সূরা আন-নিসা (আয়াত: 89)
হরকত ছাড়া:
ودوا لو تكفرون كما كفروا فتكونون سواء فلا تتخذوا منهم أولياء حتى يهاجروا في سبيل الله فإن تولوا فخذوهم واقتلوهم حيث وجدتموهم ولا تتخذوا منهم وليا ولا نصيرا ﴿٨٩﴾
হরকত সহ:
وَدُّوْا لَوْ تَکْفُرُوْنَ کَمَا کَفَرُوْا فَتَکُوْنُوْنَ سَوَآءً فَلَا تَتَّخِذُوْا مِنْهُمْ اَوْلِیَآءَ حَتّٰی یُهَاجِرُوْا فِیْ سَبِیْلِ اللّٰهِ ؕ فَاِنْ تَوَلَّوْا فَخُذُوْهُمْ وَ اقْتُلُوْهُمْ حَیْثُ وَجَدْتُّمُوْهُمْ ۪ وَ لَا تَتَّخِذُوْا مِنْهُمْ وَلِیًّا وَّ لَا نَصِیْرًا ﴿ۙ۸۹﴾
উচ্চারণ: ওয়াদ্দূ লাও তাকফুরূনা কামা-কাফারূ ফাতাকূনূনা ছাওয়াআন ফাল্লা-তাত্তাখিযূমিনহুম আওলিয়াআ হাত্তা-ইউহা-জিরূ ফী ছাবীলিল্লা-হি ফাইন তাওয়ালাও ফাখুযূহুম ওয়াকতুলূহুম হাইছুওয়াজাততুমূহুম ওয়ালা-তাত্তাখিযূমিনহুম ওয়ালিইইয়াওঁ ওয়ালানাসীরা-।
আল বায়ান: তারা কামনা করে, যদি তোমরা কুফরী করতে যেভাবে তারা কুফরী করেছে। অতঃপর তোমরা সমান হয়ে যেতে। সুতরাং আল্লাহর রাস্তায় হিজরত না করা পর্যন্ত তাদের মধ্য থেকে কাউকে তোমরা বন্ধুরূপে গ্রহণ করো না। অতএব তারা যদি মুখ ফিরিয়ে নেয় তাহলে তাদেরকে পাকড়াও কর এবং তাদেরকে যেখানে পাও হত্যা কর। আর তাদের কাউকে অভিভাবকরূপে গ্রহণ করো না এবং না সাহায্যকারীরূপে।
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৮৯. তারা এটাই কামনা করে যে, তারা যেরূপ কুফরী করেছে তোমরাও সেরূপ কুফরী কর, যাতে তোমরা তাদের সমান হয়ে যাও। কাজেই আল্লাহর পথে হিজরত(১) না করা পর্যন্ত তাদের মধ্য থেকে কাউকেও বন্ধুরূপে গ্রহন করবে না। যদি তারা মুখ ফিরিয়ে নেয়, তবে তাদেরকে যেখানে পাবে গ্রেফতার করবে এবং হত্যা করবে আর তাদের মধ্য থেকে কাউকেও বন্ধু ও সহায়রূপে গ্রহণ করবে না।
তাইসীরুল ক্বুরআন: তারা আকাঙ্ক্ষা করে যে, তারা নিজেরা যেমন কুফরী করেছে, তোমরাও তেমনি কুফরী কর, যাতে তোমরা তাদের সমান হয়ে যাও। কাজেই তাদের মধ্য হতে কাউকেও বন্ধুরূপে গ্রহণ করো না, যে পর্যন্ত তারা আল্লাহর পথে হিজরত না করে। যদি তারা মুখ ফিরিয়ে নেয়, তবে তাদেরকে গ্রেফতার কর এবং যেখানেই তাদেরকে পাও, হত্যা কর। তাদের মধ্য হতে কোন বন্ধু ও সাহায্যকারী গ্রহণ করো না।
আহসানুল বায়ান: (৮৯) তারা চায় যে, তারা যেরূপ অবিশ্বাস করেছে, তোমরাও সেরূপ অবিশ্বাস কর; ফলে তারা ও তোমরা একাকার হয়ে যাও। অতএব আল্লাহর পথে দেশত্যাগ না করা পর্যন্ত তাদের মধ্য হতে কাউকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করো না। [1] অতঃপর যদি তারা মুখ ফিরিয়ে নেয়, তাহলে তাদেরকে যেখানে পাও, সেখানেই গ্রেফতার করে হত্যা কর[2] এবং তাদের মধ্য হতে কাউকেও বন্ধু ও সহায়রূপে গ্রহণ করো না।
