সূরা আন-নিসা (আয়াত: 156)
হরকত ছাড়া:
وبكفرهم وقولهم على مريم بهتانا عظيما ﴿١٥٦﴾
হরকত সহ:
وَّ بِکُفْرِهِمْ وَ قَوْلِهِمْ عَلٰی مَرْیَمَ بُهْتَانًا عَظِیْمًا ﴿۱۵۶﴾ۙ
উচ্চারণ: ওয়াবিকুফরিহিম ওয়াকাওলিহিম ‘আলা-মারইয়ামা বুহতা-নান ‘আজীমা।
আল বায়ান: আর তাদের কুফরীর কারণে এবং মারইয়ামের বিরুদ্ধে মারাত্মক অপবাদ দেয়ার কারণে।
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ১৫৬. আর তাদের কুফরীর জন্য এবং মারইয়ামের বিরুদ্ধে গুরুতর অপবাদের জন্য।(১)
তাইসীরুল ক্বুরআন: (তাদের প্রতি আল্লাহর অসন্তোষ নেমে এসেছে) তাদের কুফরীর জন্য আর মারইয়ামের প্রতি তাদের গুরুতর অপবাদপূর্ণ কথা উচ্চারণের জন্য।
আহসানুল বায়ান: (১৫৬) এবং তারা তাদের অবিশ্বাসের জন্য ও মারয়্যামের প্রতি জঘন্য অপবাদ আরোপ করার জন্য (অভিশপ্ত হয়েছিল)। [1]
মুজিবুর রহমান: এবং তাদের কুফরী ও মারইয়ামের প্রতি তাদের ভয়ানক অপবাদের জন্য।
ফযলুর রহমান: (তাদের ওপর শাস্তি নেমে এসেছিল) তাদের কুফরির কারণে, মরিয়মের প্রতি গুরুতর অপবাদ আরোপ করার কারণে
মুহিউদ্দিন খান: আর তাদের কুফরী এবং মরিয়মের প্রতি মহা অপবাদ আরোপ করার কারণে।
জহুরুল হক: আর তাদের বলার জন্য -- "আমরা নিশ্চয়ই কাতল করেছি মসীহ্কে, -- মরিয়ম-পুত্র ঈসাকে” আল্লাহ্র রসূল, আর তারা তাঁকে কাতল করে নি, আর তারা তাঁকে ত্রুশে বধও করে নি, কিন্তু তাদের কাছে তাঁকে তেমন প্রতীয়মান করা হয়েছিল। আর নিঃসন্দেহ যারা এ বিষয়ে ভিন্ন মত পোষণ করছিল, তারা অবশ্য তাঁর সন্বন্ধে সন্দেহের মধ্যে ছিল। এ বিষয়ে তাদের কোনো জ্ঞান নেই অনুমানের অনুসরণ ছাড়া। আর এ সুনিশ্চিত যে তারা তাঁকে হত্যা করে নি।
Sahih International: And [We cursed them] for their disbelief and their saying against Mary a great slander,
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ১৫৬. আর তাদের কুফরীর জন্য এবং মারইয়ামের বিরুদ্ধে গুরুতর অপবাদের জন্য।(১)
তাফসীর:
(১) মারইয়ামের উপর চাপানো তাদের গুরুতর অপবাদ কি ছিল তা এখানে বর্ণনা করা হয় নি। অন্যত্র এসেছে যে, তারা মারইয়ামকে ব্যভিচারের অপবাদ দিতে ক্রটি করে নি। আল্লাহ বলেন, “তারপর সে সন্তানকে নিয়ে তার সম্প্রদায়ের কাছে উপস্থিত হল; তারা বলল, ‘হে মারইয়াম! তুমি তো এক অদ্ভুত জিনিস নিয়ে এসেছ’। [সূরা মারইয়াম: ২৭] এখানে অঘটন বলতে তারা ব্যভিচারের দিকেই অঙ্গুলি নির্দেশ করছিল। কারণ পরবর্তী আয়াতে মারইয়ামের বাবা খারাপ লোক না হওয়া এবং মা-ও বেশ্যা না হওয়া বলার মাধ্যমে সেটা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে। [আদওয়াউল বায়ান]
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (১৫৬) এবং তারা তাদের অবিশ্বাসের জন্য ও মারয়্যামের প্রতি জঘন্য অপবাদ আরোপ করার জন্য (অভিশপ্ত হয়েছিল)। [1]
তাফসীর:
[1] এই আয়াতের লক্ষার্থ হল, ইউসুফ নাজ্জার (যোসেফ) নামক একজন লোকের সঙ্গে মারয়্যাম (‘আলাইহাস্ সালাম)-এর ব্যভিচারের যে মিথ্যা অপবাদ আরোপ করা হয়েছিল তার খন্ডন। আজও কিছু তথাকথিত তত্ত্বানুসন্ধানী এই মস্তবড় মিথ্যা অপবাদকে একটি ‘প্রামাণ্য সত্য’ বলে বিশ্বাস করে এবং ইউসুফ নাজ্জারকে ঈসা (আঃ)-এর পিতা প্রমাণ করার অপচেষ্টা করে। (نَعُوْذُبِاللهِ) এমনকি তারা ঈসা (আঃ)-এর অলৌকিক জন্মকেও অস্বীকার করে।
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ১৫৫-১৫৯ নং আয়াতের তাফসীর:
আল্লাহ তা’আলা যেসকল অপরাধের কারণে ইয়াহূদীদের ওপর লা‘নত করেছিলেন তা এখানে বর্ণনা করেছেন:
১. তাদের নিকট যেসকল অঙ্গীকার নেয়া হয়েছিল তা ভঙ্গ করার কারণে।
২. আল্লাহ তা‘আলার নিদর্শন ও মুজিযার সাথে কুফরীর কারণে যা তারা সচক্ষে প্রত্যক্ষ করেছিল।
৩. তাদের এ কথার কারণে যে, আমাদের অন্তর মোহরাঙ্কিত।
যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(وَقَالُوْا قُلُوْبُنَا فِيْٓ أَكِنَّةٍ مِّمَّا تَدْعُوْنَآ إِلَيْهِ)
“তারা বলেঃ তুমি যার প্রতি আমাদেরকে আহ্বান করছ সে বিষয়ে আমাদের অন্তর আবরণে আচ্ছাদিত।” (সূরা হা-মীম সিজদাহ ৪১:৫)
মূলত আল্লাহ তা‘আলা তাদের অন্তরে মোহর মেরে দিয়েছিলেন তাদের কুফরীর কারণে ফলে তাদের অল্প সংখ্যকই ঈমান আনে।
৪. মারইয়াম (আলাইহাস সালাম)-এর ওপর মিথ্যা অপবাদ প্রদানের কারণে। তারা মারইয়াম (আঃ)-কে ব্যভিচারের অপবাদ প্রদান করেছিল।
৫. তাদের এ কথা বলার কারণে যে, আমরা ঈসা (আঃ)-কে হত্যা করেছি।
এসব কথা ও কাজের কারণে কিয়ামত দিবস অবধি তাদের ওপর আল্লাহ তা’আলার অভিশাপ।
তারা ঈসা (আঃ)-কে হত্যা করেছে বলে যে দাবী করে তা মিথ্যা। প্রকৃতপক্ষে তারা ঈসা (আঃ)-কে হত্যা করতে পারেনি এবং শুলিতেও চড়াতে পারেনি। বরং একজন লোককে ঈসা (আঃ)-এর সদৃশ করে দেয়া হয়েছিল। তারা তাকে হত্যা করেছে। তারা নিহত লোকটির ব্যাপারে যে মতানৈক্য করেছে তা ধারণাপ্রসূত।
পূর্বেও উল্লেখ করা হয়েছে যে, যখন ঈসা (আঃ) বুঝতে পারলেন ইয়াহূদীরা তাকে হত্যা করার চক্রান্ত করছে তখন তিনি বার বা সতেরজন সহচর নিয়ে একত্র হয়ে তাদেরকে লক্ষ করে বলেন, তোমাদের মধ্যে কে আছো যাকে আমার সাদৃশ্য প্রদান করা হবে, আর তাকে হত্যা করা হবে। ফলে সে জান্নাতে আমার সাথে থাকবে। তাদের মধ্যে একজন যুবক বলেন, আমি। এভাবে তিনবার ঈসা (আঃ) বললে যুবকটি তিনবারই দাঁড়ায়।
