সূরা কাফ (আয়াত: 4)
হরকত ছাড়া:
قد علمنا ما تنقص الأرض منهم وعندنا كتاب حفيظ ﴿٤﴾
হরকত সহ:
قَدْ عَلِمْنَا مَا تَنْقُصُ الْاَرْضُ مِنْهُمْ ۚ وَ عِنْدَنَا کِتٰبٌ حَفِیْظٌ ﴿۴﴾
উচ্চারণ: কাদ ‘আলিমনা-মা-তানকুসুল আরদুমিনহুম ওয়া ‘ইনদানা-কিতা-বুন হাফীজ।
আল বায়ান: অবশ্যই আমি জানি মাটি তাদের থেকে যতটুকু ক্ষয় করে। আর আমার কাছে আছে অধিক সংরক্ষণকারী কিতাব।
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৪. অবশ্যই আমরা জানি মাটি ক্ষয় করে তাদের কতটুকু এবং আমাদের কাছে আছে সম্যক সংরক্ষণকারী কিতাব।
তাইসীরুল ক্বুরআন: আমি জানি মাটি তাদের কতটুকু ক্ষয় করে আর আমার কাছে আছে এক কিতাব যা (সব কিছুর পূর্ণ বিবরণ) সংরক্ষণ করে।
আহসানুল বায়ান: (৪) মাটি তাদের কতটুকু ক্ষয় করে, আমি অবশ্যই তা জানি এবং আমার নিকট আছে সংরক্ষিত কিতাব।[1]
মুজিবুর রহমান: আমিতো জানি, মৃত্তিকা ক্ষয় করে তাদের কতটুকু এবং আমার নিকট আছে রক্ষিত ফলক।
ফযলুর রহমান: মাটি তাদের (মৃতদেহের) কতটুকু ক্ষয় করবে তা আমার জানা আছে। তা ছাড়া, আমার কাছে এক সংরক্ষিত কিতাব (লাওহে মাহ্ফূয) তো আছেই।
মুহিউদ্দিন খান: মৃত্তিকা তাদের কতটুকু গ্রাস করবে, তা আমার জানা আছে এবং আমার কাছে আছে সংরক্ষিত কিতাব।
জহুরুল হক: আমরা আলবৎ জানি তাদের মধ্যের কতটুকু পৃথিবী হ্রাস করে ফেলে, আর আমাদের কাছে রয়েছে সুরক্ষিত গ্রন্থ।
Sahih International: We know what the earth diminishes of them, and with Us is a retaining record.
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ৪. অবশ্যই আমরা জানি মাটি ক্ষয় করে তাদের কতটুকু এবং আমাদের কাছে আছে সম্যক সংরক্ষণকারী কিতাব।
তাফসীর:
-
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (৪) মাটি তাদের কতটুকু ক্ষয় করে, আমি অবশ্যই তা জানি এবং আমার নিকট আছে সংরক্ষিত কিতাব।[1]
তাফসীর:
[1] অর্থাৎ, মাটি মানুষের গোশত, হাড় ও চুল আদি জীর্ণ করে খেয়ে ফেলে; অর্থাৎ, দেহকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে ফেলে। আর এ জ্ঞান কেবল যে আমার কাছে --তা নয়। বরং আমার কাছে লওহে মাহফুযেও লিপিবদ্ধ আছে। তাই ঐ সমস্ত চূর্ণ ও বিক্ষিপ্ত টুকরোগুলো একত্রিত করে পুনরায় তাদেরকে জীবিত করে দেওয়া আমার জন্য কোন কঠিন ব্যাপার নয়।
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: নামকরণ ও আলোচ্য বিষয় :
সূরা ক্বাফ সম্পূর্ণ মক্কায় অবতীর্ণ হয়। ইবনু আব্বাস ও কাতাদাহ (রাঃ) বলেন : তবে একটি আয়াত ব্যতীত, তাহল-
(وَلَقَدْ خَلَقْنَا السَّمٰوٰتِ وَالْأَرْضَ وَمَا بَيْنَهُمَا فِيْ سِتَّةِ أَيَّامٍ ق وَّمَا مَسَّنَا مِنْ لُّغُوْبٍ)।
অত্র সূরার প্রথম আয়াতে উল্লেখিত ‘ক্বাফ’ বর্ণটি থেকেই উক্ত নামে সূরার নামকরণ করা হয়েছে।
এ সূরাটি “ত্বিওয়ালে মুফাস্সাল”-এর প্রথম সূরা। সূরা ক্বাফ থেকে সূরা আন-নাযিআত পর্যন্ত সূরাগুলোকে طوال المفصل বলা হয়। আবার কেউ কেউ সূরা আল হুজুরাত থেকেও গণনা করেছেন। তবে প্রথমটি সঠিক। (ইবনু কাসীর ও ফাতহুল কাদীর, অত্র সূরা তাফসীরের শুরু)