মুজিবুর রহমান: তারা ইচ্ছা করে যে, তারা যেরূপ কাফির তোমরাও যেন তদ্রুপ কাফির হয়ে যাও, যাতে তোমরাও তাদের সদৃশ হও। অতএব তাদের মধ্য হতে বন্ধু গ্রহণ করনা, যে পর্যন্ত না তারা আল্লাহর পথে দেশ ত্যাগ করে; অতঃপর যদি তারা প্রতিগমন করে তাহলে তাদেরকে ধর এবং যেখানে পাও তাদেরকে সংহার কর; এবং তাদের মধ্য হতে বন্ধু অথবা সাহায্যকারী গ্রহণ করনা।
ফযলুর রহমান: তারা চায়, নিজেরা যেমন কুফরি করেছে তোমরাও তেমনি কুফরি করো এবং এভাবে সবাই একরকম হয়ে যাও। অতএব, তাদের মধ্য থেকে বন্ধু গ্রহণ করো না, যতক্ষণ না তারা আল্লাহর পথে হিজরত করে। যদি তারা রাজি না হয় তাহলে তাদেরকে যেখানেই পাবে ধরবে আর মারবে (হত্যা করবে); আর তাদের মধ্য থেকে কোন অভিভাবক কিংবা সাহায্যকারী গ্রহণ করবে না;
মুহিউদ্দিন খান: তারা চায় যে, তারা যেমন কাফের, তোমরাও তেমনি কাফের হয়ে যাও, যাতে তোমরা এবং তারা সব সমান হয়ে যাও। অতএব, তাদের মধ্যে কাউকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করো না, যে পর্যন্ত না তারা আল্লাহর পথে হিজরত করে চলে আসে। অতঃপর যদি তারা বিমুখ হয়, তবে তাদেরকে পাকড়াও কর এবং যেখানে পাও হত্যা কর। তাদের মধ্যে কাউকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করো না এবং সাহায্যকারী বানিও না।
জহুরুল হক: তারা ব্যতীত যারা এমন লোকদের সাথে যোগ-সাজশ করে যাদের মধ্যে ও তোমাদের মধ্যে অঙ্গীকার রয়েছে, অথবা যারা তোমাদের কাছে আসে যাদের হৃদয় সংকুচিত হয়েছে তোমাদের সঙ্গে যুদ্ধ করতে অথবা তাদের লোকদের সঙ্গে লড়াই করতে। আর যদি আল্লাহ্ ইচ্ছা করতেন তবে তিনি তোমাদের উপরে তাদের বলীয়ান করতেন, তার ফলে তারা নিশ্চয়ই তোমাদের সঙ্গে যুদ্ধ করতো। কাজেই যদি তারা তোমাদের থেকে সরে যায় ও তোমাদের সঙ্গে যুদ্ধ না করে, বরঞ্চ তোমাদের প্রতি শান্তি চুক্তি পেশ করে তাহলে তাদের বিরুদ্ধে কোনো পথ ধরবার জন্য আল্লাহ্ তোমাদের নিযুক্ত করেন নি।
Sahih International: They wish you would disbelieve as they disbelieved so you would be alike. So do not take from among them allies until they emigrate for the cause of Allah. But if they turn away, then seize them and kill them wherever you find them and take not from among them any ally or helper.
