সূরা কাফ (আয়াত: 41)
হরকত ছাড়া:
واستمع يوم ينادي المنادي من مكان قريب ﴿٤١﴾
হরকত সহ:
وَ اسْتَمِعْ یَوْمَ یُنَادِ الْمُنَادِ مِنْ مَّکَانٍ قَرِیْبٍ ﴿ۙ۴۱﴾
উচ্চারণ: ওয়াছতামি‘ ইয়াওমা ইউনা-দিল মুনা-দি মিম মাকা-নিন কারীব।
আল বায়ান: মনোনিবেশ কর, যেদিন একজন ঘোষক নিকটবর্তী কোন স্থান থেকে ডাকতে থাকবে।
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৪১. আর মনোনিবেশসহকারে শুনুনু, যেদিন এক ঘোষণাকারী নিকটবর্তী স্থান হতে ডাকবে,
তাইসীরুল ক্বুরআন: আর শোন, যেদিন এক ঘোষণাকারী (প্রত্যেক ব্যক্তির) নিকটবর্তী স্থান থেকে ডাক দিবে,
আহসানুল বায়ান: (৪১) ধ্যান দিয়ে শুনো,[1] যেদিন এক ঘোষণাকারী[2] নিকটবর্তী স্থান হতে আহবান করবে। [3]
মুজিবুর রহমান: শোন, যেদিন এক ঘোষণাকারী নিকটবর্তী স্থান হতে আহবান করবে –
ফযলুর রহমান: আর শোন, যেদিন আহবানকারী নিকটবর্তী স্থান থেকে আহবান করবে,
মুহিউদ্দিন খান: শুন, যে দিন এক আহবানকারী নিকটবর্তী স্থান থেকে আহবান করবে।
জহুরুল হক: আর শোনো সেইদিন যখন একজন ঘোষণাকারী আহ্বান করবেন নিকটবর্তী স্থান থেকে, --
Sahih International: And listen on the Day when the Caller will call out from a place that is near -
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ৪১. আর মনোনিবেশসহকারে শুনুনু, যেদিন এক ঘোষণাকারী নিকটবর্তী স্থান হতে ডাকবে,
তাফসীর:
-
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (৪১) ধ্যান দিয়ে শুনো,[1] যেদিন এক ঘোষণাকারী[2] নিকটবর্তী স্থান হতে আহবান করবে। [3]
তাফসীর:
[1] অর্থাৎ, অহীর মাধ্যমে কিয়ামতের যেসব অবস্থার কথা বলা হচ্ছে, সেগুলো মন দিয়ে শোনো।
[2] এই ঘোষণাকারী ইস্রাফীল ফিরিশতা হবেন অথবা জিবরীল। আর এ আহবান সেই আহবান, যে আহবানে লোকেরা হাশরের মাঠে সমবেত হবে। অর্থাৎ দ্বিতীয় ফুৎকার।
[3] এ থেকে কেউ কেউ صخرة بيت المقدس (বাইতুল মুকাদ্দাসের পাথর) বুঝিয়েছেন। বলেন যে, এটা আসমানের নিকটতম স্থান। অন্যান্যের নিকটে এর অর্থ হল, প্রত্যেক ব্যক্তি এই শব্দ এমনভাবে শুনবে যে, মনে হবে যেন এ আওয়াজ নিকট থেকেই আসছে। (ফাতহুল ক্বাদীর) আর এ কথাই সঠিক মনে হয়।
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ৪১-৪৫ নম্বর আয়াতের তাফসীর :
(يُنَادِ الْمُنَادِ)
“একজন আহ্বানকারী আহ্বান করবে” এ ঘোষণাকারী হলেন ইসরাফিল (আঃ), এ সময় শিঙ্গার ফুঁৎকারে লোকেরা হাশরের মাঠে উপস্থিত হবে। অর্থাৎ এটা হবে দ্বিতীয় ফুৎকার।
(مَكَانٍ قَرِيْبٍ)
‘নিকটবর্তী স্থান’ অর্থাৎ জমিনের নিকটতম স্থান থেকে। আবার কেউ কেউ
صخرة بيت المقدس
(বাইতুল মুকাদ্দাসের পাথর) বুঝিয়েছেন। এটা আকাশের নিকটতম স্থান।
কোন কোন বিদ্বান বলেন এর অর্থ হলো : প্রত্যেক ব্যক্তি এ শব্দের আওয়াজ এমনভাবে শুনতে পাবে যেন নিকট থেকেই আসছে। (ফাতহুল কাদীর- এ আয়াতের তাফসীর)
