সূরা মুহাম্মাদ (আয়াত: 4)
হরকত ছাড়া:
فإذا لقيتم الذين كفروا فضرب الرقاب حتى إذا أثخنتموهم فشدوا الوثاق فإما منا بعد وإما فداء حتى تضع الحرب أوزارها ذلك ولو يشاء الله لانتصر منهم ولكن ليبلو بعضكم ببعض والذين قتلوا في سبيل الله فلن يضل أعمالهم ﴿٤﴾
হরকত সহ:
فَاِذَا لَقِیْتُمُ الَّذِیْنَ کَفَرُوْا فَضَرْبَ الرِّقَابِ ؕ حَتّٰۤی اِذَاۤ اَثْخَنْتُمُوْهُمْ فَشُدُّوا الْوَثَاقَ ٭ۙ فَاِمَّا مَنًّۢا بَعْدُ وَ اِمَّا فِدَآءً حَتّٰی تَضَعَ الْحَرْبُ اَوْزَارَهَا ۬ۚ۟ۛ ذٰؔلِکَ ؕۛ وَ لَوْ یَشَآءُ اللّٰهُ لَانْتَصَرَ مِنْهُمْ وَ لٰکِنْ لِّیَبْلُوَا۠ بَعْضَکُمْ بِبَعْضٍ ؕ وَ الَّذِیْنَ قُتِلُوْا فِیْ سَبِیْلِ اللّٰهِ فَلَنْ یُّضِلَّ اَعْمَالَهُمْ ﴿۴﴾
উচ্চারণ: ফাইযা-লাকীতুমুল্লাযীনা কাফারূফাদারবার রিকা-ব হাত্তাইযা আছখানতুমূহুম ফাশুদ্দুল ওয়াছা-কা ফাইম্মা-মান্নাম বা‘দুওয়াইম্মা-ফিদাআন হাত্তা-তাদা‘আল হারবুআওযা-রাহা-যা-লিকা ওয়ালাও ইয়াশাউল্লা-হু লানতাসারা মিনহুম ওয়ালা-কিল লিইয়াবলুওয়া বা‘দাকুম ব্বিা‘দিওঁ ওয়াল্লাযীনা কুতিলূফী ছাবীলিল্লা-হি ফালাইঁ ইউদিল্লা আ‘মা-লাহুম।
আল বায়ান: অতএব তোমরা যখন কাফিরদের সাথে যুদ্ধে অবতীর্ণ হও, তখন তাদের ঘাড়ে আঘাত কর। পরিশেষে তোমরা যখন তাদেরকে সম্পূর্ণভাবে পর্যুদস্ত করবে তখন তাদেরকে শক্তভাবে বেঁধে নাও। তারপর হয় অনুগ্রহ না হয় মুক্তিপণ আদায়, যতক্ষণ না যুদ্ধ তার বোঝা রেখে দেয়*। এটাই বিধান। আর আল্লাহ ইচ্ছা করলে তাদের কাছ থেকে প্রতিশোধ গ্রহণ করতে পারতেন, কিন্তু তিনি তোমাদের একজনকে অন্যের দ্বারা পরীক্ষা করতে চান। আর যারা আল্লাহর পথে নিহত হয় তিনি কখনো তাদের আমলসমূহ বিনষ্ট করবেন না।
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৪. অতএব যখন তোমরা কাফিরদের সাথে মুকাবিলা কর তখন ঘাড়ে আঘাত কর, অবশেষে যখন তোমরা তাদেরকে সম্পূর্ণরূপে পর্যুদস্ত করবে তখন তাদেরকে মজবুতভাবে বাঁধ; তারপর হয় অনুকম্প, নয় মুক্তিপণ। যতক্ষণ না যুদ্ধ এর ভার (অস্ত্র) নামিয়ে না ফেলে। এরূপই, আর আল্লাহ ইচ্ছে করলে তাদের থেকে প্রতিশোধ নিতে পারতেন, কিন্তু তিনি চান তোমাদের একজনকে অন্যের দ্বারা পরীক্ষা করতে। আর যারা আল্লাহর পথে নিহত হয় তিনি কখনো তাদের আমলসমূহ বিনষ্ট হতে দেন না।
তাইসীরুল ক্বুরআন: অতঃপর যখন তোমরা কাফিরদের সঙ্গে যুদ্ধে অবতীর্ণ হও, তখন তাদের ঘাড়ে আঘাত হানো, অবশেষে যখন তাদেরকে পূর্ণরূপে পরাস্ত কর, তখন তাদেরকে শক্তভাবে বেঁধে ফেল। অতঃপর হয় তাদের প্রতি অনুগ্রহ কর, না হয় তাদের থেকে মুক্তিপণ গ্রহণ কর। তোমরা যুদ্ধ চালিয়ে যাবে, যে পর্যন্ত না শত্রুপক্ষ অস্ত্র সমর্পণ করে। এ নির্দেশই তোমাদেরকে দেয়া হল। আল্লাহ ইচ্ছে করলে (নিজেই) তাদের থেকে প্রতিশোধ নিতে পারতেন। কিন্তু তিনি তোমাদের একজনকে অন্যের দ্বারা পরীক্ষা করতে চান (এজন্য তোমাদেরকে যুদ্ধ করার সুযোগ দেন)। যারা আল্লাহর পথে শহীদ হয় তিনি তাদের কর্মফল কক্ষনো বিনষ্ট করবেন না।
আহসানুল বায়ান: (৪) অতএব যখন তোমরা অবিশ্বাসীদের সাথে যুদ্ধে মোকাবিলা কর, তখন তাদের গর্দানে আঘাত কর,[1] পরিশেষে যখন তোমরা তাদেরকে সম্পূর্ণরূপে পরাভূত করবে, তখন তাদেরকে কষে বাঁধবে; [2] অতঃপর হয় অনুগ্রহ, না হয় মুক্তিপণ;[3] যে পর্যন্ত না যুদ্ধ তার অস্ত্ররাজি নামিয়ে ফেলে।[4] এটাই বিধান।[5] আর আল্লাহ ইচ্ছা করলে তাদের নিকট হতে প্রতিশোধ নিতে পারতেন,[6] কিন্তু তিনি চান তোমাদের কিছুকে অপরদের দ্বারা পরীক্ষা করতে।[7] যারা আল্লাহর পথে নিহত হয়, তিনি কখনই তাদের কর্ম বিনষ্ট করবেন না। [8]