অতঃপর আল্লাহ তা‘আলা তাকে ঈসা (আঃ)-এর আকৃতি দান করেন। তারপর আল্লাহ তা‘আলা ঈসা (আঃ)-কে আকাশে তুলে নেন। পরে ইয়াহূদীরা এসে সে যুবকটিকে হত্যা করল এবং ক্রুস বিদ্ধ করল আর মনে করল তারা ঈসা (আঃ)-কেই হত্যা করেছে। (ইবনে কাসীর, ২/ ৫০১ এ বর্ণনা বিভিন্ন শব্দে এসেছে)
ঈসা (আঃ)-এর মত আকৃতিবিশিষ্ট লোকটিকে হত্যা করার পর ইয়াহূদীদের মধ্যে মতবিরোধ সৃষ্টি হয়। একদল বলল, ঈসাকে হত্যা করা হয়েছে, অন্য দল বলল, ক্রুসবিদ্ধ ব্যক্তি ঈসা (আঃ) নয়। অন্যদল বলল তারা ঈসা (আঃ)-কে আসমানে চড়তে স্বচক্ষে দেখেছে। মোট কথা তারা হত্যার ব্যাপারে মতবিরোধের শিকার।
(بَلْ رَّفَعَهُ اللّٰهُ إِلَيْهِ)
‘বরং আল্লাহ তাকে তাঁর নিকট তুলে নিয়েছেন’এ আয়াত দ্বারা সুস্পষ্টভাবে প্রতিয়মান হয় যে, আল্লাহ তা‘আলা ঈসা (আঃ)-কে জীবিত অবস্থায় স্বশরীরে আকাশে তুলে নেন।
বিভিন্ন সূত্রে বর্ণিত হাদীসেও এ কথা প্রমাণিত। এ সকল হাদীসে ঈসা (আঃ)-কে আসমানে তুলে নেয়া ছাড়াও পুনরায় কিয়ামত দিবসের প্রাক্কালে পৃথিবীতে তার অবতরণ এবং আরো বহু কথা তার ব্যাপারে উল্লেখ করা হয়েছে। ইমাম ইবনু কাসীর (রহঃ) উক্ত হাদীসগুলো বর্ণনা করার পর বললেন, উল্লিখিত হাদীসগুলো রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) হতে প্রমাণিত। অনেক সংখ্যক সাহাবী এসব হাদীস বর্ণনা করেছেন।
এ সমস্ত হাদীসে ঈসা (আঃ) কোথায় ও কিভাবে অবতরণ করবেন তা উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি দামেশকের মিনারা শারকিয়াতে ফজরের সালাতের ইকামাতের সময় অবতরণ করবেন। তিনি শূকর হত্যা করবেন, ক্রুস ভেঙ্গে ফেলবেন ও জিযিয়া কর বাতিল করবেন। তার শাসনামলে পৃথিবীর সমস্ত মানুষ মুসলিম হয়ে যাবে। তিনিই দাজ্জালকে হত্যা করবেন, তার যুগেই ইয়াযুজ-মাযুজ ও তাদের ফেতনা প্রকাশ পাবে এবং তার বদদু‘আয় বিনাশ ও ধ্বংস হয়ে যাবে। قبل موته “তার মৃত্যুর পূর্বে” আলোচ্য আয়াতে ه (তার সর্বনামটি কার দিকে প্রত্যাবর্তন করেছে এ নিয়ে মতভেদ রয়েছে।)
একদল মুফাসসীরগণের মতে, খ্রিস্টানদেরকে বুঝানো হয়েছে। অর্থাৎ প্রত্যেক খ্রিস্টানগণ মৃত্যুর পূর্বে ঈসা (আঃ)-এর নবুওয়াতের সত্যতা উপলব্ধি করে তাঁর প্রতি ঈমান আনবে। কিন্তু সে মুহূর্তে ঈমান কোন কাজে আসবে না।
আরেক দল মুফাসসিরগণের মতে, (এবং এ ব্যাখ্যাটি সঠিক) ’’هُ‘‘ সর্বনামটি প্রত্যাবর্তন ঈসা (আঃ)-এর দিকে তিনি দ্বিতীয়বার যখন দুনিয়াতে অবতরণ করবেন, দাজ্জালকে হত্যা করবেন, ইসলাম প্রচারে মগ্ন হবেন, ইয়াহূদী ও খ্রিস্টানগণের মধ্যে যারা বিরুদ্ধাচরণ করবে তাদেরকে হত্যা করবেন এবং সর্বত্র ইসলামের একচ্ছত্র আধিপত্য কায়িম হবে। অবশিষ্ট আহলে কিতাবরা ঈসা (আঃ)-এর মৃত্যুর পূর্বেই তাঁর প্রতি যথাযথ ঈমান আনবে।
সহীহ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, যার হাতে আমার প্রাণ। সেই সত্তার শপথ! অবশ্যই এমন একদিন আসবে যেদিন তোমাদের মধ্যে ঈসা বিন মারইয়াম একজন ন্যায়পরায়ন শাসক হিসেবে অবতরণ করবেন। ক্রুস ভেঙ্গে চুরমার করবেন, শুকর নিধন করবেন, জিযিয়া কর বাতিল করবেন, মাল-সম্পদ এত বেশি হবে যে, (দান-সদাক্বাহ) গ্রহণ করার মত লোক থাকবে না। সেই সময় একটি সিজদা দুনিয়া এবং তার মধ্যে যা কিছু আছে তার থেকেও উত্তম হবে। এ হাদীস বর্ণনার পর আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) বললেন: তোমরা ইচ্ছা করলে কুরআনের এ আয়াত তেলাওয়াত করতে পার:
(وَإِنْ مِّنْ أَهْلِ الْكِتٰبِ إِلَّا لَيُؤْمِنَنَّ بِه۪ قَبْلَ مَوْتِه۪ ج وَيَوْمَ الْقِيٰمَةِ يَكُوْنُ عَلَيْهِمْ شَهِيْدًا)
“আহলে কিতাবীগণের মধ্যে প্রত্যেকে নিজ মৃত্যুর পূর্বে তাকে (ঈসা) বিশ্বাস করবেই এবং কিয়ামাতের দিন সে তাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেবে”(সূরা নিসা ৪:১৫৯, সহীহ বুখারী হা: ৩৪৪৮)
এ ব্যাপারে আরো অনেক সহীহ হাদীস রয়েছে, যা প্রমাণ করে ঈসা (আঃ) আকাশে জীবিত রয়েছেন। কিয়ামাতের পূর্বে দুনিয়াতে আসবেন। এটাই আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাতের আক্বীদাহ।
আয়াত থেকে শিক্ষণীয় বিষয়:
১. ইয়াহূদীদের ওপর লা‘নতের কারণসমূহ জানতে পারলাম।
২. খ্রিস্টানদের বাতিল আক্বীদাহ সম্পর্কে জানতে পারলাম।
৩. ঈসা (আঃ) দুনিয়ার আকাশে জীবিত আছেন। শেষ জামানায় আসবেন।
৪. আল্লাহ তা‘আলা উপরে আছেন, স্বসত্ত্বায় সর্বত্র বিরাজমান নন। যদি তাই না হতো তাহলে ঈসা (আঃ)-কে আকাশে তুলে নেয়ার কোন অর্থ হয় না।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: ১৫৫-১৫৯ নং আয়াতের তাফসীর:
আহলে কিতাবের ঐ পাপসমূহের বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যার কারণে তারা আল্লাহ তা'আলার করুণা হতে দূরে নিক্ষিপ্ত হয়েছে। অভিশপ্ত জাতি হিসেবে পরিগণিত হয়েছে। প্রথম হচ্ছে এই যে, তারা আল্লাহ তা'আলার সাথে যে অঙ্গীকার করেছিল তার উপর প্রতিষ্ঠিত থাকেনি। দ্বিতীয় হচ্ছে এই যে, তারা আল্লাহ তা'আলার আয়াতসমূহ অর্থাৎ হুজ্জত, দলীল এবং নবীদের মুজিযাকে অস্বীকার করে। তৃতীয় হচ্ছে এই যে, তারা বিনা কারণে অন্যায়ভাবে নবীদেরকে হত্যা করে। আল্লাহ পাকের রাসূলগণের একটি বিরাট দল তাদের হাতে নিহত হন। চতুর্থ এই যে, তারা বলে- আমাদের অন্তর গিলাফের অর্থাৎ পর্দার মধ্যে রয়েছে। যেমন মুশরিকরা বলেছিলঃ (আরবী) অর্থাৎ তারা বলেছিল- “হে নবী (সঃ)! আপনি আমাদেরকে যেদিকে আহ্বান করছেন তা হতে আমাদের অন্তর পর্দার মধ্যে রয়েছে।”(৪১৪ ৫) আবার এও বলা হয়েছে যে, এর ভাবার্থ হচ্ছে- আমাদের অন্তর হচ্ছে জ্ঞান ও বিদ্যার পাত্র। সেই পাত্র জ্ঞানে পরিপূর্ণ রয়েছে।
