আল কুরআন


সূরা আন-নিসা (আয়াত: 147)

সূরা আন-নিসা (আয়াত: 147)



হরকত ছাড়া:

ما يفعل الله بعذابكم إن شكرتم وآمنتم وكان الله شاكرا عليما ﴿١٤٧﴾




হরকত সহ:

مَا یَفْعَلُ اللّٰهُ بِعَذَابِکُمْ اِنْ شَکَرْتُمْ وَ اٰمَنْتُمْ ؕ وَ کَانَ اللّٰهُ شَاکِرًا عَلِیْمًا ﴿۱۴۷﴾




উচ্চারণ: মা- ইয়াফ‘আলুল্লা-হু বি‘আযা-বিকুম ইন শাকারতুম ওয়া আ-মানতুম ওয়া কা-নাল্লা-হু শা-কিরান ‘আলীমা-।




আল বায়ান: যদি তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর এবং ঈমান আন তাহলে তোমাদেরকে আযাব দিয়ে আল্লাহ কী করবেন? আল্লাহ পুরস্কার দানকারী, সর্বজ্ঞ।




আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ১৪৭. তোমরা যদি শোকর-গুজার হও(১) এবং ঈমান আন, তবে তোমাদের শাস্তি দিয়ে আল্লাহ কি করবেন? আর আল্লাহ (শোকরের) পুরস্কার দাতা সবজ্ঞ।




তাইসীরুল ক্বুরআন: তোমরা যদি শোকরগুজারি কর আর ঈমান আন তাহলে তোমাদেরকে শাস্তি দিয়ে আল্লাহ কী করবেন? আল্লাহ (সৎকাজের বড়ই) পুরস্কারদাতা, সর্ববিষয়ে জ্ঞাত।




আহসানুল বায়ান: (১৪৭) তোমরা যদি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর ও বিশ্বাস কর,[1] তাহলে আল্লাহ তোমাদেরকে শাস্তি দিয়ে কি করবেন? বস্তুতঃ আল্লাহ গুণগ্রাহী, সর্বজ্ঞ। [2]



মুজিবুর রহমান: আল্লাহ কেনইবা তোমাদেরকে শাস্তি প্রদান করবেন যদি তোমরা কৃতজ্ঞ হও ও বিশ্বাস স্থাপন কর? এবং আল্লাহতো অতিশয় গুণগ্রাহী, মহাজ্ঞানী।



ফযলুর রহমান: তোমরা যদি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করো ও ঈমানদার হও তাহলে আল্লাহ তোমাদেরকে শাস্তি দেবেন কেন? আল্লাহ তো পুরস্কারদাতা, মহাজ্ঞানী।



মুহিউদ্দিন খান: তোমাদের আযাব দিয়ে আল্লাহ কি করবেন যদি তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর এবং ঈমানের উপর প্রতিষ্ঠিত থাক! আর আল্লাহ হচ্ছেন সমুচিত মূল্যদানকারী সর্বজ্ঞ।



জহুরুল হক: আল্লাহ্ ভালোবাসেন না প্রকাশ্যে মন্দ বাক্যালাপ, তবে যাকে জুলুম করা হয়েছে সে ছাড়া। আর আল্লাহ্ হচ্ছেন সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞাতা।



Sahih International: What would Allah do with your punishment if you are grateful and believe? And ever is Allah Appreciative and Knowing.



তাফসীরে যাকারিয়া

অনুবাদ: ১৪৭. তোমরা যদি শোকর-গুজার হও(১) এবং ঈমান আন, তবে তোমাদের শাস্তি দিয়ে আল্লাহ কি করবেন? আর আল্লাহ (শোকরের) পুরস্কার দাতা সবজ্ঞ।


তাফসীর:

(১) আয়াতে শোকর শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। এর আসল অর্থ হচ্ছে নেয়ামতের স্বীকৃতি দেয়া ও কৃতজ্ঞতা স্বীকার করা এবং অনুগৃহীত হওয়া। এ ক্ষেত্রে আয়াতের অর্থ হচ্ছে, যদি তোমরা আল্লাহর প্রতি অকৃতজ্ঞ না হও এবং তার সাথে নিমকহারামী না কর; বরং যথার্থই তার প্রতি কৃতজ্ঞ ও শোকর আদায়কারী হও তাহলে আল্লাহ অনর্থক তোমাদের শাস্তি দেবেন না। মোটকথা: আল্লাহ তা'আলা ঈমানদার এবং শোকরগুজারকে শাস্তি দিবেন না। [তাবারী] কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, অনুগ্রহকারীর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের সঠিক পদ্ধতি কি? বস্তুতঃ হৃদয়ের সমগ্র অনুভূতি দিয়ে তার অনুগ্রহের স্বীকৃতি দেয়া, মুখে এ অনুভূতির স্বীকারোক্তি করা এবং কার্যকলাপের মাধ্যমে অনুগৃহীত হওয়ার প্রমাণ পেশ করাই হচ্ছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশের সঠিক উপায়।

এ তিনটি কাজের সমবেত রূপই হচ্ছে শোকর। এ শোকরের দাবী হচ্ছে প্রথমতঃ অনুগ্রহকে অনুগ্রহকারীর অবদান বলে স্বীকার করা। অনুগ্রহের স্বীকৃতি দেয়ার ক্ষেত্রে অনুগ্রহকারীর সাথে আর কাউকে অংশীদার না করা। দ্বিতীয়তঃ অনুগ্রহকারীর প্রতি ভালবাসা, বিশ্বস্ততা ও আনুগত্যের অনুভূতি নিজের হৃদয়ে ভরপুর থাকা এবং অনুগ্রহকারীর বিরোধীদের প্রতি এ প্রসঙ্গে বিন্দুমাত্র ভালবাসা, আন্তরিকতা, আনুগত্য ও বিশ্বস্ততার সম্পর্ক না থাকা। তৃতীয়তঃ অনুগ্রহকারীর আনুগত্য করা, তার হুকুম মেনে চলা, তার নেয়ামগুলোকে তার মর্জির বাইরে ব্যবহার না করা।


তাফসীরে আহসানুল বায়ান

অনুবাদ: (১৪৭) তোমরা যদি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর ও বিশ্বাস কর,[1] তাহলে আল্লাহ তোমাদেরকে শাস্তি দিয়ে কি করবেন? বস্তুতঃ আল্লাহ গুণগ্রাহী, সর্বজ্ঞ। [2]


তাফসীর:

[1] আল্লাহর কৃতজ্ঞতা করার অর্থ হল, তাঁর নির্দেশ অনুযায়ী অন্যায়-অনাচার থেকে বিরত থাকা এবং নেক আমলের প্রতি যত্ন নেওয়া। এটাই হল আল্লাহর নিয়ামতের কার্যতঃ কৃতজ্ঞতা। আর ঈমান (বিশ্বাস) বলতে আল্লাহর তাওহীদ (একত্ব), তাঁর রুবূবিয়্যাত (প্রতিপালকত্ব) এবং শেষ নবী মুহাম্মাদ (সাঃ)-এর রিসালাত এবং অন্যান্য দ্বীনী বিষয়ের উপর বিশ্বাস স্থাপন করা।

[2] অর্থাৎ, যে তাঁর (আল্লাহর) কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবে, তিনি তার মূল্যায়ন করবেন। যে অন্তর থেকে ঈমান আনবে, তিনি তাকে জেনে নেবেন এবং সেই অনুযায়ী তাকে উত্তম প্রতিদানও দেবেন।


তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ


তাফসীর: ১৪৪-১৪৭ নং আয়াতের তাফসীর:



এ আয়াতের শুরুতেই মহান আল্লাহ তা‘আলা মু’মিনদেরকে মু’মিন ছাড়া অন্য কাউকে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করতে নিষেধ করেছেন।



মু’মিন মু’মিন ছাড়া কাউকে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করবে না। এ সম্পর্কে সূরা বাকারাহ ও আলি ইমরানে আলোচনা করা হয়েছে। যদি মু’মিনরা আল্লাহ তা‘আলার এ আদেশ ভঙ্গ করে অন্য কোন বিধর্মীদের সাথে সম্পর্ক করে তাহলে মু’মিনদের নিজেদের বিরুদ্ধে আল্লাহ তা‘আলার দলীল কায়েম হয়ে যাবে, ফলে তিনি তাদেরকে শাস্তি দিতে পারেন।



