সূরা আল-আহকাফ (আয়াত: 9)
হরকত ছাড়া:
قل ما كنت بدعا من الرسل وما أدري ما يفعل بي ولا بكم إن أتبع إلا ما يوحى إلي وما أنا إلا نذير مبين ﴿٩﴾
হরকত সহ:
قُلْ مَا کُنْتُ بِدْعًا مِّنَ الرُّسُلِ وَ مَاۤ اَدْرِیْ مَا یُفْعَلُ بِیْ وَ لَا بِکُمْ ؕ اِنْ اَتَّبِعُ اِلَّا مَا یُوْحٰۤی اِلَیَّ وَ مَاۤ اَنَا اِلَّا نَذِیْرٌ مُّبِیْنٌ ﴿۹﴾
উচ্চারণ: কুল মা-কুনতুবিদ‘আম মিনার রুছুলি ওয়ামাআদরী মা-ইউফ‘আলুবী ওয়ালা-বিকুম ইন আত্তাবি‘উ ইল্লা-মা-ইউহাইলাইইয়া ওয়ামাআনা ইল্লা-নাযীরুম মুবীন।
আল বায়ান: বল, ‘আমি রাসূলদের মধ্যে নতুন নই। আর আমি জানি না আমার ও তোমাদের ব্যাপারে কী করা হবে। আমার প্রতি যা ওহী করা হয়, আমি কেবল তারই অনুসরণ করি। আর আমি একজন সুস্পষ্ট সতর্ককারী মাত্র’।
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৯. বলুন, রাসূলদের মধ্যে আমিই প্রথম নই। আর আমি জানি না, আমার ও তোমাদের ব্যাপারে কী করা হবে; আমি আমার প্রতি যা ওহী করা হয় শুধু তারই অনুসরণ করি। আর আমি তো এক স্পষ্ট সতর্ককারী মাত্ৰ।
তাইসীরুল ক্বুরআন: বল, আমি রসূলদের মধ্যে নতুন নই, আর আমি এও জানি না যে, আমার সঙ্গে কী ব্যবহার করা হবে আর তোমাদের সঙ্গেইবা কেমন (ব্যবহার করা হবে), আমি কেবল তাই মেনে চলি যা আমার প্রতি ওয়াহী করা হয়। আমি তো স্পষ্ট সতর্ককারী মাত্র।
আহসানুল বায়ান: (৯) বল, ‘আমি তো কোন নতুন রসূল নই।[1] আর আমি জানি না যে, আমার ও তোমাদের ব্যাপারে কী করা হবে;[2] আমি আমার প্রতি যা অহী (প্রত্যাদেশ) করা হয় শুধু তারই অনুসরণ করি। আমি এক স্পষ্ট সতর্ককারী মাত্র।’
মুজিবুর রহমান: বলঃ আমি এমন কোন প্রথম ও নতুন নাবী নই। আমি জানিনা, আমার ও তোমাদের ব্যাপারে কি করা হবে; আমি আমার প্রতি যা অহী করা হয় শুধু তারই অনুসরণ করি। আমি এক স্পষ্ট সতর্ককারী মাত্র।
ফযলুর রহমান: বল, “আমি তো রসূলদের মধ্যে নতুন নই (আমি তো প্রথম রসূল নই)। আমি জানিও না, আমার ও তোমাদের সাথে কি আচরণ করা হবে। আমার কাছে যে ওহী পাঠানো হয় আমি শুধু তাই মেনে চলি। একজন স্পষ্ট সতর্ককারী ছাড়া আমি আর কিছু নই।”
মুহিউদ্দিন খান: বলুন, আমি তো কোন নতুন রসূল নই। আমি জানি না, আমার ও তোমাদের সাথে কি ব্যবহার করা হবে। আমি কেবল তারই অনুসরণ করি, যা আমার প্রতি ওহী করা হয়। আমি স্পষ্ট সতর্ক কারী বৈ নই।
জহুরুল হক: তুমি বলো -- "আমি রসূলগণের মধ্যে প্রারম্ভিক নই, আর আমি ধারণা করতে পারি না আমার প্রতি কি করা হবে এবং তোমাদের সম্পর্কেও নয়। আমি শুধু অনুসরণ করি আমার কাছে যা প্রত্যাদিষ্ট হয়েছে তা বৈ তো নয়, আর আমি একজন সুস্পষ্ট সতর্ককারী ব্যতীত আর কিছুই নই।"
Sahih International: Say, "I am not something original among the messengers, nor do I know what will be done with me or with you. I only follow that which is revealed to me, and I am not but a clear warner."
