আল কুরআন


সূরা আল-আহকাফ (আয়াত: 3)

সূরা আল-আহকাফ (আয়াত: 3)



হরকত ছাড়া:

ما خلقنا السماوات والأرض وما بينهما إلا بالحق وأجل مسمى والذين كفروا عما أنذروا معرضون ﴿٣﴾




হরকত সহ:

مَا خَلَقْنَا السَّمٰوٰتِ وَ الْاَرْضَ وَ مَا بَیْنَهُمَاۤ اِلَّا بِالْحَقِّ وَ اَجَلٍ مُّسَمًّی ؕ وَ الَّذِیْنَ کَفَرُوْا عَمَّاۤ اُنْذِرُوْا مُعْرِضُوْنَ ﴿۳﴾




উচ্চারণ: মা-খালাকনাছ ছামা-ওয়া-তি ওয়াল আরদা ওয়ামা-বাইনাহুমাইল্লা-বিলহাক্কি ওয়াআজালিম মুছাম্মাওঁ ওয়াল্লাযীনা কাফারূ‘আম্মাউনযিরূমু‘রিদূন।




আল বায়ান: আমি আসমানসমূহ, যমীন ও এতদোভয়ের মধ্যে যা কিছু আছে, তা যথাযথভাবে ও একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য সৃষ্টি করেছি। আর যারা কুফরী করে, তাদেরকে যে বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছে তা থেকে তারা বিমুখ।




আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৩. আসমানসমূহ, যমীন ও এ দু'য়ের মধ্যবর্তী সমস্ত কিছুই আমরা যথাযথ ভাবে ও নির্দিষ্ট সময়ের জন্য সৃষ্টি করেছি। আর যারা কুফরী করেছে, তাদেরকে যে বিষয়ে ভীতিপ্রদর্শন করা হয়েছে তা থেকে মুখ ফিরিয়ে আছে।




তাইসীরুল ক্বুরআন: আমি আকাশ, যমীন ও এ দু’য়ের মাঝে যা আছে তা প্রকৃত উদ্দেশে একটা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য সৃষ্টি করেছি। কিন্তু কাফিরগণ, যে বিষয়ে তাদেরকে সতর্ক করা হয় তাত্থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়।




আহসানুল বায়ান: (৩) আকাশমন্ডলী ও পৃথিবী এবং উভয়ের মধ্যস্থিত সব কিছুই আমি যথাযথভাবে নির্দিষ্টকালের জন্য সৃষ্টি করেছি; [1] কিন্তু অবিশ্বাসীরা তাদেরকে যে বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছে, তা হতে মুখ ফিরিয়ে নেয়। [2]



মুজিবুর রহমান: আকাশমন্ডলী ও পৃথিবী এবং এতদুভয়ের মধ্যস্থিত সব কিছুই আমি যথাযথভাবে নির্দিষ্ট কালের জন্য সৃষ্টি করেছি; কিন্তু কাফিরদেরকে যে বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছে তা হতে মুখ ফিরিয়ে নেয়।



ফযলুর রহমান: আসমান ও জমিন এবং তার মধ্যবর্তী সবকিছু আমি যথাযথভাবে ও নির্দিষ্ট সময়ের জন্যই সৃষ্টি করেছি। আর কাফেরদেরকে যে বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছে তারা তা উপেক্ষা করে।



মুহিউদ্দিন খান: নভোমন্ডল, ভূ-মন্ডল ও এতদুভয়ের মধ্যবর্তী সবকিছু আমি যথাযথভাবেই এবং নির্দিষ্ট সময়ের জন্যেই সৃষ্টি করেছি। আর কাফেররা যে বিষয়ে তাদেরকে সতর্ক করা হয়েছে, তা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়।



জহুরুল হক: আমরা মহাকাশমন্ডলী ও পৃথিবী এবং এ দুইয়ের মধ্যে যা-কিছু রয়েছে তা সত্যের সাথে এবং একটি নির্দিষ্ট কালের জন্য ছাড়া সৃষ্টি করি নি। কিন্তু যারা অবিশ্বাস পোষণ করে তারা ফিরে দাঁড়ায় তা থেকে যে-সন্বন্ধে তাদের সতর্ক করা হয়।



Sahih International: We did not create the heavens and earth and what is between them except in truth and [for] a specified term. But those who disbelieve, from that of which they are warned, are turning away.