কুত্ববাহ্ ইবনু মালিক (রাঃ) বলেন : নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ফজরের প্রথম রাক‘আতে এ সূরা তিলাওয়াত করতেন। (সহীহ মুসলিম হা. ৪৫৮)
ওয়াকিদ আল লাইসী (রাঃ) বলেন : রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ঈদের সালাতে সূরা ক্বাফ ও সূরা আল ক্বামার তিলাওয়াত করতেন। (সহীহ মুসলিম হা. ৮৯১, আত্ তিরমিযী হা. ৫৩৪)
উম্মু হিশাম বিনতু হারেসাহ্ (রাঃ) বলেন : আমি সূরা ক্বাফ রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর মুখ থেকে শিখেছি। তিনি প্রত্যেক জুমু‘আয় মিম্বারে দাঁড়িয়ে মানুষের সামনে এ সূরা পাঠ করতেন। (সহীহ মুসলিম, আবূ দাঊদ হা. ১০১২)
হাফিয ইবনু কাসীর (রহঃ) বলেন : বড় ধরনের সমাবেশে (যেমন ঈদ, জুমু‘আহ্) এ সূরা পাঠ করার উদ্দেশ্য হলো এতে মানব সৃষ্টির সূচনা, পুনরুত্থান, আখিরাত, কিয়ামত, হিসাব, জান্নাত, জাহান্নাম ইত্যাদি বিষয়ে আলোচনা করা হয়েছে তা জানানোর জন্য। আল্লাহ অধিক জানেন। (ইবনু কাসীর)
১-৫ নম্বর আয়াতের তাফসীর :
قٓ (ক্বাফ) এ জাতীয় “হুরূফুল মুক্বাত্বআত” বা বিচ্ছিন্ন অক্ষরসমূহ সম্পর্কে সূরা বাক্বারার শুরুতে আলোচনা করা হয়েছে। এর অর্থ ও প্রকৃত উদ্দেশ্য আল্লাহ তা‘আলাই ভাল জানেন।
ইবনু কাসীর (রহঃ) বলেন : সমস্ত পৃথিবীকে বেষ্টন করে আছে এমন একটি পাহাড়ের নাম হল ক্বাফ। সম্ভবত এটা বানী ইসরাঈলের বর্ণিত কল্পকাহিনী। (আল্লাহ তা‘আলাই ভাল জানেন)
অতঃপর আল্লাহ সম্মানিত কুরআনের শপথ করেছেন। الْمَجِيْدُ শব্দের অর্থ সম্মানিত, অর্থাৎ কুরআন এমন একটি সম্মানিত কিতাব যা অর্থ ও শব্দগত দিক থেকে সকল আসমানী কিতাব থেকে সুউচ্চ ও মর্যাদাসম্পন্ন, বরকতময় ও গুণে পরিপূর্ণ। আল্লাহ তা‘আলা কুরআনের শপথ করলেন, কারণ আল্লাহ তা‘আলা যা ইচ্ছা তার নামে শপথ করতে পারেন, তবে মানুষ আল্লাহ তা‘আলা ছাড়া অন্য কারো নামে শপথ করতে পারে না। কুরআন নিয়ে মহান আল্লাহর এ শপথের জবাব উহ্য রয়েছে, তা হলো- لَتُبْعَثُنَّ (তোমরা অবশ্যই কিয়ামাতের দিন পুনরুত্থিত হবে)। আবার কেউ কেউ বলেছেন, এর জবাব হলো পরবর্তী আলোচ্য বিষয় যাতে নবুওয়াত ও পুনরুত্থানের কথাকে সুসাব্যস্ত করা হয়েছে।
(جَا۬ءَهُمْ مُنْذِرٌ مِنْهُمْ)
‘তাদের মধ্য হতে একজন সতর্ককারী আবির্ভূত হয়েছে’ অর্থাৎ তৎকালীন মক্কার কাফিররা এতে আশ্চর্যবোধ করত যে, তাদের মধ্য হতেই একজন ব্যক্তিকে রিসালাত প্রদান করা হয়েছে। তাদের বিশ্বাস যে, কোন ফেরেশতাকে নাবী হিসেবে পাঠানো হবে অথবা নাবীর সাথে কোন ফেরেশতাকে পাঠানো হবে।
যেমন তারা আশ্চর্য হয়ে বলত :
(وَقَالُوْا مَالِ ھٰذَا الرَّسُوْلِ یَاْکُلُ الطَّعَامَ وَیَمْشِیْ فِی الْاَسْوَاقِﺚ لَوْلَآ اُنْزِلَ اِلَیْھِ مَلَکٌ فَیَکُوْنَ مَعَھ۫ نَذِیْرًا)
“তারা বলে : ‘এ কেমন রাসূল’ যে আহার করে এবং হাটে-বাজারে চলাফেরা করে; তার কাছে কোন ফেরেশতা কেন অবতীর্ণ করা হল না, যে তার সঙ্গে থাকত সতর্ককারীরূপে?’ (আল ফুরকান ২৫ :৭)
আল্লাহ তা‘আলা বলেন :
