন। ইমাম ইবনে জারীরও (রঃ) এটাই পছন্দ করেছেন।

হযরত আলী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত খাদীজা (রাঃ) নবী (সঃ)-কে তাঁর ঐ দুই সন্তানের অবস্থানস্থল সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেন যারা জাহেলিয়াতের যুগে মারা গিয়েছিল। উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “তারা দু’জন জাহান্নামে রয়েছে।” অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে দুঃখিতা হতে দেখে। বলেনঃ “তুমি যদি তাদের বাসস্থান দেখতে তবে অবশ্যই তাদের প্রতি শত্রুতা পোষণ করতে।” হযরত খাদীজা (রাঃ) পুনরায় বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনার মাধ্যমে আমার যে সন্তান হয়েছে তার স্থান কোথায়?” জবাবে তিনি বলেনঃ “জান্নাতে।” তারপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “নিশ্চয়ই মুমিনরা ও তাদের সন্তানরা জান্নাতে যাবে এবং মুশরিকরা ও তাদের সন্তানরা জাহান্নামে যাবে।” অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) আয়াতটি পাঠ করেন। (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন) এতো হলো পিতাদের আমলের বরকতে পুত্রদের মর্যাদার বর্ণনা। এখন পুত্রদের দু'আর বরকতে পিতাদের মর্যাদার বর্ণনা দেয়া হচ্ছেঃ

হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন, হঠাৎ করে আল্লাহ তা'আলা তাঁর সৎ বান্দাদের মর্যাদা বাড়িয়ে দিবেন। তখন তারা জিজ্ঞেস করবেঃ “হে আল্লাহ! আমাদের মর্যাদা এভাবে হঠাৎ করে বাড়িয়ে দেয়ার কারণ কি?” আল্লাহ তা'আলা উত্তরে বলবেনঃ “তোমাদের সন্তানরা তোমাদের জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করেছে, তাই আমি তোমাদের মর্যাদা বাড়িয়ে দিয়েছি।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন। এ হাদীসটির ইসনাদ সম্পূর্ণরূপে বিশুদ্ধ। তবে সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে এ শব্দগুলোর দ্বারা এভাবে বর্ণিত হয়নি)

হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যখন আদম সন্তান মারা যায় তখন তার সমস্ত আমল বন্ধ হয়ে যায়। শুধু -এ তিনটি আমলের সওয়াব সে মৃত্যুর পরেও পেতে থাকে। (এক) সদকায়ে জারিয়াহ। (দুই) দ্বীনী ইলম, যার দ্বারা উপকার লাভ করা হয়। (তিন) সৎ সন্তান, যে মৃত ব্যক্তির জন্যে দু'আ করতে থাকে।” (এ হাদীসটি সহীহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে)

এখানে বর্ণনা করা হয়েছে যে, মুমিনদের সন্তানরা আমলহীন হলেও তাদের আমলের বরকতে তাদের সন্তানদের মর্যাদাও তাদের সমপর্যায়ে আনয়ন করা হবে, আল্লাহ তাআলা তাঁর এই অনুগ্রহের বর্ণনা দেয়ার সাথে সাথেই নিজের আদল ও ইনসাফের বর্ণনা দিচ্ছেন যে, কাউকেও অন্য কারো আমলের কারণে পাকড়াও করা হবে না, বরং প্রত্যেকেই নিজ নিজ কৃতকর্মের জন্যে দায়ী থাকবে। পিতার পাপের বোঝা পুত্রের উপর এবং পুত্রের পাপের বোঝা পিতার উপর চাপানো হবে না। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “প্রত্যেক ব্যক্তি নিজ কৃতকর্মের দায়ে আবদ্ধ, তবে দক্ষিণ পার্শ্বস্থ ব্যক্তিরা নয়, তারা থাকবে উদ্যানে এবং জিজ্ঞাসাবাদ করবে- অপরাধীদের সম্পর্কে।” (৭৪:৩৮-৪১)

এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ আমি তাদেরকে দিবো ফলমূল এবং গোশত যা তারা পছন্দ করে। সেখানে তারা একে অপরের নিকট হতে গ্রহণ করবে পান-পাত্র, যা হতে পান করলে কেউ অসার কথা বলবে না এবং পাপ কর্মেও লিপ্ত হবে না। এটা পানে তারা অজ্ঞান হবে না। এতে তারা পূর্ণ তৃপ্তি লাভ করবে। এটা পান করে তারা আবোল তাবোল বকবে না এবং পাপকার্যে লিপ্ত হয়ে পড়বে না। দুনিয়ার মদের অবস্থা এই যে, যারা এটা পান করে তাদের মাথায় চক্কর দেয়, জ্ঞান লোপ পায় এবং বক্ করে বকতে থাকে। তাদের মুখ দিয়ে দুর্গন্ধ বের হয় এবং চেহারার ঔজ্জ্বল্য নষ্ট হয়। কিন্তু জান্নাতের মদ এসব বদ অভ্যাস হতে সম্পূর্ণরূপে মুক্ত ও পবিত্র। এর রঙ সাদা ও পরিষ্কার। এটা সুপেয়। এটা পানে কেউ অজ্ঞানও হবে না এবং বাজে কথা বকবেও না। এতে ক্ষতির কোন সম্ভাবনাই নেই। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী)

অর্থাৎ “শুভ্র উজ্জ্বল, যা হবে পানকারীদের জন্যে সুস্বাদু। তাতে ক্ষতিকর কিছুই থাকবে না এবং তাতে তারা মাতালও হবে না।” (৩৭:৪৬-৪৭) আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “সেই সুরা পানে তাদের শিরঃপীড়া হবে না, তারা জ্ঞান হারাও হবে ।” (৫৬:১৯)

অতঃপর আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলেনঃ তাদের সেবায় নিয়োজিত থাকবে কিশোরেরা, তারা যেন সুরক্ষিত মুক্তা সদৃশ। যেমন অন্য জায়গায় মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তাদের সেবায় ঘোরাফেরা করবে চিরকিশোরেরা পান-পাত্র, কুঁজা ও প্রস্রবণ-নিসৃত সুরাপূর্ণ পেয়ালা নিয়ে।” (৫৬:১৭-১৮)

মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ তারা একে অপরের দিকে ফিরে জিজ্ঞেস করবে অথাৎ পরস্পর আলাপ আলোচনা করবে। তাদের পার্থিব আমল ও অবস্থা সম্পর্কে তারা একে অপরকে জিজ্ঞাসাবাদ করবে। তারা বলবেঃ পূর্বে আমরা পরিবার পরিজনের মধ্যে শংকিত অবস্থায় ছিলাম। আজকের দিনের শাস্তি সম্পর্কে আমরা সদা ভীত-সন্ত্রস্ত থাকতাম। মহান আল্লাহর সমস্ত প্রশংসা যে, তিনি আমাদের প্রতি অনুগ্রহ করেছেন এবং আমাদেরকে আগুনের শাস্তি হতে রক্ষা করেছেন। পূর্বেও আমরা তাকেই আহ্বান করতাম। তিনি আমাদের দু'আ কবূল করেছেন এবং আমাদের আকাঙ্ক্ষা পূর্ণ করেছেন। তিনি তো কৃপাময়, পরম দয়ালু।

হযরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “জান্নাতী যখন জান্নাতে প্রবেশ করবে তখন সে তার (মুমিন) ভাইদের সাথে মিলনের আকাক্ষা করবে, আর ওদিকে তার বন্ধুর মনেও তার সাথে মিলিত হবার বাসনা জাগবে। অতঃপর দু’দিক হতে দু’জনের আসন উড়বে এবং পথে উভয়ের সাক্ষাৎ ঘটবে। তারা উভয়ে নিজ নিজ আসনে আরামে বসে থাকবে এবং পরস্পর আলাপ আলোচনা করবে। তারা তাদের পার্থিব কথাবার্তা বলবে। তারা একে অপরকে বলবেঃ “অমুক দিন অমুক জায়গায় আমরা ক্ষমা প্রার্থনা করেছিলাম এবং আল্লাহ তা'আলা তা কবূল করেছেন।” (এ হাদীসটি হাফিয আবু বকর আল বাযার (রঃ) তাঁর মুসনাদে বর্ণনা করেছেন। এ হাদীসের সনদ দুর্বল)

হযরত মাসরূক (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত আয়েশা (রাঃ) (আরবী) এ আয়াত দুটি পাঠ করে দু'আ করতেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে আল্লাহ! আপনি আমাদের প্রতি অনুগ্রহ করুন! নিশ্চয়ই আপনি কৃপাময়, পরম দয়ালু।” হাদীসটির বর্ণনাকারী হযরত আমাশ (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করা হয়ঃ “তিনি কি নামাযে এই দু'আ করেন?” উত্তরে তিনি বলেনঃ “হ্যাঁ।” (এ হাদীসটি ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)





সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।