তারপর সকল বিশ্বাসগত মুনাফিকদের ঠিকানার কথা বলছেন, তারা জাহান্নামের অতল তলে থাকবে। তবে যারা নিফাকী বর্জন করে তাওবাহ করে নিজেদেরকে সংশোধন করে নিয়েছে, আল্লাহ তা‘আলাকে দৃঢ়ভাবে ধারণ করেছে এবং আমল সংশোধন করে নিয়েছে তারা মু’মিনদের অন্তর্ভুক্ত। আল্লাহ তা‘আলা তাদেরকে মহা প্রতিদান দেবেন।



অতঃপর আল্লাহ তা‘আলা বান্দার প্রতি নিজের দয়া ও সহানুভূতি প্রকাশ করে বলছেন, তিনি তোমাদেরকে শাস্তি দিয়ে কী করবেন যদি তোমরা ঈমান আন ও শুকরিয়া আদায় কর। অর্থাৎ আল্লাহ তা‘আলা চান না কোন বান্দাকে জাহান্নামে দিতে। কিন্তু বান্দারাই নিজেদের কর্মের কারণে জাহান্নামে যাবে।



যে ব্যক্তির মাঝে চারটি জিনিস আছে সে চারটি জিনিস তার উপকারে আসবে। চারটি জিনিস হল: শুকরিয়া আদায় করা, ঈমান আনা, দু’আ করা, ক্ষমা প্রার্থনা করা। আর তিনটি জিনিস কোন ব্যক্তির মাঝে থাকলে সে তিনটি জিনিস তার ক্ষতির কারণ হবে। তিনটি জিনিস হল: চক্রান্ত করা, ফাসাদ সৃষ্টি করা এবং অঙ্গীকার ভঙ্গ করা। (তাফসীর কুরতুবী ৫/৩২১)



আয়াত থেকে শিক্ষণীয় বিষয়:

১. মু’মিন ব্যতীত অন্যদের বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করা হারাম।

২. কাফিরদের আচার-আচরণ, বেশ-ভূষা ও সংস্কৃতি গ্রহণ করা বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করার নামান্তর।

৩. তাওবাহ পূর্বের সকল অপরাধ ক্ষমা করে দেয়।

৪. আল্লাহ তা‘আলার ন্যায়পরায়ণতা জানতে পারলাম যে, তিনি কারো বিরুদ্ধে দলীল প্রমাণিত না হলে শাস্তি দেবেন না।

৫. আল্লাহ তা‘আলার দয়ার প্রশস্ততার কথা জানতে পারলাম।


তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)


তাফসীর: ১৪৪-১৪৭ নং আয়াতের তাফসীর:

কাফিরদের সাথে বন্ধুত্ব স্থাপন করতে, তাদের প্রতি আন্তরিক ভালবাসা রাখতে, তাদের সাথে সর্বদা উঠাবসা করতে, মুসলমানদের গুপ্তকথা তাদের নিকট প্রকাশ করতে এবং তাদের সাথে গোপন সম্পর্ক বজায় রাখতে আল্লাহ তা'আলা মুসলমানদেরকে নিষেধ করছেন। অন্য আয়াতে আছে (আরবী) অর্থাৎ 'মুমিনগণ যেন মুমিনদেরকে ছেড়ে কাফিরদেরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ না করে, আর যে ব্যক্তি এরূপ করে সে আল্লাহ তা'আলার নিকট কোন মঙ্গলের অধিকারী নয়। হঁ্যা, তবে যদি আত্মরক্ষার জন্যে বাহ্যিক ভালবাসা রাখ সেটা অন্য কথা এবং আল্লাহ তোমাদেরকে নিজ হতে ভয় প্রদর্শন করছেন।' (৩:২৮) অর্থাৎ তোমরা যদি তাঁর অবাধ্য হও তবে তোমাদের তাঁর হতে ভীত হওয়া উচিত। মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিমে' হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেনঃ কুরআন কারীমের মধ্যে যেখানেই এরূপ ইবাদতের মধ্যে (আরবী) শব্দ রয়েছে তথায় তার ভাবার্থ হচ্ছে দলীল। অর্থাৎ তোমরা যদি মুমিনদেরকে ছেড়ে কাফিরদেরকে তোমাদের অন্তরঙ্গ বন্ধু হিসেবে গ্রহণ কর তবে তোমাদের ঐ কাজ তোমাদের উপর ঐ বিষয়ের দলীল হয়ে যাবে যে আল্লাহ তা'আলা তোমাদেরকে শাস্তি প্রদান করবেন। পূর্বযুগীয় কয়েকজন মুফাসৃসির এ আয়াতের এ তাফসীরই করেছেন।

