আল কুরআন


সূরা আন-নিসা (আয়াত: 83)

সূরা আন-নিসা (আয়াত: 83)



হরকত ছাড়া:

وإذا جاءهم أمر من الأمن أو الخوف أذاعوا به ولو ردوه إلى الرسول وإلى أولي الأمر منهم لعلمه الذين يستنبطونه منهم ولولا فضل الله عليكم ورحمته لاتبعتم الشيطان إلا قليلا ﴿٨٣﴾




হরকত সহ:

وَ اِذَا جَآءَهُمْ اَمْرٌ مِّنَ الْاَمْنِ اَوِ الْخَوْفِ اَذَاعُوْا بِهٖ ؕ وَ لَوْ رَدُّوْهُ اِلَی الرَّسُوْلِ وَ اِلٰۤی اُولِی الْاَمْرِ مِنْهُمْ لَعَلِمَهُ الَّذِیْنَ یَسْتَنْۢبِطُوْنَهٗ مِنْهُمْ ؕ وَ لَوْ لَا فَضْلُ اللّٰهِ عَلَیْکُمْ وَ رَحْمَتُهٗ لَاتَّبَعْتُمُ الشَّیْطٰنَ اِلَّا قَلِیْلًا ﴿۸۳﴾




উচ্চারণ: ওয়া ইযা-জাআহুম আমরুম মিনাল আমনি আবিলখাওফি আযা-‘ঊ বিহী ওয়া লাও রাদ্দূহু ইলার রাছূলি ওয়া ইলাঊলিল আমরি মিনহুম লা‘আলিমাহুল্লাযীনা ইয়াছতামবিতূনাহু মিনহুম ওয়া লাওলা-ফাদলুল্লা-হি ‘আল্লাইকুম ওয়া রাহমাতুহু লাত্তাবা‘তুমশশাইতা-না ইলা-কালীলা-।




আল বায়ান: আর যখন তাদের কাছে শান্তি কিংবা ভীতিজনক কোন বিষয় আসে, তখন তারা তা প্রচার করে। আর যদি তারা সেটি রাসূলের কাছে এবং তাদের কর্তৃত্বের অধিকারীদের কাছে পৌঁছে দিত, তাহলে অবশ্যই তাদের মধ্যে যারা তা উদ্ভাবন করে তারা তা জানত। আর যদি তোমাদের উপর আল্লাহর অনুগ্রহ ও তাঁর রহমত না হত, তবে অবশ্যই অল্প কয়েকজন ছাড়া তোমরা শয়তানের অনুসরণ করতে।




আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৮৩. যখন শান্তি বা শংকার কোন সংবাদ তাদের কাছে আসে তখন তারা তা প্রচার করে থাকে।(১) যদি তারা তা রাসুল(২) এবং তাদের মধ্যে যারা নির্দেশ প্রদানের অধিকারী তাদেরকে জানাত, তবে তাদের মধ্যে যারা তথ্য অনুসন্ধান করে তারা সেটার যথার্থতা নির্ণয় করতে পারত(৩)। তোমাদের প্রতি যদি আল্লাহ্‌র অনুগ্রহ ও রহমত না থাকত তবে তোমাদের অল্প সংখ্যক ছাড়া সকলে শয়তানের অনুসরণ করত।




তাইসীরুল ক্বুরআন: যখন তাদের নিকট নিরাপত্তার কিংবা ভয়ের কোন সংবাদ আসে তখন তারা তা রটিয়ে দেয়। যদি তারা তা রসূলের কিংবা তাদের মধ্যে যারা ক্ষমতার অধিকারী তাদের গোচরে আনত, তবে তাদের মধ্য হতে তথ্যানুসন্ধানীগণ প্রকৃত তথ্য জেনে নিত। যদি তোমাদের প্রতি আল্লাহর দয়া ও করুণা না থাকত তবে তোমাদের অল্প সংখ্যক ছাড়া সকলেই শায়ত্বনের অনুসরণ করত।