মুজিবুর রহমান: অতএব যখন তোমরা কাফিরদের সাথে যুদ্ধে মুকাবিলা কর তখন তাদের গর্দানে আঘাত কর, পরিশেষে যখন তোমরা তাদেরকে সম্পূর্ণ রূপে পরাভূত করবে তখন তাদেরকে কষে বাঁধবে; অতঃপর হয় অনুকম্পা, না হয় মুক্তিপণ। তোমরা জিহাদ চালাবে যতক্ষণ না ওরা অস্ত্র নামিয়ে ফেলে। এটাই বিধান। এটা এ জন্য যে, আল্লাহ ইচ্ছা করলে তাদেরকে শাস্তি দিতে পারতেন, কিন্তু তিনি চান তোমাদেরকে অপরদের দ্বারা পরীক্ষা করতে। যারা আল্লাহর পথে নিহত হয় তিনি কখনও তাদের আমল বিনষ্ট হতে দেননা।
ফযলুর রহমান: অতএব, কাফেরদের সাথে যখন (যুদ্ধের ময়দানে) তোমাদের মোকাবেলা হবে তখন তাদের শিরশ্ছেদ করবে। অবশেষে যখন তোমরা তাদের (অনেকের) রক্তপাত ঘটাবে তখন (অবশিষ্টদেরকে) কষে বাঁধবে (বন্দী করবে)। তারপর হয় অনুকম্পা, না হয় মুক্তিপণ। (অর্থাৎ তাদেরকে হয় অনুকম্পা দেখিয়ে ছেড়ে দেবে, না হয় মুক্তিপণের বিনিময়ে মুক্তি দেবে।) (তবে তোমরা তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ অব্যাহত রাখবে) যতক্ষণ না যুদ্ধ তার বোঝা নামিয়ে রাখে (শত্রু তার অস্ত্র সমর্পণ করে)। এটাই (আল্লাহর নির্দেশ)। আল্লাহ চাইলে তাদের থেকে প্রতিশোধ নিতে পারতেন (তাদেরকে শাস্তি দিতে পারতেন), কিন্তু তিনি চান তোমাদের কতককে কতকের দ্বারা পরীক্ষা করতে। তবে যারা আল্লাহর পথে নিহত (শহীদ) হয়, তাদের কর্ম তিনি কিছুতেই নষ্ট করবেন না।
মুহিউদ্দিন খান: অতঃপর যখন তোমরা কাফেরদের সাথে যুদ্ধে অবতীর্ণ হও, তখন তাদের গর্দার মার, অবশেষে যখন তাদেরকে পূর্ণরূপে পরাভূত কর তখন তাদেরকে শক্ত করে বেধে ফেল। অতঃপর হয় তাদের প্রতি অনুগ্রহ কর, না হয় তাদের নিকট হতে মুক্তিপণ লও। তোমরা যুদ্ধ চালিয়ে যাবে যে পর্যন্ত না শত্রুপক্ষ অস্ত্র সমর্পণ করবে! একথা শুনলে। আল্লাহ ইচ্ছা করলে তাদের কাছ থেকে প্রতিশোধ নিতে পারতেন। কিন্তু তিনি তোমাদের কতককে কতকের দ্বারা পরীক্ষা করতে চান। যারা আল্লাহর পথে শহীদ হয়, আল্লাহ কখনই তাদের কর্ম বিনষ্ট করবেন না।
জহুরুল হক: সেজন্য যারা অবিশ্বাস পোষণ করে তাদের সাথে যখন তোমরা মোকাবিলা কর তখন গর্দান মারা, পরিশেষে যখন তোমরা তাদের পরাজিত করবে তখন মজবুত করে বাঁধবে, তখন এরপরে হয় সদয়ভাবে মুক্তিদান, না হয় মুক্তিপণ গ্রহণ -- যতক্ষণ না যুদ্ধ তার অস্ত্রভার নামিয়ে দেয়, এমনটাই। আর আল্লাহ্ যদি চাইতেন তাহলে তিনিই তাদের থেকে প্রতিশোধ গ্রহণ করতে পারতেন, কিন্ত এইজন্য যে তোমাদের কারোকে যেন অপরের দ্বারা তিনি সুনিয়ন্ত্রিত করতে পারেন। আর যাদের আল্লাহ্র পথে শহীদ করা হয় তাদের ক্রিয়াকর্মকে তিনি কখনো লক্ষ্যহারা হতে দেবেন না।
Sahih International: So when you meet those who disbelieve [in battle], strike [their] necks until, when you have inflicted slaughter upon them, then secure their bonds, and either [confer] favor afterwards or ransom [them] until the war lays down its burdens. That [is the command]. And if Allah had willed, He could have taken vengeance upon them [Himself], but [He ordered armed struggle] to test some of you by means of others. And those who are killed in the cause of Allah - never will He waste their deeds.
