আল কুরআন


সূরা আশ-শূরা (আয়াত: 8)

সূরা আশ-শূরা (আয়াত: 8)



হরকত ছাড়া:

ولو شاء الله لجعلهم أمة واحدة ولكن يدخل من يشاء في رحمته والظالمون ما لهم من ولي ولا نصير ﴿٨﴾




হরকত সহ:

وَ لَوْ شَآءَ اللّٰهُ لَجَعَلَهُمْ اُمَّۃً وَّاحِدَۃً وَّ لٰکِنْ یُّدْخِلُ مَنْ یَّشَآءُ فِیْ رَحْمَتِهٖ ؕ وَ الظّٰلِمُوْنَ مَا لَهُمْ مِّنْ وَّلِیٍّ وَّ لَا نَصِیْرٍ ﴿۸﴾




উচ্চারণ: ওয়ালাও শাআল্লা-হু লাজা‘আলাহুম উম্মাতাওঁ ওয়া-হিদাতাওঁ ওয়ালা-কিইঁ ইউদ খিলুমাইঁ ইয়াশাউ ফী রাহমাতিহী ওয়াজ্জা-লিমূনা মা-লাহুম মিওঁ ওয়ালিইয়িওঁ ওয়ালা-নাসীর।




আল বায়ান: আল্লাহ ইচ্ছা করলে তাদেরকে এক জাতিভুক্ত করতে পারতেন; কিন্তু তিনি যাকে চান তাঁর রহমতে প্রবেশ করান আর যালিমদের জন্য কোন অভিভাবক নেই, সাহায্যকারীও নেই।




আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৮. আর আল্লাহ ইচ্ছে করলে তাদেরকে একই উম্মত করতে পারতেন; কিন্তু তিনি যাকে ইচ্ছে তাকে স্বীয় অনুগ্রহে প্ৰবেশ করান। আর যালিমরা, তাদের কোন অভিভাবক নেই, কোন সাহায্যকারীও নেই।




তাইসীরুল ক্বুরআন: আল্লাহ ইচ্ছে করলে তাদেরকে একই উম্মত করতেন, কিন্তু তিনি যাকে ইচ্ছে তাঁর রহমাতের মধ্যে দাখিল করেন, আর যালিমদের জন্য নেই কোন অভিভাবক, নেই কোন সাহায্যকারী।




আহসানুল বায়ান: (৮) আল্লাহ ইচ্ছা করলে মানুষকে একই জাতিভুক্ত (একই মতাদর্শের অনুসারী) করতে পারতেন;[1] কিন্তু তিনি যাকে ইচ্ছা তাকে স্বীয় অনুগ্রহের অধিকারী করে থাকেন। আর সীমালংঘনকারীদের কোন অভিভাবক নেই, কোন সাহায্যকারীও নেই।



মুজিবুর রহমান: আল্লাহ ইচ্ছা করলে মানুষকে একই উম্মাত করতে পারতেন। বস্তুতঃ তিনি যাকে ইচ্ছা তাকে স্বীয় অনুগ্রহের অধিকারী করেন। যালিমদের কোন অভিভাবক নেই, কোন সাহায্যকারীও নেই।



ফযলুর রহমান: আল্লাহ ইচ্ছা করলে তাদেরকে (সব মানুষকে) এক জাতি করতে পারতেন। কিন্তু তিনি যাকে ইচ্ছা তাঁর রহমতের অন্তর্ভুক্ত করেন। আর জালেমদের জন্য কোন অভিভাবক কিংবা সাহায্যকারী নেই।



মুহিউদ্দিন খান: আল্লাহ ইচ্ছা করলে সমস্ত লোককে এক দলে পরিণত করতে পারেন। কিন্তু তিনি যাকে ইচ্ছা স্বীয় রহমতে দাখিল করেন। আর যালেমদের কোন অভিভাবক ও সাহায্যকারী নেই।



জহুরুল হক: আর আল্লাহ্ যদি চাইতেন তাহলে তিনি তাদের একই সম্প্রদায় করতে পারতেন, কিন্ত তিনি তাঁর করুণার মধ্যে প্রবেশ করান যাকে তিনি ইচ্ছে করেন। আর অনাচারীরা -- তাদের জন্যে কোনো অভিভাবক নেই আর কোনো সাহায্যকারীও নেই।



Sahih International: And if Allah willed, He could have made them [of] one religion, but He admits whom He wills into His mercy. And the wrongdoers have not any protector or helper.



