সূরা আন-নিসা (আয়াত: 35)
হরকত ছাড়া:
وإن خفتم شقاق بينهما فابعثوا حكما من أهله وحكما من أهلها إن يريدا إصلاحا يوفق الله بينهما إن الله كان عليما خبيرا ﴿٣٥﴾
হরকত সহ:
وَ اِنْ خِفْتُمْ شِقَاقَ بَیْنِهِمَا فَابْعَثُوْا حَکَمًا مِّنْ اَهْلِهٖ وَ حَکَمًا مِّنْ اَهْلِهَا ۚ اِنْ یُّرِیْدَاۤ اِصْلَاحًا یُّوَفِّقِ اللّٰهُ بَیْنَهُمَا ؕ اِنَّ اللّٰهَ کَانَ عَلِیْمًا خَبِیْرًا ﴿۳۵﴾
উচ্চারণ: ওয়া ইন খিফতুম শিকা-কা বাইনাহুমা-ফাব‘আছূহাকামাম মিন আহলিহী ওয়া হাকামাম মিন আহলিহা- ইয়ঁইউরীদা-ইসলা-হাইঁ ইউওয়াফফিকিল্লা-হু বাইনাহুম ইন্নাল্লা-হা কা-না ‘আলীমান খাবীরা।
আল বায়ান: আর যদি তোমরা তাদের উভয়ের মধ্যে বিচ্ছেদের আশঙ্কা কর তাহলে স্বামীর পরিবার থেকে একজন বিচারক এবং স্ত্রীর পরিবার থেকে একজন বিচারক পাঠাও। যদি তারা মীমাংসা চায় তাহলে আল্লাহ উভয়ের মধ্যে মিল করে দেবেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্বজ্ঞানী, সম্যক অবগত।
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৩৫. আর তাদের উভয়ের মধ্যে বিরোধ আশংকা করলে তোমরা স্বামীর পরিবার থেকে একজন এবং স্ত্রীর পরিবার থেকে একজন সালিশ নিযুক্ত কর; তারা উভয়ে নিস্পত্তি চাইলে আল্লাহ তাদের মধ্যে মীমাংসার অনুকূল অবস্থা সৃষ্টি করবেন। নিশ্চয় আল্লাহ সর্বজ্ঞ, সবিশেষ অবহিত।(১)
তাইসীরুল ক্বুরআন: যদি তোমরা তাদের মধ্যে অনৈক্যের আশংকা কর, তবে স্বামীর আত্মীয়-স্বজন হতে একজন এবং স্ত্রীর আত্মীয়-স্বজন হতে একজন সালিস নিযুক্ত কর। যদি উভয়ে মীমাংসা করিয়ে দেয়ার ইচ্ছে করে, তবে আল্লাহ উভয়ের মধ্যে নিষ্পত্তির ব্যবস্থা করবেন, নিশ্চয় আল্লাহ সব কিছু জানেন, সকল কিছুর খবর রাখেন।
আহসানুল বায়ান: (৩৫) আর যদি উভয়ের মধ্যে বিরোধ আশংকা কর, তাহলে তোমরা ওর (স্বামীর) পরিবার হতে একজন এবং এর (স্ত্রীর) পরিবার হতে একজন সালিস নিযুক্ত কর; [1] যদি তারা উভয়ে নিষ্পত্তির ইচ্ছা রাখে, তাহলে আল্লাহ তাদের মধ্যে মীমাংসার অনুকূল অবস্থা সৃষ্টি করে দেবেন। নিশ্চয় আল্লাহ সর্বজ্ঞ, সবিশেষ অবহিত।
মুজিবুর রহমান: আর যদি তোমরা উভয়ের মধ্যে বিচ্ছেদের আশংকা কর তাহলে তোমাদের বংশ হতে একজন বিচারক এবং তোমাদের স্ত্রীদের বংশ হতে একজন বিচারক নির্দিষ্ট কর; যদি তারা মীমাংসার আকাংখা করে তাহলে আল্লাহ তাদের মধ্যে সম্প্রীতি সঞ্চার করবেন; নিশ্চয়ই আল্লাহ মহাজ্ঞানী, অভিজ্ঞ।