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ৪. অতএব যখন তোমরা কাফিরদের সাথে মুকাবিলা কর তখন ঘাড়ে আঘাত কর, অবশেষে যখন তোমরা তাদেরকে সম্পূর্ণরূপে পর্যুদস্ত করবে তখন তাদেরকে মজবুতভাবে বাঁধ; তারপর হয় অনুকম্প, নয় মুক্তিপণ। যতক্ষণ না যুদ্ধ এর ভার (অস্ত্র) নামিয়ে না ফেলে। এরূপই, আর আল্লাহ ইচ্ছে করলে তাদের থেকে প্রতিশোধ নিতে পারতেন, কিন্তু তিনি চান তোমাদের একজনকে অন্যের দ্বারা পরীক্ষা করতে। আর যারা আল্লাহর পথে নিহত হয় তিনি কখনো তাদের আমলসমূহ বিনষ্ট হতে দেন না।
তাফসীর:
-
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (৪) অতএব যখন তোমরা অবিশ্বাসীদের সাথে যুদ্ধে মোকাবিলা কর, তখন তাদের গর্দানে আঘাত কর,[1] পরিশেষে যখন তোমরা তাদেরকে সম্পূর্ণরূপে পরাভূত করবে, তখন তাদেরকে কষে বাঁধবে; [2] অতঃপর হয় অনুগ্রহ, না হয় মুক্তিপণ;[3] যে পর্যন্ত না যুদ্ধ তার অস্ত্ররাজি নামিয়ে ফেলে।[4] এটাই বিধান।[5] আর আল্লাহ ইচ্ছা করলে তাদের নিকট হতে প্রতিশোধ নিতে পারতেন,[6] কিন্তু তিনি চান তোমাদের কিছুকে অপরদের দ্বারা পরীক্ষা করতে।[7] যারা আল্লাহর পথে নিহত হয়, তিনি কখনই তাদের কর্ম বিনষ্ট করবেন না। [8]
তাফসীর:
[1] উভয় দলের কথা উল্লেখ করার পর এখন কাফের এবং যে কিতাবধারীদের সাথে কোন চুক্তি হয়নি, তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে। হত্যার পরিবর্তে গর্দান কাটার নির্দেশ দেওয়ার মধ্যে রয়েছে কাফেরদের সাথে চরম কঠোরতা প্রদর্শনের নির্দেশ। (ফাতহুল ক্বাদীর)
[2] অর্থাৎ, তুমুল যুদ্ধ এবং তাদেরকে অধিকহারে হত্যা করার পর তাদের মধ্যে যারা তোমাদের হাতে ধরা পড়বে, তাদেরকে বন্দী করে শক্তভাবে বেঁধে রাখ। যাতে তারা পালাতে না পারে।
[3] مَنٌّ এর অর্থ হল, কোন বিনিময় না নিয়ে কেবল অনুগ্রহ করে ছেড়ে দেওয়া। আর فِدَاء এর অর্থ হল, কিছু মুক্তিপণ নিয়ে ছেড়ে দেওয়া। যুদ্ধবন্দীদের ব্যপারে এই স্বাধীনতা বা এখতিয়ার দেওয়া হয়েছে যে, পরিস্থিতি ও অবস্থা অনুপাতে যেটাই ইসলাম ও মুসলিমদের জন্য সর্বাধিক উত্তম হবে, সেটাই অবলম্বন করা যাবে।
[4] অর্থাৎ কাফেরদের সাথে যুদ্ধের পরিসমাপ্তি ঘটে। অথবা এর অর্থ এই যে, যুদ্ধরত শত্রু পরাস্ত হয়ে কিংবা সন্ধির আশ্রয় নিয়ে অস্ত্র রেখে দেয় অথবা ইসলাম বিজয়ী হয় এবং কুফরীর সমাপ্তি ঘটে। উদ্দেশ্য হল, এই ধরনের পরিস্থিতি সৃষ্টি না হওয়া অবধি কাফেরদের সাথে তোমাদের যুদ্ধ চলতেই থাকবে। তোমরা তাদেরকে হত্যা করবে এবং যুদ্ধবন্দীদের ক্ষেত্রে উক্ত দু’টি সিদ্ধান্তই (মুক্তিপণ নিয়ে বা না নিয়ে ছেড়ে দেওয়া) তোমাদের এখতিয়ারাধীন থাকবে। কেউ বলেছেন, এই আয়াতটি রহিত হয়ে গেছে; বিধায় এখন হত্যা ব্যতীত আর কিছুই অবশিষ্ট নেই। তবে সঠিক কথা এই যে, আয়াতটি রহিত নয়, বরং অব্যাহত। সুতরাং শাসকের চারটি জিনিসের এখতিয়ার আছেঃ কাফেরদের হত্যা করবে, না হয় বন্দী। বন্দীদের মধ্যে কাউকে অথবা সবাইকে হয় অনুগ্রহ করে ছেড়ে দেবে, না হয় মুক্তিপণ নিয়ে ছাড়বে। (ফাতহুল ক্বাদীর)
[5] কিংবা তোমরা এ রকমই করো। افْعَلُوْا ذَلِكَ বা ذَلِكَ حُكْمُ الْكُفَّار
[6] কাফেরদেরকে বিনাশ করে কিংবা শাস্তি দিয়ে। অর্থাৎ, তোমাদের তাদের সাথে যুদ্ধ করার কোন প্রয়োজনই পড়ত না।
[7] অর্থাৎ, তোমাদেরকে একে অপরের মাধ্যমে পরীক্ষা করতে। যাতে তিনি জেনে নেন যে, তোমাদের মধ্যে তাঁর পথে মুজাহিদ কারা? যাতে তিনি তাদেরকে প্রতিদান দেন এবং কাফেরদেরকে তাদের হাতে পরাস্ত করেন।
[8] অর্থাৎ, তাদের পুণ্য ও পুরস্কার বিনষ্ট করবেন না।
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ৪-৯ নম্বর আয়াতের তাফসীর :