তাফসীরে যাকারিয়া

অনুবাদ: ৩. আসমানসমূহ, যমীন ও এ দু´য়ের মধ্যবর্তী সমস্ত কিছুই আমরা যথাযথ ভাবে ও নির্দিষ্ট সময়ের জন্য সৃষ্টি করেছি। আর যারা কুফরী করেছে, তাদেরকে যে বিষয়ে ভীতিপ্রদর্শন করা হয়েছে তা থেকে মুখ ফিরিয়ে আছে।


তাফসীর:

-


তাফসীরে আহসানুল বায়ান

অনুবাদ: (৩) আকাশমন্ডলী ও পৃথিবী এবং উভয়ের মধ্যস্থিত সব কিছুই আমি যথাযথভাবে নির্দিষ্টকালের জন্য সৃষ্টি করেছি; [1] কিন্তু অবিশ্বাসীরা তাদেরকে যে বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছে, তা হতে মুখ ফিরিয়ে নেয়। [2]


তাফসীর:

[1] অর্থাৎ আকাশ ও পৃথিবী সৃষ্টি করার পিছনে রয়েছে একটি বিশেষ উদ্দেশ্য। আর তা হল, মানুষকে পরীক্ষা করা। দ্বিতীয়তঃ তার একটি নির্দিষ্ট সময়ও রয়েছে। প্রতিশ্রুত সে সময় যখন উপস্থিত হয়ে যাবে, তখন আকাশ ও পৃথিবীর বর্তমান এ সকল নিয়ম-শৃঙ্খলা বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়বে। তখন না এই আকাশ থাকবে, আর না এই পৃথিবী। (দেখুনঃ সূরা ইবরাহীম ৪৮ আয়াত) يَوْمَ تُبَدَّلُ الْأَرْضُ غَيْرَ الْأَرْضِ وَالسَّمَاوَاتُ  (ابراهيم: ৪৮)

[2] অর্থাৎ ঈমান না আনার কারণে যখন তাদেরকে পুনরুত্থান, হিসাব-নিকাশ ও প্রতিদানের ব্যাপারে ভয় দেখানো হয়, তখন তারা তার কোন পরোয়াই করে না। না তারা তার উপর ঈমান আনে, আর না পারলৌকিক শাস্তি হতে বাঁচার কোন প্রস্তুতি গ্রহণ করে।


তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ


তাফসীর: নামকরণ : أحقاف



শব্দটি حقف এর বহুবচন, যার অর্থ হল : প্রচুর বালু, বালুর উঁচু ও লম্বা পাহাড়। কেউ অর্থ করেছেন পাহাড় ও গুহা। এটা আরব উপ-দ্বীপের দক্ষিণ পাশে তথা ইয়ামানের হাযরামাউতের নিকটস্থ হূদ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সম্প্রদায় প্রথম ‘আদ এর এলাকার নাম। সূরা আল আহক্বাফ মক্কায় অবতীর্ণ। এ সূরায় আহক্বাফ শব্দটি উল্লেখ রয়েছে আর তা থেকেই সূরার নামকরণ করা হয়েছে।



সূরাতে কয়েকটি আলোচনা স্থান পেয়েছে : (১) আকাশ জমিন সৃষ্টির উদ্দেশ্য এবং এর একটি নির্দিষ্ট সময় রয়েছে, সময় শেষ হলে সব শেষ হয়ে যাবে। (২) আল্লাহ তা‘আলাই একমাত্র সব কিছুর সৃষ্টিকর্তা এবং যারা আল্লাহ তা‘আলা ছাড়া অন্যদেরকে মা‘বূদ হিসেবে ডাকে তারা সবচেয়ে পথভ্রষ্ট। (৩) মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কোন নতুন রাসূল নন, বরং তাঁর মত অনেক রাসূল অতীতে চলে গেছেন। (৪) কাফিরদের দাবী- মুহাম্মাদ যে ইসলাম নিয়ে এসেছে তা কল্যাণকর হলে আমরাই তা প্রথমে গ্রহণ করতাম। (৫) পিতা-মাতার সাথে সদাচরণ এবং তাদের অবদান উল্লেখ করা হয়েছে, সবশেষে আহকাফবাসী ও তাদের ওপর আপতিত শাস্তি সম্পর্কে তুলে ধরা হয়েছে।