সেদিন মানুষ সেই শিঙ্গার ফুঁৎকার সত্যি শুনতে পাবে আর ক্ববর থেকে উঠে হাশরের ময়দানে হাজির হবে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন :
(وَنُفِخَ فِي الصُّوْرِ فَإِذَا هُمْ مِّنَ الْأَجْدَاثِ إِلٰي رَبِّهِمْ يَنْسِلُوْنَ)
“শিঙ্গায় ফুঁৎকার দেয়া হবে, তৎক্ষণাৎ তারা কবর থেকে নিজের প্রতিপালকের দিকে ছুটে যাবে।” (সূরা ইয়াসীন ৩৬ :৫১)
سِرَاعًا অর্থাৎ আহ্বানকারীর ডাকে সাড়া দিতে দ্রুত উঠবে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন :
(يَوْمَ يَخْرُجُوْنَ مِنَ الْأَجْدَاثِ سِرَاعًا كَأَنَّهُمْ إِلٰي نُصُبٍ يُّوْفِضُوْنَ )
“সেদিন তারা কবর হতে বের হবে দ্রুত বেগে, মনে হবে যে, তারা কোন একটি আস্তানার দিকে ছুটে আসছে।” (সূরা মাআরিজ ৭০ :৪৩)
আল্লাহ তা‘আলা বলেন :
(يَوْمَ يَدْعُوْكُمْ فَتَسْتَجِيْبُوْنَ بِحَمْدِه۪ وَتَظُنُّوْنَ إِنْ لَّبِثْتُمْ إِلَّا قَلِيْلًا)
‘যেদিন তিনি তোমাদেরকে আহ্বান করবেন, এবং তোমরা তাঁর প্রশংসার সাথে তাঁর আহ্বানে সাড়া দেবে এবং তোমরা মনে করবে, তোমরা অল্প সময়ই (দুনিয়াতে) অবস্থান করেছিলে।’ (সূরা ইস্রা ১৭ :৫২)
রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন : সর্বপ্রথম আমার কবর ফাটা হবে। (তিরমিযী হা. ৩১৪৮, সহীহ)
(وَمَا أَنْتَ عَلَيْهِمْ بِجَبَّارٍ)
অর্থাৎ তুমি তাদের ওপর জবরদস্তিকারী নও।
আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন :
(لَسْتَ عَلَيْهِمْ بِمُصَيْطِرٍ إِلَّا مَنْ تَوَلّٰي وَكَفَرَ)
“তুমি তাদের যিম্মাদার নও। তবে কেউ মুখ ফিরিয়ে নিলে ও কুফরী করলে।” (সূরা আল গাশিয়াহ্ ৮৮ :২২-২৩)
অতএব যারা আল্লাহ তা‘আলার শাস্তিকে ভয় করে তাদেরকে কুরআন দ্বারা উপদেশ দাও। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(وَإِنْ مَّا نُرِيَنَّكَ بَعْضَ الَّذِيْ نَعِدُهُمْ أَوْ نَتَوَفَّيَنَّكَ فَإِنَّمَا عَلَيْكَ الْبَلٰغُ وَعَلَيْنَا الْحِسَابُ)
“তাদেরকে যে শাস্তির প্রতিশ্রুতি দিয়েছি তার কিছু যদি তোমাকে দেখাই অথবা যদি এর পূর্বে তোমার মৃত্যু ঘটাই (উভয় অবস্থাতেই) তোমার কর্তব্য তো কেবল প্রচার করা এবং হিসেব-নিকেশ একমাত্র আমার কাজ।” (সূরা রা‘দ ১৩ :৪০)
কাতাদাহ (রহঃ) এ দু‘আটি পড়তেন : হে আল্লাহ তা‘আলা! আমাকে তাদের অন্তর্ভুক্ত করো যারা তোমার শাস্তিকে ভয় করে, তোমার প্রতিশ্রুতির আশা করে। হে অনুগ্রহকারী, হে দয়াময়। (ইবনু কাসীর, এ আয়াতের তাফসীর)
আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয় :
১. পুনরুত্থানের প্রমাণ পেলাম।
২. দা‘ওয়াতী কাজে জবরদস্তি করার প্রয়োজন নেই।
৩. কুরআন দিয়ে আহ্বান করলেন যারা আল্লাহ তা‘আলাকে ভয় করে তারা সাড়া দেবে।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: ৪১-৪৫ নং আয়াতের তাফসীর:
হযরত কা'ব আহবার (রাঃ) বলেন যে, আল্লাহ্ তা'আলা একজন ফেরেশতাকে বায়তুল মুকাদ্দাসে দাঁড়িয়ে উচ্চস্বরে একথা বলার নির্দেশ দিবেনঃ “সড়া-গলা অস্থিসমূহ এবং হে দেহের বিচ্ছিন্ন অংশসমূহ! আল্লাহ তোমাদেরকে একত্রিত হয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিচ্ছেন। তোমাদের মধ্যে তিনি ফায়সালা করবেন।” সুতরাং এর দ্বারা সূর বা শিংগাকে বুঝানো হয়েছে। এই সত্য ঐ সন্দেহ ও মতভেদকে দূর করে দিবে যা ইতিপূর্বে ছিল। এটা হবে কবর হতে বের হয়ে যাওয়ার দিন।
মহান আল্লাহ বলেনঃ প্রথমে সৃষ্টি করা, তারপর ফিরিয়ে আনা এবং সমস্ত মাখলুককে এক জায়গায় একত্রিত করার ক্ষমতা আমার রয়েছে। ঐ সময় প্রত্যেককে আমি তার আমলের প্রতিদান প্রদান করবে। প্রত্যেকে তার ভাল-মন্দের প্রতিফল পেয়ে যাবে। যমীন ফেটে যাবে। সবাই তাড়াতাড়ি উঠে দাড়িয়ে যাবে। আল্লাহ তা'আলা আকাশ হতে বৃষ্টি বর্ষণ করবেন, যার ফলে মাখলুকের দেহ অংকুরিত হতে শুরু করবে, যেমন কাদায় পড়ে থাকা শস্য বৃষ্টি বর্ষণের ফলে অংকুরিত হয়। যখন দেহ পূর্ণরূপে গঠিত হয়ে যাবে তখন আল্লাহ তা'আলা হযরত ইসরাফীল (আঃ)-কে শিংগায় ফুৎকার দেয়ার হুকুম করবেন। সমস্ত রূহ শিংগার ছিদ্রে থাকবে। হযরত ইসরাফীল (আঃ)-এর শিংগায় ফুৎকার দেয়ার সাথে সাথে রূহগুলো আসমান ও যমীনের মাঝে ফিরতে শুরু করবে। ঐ সময় মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলবেনঃ “আমার ইযযত ও মর্যাদার কসম! অবশ্যই প্রত্যেক রূহ নিজ নিজ দেহের মধ্যে চলে যাবে। যাকে সে দুনিয়ায় আবাদ করে রেখেছিল।” তখন প্রত্যেক রূহ নিজ নিজ দেহে চলে যাবে এবং যেভাবে বিষাক্ত জন্তুর বিষক্রিয়া চতুষ্পদ জন্তুর শিরায় শিরায় অতি তাড়াতাড়ি পৌঁছে যায় সেই ভাবে ঐ দেহের শিরা উপশিরায় অতিসত্বর রূহ চলে যাবে। আর সমস্ত মাখলুক আল্লাহর ফরমান অনুযায়ী দৌড়তে দৌড়তে অতি তাড়াতাড়ি হাশরের মাঠে হাযির হয়ে যাবে। এই সময়টি হবে কাফিরদের উপর অত্যন্ত কঠিন। আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “যেদিন তিনি তোমাদেরকে ডাক দিবেন তখন তোমরা তাঁর প্রশংসাসহ তার আহ্বানে সাড়া দিবে এবং তোমরা ধারণা করবে যে, তোমরা খুব অল্পই বসবাস করেছো।” (১৭:৫২)।
হযরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “সর্বপ্রথম আমার কবরের যমীন ফেটে যাবে।”
আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “এই সমবেত সমাবেশকরণ আমার জন্যে সহজ। যেমন মহামহিমান্বিত আল্লাহ অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমার হুকুম একবার ছাড়া নয়, চক্ষু অবনত হওয়ার মত।” (৫৪:৫০) অন্য আয়াতে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “তোমাদের সকলকে সৃষ্টি করা এবং মৃত্যুর পর পুনর্জীবিত করা একটি প্রাণকে মেরে পুনর্জীবিত করার মতই (অতি সহজ), নিশ্চয়ই আল্লাহ শ্রবণকারী, দর্শনকারী।” (৩১:২৮)।
মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ ‘তারা যা বলে তা আমি জানি (এতে তুমি মন খারাপ করো না)। যেমন আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “ (হে নবী সঃ)! অবশ্যই আমি জানি যে, তারা যা বলছে এতে তোমার মন সংকীর্ণ হচ্ছে। (কিন্তু তুমি সংকীর্ণমনা হয়ে না বা মন খারাপ করো না, বরং) তুমি তোমার প্রতিপালকের সপ্রশংস পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা কর এবং সিজদাকারীদের অর্থাৎ নামাযীদের অন্তর্ভুক্ত হও। আর তোমার পতিপালকের ইবাদতে লেগে থাকো যে পর্যন্ত না তোমার মৃত্যু হয়। (১৫:৯৭-৯৯)
এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “তুমি তাদের উপর জবরদস্তিকারী নও’ অর্থাৎ তুমি তাদেরকে জোরপূর্বক হিদায়াতের উপর আনতে পার না এবং এরূপ করতে আদিষ্টও নও। এও অর্থ হয়ঃ তুমি তাদের উপর জোর-জবরদস্তি করো না। কিন্তু প্রথম উক্তিটিই উত্তম। কেননা, শব্দে ‘তুমি তাদের উপর জোর-জবরদস্তি করো না এরূপ নেই। বরং আছে- তুমি তাদের উপর জাব্বার নও। অর্থাৎ “হে নবী! তুমি শুধু তাবলীগ করেই তোমার কর্তব্য সমাপ্ত কর। (আরবী) শব্দটি (আরবী) শব্দের অর্থেও এসে থাকে।
মহান আল্লাহ বলেনঃ “যে আমার শাস্তিকে ভয় করে তাকে তুমি উপদেশ দান কর কুরআনের সাহায্যে। অর্থাৎ যার অন্তরে আল্লাহর ভয় আছে, তার শাস্তিকে যে ভয় করে এবং তাঁর রহমতের আশা করে, তাকে তুমি কুরআনের মাধ্যমে উপদেশ দাও। এতে সে অবশ্যই উপকৃত হবে এবং সঠিক পথে চলে আসবে। যেমন আল্লাহ পাক অন্য আয়াতে বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তোমার দয়িত্ব শুধু পৌছিয়ে দেয়া এবং হিসাব গ্রহণের দায়িত্ব আমার।” (১৩:৪০) আর এক জায়গায় আছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “অতএব তুমি উপদেশ দাও, তুমি তো একজন উপদেশদাতা। তুমি তাদের কর্মনিয়ন্ত্রক নও।” (৮৮:২১-২২)।
অন্য এক জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “তাদেরকে হিদায়াত করা তোমার দায়িত্ব নয়, বরং আল্লাহ যাকে চান হিদায়াত দান করে থাকেন।” (২:২৭২) অন্য এক জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তুমি যাকে ভালবাস তাকে তুমি হিদায়াত দান করতে পার না, বরং আল্লাহ যাকে চান হিদায়াত দান করে থাকেন।” (২৮:৫৬) এজন্যেই আল্লাহ তা'আলা এখানে বলেনঃ “তুমি তাদের উপর জবরদস্তিকারী নও, সুতরাং যে আমার শাস্তিকে ভয় করে তাকে তুমি উপদেশ দান কর কুরআনের সাহায্যে।
হযরত কাতাদা (রঃ) দু'আ করতেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে আল্লাহ! যারা আপনার শাস্তিকে ভয় করে এবং আপনার নিয়ামতের আশা রাখে, আমাদেরকে আপনি তাদেরই অন্তর্ভুক্ত করুন! হে অনুগ্রহশীল, হে করুণাময়!”
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।