(اَکَانَ لِلنَّاسِ عَجَبًا اَنْ اَوْحَیْنَآ اِلٰی رَجُلٍ مِّنْھُمْ اَنْ اَنْذِرِ النَّاسَ وَبَشِّرِ الَّذِیْنَ اٰمَنُوْٓا اَنَّ لَھُمْ قَدَمَ صِدْقٍ عِنْدَ رَبِّھِمْﺛ قَالَ الْکٰفِرُوْنَ اِنَّ ھٰذَا لَسٰحِرٌ مُّبِیْنٌ)
‘মানুষের জন্য এটা কি আশ্চর্যের বিষয় যে, আমি তাদেরই একজনের নিকট ওয়াহী প্রেরণ করেছি এ মর্মে যে, তুমি মানুষকে সতর্ক কর এবং মু’মিনদেরকে সুসংবাদ দাও যে, তাদের জন্য তাদের প্রতিপালকের নিকট আছে উচ্চ মর্যাদা! কাফিররা বলে, ‘এ তো এক সুস্পষ্ট জাদুকর!’ (সূরা ইউনুস ১০ :২)
অর্থাৎ এতে আশ্চর্যের কিছুই নেই। রাসূল যদি মানুষ না হয়ে ফেরেশতা হতেন তাহলে মাটির মানুষের সমস্যা নূরের তৈরি ফেরেশতাগণ বুঝতে সক্ষম হত না। অতএব রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমাদের মত পিতার ঔরসে মায়ের গর্ভে রক্ত মাংসে সৃষ্টি মাটির মানুষ, তিনি কোন ফেরেশতাও নন বা নূরের তৈরিও নন। যেখানে মক্কার কাফিররা জানত রাসূল মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমাদের মত একজন মানুষ, তাকে নবুআত দেয়া হয়েছে এবং এতে তারা আশ্চর্যও বোধ করেছে যে- নাবীদের খাবার, বাজার ইত্যাদির প্রয়োজন হয় নাকি? সেখানে আমাদের সমাজে একশ্রেণির মুসলিম বিশ্বাস করে নাবী মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নাকি নূরের তৈরি। এক্ষেত্রে মক্কার মুশরিকদের চেয়ে এদের আকীদাহর অবস্থা কত নিম্নমানের!
কাফিররা আশ্চর্য হয়ে আরো বলে, আমরা মারা যাওয়ার পর মাটি হয়ে যাব, নিঃশেষ হয়ে যাব এর পরেও কি আবার আমাদেরকে জীবিত করা হবে, এরূপ গঠনাকৃতি দেয়া হবে? এটা তো কল্পনাতীত কথা, এরূপ সংঘটিত হওয়া অসম্ভব। যেমন তাদের কথা আল্লাহ তা‘আলা তুলে ধরে বলেন :
(وَقَالُوا أَإِذَا ضَلَلْنَا فِي الْأَرْضِ أَإِنَّا لَفِي خَلْقٍ جَدِيدٍ بَلْ هُمْ بِلِقَا۬ءِ رَبِّهِمْ كَافِرُونَ)
“আর তারা বলে, আমরা যখন মাটিতে মিশে শেষ হয়ে যাব, তখন কি আবার আমাদেরকে নতুন করে সৃষ্টি করা হবে? বস্তুতঃ তারা তাদের প্রতিপালকের সাথে সাক্ষাতকে অস্বীকার করে।” কাফিররা পুনরুত্থানকে অসম্ভব ও কল্পনাতীত মনে করে এরূপ কথা কুরআনে বহু স্থানে উল্লেখ রয়েছে। তাদের এসব কল্পনাতীত চিন্তার জবাবে
মহান আল্লাহ বলছেন :
(قَدْ عَلِمْنَا مَا تَنْقُصُ الْأَرْضُ مِنْهُمْ ج وَعِنْدَنَا كِتٰبٌ حَفِيْظٌ)
“আমি তো জানি মাটি তাদের কতটুকু ক্ষয় করে এবং আমার নিকট আছে সংরক্ষিত এক কিতাব।” (সূরা কাফ ৫০ :৪) সূরা তাগাবুনের ৭ নং আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা এ ব্যাপারে নিজ সত্ত্বার শপথ করে বলেছেন : অবশ্যই পুনরুত্থান করানো হবে।
অর্থাৎ মাটি তাদের মাংসস্ত হাড় জীর্ণ করে খেয়ে ফেলুক, শরীর আলাদা আলাদা হয়ে যাক, আর যা কিছু হোক না কেন সব আল্লাহ তা‘আলা জানেন। সব কিছু লাওহে মাহফুজে লিপিবদ্ধ রয়েছে। এমন নয় যে কেউ টুকরো টুকরো হয়ে গেল বা আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে গেল তাকে আল্লাহ তা‘আলা ধরতে পারবেন না।