ফযলুর রহমান: তোমরা যদি স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিরোধের আশঙ্কা করো তাহলে স্বামীর পরিবার থেকে একজন সালিস এবং স্ত্রীর পরিবার থেকে একজন সালিস নিযুক্ত কর। তারা যদি মীমাংসা চায় তাহলে আল্লাহ তাদের মধ্যে মিলসাধন করে দেবেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ মহাজ্ঞানী, সবকিছু অবগত।
মুহিউদ্দিন খান: যদি তাদের মধ্যে সম্পর্কচ্ছেদ হওয়ার মত পরিস্থিতিরই আশঙ্কা কর, তবে স্বামীর পরিবার থেকে একজন এবং স্ত্রীর পরিবার থেকে একজন সালিস নিযুক্ত করবে। তারা উভয়ের মীমাংসা চাইলে আল্লাহ সর্বজ্ঞ, সবকিছু অবহিত।
জহুরুল হক: আর যদি তোমরা দু’জনের মধ্যে বিচ্ছেদ আশঙ্কা করো, তবে তার লোকদের থেকে একজন মধ্যস্থ নিয়োগ করো এবং ওর লোকদের থেকেও একজন মধ্যস্থ, যদি তারা দু’জনই মিটমাট চায় তবে আল্লাহ্ তাদের মধ্যে মিলন ঘটাবেন। নিঃসন্দেহ আল্লাহ্ সর্বজ্ঞাতা, ওয়াকিফহাল।
Sahih International: And if you fear dissension between the two, send an arbitrator from his people and an arbitrator from her people. If they both desire reconciliation, Allah will cause it between them. Indeed, Allah is ever Knowing and Acquainted [with all things].
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ৩৫. আর তাদের উভয়ের মধ্যে বিরোধ আশংকা করলে তোমরা স্বামীর পরিবার থেকে একজন এবং স্ত্রীর পরিবার থেকে একজন সালিশ নিযুক্ত কর; তারা উভয়ে নিস্পত্তি চাইলে আল্লাহ তাদের মধ্যে মীমাংসার অনুকূল অবস্থা সৃষ্টি করবেন। নিশ্চয় আল্লাহ সর্বজ্ঞ, সবিশেষ অবহিত।(১)
তাফসীর:
(১) উল্লেখিত ব্যবস্থাটি ছিল এ কারণে, যাতে ঘরের ব্যাপার ঘরেই মীমাংসা হয়ে যেতে পারে। কিন্তু অনেক সময় মনোমালিন্য বা বিবাদ দীর্ঘায়িতও হয়ে যায়। তা স্ত্রীর স্বভাবের তিক্ততা ও অবাধ্যতা কিংবা পুরুষের পক্ষ থেকে অহেতুক কড়াকড়ি প্রভৃতি যে কোন কারণেই হোক এমতাবস্থায় ঘরের বিষয় আর ঘরে সীমিত থাকে না; বাইরে নিয়ে যাওয়া অপরিহার্য হয়ে পড়ে। আল্লাহ তা'আলা এ ধরনের বিবাদ-বিসংবাদের দরজা বন্ধ করার উদ্দেশ্যে সমসাময়িক শাসকবর্গ, উভয় পক্ষের সমর্থক ও পক্ষাবলম্বীদের এবং মুসলিম সংস্থাকে সম্বোধন করে এমন এক পবিত্র পন্থা বাতলে দিয়েছেন, তা হল এই যে, সরকার, উভয় পক্ষের মুরুব্বী-অভিভাবক অথবা মুসলিমদের কোন শক্তিশালী সংস্থা তাদের (অর্থাৎ স্বামী-স্ত্রীর) মধ্যে আপোষ করিয়ে দেয়ার জন্য দু’জন সালিস নির্ধারণ করে দেবেন। একজন স্বামীর পরিবার থেকে এবং একজন স্ত্রীর পরিবার থেকে। এতদুভয় ক্ষেত্রে সালিস অর্থে حكم (হাকাম) শব্দ প্রয়োগ করে কুরআন নির্বাচিত সালিসদ্বয়ের প্রয়োজনীয় গুণ-বৈশিষ্টের বিষয়টিও নির্ধারণ করে দিয়েছে। তা হচ্ছে এই যে, এতদুভয়ের মধ্যেই বিবাদ মীমাংসা করার গুণ থাকতে হবে। বলাবাহুল্য, এ গুণটি সে ব্যক্তির মধ্যেই থাকতে পারে, যিনি বিজ্ঞও হবেন এবং তৎসঙ্গে বিশ্বস্ত ও দ্বীনদারও হবেন।