পূর্বের আয়াতগুলোতে মু’মিন ও কাফির উভয় দলের পরিচয় ও পরিণতি আলোচনার পর কাফির এবং যে সকল আহলে কিতাবীদের সাথে কোন চুক্তি হয়নি তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার নির্দেশ দিয়েছেন, সে সাথে শত্র“দের দ্রুত পরাভূত করার কৌশল শিক্ষা দিয়ে বলছেন : যখনই কাফিরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে প্রথমেই তাদের গর্দানে আঘাত করবে। তাহলে সহজেই তারা পরাভূত হবে।
অর্থাৎ যখন শত্র“দের অধিকাংশদেরকে হত্যা করে ফেলবে এবং তাদের শক্তি হ্রাস পেয়ে যাবে তখন অবশিষ্ট বন্দীদেরকে শক্ত করে বাঁধবে যাতে তারা পালাতে না পারে। অতঃপর যখন যুদ্ধ থেমে যাবে, আর তোমরা চিন্তামুক্ত হয়ে যাবে তখন বন্দিদের ব্যাপারে তোমরা স্বাধীন, ইচ্ছা করলে বন্দিদেরকে অনুগ্রহ করে বিনা মুক্তিপণে ছেড়ে দেবে, অথবা মুক্তিপণ নিয়ে অথবা হত্যা করবে যতক্ষণ না তারা যুদ্ধ থেকে বিরত থাকে। যদিও এখানে মুক্তিপণের কথা বলা হয়েছে কিন্তু অন্যান্য আয়াতে কাফিরদের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক জিহাদ চালিয়ে যাওয়ার নির্দেশ এসেছে। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন :
(مَا كَانَ لِنَبِيٍّ أَنْ يَّكُوْنَ لَه۫ٓ أَسْرٰي حَتّٰي يُثْخِنَ فِي الْأَرْضِ)
“জমিনে ব্যাপকভাবে শত্র“কে পরাভূত না করা পর্যন্ত বন্দী রাখা কোন নাবীর জন্য সঙ্গত নয়।” (সূরা আনফাল ৮ : ৬৭) আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন :
(فَاضْرِبُوْا فَوْقَ الْأَعْنَاقِ وَاضْرِبُوْا مِنْهُمْ كُلَّ بَنَانٍ)
“সুতরাং তোমরা আঘাত কর তাদের স্কন্ধে ও আঘাত কর তাদের প্রত্যেক আঙ্গুলের অগ্রভাগে। ” (সূরা আনফাল ৮ : ১৬)
এ দুয়ের মাঝে সমন্বয় করতে গিয়ে আলেম সমাজ অনেক কথা বলেছেন। কেউ বলেছেন, আয়াতটি রহিত হয়ে গেছে, কেউ বলেছেন এ আয়াতটি বন্দি করা নিষিদ্ধ সম্বলিত আয়াতগুলোকে রহিত করে দিয়েছে ইত্যাদি। ইমাম কুরতুবী (রহঃ) এ ব্যাপারে পাঁচটি মত ব্যক্ত করেছেন, তার মধ্যে উত্তম হল : আয়াতটি রহিত হয়নি বরং মুহকাম তথা কার্যকর রয়েছে। মুসলিম রাষ্ট্রপ্রধানের স্বাধীনতা রয়েছে- ইচ্ছা করলে বন্দী করে রাখতে পারে, ইচ্ছা করলে কোন মুক্তিপণ না নিয়ে ছেড়ে দিতে পারে আবার ইচ্ছা করলে মুক্তিপণ নিয়ে ছেড়ে দিতে পারে। যেমন নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বদরের দিন উকবা বিন আবূ মুঈতকে বেঁধে হত্যা করেছিলেন, নযর বিন হারেসকে হত্যা করেছিলেন ও অন্য সকল বন্দিদেরকে মুক্তিপণ নিয়ে ছেড়ে দিয়েছেন। সুমামাহ বিন আসালকে বিনা মুক্তিপণে ছেড়ে দিয়েছেন, হাওয়াজেন গোত্রের লোককে ছেড়ে দিয়েছেন। এ সব সহীহ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত (কুরতুবী)।
(وَلَوْ يَشَا۬ءُ اللّٰهُ لَانْتَصَرَ مِنْهُمْ)
অর্থাৎ জিহাদের বিধান দিয়েছেন কাফিরদের দ্বারা মু’মিনদেরকে পরীক্ষা করার জন্য ও মু’মিনদের দ্বারা কাফিরদেরকে শাস্তি দিতে। আল্লাহ তা‘আলা ইচ্ছা করলে কাফিরদের উপর বিনা যুদ্ধে মু’মিনদের বিজয় দান করতে পারতেন, কিন্তু তিনি চান কাফির ও মু’মিনদের মাঝে জিহাদ হোক, ফলে মু’মিনদের ঈমান মজবুত হোক এবং দুনিয়ার সামান্য আঘাত ও কষ্টের বিনিময়ে আখিরাতে আযাব থেকে রক্ষা পেয়ে যাক এবং মর্যাদা বেড়ে যাক। আর কাফিররা মু’মিনদের হাতে দুনিয়াতে শাস্তি ভোগ করুক।
(فَلَنْ يُّضِلَّ أَعْمَالَهُمْ)
অর্থাৎ যারা আল্লাহ তা‘আলার পথে জিহাদ করে আল্লাহ তা‘আলা তাদের আমলের পুরস্কার বরবাদ করবেন না। বরং তাদের মর্তবা আরো বাড়িয়ে দেবেন।
রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন : একজন শহীদ তার পরিবারের সত্তরজনকে সুপারিশ করতে পারবে। (আবূ দাউদ হা. ২৫২২, সহীহ)