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ৯. বলুন, রাসূলদের মধ্যে আমিই প্রথম নই। আর আমি জানি না, আমার ও তোমাদের ব্যাপারে কী করা হবে; আমি আমার প্রতি যা ওহী করা হয় শুধু তারই অনুসরণ করি। আর আমি তো এক স্পষ্ট সতর্ককারী মাত্ৰ।
তাফসীর:
-
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (৯) বল, ‘আমি তো কোন নতুন রসূল নই।[1] আর আমি জানি না যে, আমার ও তোমাদের ব্যাপারে কী করা হবে;[2] আমি আমার প্রতি যা অহী (প্রত্যাদেশ) করা হয় শুধু তারই অনুসরণ করি। আমি এক স্পষ্ট সতর্ককারী মাত্র।”
তাফসীর:
[1] অর্থাৎ, আমি তো কোন প্রথম ও নতুন রসূল নই। বরং আমার পূর্বেও অনেক রসূল এসেছেন।
[2] অর্থাৎ, দুনিয়াতে কী করা হবে, তা আমার অজানা। আমি মক্কাতেই থাকব, না এখান থেকে বহিষ্কার হতে আমাকে বাধ্য হতে হবে, আমার সাধারণ ও স্বাভাবিক মরণ হবে, না তোমাদের হাতে আমাকে হত্যা হতে হবে? তোমরা শীঘ্রই শাস্তির সম্মুখীন হবে, নাকি দীর্ঘকাল পর্যন্ত তোমাদেরকে অবকাশ দেওয়া হবে? এ সবের জ্ঞান একমাত্র আল্লাহর নিকটেই আছে। আমার এটা জানা নেই যে, আগামী কাল আমার অথবা তোমাদের সাথে কী আচরণ করা হবে? তবে পরকাল সম্পর্কে আমি নিশ্চিত রূপে বিদিত যে, মু’মিনরা জান্নাতে এবং কাফেররা জাহান্নামে প্রবেশ করবে। আর হাদীসে যে বর্ণিত হয়েছে, কোন সাহাবীর মৃত্যুর সময় তাঁর ব্যাপারে সুধারণা প্রকাশ করা হলে নবী (সাঃ) বলতেন, (وَاللهِ مَا أَدْرِيْ- وأَنَا رَسُوْلُ اللهِ- مَا يُفْعَلُ بِيْ وَلاَ بِكُمْ) ‘‘আল্লাহর কসম! আমি আল্লাহর রসূল হওয়া সত্ত্বেও এ কথা জানি না যে, আমার ও তোমাদের সাথে কি ব্যবহার করা হবে?’’ (সহীহ বুখারী, মানাক্বিবুল আনসার) তো এখানে কোন এক নির্দিষ্ট ব্যক্তির সুনিশ্চিত পরিণাম সম্বন্ধে অজ্ঞতা প্রকাশ করা হয়েছে। হ্যাঁ! যাঁদের (জান্নাতী হওয়ার) কথা সুস্পষ্ট দলীল দ্বারা সুসাব্যস্ত, তাঁদের ব্যাপার ভিন্ন। যেমন, সুসংবাদপ্রাপ্ত দশজন সাহাবী এবং বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী প্রমুখ সাহাবীগণ।
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ৭-৯ নম্বর আয়াতের তাফসীর :
কাফির-মুশরিকদের সামনে আল্লাহ তা‘আলার কালাম কুরআন তেলাওয়াত করা হলে তারা বলে এটা একটি সুস্পষ্ট জাদু। আর মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) একজন জাদুকর। আল্লাহ তা‘আলা বলেন
(وَقَالَ الَّذِيْنَ كَفَرُوْا لِلْحَقِّ لَمَّا جَا۬ءَهُمْ لا إِنْ هٰذَآ إِلَّا سِحْرٌ مُّبِيْنٌ )
“আর কাফিরদের কাছে যখন এ সত্য (কুরআন) আসল তখন তারা বলল- এটা প্রকাশ্য জাদু ব্যতীত আর কিছুই নয়।।” (সূরা সাবা ৩৪ : ৪৩)
অন্যত্র আল্লাহ তা‘আলা বলেন :
(وَلَمَّا جَا۬ءَهُمُ الْحَقُّ قَالُوْا هٰذَا سِحْرٌ وَّإِنَّا بِه۪ كٰفِرُوْنَ )
“যখন তাদের নিকট সত্য আসল তখন তারা বললো- এটা তো জাদু এবং আমরা অবশ্যই এর প্রতি অস্বীকার জ্ঞাপন করি।”