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (৩৫) আর যদি উভয়ের মধ্যে বিরোধ আশংকা কর, তাহলে তোমরা ওর (স্বামীর) পরিবার হতে একজন এবং এর (স্ত্রীর) পরিবার হতে একজন সালিস নিযুক্ত কর; [1] যদি তারা উভয়ে নিষ্পত্তির ইচ্ছা রাখে, তাহলে আল্লাহ তাদের মধ্যে মীমাংসার অনুকূল অবস্থা সৃষ্টি করে দেবেন। নিশ্চয় আল্লাহ সর্বজ্ঞ, সবিশেষ অবহিত।
তাফসীর:
[1] উল্লিখিত তিনটি ব্যবস্থা গ্রহণ করার পরও যদি কোন ফল না হয়, তাহলে এটা হল চতুর্থ ব্যবস্থা। এ ব্যাপারে বলা হল যে, দু’জন বিচারক নিষ্ঠাবান ও আন্তরিকতাপূর্ণ হলে, তাদের সংশোধনের প্রচেষ্টা অবশ্যই ফলপ্রসূ হবে। আর যদি তাদের প্রচেষ্টা ফলপ্রসূ না হয়, তাহলে তালাকের মাধ্যমে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটিয়ে দেওয়ার অধিকার তাদের আছে, না নেই? এ ব্যাপারে আলেমদের মতভেদ রয়েছে। কেউ কেউ বলেন, এ অধিকার শর্তসাপেক্ষ; অর্থাৎ, তাতে শাসনকর্তৃপক্ষের আদেশ অথবা স্বামী-স্ত্রীর মাঝে বিচ্ছেদ ঘটানোর ব্যাপারে কর্তৃপক্ষের অনুমতি থাকতে হবে। তবে অধিকাংশ উলামার নিকট কোন শর্ত ছাড়াই তাদের এ অধিকার আছে।
(বিস্তারিত জানার জন্য দ্রষ্টব্যঃ তাফসীর ত্বাবারী, ফাতহুল ক্বাদীর এবং ইবনে কাসীর)
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ৩৪ ও ৩৫ নং আয়াতের তাফসীর:
পুরুষগণ মহিলাদের কর্তা, নেতা, শ্রেষ্ঠ হাকিম এবং যখন অবাধ্য হবে তখন আদব শিক্ষা প্রদানকারী।
এর কারণ দুটি:
১. আল্লাহ তা‘আলা প্রদত্ত শ্রেষ্ঠত্ব, আল্লাহ তা‘আলা নিজেই পুরুষদেরকে মহিলাদের ওপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন। পুরুষদের দৈহিক শক্তি, কর্মক্ষমতা, সাহস ও ধৈর্য ইত্যাদি নারীদের থেকে বহুগুণে বেশি দিয়েছেন। ফলে পুরুষদের দ্বারা যে কাজ হয় নারীদের দ্বারা সেরূপ কাজ হয় না। এজন্য নবুওয়াত কেবল পুরুষদের মধ্যে সীমাবদ্ধ। অনুরূপভাবে রাজত্ব পরিচালনা করাও পুরুষদের হাতেই। কারণ পুরুষের শাসনে রাষ্ট্রে যে নিয়ম-শৃঙ্খলা বহাল থাকবে, নারী পরিচালিত রাষ্ট্রে তা বহাল থাকবে না।
তাই যখন রূমবাসী তাদের প্রেসিডেন্ট মহিলাকে নির্বাচিত করল তখন নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন,
لَنْ يُفْلِحَ قَوْمٌ وَلَّوْا أَمْرَهُمُ امْرَأَةً
এমন জাতি কখনো সফলকাম হবে না যারা তাদের নেতৃত্বের দায়িত্বভার কোন মহিলার ওপর অর্পণ করে। (সহীহ বুখারী হা: ৪৪২৫)