বানী ইসরাঈলের জনৈক ব্যক্তি মারা যাওয়ার পূর্বে তার সন্তানদেরকে অসিয়ত করেছিল যে, আমি মারা গেলে আমার মৃতদেহ পুড়িয়ে ছাই বানিয়ে উড়িয়ে দেবে। আল্লাহর শপথ, আল্লাহ আমাকে পাকড়াও করতে পারলে এমন শাস্তি দেবেন যা কাউকে দেয়া হয়নি। মারা যাওয়ার পর অসিয়ত অনুযায়ী সন্তানেরা তাই করল। আল্লাহ তা‘আলা জমিনকে নির্দেশ দিলেন মৃতদেহের ছাই একত্রিত করতে। জমিন তাই করল, আল্লাহ তা‘আলা তাকে জীবিত করে জিজ্ঞাসা করলেন তুমি কেন এরূপ করেছ? সে বলল : আপনার ভয়ে, তখন আল্লাহ তা‘আলা ঐ ব্যক্তিকে ক্ষমা করে দেন। (সহীহ বুখারী হা. ৩৪৮১)
ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম (রহঃ) বলেন : চিন্তা করুন! সূরাটি কত সুস্পষ্টভাবে প্রমাণ করছে যে, দুনিয়াতে মানুষকে যে শরীর দেয়া হয়েছে সে শরীরেই তাকে পুনরুত্থিত করা হবে। এমন নয় যে, আল্লাহ তা‘আলা মানুষের দুনিয়ার শরীর পরিবর্তন করে নতুন শরীর প্রদান করবেন। এরূপ বিশ্বাস করা পুনরুত্থানকে অস্বীকার করার শামিল। কারণ আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন :
(وَهُوَ الَّذِي يَبْدَأُ الْخَلْقَ ثُمَّ يُعِيدُهُ وَهُوَ أَهْوَنُ عَلَيْهِ)
“তিনিই সে সত্ত্বা যিনি সৃষ্টি সূচনা করেছেন আবার তিনিই তা ফিরিয়ে নিয়ে আসবেন। আর এটা তাঁর জন্য খুবই সহজ।” (সূরা রুম ৩০ :২৭)
সুতরাং কিয়ামতের দিন সব কিছু আল্লাহ তা‘আলা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে ফিরিয়ে আনতে সক্ষম। মূলত কাফিররা সত্যকে তথা কুরআন, ইসলাম ও মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে অস্বীকার করেছে। যার কারণে তারা সংশয়ে নিপতিত।
আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয় :
১. কুরআনের মর্যাদা সম্পর্কে জানলাম।
২. নাবী-রাসূলদেরকে মানব জাতি থেকে প্রেরণ করা হয়েছে। তারা মাটির মানুষ নূরের তৈরি নয়।
৩. পুনরুত্থানের প্রতি বিশ্বাস রাখা ঈমানের অন্যতম একটি রুকন। তার প্রতি বিশ্বাস না থাকলে মু’মিন হওয়া যাবে না।
৪. মানুষকে কবরস্থ করা হোক, আর যা কিছু করা হোক না কেন তার পুনরুত্থান হবেই।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: যেসব সূরাকে মুফাস্সাল সূরা বলা হয় ওগুলোর মধ্যে সূরায়ে কাফই প্রথম। তবে একটি উক্তি এও আছে যে, মুফাস্সাল সূরাগুলো সূরায়ে হুজুরাত হতে শুরু হয়েছে। সর্বসাধারণের মধ্যে এটা যে প্রসিদ্ধ হয়ে রয়েছে যে, মুফাস্সাল সূরাগুলো (আরবী) হতে শুরু হয় এটা একেবারে ভিত্তিহীন কথা। আলেমদের কেউই এর উক্তিকারী নন। মুফাস্সাল সূরাগুলোর প্রথম সূরা এই সূরায়ে কাফই বটে। এর দলীল হচ্ছে সুনানে আবি দাউদের ঐ হাদীসটি যা ‘বাবু তাহযীবিল কুরআন’-এর মধ্যে বর্ণিত হয়েছে। হযরত আউস ইবনে হুযাইফা (রাঃ) বলেনঃ সাকীফ প্রতিনিধি দলের মধ্যে শামিল হয়ে আমরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর খিদমতে হাযির হই। আহলাফ তো হযরত মুগীরা ইবনে শু’বা (রাঃ)-এর ওখানে অবস্থান। করেন। আর বানু মালিককে রাসূলুল্লাহ (সঃ) নিজের ওখানে অবস্থান করান। তাঁদের মধ্যে মুসাদ্দাদ (রাঃ) নামক এক ব্যক্তি বলেনঃ “প্রত্যহ রাত্রে ইশা'র নামাযের পর রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাদের নিকট আসতেন এবং দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আমাদেরকে তাঁর নিজের কথা শুনাতেন। এমন কি বিলম্ব হয়ে যাওয়ার কারণে তাঁর পা পরিবর্তন করার প্রয়োজন হতো। কখনো তিনি এই পায়ের উপর ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতেন এবং কখনো ঐ পায়ের উপর। প্রায়ই তিনি আমাদের সামনে ঐ সব দুঃখপূর্ণ ঘটনা বর্ণনা করতেন যেগুলো কুরায়েশরা ঘটিয়েছিল। অতঃপর তিনি বলতেনঃ “কোন দুঃখ নেই, আমরা মক্কায় দুর্বল ছিলাম, শক্তিহীন ছিলাম। তারপর আমরা মদীনায় আসলাম। এরপর মক্কাবাসী ও আমাদের মধ্যে যুদ্ধ সংঘটিত হয় এবং ফল হয় বালতির মত অর্থাৎ কখনো আমরা তাদের উপর বিজয়ী হই এবং কখনো তারা আমাদের উপর বিজয়ী হয়। মোটকথা, প্রত্যহ রাত্রে আমরা তাঁর প্রিয় সাহচর্য লাভ করে গৌরবান্বিত হতাম। একদা রাত্রে তাঁর আগমনের সময় হয়ে গেল কিন্তু তিনি আসলেন না। বহুক্ষণ পর আসলেন। আমরা বললামঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আজ তো আসতে আপনার খুব বিলম্ব হলো (কারণ কি?) উত্তরে তিনি বললেনঃ “হ্যাঁ, কুরআন কারীমের যে অংশ আমি দৈনিক পাঠ করে থাকি তা এই সময় পাঠ করছিলাম। অসমাপ্ত ছেড়ে আসতে আমার মন চাইলো না (তাই সমাপ্ত করে আসতে বিলম্ব হলো)।” হযরত আউস (রাঃ) বলেনঃ আমি সাহাবীদেরকে (রাঃ) জিজ্ঞেস করলামঃ আপনারা কুরআন কারীমকে কিভাবে ভাগ করতেন? তাঁরা উত্তরে বললেনঃ “আমাদের ভাগ করার পদ্ধতি নিম্নরূপঃ
প্রথম তিনটি সূরার একটি মনযিল, তারপর পাঁচটি সূরার এক মনযিল, এরপর সাতটি সূরার এক মনযিল, তারপর নয়টি সূরার এক মনযিল, অতঃপর এগারোটি সূরার এক মনযিল এবং এরপর তেরোটি সূরার এক মনযিল আর শেষে মুফাসসাল সূরাগুলোর এক মনযিল।” এ হাদীসটি সুনানে ইবনে মাজাহতেও রয়েছে। সুতরাং প্রথম ছয় মনযিলে মোট আটচল্লিশটি সূরা হচ্ছে। তারপর মুফাসসালের সমস্ত সূরার একটি মনযিল হলো। আর এই মনযিলের প্রথমেই সূরায়ে কা’ফ রয়েছে। নিয়মিতভাবে গণনা নিম্নরূপঃ
প্রথম মনযিলের তিনটি সূরা হলোঃ সূরায়ে বাকারা, সূরায়ে আলে ইমরান এবং সূরায়ে নিসা। দ্বিতীয় মনযিলের পাঁচটি সূরা হলোঃ সূরায়ে মায়েদাহ, সূরায়ে আনআম, সূরায়ে আ'রাফ, সূরায়ে আনফাল এবং সূরায়ে বারাআত। তৃতীয় মনযিলের সাতটি সূরা হচ্ছেঃ সূরায়ে ইউনুস, সূরায়ে হূদ, সূরায়ে ইউসুফ, সূরায়ে রা’দ, সূরায়ে ইবরাহীম, সূরায়ে হিজর এবং সূরায়ে নাহল। চতুর্থ মনযিলের নয়টি সূরা হলোঃ সূরায়ে সুবহান, সূরায়ে কাহাফ, সূরায়ে মারইয়াম, সূরায়ে তোয়া-হা, সূরায়ে আম্বিয়া, সূরায়ে হাজ্ব, সূরায়ে মু'মিনূন, সূরায়ে নূর এবং সূরায়ে ফুরকান। পঞ্চম মনযিলের এগারোটি সূরা হচ্ছেঃ সূরায়ে শুআরা, সূরায়ে নামল, সূরায়ে কাসাস, সূরায়ে আনকাবূত, সূরায়ে রূম, সূরায়ে লোকমান, সূরায়ে আলিফ-লাম-মীম-আস্সাজদাহ, সূরায়ে আহযার, সূরায়ে সাবা, সূরায়ে ফাতির এবং সূরায়ে ইয়াসীন। ষষ্ঠ মনযিলের তেরোটি সূরা হলোঃ সূরায়ে আস-সফফাত, সূরায়ে সা’দ, সূরায়ে যুমার, সূরায়ে গাফির, সূরায়ে হা-মীম আসসাজদাহ, সূরায়ে হা-মীম-আইন-সীন-কাফ, সূরায়ে যুখরুফ, সূরায়ে দুখান, সূরায়ে জাসিয়াহ, সূরায়ে আহকাফ, সূরায়ে কিতাল, সূরায়ে ফাতহ এবং সূরায়ে হুজুরাত। তারপর শেষের মুফাসসাল সূরাগুলোর মনযিল, যেমন সাহাবীগণ (রাঃ) বলেছেন এবং এটা সূরায়ে কা'ফ হতেই শুরু হয়েছে যা আমরা বলেছি। সুতরাং আল্লাহ তা'আলার জন্যেই সমস্ত প্রশংসা।
