সূরা আন-নিসা (আয়াত: 71)
হরকত ছাড়া:
يا أيها الذين آمنوا خذوا حذركم فانفروا ثبات أو انفروا جميعا ﴿٧١﴾
হরকত সহ:
یٰۤاَیُّهَا الَّذِیْنَ اٰمَنُوْا خُذُوْا حِذْرَکُمْ فَانْفِرُوْا ثُبَاتٍ اَوِ انْفِرُوْا جَمِیْعًا ﴿۷۱﴾
উচ্চারণ: ইয়াআইয়ুহাল্লাযীনা আ-মানূখুযূহিযরাকুম ফানফিরূ ছু বা-তিন আবিনফিরূ জামী‘আ-।
আল বায়ান: হে মুমিনগণ, তোমরা তোমাদের সতর্কতা অবলম্বন কর। অতঃপর ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দল হয়ে বেরিয়ে পড় অথবা একসাথে বের হও।
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৭১. হে মুমিনগণ! তোমরা তোমাদের সতর্কতা অবলম্বন কর; তারপর হয় দলে দলে বিভক্ত হয়ে অগ্রসর হও অথবা একসঙ্গে অগ্রসর হও।(১)
তাইসীরুল ক্বুরআন: হে ঈমানদারগণ! তোমরা সতর্কতা অবলম্বন কর এবং দলে দলে ভাগ হয়ে কিংবা মিলিতভাবে অগ্রসর হও।
আহসানুল বায়ান: (৭১) হে বিশ্বাসিগণ! তোমরা সতর্কতা অবলম্বন কর,[1] অতঃপর হয় দলেদলে বিভক্ত হয়ে অগ্রসর হও অথবা এক সঙ্গে সম্মিলিতভাবে অগ্রসর হও।
মুজিবুর রহমান: হে মু’মিনগণ! তোমরা স্বীয় আত্মরক্ষার সরঞ্জাম তুলে নাও, অতঃপর পৃথকভাবে বহির্গত হও অথবা সম্মিলিতভাবে অভিযান কর।
ফযলুর রহমান: হে ঈমানদারগণ! তোমরা আত্মরক্ষামূলক ব্যবস্থা নাও এবং দলে দলে ভাগ হয়ে অথবা সবাই একত্রে (অভিযানে) বেরিয়ে পড়।
মুহিউদ্দিন খান: হে ঈমানদারগণ! নিজেদের অস্ত্র তুলে নাও এবং পৃথক পৃথক সৈন্যদলে কিংবা সমবেতভাবে বেরিয়ে পড়।
জহুরুল হক: আর নিঃসন্দেহ তোমাদের মধ্যে এমন লোক আছে যে পেছনে পড়ে থাকে, তারপর তোমাদের উপরে যদি কোনো দু র্ঘটনা ঘটে যায় সে বলে -- "আল্লাহ্ নিশ্চয়ই আমার উপরে অনুগ্রহ করেছেন যে আমি তাদের সঙ্গে চাক্ষুষকারী ছিলুম না।"
Sahih International: O you who have believed, take your precaution and [either] go forth in companies or go forth all together.