২. পুরুষদের স্ব-উপার্জিত সম্পদ দ্বারা ব্যয়ভার বহন করে। একজন নারীকে ইসলাম উপার্জনের নির্দেশ দেয়নি। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনা করবে স্বামী আর স্বামীর ঘর সংরক্ষণ করবে স্ত্রী। একজন নারী যদি অর্থ উপার্জন করতে যায় তাহলে সাংসারিক, সন্তান-সন্ততি ও দৈহিক এবং ধর্ম-কর্ম ইত্যাদি সর্বদিক থেকে সমস্যা সৃষ্টি হবে।
(حَافِظَاتٌ لِّلْغَيْبِ بِمَا حَفِظَ اللّٰهُ)
‘লোকচক্ষুর অন্তরালে আল্লাহ যা সংরক্ষিত করতে বলেছেন, তা হিফাযত করে।’অর্থাৎ স্বামীর অনুপস্থিতিতে নিজের সতীত্ব এবং স্বামীর সম্পদ হেফাযত করবে।
এরূপ আনুগত্যশীল নারীদের অনেক ফযীলত রয়েছে। নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, মহিলাদের মধ্যে সেই উত্তম যখন তুমি তার দিকে তাকাবে তখন সে তোমাকে আনন্দ দেবে, যখন নির্দেশ দেবে তা পালন করবে এবং যখন তুমি অনুপস্থিত থাকবে তখন সে নিজেকে এবং তোমার সম্পদ হেফাযত করবে। তারপর নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এ আয়াত তেলাওয়াত করলেন। (তাফসীর তাবারী, হা: ৯৩২৫, সহীহ)
রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, যখন কোন নারী পাঁচ ওয়াক্ত সালাত আদায় করে, রমযানের সিয়াম পালন করে, স্বীয় লজ্জাস্থান হিফাজত করে এবং স্বামীর আনুগত্য করে, তাকে বলা হবে: তুমি জান্নাতে প্রবেশ কর, তোমার যে দরজা দিয়ে ইচ্ছা। (সহীহুল জামে হা: ৬৬০, সহীহ, আহমাদ ১/১৯১)
পক্ষান্তরে যে সকল নারী স্বামীর অবাধ্য হবে তার সংশোধনের জন্য আল্লাহ তা‘আলা তিনটি ব্যবস্থা দিয়েছেন-
১. তাদেরকে সদুপদেশ ও নসীহত করে বুঝাতে হবে।
২. সাময়িকভাবে বিছানা আলাদা করে দেবে। বুদ্ধিমতী মহিলার জন্য এটাই যথেষ্ট।
এতেও কাজ না হলে:
৩. হালকা মৃদু প্রহার করবে।
তবে প্রহার যেন জুলুমের পর্যায়ে চলে না যায়। অনেক গণ্ডমুর্খ পুরুষ প্রহার করতে গিয়ে স্ত্রীদেরকে মেরেও ফেলে যা শরীয়তে সম্পূর্ণ হারাম।
উল্লিখিত তিনটি ব্যবস্থা গ্রহণ করার পরও যদি কোন ফল না হয়, তাহলে চতুর্থ ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। এ ব্যাপারে বলা হয়েছে যে, স্বামী-স্ত্রী উভয়পক্ষকে দু’জন বিচারক নিয়োগ করতে হবে। তারা উভয়ে নিষ্ঠাবান ও আন্তরিকতাপূর্ণ হলে তাদের সংশোধনের প্রচেষ্টা অবশ্যই ফলপ্রসূ হবে। আর যদি তাদের প্রচেষ্টা ফলপ্রসূ না হয়, তাহলে তালাকের মাধ্যমে স্বামী-স্ত্রীর বিচ্ছেদ ঘটিয়ে দেয়ার অধিকার তাদের আছে। এ ব্যাপারে মতানৈক্য রয়েছে। কেউ কেউ বলেছেন এ অধিকার শর্ত সাপেক্ষে অর্থাৎ তাতে শাসকের পক্ষ হতে আদেশ বা স্বামী-স্ত্রীর মাঝে বিচ্ছেদ ঘটানোর ব্যাপারে কর্তৃপক্ষের অনুমতি থাকতে হবে। তবে অধিকাংশ আলিম সমাজের মতে কোন শর্ত ছাড়াই তাদের এ অধিকার আছে।