সরা-ই-বাকারার মধ্যেও এর দৃষ্টান্ত বর্ণিত হয়েছে। আল্লাহ তাআলা তাদের। এ কথাকে খণ্ডন করে বলেনঃ এটা নয় বরং তাদের কুফরীর কারণে আল্লাহ তা'আলা তাদের অন্তরে মোহর মেরে দিয়েছেন। প্রথম তাফসীরের ভিত্তিতে ভাবার্থ হবে- তারা ওযর পেশ করে বলেছিল, আমাদের অন্তরের উপর পর্দা পড়ে গেছে বলে আমরা নবী (আঃ)-এর কথাগুলো মনে রাখতে পারি না। তখন আল্লাহ তা'আলা উত্তরে বলেন-“এরূপ নয়, বরং তোমাকে কারণে তোমাদের অন্তরে মোহর মেরে দেয়া হয়েছে। দ্বিতীয় তাফসীরের ভিত্তিতে তো ভাবার্থ সবদিক দিয়েই স্পষ্ট। সূরা-ই-বাকারার তাফসীরে এর বিস্তারিত বিবরণ দেয়া হয়েছে। সুতরাং পরিণাম হিসেবে বলা হয়েছে যে, এখন তাদের অন্তর কুফরী, অবাধ্যতা এবং ঈমানের স্বল্পতার উপরেই থাকবে।
অতঃপর তাদের পঞ্চম বড় অপরাধের বর্ণনা দেয়া হয়েছে যে, তারা সতীসাধ্বী নারী হযরত মারইয়াম (আঃ)-এর উপরও ব্যভিচারের জঘন্যতম অপবাদ দেয় এবং তারা একথা বলতেও দ্বিধাবোধ করেনি যে, এ ব্যভিচারের মাধ্যমেই হযরত ঈসা (আঃ) জন্মগ্রহণ করেছেন। কেউ কেউ আবার আর এক পা অগ্রসর হয়ে বলে যে, এ ব্যভিচার ঋতু অবস্থায় হয়েছিল। তাদের উপর আল্লাহ তা'আলার অভিসম্পাত বর্ষিত হোক যে, তাঁর গৃহীত বান্দাও তাদের কু-কথা হতে রক্ষা পাননি। তাদের ষষ্ঠ অপরাধ এই যে, তারা বিদ্রুপ করে এবং গৌরব বোধ করে বলেছিল, আমরা হযরত ঈসা (আঃ)-কে হত্যা করেছি। যেমন মুশরিকরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে উপহাস করে বলেছিল-“হে ঐ ব্যক্তি! যার উপর কুরআন মাজীদ অবতীর্ণ হয়েছে, তুমি তো পাগল।”
পূর্ণ ঘটনা এই যে, যখন আল্লাহ তা'আলা হযরত ঈসা (আঃ)-কে নবীরূপে প্রেরণ করেন এবং তাঁকে বড় বড় মুজিযা প্রদান করেন, যেমন জন্মান্ধকে চক্ষুদান করা, শ্বেতকুষ্ঠ রোগীকে ভাল করে দেয়া, মৃতকে জীবিত করা, মাটি দ্বারা পাখি তৈরী করে তার ভিতর ফুক দিয়ে তাকে জীবন্ত পাখি করে উড়িয়ে দেয়া ইত্যাদি। তখন ইয়াহুদীরা অত্যন্ত কুপিত হয় এবং তার বিরুদ্ধাচরণে উঠে পড়ে লেগে যায় ও সর্ব প্রকারের কষ্ট দিতে আরম্ভ করে। তারা তাঁর জীবন দুর্বিসহ করে তুলে। কোন গ্রামে কদিন ধরে নিরাপদে অবস্থানও তার ভাগ্যে জুটেনি। সারা জীবন তিনি মায়ের সঙ্গে জঙ্গলে ও প্রান্তরে ভ্রমণের অবস্থায়। কাটিয়ে দেন। সে অবস্থাতেও তিনি নিশ্চিন্ত থাকতে পারেননি। সে যুগের দামেস্কের বাদশাহর নিকট তিনি গমন করেন। সে বাদশাহ ছিল তারকা পূজক। সে সময় ঐ মাযহাবের লোককে ‘ইউনান' বলা হতো। ইয়াহুদীরা এখানে এসে হযরত ঈসা (আঃ)-এর বিরুদ্ধে বাদশাহকে উত্তেজিত করে। তারা বলে, এ লোকটি বড়ই বিবাদী। সে জনগণকে বিপথে চালিত করছে। প্রত্যহ নতুন নতুন গণ্ডগোল সৃষ্টি করছে ও শান্তি ভঙ্গ করছে। সে জনগণের মধ্যে বিদ্রোহের আগুন প্রজ্জ্বলিত করছে।
বাদশাহ বায়তুল মুকাদ্দাসে অবস্থানরত স্বীয় শাসনকর্তার নিকট নির্দেশনামা প্রেরণ করে যে, সে যেন হযরত ঈসা (আঃ)-কে গ্রেফতার করতঃ শূলে চড়িয়ে দেয় এবং তাঁর মস্তকোপরি কাটার মুকুট পরিয়ে দেয় এবং এভাবে জনগণকে এ বিপদ থেকে রক্ষা করে। বাদশাহর এ নির্দেশনামা পাঠ করে ঐ শাসনকর্তা ইয়াহূদীদের একটি দলকে সঙ্গে নিয়ে ঐ ঘরটি অবরোধ করে যেখানে হযরত ঈসা (আঃ) অবস্থান করছিলেন। সে সময় তার সঙ্গে বারোজন বা তেরোজন অথবা খুব বেশী হলে সতেরোজন লোক ছিল। শুক্রবার আসরের পর তারা ঐ ঘরটি অবরোধ করে এবং শনিবারের রাত পর্যন্ত অবরোধ স্থায়ী থাকে। যখন ঈসা (আঃ) অনুভব করেন যে, এখন হয় তারাই জোর করে ঘরে প্রবেশ করতঃ তাকে গ্রেফতার করে নিয়ে যাবে, না হয় তাকেই বাইরে যেতে হবে। তাই তিনি স্বীয় সহচরদেরকে বলেনঃ “তোমাদের মধ্যে কে এটা পছন্দ করবে যে, তার উপর আমার সদৃশ আনয়ন করা হবে অর্থাৎ তার আকার আমার আকারের মত হয়ে যাবে, অতঃপর সে তাদের হাতে গ্রেফতার হবে এবং আল্লাহ পাক আমাকে মুক্তি দেবেন? আমি তার জন্যে জান্নাতের জামিন হচ্ছি।” এ কথা শুনে এক নব্য যুবক দাঁড়িয়ে গিয়ে বলেনঃ “আমি এতে সম্মত আছি।” কিন্তু ঈসা (আঃ) তাঁকে এর যোগ্য মনে না করে দ্বিতীয়বার এবং তৃতীয়বারও একথাই বলেন। কিন্তু প্রত্যেকবার তিনিই প্রস্তুত হয়ে যান। তখন হযরত ঈসাও (আঃ) মেনে নেন এবং দেখতে না দেখতেই আল্লাহ তা'আলার হুকুমে তাঁর আকার পরিবর্তিত হয়, আর মনে হয় যে, তিনিই হযরত ঈসা (আঃ)। সে সময় ছাদের এক দিকে একটি ছিদ্র প্রকাশিত হয় এবং হযরত ঈসা (আঃ)-এর উপর তন্দ্রার ন্যায় অবস্থা ছেয়ে যায়। ঐ অবস্থাতেই তাকে আকাশে উঠিয়ে নেয়া হয়। যেমন আল্লাহ পাক বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ যখন আল্লাহ তাআলা বলেন- হে ঈসা! নিশ্চয়ই আমি তোমাকে গ্রহণকারী এবং আমার নিকট উত্তোলনকারী।' (৩:৫৫)।