মূলত কাফিরদের এসব কথা দ্বারা উদ্দেশ্য- নাবী মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এসব নিজের পক্ষ থেকে তৈরি করে এনেছে।
আল্লাহ নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে শিখিয়ে দিচ্ছেন, বলে দাও, যদি আমি নিজের পক্ষ থেকে তৈরি করে আনতাম তাহলে আল্লাহ তা‘আলার আযাব থেকে তোমরা আমাকে রক্ষা করতে পারতে না। আল্লাহ তা‘আলা বলেন- “যদি সে নিজে কোন কথা বানিয়ে আমার কথা বলে চালিয়ে দিত, তবে অবশ্যই আমি তার ডান হাত ধরে ফেলতাম, এবং কেটে দিতাম তার হৃৎপিণ্ডের শিরা। অতঃপর তোমাদের মধ্যে এমন কেউ থাকত না, যে তার থেকে আমাকে বিরত রাখতে পারে।” (সূরা হাক্কাহ ৬৯ : ৪৪-৪৭)
(مَا كُنْتُ بِدْعًا مِنَ الرُّسُلِ)
‘আমি কোন নতুন রাসূল নই’ بدع অর্থ নতুন, যার পূর্ব কোন উপমা নেই। তাই আল্লাহ তা‘আলাকে বলা হয়
(بَدِيْعُ السَّمٰوٰتِ وَالْأَرْضِ)
“তিনি আকাশ ও পৃথিবীর অস্তিত্ব দান করেন” (সূরা বাকারাহ ২ : ১১৭) অর্থাৎ নাবী মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নতুন ও প্রথম রাসূল নন, তাঁর পূর্বে অনেক রাসূল অতীত হয়ে গেছেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন :
(وَلَقَدْ أَرْسَلْنَا مِنْ قَبْلِكَ رُسُلًا إِلٰي قَوْمِهِمْ فَجَا۬ءُوْهُمْ بِالْبَيِّنٰتِ)
“আমি তো প্রেরণ করেছিলাম তোমার পূর্বে বহু রাসূল তাদের নিজ নিজ সম্প্রদায়ের নিকট, তারা তাদের কাছে সুস্পষ্ট দৃষ্টান্ত নিয়ে এসেছিল।” (সূরা রুম ৩০ : ৪৭) এছাড়াও এ ব্যাপারে অনেক আয়াত রয়েছে যা যুগে যুগে অসংখ্য নাবী-রাসূলের আগমনের কথা প্রমাণ করে।
(وَمَا أَدْرِي مَا يُفْعَلُ بِي وَلَا بِكُمْ)
‘আর আমি জানি না যে, আমার সাথে ও তোমাদের সাথে কেমন আচরণ করা হবে’ অর্থাৎ দুনিয়াতে কী করা হবে, তা আমার অজানা।
আমি মক্কায় থাকব, না এখান থেকে চলে যেতে বাধ্য করা হবে, আমার সাধারণ মরণ হবে না কারো হাতে মৃত্যু হবে? এটাও জানা নেই আগামী কাল আমার অথবা তোমাদের সাথে কী আচরণ করা হবে? তবে পরকাল সম্পর্কে আমি নিশ্চিতরূপে বিদিত যে, মুুমিনরা জান্নাতে আর কাফিররা জাহান্নামে প্রবেশ করবে। কোন সাহাবীর মৃত্যুর সময় তার ব্যাপারে সু-ধারণা প্রকাশ করা হলে নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন : আল্লাহ তা‘আলার শপথ! আমি আল্লাহ তা‘আলার রাসূল হওয়া সত্ত্বেও এ কথা জানিনা যে, আমার ও তোমাদের সাথে কী ব্যবহার করা হবে। (সহীহ বুখারী হা. ৩৯৩৯)
ইবনু আব্বাস, আনাস, কাতাদাহ প্রমুখ মুফাসসিরগণ বলেন : যখন এ আয়াত নাযিল হয় তখন মুশরিক, ইয়াহূদ ও মুনাফিকরা খুব খুশি হয় এবং বলে : কিভাবে এমন রাসূলের অনুসরণ করব যে জানেনা তাঁর সাথে ও আমাদের সাথে কি আচরণ করা হবে? তাহলে আমাদের ওপর তাঁর কোন ফযীলত নেই। তখন নাযিল হয়-
(لِيَغْفِرَ لَكَ اللّٰهُ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْۭبِكَ وَمَا تَأَخَّرَ)
(সূরা ফাতহ ৪৮ : ২, তাফসীর আযওয়াউল বায়ান)