হযরত উমার ইবনুল খাত্তাব (রাঃ) হযরত আবু ওয়াফিদ লাইসীকে (রাঃ) জিজ্ঞেস করেনঃ “ঈদের নামাযে রাসূলুল্লাহ (সঃ) কি পড়তেন?” উত্তরে তিনি বলেনঃ “ঈদের নামাযে রাসূলুল্লাহ (সঃ) সূরায়ে কাফ এবং সূরায়ে ইকতারাবাত পাঠ করতেন।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) ও ইমাম মুসলিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)
হযরত উম্মে হিশাম বিনতে হারেসাহ (রাঃ) বলেনঃ “দুই বছর অথবা এক বছর ও কয়েক মাস পর্যন্ত রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর এবং আমাদের চুল্লী একটিই ছিল। আমি সূরায়ে কা'ফ-ওয়াল-কুরআনিল মাজীদ, এই সূরাটি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর মুখে শুনে শুনে মুখস্থ করে নিয়েছিলাম। কেননা, প্রত্যেক জুমআর দিন যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) জনগণের সামনে ভাষণ দেয়ার জন্যে মিম্বরের উপর দাড়াতেন তখন এই সূরাটি তিনি তিলাওয়াত করতেন। মোটকথা, বড় বড় সমাবেশে, যেমন ঈদ ও জুমআতে রাসূলুল্লাহ (সঃ) এই সূরাটি পড়তেন। কেননা, এর মধ্যে সৃষ্টির সূচনা, মৃত্যুর পরে পুনর্জীবন, আল্লাহ তা'আলার সামনে দাঁড়ানো, হিসাব-কিতাব, জান্নাত-জাহান্নাম, পুরস্কার-শাস্তি, উৎসাহ প্রদান এবং ভীতি প্রদর্শন ইত্যাদির বর্ণনা রয়েছে। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।
১-৫ নং আয়াতের তাফসীর:
(আরবী) হুরূফে হিজার মধ্যে একটি হরফ বা অক্ষর যেগুলো সূরাসমূহের প্রথমে এসে থাকে। যেমন (আরবী) ইত্যাদি। আমরা এগুলোর পূর্ণ ব্যাখ্যা সূরায়ে বাকারার তাফসীরের শুরুতে করে দিয়েছি। সুতরাং এখানে পুনরাবৃত্তি নিষ্প্রয়োজন। পূর্বযুগীয় কোন কোন গুরুজনের উক্তি এই যে, কাফ একটি পাহাড় যা সারা যমীনকে পরিবেষ্টন করে রয়েছে। মনে হয় এটা বানী ইসরাঈলের বানানো কথা যা কতক লোক তাদের নিকট হতে গ্রহণ করেছে এই মনে করে যে, তাদের থেকে রিওয়াইয়াত গ্রহণ করা বৈধ। যদিও তা সত্যও বলা যায় না এবং মিথ্যাও না। কিন্তু আমার ধারণা এই যে, এটা এবং এই ধরনের আরো বহু। রিওয়াইয়াত তো বানী ইসরাঈলের অবিশ্বাসী লোকেরা গড়িয়ে বা বানিয়ে নিয়েছে যাতে দ্বীনকে তারা জনগণের উপর মিশ্রিত করে দিতে পারে। একটু চিন্তা করলেই বুঝা যাবে যে, যদিও এই উম্মতের মধ্যে বড় বড় আলেম, হাফি, দ্বীনদার ও অকপট লোক সর্বযুগে ছিল এবং এখনো আছে তথাপি আল্লাহর একত্ববাদে অবিশ্বাসী লোকেরা অতি অল্প কালের মধ্যে মাওযূ' হাদীসসমূহ রচনা করে ফেলেছে! তাহলে বানী ইসরাঈল, যাদের উপর দীর্ঘ যুগ অতীত হয়েছে এবং যাদের মধ্যে হাফিয ও আলেমের সংখ্যা অতি নগণ্য ছিল, যারা আল্লাহর কালামকে মূলতত্ত্ব হতে সরিয়ে দিতো, যারা মদ্য পানে লিপ্ত থাকতো, যারা আল্লাহর