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ৮৯. তারা এটাই কামনা করে যে, তারা যেরূপ কুফরী করেছে তোমরাও সেরূপ কুফরী কর, যাতে তোমরা তাদের সমান হয়ে যাও। কাজেই আল্লাহর পথে হিজরত(১) না করা পর্যন্ত তাদের মধ্য থেকে কাউকেও বন্ধুরূপে গ্রহন করবে না। যদি তারা মুখ ফিরিয়ে নেয়, তবে তাদেরকে যেখানে পাবে গ্রেফতার করবে এবং হত্যা করবে আর তাদের মধ্য থেকে কাউকেও বন্ধু ও সহায়রূপে গ্রহণ করবে না।
তাফসীর:
(১) হিজরত দু’অর্থে ব্যবহৃত হয়- (১) দ্বীনের খাতিরে দেশ ত্যাগ করা, যেমন সাহাবায়ে কেরাম স্বদেশ মক্কা ছেড়ে মদীনা ও আবিসিনিয়ায় চলে যান। (২) পাপ কাজ বর্জন করা। তন্মধ্যে প্রথম প্রকার হিজরত হচ্ছে নিজের দ্বীনকে বাঁচানোর জন্য। ইসলামের প্রাথমিক যুগে কাফেরদের দেশ থেকে হিজরত করা প্রত্যেক মুসলিমের উপর ফরয ছিল। এ কারণে যারা এ ফরয পরিত্যাগ করতো, তাদের সাথে আল্লাহ্ তাআলা মুসলিমদের মত ব্যবহার করতে নিষেধ করে দেন। হিজরত সম্পর্কে হাদীসে বলা হয়েছেঃ যতদিন তাওবা কবুল হওয়ার সময় থাকবে, ততদিন হিজরত বাকী থাকবে। [আবু দাউদঃ ২৪৭৯]
এর দ্বারা বোঝা যায় যে, বর্তমানেও যদি কোন দেশে মুসলিমরা তাদের ঈমান টিকিয়ে রাখতে সামর্থ না হয়, তাদেরকে সেখান থেকে হিজরত করতে হবে ৷ পক্ষান্তরে দ্বিতীয় প্রকার হিজরত হচ্ছে, পাপকর্ম ত্যাগ করা। যেমন, এক হাদীসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ ‘ঐ ব্যক্তি মুহাজির, যে আল্লাহর নিষিদ্ধ বিষয় বর্জন করে। [মুসনাদে আহমাদঃ ৪/৯৯] এ হিজরত সর্বাবস্থায় একজন মুমিনের কর্তব্য। এর জন্য দেশ ত্যাগের প্রয়োজন পড়ে না।
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (৮৯) তারা চায় যে, তারা যেরূপ অবিশ্বাস করেছে, তোমরাও সেরূপ অবিশ্বাস কর; ফলে তারা ও তোমরা একাকার হয়ে যাও। অতএব আল্লাহর পথে দেশত্যাগ না করা পর্যন্ত তাদের মধ্য হতে কাউকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করো না। [1] অতঃপর যদি তারা মুখ ফিরিয়ে নেয়, তাহলে তাদেরকে যেখানে পাও, সেখানেই গ্রেফতার করে হত্যা কর[2] এবং তাদের মধ্য হতে কাউকেও বন্ধু ও সহায়রূপে গ্রহণ করো না।
তাফসীর:
[1] হিজরত (দ্বীনের জন্য স্বদেশত্যাগ) করলে প্রমাণিত হয় যে, এখন সে নিষ্ঠাবান মুসলিমে পরিণত হয়েছে। এই অবস্থায় তার সাথে বন্ধুত্ব স্থাপন করা বৈধ।
[2] তাতে তা ‘হিল্ল’ (যেখানে হত্যাকান্ড বৈধ সেখানে) হোক অথবা ‘হারাম’ (যেখানে হত্যাকান্ড বৈধ নয় সেখানে) হোক, যখন তোমরা তাদেরকে নিজেদের কাবুতে পেয়ে যাবে।
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ৮৮-৯১ নং আয়াতের তাফসীর:
শানে নুযূল:
যায়েদ বিন ছাবেত (রাঃ) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) উহুদের যুদ্ধের জন্য বের হলেন। কিছু মানুষ যুদ্ধ না করে ফিরে আসে। ফলে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সাহাবীগণ দু’দলে বিভক্ত হয়ে যায়। একদল বলে আমরা তাদেরকে হত্যা করব, আরেক দল বলে না, হত্যা করব না কেননা তারা মু’মিন। তখন এ আয়াত অবতীর্ণ হয়:
(فَمَا لَكُمْ فِي الْمُنٰفِقِيْنَ فِئَتَيْنِ)
(সহীহ বুখারী হা: ১৮৮৪, সহীহ মুসলিম হা: ২৭৭৬)
کَسَبُوْا (কৃতকর্ম) বলতে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর বিরোধিতা এবং জিহাদ থেকে বিমুখতা অবলম্বন করা।
أركسهم সুদ্দী বলেন: أضلهم তাদেরকে পথ ভ্রষ্ট করবেন।
وَدُّوْا ‘তারা কামনা করে’ অর্থাৎ কাফিররা চায়- যদি তোমরা কুফরী করতে ফলে তাদের সমান হয়ে যেতে। এ সম্পর্কে সূরা বাকারায় আলোচনা করা হয়েছে।
(فَاِنْ تَوَلَّوْا) ‘যদি তারা মুখ ফিরিয়ে নেয়’ যদি জিহাদ ছেড়ে দেয়। ইবনু আব্বাস (রাঃ) ও সুদ্দী (রহঃ) বলেন: যদি তারা কুফরী প্রকাশ করে, তাহলে যেখানে পাবে সেখানেই হত্যা করবে। তবে যারা এমন সম্প্রদায়ের সাথে মিলিত হয়, যাদের সাথে তোমরা চুক্তিবদ্ধ তাদের বিধান তোমাদের বিধানের মত অথবা এমন লোক যারা তোমাদের কাছে এমন অবস্থায় আসে যে, তাদের হৃদয় নিজেদের জাতির সাথে মিলে তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার বা তোমাদের সাথে মিলে নিজের জাতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার ব্যাপারে বড় সংকীর্ণতা বোধ করে। অর্থাৎ না তোমাদের পক্ষ হয়ে যুদ্ধ করে, না তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে।
(فَمَا جَعَلَ اللّٰهُ لَكُمْ عَلَيْهِمْ سَبِيْلًا)
‘তবে আল্লাহ তোমাদের জন্য তাদের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা দেননি।’তারা যদি পৃথক হয়ে যায়, তোমাদের সাথে যুদ্ধ না করে এবং তোমাদের নিকট সন্ধি প্রার্থনা করে তাহলে তোমরা তাদেরকে হত্যা করতে পারবে না। যতদিন তারা এ অবস্থায় বিদ্যমান থাকবে। এদের দৃষ্টান্ত সেই গোষ্ঠিও বটে, যাদের সম্পর্ক ছিল বানী হাশেমের সাথে। এরা বদর যুদ্ধে মুশরিকদের সাথে যুদ্ধের ময়দানে উপস্থিত হলেও মুসলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করাতে তাদের কোনই ইচ্ছা ছিল না। যেমন রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর চাচা আব্বাস প্রভৃতি।
(سَتَجِدُوْنَ اٰخَرِيْنَ)
‘অচিরেই তোমরা এমন কিছু লোক পাবে’ এরা হল মুনাফিকদের অন্যতম আরেকটি দল। এরা মুসলিমদের কাছে এসে ইসলাম প্রকাশ করত যাতে মুসলিমদের হাত থেকে নিরাপদে থাকতে পারে। আবার যখন স্বীয় জাতির নিকট যেত, তখন তাদের সাথে শির্ক ও মূর্তি পূজায় লিপ্ত হত যাতে এদেরকে নিজেদের দলভুক্ত মনে করে। এভাবেই এরা উভয় স্বার্থ হাসিল করত। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(وَإِذَا خَلَوْا إِلٰي شَيَاطِينِهِمْ قَالُوْآ إِنَّا مَعَكُمْ)
“যখন তারা নিজেদের শয়তানদের (কাফির বন্ধুদের) সাথে মিলিত হয় তখন বলে, আমরা তোমাদের সঙ্গেই আছি।“ (সূরা বাকারাহ ২:১৪)
الفتنة ‘ফেতনা’সুদ্দী (রহঃ) বলেন: এর দ্বারা উদ্দেশ্য শির্ক। আর যদি তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা থেকে তারা বিরত না থাকে এবং সন্ধিও না করে তাহলে তাদেরকে ধর আর হত্যা কর।
মোটকথা উপরে বর্ণিত তিন প্রকার মুনাফিক ব্যতীত যারা তোমাদের সাথে বাহ্যিক মিল রাখে কিন্তু সুযোগ পেলেই তোমাদের হত্যা করার সংকল্প রাখে তাদরেকে হত্যা করতে কোন বাধা নেই।