আহসানুল বায়ান: (৮৩) আর যখন শান্তি অথবা ভয়ের কোন সংবাদ তাদের নিকট আসে, তখন তারা তা রটিয়ে বেড়ায়। কিন্তু যদি তারা তা রসূল কিংবা তাদের মধ্যে দায়িত্বশীলদের গোচরে আনত, তাহলে তাদের মধ্যে তত্ত্বানুসন্ধানীগণ তার যথার্থতা উপলব্ধি করতে পারত। [1] আর তোমাদের প্রতি যদি আল্লাহর অনুগ্রহ ও দয়া না থাকত, তাহলে তোমাদের কিছু লোক ছাড়া সকলে শয়তানের অনুসরণ করত।



মুজিবুর রহমান: আর যখন তাদের নিকট কোন শাস্তি অথবা ভীতিজনক বিষয় উপস্থিত হয় তখন তারা ওটা রটনা করতে থাকে এবং যদি তারা ওটা রাসূলের কিংবা তাদের আদেশ দাতাদের প্রতি সমর্পন করত তাহলে তাদের মধ্যে সঠিক তথ্য পেয়ে যেত এবং যদি তোমাদের প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহ ও করুণা না হত তাহলে অল্প সংখ্যক ব্যতীত তোমরা শাইতানের অনুসরণ করতে।



ফযলুর রহমান: যখন তাদের কাছে নিরাপত্তা কিংবা ভয়ের কোন বিষয় উপস্থিত হয় তখন তারা সেটা প্রচার করে দেয়। (তা না করে) তারা যদি বিষয়টা রসূল ও তাদের মধ্যে দায়িত্বশীলদের গোচরে আনত তাহলে সেটা তাদের থেকে (সরাসরি) এমন লোকেরা জানতে পারত যারা তার সূত্র উদ্‌ঘাটন করতে পারত। তোমাদের ওপর যদি আল্লাহর অনুগ্রহ ও দয়া না থাকত তাহলে অল্প কয়েকজন ছাড়া তোমরা (সবাই) শয়তানের অনুসরণ করতে।



মুহিউদ্দিন খান: আর যখন তাদের কছে পৌঁছে কোন সংবাদ শান্তি-সংক্রান্ত কিংবা ভয়ের, তখন তারা সেগুলোকে রটিয়ে দেয়। আর যদি সেগুলো পৌঁছে দিত রসূল পর্যন্ত কিংবা তাদের শাসকদের পর্যন্ত, তখন অনুসন্ধান করে দেখা যেত সেসব বিষয়, যা তাতে রয়েছে অনুসন্ধান করার মত। বস্তুতঃ আল্লাহর অনুগ্রহ ও করুণা যদি তোমাদের উপর বিদ্যমান না থাকত তবে তোমাদের অল্প কতিপয় লোক ব্যতীত সবাই শয়তানের অনুসরণ করতে শুরু করত!



জহুরুল হক: অতএব যুদ্ধ করো আল্লাহ্‌র পথে, তোমার উপরে তোমার নিজের ছাড়া চাপানো হয় নি, আর বিশ্বাসীদের উদ্বুদ্ধ করো। হতে পারে যারা অবিশ্বাস পোষণ করে তাদের হিংস্রতা আল্লাহ্ বন্ধ করবেন। আর আল্লাহ্ বিক্রমে কঠোরতর, আর লক্ষণীয় শাস্তিদানে আরো কঠোর।



Sahih International: And when there comes to them information about [public] security or fear, they spread it around. But if they had referred it back to the Messenger or to those of authority among them, then the ones who [can] draw correct conclusions from it would have known about it. And if not for the favor of Allah upon you and His mercy, you would have followed Satan, except for a few.



তাফসীরে যাকারিয়া

অনুবাদ: ৮৩. যখন শান্তি বা শংকার কোন সংবাদ তাদের কাছে আসে তখন তারা তা প্রচার করে থাকে।(১) যদি তারা তা রাসুল(২) এবং তাদের মধ্যে যারা নির্দেশ প্রদানের অধিকারী তাদেরকে জানাত, তবে তাদের মধ্যে যারা তথ্য অনুসন্ধান করে তারা সেটার যথার্থতা নির্ণয় করতে পারত(৩)। তোমাদের প্রতি যদি আল্লাহ্–র অনুগ্রহ ও রহমত না থাকত তবে তোমাদের অল্প সংখ্যক ছাড়া সকলে শয়তানের অনুসরণ করত।


তাফসীর:

(১) এ আয়াত দ্বারা প্রতীয়মান হচ্ছে যে, কোন শ্রুত কথা যাচাই, অনুসন্ধান ব্যতিরেকে বর্ণনা করা উচিত নয়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এক হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, কোন লোকের পক্ষে মিথ্যাবাদী হওয়ার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে, সে কোন রকম যাচাই না করেই সমস্ত শ্রুত কথা প্রচার করে। [মুসলিম: ৫] অপর এক হাদীসে তিনি বলেছেনঃ “যে লোক এমন কোন কথা বর্ণনা করে, যার ব্যাপারে সে জানে যে, সেটি মিথ্যা, তাহলে সে দু'জন মিথ্যাবাদীর একজন মিথ্যাবাদী।” [তিরমিযী: ২৬৬২ ইবন মাজাহ ৩৮; মুসনাদে আহমাদ ৪/২৫৫]


(২) আয়াতের দ্বারা প্রতীয়মান হয় যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও দলীলপ্রমাণের মাধ্যমে হুকুম-আহকাম উদ্ভাবনের দায়িত্বপ্রাপ্ত। তার কারণ, আয়াতে দু'রকম লোকের নিকট প্রত্যাবর্তন করতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। তাদের একজন হলেন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং অপরজন হচ্ছেন, ‘উলুল আমর’। অতঃপর বলা হয়েছে, তাদের মধ্যে যারা ক্ষমতার অধিকারী তাদেরকে জানাত, তবে তাদের মধ্যে যারা তথ্য অনুসন্ধান করে তারা সেটার যথার্থতা নির্ণয় করতে পারত’। আর এই নির্দেশটি অত্যন্ত ব্যাপক। রাসূল ও আলেম সমাজ এর আওতাভুক্ত।


(৩) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কুরআন তার একাংশ অপরাংশ দ্বারা মিথ্যা প্রতিপন্ন করার জন্য নাযিল হয়নি, বরং এর একাংশ অপরাংশের সত্যতা নিরূপন করে। সুতরাং তোমরা এর মধ্যে যা বুঝতে পার তার উপর আমল কর আর যা বুঝতে পারবে না সেটা যারা বুঝে তাদের হাতে ছেড়ে দাও। [ইবন মাজাহঃ ৮৫, মুসনাদে আহমাদ ২/১৮১]


তাফসীরে আহসানুল বায়ান

অনুবাদ: (৮৩) আর যখন শান্তি অথবা ভয়ের কোন সংবাদ তাদের নিকট আসে, তখন তারা তা রটিয়ে বেড়ায়। কিন্তু যদি তারা তা রসূল কিংবা তাদের মধ্যে দায়িত্বশীলদের গোচরে আনত, তাহলে তাদের মধ্যে তত্ত্বানুসন্ধানীগণ তার যথার্থতা উপলব্ধি করতে পারত। [1] আর তোমাদের প্রতি যদি আল্লাহর অনুগ্রহ ও দয়া না থাকত, তাহলে তোমাদের কিছু লোক ছাড়া সকলে শয়তানের অনুসরণ করত।


তাফসীর:

[1] এটা হল কিছু দুর্বল ও দ্রুততাপ্রিয় মুসলিমের স্বভাব। তাদের সংশোধনের উদ্দেশ্যে আলোচ্য আয়াতের অবতারণা। الأمن শান্তির খবর বলতে মুসলিমদের সফলতা এবং শত্রু-ধ্বংসের ও পরাজয়ের খবরকে বুঝানো হয়েছে। (যা শুনে শান্তি ও স্বস্তির ঝড় বয়ে যায় এবং যার ফলে প্রয়োজনাতীত স্বনির্ভরশীলতার সৃষ্টি হয়; যা ক্ষতির কারণও হতে পারে) আর الخَوف ভয়ের সংবাদ বলতে মুসলিমদের পরাজয় এবং তাদের হত্যা ও ধ্বংসের খবরকে বুঝানো হয়েছে। (যাতে মুসলিমদের মাঝে দুঃখ, বেদনা ও আফসোস ছড়িয়ে পড়ে এবং তাদের মনোবল দমে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে।) তাই তাদেরকে বলা হচ্ছে যে, এই ধরনের খবর শুনে; তাতে তা শান্তির (জয়ের) হোক অথবা ভয়ের (পরাজয়ের) হোক তা সাধারণের মাঝে প্রচার না করে রসূল (সাঃ)-এর নিকট পৌঁছে দাও কিংবা জ্ঞানী ও তত্ত্বানুসন্ধানীদের কাছে পৌঁছে দাও; যাতে তাঁরা দেখেন যে খবর সঠিক, না বেঠিক? যদি সঠিক হয়, তাহলে তখন এ খবর মুসলিমদের জানা লাভদায়ক, নাকি না জানা আরো বেশী লাভদায়ক? এই নীতি সাধারণ অবস্থাতেও বড় গুরুত্বপূর্ণ এবং অতীব লাভদায়ক, বিশেষ করে যুদ্ধের সময় এর গুরুত্ব ও উপকারিতা আরো বেশী। اسْتِنْبَاطٌ শব্দটি نَبَطٌ ধাতু থেকে গঠিত। আর نَبَطٌ (নাবাত্ব) সেই পানিকে বলে, যে পানি কুয়ো খোঁড়ার সময় সর্বপ্রথম বের হয়। এই কারণেই তত্ত্বানুসন্ধান করা ও বিষয়ের গভীরে পৌঁছনোকে اسْتِنْبَاطٌ বলা হয়। (ফাতহুল ক্বাদীর)


তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ


তাফসীর: ৮২-৮৩ নং আয়াতের তাফসীর:



অত্র আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা কুরআনের একটি মুজিযাহ ও কুরআন দ্বারা একটি চ্যালেঞ্জ করেছেন। তা হল কুরআনে কোন পরস্পর বৈপরিত্য ও মতভেদ নেই। বরং পরস্পর পরস্পরকে সত্যায়ণ করে।



এ জন্য কুরআন নিয়ে চিন্তা-গবেষণা করার কথা বলছেন। কুরআন নিয়ে চিন্তা-গবেষণা করলে অজ্ঞতা দূর হয়ে জ্ঞানের গভীরতা বৃদ্ধি পাবে, কুরআনের মুজিযা দিবালোকের ন্যায় প্রকাশ পাবে, আল্লাহ তা‘আলার মহত্ব সম্পর্কে জানা যাবে। ফলে হিদায়াতের পথ সুগম হয়ে যাবে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(كِتٰبٌ أَنْزَلْنٰهُ إِلَيْكَ مُبَارَكٌ لِّيَدَّبَّرُوْآ اٰيٰتِه۪ وَلِيَتَذَكَّرَ أُولُوا الْأَلْبَابِ)



“(এ কুরআন) একটি বরকতময় কিতাব, আমি তা তোমার‎ প্রতি নাযিল করেছি যেন মানুষ এর আয়াতসমূহ অনুধাবন করে এবং জ্ঞানবান লোকেরা উপদেশ গ্রহণ করে।”(সূরা সোয়াদ ৩৮:২৯)



অন্যত্র আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(أَفَلَا يَتَدَبَّرُوْنَ الْقُرْاٰنَ أَمْ عَلٰي قُلُوْبٍ أَقْفَالُهَا)



“তবে কি তারা কুরআন সম্বন্ধে চিন্তা-ভাবনা করে না? নাকি তাদের অন্তরে তালা লেগে গেছে?” (সূরা মুহাম্মাদ ৪৭:২৪)



আমর বিন শুয়াইব (রাঃ)‎ তাঁর পিতা হতে এবং তাঁর পিতা তাঁর দাদা হতে বর্ণনা করেন যে, আমি এবং আমার ভাই এমন এক সমাবেশে বসেছিলাম যা আমার নিকট এত প্রিয় ছিল যে, আমি একটি লাল বর্ণের উট পেলেও এ মজলিসের তুলনায় নগণ্য মনে করতাম। আমরা এসে দেখি যে, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর দরজার ওপর কয়েকজন মর্যাদাবান সাহাবী দাঁড়িয়ে আছেন। আমরা তাদের মাঝে বসতে অপছন্দ করলাম না, বিধায় এক কোণায় বসে পড়লাম। এমন সময় সেখানে কুরআনের একটি আয়াত নিয়ে আলোচনা করা হচ্ছিল এবং তাঁদের মধ্যে কিছু মতানৈক্য দেখা দিয়েছিল এমনকি উঁচু আওয়াজে কথা বলতে লাগল। তখন রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) রাগান্বিত অবস্থায় বের হলেন, তাদের ওপর মাটি নিক্ষেপ করত: বললেন: তোমরা নীরব হও। তোমাদের পূর্ববর্তী উম্মাতগণ নাবীদের ব্যাপারে মতানৈক্য ও আল্লাহ তা‘আলার কিতাবের এক অংশকে অন্য অংশের সাথে বৈপরিত্য করার কারণে ধ্বংস হয়েছে।