سَيَهْدِيْهِمْ অর্থাৎ জান্নাতের দিকে পথ দেখাবেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন :
(إِنَّ الَّذِيْنَ اٰمَنُوْا وَعَمِلُوا الصّٰلِحٰتِ يَهْدِيْهِمْ رَبُّهُمْ بِإِيْمَانِهِمْ ج تَجْرِيْ مِنْ تَحْتِهِمُ الْأَنْهٰرُ فِيْ جَنّٰتِ النَّعِيْمِ)
“নিশ্চয়ই যারা মু’মিন ও সৎ কর্মপরায়ণ তাদের প্রতিপালক তাদের ঈমানের কারণে তাদেরকে পথনির্দেশ করবেন নেয়ামতপূর্ণ জান্নাতের দিকে; যার পাদদেশে নহরসমূহ প্রবাহিত হবে।” (সূরা ইউনুস ১০ : ৯)
(إِنْ تَنْصُرُوا اللّٰهَ يَنْصُرْكُمْ)
আল্লাহ তা‘আলা বলছেন, যদি আমাকে সহযোগিতা কর তাহলে আমি তোমাদেরকে সহযোগিতা করব। আর যুদ্ধের ময়দানে তিনি তোমাদের পাসমূহ স্থির রাখবেন। কেউ বলেছেন, পুলসিরাতের ওপর পা অটল রাখবেন।
অন্যত্র আল্লাহ তা‘আলা বলেন :
(وَلَيَنْصُرَنَّ اللّٰهُ مَنْ يَّنْصُرُه۫ ط إِنَّ اللّٰهَ لَقَوِيٌّ عَزِيْزٌ)
“আল্লাহ নিশ্চয়ই তাকে সাহায্য করেন যে তাঁকে সাহায্য করে। আল্লাহ নিশ্চয়ই শক্তিমান, পরাক্রমশালী।” (সূরা হাজ্জ ২২ : ৪০)
অন্যত্র আল্লাহ তা‘আলা বলেন :
(إِنَّا لَنَنْصُرُ رُسُلَنَا وَالَّذِيْنَ اٰمَنُوْا فِي الْحَيٰوةِ الدُّنْيَا وَيَوْمَ يَقُوْمُ الْأَشْهَادُ)
“নিশ্চয়ই আমি আমার রাসূলদের ও মু’মিনদেরকে সাহায্য করব পার্থিব জীবনে ও যেদিন সাক্ষীগণ দন্ডায়মান হবে।” (সূরা মু’মিনুন ৪০ : ৫১) আল্লাহ তা‘আলাকে সাহায্য করার অর্থ আল্লাহ তা‘আলার দীনকে সাহায্য করা, যে সব এলাকায় মুসলিমরা নির্যাতিত ও অত্যাচারিত সেখানে তাদেরকে সাহায্য করা এবং আল্লাহ তা‘আলার পথে জিহাদ করা। তাহলে আল্লাহ তা‘আলা আমাদেরকে কাফিরদের ওপর সাহায্য করবেন।
কিন্তু আজকে মুসলিমরা দেশ ও জাতীর নামে বিভক্ত হওয়ার কারণে অন্যান্য দেশ বা জাতির মুসলিমদের ওপর কাফির-মুশরিকরা নির্যাতনের স্টিমরোলার চালিয়ে যাচ্ছে অথচ আমরা তাদেরকে সহযোগিতা তো দূরের কথা তাদের পক্ষে কথা বলারও সাহস করি না।
নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন -
الْمُسْلِمُونَ كَرَجُلٍ وَاحِدٍ، إِنِ اشْتَكَي عَيْنُهُ، اشْتَكَي كُلُّهُ، وَإِنِ اشْتَكَي، رَأْسُهُ اشْتَكَي كُلُّهُ
সারা বিশ্বের মুসলিমরা একটি ব্যক্তির ন্যায়, তার চোখে আঘাতপ্রাপ্ত হলে সারা শরীর আঘাত প্রাপ্ত হয়, তার মাথা আঘাত প্রাপ্ত হলে সারা শরীর আঘাতপ্রাপ্ত হয়। (সহীহ মুসলিম হা. ৬৭) তাই আমাদেরকে আল্লাহ তা‘আলার সাহায্য পেতে হলে সকল মুসলিমকে সঠিক ঈমান ও আকীদাহ গ্রহণ করত একে অপরের ভাই হিসেবে বসবাস করতে হবে, সে মুসলিম যেখানেই থাকুক না কেন আর যে দেশেরই হোক না কেন।
আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয় :
১. যতদিন কাফিররা যুদ্ধ করবে ততদিন যুদ্ধ করা আবশ্যক।
২. আল্লাহ তা‘আলা দুনিয়াতেই মুসলিমদের হাতে কাফিরদের শাস্তি দিতে চান।
৩. বন্দিদের ব্যাপারে মুসলিমদের স্বাধীনতা রয়েছে।
৪. মুজাহিদদের জন্য জান্নাতের সুসংবাদ রয়েছে।
৫. যারা আল্লাহ তা‘আলার দীনকে সাহায্য করে আল্লাহ তা‘আলা তাদেরকে সাহায্য করবেন।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: ৪-৯ নং আয়াতের তাফসীর:
এখানে আল্লাহ তা'আলা মুমিনদেরকে যুদ্ধের নির্দেশাবলী জানিয়ে দিচ্ছেন। তিনি তাদেরকে বলছেন:যখন তোমরা কাফিরদের সাথে যুদ্ধে মুকাবিলা করবে এবং হাতাহাতি লড়াই শুরু হয়ে যাবে তখন তোমরা তাদের গর্দান উড়িয়ে দিবে এবং তরবারী চালনা করে তাদের মস্তক দেহ হতে বিচ্ছিন্ন করে ফেলবে। অতঃপর যখন দেখবে যে, শক্ররা পরাজিত হয়ে গেছে এবং তাদের বহু সংখ্যক লোক নিহত হয়েছে তখন তোমরা অবশিষ্টদেরকে শক্তভাবে বন্দী করে ফেলবে। অতঃপর যখন যুদ্ধ শেষ হয়ে যাবে তখন তোমাদেরকে দু’টি জিনিসের কোন একটি গ্রহণ করার অধিকার দেয়া হয়েছে। হয় তোমরা অনুগ্রহ করে বিনা মুক্তিপণে তাদেরকে ছেড়ে দিবে, অথবা মুক্তিপণ আদায় করে ছেড়ে দিবে।