হযরত ঈসা (আঃ)-কে আকাশে উঠিয়ে নেয়ার পর এ লোকগুলো ঘর হতে বেরিয়ে আসে। যে মহান সাহাবীকে হযরত ঈসা (আঃ)-এর আকারবিশিষ্ট করে দেয়া হয়েছিল তাঁকেই ঈসা (আঃ) মনে করে ইয়াহূদীদের দলটি ধরে নেয় এবং রাতারাতিই তাকে শূলের উপর চড়িয়ে দিয়ে তার মাথার উপর কাঁটার মুকুট পরিয়ে দেয়। তখন ইয়াহূদীরা আনন্দে আত্মহারা হয়ে পড়ে যে, তারা হযরত ঈসা (আঃ)-কে হত্যা করে ফেলেছে। সবচেয়ে বিস্ময়কর ব্যাপার এই যে, খ্রীষ্টানদের একটি নির্বোধ দলও ইয়াহূদীদের সুরে সুর মিলিয়ে দেয়। শুধুমাত্র যারা হযরত ঈসা (আ)-এর সঙ্গে ঐ ঘরে উপস্থিত ছিল এবং যারা নিশ্চিতরূপে জানতো যে, তাকে আকাশে উঠিয়ে নেয়া হয়েছে, আর ইনি হচ্ছেন অমুক ব্যক্তি যিনি প্রতারণায় তার স্থানে শহীদ হয়েছেন, তারা ছাড়া অবশিষ্ট সমস্ত খ্রীষ্টানই মতই আলাপ আলোচনা করতে থাকে। এমন কি তারা একথাও বানিয়ে নেয় যে, হযরত ঈসা (আঃ)-এর মাতা হযরত মারইয়াম (আঃ) শূলের নীচে বসে ক্রন্দন করছিলেন। তারা একথাও বলে যে, হযরত মারইয়াম (আঃ) সে সময় স্বীয় পুত্রের সঙ্গে কিছু কথাবার্তাও বলেছিলেন। আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।
প্রকৃতপক্ষে এটা ছিল আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হতে তাঁর বান্দাদের উপর পরীক্ষা যা তাঁর পূর্ণ নৈপুণ্যের পরিচায়ক। অতঃপর আল্লাহ তাআলা এ অপপ্রচারকে প্রকাশ করে দিয়ে প্রকৃত অবস্থা সম্বন্ধে স্বীয় বান্দাদেরকে অবহিত করেন এবং স্বীয় সর্বশ্রেষ্ঠ রাসূল ও বড় মর্যাদাসম্পন্ন নবী (সঃ)-এর মাধ্যমে তাঁর পবিত্র ও সত্য কালামে পরিষ্কারভাবে বর্ণনা করেছেন যে, প্রকৃতপক্ষে না কেউ হযরত ঈসা (আঃ)-কে হত্যা করেছে, না তাকে শূলে দিয়েছে। বরং যে ব্যক্তির আকার তারই আকারের ন্যায় করে দেয়া হয়েছিল তাকেই তারা হযরত ঈসা (আঃ) মনে করে শূলে দিয়েছিল।”যেসব ইয়াহুদী ও খ্রীষ্টান হযরত ঈসা (আঃ)-এর নিহত হওয়ার কথা বলে থাকে তারা সন্দেহ ও ভ্রান্তির মধ্যে রয়েছে। তাদের নিকট না আছে কোন দলীল, না তাদের আছে সে সম্পর্কে কোন জ্ঞান। কল্পনার অনুসরণ ব্যতীত তাদের এ বিষয়ে কোনই জ্ঞান নেই। এ জন্যেই আল্লাহ তা'আলা এরই সাথে আবার বলে দিয়েছেন যে, হযরত ঈসা রূহুল্লাহ (আঃ)-কে কেউ যে হত্যা করেনি এটা নিশ্চিত স্বরূপ কথা। বরং প্রবল পরাক্রান্ত ও মহাজ্ঞানী আল্লাহ তাঁকে নিজের নিকট উঠিয়ে নিয়েছেন।
হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, যখন আল্লাহ তা'আলা হযরত ঈসা (আঃ)-কে আকাশে উঠিয়ে নিতে ইচ্ছে করেন তখন তিনি বাড়িতে আসেন। সে সময় ঘরে বারোজন সাহায্যকারী ছিলেন। তাঁর চুল হতে পানির ফোটা ঝরে ঝরে পড়ছিলো। তিনি তাঁর সহচরদেরকে বলেনঃ “তোমাদের মধ্যে কেউ কেউ এমন আছে যারা আমার উপর বিশ্বাস স্থাপন করেছে কিন্তু বারো বার আমার সঙ্গে কুফরী করবে। অতঃপর তিনি বলেনঃ “তোমাদের মধ্যে কে এমন আছে যে পছন্দ করে যে, আমার মত তার আকার করে দেয়া হবে এবং আমার স্থলে তাকে হত্যা করা হবে এবং জান্নাতে সে আমার বন্ধু হবে।'
এ বর্ণনায় এও আছে যে, হযরত ঈসা (আঃ)-এর ভবিষ্যদ্বাণী অনুযায়ী কেউ কেউ তার সাথে বারো বার কুফরী করে। অতঃপর তাদের তিনটি দল হয়ে যায়। (১) ইয়াকুবিয়্যাহ, (২) নাসতুরিয়াহ এবং (৩) মুসলমান। ইয়াকুবিয়্যাহ তো বলতে থাকে-“স্বয়ং আল্লাহ আমাদের মধ্যে অবস্থান করছিলেন। যতোদিন থাকার তাঁর ইচ্ছে ছিল ততোদিন ছিলেন। অতঃপর আকাশে উঠে গেছেন। নাসতুরিয়্যাহ বলে-‘আল্লাহর পুত্র আমাদের মধ্যে ছিলেন। তাঁকে কিছুকাল আমাদের মধ্যে রাখার পর তিনি তাঁকে নিজের নিকট উঠিয়ে নিয়েছেন। মুসলমানদের বিশ্বাস ছিল যে, আল্লাহর বান্দা ও রাসূল তাদের মধ্যে ছিলেন। যতোদিন রাখার ইচ্ছা ততোদিন তাদের মধ্যে রেখেছেন। অতঃপর নিজের নিকট উঠিয়ে নিয়েছেন।
পূর্ববর্তী দু’দলের প্রভাব খুব বেশী হয় এবং তারা তৃতীয় সত্য ও ভাল দলটিকে পিষ্ট ও দলিত করতে থাকে। সুতরাং তারা দুর্বল হয়ে পড়ে। অবশেষে আল্লাহ তা'আলা শেষ নবী হযরত মুহাম্মাদ (সঃ)-কে প্রেরণ করতঃ ইসলামকে জয়যুক্ত করেন। এর ইসনাদ সম্পূর্ণ সঠিক এবং সুনান-ই-নাসাঈতে হযরত আবু মুআবিয়া (রঃ) হতেও এটা বর্ণিত আছে। অনুরূপভাবে পূর্বযুগীয় বহু মনীষীরও এটা উক্তি রয়েছে। হযরত অহাব ইবনে মুনাব্বাহ (রঃ) বলেন যে, সে সময় শাহী সৈন্য ও ইয়াহূদীরা হযরত ঈসা (আঃ)-এর উপর আক্রমণ চালায় ও তাকে অবরোধ করে। সে সময় তাঁর সঙ্গে তাঁর সতেরোজন সহচর ছিলেন। ঐ লোকগুলো দরজা খুলে ভেতরে প্রবেশ করে দেখে যে সমস্ত লোকই হচ্ছে হযরত ঈসা (আঃ)-এর আকার বিশিষ্ট। ওরা তখন তাদেরকে বলেঃ ‘তোমাদের মধ্যে যিনি প্রকৃত ঈসা তাঁকে আমাদের হাতে সমর্পণ কর, নতুবা তোমাদের সকলকেই হত্যা করে ফেলবো।'
তখন হযরত ঈসা (আঃ) স্বীয় সহচরবৃন্দকে বলেনঃ “তোমাদের মধ্যে এমন কে আছে যে জান্নাতে আমার বন্ধু হতে ইচ্ছে করে এবং তার বিনিময়ে আমার স্থলে শূলে চড়া স্বীকার করে নেয়।” একথা শুনে একজন সাহাবী প্রস্তুত হয়ে যান এবং বলেনঃ “আমিই ঈসা।” সুতরাং ধর্মের শত্রুরা তাকে গ্রেফতার করতঃ হত্যা করে শূলে চড়িয়ে দেয় এবং প্রফুল্লচিত্তে বলে, “আমরা ঈসা (আঃ)-কে হত্যা করেছি।” অথচ প্রকৃতপক্ষে এরূপ হয়নি, বরং তারা প্রতারিত হয়েছে এবং আল্লাহ তা'আলা সেই সময় স্বীয় নবী (আঃ)-কে নিজের নিকট উঠিয়ে নিয়েছেন।
তাফসীর-ই-ইবনে জারীরে রয়েছে যে, যখন আল্লাহ তা'আলা হযরত ঈসা (আঃ)-এর অন্তরে এ বিশ্বাস জাগ্রত করেন যে, তাঁকে দুনিয়া হতে ফিরে আসতে হবে তখন সেটা তাঁর নিকট খুবই কঠিন ঠেকে এবং মৃত্যুর ভয়ে তিনি