আয়াত থেকে শিক্ষণীয় বিষয়:
১. পুরুষেরাই মহিলাদের নেতৃত্ব দেবে।
২. অবাধ্য নারীদের সংশোধনের জন্য শরয়ী ব্যবস্থাপনার কথা জানলাম।
৩. সাধারণ কোন ভুল-ত্র“টির জন্য স্ত্রীদের প্রহার করা উচিত নয়।
৪. স্বামী-স্ত্রীর মাঝে বিবাদ দেখা দিলে উভয় পক্ষ থেকে মীমাংসার জন্য হাকিম নির্ধারণ করা বৈধ।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: উপরে ঐ অবস্থার কথা বর্ণনা করা হয়েছে যে, অবাধ্যতা ও বক্রতা যদি স্ত্রীর পক্ষ হতে হয়। আর এখানে ঐ অবস্থার বর্ণনা দেয় হচ্ছে যে, যদি স্বামী-স্ত্রী উভয়েই একে অপরের প্রতি বিরূপ মত পোষণ করে তবে কি করতে হবে? এ ব্যাপারে উলামা-ই-কিরাম বলেন যে, এরূপ অবস্থায় শাসনকর্তা একজন নির্ভরযোগ্য ও বুদ্ধিমান বিচারক নিযুক্ত করবেন। যিনি দেখবেন যে, অত্যাচার ও বাড়াবাড়ি কার পক্ষ হতে হচ্ছে। অতঃপর তিনি অত্যাচারীকে অত্যাচার হতে বাধা দান করবেন। যদি এর দ্বারা কোন সন্তোষজনক ফল পাওয়া না যায় তবে শাসনকর্তা স্ত্রীর পক্ষ হতে একজন ও পুরুষের পক্ষ হতে একজন বিচারক নির্ধারণ করবেন এবং তাঁরা দুজন মিলিতভাবে বিষয়টি যাচাই করে দেখবেন। অতঃপর যাতে তারা মঙ্গল বিবেচনা করবেন সে মীমাংসাই করবেন। অর্থাৎ হয় তাদের মধ্যে বিচ্ছেদ আনয়ন করবেন, না হয় মিলন ঘটিয়ে দেবেন। কিন্তু শরীয়তের প্রচারক (সঃ) তো ঐ কাজের দিকেই আগ্রহ উৎপাদন করেছেন যে, তাঁরা যেন স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে মিলন ঘটাবারই যথাসাধ্য চেষ্টা করেন। বিচারকদ্বয়ের যাচাইয়ে যদি স্বামীর দিক হতে অন্যায় প্রমাণিত হয় তবে তারা এ স্ত্রীকে তার স্বামী হতে পৃথক করে রাখবেন এবং স্বামীকে বাধ্য করবেন যে, সে। যেন তার চরিত্র ভাল না করা পর্যন্ত স্বীয় স্ত্রী হতে পৃথক থাকে এবং তার খরচ বহন করে। আর যদি দুষ্টামি স্ত্রীর দিক হতে প্রমাণিত হয় তবে তারা তার স্বামীকে খরচ বহন করতে বাধ্য করবেন না, বরং স্ত্রীকেই করবেন। অনুরূপভাবে যদি বিচারকদ্বয় তালাকের ফায়সালা করেন তবে স্বামী তালাক দিতে বাধ্য হবে। আর যদি তারা তাদের পরস্পরেই বসবাসের ফায়সালা করেন। তবে সেটাও তাদেরকে মানতে হবে। এমনকি হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) তো বলেন যে, সালিসদ্বয় যদি তাদেরকে একত্রীকরণের ফায়সালা করেন এবং সে ফায়সালা একজন মেনে নেয় ও অপরজন না মানে আর ঐ অবস্থাতেই একজনের মৃত্যু হয়ে যায় তবে যে সম্মত ছিল সে অসম্মত ব্যক্তির উত্তরাধিকারী হবে। কিন্তু যে অসম্মত ছিল সে সম্মত ব্যক্তির উত্তরাধিকারী হবে না। (তাফসীর-ই-ইবনে জারীর)