বাহ্যতঃ জানা যাচ্ছে যে, বদরের যুদ্ধের পর এ আয়াতটি নাযিল হয়। কেননা, বদরের যুদ্ধে শত্রুদের অধিকাংশকে বন্দী করে তাদের নিকট হতে মুক্তিপণ আদায় করা এবং তাদের খুব সংখ্যককে হত্যা করার কারণে মুসলমানদের তিরস্কার ও নিন্দে করা হয়েছিল। এ সময় আল্লাহ তা'আলা বলেছিলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “দেশে ব্যাপকভাবে শত্রুকে পরাভূত না করা পর্যন্ত বন্দী রাখা কোন নবীর জন্যে সংগত নয়। তোমরা কামনা কর পার্থিব সম্পদ এবং আল্লাহ চান পরকালের কল্যাণ; আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়। আল্লাহর পূর্ব বিধান না থাকলে তোমরা যা গ্রহণ করেছো তজ্জন্য তোমাদের উপর মহাশাস্তি আপতিত হতো।”(৮:৬৭-৬৮)।
কোন কোন বিদ্বান ব্যক্তির উক্তি এই যে, বন্দী শত্রুদেরকে অনুগ্রহ করে ছেড়ে দেয়া অথবা মুক্তিপণ আদায় করে ছেড়ে দেয়ার অধিকার রহিত হয়ে গেছে। নিম্নের আয়াতটি হলো এটা রহিতকারীঃ (আরবী) অর্থাৎ “যখন মর্যাদা সম্পন্ন মাসগুলো অতিক্রান্ত হয়ে যাবে তখন তোমরা মুশরিকদেরকে যেখানেই পাও হত্যা কর।”(৯:৫) কিন্তু অধিকাংশ বিদ্বানের উক্তি এই যে, এটা রহিত হয়নি। কেউ কেউ তো এখন বলেন যে, নেতার এ দু’টোর মধ্যে যে কোন একটি গ্রহণ করার স্বাধীনতা রয়েছে। অর্থাৎ তিনি ইচ্ছা করলে এ বন্দীদেরকে অনুগ্রহ করে বিনা মুক্তিপণেই ছেড়ে দিতে পারেন এবং ইচ্ছা করলে মুক্তিপণ আদায় করে ছাড়তে পারেন। কিন্তু অন্য কেউ বলেন যে, তাদেরকে হত্যা করে দেয়ার অধিকারও নেতার রয়েছে। এর দলীল এই যে, বদরের বন্দীদের মধ্যে নযর ইবনে হারিস এবং উকবা ইবনে আবি মুঈতকে রাসূলুল্লাহ (সঃ) হত্যা করিয়েছিলেন। আর এটাও এর দলীল যে, হযরত সুমামা ইবনে উসাল (রাঃ) যখন বন্দী অবস্থায় ছিলেন তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিলেন:“হে সুমামা (রাঃ)! তোমার এখন বক্তব্য কি আছে?” উত্তরে তিনি বলেছিলেন:“যদি আপনি আমাকে হত্যা করেন তবে একজন খুনীকেই হত্যা করবেন। আর যদি আমার প্রতি অনুগ্রহ করে আমাকে ছেড়ে দেন তবে একজন কৃতজ্ঞের উপরই অনুগ্রহ করবেন। যদি আপনি সম্পদের বিনিময়ে আমাকে মুক্তি দেন তবে যা চাইবেন তাই পাবেন।” ইমাম শাফেয়ী (রঃ) চতুর্থ। আর একটি অধিকারের কথা বলেছেন এবং তা হলো তাকে গোলাম বানিয়ে নেয়া। এই মাসআলাকে বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করার জায়গা হলো ফুরূঈ’ মাসআলার কিতাবগুলো। আর আমরাও আল্লাহর ফযল ও করমে কিতাবুল আহকামে এর দলীলগুলো বর্ণনা করেছি।
মহাপ্রতাপান্বিত আল্লাহর উক্তিঃ ‘যে পর্যন্ত না যুদ্ধ ওর অস্ত্র নামিয়ে ফেলে। অর্থাৎ হযরত মুজাহিদ (রঃ)-এর উক্তিমতে যে পর্যন্ত না হযরত ঈসা (আঃ) অবতীর্ণ হন। সম্ভবতঃ হযরত মুজাহিদ (রঃ)-এর দৃষ্টি নিম্নের হাদীসের উপর রয়েছেঃ “আমার উম্মত সদা সত্যের সাথে জয়যুক্ত থাকবে, শেষ পর্যন্ত তাদের শেষ লোকটি দাজ্জালের সঙ্গে যুদ্ধ করবে।”
হযরত সালমা ইবনে নুফায়েল (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর খিদমতে হাযির হয়ে আরয করেনঃ “আমি ঘোড়া ছেড়ে দিয়েছি, অস্ত্র-শস্ত্র রেখে দিয়েছি এবং যুদ্ধ ওর অস্ত্র-শস্ত্র নামিয়ে ফেলেছে। যুদ্ধ আর নেই।” তখন নবী (সঃ) তাকে বললেনঃ “এখন যুদ্ধ এসে গেছে। আমার উম্মতের একটি দল সদা লোকদের উপর জয়যুক্ত থাকবে। যাদের অন্তরকে আল্লাহ তা'আলা বক্র করে দিবেন তাদের বিরুদ্ধে ঐ দলটি যুদ্ধ করবে এবং তাদের হতে আল্লাহ তাদেরকে জীবিকা দান করবেন, শেষ পর্যন্ত আল্লাহর আদেশ এসে যাবে এবং তারা ঐ অবস্থাতেই থাকবে। মুমিনদের বাসভূমি সিরিয়ায়। ঘোড়ার কেশরে কিয়ামত পর্যন্ত কল্যাণ দান করা হয়েছে।” (এ হাদীসটি মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত হয়েছে। ইমাম নাসাঈও (রঃ) এটা বর্ণনা করেছেন)