অত্যন্ত ভীত হয়ে পড়েন। তাই তিনি স্বীয় সহচরগণকে জিয়াফত দান করেন। খানা তৈরী করেন এবং সকলকে বলে দেন-‘অজি রাতে তোমরা সবাই আমার বাড়ীতে অবশ্যই আসবে, তোমাদের সাথে আমার জরুরী কথা আছে।' তাঁর সহচরগণ উপস্থিত হলে তিনি স্বহস্তে তাদেরকে ভোজন করান। সমস্ত কাজ-কর্ম তিনি নিজেই করতে থাকেন। তাদের খাওয়া শেষ হলে তিনি স্বহস্তে তাঁদের হাত ধৌত করিয়ে দেন এবং নিজের কাপড় দিয়ে তাঁদের হাত মুছিয়ে দেন। এটা তাঁর সাহাবীদের নিকট ভাল মনে হয় না। তখন তিনি তাদেরকে বলেনঃ “আজকে যদি তোমাদের মধ্যে কেউ আমার কাজে বাধা দান করে তবে তার সাথে আমার কোনই সম্পর্ক নেই। আমিও তার নই এবং সেও আমার নয়।” একথা শুনে তারা নীরব হয়ে যান।
অতঃপর যখন তিনি ঐ সম্মানজনক কাজ হতে অবসর গ্রহণ করেন তখন সহচরগণকে সম্বোধন করে বলেনঃ “দেখ আমি তোমাদের মধ্যে সর্বাপেক্ষা সম্মানিত ব্যক্তি, তথাপি আমি স্বহস্তে তোমাদের খিদমত করেছি যেন তোমরা আমার এ সুন্নাতের অনুসারী হয়ে যাও। সাবধান! তোমাদের কেউ যেন নিজেকে স্বীয় মুসলমান ভাই হতে উত্তম মনে না করে। বরং বড়রা যেন ছোটদের সেবা করে যেমন স্বয়ং আমি তোমাদের খিদমত করলাম। যাক, তোমাদের সঙ্গে আমার বিশেষ এক কাজ ছিল যার জন্যে আমি তোমাদেরকে ডেকেছি। তা হচ্ছে এই যে, তোমরা আজ রাতে অত্যন্ত বিনয়ের সাথে আমার জন্যে প্রার্থনা কর যেন আমার প্রভু আমার মৃত্যুর সময় পিছিয়ে দেন।”
অতএব, তাঁরা প্রার্থনা করতে আরম্ভ করেন। কিন্তু বিনয় প্রকাশের সময়ের পূর্বেই তাদেরকে ঘুম এমনভাবে চেপে বসে যে, তাদের মুখ দিয়ে একটি শব্দ বের হওয়াও কঠিন হয়ে পড়ে। তিনি তাদেরকে জাগ্রত করতে থাকেন ও বলেনঃ “তোমাদের হলো কি যে এক রাতও তোমরা জেগে থাকতে পারছো
?” সকলেই তখন উত্তরে বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (আঃ)! আমরা নিজেরাই তো হতবুদ্ধি হয়ে পড়েছি যে, এটা হচ্ছে কি? এক রাতই নয়, বরং ক্রমাগত ক'রাত জেগে থাকারও আমাদের অভ্যাস আছে। কিন্তু আল্লাহ তাআলাই জানেন আজ আমাদেরকে ঘুম ঘিরে নেয়ার কারণ কি? প্রার্থনা ও আমাদের মধ্যে কোন কুদরতী’ বাধার সৃষ্টি হয়েছে।” তখন তিনি বলেনঃ “তাহলে রাখাল থাকবে না এবং ছাগলগুলো ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়বে।”
মোটকথা, তিনি ইশারা-ইঙ্গিতে স্বীয় অবস্থা প্রকাশ করতে থাকেন। তারপরে তিনি বলেনঃ “দেখ, তোমাদের মধ্যকার এক ব্যক্তি সকালে মোরগ ডাক দেয়ার পূর্বে আমার সাথে তিনবার কুফরী করবে এবং তোমাদের মধ্যে একটি লোক গুটিকয়েক রৌপ্যমুদ্রার বিনিময়ে আমাকে বিক্রি করতঃ আমার মূল্য ভক্ষণ করবে।” তখন এ লোকগুলো এখান থেকে বেরিয়ে পড়ে এদিক। ওদিক চলে যান। ইয়াহূদীরা তাদের অনুসন্ধানে লেগে ছিল। তারা শামউন নামে হযরত ঈসা (আঃ)-এর একজন সহচরকে চিনে নিয়ে ধরে ফেলে এবং বলে যে, এও তার একজন সঙ্গী। কিন্তু শামউন বলে-এটা ভুল কথা, আমি তাঁর সঙ্গী নই। তারা তার কথা বিশ্বাস করে তাকে ছেড়ে দেয়। কিছু দূরে এগিয়ে গিয়ে সে অন্য দলের হাতে ধরা পড়ে যায় এবং সেখানে ঐভাবেই অস্বীকার করে নিজেকে ছাড়িয়ে নেয়। এমন সময় মোরগ ডাক দেয়। তখন সে অনুতাপ করতে থাকে এবং অত্যন্ত চিন্তিত হয়ে পড়ে।
সকালে হযরত ঈসা (আঃ)-এর একজন সহচর ইয়াহুদীদের নিকটে গিয়ে বলেঃ “আমি যদি তোমাদেরকে হযরত ঈসা (আঃ)-এর ঠিকানা বলে দেই তবে তোমরা আমাকে কি দেবে?” তারা বলেঃ “ত্রিশটি রৌপ্যমুদ্রা দেবো।” সুতরাং সে সেই মুদ্রা গ্রহণ করে ও হযরত ঈসা (আঃ)-এর ঠিকানা তাদেরকে বলে দেয়। তখন তারা তাকে গ্রেফতার করে নেয় এবং রশি দ্বারা বেঁধে টানতে টানতে নিয়ে যায় ও বিদ্রুপ করে বলে-“আপনিতো মৃতকে জীবিত করতেন, জ্বিনদেরকে তাড়িয়ে দিতেন, পাগলকে ভাল করতেন। কিন্তু এখন ব্যাপার কি যে, নিজেকেই বাঁচাতে পারছেন না? রঞ্জুকেই ছিড়ে ফেলতে পারছেন না? ধিক আপনাকে।` এসব কথা বলতে বলতে যাচ্ছিল এবং তার দিকে কন্টক নিক্ষেপ করছিল। এরূপ নির্দয়ভাবে টেনে এনে যখন শূলের কাঠের নিকট নিয়ে আসে এবং শূলের উপর চড়িয়ে দেয়ার ইচ্ছে করে সে সময় আল্লাহ পাক স্বীয় নবী (আঃ)-কে নিজের কাছে উঠিয়ে নেন এবং তারা তারই আকারের সাদৃশ্যযুক্ত একজন লোককে শূলের উপর উঠিয়ে দেয়।
অতঃপর সাতদিন পরে হযরত মারইয়াম (আঃ) এবং যে স্ত্রীলোকটিকে হযরত ঈসা (আঃ) জ্বিন হতে রক্ষা করেছিলেন তথায় আগমন করেন ও ক্রন্দন করতে থাকেন। তখন হযরত ঈসা (আঃ) তথায় আগমন করতঃ বলেনঃ “আপনারা কাঁদছেন কেন? আমাকে তো আল্লাহ তা'আলা তাঁর নিকট উঠিয়ে নিয়েছেন এবং আমার নিকট তাদের কষ্ট পৌছেনি। বরং তাদেরকে সংশয়াবিষ্ট করা হয়েছে। আমার সহচরদেরকে সংবাদ দিন যে, তারা যেন অমুক স্থানে - আমার সাথে সাক্ষাৎ করে।” ঐ শুভ সংবাদ পেয়ে এ এগারজন লোক সবাই তথায় উপস্থিত হন। যে সহচর তাঁকে বিক্রি করেছিল, তাকে তথায় দেখতে পেলেন না। জিজ্ঞেস করে জানতে পারলেন যে, সে অত্যন্ত লজ্জিত ও অনুতপ্ত হয়ে আত্মহত্যা করেছে। তিনি বলেনঃ “যদি সে তাওবা করতো তবে আল্লাহ। তাআলা তার তাওবা কবূল করতেন।
