সূরা আয-যারিয়াত (আয়াত: 30)
হরকত ছাড়া:
قالوا كذلك قال ربك إنه هو الحكيم العليم ﴿٣٠﴾
হরকত সহ:
قَالُوْا کَذٰلِکِ ۙ قَالَ رَبُّکِ ؕ اِنَّهٗ هُوَ الْحَکِیْمُ الْعَلِیْمُ ﴿۳۰﴾
উচ্চারণ: কা-লূকাযা-লিকি কা-লা রাব্বুকি ইন্নাহূহুওয়াল হাকীমুল ‘আলীম।
আল বায়ান: তারা বলল, ‘তোমার রব এরূপই বলেছেন। নিশ্চয়ই তিনি প্রজ্ঞাময়, সর্বজ্ঞ’।
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৩০. তারা বলল, আপনার রব এরূপই বলেছেন; নিশ্চয় তিনি প্রজ্ঞাময়, সর্বজ্ঞ।
তাইসীরুল ক্বুরআন: তারা বলল- ‘‘তোমার প্রতিপালক এ রকমই বলেছেন, তিনি মহা প্রজ্ঞাময়, সর্বজ্ঞ।
আহসানুল বায়ান: (৩০) তারা বলল, ‘তোমার প্রতিপালক এরূপই বলেছেন। নিশ্চয় তিনিই প্রজ্ঞাময়, সর্বজ্ঞ।’ [1]
মুজিবুর রহমান: তারা বললঃ তোমার রাব্ব এরূপই বলেছেন; তিনি প্রজ্ঞাময়, সর্বজ্ঞ।
ফযলুর রহমান: তারা (আগন্তুক ফেরেশতারা) বলল, “তবু এমনই তোমার প্রভু বলেছেন। নিশ্চয়ই তিনি অসীম প্রজ্ঞাবান, মহাজ্ঞানী।”
মুহিউদ্দিন খান: তারা বললঃ তোমার পালনকর্তা এরূপই বলেছেন। নিশ্চয় তিনি প্রজ্ঞাময়, সর্বজ্ঞ।
জহুরুল হক: তারা বললে -- "এমনটাই হবে, তোমার প্রভু বলেছেন।" নিঃসন্দেহ তিনি স্বয়ং পরমজ্ঞানী, সর্বজ্ঞাতা।
Sahih International: They said, "Thus has said your Lord; indeed, He is the Wise, the Knowing."
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ৩০. তারা বলল, আপনার রব এরূপই বলেছেন; নিশ্চয় তিনি প্রজ্ঞাময়, সর্বজ্ঞ।
তাফসীর:
-
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (৩০) তারা বলল, ‘তোমার প্রতিপালক এরূপই বলেছেন। নিশ্চয় তিনিই প্রজ্ঞাময়, সর্বজ্ঞ।” [1]
তাফসীর:
[1] অর্থাৎ, যেভাবে আমরা তোমাকে বললাম, তা আমরা নিজের পক্ষ হতে বলিনি। বরং তোমার প্রতিপালকই এ কথা বলেছেন। আমরা কেবল তোমাকে অবগত করাচ্ছি। কাজেই এতে না আশ্চর্য হওয়ার কিছু আছে, আর না সন্দেহ করার। কারণ, আল্লাহ যা চান তা অবশ্যই হবে।
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ২৪-৩৭ নং আয়াতের তাফসীর :
ইবরাহীম (আঃ) ও লূত (আঃ) সমকালীন নাবী। তারা উভয়ে চাচাতো বা খালাতো ভাই। লূত (আঃ)-এর জাতি পৃথিবীর বুকে সর্বপ্রথম সমকামিতায় লিপ্ত হয়। তাদেরকে লূত (আঃ) বার বার বারণ করার পরেও যখন বিরত থাকল না। তখন আল্লাহ তা‘আলা তাদেরকে শাস্তি দেয়ার জন্য ফেরেশতা প্রেরণ করলেন।
এ ফেরেশতাদেরকে আল্লাহ তা‘আলা ইব্রাহীম (আঃ)-এর বাড়ি হয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন। কারণ (১) ইবরাহীম (আঃ)-কে তাঁর সন্তান ইসহাকের সুসংবাদ দেয়ার জন্য, (২) লূত (আঃ)-এর অবাধ্য সম্প্রদায়ের ওপর আযাবের কথা জানিয়ে দেয়ার জন্য।