এরপর আল্লাহ তা'আলা মুনাফিকদের পরিণাম বর্ণনা করেছেন যে, তারা তাদের কঠিন কুফরীর কারণে জাহান্নামের একেবারে নিম্নস্তরে প্রবেশ করবে। (আরবী) শব্দটি হচ্ছে (আরবী) শব্দের বিপরীত। জান্নাতের দরজা রয়েছে একটির উপর আরেকটি। পক্ষান্তরে জাহান্নামের দারক’ রয়েছে একটির নীচে অপরটি। হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) বলেন যে, মুনাফিকদেরকে আগুনের বাক্সে পুরে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে এবং তারা ওর মধ্যে জ্বলতে পুড়তে থাকবে। হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেন যে, এ বাক্সটি হবে লোহার, যাতে আগুন দেয়া মাত্রই আগুন হয়ে যাবে এবং তার চার দিক সম্পূর্ণরূপে বন্ধ থাকবে। কেউ এমন হবে না যে তাকে কোন প্রকারের সাহায্য করতে পারে বা তাকে জাহান্নাম হতে বের করতে পারে অথবা শাস্তি কিছু কম করাতে পারে। তবে হ্যা, তাদের মধ্যে যারা তাওবা করবে, লজ্জিত হবে এবং ঐ পাপের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করবে, অতঃপর সংশোধিত হয়ে যাবে, একমাত্র আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে সকার্য সম্পাদন করবে, রিয়াকে আন্তরিকতার সাথে পরিহার করবে এবং আল্লাহ তা'আলার দ্বীনকে দৃঢ়রূপে ধারণ করবে, তিনি তাদের তাওবা কবুল করবেন, তাদেরকে খাঁটি মুমিনদের অন্তর্ভুক্ত করবেন এবং উত্তম পুণ্যের অধিকারী করবেন। মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিমে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমরা তোমাদের দ্বীনকে খাটি কর তবে অল্প আমলই তোমাদের জন্যে যথেষ্ট হবে।

এরপর ইরশাদ হচ্ছে-‘আল্লাহ তা'আলা হচ্ছেন বেনিয়ায, তিনি বান্দাদেরকে শাস্তি দিতে চান না। হ্যাঁ, তবে যদি সে সম্পূর্ণ নির্ভয়ে পাপ কার্য করতে থাকে তবে অবশ্যই শাস্তি প্রাপ্ত হবে। তাই আল্লাহ তা'আলা বলেন-“যদি তোমরা তোমাদের আমল সুন্দর করে নাও এবং আল্লাহর উপর ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর উপর অন্তরের সাথে বিশ্বাস স্থাপন কর তবে কোন কারণ নেই যে, আল্লাহ তা'আলা তোমাদেরকে শাস্তি প্রদান করবেন। তিনিতো ছোট ছোট পুণ্যের বেশ মর্যাদা দিয়ে থাকেন। যে তার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে তিনি তাকে সম্মান দিয়ে থাকেন। তিনি পূর্ণ ও সঠিক জ্ঞানের অধিকারী। কার আমল যে খাটি ও গ্রহণযোগ্য তা তিনি ভালই জানেন। কার অন্তরে যে দৃঢ় বিশ্বাস রয়েছে এবং কার অন্তর যে ঈমান শূন্য তিনি সেটাও জানেন। সুতরাং তিনি তাদেরকে পূর্ণ প্রতিদান প্রদান করবেন।





সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।