১-৩ নম্বর আয়াতের তাফসীর :



حٰمٓ (হা-মীম) এ জাতীয় “হুরূফুল মুক্বাত্বআত” বা বিচ্ছিন্ন অক্ষরসমূহ সম্পর্কে সূরা বাক্বারার শুরুতে আলোচনা করা হয়েছে। এর অর্থ ও প্রকৃত উদ্দেশ্য আল্লাহ তা‘আলাই ভাল জানেন।



মক্কার কাফির-মুশরিকরা মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নবুওয়াতকে অস্বীকার, তাঁর প্রতি অবতীর্ণ কিতাবকে অবিশ্বাস, বরং এটা মানব রচিত একটি কিতাব বলে বিশ্বাস করার কথা খণ্ডন করে আল্লাহ তা‘আলা বলেন : এ কুরআন পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময় আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ থেকে অবতারিত। এর বিধি-বিধান সত্য, এতে কোন প্রকার সন্দেহ সংশয় নেই।



আল্লাহ তা‘আলা বলেন,



(وَإِنَّه۫ لَكِتٰبٌ عَزِيْزٌ لا ‏- لَّا يَأْتِيْهِ الْبَاطِلُ مِنْمبَيْنِ يَدَيْهِ وَلَا مِنْ خَلْفِه۪ ط تَنْزِيْلٌ مِّنْ حَكِيْمٍ حَمِيْدٍ)‏



“এবং এটা অবশ্যই এক মহিমাময় গ্রন্থ। কোন মিথ্যা এতে অনুপ্রবেশ করবে না- অগ্র হতেও নয়, পশ্চাত হতেও নয়। এটা প্রজ্ঞাময়, প্রশংসনীয় আল্লাহর নিকট হতে অবতীর্ণ।” (সূরা হা-মীম আস্ সাজদাহ্ ৪১ : ৪১-৪২)



আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন,



(وَاِنَّھ۫ لَتَنْزِیْلُ رَبِّ الْعٰلَمِیْنَﰏﺚنَزَلَ بِھِ الرُّوْحُ الْاَمِیْنُﰐﺫعَلٰی قَلْبِکَ لِتَکُوْنَ مِنَ الْمُنْذِرِیْنَﰑﺫبِلِسَانٍ عَرَبِیٍّ مُّبِیْنٍﰒ)



“নিশ্চয়ই এ কুরআন জগতসমূহের প্রতিপালক হতে অবতীর্ণ। জিব্রাঈল এটা নিয়ে অবতরণ করেছে তোমার হৃদয়ে, যাতে তুমি সতর্ককারী হতে পার। (অবতীর্ণ করা হয়েছে) সুস্পষ্ট আরবি ভাষায়।” (সূরা আশ্ শু‘আরা- ২৬ : ১৯২-১৯৫)



(بِالْحَقِّ وَأَجَلٍ مُسَمًّي)



‘সত্যতার সাথে ও এক নির্দিষ্ট সময়ের জন্য’ অর্থাৎ আকাশসমূহ ও জমিন সৃষ্টির পেছনে আল্লাহ তা‘আলা দুটি বিষয় সম্পৃক্ত করে দিয়েছেন- (১) আল্লাহ তা‘আলা সত্যসহ আকাশ ও জমিন সৃষ্টি করেছেন, অনর্থক সৃষ্টি করেননি, বরং সৃষ্টির পেছনে রয়েছে বিশেষ উদ্দেশ্য, আর তা হল : মানুষকে পরীক্ষা করার জন্য যে, কে সৎ আমলে উত্তম।



আল্লাহ তা‘আলা বলেন :



(ھُوَ الَّذِیْ خَلَقَ السَّمٰوٰتِ وَالْاَرْضَ فِیْ سِتَّةِ اَیَّامٍ وَّکَانَ عَرْشُھ۫ عَلَی الْمَا۬ئِ لِیَبْلُوَکُمْ اَیُّکُمْ اَحْسَنُ عَمَلًاﺚ وَلَئِنْ قُلْتَ اِنَّکُمْ مَّبْعُوْثُوْنَ مِنْۭ بَعْدِ الْمَوْتِ لَیَقُوْلَنَّ الَّذِیْنَ کَفَرُوْٓا اِنْ ھٰذَآ اِلَّا سِحْرٌ مُّبِیْنٌ‏)‏