জেনে রেখ! কুরআনের এক অংশ অপর অংশকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করে না বরং সত্যায়িত করে। যা তোমরা কুরআনে জানবে তার প্রতি আমল করবে আর যা জানবে না তা আলেমদের কাছে ফিরিয়ে দিও। (আহমাদ হা: ১৮১, সহীহ)



পরের আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা তাদের নিন্দা করেছেন যারা কোন সংবাদ সত্য মিথ্যা যাচাই-বাছাই না করে সমাজে ছড়িয়ে দেয়। ফলে সামজে বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়।



الأَمْنُ: শান্তির খবর বলতে মুসলিমদের সফলতা এবং শত্র“দের ধ্বংস ও পরাজয়ের খবরকে বুঝানো হয়েছে। আর الْخَوْفُ ভয়ের সংবাদ বলতে মুসলিমদের পরাজয়ের কথা বলা হচ্ছে। যাতে মুসলিমদের দুঃখ-বেদনা, আফসোস ছড়িয়ে পড়ে এবং মনোবল নষ্ট হয়ে যায়।



তাই তাদেরকে বলা হচ্ছে, যে কোন খবর, চাই ভাল হোক বা মন্দ হোক যাচাই-বাছাই না করে মুসলিমদের ভেতরে ছড়ানো যাবে না। বরং রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বা যারা জ্ঞানী তাদের নিকট ফিরিয়ে দিতে হবে। আর এটাই হবে কল্যাণকর।



রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:



كَفَي بِالْمَرْءِ كَذِباً أَنْ يُحَدِّثَ بِكُلِّ مَا سَمِعَ



একজন ব্যক্তির মিথ্যুক হবার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে, সে যা শুনবে তাই বলে বেড়াবে। (সহীহ মুসলিম হা: ৫, ভূমিকা, আবূ দাঊদ হা: ৪৯৯২, সহীহ)



আয়াত থেকে শিক্ষণীয় বিষয়:



১. কুরআন নিয়ে গবেষণা করা উচিত।

২. আল্লাহ তা‘আলার কালাম কুরআন সর্বপ্রকার ত্র“টি, অসম্পূর্ণতা ও বৈপরিত্য থেকে মুক্ত।

৩. কোন সংবাদ যাচাই-বাছাই না করে গ্রহণ করা ও সমাজে ছড়ানো সম্পূর্ণ অসঙ্গতিপূর্ণ এবং নিষেধ।


তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)


তাফসীর: ৮২-৮৩ নং আয়াতের তাফসীর:

আল্লাহ তা'আলা স্বীয় বান্দাদেরকে নির্দেশ দিচ্ছেন যে,তারা যেন কুরআন কারীমকে চিন্তা ও গবেষণা সহকারে পাঠ করে। ওটা হতে যেন তারা বিমুখ না হয়, অবজ্ঞা না করে। ওর মজবুত রচনা, নৈপুণ্য পূর্ণ নির্দেশাবলী এবং বাকচাতুর্য সম্বন্ধে যেন চিন্তা করে। সাথে সাথে এ সংবাদও দিচ্ছেন যে, এ পবিত্র গ্রন্থটি মতভেদ ও মতানৈক্য হতে সম্পূর্ণ পবিত্র। কেননা, এটা মহা বিজ্ঞানময় ও চরম প্রশংসিত আল্লাহরই বাণী। তিনি নিজে সত্য এবং দ্রুপ তাঁর কালামও সম্পূর্ণ সত্য। যেমন অন্য আয়াতে ঘোষণা করেছেনঃ (আরবী) অর্থাৎ তারা কি কুরআন সম্বন্ধে চিন্তা ও গবেষণা করে না, না তাদের অন্তর তালাবদ্ধ রয়েছে? (৪৭:২৪)