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ৭১. হে মুমিনগণ! তোমরা তোমাদের সতর্কতা অবলম্বন কর; তারপর হয় দলে দলে বিভক্ত হয়ে অগ্রসর হও অথবা একসঙ্গে অগ্রসর হও।(১)
তাফসীর:
(১) আয়াতের প্রথমাংশে জিহাদের জন্য অস্ত্র সংগ্রহ এবং আয়াতের দ্বিতীয় অংশে জিহাদে অংশ গ্রহণের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এতে বেশকিছু শিক্ষা রয়েছে - (১) কোন ব্যাপারে বাহ্যিক উপকরণ অবলম্বন করা তাওয়াক্কুল বা আল্লাহর উপর নির্ভরশীলতার পরিপন্থী নয়। (২) অস্ত্র সংগ্রহের নির্দেশ দেয়া হলেও এমন প্রতিশ্রুতি কিন্তু দেয়া হয়নি যে, এ অস্ত্রের কারণে তোমরা নিশ্চিতভাবেই নিরাপদ হতে পারবে। এতে ইঙ্গিত করা হয়েছে যে, বাহ্যিক উপকরণ অবলম্বন করাটা মূলতঃ মানসিক স্বস্তি লাভের জন্যই হয়ে থাকে। (৩) এ আয়াতে প্রথমে জিহাদের প্রস্তুতি গ্রহণের নির্দেশ অতঃপর জিহাদের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হওয়ার সুশৃংখল নিয়ম বাতলে দেয়া হয়েছে। বলা হয়েছে, তোমরা যখন জিহাদের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হবে, তখন একা একা বাহির হবেনা, বরং ছোট ছোট দলে বাহির হবে কিংবা (সম্মিলিত) বড় সৈন্যদল নিয়ে বাহির হবে। তার কারণ, একা একা যুদ্ধ করতে গেলে ক্ষতির আশংকা রয়েছে। শক্ররা এমন সুযোগের সদ্ব্যবহার করতে মোটেই শৈথিল্য করে না।
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (৭১) হে বিশ্বাসিগণ! তোমরা সতর্কতা অবলম্বন কর,[1] অতঃপর হয় দলেদলে বিভক্ত হয়ে অগ্রসর হও অথবা এক সঙ্গে সম্মিলিতভাবে অগ্রসর হও।
তাফসীর:
[1] حِذْرَكُمْ অর্থাৎ, অস্ত্র-শস্ত্র, যুদ্ধ-সামগ্রী এবং অন্য উপকরণাদি দ্বারা আত্মরক্ষার ব্যবস্থা গ্রহণ কর।
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ৭১-৭৪ নং আয়াতের তাফসীর:
আল্লাহ তা‘আলা মু’মিনদেরকে কাফির-মুশরিক শত্র“দের ব্যাপারে সর্বোচ্চ সর্তক থাকতে নির্দেশ প্রদান করতঃ এক দলের পর আরেক দল বা একত্রে সকলকে শত্র“দের বিরুদ্ধে বের হবার আদেশ দিচ্ছেন। এ নির্দেশ শত্র“দের বিরুদ্ধে সার্বিক প্রস্তুতি গ্রহণ করা শামিল করে। তাদের বিরুদ্ধে জিহাদ করার জন্য অস্ত্র সংগ্রহ ও প্রশিক্ষণ গ্রহণ, তাদের চক্রান্ত প্রতিহত করতে কৌশল গ্রহণ ও অর্জন সর্বোপরি তাদের বিরুদ্ধে জিহাদে অংশ গ্রহণ করা। এজন্য আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন:
فَانْفِرُوْا ثُبَاتٍ
অর্থাৎ বিচ্ছিন্নভাবে যে এক দল তাদের বিরুদ্ধে জিহাদ করবে আরেক দল অবস্থান করবে, অথবা প্রয়োজনে সকলেই বের হয়ে যাবে।
তারপর মুনাফিকদের কথা উল্লেখ করেছেন। তারা যখন মু’মিনদের ওপর কোন বিপদ-আপদ দেখে যে, মু’মিনরা যুদ্ধের ময়দানে শহীদ হয়েছে বা আহত হয়েছে তখন তারা বলে, আল্লাহ তা‘আলার অনুগ্রহ যে আমরা সেখানে যাইনি। এদের ব্যাপারে আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(إِنْ تُصِبْكَ حَسَنَةٌ تَسُؤْهُمْ وَإِنْ تُصِبْكَ مُصِيْبَةٌ يَّقُوْلُوْا قَدْ أَخَذْنَآ أَمْرَنَا مِنْ قَبْلُ وَيَتَوَلَّوْا وَّهُمْ فَرِحُوْنَ)