অতঃপর তিনি তাদেরকে বলেনঃ “যে শিশুটি তোমাদের সঙ্গে রয়েছে, তার নাম ইয়াহ্ইয়া। সে এখন তোমাদের সঙ্গী। জেনে রেখো, সকালে তোমাদের ভাষা পরিবর্তন করে দেয়া হবে। প্রত্যেকেই স্ব-স্ব সম্প্রদায়ের ভাষা বলতে পারবে। সুতরাং তাদের উচিত যে তারা যেন স্ব-স্ব সম্প্রদায়ের নিকটে গিয়ে তাদের নিকট আমার দাওয়াত পৌছে দেয় এবং আল্লাহর ভয় প্রদর্শন করে। এ ঘটনাটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইবনে ইসহাক (রাঃ)-এর উক্তি এই যে, বানী ইসরাঈলের যে বাদশাহ হযরত ঈসা (আঃ)-কে হত্যা করার জন্যে স্বীয় সৈন্য বাহিনী প্রেরণ করেছিল তার নাম ছিল দাউদ। সে সময় হযরত ঈসা (আঃ) অত্যন্ত ভীত সন্ত্রস্ত ছিলেন। কোন ব্যক্তিই স্বীয় মৃত্যুতে এত বেশী উদ্বিগ্ন ও হা-হুতাশকারী নেই যে হা-হুতাশ তিনি সে সময় করেছিলেন। এমন কি তিনি বলেনঃ “হে আল্লাহ! কারও মাধ্যমে যদি আপনি আমার মৃত্যুকে সরিয়ে দেন তবে খুবই ভাল হয়।” তার এত ভয় হয় যে, ভয়ের কারণে তার শরীর দিয়ে রক্ত ফুটে বের হয়। সে সময় সে ঘরে তার সাথে তার বারোজন সাহায্যকারী ছিলেন। তাঁদের নাম নিম্নে দেয়া হলোঃ (১) ফারতুস, (২) ইয়াকুবাস, (৩) অয়লা ওয়ানাস (ইয়াকূবের ভাই), (৪) আনদ্রা ইয়াস, (৫) ফাইলাসা ইবনে ইয়ালামা, (৬) মুনতা, (৭) মাস, (৮) ইয়াকূব ইবনে হালকা, (৯) নাদ, (১০) আসীস, (১১) কাতাবিয়া এবং (১২) লাইউদাসরাক রিয়াইউতা। কেউ কেউ বলেন যে, তাঁরা ছিলেন তেরোজন। আর একজনের নাম ছিল সারজাস। তিনিই হযরত ঈসা (আঃ)-এর শুভ সংবাদের পরিপ্রেক্ষিতে তার স্থলে শূলবিদ্ধ হতে সম্মত হয়েছিলেন।
যখন হযরত ঈসা (আঃ)-কে আকাশে উঠিয়ে নেয়া হয় এবং অবশিষ্ট লোক ইয়াহূদীদের হাতে বন্দী হন তখন তাদেরকে গণনা করা হলে দেখা যায় যে, একজন কম হচ্ছেন। তখন তাদের মধ্যে মতবিরোধ দেখা দেয়। ঐদলটি যখন হযরত ঈসা (আঃ) ও তাঁর সহচরদের উপর আক্রমণ চালায় ও তাদেরকে গ্রেফতার করার ইচ্ছে করে তখন তারা হযরত ঈসা (আঃ)-কে চিনতে পারেনি। সে সময় লাইউদাসরাকরিয়াইউতা ইয়াহূদীদের নিকট হতে ত্রিশটি রৌপ্যমুদ্রা গ্রহণ করতঃ তাদেরকে বলেছিল, আমি সর্বপ্রথমে যাচ্ছি। গিয়ে যে লোকটিকে আমি চুম্বন দান করবো, তোমরা বুঝে নেবে, উনিই হযরত ঈসা (আঃ)।
অতঃপর যখন এ লোকটি ভেতরে প্রবেশ করে তখন আল্লাহ তা'আলা হযরত ঈসা (আঃ)-কে উঠিয়ে নিয়ে ছিলেন এবং হযরত সারজাসকে তার আকার বিশিষ্ট করে দেয়া হয়। ঐ লোকটি গিয়ে চুক্তি অনুযায়ী তাঁকেই চুম্বন দেয়। সুতরাং হযরত সারজাসকে গ্রেফতার করে নিয়ে যাওয়া হয়। এ পাপকার্য সাধনের পর সে বড়ই লজ্জিত ও অনুতপ্ত হয় এবং স্বীয় গলদেশে রশি লাগিয়ে ফাঁসির উপর ঝুলে যায়। এভাবে সে খ্রীষ্টানদের মধ্যে অভিশপ্ত হিসেবে পরিগণিত হয়। কেউ কেউ বলেন যে, তার নাম লাইউদাসরাকরিয়াইউতা। যখনই সে হযরত ঈসা (আঃ)-কে চিনিয়ে দেয়ার উদ্দেশ্যে ঐ ঘরে প্রবেশ করে তখনই হযরত ঈসা (আঃ)-কে উঠিয়ে নেয়া হয় এবং স্বয়ং তারই আকার হযরত ঈসা (আঃ)-এর মত হয়ে যায়। কাজেই লোকেরা তাকেই ধরে নেয়। সে বহুবার চীৎকার করে বলে- আমি হযরত ঈসা (আঃ) নই। আমি তো তোমাদের সঙ্গী। আমিইতো হযরত ঈসা (আঃ)-কে চিনিয়েছিলাম। কিন্তু তা শুনবে কে? শেষে তাকেই শূলে বিদ্ধ করা হয়। এখন আল্লাহ তা'আলাই জানেন যে, হযরত ঈসা (আঃ)-এর আকারের সহিত সাদৃশ্যযুক্ত শূলবিদ্ধ ব্যক্তি মুমিন সারজাস ছিলেন, না মুনাফিক সহচর লাইউদাসকরিয়াইউতা ছিল। হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, হযরত ঈসা (আঃ)-এর সাদৃশ্য যার উপর আনয়ন করা হয়েছিল তাকেই ইয়াহুদীরা শূলবিদ্ধ করেছিল এবং হযরত ঈসা (আঃ)-কে আল্লাহ তা'আলা জীবিত আকাশে উঠিয়ে নিয়েছিলেন। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, হযরত ঈসার আকারের সাদৃশ্য তাঁর সমস্ত সঙ্গীর উপরই আনয়ন করা হয়েছিল।
এরপর বর্ণনা করা হচ্ছে যে, হযরত ঈসা (আঃ)-এর মৃত্যুর পূর্বে সমস্ত আহলে কিতাব তার উপর বিশ্বাস স্থাপন করবে এবং কিয়ামতের দিন তিনি তাদের উপর সাক্ষী হবেন। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, এ আয়াতের তাফসীরে কয়েকটি উক্তি আছে। প্রথমতঃ এই যে, হযরত ঈসা (আঃ)-এর মৃত্যুর পূর্বে অর্থাৎ যখন তিনি দাজ্জালকে হত্যা করার জন্যে দ্বিতীয়বার ভূপৃষ্ঠে আগমন করবেন তখন সমস্ত মাযহাব উঠে যাবে। শুধুমাত্র ইসলাম ধর্ম অবশিষ্ট থাকবে, যা হচ্ছে প্রকৃতপক্ষে হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর সুদৃঢ় ধর্ম।
হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে (আরবী)-এর ভাবার্থ হযরত ঈসা (আঃ)-এর মৃত্যু। হযরত আবূ মালিক (রঃ) বলেন যে, যখন হযরত ঈসা (আঃ) অবতরণ করবেন তখন সমস্ত আহলে কিতাব তার উপর ঈমান আনয়ন করবে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর দ্বিতীয় বর্ণনায় রয়েছে যে, বিশেষ করে ইয়াহুদী একজনও অবশিষ্ট থাকবে না। হযরত হাসান বসরী (রঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছে নাজাসী এবং তাঁর সঙ্গী। তিনি আরও বলেন, আল্লাহর শপথ! হযরত ঈসা (আঃ) আল্লাহ তাআলার নিকট জীবিত বিদ্যমান রয়েছেন। যখন তিনি ভূ-পৃষ্ঠে অবতরণ করবেন তখন একজনও এমন আহলে কিতাব অবশিষ্ট থাকে না যে তার উপর বিশ্বাস স্থাপন করবে না। তাকে এ আয়াতের তাফসীর জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেনঃ “আল্লাহ তাআলা হযরত ঈসা (আঃ)-কে নিজের কাছে উঠিয়ে নিয়েছেন এবং কিয়ামতের পূর্বে তাঁকে পুনরায় পৃথিবীতে এ হিসেবে প্রেরণ করবেন যে, ভালমন্দ সবাই তার উপরে ঈমান আনয়ন করবে। হযরত কাতাদাহ (রঃ), হযরত আবদুর রহমান (রঃ) প্রমুখ মুফাসসিরগণের সিদ্ধান্ত এটা এবং এটাই সঠিক উক্তি। এ তাফসীর হচ্ছে সম্পূর্ণ সঠিক তাফসীর।