এসব প্রমাণ করছে নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) গায়েব জানেন না, বরং তিনি কেবল তাঁর প্রতি যে ওয়াহী করা হয় তার অনুসরণ করেন এবং ওয়াহীর মাধ্যমে গায়েবের যতটুকু জ্ঞান দান করা হয় ততটুকু জানেন।
আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয় :
১. সত্য আগমনের পর তা সত্য হিসেবে জানার পরেও একশ্রেণির মানুষ বিভিন্ন বাহানা করে সত্য পরিত্যাগ করে।
২. আল্লাহ তা‘আলার ব্যাপারে স্বয়ং রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কোন মিথ্যা কথা বললে আল্লাহ তা‘আলা ছেড়ে দেবেন না।
৩. মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কোন নতুন রাসূল নন, তাঁর পূর্বে অনেক রাসূল অতীত হয়ে গেছেন।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: ৭-৯ নং আয়াতের তাফসীর:
মুশরিকদের হঠকারিতা, ঔদ্ধত্য এবং কুফরীর বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যে, যখন তাদেরকে আল্লাহ তা'আলার প্রকাশ্য, স্পষ্ট এবং পরিষ্কার আয়াতসমূহ শুনানো হয় তখন তারা বলে থাকেঃ এটা তো যাদু ছাড়া কিছুই নয়। মিথ্যা প্রতিপন্ন করা, অপবাদ দেয়া, পথভ্রষ্ট হওয়া এবং কুফরী করাই যেন তাদের নীতি। তারা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে শুধু যাদুকর বলেই ক্ষান্ত হয় না, বরং একথাও বলে যে, তিনি কুরআনকে নিজেই রচনা করেছেন। তাই মহান আল্লাহ স্বীয় নবী (সঃ)-কে বলেনঃ তুমি তাদেরকে বল- আমি যদি নিজেই কুরআনকে রচনা করে থাকি এবং আমি আল্লাহ তাআলার সত্য নবী না হই তবে অবশ্যই তিনি আমাকে আমার এ মিথ্যা অপবাদের কারণে কঠিন শাস্তি প্রদান করবেন, তখন তোমরা কেন, সারা দুনিয়ায় এমন কেউ নেই যে আমাকে তাঁর এ আযাব হতে রক্ষা করতে পারে। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “(হে নবী সঃ)! তুমি বলঃ আল্লাহ হতে কেউ আমাকে বাঁচাতে পারে না এবং তিনি ছাড়া আমি কোন আশ্রয়স্থল ও পলায়নের জায়গা পাবো না। কিন্তু আমি তার পক্ষ হতে প্রচার ও রিসালাতের দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছি।`(৭২:২২) অন্য এক জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “সে যদি আমার নামে কিছু রচনা করে চালাতে চেষ্টা করতো, তবে অবশ্যই আমি তার দক্ষিণ হস্ত ধরে ফেলতাম, এবং কেটে দিতাম তার জীবন ধমনী, অতঃপর তোমাদের মধ্যে এমন কেউই নেই, যে তাকে রক্ষা করতে পারে।`(৬৯:৪৪-৪৭)।
এরপর কাফিরদেরকে ধমকানো হচ্ছে যে, তারা যে বিষয়ে আলোচনায় লিপ্ত আছে, সে সম্বন্ধে আল্লাহ সবিশেষ অবহিত। তিনি সবারই মধ্যে ফায়সালা করবেন।
'এই ধমকের পর তাদেরকে তাওবা করার প্রতি উৎসাহ দেয়া হচ্ছে। মহান আল্লাহ বলেনঃ তিনি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। যদি তোমরা তার দিকে ফিরে আসো এবং তোমাদের কৃতকর্ম হতে বিরত থাকো তবে তিনি তোমাদেরকে ক্ষমা করে দিবেন এবং তোমাদের প্রতি দয়া করবেন। সূরায়ে ফুরকানে এ বিষয়েরই আয়াত রয়েছে। সেখানে আল্লাহ পাক বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তারা বলেঃ এগুলো তো সেকালের উপকথা, যা সে লিখিয়ে নিয়ে এগুলো সকাল-সন্ধ্যায় তার নিকট পাঠ করা হয়। বলঃ এটা তিনিই অবতীর্ণ করেছেন যিনি আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর সমুদয় রহস্য অবগত আছেন। তিনি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।”(২৫:৫-৬)