“আর তিনিই আকাশসমূহ ও পৃথিবী ছয়দিনে সৃষ্টি করেন, তখন তাঁর ‘র্আশ ছিল পানির ওপর, (সৃষ্টি করেছেন) তোমাদের মধ্যে কে সৎকর্মে শ্রেষ্ঠ তা পরীক্ষা করার জন্য। তুমি যদি বল : ‎ ‘মৃত্যুর পর তোমরা অবশ্যই উত্থিত হবে’, কাফিররা নিশ্চয়ই বলবে, ‘এটা তো সুস্পষ্ট জাদু।’ (সূরা হূদ ১১ : ৭)



অন্যত্র আল্লাহ তা‘আলা বলেন :



(إِنَّا جَعَلْنَا مَا عَلَي الْأَرْضِ زِيْنَةً لَّهَا لِنَبْلُوَهُمْ أَيُّهُمْ أَحْسَنُ عَمَلًا ‏)‏



“পৃথিবীর ওপর যা কিছু আছে আমি সেগুলোকে তার শোভা সৌন্দর্যমণ্ডিত করেছি, মানুষকে এ পরীক্ষা করার জন্য যে, তাদের মধ্যে সৎকর্মে কে শ্রেষ্ঠ।” (সূরা কাহ্ফ ১৮ : ৭)



এছাড়াও এ ব্যাপারে অনেক আয়াত প্রমাণ করে আল্লাহ তা‘আলা অনর্থক এ মহা আকাশ ও জমিন সৃষ্টি করেননি। (২) এ আকাশ ও জমিন সৃষ্টি করেছেন একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য। যখন প্রতিশ্র“ত সময় উপস্থিত হবে তখন আকাশ ও পৃথিবীর বর্তমান এ সকল নিয়মশৃংখলা ভেঙ্গে পড়বে। তা হল কিয়ামত দিবস। তখন আর আকাশ ও জমিন থাকবেনা। আল্লাহ তা‘আলা বলেন :



(يَوْمَ تُبَدَّلُ الْأَرْضُ غَيْرَ الْأَرْضِ وَالسَّمٰوٰتُ وَبَرَزُوْا لِلّٰهِ الْوَاحِدِ الْقَهَّارِ ‏)‏



“যেদিন এ পৃথিবী পরিবর্তিত হয়ে অন্য পৃথিবী হবে এবং আকাশসমূহও; এবং মানুষ উপস্থিত হবে আল্লাহর সম্মুখে- যিনি এক, পরাক্রমশালী।” (সূরা ইবরাহীম ১৪ : ৪৮)



অন্যত্র আল্লাহ তা‘আলা বলেন :



(وَيَسْئَلُوْنَكَ عَنِ الرُّوْحِ ط قُلِ الرُّوْحُ مِنْ أَمْرِ رَبِّيْ وَمَآ أُوْتِيْتُمْ مِّنَ الْعِلْمِ إِلَّا قَلِيْلًا ‏)‏



“আর তোমাকে তারা রূহ সম্পর্কে প্রশ্ন করে। বল : ‎ ‘রূহ আমার প্রতিপালকের আদেশমাত্র এবং তোমাদেরকে জ্ঞান দেয়া হয়েছে সামান্যই।” (সূরা হিজর ১৫ : ৮৫)



(وَالَّذِينَ كَفَرُوا عَمَّا أُنْذِرُوا مُعْرِضُونَ)



‘কিন্তু যারা কাফির তাদেরকে এ বিষয়ে সাবধান করা সত্ত্বেও তা থেকে তারা মুখ ফিরিয়ে রেখেছে’ অর্থাৎ একমাত্র কাফিররাই আল্লাহ তা‘আলা ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান আনয়ন ও দীনের প্রতি আমলের সতর্কতা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়। ঈমান না আনার কারণে যখন তাদেরকে পুনরুত্থান, হিসাব-নিকাশ ও প্রতিদানের ব্যাপারে ভয় দেখানো হয় তখন তারা তার কোন পরওয়া করেনা। আল্লাহ তা‘আলা বলেন :



(وَمَا تَأْتِيْهِمْ مِّنْ اٰيَةٍ مِّنْ اٰيٰتِ رَبِّهِمْ إِلَّا كَانُوْا عَنْهَا مُعْرِضِيْنَ) ‏