ফেরেশতাগণ ইবরাহীম (আঃ)-এর বাড়িতে মেহমানের বেশে আগমন করলেন। তারা ইবরাহীম (আঃ)-কে সালাম দিলে ইবরাহীম (আঃ) সালামের জবাব দিয়ে বললেন- (قَوْمٌ مُّنْكَرُونَ) অর্থাৎ- আপনাদেরকে অপরিচিত মনে হচ্ছে। ইবরাহীম (আঃ) তাদেরকে চিনতে পারেননি যে, তারা ফেরেশতা। ইবরাহীম (আঃ) মেহমানদের আপ্যায়ন করার জন্য চুপিসারে স্ত্রীর কাছে গিয়ে ভূনা করা একটি গরুর বাছুর নিয়ে এসে খেতে বললেন। কিন্তু তারা খাচ্ছে না। এ অবস্থা দেখে তিনি ভয় পেয়ে গেলেন। তারা বললেন : আপনি ভয় করবেন না। যেমন অন্যত্র আল্লাহ তা‘আলা বলেন :
( فَلَمَّا رَآٰ اَیْدِیَھُمْ لَا تَصِلُ اِلَیْھِ نَکِرَھُمْ وَاَوْجَسَ مِنْھُمْ خِیْفَةًﺚ قَالُوْا لَا تَخَفْ اِنَّآ اُرْسِلْنَآ اِلٰی قَوْمِ لُوْطٍﮕوَامْرَاَتُھ۫ قَا۬ئِمَةٌ فَضَحِکَتْ فَبَشَّرْنٰھَا بِاِسْحٰقَﺫ وَمِنْ وَّرَا۬ئِ اِسْحٰقَ یَعْقُوْبَ)
“সে যখন দেখল তাদের হাত তার দিকে প্রসারিত হচ্ছে না, তখন তাদেরকে অবাঞ্ছিত মনে করল এবং তাদের সম্বন্ধে তার মনে ভীতি সঞ্চার হল। তারা বলল : ‘ভয় কর না, আমরা লূতের সম্প্রদায়ের প্রতি প্রেরিত হয়েছি।’ আর তার স্ত্রী দণ্ডায়মান ছিল এবং সে হেসে ফেলল। অতঃপর আমি তাকে ইস্হাকের ও ইস্হাকের পরবর্তী ইয়া‘কূবের সুসংবাদ দিলাম। (সূরা হূদ ১১ :৭০-৭১)
তারপর তারা ইবরাহীম (আঃ)-কে ইসহাক (আঃ)-এর সুসংবাদ দিলেন। ইবরাহীম (আঃ)-এর স্ত্রী অবাক, আমি বন্ধ্যা ও বৃদ্ধা, কিভাবে আমার সন্তান হবে। তারা বললেন : তোমার প্রতিপালক এরূপই বলেছেন।
তারপর ইবরাহীম (আঃ) তাদেরকে বললেন, তাহলে আপনাদের আসার উদ্দেশ্য কী? তখন ফেরেশতাগণ আয়াতে বর্ণিত কথাগুলো বললেন।
(فَمَا وَجَدْنَا فِيْهَا غَيْرَ بَيْتٍ مِّنَ الْمُسْلِمِيْنَ)
‘এবং সেখানে একটি পরিবার (লূত এর পরিবার) ব্যতীত কোন মুসলিম আমি পাইনি।’ এ ঘরটি ছিল লূত (আঃ)-এর। সেখানে তাঁর দু’কন্যা এবং তাঁর ওপর ঈমান আনয়নকারী কিছু লোক ছিল। বলা হয় এরা মোট তেরজন ছিল। এদের মধ্যে লূত-এর স্ত্রী শামিল ছিল না। বরং সে ধ্বংসপ্রাপ্ত জাতির অন্তর্ভুক্ত ছিল। (আয়সারুত্ তাফাসীর- অত্র আয়াতের তাফসীর)
এসব কিছুর মাঝে রয়েছে তাদের জন্য নিদর্শন যারা যন্ত্রণাদায়ক শাস্তিকে ভয় করে।
আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয় :
১. নাবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নবুওয়াতের স্বীকৃতি পাওয়া গেল। কারণ একজন উম্মি ব্যক্তির জন্য ওয়াহীর মাধ্যম ছাড়া এসব ঘটনা জানা সম্ভব না।