“তোমার মঙ্গল হলে তা তাদেরকে পীড়া দেয় এবং তোমার বিপদ ঘটলে তারা বলে, ‘আমরা তো পূর্বেই আমাদের ব্যাপারে সতর্কতা অবলম্বন করেছিলাম’এবং তারা উৎফুল্লচিত্তে সরে পড়ে।”(সূরা তাওবাহ ৯:৫০)
পক্ষান্তরে যদি মু’মিনরা কোন বিজয় লাভ করে বা গনীমত পায় তাহলে আফসোস করে বলে হায় যদি সেখানে থাকতাম তাহলে সফলকাম হতাম। মু’মিনদের সফলতা দেখে তারা ব্যথিত হয়।
আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(إِنْ تَمْسَسْكُمْ حَسَنَةٌ تَسُؤْهُمْ)
“যদি কোন কল্যাণ তোমাদের কাছে আসে তবে তাদের খারাপ লাগে।”(সূরা আলি-ইমরান ৩:১২০)
অতঃপর আল্লাহ তা‘আলা মু’মিনদেরকে তাঁর পথে যুদ্ধ করার প্রতি উৎসাহ প্রদান করছেন। কারণ যারা আল্লাহ তা‘আলার রাস্তায় যুদ্ধ করবে তারা শহীদ হোক বা বিজয় লাভ করুক উভয় অবস্থায় মহা প্রতিদান পাবে।
আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(قُلْ هَلْ تَرَبَّصُوْنَ بِنَآ إِلَّآ إِحْدَي الْحُسْنَيَيْنِ)
“বল: ‘তোমরা আমাদের দু’টি মঙ্গলের একটির প্রতীক্ষা করছ।”(সূরা তাওবাহ ৯:৫২)
রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন: যে ব্যক্তি একমাত্র আল্লাহ তা‘আলার পথে জিহাদ করার জন্য বের হয়, আল্লাহ তা‘আলার ওপর বিশ্বাস করে এবং রাসূলকে সত্য বলে জানে সে ব্যক্তির দায়িত্ব আল্লাহ তা‘আলা নিয়েছেন। হয় তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন অথবা তাকে গনীমত বা প্রতিদানসহ সেই বাড়িতে ফিরিয়ে নিয়ে আসবেন যে বাড়ি থেকে বের হয়ে আসছিল। (সহীহ বুখারী হা: ৩১২৩, সহীহ মুসলিম হা: ১৯৭৬)
তাই মু’মিনদের উচিত সদা শত্র“দের ব্যাপারে সর্তক থাকা, আর প্রয়োজনানুপাতে তাদের বিরুদ্ধে আল্লাহ তা‘আলার পথে যুদ্ধ করা।
আয়াত থেকে শিক্ষণীয় বিষয়:
১. মু’মিনদের সর্বদা শত্র“দের বিরুদ্ধে সতর্ক থাকা আবশ্যক।
২. মু’মিনদের আল্লাহ তা‘আলার পথে যুদ্ধ করার জন্য প্রশিক্ষণ গ্রহণ করা উচিত।
৩. মুনাফিকরা সর্বদা মু’মিনদের অমঙ্গল কামনা করে।
৪. সর্বোত্তম মৃত্যু শহীদি মৃত্যু। আল্লাহ তা‘আলার রাস্তায় যুদ্ধ করলে উভয় অবস্থায় মহাসাফল্য।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: ৭১-৭৪ নং আয়াতের তাফসীর:
আল্লাহ তা'আলা মুসলমানদেরকে নির্দেশ দিচ্ছেন যে, তারা যেন সর্বদা আত্মরক্ষার ব্যবস্থা গ্রহণ করে। সদা যেন অস্ত্র-শস্ত্রে সজ্জিত থাকে যাতে শত্রুরা অতি সহজে তাদের উপর জয়যুক্ত না হয়। তারা সব সময় যেন প্রয়োজনীয় অস্ত্র প্রস্তুত রাখে, নিজেদের সংখ্যা বৃদ্ধি করতে থাকে এবং শক্তি দৃঢ় করে। নির্দেশ মাত্রই যেন তারা বীর বেশে যুদ্ধের জন্য বেরিয়ে যায়। ছোট ছোট সৈন্যদলে বিভক্ত হয়েই হোক বা সবাই সম্মিলিত হয়েই হোক সুযোগমত তারা যেন যুদ্ধের অহ্বান মাত্রই বেড়িয়ে পড়ে। (আরবী) হচ্ছে (আরবী) শব্দের বহু বচন। আবার কখনও (আরবী)-এর বহু বছন (আরবী) ও আসে।
হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর উক্তি অনুসারে (আরবী)-এর অর্থ হচ্ছে তোমরা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দল হয়ে বহির্গত হও। আর (আরবী)-এর অর্থ হচ্ছে ‘তোমরা সম্মিলিতভাবে বেড়িয়ে পড়।' মুজাহিদ (রঃ), ইকরামা (রঃ), সুদ্দী (রঃ), কাতাদাহ্ (রঃ), যহহাক (রঃ), আতা' আল খুরাসানী (রঃ), মুকাতিল ইবনে হিব্বান (রঃ) এবং খাসীফ আল জাযারীও (রঃ) এ কথাই বলেন।