আয়াত থেকে শিক্ষণীয় বিষয়:
১. মুনাফিকদের শ্রেণি বিন্যাস সম্পর্কে জানতে পারলাম।
২. মুনাফিকদের সাথে কিভাবে মুয়ামালাত করব তা জানতে পারলাম।
৩. মুনাফিকদেরকে কখন হত্যা করা যাবে তা জানতে পারলাম।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: ৮৮-৯১ নং আয়াতের তাফসীর:
মুনাফিকদের কোন ব্যাপারে যে মুসলমানদের দু' প্রকার মত হয়েছিল সে সম্বন্ধে মতভেদ রয়েছে। হযরত যায়েদ ইবনে সাবিত (রাঃ) বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) যখন উহুদ প্রান্তরে গমন করেন তখন তার সাথে মুনাফিকেরাও ছিল। তারা যুদ্ধের পূর্বেই ফিরে এসেছিল। তাদের ব্যাপারে কতক মুসলমান বলছিলেন যে, তাদেরকে হত্যা করে ফেলা উচিত। আবার অন্য কয়েকজন বলছিলেন যে, হত্যা করা হবে না, কেননা তারাও মুমিন। তখন এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ ‘এটা পবিত্র শহর, এটা নিজেই মালিন্য এমনভাবে দূর করে দেবে যেমনভাবে ভাটি লোহাকে পরিষ্কার করে থাকে। (সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিম)
মুহাম্মাদ ইবনে ইসহাক (রঃ) উহুদ যুদ্ধের ঘটনা সম্বন্ধে বলেন যে, উহুদের যুদ্ধে মুসলমানদের মোট সৈন্যসংখ্যা ছিল এক হাজার। আবদুল্লাহ ইবনে উবাই ইবনে সাল তিনশ লোককে সঙ্গে নিয়ে ফিরে এসেছিল এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সঙ্গে সাতশ জন রয়ে গিয়েছিলেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, মক্কায় এমন কতগুলো লোক ছিল যারা ইসলামের কালেমা পাঠ করেছিল। কিন্তু মুসলমানদের বিরুদ্ধে মুশরিকদেরকে সাহায্য করতো। তারা নিজেদের কোন বিশেষ প্রয়োজনে মক্কা হতে বের হয়। তাদের বিশ্বাস ছিল যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাহাবীগণ তাদেরকে কোন বাধা প্রদান করবেন না। কেননা, প্রকাশ্যে তারা কালেমা পড়েছিল।
মদীনার মুসলমানগণ যখন এ সংবাদ জানতে পারেন তখন তাদের মধ্যে কেউ কেউ বলেনঃ “এ কাপুরুষদের সাথে প্রথমে জিহাদ করা হোক। কেননা, এরা আমাদের শত্রুদের পৃষ্ঠপোষক। কিন্তু কতক লোক বলেন, 'সুবহানাল্লাহ! যারা আমাদের মতই কালেমা পড়ে তোমরা তাদের সাথেই যুদ্ধ করবে। শুধু এ কারণে যে, তারা হিজরত করেনি এবং নিজেদের ঘরবাড়ী ছাড়েনি? আমরা কিভাবে তাদের রক্ত ও মাল হালাল করতে পারি?
রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সামনে তাদের এ মতানৈক্য হয়েছিল। তিনি নীরব ছিলেন। সে সময় এ আয়াত অবতীর্ণ হয়। (মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিম) হযরত সাদ ইবনে মুআয বলেন যে, হযরত আয়েশা (রাঃ)-কে যখন অপবাদ দেয়া হয়েছিল সে সময় রাসূলুল্লাহ (সঃ) মিম্বরের উপর দাড়িয়ে বলেনঃ “কে আছে যে আমাকে আবদুল্লাহ ইবনে উবাইয়ের উৎপীড়ন হতে রক্ষা করে? সে সময় আউস ও খাযরাজ গোত্রদ্বয়ের মধ্যে যে মতানৈক্যের সৃষ্টি হয় ঐ ব্যাপারেই এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। কিন্তু এ উক্তিটি গারীব। এ ছাড়া আরও উক্তি রয়েছে। আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে তাদের অবাধ্যতার কারণে ধ্বংস করেছেন। তাদের হিদায়াতের কোন পথ নেই। তারাতে চায় যে খাটি মুসলমানও তাদের মত পথভ্রষ্ট হয়ে যাক।