এ রকমই একটি বিবাদে হযরত উসমান (রাঃ) হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) এবং হযরত মু'আবিয়া (রাঃ)-কে সালিস নিযুক্ত করেন এবং তাদেরকে বলেন, তোমরা যদি তাদের মধ্যে সংযোগ স্থাপন করতে চাও তবে সংযোগ স্থাপিত হয়ে যাবে। আর যদি বিচ্ছেদ আনয়নের ইচ্ছে কর তবে বিচ্ছেদই হয়ে যাবে। একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, হযরত আকীল ইবনে আবু তালিব (রাঃ) হযরত ফাতিমা বিনতে উত্মা ইবনে রাবিআ’ (রাঃ)-কে বিয়ে করেন। হযরত ফাতিমা (রাঃ) হযরত আকীল (রাঃ)-কে বলেন, তুমি আমার নিকট আসবেও এবং আমি তোমার খরচও বহন করবো। তখন এই ঘটতে থাকে যে, হযরত আকীল (রাঃ) যখন হযরত ফাতিমা (রাঃ)-এর নিকট আসার ইচ্ছে করতেন তখন তিনি (ফাতিমা রাঃ) জিজ্ঞেস করতেন, উৎকী ইবনে রাধিকা এবং “শাইবা ইবনে রাবীআ' কোথায় রয়েছে? হযরত আকীল (রাঃ) বলতেন, “তোমার বাম পার্শ্বে জাহান্নামে রয়েছে। এতে হযরত ফাতিমা (রাঃ) কুপিতা হয়ে স্বীয় কাপড় ঠিক করে নিতেন (অর্থাৎ অনাবৃত দেহ বস্ত্রে আবৃত করতেন)। একদিন হযরত আকীল (রাঃ) হযরত উসমান (রাঃ)-এর নিকট এসে ঘটনাটি বর্ণনা করেন। হযরত উসমান (রাঃ) এতে হৈসে উঠেন এবং হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) ও হযরত মুআবিয়া (রাঃ)-কে তাদের সালিস নিযুক্ত করেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) তো বলছিলেন যে, তাদের মধ্যে বিচ্ছেদ আনয়ন করা হোক। কিন্তু হযরত মু'আবিয়া (রাঃ) বলেছিলেন, “আমি বান্ ‘আবদ-ই-মানাফের মধ্যে এ বিচ্ছেদ অপছন্দ করি। তখন তারা হযরত আকীল (রাঃ)-এর গৃহে আগমন করেন। এসে দেখেন যে, দরজা কন্ধ রয়েছে এবং স্বামী-স্ত্রী দু'জনই ভেতরে রয়েছেন। তখন তারা ফিরে আসেন।
মুসনাদ-ই-আবদুর রাযযাকে রয়েছে যে, আলী (রাঃ)-এর খিলাফতকালে এক দম্পত্তি মনোমালিন্যের ঝগড়া নিয়ে হযরত আলী (রাঃ)-এর নিকট আগমন করেন। উভয়ের সাথে নিজ উভয় দল হতে একজন করে লোক বেছে নিয়ে তাদেরকে সালিস নিযুক্ত করেন। অতঃপর তিনি সালিসদ্বয়কে বলেন, “তোমাদের কাজ কি তা তোমরা জান কি? তোমাদের কাজ হচ্ছে স্বামী-স্ত্রীকে একত্রিত করণ বা তাদের মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটান। একথা শুনে স্ত্রী বলে, আমি আল্লাহ তা'আলার সিদ্ধান্তের উপর সম্মত রয়েছি, সেটা হয় সংযোগ হোক, না হয় বিচ্ছেদই হোক। কিন্তু স্বামী বলে, বিচ্ছেদে আমি সম্মত নই। তাতে হযরত আলী (রাঃ) বলেন, না, না। আল্লাহর শপথ! তোমাকে দু'টোতেই সম্মত হতে হবে।