“তাদের প্রতিপালকের নিদর্শনাবলীর এমন কোন নিদর্শন তাদের নিকট উপস্থিত হয় না যা হতে তারা মুখ না ফেরায়।” (সূরা আন‘আম ৬ : ৪)



তাই আল্লাহ তা‘আলার দীন থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়া, দীনি জ্ঞানার্জন না করা ও আল্লাহ তা‘আলার ইবাদত না করা কুফরী কাজ। কেউ কেউ এদেরকে নাস্তিক এবং ধর্মনিরপেক্ষবাদী বলেছেন। আসলে এরা হলো শয়তান পূজারী। পৃথিবীতে এমন কেউ নেই যে ইবাদত করে না। যে আল্লাহ তা‘আলার ইবাদত করে না, প্রকৃত পক্ষে সে শয়তানের ইবাদত করে।



আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয় :



১. আকাশ ও জমিন সৃষ্টির মূল উদ্দেশ্য মানুষকে পরীক্ষা করা, কে সৎ আমলে উত্তম।

২. দুনিয়া একদিন ধ্বংস হয়ে যাবে। সেদিন দুনিয়ার এ নিয়ম-কানুন বহাল থাকবে না।

৩. আল্লাহ তা‘আলার দীন থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়া, দীনি জ্ঞানার্জন না করা ও আল্লাহ তা‘আলার ইবাদত না করা কুফরী কাজ।


তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)


তাফসীর: ১-৬ নং আয়াতের তাফসীর:

আল্লাহ তা'আলা খবর দিচ্ছেন যে, তিনি এই কুরআন কারীম স্বীয় বান্দা ও রাসূল হযরত মুহাম্মাদ (সঃ)-এর উপর অবতীর্ণ করেছেন। তিনি এমনই সম্মানের অধিকারী যে, তা কখনো নষ্ট হবার নয় এবং তিনি এমনই প্রজ্ঞাময় যে, তাঁর কোন কথা ও কাজ প্রজ্ঞাশূন্য নয়।

এরপর ইরশাদ হচ্ছে যে, আল্লাহ তা'আলা আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী এবং এতোদুভয়ের সব জিনিসই যথাযথভাবে নির্দিষ্ট কালের জন্যে সৃষ্টি করেছেন। কোনটাই তিনি অযথা ও বৃথা সৃষ্টি করেননি।

(আরবী) -এর অর্থ হচ্ছে নির্দিষ্ট কাল, যা বৃদ্ধিও পাবে না এবং কমেও যাবে। এই রাসূল (সঃ), এই কিতাব (কুরআন) এবং সতর্ককারী অন্যান্য নিদর্শনাবলী হতে যে দুষ্টমতি লোকেরা মুখ ফিরিয়ে নেয় এবং বেপরোয়া হয় তারা নিজেদের কি পরিমাণ ক্ষতি করেছে তা তারা সত্বরই জানতে পারবে।

মহান আল্লাহ স্বীয় নবী (সঃ)-কে বলেনঃ এই মুশরীকদেরকে তুমি জিজ্ঞেস কর- তোমরা আল্লাহর পরিবর্তে যাদেরকে ডাকো এবং যাদের ইবাদত কর, তাদের কথা কিছু ভেবে দেখেছো কি? তারা পৃথিবীতে কি সৃষ্টি করেছে আমাকে দেখাও তো? অথবা আকাশমণ্ডলীতে তাদের কোন অংশীদারিত্ব আছে কি? প্রকৃত ব্যাপার তো এই যে, আকাশ হোক, পৃথিবী হোক, যে কোন জিনিসই হোক না কেন সবকিছুরই সৃষ্টিকর্তা একমাত্র আল্লাহ। তিনি ছাড়া কারো এক অণুপরিমাণ জিনিসেরও অধিকার নেই। সমগ্র রাজ্যের মালিক তিনিই। প্রত্যেক জিনিসের উপর পূর্ণ ক্ষমতাবান একমাত্র তিনি। তিনিই সবকিছুর ব্যবস্থাপক। সবকিছুরই উপর পূর্ণ অধিকার একমাত্র তিনিই রাখেন। সুতরাং মানুষ তাঁর ছাড়া অন্যদের ইবাদত কেন করে? কেন তারা তাদের বিপদ-আপদের সময় অল্লাহ ছাড়া অন্যকে ডাকে? কে তাদেরকে এ শিক্ষা দিয়েছে? কে তাদেরকে এ শিরক করতে | শিখিয়েছে? প্রকতপক্ষে কোন সৎ ও জ্ঞানী মানুষের এ শিক্ষা হতে পারে না ।
মহান আল্লাহ তাদেরকে এ শিক্ষা দেননি। তাই তো তিনি বলেনঃ “পূর্ববর্তী কোন কিতাব অথবা পরম্পরাগত কোন জ্ঞান থাকলে তা আমার নিকট উপস্থিত কর, যদি তোমরা সত্যবাদী হও।' কিন্তু আসলে তো এটা তোমাদের বাজে ও বাতিল কাজ। সুতরাং তোমরা এর স্বপক্ষে না পারবে কোন শরীয়ত সম্মত দলীল পেশ করতে এবং না পারবে কোন জ্ঞান সম্মত দলীল পেশ করতে। এক কিরআতে (আরবী) রয়েছে। অর্থাৎ তোমাদের পূর্ববর্তীদের হতে কোন সঠিক জ্ঞানের বর্ণনা পেশ কর।

মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছেঃ এমন কাউকেও উপস্থিত কর যে সঠিক ইলমের বর্ণনা দিতে পারে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, ভাবার্থ হচ্ছেঃ এই বিষয়ের কোন দলীল আনয়ন কর।

মুসনাদে আহমাদে রয়েছে যে, এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো জ্ঞান-লিপি। বর্ণনাকারী বলেন যে, তাঁর ধারণামতে এ হাদীসটি মার'। হযরত আবু বকর ইবনে আইয়াশ (রঃ) বলেন যে, এর দ্বারা বাকী ইলমকে বুঝানো হয়েছে। হযরত হাসান বসরী (রঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছেঃ ‘কোন গোপন দলীলও পেশ কর?' এই সব গুরুজন হতে এটাও বর্ণিত আছে যে, এর দ্বারা পূর্ববতী লিপি উদ্দেশ্য। হযরত কাতাদা (রঃ) বলেন যে, এর দ্বারা কোন বিশেষ জ্ঞানকে বুঝানো হয়েছে। এসব উক্তি প্রায় একই অর্থবোধক। ভাবার্থ ওটাই যা আমরা প্রথমে বর্ণনা করেছি। ইমাম ইবনে জারীরও (রঃ) এটাকেই পছন্দ করেছেন।

এরপর ইরশাদ হচ্ছেঃ “ঐ ব্যক্তি অপেক্ষা অধিক বিভ্রান্ত কে যে আল্লাহর পরিবর্তে এমন কিছুকে ডাকে যা কিয়ামত দিবস পর্যন্তও তার ডাকে সাড়া দিবে না? এবং এগুলো তাদের প্রার্থনা সম্বন্ধে অবহিতও নয়। কেননা এগুলো তো পাথর এবং জড় পদার্থ। এরা না শুনতে পায়, না দেখতে পায়।

কিয়ামতের দিন যখন সব মানুষকে একত্রিত করা হবে তখন এসব বাতিল মা'বুদ বা উপাস্য তাদের উপাসকদের শত্রু হয়ে যাবে এবং তারা এদের ইবাদত অস্বীকার করবে। যেমন আল্লাহ তা'আলা অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তারা আল্লাহ ব্যতীত অন্য মাবুদ গ্রহণ করে এ জন্যে যে, যাতে তারা তাদের সহায় হয়। কখনই নয়; তারা তাদের ইবাদত অস্বীকার করবে এবং তাদের বিরোধী হয়ে যাবে।”(১৯:৮১-৮২) অর্থাৎ যখন এরা তাদের পূর্ণ মুখাপেক্ষী হবে তখন তারা মুখ ফিরিয়ে নিবে।

হযরত ইবরাহীম খলীলুল্লাহ (সঃ) তাঁর উম্মতকে বলেছিলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তোমরা আল্লাহ ব্যতীত প্রতিমাগুলোর সাথে যে পার্থিব সম্পর্ক স্থাপন করেছো এর ফলাফল তোমরা কিয়ামতের দিন দেখে নিবে, যখন তোমরা একে অপরকে অস্বীকার করবে এবং একে অপরকে লা'নত করবে, আর তোমাদের আশ্রয়স্থল হবে জাহান্নাম এবং তোমাদের জন্যে কোন সাহায্যকারী হবে না।”





সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।