২. ইবরাহীম (আঃ)-অতিথিপরায়ণ ছিলেন, এমনকি অপরিচিত লোকদের ক্ষেত্রেও মেজবানের যথার্থ পরিচয় দিতেন ।
৩. আল্লাহ তা‘আলা যাকে যখন ইচ্ছা সন্তান দান করতে পারেন।
৪. লূত (আঃ)-এর সম্প্রদায় সর্বপ্রথম সমকামিতার অপরাধে লিপ্ত হয়, যার কারণে তাদেরকে ধ্বংস করে দেয়া হয়।
৫. অপরিচিত লোক মেহমান হলে তাকে সম্মানের সাথে মেহমানদারী করা উচিত।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: ২৪-৩০ নং আয়াতের তাফসীর:
এ ঘটনাটি সূরায়ে হূদ ও সূরায়ে হিজরে গত হয়েছে। মেহমান বা অতিথিরা ফেরেশতা ছিলেন, যারা মানুষের আকারে আগমন করেছিলেন। তাদেরকে আল্লাহ তা'আলা সম্মান দান করেছিলেন। হযরত ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল (রঃ) এবং অন্যান্য আলেমদের একটি জামা'আত বলেন যে, অতিথিদেরকে আতিথ্য দান করা ওয়াজিব। হাদীসেও এটা এসেছে এবং কুরআন কারীমের বাহ্যিক শব্দও এটাই।
মানবরূপী ফেরেশতাগণ হযরত ইবরাহীম (আঃ)-কে সালাম করেন এবং তিনি সালামের জবাব দেন। দ্বিতীয় (আরবী) শব্দের উপর দুই পেশ হওয়াটাই এর প্রমাণ। আল্লাহ তা'আলা এজন্যেই বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “যখন তোমাদেরকে সালাম দেয়া হবে তখন তোমরা ওর চেয়ে উত্তম (শব্দ) দ্বারা জবাব দিবে অথবা ওটাই ফিরিয়ে দিবে।` (৪:৮৬)
হযরত খলীল (আঃ) উত্তম পন্থাটিই গ্রহণ করেন। তারা যে আসলে ফেরেশতা ছিলেন তা হযরত ইবরাহীম (আঃ) জানতেন না বলে তিনি বলেনঃ “এরা তো অপরিচিত লোক।” ফেরেশতারা ছিলেন হযরত জিবরাঈল (আঃ), হযরত মীকাঈল (আঃ) এবং হযরত ইসরাফীল (আঃ)। তাঁরা সুশ্রী যুবকের রূপ ধারণ করে এসেছিলেন। তাদের চেহারায় মর্যাদা ও ভীতির লক্ষণ প্রকাশমান ছিল। হযরত ইবরাহীম (আঃ) তাদের খাদ্য তৈরীর কাজে মগ্ন হয়ে পড়েন। তিনি নিঃশব্দে অতি তাড়াতাড়ি স্বীয় স্ত্রীর নিকট গমন করেন। অল্পক্ষণের মধ্যেই গো-বৎসের ভাজা গোশত নিয়ে তাদের সামনে হাযির হয়ে যান। তিনি ঐ গোশত তাঁদের নিকটে রেখে দেন এবং বলেনঃ “আপনারা খাচ্ছেন না কেন?” এর দ্বারা জিয়াফতের আদব জানা যাচ্ছে যে, হযরত ইবরাহীম (আঃ) মেহমানকে কিছু জিজ্ঞেস না করেই এবং তাদের জন্যে তিনি যে খাবার আনছেন এ অনুগ্রহের কথা তাদেরকে বলেই নিঃশব্দে তাঁদের নিকট হতে চলে গেলেন এবং তাড়াতাড়ি উৎকৃষ্ট হতে উৎকৃষ্টতম যে জিনিস তিনি পেলেন তা প্রস্তুত করে নিয়ে আসলেন। তা ছিল অল্প বয়স্ক একটি তাজা গো-বৎসের ভাজা গোশত। এ খাদ্য তাদের সামনে রেখে দিয়ে তিনি তাদেরকে খেয়ে নেন' একথা বললেন না। কেননা, এতে এক ধরনের হুকুম পাওয়া যাচ্ছে। বরং তিনি তার সম্মানিত মেহমানদেরকে অত্যন্ত বিনয় ও ভালবাসার সুরে বলেনঃ “আপনারা খেতে শুরু করছেন না কেন?” যেমন কোন ব্যক্তি কাউকেও বলে থাকেঃ “যদি আপনি দয়া, অনুগ্রহ ও সদাচরণ করতে চান তবে করতে পারেন।`