মহান আল্লাহ স্বীয় নবী (সঃ)-কে বলছেন, তুমি বলঃ আমি তো প্রথম রাসূল নই। আমার পূর্বে তো দুনিয়ায় মানুষের নিকট রাসূল আসতেই থেকেছেন। সুতরাং আমার আগমনে তোমাদের এতো বিস্মিত হবার কারণ কি? আমার এবং তোমাদের ব্যাপারে কি করা হবে তাও তো আমি জানি না।
হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর উক্তি হিসেবে এই আয়াতের পরে (আরবী) (যেন আল্লাহ তোমার অতীত ও ভবিষ্যৎ ক্রটিসমূহ মার্জনা করেন ৪৮:২)-এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। অনুরূপভাবে হযরত ইকরামা (রঃ), হযরত হাসান (রঃ) এবং হযরত কাতাদাও (রঃ) .. (আরবী) আয়াতটি দ্বারা (আরবী)-এ আয়াতটি রহিত বলেছেন। যখন (আরবী)-এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয় তখন একজন সাহাবী রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলেনঃ “এ আয়াত দ্বারা তো আল্লাহ তা'আলা আপনার সাথে যা করবেন তা বর্ণনা করলেন, এখন আমাদের সাথে তিনি কি করবেন?” তখন আল্লাহ তা'আলা নিম্নের আয়াতটি অবতীর্ণ করেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “যেন আল্লাহ মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীদেরকে প্রবিষ্ট করেন এমন জান্নাতে যার নিম্নদেশে নদী প্রবাহিত।”(৪৮:৫)
সহীহ হাদীস দ্বারাও এটা প্রমাণিত যে, মুমিনরা বলেছিলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনাকে মুবারকবাদ! বলুন, আমাদের জন্যে কি আছে?” তখন আল্লাহ তা'আলা ... (আরবী)-এ আয়াতটি অবতীর্ণ করেন।
হযরত যহহাক (রঃ) (আরবী)-এ আয়াতের তাফসীরে বলেন যে, ভাবার্থ হচ্ছেঃ ‘আমাকে কি হুকুম দেয়া হবে এবং কোন জিনিস হতে নিষেধ করা হবে তা আমি জানি না।'
হযরত হাসান বসরী (রঃ) বলেন যে, এ আয়াতের ভাবার্থ হলোঃ ‘পরকালের পরিণাম তো আমার জানা আছে যে, আমি জান্নাতে যাবো, কিন্তু দুনিয়ার অবস্থা আমার জানা নেই যে, পূর্ববর্তী কোন কোন নবী (আঃ)-এর মত আমাকে হত্যা করা হবে, না আমি আমার আয়ু পূর্ণ করে আল্লাহ তা'আলার নিকট হাযির হবো? অনুরূপভাবে আমি এটাও জানি না যে, তোমাদেরকে যমীনে ধ্বসিয়ে দেয়া হবে, না তোমাদের উপর পাথর বর্ষিত হবে?' ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) এটাকেই বিশ্বাসযোগ্য বলেছেন। আর প্রকৃতপক্ষেও এটা ঠিকই বটে যে, তিনি এবং তাঁর অনুসারীরা যে জান্নাতে যাবেন এটা তার নিশ্চিত রূপে জানা ছিল এবং দুনিয়ার অবস্থার পরিণাম সম্পর্কে তিনি ছিলেন বে-খবর যে, তার এবং তার বিরোধী কুরায়েশদের অবস্থা কি হতে পারে? তারা কি ঈমান আনবে, না কুফরীর উপরই থাকবে ও শাস্তিপ্রাপ্ত হবে, না কি সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস হয়ে যাবে?