এ হাদীসটি ইমাম বাগাভী (রঃ) ও ইমাম হাফিয আবূ ইয়ালা মুসিলীও (রঃ) আনয়ন করেছেন। যারা এটাকে মানসূখ বা রহিত বলেন না, এ হাদীস তাঁদের পৃষ্ঠপোষকতা করবে। এটা যেন শরীয়তের হুকুম হিসেবেই থাকবে যতদিন যুদ্ধ বাকী থাকবে। এ আয়াতটি নিম্নের আয়াতের অনুরূপঃ (আরবী) অর্থাৎ “তাদের সাথে যুদ্ধ করতে থাকো যতদিন পর্যন্ত হাঙ্গামা বাকী থাকে এবং দ্বীন সম্পূর্ণরূপে আল্লাহর জন্যে না হয়।”(৮:৩৯)
হযরত কাতাদা (রঃ) বলেন যে, যুদ্ধের অস্ত্র রেখে দেয়ার অর্থ হলো শিরক বাকী না থাকা। আর কেউ কেউ বলেন যে, এর দ্বারা মুশরিকদের শিরক হতে তাওবা করা বুঝানো হয়েছে। একথাও বলা হয়েছে যে, এর ভাবার্থ হলোঃ যে পর্যন্ত না তারা নিজেদের চেষ্টা-যত্ন আল্লাহর আনুগত্যে ব্যয় করে।
এরপর আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলেনঃ আল্লাহ ইচ্ছা করলে তাদেরকে শাস্তি দিতে পারতেন। অর্থাৎ তিনি ইচ্ছা করলে নিজের নিকট হতে আযাব পাঠিয়েই তাদেরকে ধ্বংস করে দিতে পারতেন, কিন্তু তিনি চান তোমাদের একজনকে অপরের দ্বারা পরীক্ষা করতে। এ জন্যেই তিনি জিহাদের আহকাম জারী করেছেন। সূরায়ে আলে-ইমরান এবং সূরায়ে বারাআতের মধ্যেও এ বিষয়ের বর্ণনা রয়েছে। সূরায়ে আলে-ইমরানে আছেঃ (আরবী) অথাৎ “তোমরা কি মনে কর যে, তোমরা জান্নাতে প্রবেশ করবে, যখন আল্লাহ তোমাদের মধ্যে কে জিহাদ করেছে এবং কে ধৈর্যশীল তা এখনো জানেন। ?”(৩:১৪২) সূরায়ে বারাআতে আছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “তোমরা তাদের সাথে সংগ্রাম করবে। তোমাদের হস্তে আল্লাহ তাদেরকে শাস্তি দিবেন, তাদেরকে লাঞ্ছিত করবেন, তাদের বিরুদ্ধে তোমাদেরকে বিজয়ী করবেন ও মুমিনদের চিত্ত প্রশান্ত করবেন। আর তাদের অন্তরের ক্ষোভ দূর করবেন। আল্লাহ যাকে ইচ্ছা তার প্রতি ক্ষমাপরায়ণ হন, আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।”(৯:১৪)।
যেহেতু এটাও ছিল যে, জিহাদে মুমিনও শহীদ হয় সেই হেতু আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ যারা আল্লাহর পথে নিহত হয় তিনি কখনো তাদের কর্ম বিনষ্ট হতে দেন না। বরং তাদেরকে তিনি খুব বেশী বেশী করে পুণ্য দান করেন। কেউ কেউ তো কিয়ামত পর্যন্ত পুণ্য লাভ করতে থাকে।
হযরত কায়েস আল জুযামী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “শহীদকে ছয়টি ইনআ’ম দেয়া হয়। (এক) তার রক্তের প্রথম ফোটা মাটিতে পড়া মাত্রই তার সমস্ত গুনাহ মাফ হয়ে যায়। (দুই) তাকে তার জান্নাতের স্থান দেখানো হয়। (তিন) সুন্দরী, বড় বড় চক্ষু বিশিষ্টা হুরদের সঙ্গে তার বিয়ে দিয়ে দেয়া হয়। (চার) সে ভীতি-বিহ্বলতা হতে নিরাপত্তা লাভ করে। (পাঁচ) তাকে কবরের শাস্তি হতে বাচিয়ে নেয়া হয়। (ছয়) তাকে ঈমানের অলংকার দ্বারা ভূষিত করা হয়।” (এ হাদীসটি মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত হয়েছে)
অন্য একটি হাদীসে আছে যে, তার মাথার উপর সম্মানের মুকুট পরানো হবে যাতে মণি-মুক্তা বসানো থাকবে, যার একটি ইয়াকূত ও মুক্তা সারা দুনিয়া এবং ওর সমুদয় জিনিস হতে মূল্যবান হবে। সে বাহাত্তরটি আয়ত নয়না হ্র লাভ করবে। আর সে তার বংশের সত্তরজন লোকের জন্যে সুপারিশ করার অনুমতি লাভ করবে এবং তার সুপারিশ কবূল করা হবে।' (এ হাদীসটি ইমাম তিরমিযী (রঃ) ও ইমাম ইবনে মাজাহ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)
হযরত আৰূ কাতাদা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “ঋণ ছাড়া শহীদের সমস্ত গুনাহ মাফ করে দেয়া হবে।” (এ হাদীসটি সহীহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে)