এরপর আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলেনঃ “এতে তাদের সম্পর্কে তার মনে ভীতির সঞ্চার হলো।' যেমন অন্য আয়াতে আছেঃ (আরবী) অর্থৎ “সে যখন দেখলো যে, তাদের হস্তগুলো ওর দিকে প্রসারিত হচ্ছে না, তখন সে তাদেরকে অবাঞ্ছিত মনে করলো এবং তাদের সম্বন্ধে তার মনে ভীতির সঞ্চার হলো। তারা বললোঃ ভয় করো না, আমরা লুত (আঃ)-এর সম্প্রদায়ের প্রতি প্রেরিত হয়েছি। তখন তার স্ত্রী দাঁড়িয়েছিল এবং সে হাসলো।` (১১:৭০-৭১) মহান আল্লাহ আরো বলেনঃ “অতঃপর আমি তাকে ইসহাক (আঃ)-এর ও ইসহাকের পরবর্তী ইয়াকূব (আঃ)-এর সুসংবাদ দিলাম। সে বললোঃ কি আশ্চর্য! সন্তানের জননী হবো আমি যখন আমি বৃদ্ধা এবং এই আমার স্বামী বৃদ্ধ! এটা অবশ্যই এক অদ্ভুত ব্যাপার। তারা বললোঃ আল্লাহর কাজে তুমি বিস্ময়বোধ করছো? হে পরিবারবর্গ! তোমাদের প্রতি রয়েছে আল্লাহর অনুগ্রহ ও কল্যাণ। তিনি প্রশংসার্হ ও সম্মানার্হ।”
মহান আল্লাহ এখানে বলেনঃ “তারা তাকে এক জ্ঞানী পুত্র সন্তানের সুসংবাদ দিলো। এ আয়াতে আছে যে, ফেরেশতারা হযরত ইবরাহীম (আঃ)-কে পুত্র সন্তানের সুসংবাদ দিয়েছিলেন, আর পূর্ববর্তী আয়াতে রয়েছে, এ সংবাদ তাঁরা তার স্ত্রীকে দিয়েছিলেন। সুতরাং ভাবার্থ এই যে, স্বামী-স্ত্রী দু'জনকেই এ সুসংবাদ দেয়া হয়েছিল। কেননা, সন্তানের জন্মগ্রহণ উভয়ের জন্যেই খুশীর বিষয়।
এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ এ সুসংবাদ শুনে হযরত ইবরাহীম। (আঃ)-এর স্ত্রীর মুখ দিয়ে জোর শব্দ বেরিয়ে আসলো এবং কপালে হাত মেরে বিস্ময় প্রকাশ করে তিনি বললেনঃ “যৌবনে আমি বন্ধ্যা ছিলাম। এখন আমিও বৃদ্ধা এবং আমার স্বামীও বৃদ্ধ, এমতাবস্থায় আমি গর্ভবতী হববা?” তার এই কথা শুনে ফেরেশতারা বললেনঃ “এই সুসংবাদ আমরা আমাদের নিজেদের পক্ষ হতে দিচ্ছি না। বরং মহামহিমান্বিত আল্লাহই আমাদেরকে এ সুসংবাদ দেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি তো প্রজ্ঞাময়, সর্বজ্ঞ। আপনারা যে মহা সম্মান পাওয়ার যোগ্য এটা তিনি ভালরূপেই জানেন। তাঁর ঘোষণা এই যে, এ বৃদ্ধ বয়সেই তিনি আপনাদেরকে সন্তান দান করবেন। তাঁর কোন কাজই প্রজ্ঞাশূন্য নয় এবং তার কোন হুকুমও হিকমত শূন্য হতে পারে না।”
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।