তাই আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “তাদের অন্তরে যখন তোমাদের প্রতি এত শত্রুতা রয়েছে তখন তোমাদেরকে নিষেধ করা হচ্ছে যে, যে পর্যন্ত তারা হিজরত না করে সে পর্যন্ত তোমরা তাদেরকে নিজের মনে করো না। তোমরা এটা মনে করো না যে, তারা তোমাদের বন্ধু ও সাহায্যকারী। বরং তারা নিজেরাই এর যোগ্য যে, নিয়মিতভাবে তাদের সাথে যুদ্ধ করা হবে। অতঃপর ওদের মধ্য হতে ঐ লোকদেরকে পৃথক করা হচ্ছে যারা কোন এমন সম্প্রদায়ের আশ্রয়ে চলে যায় যাদের সঙ্গে মুসলমানদের সন্ধি ও চুক্তি রয়েছে। তখন তাদের হুকুম সন্ধিযুক্ত সম্প্রদায়ের মতই হবে।
সুরাকাহ্ ইবনে মালিক মুদলেজী বলে-বদর ও উহুদ যুদ্ধে যখন মুসলমানেরা জয়যুক্ত হয় এবং আশে-পাশের লোকদের মধ্যে ইসলাম ভালভাবে ছড়িয়ে পড়ে তখন আমি জানতে পারি যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমার গোত্র বানূ মুদলিজের বিরুদ্ধে হযরত খালিদ ইবনে ওয়ালীদ (রাঃ)-এর নেতৃত্বে এক সৈন্য বাহিনী প্রেরণ করার সংকল্প করেছেন। আমি তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর খিদমতে উপস্থি হয়ে আরয করি- আমি আপনাকে অনুগ্রহের কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি। তখন জনগণ বলেনঃ “চুপ কর।' কিন্তু তিনি বলেনঃ ‘তাকে বলতে দাও। তুমি কি বলতে চাও, বল। আমি তখন বলি, আমি জানতে পেরেছি যে, আপনি আমার সম্প্রদায়ের দিকে সেনাবাহিনী পাঠাতে চাচ্ছেন। আমি চাই, আপনি তাদের সাথে এ শর্তে সন্ধি করুন যে, যদি কুরাইশরা ইসলাম গ্রহণ করে তবে তারাও মুসলমান হয়ে যাবে। আর যদি তারা মুসলমান না হয় তবে তাদের উপরও আপনি আক্রমণ করবেন না। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন হযরত খালিদ ইবনে ওয়ালীদ (রাঃ)-এর হাতখানা স্বীয় হাতের মধ্যে নিয়ে বলেনঃ তুমি এর সাথে যাও এবং এর কথা অনুসারে তার কওমের সাথে সন্ধি করে এসো। সুতরাং এ শর্তে সন্ধি হয়ে গেল যে, তারা ধর্মের শত্রুদেরকে কোন প্রকারের সাহায্য করবে না এবং যদি কুরাইশরা মুসলমান হয়ে যায় তবে তারাও মুসলমান হয়ে যাবে। তখন আল্লাহ তা'আলা (আরবী)-এ আয়াতটি অবতীর্ণ করেন। অর্থাৎ এরা চায় যে, তাদের মত তোমরাও কুফরী কর যেন তোমরা সমান হয়ে যাও। সুতরাং তাদের মধ্যে হতে কাউকেও বন্ধুরূপে গ্রহণ করো না। এ বর্ণনাটি তাফসীর-ই-ইবনে মিরদুওয়াই-এর মধ্যেও রয়েছে। তাতে রয়েছে যে, আল্লাহ তা'আলা তখন (আরবী)-এ আয়াতটি অবতীর্ণ করেন। অর্থাৎ কিন্তু যারা এমন সম্প্রদায়ের সাথে সম্মিলিত হয় যে, তোমাদের মধ্যে ও তাদের মধ্যে চুক্তি রয়েছে। সুতরাং যারা তাদের সঙ্গে মিলিত হবে তারাও তাদের মতই পূর্ণ নিরাপত্তা লাভ করবে। কালামের শব্দের সাথে এরই বেশী সম্পর্ক রয়েছে।