আয়াতসমূহকে বদলিয়ে দিতো, তারা যে অনেক কিছু নিজেরাই বানিয়ে নিবে এতে বিস্ময়ের কিছুই নেই। সুতরাং হাদীসে তাদের হতে যে রিওয়াইয়াতগুলো গ্রহণ করা জায়েয রাখা হয়েছে সেগুলো হচ্ছে ঐ রিওয়াইয়াত যেগুলো কমপক্ষে জ্ঞানে ধরে ও বুঝে আসে। ওগুলো নয় যেগুলো স্পষ্টভাবে বিবেক বিরোধী। যেগুলো শোনমাত্রই জ্ঞানে ধরা পড়ে যে, ওগুলো মিথ্যা ও বাজে। ওগুলো মিথ্যা হওয়া এমনই প্রকাশমান যে, এর জন্যে দলীল আনয়নের কোনই প্রয়োজন হয় না। সুতরাং উপরে বর্ণিত রিওয়াইয়াতটিও অনুরূপ। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।
বড়ই দুঃখজনক যে, পূর্বযুগীয় ও পরবর্তী যুগের বহু গুরুজন আহলে কিতাব হতে এই ধরনের বর্ণনা ও কাহিনীগুলো কুরআন কারীমের তাফসীরে আনয়ন করেছেন। আসলে কুরআন মাজীদ এই প্রকারের রিওয়াইয়াতের মোটেই মুখাপেক্ষী নয়। সুতরাং সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ তা'আলারই প্রাপ্য।
মুহাম্মাদ আব্দুর রহমান ইবনে আবি হাতিম আর রাযীও (রঃ) এখানে এক অতি বিস্ময়কর আসার হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর বরাত দিয়ে বর্ণনা করেছেন, যার সনদ সঠিক নয়। তাতে রয়েছেঃ আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা একটি সমুদ্র সৃষ্টি করেছেন যা গোটা পৃথিবীকে ঘিরে রয়েছে। এই সমুদ্রের পিছনে একটি পাহাড় রয়েছে যা ওকে পরিবেষ্টন করে আছে, ওরই নাম কাফ। আকাশ ও পৃথিবী ওরই উপর উঠানো রয়েছে। আবার এই পাহাড়ের পিছনে আল্লাহ তাআলা এক যমীন সৃষ্টি করেছেন যা এই যমীন হতে সাতগুণ বড়। ওর পিছনে আবার একটি সমুদ্র রয়েছে যা ওকে ঘিরে রয়েছে। আবার ওর পিছনে একটি পাহাড় আছে যা ওকে পরিবেষ্টন করে আছে। ওটাকেও কাফ বলা হয়। দ্বিতীয় আকাশকে ওরই উপর উঁচু করা আছে। এই ভাবে সাতটি যমীন, সাতটি সমুদ্র, সাতটি পাহাড় এবং সাতটি আকাশ গণনা করেছেন। তিনি বলেন যে, আল্লাহর নিমের উক্তির তাৎপর্য এটাইঃ (আরবী) অর্থাৎ “এই যে সমুদ্র এর সহিত যদি আরো সাত সমুদ্র যুক্ত হয়ে কালি হয়।” (৩১:২৭) এর ইসনাদ ছেদ কাটা।
হযরত আলী ইবনে আবি তালহা (রাঃ) হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে যা বর্ণনা করেছেন তাতে রয়েছে যে, (আরবী) আল্লাহর নামসমূহের মধ্যে একটি নাম। হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, (আরবী) অক্ষরটিও (আরবী) প্রভৃতি হুরূফে হিজার মতই একটি হরফ বা অক্ষর। সুতরাং এসব উক্তি দ্বারা হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত বলে ধারণাকৃত পূর্বের উক্তিটি দূর হয়ে যায়। এটাও বলা হয়েছে যে, এর দ্বারা বুঝানো হয়েছেঃ “আল্লাহর কসম! কাজের ফায়সালা করে দেয়া হয়েছে এবং বলে অবশিষ্ট বাক্য ছেড়ে দেয়া হয়েছে। যেমন কবির উক্তিঃ
(আরবী) অর্থাৎ “আমি তাকে (মহিলাটিকে) বললামঃ থামো, তখন সে বললো।” কিন্তু এই তাফসীরের ব্যাপারেও চিন্তা-ভাবনার অবকাশ রয়েছে। কেননা, উহ্যের উপর ইঙ্গিতকারী কালাম পরিষ্কার হওয়া উচিত। তাহলে এখানে কোন্ কালাম রয়েছে যদদ্বারা এতো বড় বাক্য উহ্য থাকার প্রতি ইঙ্গিত করছো?