মুজাহিদ (রঃ) এবং আরও কয়েকজন মনীষী বলেন যে, (আরবী)-এ আয়াতটি মুনাফিকদের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়। মুনাফিকদের স্বভাব এই যে, নিজেও তারা আল্লাহর পথে যুদ্ধ করা হতে বিরত থাকে এবং অপরকেও যুদ্ধে না যেতে উৎসাহিত করে। যেমন মুনাফিকদের নেতা আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই ইবনে সাকূলের কার্যকলাপ ছিল। আল্লাহ তা'আলা তাকে। অপমানিত করুন।
তাদের অবস্থা এই যে, আল্লাহ তাআলার কোন হিকমতের কারণে যদি মুসলমানরা তাদের শত্রুদের উপর বিজয় লাভে অসমর্থ হয় বরং শত্রুরাই তাদের উপর চেপে বসে এবং মুসলমানদের ক্ষতি হয় ও তাদের লোক শাহাদাত বরণ করে তখন ঐ মুনাফিকরা বাড়িতে বসে ফুলতে থাকে এবং স্বীয় বুদ্ধির উপর গৌরব বোধ করে। তারা তখন তাদের জিহাদে অংশগ্রহণ না করাকে আল্লাহ তা'আলার দান বলে গণ্য করে। কিন্তু ঐ নির্বোধেরা বুঝে না যে, ঐ মুজাহিদেরা জিহাদে অংশগ্রহণের ফলে যে পুণ্য লাভ করেছে তা হতে তারা সম্পূর্ণরূপে বঞ্চিত রয়েছে। যদি তারাও জিহাদে অংশ নিত তবে মুসলমানদের মত তারাও গাযী হওয়ার মর্যাদা এবং ধৈর্য ধারণের পুণ্য লাভ করতে অথবা শহীদ হওয়ার গৌরব লাভ করতো। পক্ষান্তরে যদি মুসলমান মুজাহিদগণ আল্লাহ তাআলার অনুগ্রহ প্রাপ্ত হয় অর্থাৎ শত্রুদের উপর জয়ী হয় এবং শত্রুরা সমূলে ধ্বংস হয়ে যায় আর এর ফলে মুসলমানেরা যুদ্ধলব্ধ মাল নিয়ে ও দাস-দাসী নিয়ে নিরাপদে প্রত্যাবর্তন করে, তবে ঐ মুনাফিকরা চরম দুঃখিত হয় এবং দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে এত হা-হুতাশ করে ও এমন এমন কথা মুখ দিয়ে বের করে যে, যেন মুসলমানদের সঙ্গে তাদের কোন সম্বন্ধই ছিল না। তাদের ধর্মই যেন অন্য। তারা তখন বলে, হায়! আমরাও যদি তাদের সঙ্গে থাকতাম তবে আমরাও গনীমতের মাল পেতাম এবং তাদের মত আমরাও দাস-দাসী ও ধন-সম্পদের অধিকারী হয়ে যেতাম।
মোটকথা, দুনিয়া লাভই তাদের চরম ও পরম উদ্দেশ্য। সুতরাং যারা ইহকালের বিনিময়ে পরকালকে বিক্রি করে তাদের বিরুদ্ধে মুসলমানদের জিহাদ ঘোষণা করা উচিত। তারা কুফরী ও অবিশ্বাসের কারণে দুনিয়ার সামান্য লাভের বিনিময়ে আখিরাতকে ধ্বংস করেছে। তাই মুনাফিকদের বলা হচ্ছে- হে মুনাফিকের দল! তোমরা জেনে রেখো যে, যারা আল্লাহ তাআলার পথের মুজাহিদ তারা কখনও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে না। তাদের উভয় হস্তে লাড়ু রয়েছে। নিহত হলেও তাদের জন্য মহান আল্লাহর নিকট রয়েছে বিরাট প্রতিদান এবং বিজয়ী বেশে ফিরে আসলেও রয়েছে গনীমতের মালের বিরাট অংশ।
সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে রয়েছেঃ “আল্লাহর পথের মুজাহিদের যামিন হচ্ছেন স্বয়ং আল্লাহ। হয় তিনি তাকে মৃত্যু দান করে জান্নাতে পৌছিয়ে দেবেন, আর না হয় যেখান হতে সে বের হয়েছে সেখানেই যুদ্ধলব্ধ মালসহ নিরাপদে ফিরিয়ে আনবেন।
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।