দ্বিতীয় উক্তি এই যে, প্রত্যেক আহলে কিতাব স্বীয় মৃত্যুর পূর্বে হযরত ঈসা (আঃ)-এর উপর বিশ্বাস স্থাপন করবে। কেননা, মৃত্যুর সময় সত্য ও মিথ্যা প্রত্যেকের উপর প্রকাশিত হয়ে যায়। তাই প্রত্যেক আহলে কিতাব এ নশ্বর জগত হতে 'বিদায় গ্রহণের সময় হযরত ঈসা (আঃ)-এর সত্যতা স্বীকার করবে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, কোন কিতাবী মারা যায় না যে পর্যন্ত না সে হযরত ঈসা (আঃ) -এর উপর ঈমান আনয়ন করে। হযরত মুজাহিদেরও (রাঃ) এটাই উক্তি। এমন কি হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে তা এতদূর পর্যন্ত বর্ণিত আছে যে, যদি কোন আহলে কিতাবের গর্দান তরবারী দ্বারা উড়িয়ে দেয়া হয় তথাপি তার আত্মা বের হয় না যে পর্যন্ত না সে হযরত ঈসা (আঃ)-এর উপর ঈমান আনে এবং এটা বলে দেয় যে, তিনি আল্লাহ তাআলার বান্দা ও তাঁর রাসূল। হযরত উবাই (রাঃ)-এর পঠনে (আরবী) রয়েছে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করা হয়ঃ মনে করুন কেউ হয়তো দেয়াল হতে পড়ে মারা গেল। তখন সে কি করে ঈমান আনতে পারে? তিনি উত্তরে বলেনঃ “সে ঐ মধ্যবর্তী দূরত্বের মধ্যেই ঈমান আনতে পারে।” ইকরামা (রঃ), মুহম্মদ ইবনে সীরিন (রঃ), যহ্হাক (রঃ), জুয়াইবির (রঃ) হতেও এটাই বর্ণিত আছে।
তৃতীয় উক্তি এই যে, আহলে কিতাবের মধ্যে কেউ এমন নেই যে, তার মৃত্যুর পূর্বে হযরত মুহম্মাদ (সঃ)-এর উপর বিশ্বাস স্থাপন করবে না। ইকরামা (রঃ) একথাই বলেন। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বলেনঃ এসব উক্তির মধ্যে অধিকতর সঠিক উক্তি হচ্ছে প্রথম উক্তিটিই। তা এই যে, কিয়ামতের নিকটবর্তী সময়ে হযরত ঈসা (আঃ) যখন আকাশ হতে অবতরণ করবেন, কোন আহলে কিতাবই ঐ সময় তাঁর উপর ঈমান আনা ছাড়া থাকবে না। প্রকৃতপক্ষে ইমাম ইবনে জারীর (রঃ)-এর এই উক্তিটিই সঠিকতম উক্তি। কেননা, এখানকার আয়াতগুলো দ্বারা স্পষ্টভাবে এটা প্রতীয়মান হচ্ছে যে, প্রকৃত উদ্দেশ্য হচ্ছে ইয়াহূদীদের “আমরা হযরত ঈসা (আঃ)-কে হত্যা করেছি ও শূলে দিয়েছি” এ দাবীর অসারতা প্রমাণিত করা।
সহীহ মুতাওয়াতির হাদীসসমূহে রয়েছে যে, হযরত ঈসা (আঃ) দাজ্জালকে হত্যা করবেন, ক্রুশকে ভেঙ্গে দেবেন, শূকরকে হত্যা করবেন এবং তিনি জিযিয়া কর গ্রহণ করবেন না। তিনি ঘোষণা করবেন- হয় তোমরা ইসলাম গ্রহণ কর, না হয় তরবারীর সম্মুখীন হও।' সুতরাং এ আয়াতে সংবাদ দেয়া হচ্ছে যে, সমস্ত আহলে কিতাব তাঁর হাতে ইসলাম গ্রহণ করবেন। একজনও এমন থাকবে না যে ইসলাম গ্রহণ হতে বিরত থাকবে বা কাউকে বিরত রাখবে। অতএব, যাকে এ পথভ্রষ্ট ইয়াহূদ ও নির্বোধ খ্রীষ্টানেরা মৃত মনে করে থাকে এবং বিশ্বাস রাখে যে, তাকে শূলবিদ্ধ করা হয়েছিল, তারা তাঁর প্রকৃত মৃত্যুর পূর্বেই তার প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করবে এবং যে কাজ তারা তার সামনে করেছে বা করবে, তিনি কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা'আলার সম্মুখে তার সাক্ষ্য প্রদান করবেন। অর্থাৎ তাকে আকাশে উঠিয়ে নেয়ার পূর্বের জীবনে তাদেরকে তিনি যেসব কাজ করতে দেখেছেন এবং দ্বিতীয়বার পৃথিবীতে অবতরণের পর সেই শেষ জীবনে তারা তাঁর সামনে যা কিছু করবে, কিয়ামতের দিন ঐ সমস্তই তাঁর চোখের সামনে ভেসে উঠবে এবং তিনি আল্লাহ পাকের সামনে ওগুলো পেশ করবেন। হ্যা, তবে এ আয়াতের তাফসীরে অন্য যে দু'টি উক্তি বর্ণিত হয়েছে, ঘটনা হিসেবে সে দু'টোও সম্পূর্ণ সত্য। মৃত্যুর ফেরেশতা এসে যাওয়ার পর আখেরাতের অবস্থা তার সামনে প্রকাশ হয়ে পড়ে। সে সময় প্রত্যেক ব্যক্তি সত্যকে সত্যরূপেই অনুধাবন করে থাকে। কিন্তু সে সময়ের ঈমান তার কোন উপকারে আসে না। এ সূরারই প্রথমদিকে রয়েছে (আরবী) অর্থাৎ “যারা অসৎ কাজ করতে থাকে, অবশেষে যখন তাদের কারও নিকট মৃত্যু উপস্থিত হয় তখন বলে-আমি এখন তাওবা করলাম, তার তাওবা গৃহীত হবে না।” (৪:১৮) আর এক জায়গায় আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “যখন তারা আমার শাস্তি অবলোকন করে তখন বলে—আমি এক আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করলাম।” (৪০:৮৪) তাদেরও সেই ঈমানে কোন উপকার হবে না।
অতএব এ দু'টি আয়াতকে সামনে রেখে আমরা বলি যে, ইমাম ইবনে জারীর শেষের উক্তি দু'টিকে যে খণ্ডন করেছেন, এটা তিনি ঠিক করেননি। তিনি যুক্তি দিয়ে বলেন যে, এ আয়াতের তাফসীরে যদি এ উক্তিদ্বয়কে সঠিক মেনে নেয়া হয় তবে সেই ইয়াহূদী বা খ্রীষ্টানদের আত্মীয়-স্বজন তার উত্তরাধিকারী না হওয়া অপরিহার্য হয়ে পড়ে। কেননা, সে তো তখন হযরত ঈসা (আঃ) ও হযরত মুহাম্মাদ (সঃ)-এর উপর ঈমান এনে মারা গেল, অথচ তার উত্তরাধিকারীগণ হচ্ছে ইয়াহুদী ও খ্রীষ্টান। আর মুসলমানের উত্তরাধিকারী কাফিরগণ হতে পারে না। কিন্তু আমরা বলি যে, এটা ঐ সময় প্রযোজ্য যখন সে এমন সময়ে ঈমান আনবে যে সময়ের ঈমান আল্লাহ তাআলার নিকট গৃহীত হয়। কিন্তু সে সময়ের ঈমান আনয়ন নয় যা একেবারে বৃথা যায়। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর উক্তির উপর গভীরভাবে চিন্তা করলে দেখা যায় যে, দেয়াল হতে পড়ে গিয়ে মৃত্যুবরণকারী, হিংস্র জন্তুর মুখে পড়ে মৃত্যু মুখে পতিত ব্যক্তি এবং তরবারির আঘাতে নিহত ব্যক্তিও বিশ্বাস স্থাপন করে থাকে।