শহীদদের মর্যাদা সম্বলিত আরো বহু হাদীস রয়েছে।
এরপর মহান আল্লাহ বলেনঃ তিনি তাদেরকে সৎ পথে পরিচালিত করেন। অর্থাৎ তিনি তাদেরকে জান্নাতের পথে পরিচালিত করে থাকেন। যেমন আল্লাহ তাআলা অন্য আয়াতে বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ ‘যারা ঈমান এনেছে ও সৎকর্ম সম্পাদন করেছে, তাদের ঈমানের কারণে তাদের প্রতিপালক তাদেরকে জান্নাতের পথে পরিচালিত করবেন, যেগুলো হবে সুখময় এবং যেগুলোর পাদদেশ দিয়ে নদী প্রবাহিত হবে।” (১০:৯)
অতঃপর আল্লাহ পাক বলেনঃ আল্লাহ তাদের অবস্থা ভাল ও সুন্দর করবেন। তিনি তাদেরকে দাখিল করবেন জানাতে যার কথা তিনি তাদেরকে জানিয়েছিলেন। অর্থাৎ জান্নাতবাসী প্রত্যেকটি লোক নিজের ঘর ও জায়গা এমনভাবে চিনতে পারবে যেমনভাবে দুনিয়ায় নিজের বাড়ী ও জায়গা চিনতো। কাউকেও জিজ্ঞেস করার প্রয়োজন হবে না। তাদের মনে হবে যে, পূর্ব হতেই যেন তারা সেখানে অবস্থান করছে।
মুসনাদে ইবনে আবি হাতিমে রয়েছে যে, দুনিয়ায় মানুষের সাথে তার আমলের যে রক্ষক ফেরেশতা রয়েছেন তিনিই তার আগে আগে চলবেন। যখন ঐ জান্নাতবাসী তার জায়গায় পৌঁছে যাবে তখন সে নিজেই চিনে নিয়ে বলবেঃ “এটাই আমার জায়গা।” অতঃপর যখন সে নিজের জায়গায় চলাফেরা করতে শুরু করবে এবং এদিক ওদিক ঘুরতে থাকবে তখন ঐ রক্ষক ফেরেশতা সেখান হতে সরে পড়বেন এবং সে তখন নিজের ভোগ্যবস্তু উপভোগে মগ্ন হয়ে পড়বে।
হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যখন মুমিনরা জাহান্নাম হতে মুক্তি পেয়ে যাবে তখন তাদেরকে জান্নাত ও জাহান্নামের মাঝে অবস্থিত এক সেতুর উপর আটক করা হবে এবং দুনিয়ায় তারা একে অপরের উপর যে যুলুম করেছিল তার প্রতিশোধ নিয়ে নেয়া হবে। অতঃপর যখন তারা সম্পূর্ণরূপে পাক সাফ হয়ে যাবে তখন তাদেরকে জান্নাতে প্রবেশের অনুমতি দেয়া হবে। আল্লাহর শপথ! যেমন তোমাদের প্রত্যেকেই তার এই পার্থিব ঘরের পথ চিনতে পারে তার চেয়ে বেশী তারা জান্নাতে তাদের ঘর ও স্থান চিনতে পারবে।” (এ হাদীসটি ইমাম বুখারী (রঃ) তাঁর সহীহ গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন)
মহান আল্লাহ বলেনঃ “হে মুমিনরা! যদি তোমরা আল্লাহকে সাহায্য কর, তবে আল্লাহ তোমাদেরকে সাহায্য করবেন এবং তোমাদের অবস্থান দৃঢ় করবেন। যেমন মহামহিমান্বিত আল্লাহ অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “অবশ্যই আল্লাহ ঐ ব্যক্তিকে সাহায্য করবেন যে তাঁকে সাহায্য করবে।”(২২:৪০) কেননা, যেমন আমল হয় তেমনই প্রতিদান দেয়া হয়। আর আল্লাহ এরূপ লোকের অবস্থানও দৃঢ় করে থাকেন। যেমন হাদীসে এসেছেঃ “যে ব্যক্তি কোন সম্রাটের কাছে কোন ব্যক্তির এমন কোন প্রয়োজনের কথা পৌঁছিয়ে দেয় যা ঐ ব্যক্তি নিজে পৌঁছাতে সক্ষম নয়, আল্লাহ তা'আলা কিয়ামতের দিন পুলসিরাতের উপর ঐ ব্যক্তির পদদ্বয়কে দৃঢ় করবেন।”
এরপর আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলেনঃ যারা কুফরী করেছে তাদের জন্যে রয়েছে দুর্ভোগ। অর্থাৎ মুমিনদের বিপরীত অবস্থা হবে কাফিরদের। সেখানে তাদের পদস্খলন ঘটবে। হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “দীনার, দিরহাম ও কাপড়ের দাসেরা ধ্বংস হয়ে গেছে। সে যদি রুগ্ন হয়ে পড়ে তবে আল্লাহ যেন তাকে রোগমুক্ত না করেন।”
আল্লাহ তাআলা তাদের আমল ব্যর্থ করে দিবেন। কেননা, আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন তা তারা অপছন্দ করে। না তারা এর সম্মান করে, না এটা মানার তাদের ইচ্ছা আছে। সুতরাং আল্লাহ তাদের কর্ম নিষ্ফল করে দিবেন।
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।