সহীহ বুখারী শরীফে হুদায়বিয়ার সন্ধি ঘটনায় রয়েছে যে, এরপর যে চাইতো মদীনার মুসলমানদের সাথে মিলিত হতো এবং চুক্তিপত্রের কারণে। নিরাপত্তা লাভ করতো। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর উক্তি এই যে, নিম্নের আয়াতটি এ হুকুমকে রহিত করে দেয়ঃ (আরবী) অর্থাৎ ‘যখন হারাম মাসগুলো অতিক্রান্ত হয়ে যাবে তখন মুশরিকদেরকে যেখানেই পাও সেখানেই হত্যা কর”। (৯:৫) এরপর অন্য একটি দলের বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যাদেরকে যুদ্ধক্ষেত্রে নিয়ে আসা হয় বটে কিন্তু তারা সংকুচিত চিত্ত হয়ে হাযির হয়। তারা না তোমাদের সাথে যুদ্ধ করতে চায়, না তোমাদের সাথে মিলিত হয়ে স্বীয় সম্প্রদায়ের সাথে যুদ্ধ করা পছন্দ করে। বরং ত পক্ষীয় লোকে। তাদেরকে না তোমাদের শত্রু বলা যেতে পরে, না বন্ধু বলা যেতে পারে। সুতরাং এটাও আল্লাহ পাকের একটা অনুগ্রহ যে, তিনি তাদেরকে তোমাদের উপর শক্তিশালী করেননি। তিনি ইচ্ছে করলে তাদের ক্ষমতা দান করতেন এবং তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার স্পৃহা তাদের অন্তরে জাগিয়ে তুলতেন। সুতরাং যদি তারা তোমাদের সাথে যুদ্ধ করা হতে বিরত থাকে এবং তোমাদের নিকট সন্ধি প্রার্থনা করে তবে তোমাদের জন্যে তাদের সাথে যুদ্ধ করবার অনুমতি নেই।
বদরের যুদ্ধে বানু হাশিম গোত্রের কতগুলো লোক মুশরিকদের সাথে যুদ্ধ ক্ষেত্রে এসেছিল। যারা মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে অন্তরে অপছন্দ করেছিল, তারাই ছিল এ প্রকারের লোক। যেমন হযরত আব্বাস (রাঃ) ইত্যাদি। এ কারণেই রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত আব্বাস (রাঃ)-কে হত্যা করতে নিষেধ করেছিলেন এবং তাঁকে জীবিত গ্রেফতার করতে বলেছিলেন।
অতঃপর আর একটি দলের বর্ণনা দেয়া হচ্ছে, যারা বাহ্যতঃ উপরোক্ত দলের মতই কিন্তু তাদের নিয়ত খুবই কুঞ্চিত, তারা মুনাফিক। এ মুনাফিকরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট এসে ইসলাম প্রকাশ করতঃ স্বীয় জান ও মাল মুসলমানের হাত হতে রক্ষা করতো আর ওদিকে কাফিরদের সাথে মিলিত হয়ে তাদের বাতিল মাবুদের ইবাদত করতো এবং তাদেরই অন্তর্ভুক্ত হওয়ার কথা প্রকাশ করতঃ তাদের সাথেই মিলেমিশে থাকতো যেন তাদের নিকটেও নিরাপদে থাকতে পারে। প্রকৃতপক্ষে এরা ছিল কাফির। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ যখন তারা শয়তানদের সন্নিকটে একাকী হয়, তখন বলে নিশ্চয়ই আমরা তোমাদের সঙ্গেই আছি।' (২৪ ১৪) এখানেও বলা হচ্ছে-যখন তারা বিরোধের দিকে প্রত্যাবর্তিত হয় তখন তাতেই নিপতিত হয়। এখানেও শব্দের ভাবার্থ হচ্ছে শিরক। হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, এ লোকগুলোও মক্কাবাসী ছিল। এখানে এসে তারা রিয়াকারী রূপে ইসলাম গ্রহণ করতো এবং মক্কায় ফিরে গিয়ে মূর্তিপূজা করতো। তাই তাদের ব্যাপারে মুসলমানদেরকে আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ যদি তারা তোমাদের দিক হতে নিবৃত্ত না হয় ও সন্ধি প্রার্থনা না করে তবে তাদেরকে নিরাপত্তা দান করো না, বরং তাদের সাথে যুদ্ধ কর, বন্দী কর এবং যেখানেই পাও হত্যা কর। তাদের উপর আল্লাহ তা'আলা তোমাদেরকে প্রকাশ্য আধিপত্য দান করেছেন।
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।