আর এটা স্পষ্টকথা যে, এরূপ অবস্থায় ঈমান আনয়ন মোটেই কোন উপকারে আসতে পারে না, যেমন কুরআন কারীমে উপরোক্ত আয়াতদ্বয়ে এটাই প্রকাশ পাচ্ছে। আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন। আমার ধারণায় তো এ কথা খুব পরিষ্কার যে, এ আয়াতের তাফসীরের পরবর্তী উক্তিদ্বয়কেও বিশ্বাসযোগ্যরূপে মেনে নিতে কোনই অসুবিধে নেই। ও দু'টোও স্ব-স্ব স্থানে ঠিকই আছে। কিন্তু হ্যাঁ, আয়াতের প্রকাশ্য ভাবার্থতো সেটাই যা প্রথম উক্তি। তাহলে ভাবার্থ এই যে, হযরত ঈসা (আঃ) আকাশে বিদ্যমান রয়েছেন। কিয়ামতের নিকটবর্তী সময়ে তিনি পৃথবীতে অবতরণ করবেন এবং ইয়াহুদী ও খ্রীষ্টান উভয় জাতিকেই মিথ্যাবাদী বলে ঘোষণা করবেন। আর যে ইফরাত ও ‘তাফরীত’ (খুবই বাড়িয়ে দেয়াকে ‘ইফরাত' এবং খুবই নীচে নামিয়ে দেয়াকে ‘তাফরীত' বলে) তারা করেছিল তাকেও তিনি বাতিল বলবেন। একদিকে রয়েছে অভিশপ্ত ইয়াহুদী দল যারা তাঁকে তাঁর প্রকৃত মর্যাদা হতে বহু নীচে নামিয়ে দিয়েছিল এবং তাঁর সম্পর্কে এমন জঘন্য উক্তি করেছিল যে, যা শুনতে ভাল মানুষ ঘৃণাবোধ করেন। অপরদিকে ছিল খ্রীষ্টান জাতি, যারা তার মর্যাদা এত বেশী বাড়িয়ে দিয়েছিল যে, যা তাঁর মধ্যে ছিল না তাই তারা তাঁর মধ্যে আনয়ন করেছিল এবং তাঁকে নবুওয়াতের পর্যায় হতে প্রভুত্বের পর্যায়ে পৌছিয়ে দিয়েছিল। যা হতে মহান আল্লাহর সত্তা সম্পূর্ণরূপে পবিত্র।
এখন ঐ সব হাদীসের বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যেগুলোর মধ্যে রয়েছে যে, হযরত ঈসা (আঃ) শেষ যুগে কিয়ামতের পূর্বে আকাশ হতে পৃথিবীতে অবতরণ করবেন এবং অংশীবিহীন এক আল্লাহর ইবাদতের দিকে মানুষকে আহবান করবেন। ইমাম বুখারী (রঃ) স্বীয় হাদীস গ্রন্থ ‘সহীহের’ (আরবী)-এর মধ্যে এ হাদীসটি এনেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে আল্লাহর হাতে আমার প্রাণ রয়েছে, তার শপথ! অতিসত্বরই তোমাদের মধ্যে ইবনে মারইয়াম (আঃ) অবতীর্ণ হবেন। তিনি ন্যায়পরায়ণ শাসকরূপে ক্রুশকে ভেঙ্গে ফেলবেন, শূকরকে হত্যা করবেন এবং জিযিয়া কর উঠিয়ে দেবেন। সম্পদ এত বৃদ্ধি পাবে যে, তা গ্রহণ করতে কেউ সম্মত হবে না। একটি সিজদা করে নেয়া দুনিয়া ও দুনিয়ার সমুদয় জিনিস হতে প্রিয়তর হবে। অতঃপর হাদীসটির বর্ণনাকারী হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) বলেনঃ “তোমরা ইচ্ছে করলে। (আরবী)-এ আয়াতটি পাঠ কর। অর্থাৎ আহলে কিতাবের মধ্যে প্রত্যেকেই তার মৃত্যুর পূর্বে তার উপর (ঈসা আঃ -এর উপর) অবশ্যই বিশ্বাস স্থাপন করবে এবং সে কিয়ামতের দিন তাদের উপর সাক্ষী হবে। সহীহ মুসলিমেও এ হাদীসটি বর্ণিত আছে। অন্য সনদে এ বর্ণনাটি সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের মধ্যে রয়েছে, তাতে এও আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “সে সময় সিজদাহ শুধু বিশ্ব প্রভু আল্লাহর জন্যেই হবে। তারপর হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) বলেনঃ ‘তোমরা ইচ্ছে করলে পাঠ কর (আরবী) তাঁর মৃত্যুর পূর্বে অর্থাৎ হযরত ঈসা ইবনে মারইয়াম (আঃ)-এর মৃত্যুর পূর্বে। অতঃপর হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) তিনবার এর পুনরাবৃত্তি করেন।
মুসনাদ-ই-আহমাদের হাদীসে রয়েছে যে, হযরত ঈসা (আঃ) ‘ফাজ্জেরাওহা প্রান্তরে হজ্বের উপর বা উমরার উপর অথবা হজ্ব ও উমরা দু'টোর উপরই লাব্বায়েক বলবেন। এ হাদীসটি সহীহ মুসলিমেও রয়েছে। মুসনাদ-ই-আহমাদের অন্য হাদীসে রয়েছে যে, হযরত ইবনে মারইয়াম অবতরণ করবেন, শূকরকে হত্যা করবেন, ক্রুশকে নিশ্চিহ্ন করবেন, নামায জামাআতের সঙ্গে হবে এবং আল্লাহ তাআলার পথে সম্পদ এত বেশী প্রদান করা হবে যে, কোন গ্রহণকারী পাওয়া যাবে না। তিনি খাজনা ছেড়ে দেবেন, রওহায় গমন করবেন এবং তথা হতে হজ্ব বা উমরা পালন করবেন অথবা একই সাথে দুটোই করবেন।
অতঃপর হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) উপরোক্ত আয়াতটি পাট করেন। কিন্তু তার ছাত্র হযরত হানযালা (রঃ)-এর ধারণা এই যে, হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) বলেনঃ “হযরত ঈসা (আঃ)-এর ইন্তিকালের পূর্বে আহলে কিতাব তার উপর বিশ্বাস স্থাপন করবে।” হযরত হানযালা (রঃ) বলেনঃ “আমার জানা নেই যে, এগুলো হাদীসেরই শব্দ, না হযরত আবূ হুরাইরা (রাঃ)-এর নিজের কথা।” সহীহ বুখারীর মধ্যে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “ঐ সময় তোমাদের কি অবস্থা হবে যখন হযরত ঈসা (আঃ) তোমাদের মধ্যে অবতীর্ণ হবেন এবং তোমাদের ইমাম তোমাদের মধ্য হতেই হবে?”
সুনান-ই-আবি দাউদ, মুসনাদ-ই-আহমাদ প্রভৃতির মধ্যে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ নবীগণ (আঃ) সবাই বৈমাত্রেয় ভাই, তাদের মা বিভিন্ন বটে, কিন্তু ধর্ম একই। হযরত ঈসা (আঃ)-এর বেশী নিকটবর্তী আমিই। কেননা, তাঁর ও আমার মধ্যে কোন নবী নেই। তিনি অবতীর্ণ হবেন, তোমরা তাঁকে চিনে নাও। তিনি হবেন মধ্যম দেহ বিশিষ্ট ও শ্বেত রক্তিম বর্ণের। তিনি দুটি মিসরীয় কাপড় পরিহিত থাকবেন। তাঁর মস্তক হতে পানির ফোটা ঝরে ঝরে পড়বে যদিও পানিতে সিক্ত হবেন না। তিনি ক্রুশ ভেঙ্গে ফেলবেন, শূকরকে হত্যা করবেন, জিযিয়া কর গ্রহণ করবেন না এবং মানুষক
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।