উম্মুল আলা (রাঃ) হতে বর্ণিত, যিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর হাতে বায়আত গ্রহণ করেছিলেন, তিনি বলেনঃ “লটারীর মাধ্যমে মুহাজিরদেরকে যখন আনসারদের মধ্যে বন্টন করা হচ্ছিল তখন আমাদের ভাগে আসেন হযরত উসমান ইবনে মাযউন (রাঃ)। আমাদের এখানেই তিনি রুগ্ন হয়ে পড়েন এবং অবশেষে মৃত্যুমুখে পতিত হন। আমরা যখন তাকে কাফন পরিয়ে দিই এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ)-ও আগমন করেন তখন আমার মুখ দিয়ে বেরিয়ে পড়েঃ হে আবূ সায়েব (রাঃ)! আল্লাহ আপনার প্রতি দয়া করুন! আপনার ব্যাপারে আমার সাক্ষ্য এই যে, আল্লাহ অবশ্যই আপনাকে সম্মান দান করবেন! আমার একথা শুনে রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাকে বললেনঃ “তুমি কি করে জানতে পারলে যে, আল্লাহ তাকে সম্মান প্রদান করবেন?` তখন আমি বললামঃ আপনার উপর আমার পিতা-মাতা কুরবান হোক! আমি কিছুই জানি না। তিনি তখন বললেনঃ “তাহলে জেনে রেখো যে, তার কাছে তার প্রতিপালকের পক্ষ হতে নিশ্চিত বিষয় (মৃত্যু) এসে গেছে। তার সম্পর্কে আমি কল্যাণেরই আশা রাখি। আল্লাহর শপথ! আমি আল্লাহর রাসূল হওয়া সত্ত্বেও আমার সাথে কি করা হবে তা আমি জানি না।” আমি তখন বললামঃ “আল্লাহর কসম! আজকের পরে আর কখনো আমি কাউকেও পবিত্র ও নিস্পাপ বলে নিশ্চয়তা প্রদান করবো না। আর এতে আমি বড়ই দুঃখিত হই। কিন্তু আমি স্বপ্নে দেখি যে, হযরত উসমান ইবনে মাউন (রাঃ)-এর একটি নদী বয়ে যাচ্ছে। আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর দরবারে হাযির হয়ে এটা বর্ণনা করি। তখন তিনি বলেনঃ “এটা তার আমল।” এর অন্য একটি সনদে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “আমি আল্লাহর রাসূল হওয়া সত্ত্বেও তার সাথে কি করা হবে তা জানি না। (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন এবং শুধু ইমাম বুখারী (রঃ) এটা তাখরীজ করেছেন, ইমাম মুসলিম (রঃ) করেননি) অবস্থা হিসেবে এ শব্দগুলোই সঠিক বলে মনে ধরছে। কেননা, এর পরেই হযরত উম্মুল আ’লা (রাঃ)-এর উক্তি রয়েছেঃ এতে আমি বড়ই দুঃখ পাই।'
মোটকথা, এই হাদীস এবং এর অর্থেরই আরো অন্যান্য হাদীসসমূহ এটাই প্রমাণ করে যে, কোন নির্দিষ্ট ব্যক্তির জান্নাতী হওয়ার নিশ্চিত জ্ঞান কারো নেই এবং কারো এ ধরনের মন্তব্য করা উচিতও নয় যে, অমুক ব্যক্তি জান্নাতী। তবে ঐ মহান ব্যক্তিবর্গ এর ব্যতিক্রম যাদেরকে শরীয়ত প্রবর্তক (সঃ) জান্নাতী বলে ঘোষণা করেছেন। যেমন সুসংবাদ প্রদত্ত দশজন ব্যক্তি (আশারায়ে মুবাশশারাহ রাঃ), হযরত ইবনে সালাম (রাঃ), হযরত আমীসা (রাঃ), হযরত বিলাল (রাঃ), হযরত জাবির (রাঃ)-এর পিতা হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনে হারাম (রাঃ), বি’রে মাউনায় শাহাদাত প্রাপ্ত সত্তরজন কারী (রাঃ), হযরত যায়েদ ইবনে হারেসাহ (রাঃ), হযরত জাফর (রাঃ), হযরত ইবনে রাওয়াহা (রাঃ) এবং এঁদের মত আরো যারা বুযুর্গ ব্যক্তি রয়েছেন। আল্লাহ তা'আলা তাদের সবারই প্রতি সন্তুষ্ট থাকুন।
এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেন, হে নবী (সঃ)! তুমি তাদেরকে বলঃ আমি আমার প্রতি অবতারিত অহীরই শুধু অনুসরণ করি এবং আমি এক স্পষ্ট সতর্ককারী মাত্র। আমার কাজ প্রত্যেক জ্ঞানী ও বিবেকবান ব্যক্তির নিকট স্পষ্টভাবে প্রকাশমান। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।