অতঃপর আল্লাহ তা'আলা ঐ মহাসম্মানিত কুরআনের শপথ করছেন যার সামনে হতে ও পিছন হতে বাতিল আসতেই পারে না, যা বিজ্ঞানময় ও প্রশংসার্হ আল্লাহর নিকট হতে অবতারিত।
এই কসমের জবাব কি এ সম্পর্কেও কয়েকটি উক্তি রয়েছে। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) তো কোন কোন নাহভী হতে বর্ণনা করেছেন যে, এর জবাব হলো (আরবী) হতে পূর্ণ আয়াত পর্যন্ত। কিন্তু এ ব্যাপারেও চিন্তা-ভাবনার অবকাশ রয়েছে। বরং এই কসমের জবাব হলো কসমের পরবর্তী কালামের বিষয় অর্থাৎ নবুওয়াত এবং দ্বিতীয় বারের জীবনকে সাব্যস্ত করণ, যদিও শব্দ দ্বারা এটা বলা হয়নি। এরূপ কসমের জবাব কুরআন কারীমে বহু রয়েছে। যেমন সূরায়ে (আরবী)-এর শুরুতে এটা গত হয়েছে। এখানেও ঐরূপ হয়েছে।
এরপর আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলেনঃ “কিন্তু কাফিররা তাদের মধ্যে একজন সতর্ককারী আবির্ভূত হতে দেখে বিস্ময় বোধ করে ও বলেঃ এটা তো এক আশ্চর্যজনক ব্যাপার!' অর্থাৎ তারা এ দেখে খুবই বিস্ময় প্রকাশ করেছে যে, তাদেরই মধ্য হতে একজন মানুষ কিভাবে রাসূল হয়ে গেল! যেমন অন্য আয়াতে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “লোকেরা কি এতে বিস্ময় বোধ করেছে যে, আমি তাদেরই মধ্য হতে একজন লোকের উপর অহী অবতীর্ণ করেছি (এই বলার জন্যে) যে, তুমি লোকদেরকে ভয় প্রদর্শন কর....?” (১০:২) অর্থাৎ প্রকৃতপক্ষে এটা বিস্ময়ের ব্যাপার ছিল না। আল্লাহ তাআলা ফেরেশতাদের মধ্যে যাকে চান রিসালাতের জন্যে মনোনীত করেন এবং মানুষের মধ্যে যাকে চান রাসূলরূপে মনোনীত করেন। এরই সাথে এটাও বর্ণিত হচ্ছে যে, তারা মৃত্যুর পরে পুনর্জীবনকেও বিস্ময়ের দৃষ্টিতে দেখেছে। তারা বলেছেঃ আমরা যখন মরে যাবো এবং আমাদের মৃতদেহ গলে পচে মৃত্তিকায় পরিণত হয়ে যাবে, এরপরেও কি আমরা পুনরুত্থিত হবো? অর্থাৎ আমাদের অবস্থা এরূপ হয়ে যাওয়ার পর আমাদের পুনর্জীবন লাভ অসম্ভব। তাদের এ কথার জবাবে আল্লাহ তাআলা বলেনঃ মৃত্তিকা তাদের কতটুকু ক্ষয় করে তা তো আমি জানি। অর্থাৎ তাদের মৃতদেহের অণু-পরমাণু মাটির কোথায় যায় এবং কি অবস্থায় কোথায় থাকে তা আমার অজানা থাকে না। আমার নিকট যে রক্ষিত ফলক রয়েছে তাতে সব কিছুই লিপিবদ্ধ রয়েছে।
হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছে তাদের গোশত, চামড়া, হাড়, চুল ইত্যাদি যা কিছু মৃত্তিকায় খেয়ে ফেলে তা আমার জানা আছে।
এরপর আল্লাহ তাআলা তাদের এটাকে অসম্ভব মনে করার প্রকৃত কারণ বর্ণনা করছেন যে, তারা আসলে তাদের নিকট সত্য আসার পর তা প্রত্যাখ্যান করেছে। আর যারা এভাবে সত্যকে প্রত্যাখ্যান করে তাদের ভাল বোধশক্তি ছিনিয়ে নেয়া হয়। (আরবী) শব্দের অর্থ হচ্ছে বিভিন্ন, অস্থির, প্রত্যাখ্যানকারী এবং মিশ্রণ। যেমন কুরআন কারীমে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “নিশ্চয়ই তোমরা বিভিন্ন উক্তির মধ্যে রয়েছে। কুরআনের অনুসরণ হতে সেই বিরত থাকে যাকে কল্যাণ হতে ফিরিয়ে দেয়া হয়েছে।” (৫১:৮-৯)
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।