এরপর আল্লাহ তাআলা বলেন-মুশরিক ও মুনাফিকদের ধারণা হিসেবে এ কুরআন যদি আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হতে নাযিলকৃত না হতো এবং কারও মনগড়া কথা হতো তবে অবশ্যই মানুষ ওর মধ্যে বহু মতভেদ লক্ষ্য করতো। অর্থাৎ মানুষের কথা বৈপরীত্যশূন্য হওয়া অসম্ভব। এটা অবশ্যই হতো যে, এখানে কিছু পেতো ওখানে কিছু পেতো, হয়তো এক জায়গায় ওরই বিপরীত কথা বলা হয়েছে। সুতরাং এ পবিত্র গ্রন্থের এসব ত্রুটি হতে মুক্ত হওয়া এরই পরিষ্কার দলীল যে, এটা আল্লাহ্ পাকেরই বাণী। যেমন আল্লাহ্ তা'আলা জ্ঞানে পরিপক্ক আলেমদের কথা বর্ণনা করেছেন যে, তারা বলে, আমরা এগুলোর উপর ঈমান এনেছি, এগুলো সবই আমাদের প্রভুর পক্ষ হতে আগত। অর্থাৎ স্পষ্ট আয়তি ও অস্পষ্ট আয়াত সবই সত্য। এ জন্যই তারা অস্পষ্ট আয়াতগুলোকে স্পষ্ট আয়াতগুলোর দিকে ফিরিয়ে থাকে এবং এর ফলে তারা সুপথ প্রাপ্ত হয়। পক্ষান্তরে যাদের অন্তরে বক্রতা রয়েছে তারা স্পষ্ট আয়াতগুলো অস্পষ্ট আয়াতগুলোর দিকে ফিরিয়ে থাকে এবং এর ফলে তারা পথভ্রষ্ট হয়ে যায়। এ কারণেই আল্লাহ তাআলা প্রথম প্রকারের লোকদের প্রশংসা করেছেন এবং দ্বিতীয় প্রকারের লোকদের নিন্দে করেছেন।

মুসনাদ-ই-আহমাদে রয়েছে, হযরত আমর ইবনে শুয়াইব (রাঃ) তাঁর পিতা হতে এবং তিনি তাঁর দাদা হতে বর্ণনা করেছেন, তার দাদা বলেনঃ আমি এবং আমার ভাই এমন এক সমাবেশে বসেছিলাম যা আমার নিকট এত প্রিয় ছিল যে, আমি একটি লাল বর্ণের উট পেলেও এমজলিসের তুলনায় ওটাকে নগণ্য মনে করতাম। আমরা এসে দেখি যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর দরজার উপর কয়েকজন মর্যাদাবান সাহাবী (রাঃ) দাড়িয়ে রয়েছেন। আমরা ভদ্রতা রক্ষা করে এক দিকে বসে পড়ি। তথায় কুরআন মাজীদের কোন আয়াত নিয়ে আলোচনা চলছিল এবং তাদের মধ্যে কিছু মতানৈক্য দেখা দিয়েছিল। অবশেষে কথা বেড়ে যায় এবং তারা পরস্পর উচ্চৈঃস্বরে কথা বলতে থাকেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) এটা শুনতে পেয়ে কুপিত অবস্থায় বাইরে আগমন করেন এবং তার চেহারা মুবারক রক্ত বর্ণ ধারণ করেছিল। তাদের উপর মাটি নিক্ষেপ করতঃ বলেনঃ “তোমরা নীরবতা অবলম্বন কর। তোমাদের পূর্ববর্তী উম্মতগণ এ কারণেই ধ্বংস হয়েছে যে, তারা তাদের নবীদের উপর মতানৈক্য আনয়ন করেছিল এবং আল্লাহর কিতাবের একটি আয়াতকে অপর আয়াতের বিপরীত বলেছিল। জেনে রেখো যে, কুরআন মাজীদের কোন আয়াত অপর আয়াতের সত্যতা প্রতিপাদন করে। তোমরা যেটা জান তার উপর আমল কর এবং যেটা জাননা সেটা যারা জানে তাদের উপর ছেড়ে দাও।'