অতএব, আলেমদের ইজমা হয়েছে যে, এরূপ অবস্থায় ঐ সালীসদ্বয়ের দু’টোরই স্বাধীনতা রয়েছে। এমনকি হযরত ইবরাহীম নাখঈ (রঃ) ৱলেন যে, তাঁরা ইচ্ছে করলে দু'টি বা তিনটি তালাকও দিতে পারেন। হযরত ইমাম মালিক (রঃ) হতেও এটাই বর্ণিত আছে। হ্যাঁ, তবে হযরত হাসান বসরী (রঃ) বলেন যে, তাদের একত্রিকরণের অধিকার রয়েছে বটে, কিন্তু বিচ্ছেদ করণের অধিকার নেই। হযরত কাতাদা (রঃ) এবং হযরত যায়েদ ইবনে আসলাম (রঃ)-এরও এটাই উক্তি। ইমাম আহমাদ (রঃ), আবু সাউর এবং (রঃ) দাউদেরও মাযহাব এটাই। তাদের দলীল হচ্ছে- (আরবী) যুক্ত আয়াতটি। কেননা, এতে বিচ্ছেদের উল্লেখ নেই। হ্যা, তবে যদি তাঁরা দু’জন দু’পক্ষ হতে ওয়াকীলু (উকিল) নির্বাচিত হন তবে অবশ্যই তাদের সংযোগ ও বিচ্ছেদ দু'টোরই অধিকার রয়েছে। আর এতে কারও বিরোধ নকল করা হয়নি। এটাও মনে রাখতে হবে যে, এ দু’জন সালীস শাসনকর্তার পক্ষ হতে নিযুক্ত হবেন এবং তার পক্ষ হতেই ফায়সালা করবেন, যদিও তাতে উভয়পক্ষ অসম্মত থাকে। অথরা সালীসদ্বয়, স্বামী ও স্ত্রীর পক্ষ হতে ওয়াকীল (উকিল) নির্বাচিত হবেন। জমহূরের মাযহাব হচ্ছে প্রথমটি। তাদের দলীল হচ্ছে এই যে, কুরআন হাকিম তাঁদের নাম ‘হাকাম রেখেছে এবং ‘হাকামে’র ফায়সালায় কেউ সন্তুষ্ট হোক আর অসন্তুষ্টই হোক সর্বাবস্থাতেই তাদের ফায়সালা শিরোধার্য।
আয়াতের বাহ্যিক শব্দগুলো জমহুরের পক্ষেই রয়েছে। ইমাম শাফিঈ (রঃ)-এর নতুন উক্তি এটাই এবং ইমাম আবু হানিফা (রঃ) ও তাঁর সহচরদের এটাই উক্তি। দ্বিতীয় উক্তি যাদের তারা বলেন যে, যদি তারা ‘হাকামের অবস্থায় হতেন তবে. হযরত আলী (রাঃ) ঐ স্বামীকে কেন বললেন- তোমার স্ত্রী যখন দু' • অবস্থাকেই মেনে নিয়েছে তখন তুমি না মানলে তুমি মিথ্যবাদীরূপে সাব্যস্ত হবে। এ বিষয়ে আল্লাহ তা'আলারই জ্ঞান সবচেয়ে বেশী রয়েছে।
ইমাম ইবনে বারুর (রঃ) বলেন, এ কথার উপর আলেমদের ইজমা হয়েছে যে, দু’জন সালীসের উক্তির মধ্যে যখন মতবিরোধ দেখা দেবে তখন অপরের উক্তির উপর কোন গুরুত্ব দেয়া হবে না। একথার উপরও ইজমা হয়েছে যে, যদি সালীসদ্বয় সংযোগ স্থাপন করতে চান তবে তাঁদের ফায়সালা কার্যকরী হবে। কিন্তু যদি তারা তাদের মধ্যে বিচ্ছেদ, আনয়ন করতে চান তাহলেও তাদের সিদ্ধান্ত কার্যকরী হবে কি-না সে বিষয়ে মতবিরোধ রয়েছে। কিন্তু জমহুরের মাযহাব এটাই যে, সে সময়েও তাদের সিদ্ধান্ত কার্যকরী হবে যদিও তাদেরকে ওয়াকীল (উকিল) বানানো না হয়।
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।