অন্য বর্ণনায় রয়েছে যে, সাহাবা-ই-কিরাম তাকদীর সম্বন্ধে আলোচনা করেছিলেন। বর্ণনাকারী বলেনঃ যদি আমি এ সমাবেশে না বসতাম!' হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমার (রাঃ) বলেনঃ আমি দুপুরে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর দরবারের উপস্থিত হই। আমি বসে রয়েছি এমন সময় দু'টি লোকের মধ্যে একটি আয়াতের ব্যাপারে মতভেদ সৃষ্টি হয় এবং কণ্ঠস্বর উচ্চ হতে থাকে। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “তোমাদের পূর্ববর্তী উম্মতগণের ধ্বংসের একমাত্র কারণই ছিল আল্লাহ তা'আলার কিতাবে তাদের মতভেদ সৃষ্টি করা। (মুসনাদ-ই-আহমাদ)

এরপর ঐ তাড়াহুড়োকারীদেরকে বাধা দেয়া হচ্ছে যারা কোন নিরাপত্তা বা ভয়ের সংবাদ পাওয়া মাত্রই সত্যাসত্য যাচাই না করেই এদিক হতে ওদিক পৃর্যন্ত পৌঁছিয়ে থাকে। অথচ ওটা সম্পূর্ণ ভুল সংবাদ হওয়ারও সম্ভাবনা রয়েছে। সহীহ মুসলিম শরীফের ভূমিকায় হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ মানুষকে মিথ্যাবাদী বলার জন্যে এটাই যথেষ্ট যে, সে যা শুনে তাই বর্ণনা করে।' সুনান-ই-আবু দাউদের মধ্যেও এ বর্ণনাটি রয়েছে।

সহীহ বুখারী ও মুসলিমে হযরত মুগীরা ইবনে শু’বা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) (আরবী) হতে নিষেধ করেছেন এবং বলেছেনঃ অর্থাৎ ‘লোকেরা যেসব কথা বলে থাকে এরূপ বহু কথা সত্যাসত্য যাচাই ও চিন্তা ভাবনা না করেই যে ব্যক্তি বর্ণনা করে থাকে।

সুনান-ই-আবি দাউদে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি কোন কথা বর্ণনা করে এবং সে ধারণা করে যে, ওটা যথার্থ নয় সেও মিথ্যাবাদীদের মধ্যে একজন মিথ্যাবাদী।' এখানে আমরা হযরত উমার (রাঃ)-এর হাদীসটি বর্ণনা করছি যার বিশুদ্ধতার উপর মতৈক্য রয়েছে। যখন তিনি শুনেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) স্বীয় সহধর্মিণীগণকে তালাক দিয়েছেন। তখন তিনি স্বীয় বাড়ী হতে বের হয়ে এসে মসজিদে প্রবেশ করেন। এখানেও তিনি জনগণকে একথাই বলতে শুনেন। সুতরাং স্বয়ং তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট উপস্থিত হন এবং তাকে জিজ্ঞেস করেনঃ আপনি কি আপনার সহধর্মিণীগণকে তালাক দিয়েছেন?' তিনি বলেনঃ না।' তখন তিনি-‘আল্লাহু আকবার পাঠ করেন। হাদীসটি দীর্ঘতার সাথে বর্ণনা করা হয়েছে।

সহীহ মুসলিম শরীফে রয়েছে যে, অতঃপর তিনি মসজিদের দরজায় দাঁড়িয়ে উচ্চৈঃস্বরে ঘোষণা করেন্নঃ ‘হে জনমণ্ডলী! রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁর পত্নীগণকে তালাক দেননি।'সে সময় এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। হযরত উমার (রাঃ) এ ব্যাপারে তত্ত্ব অনুসন্ধান করেছেন। সুতরাং তিনি তত্বানুসন্ধিৎসুগণের মধ্যে একজন। কোন জিনিসকে ওর ঠিকানা ও আগার হতে বের করাকে (আরবী) বলা হয়। যখন তোক খনি খনন করে ওর মধ্যে হতে কোন জিনিস বের করে তখন আরববাসীরা (আরবী) এ কথা বলে থাকেন। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেন-“যদি তোমাদের উপর আল্লাহর অনুগ্রহ ও করুণা না হতো তবে অল্প সংখ্যক ব্যতীত অর্থাৎ পূর্ণ মুমিন ব্যতীত তোমরা শয়তানের অনুসারী হয়ে যেতে।' এরূপ স্থলে এ অর্থও হয় যে, তোমরা সবাই শয়তানের অনুসারী হয়ে যেতে। আরবী কবিতাতেও এ অর্থের ব্যবহার দেখা যায়।





সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।