তাফসীরে যাকারিয়া

অনুবাদ: ৮. আর আল্লাহ ইচ্ছে করলে তাদেরকে একই উম্মত করতে পারতেন; কিন্তু তিনি যাকে ইচ্ছে তাকে স্বীয় অনুগ্রহে প্ৰবেশ করান। আর যালিমরা, তাদের কোন অভিভাবক নেই, কোন সাহায্যকারীও নেই।


তাফসীর:

-


তাফসীরে আহসানুল বায়ান

অনুবাদ: (৮) আল্লাহ ইচ্ছা করলে মানুষকে একই জাতিভুক্ত (একই মতাদর্শের অনুসারী) করতে পারতেন;[1] কিন্তু তিনি যাকে ইচ্ছা তাকে স্বীয় অনুগ্রহের অধিকারী করে থাকেন। আর সীমালংঘনকারীদের কোন অভিভাবক নেই, কোন সাহায্যকারীও নেই।


তাফসীর:

[1] এই অবস্থায় কিয়ামতের দিন কেবল একটাই দল হত। অর্থাৎ, ঈমানদার জান্নাতীদের। কিন্তু আল্লাহর সুকৌশল ও ইচ্ছা এই বাধ্যকরণকে পছন্দ করেনি। বরং মানুষদেরকে পরীক্ষা করার জন্য তিনি তাদেরকে (করা না করার) ইচ্ছা ও এখতিয়ারের স্বাধীনতা দান করেছেন। যে এই স্বাধীনতার সঠিক ব্যবহার করে, সে আল্লাহর রহমতের অধিকারী হয়ে যায়। আর যে তার অপব্যবহার করে, সে প্রকৃতপক্ষে অন্যায়ভাবে আল্লাহর দেওয়া স্বাধীনতা ও এখতিয়ারকে আল্লাহরই অবাধ্যতায় ব্যবহার করে। সুতরাং কিয়ামতের দিন এ রকম অন্যায়কারী যালেমদের কোন সাহায্যকারী হবে না।


তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ


তাফসীর: ৭-৮ নম্বর আয়াতের তাফসীর :



কুরআনুল কারীম অবতীর্ণ করা হয়েছে বা অবতীর্ণ করার একমাত্র উদ্দেশ্য এই যে, মানুষদেরকে জাহান্নামের শাস্তির ব্যাপারে সতর্ক করা এবং জান্নাতের আরাম-আয়েশের ব্যাপারে সুসংবাদ প্রদান করা। যাতে মানুষ শাস্তির ভয়ে এবং জান্নাত লাভের আকাক্সক্ষায় বেশি বেশি সৎ আমল করে এবং খারাপ কাজ থেকে বিরত থাকে।



وَكَذٰلِكَ অর্থাৎ যেভাবে পূর্ববর্তী নাবীদের প্রতি ওয়াহী করেছি তেমনি তোমার প্রতি এ কুরআন আরবি ভাষায় ওয়াহীর মাধ্যমে নাযিল করেছি। প্রথম আয়াতে এ সম্পর্কে বলা হয়েছে।



(أُمَّ الْقُرٰي) উম্মূল কুরা- দ্বারা এখানে পবিত্র মক্কা মুর্কারমাকে বুঝানো হয়েছে। আর মক্কাকে বিশেষ করে উল্লেখ করার কারণ সূরা আন‘আমের ৯২ নম্বর আয়াতে আলোচনা করা হয়েছে।



আর মক্কাকে “উম্মুল কুরা” বলার কারণ হলো এটা সমস্ত শহর হতে শ্রেষ্ঠ। হাদীসে বলা হয়েছে-



‘আবদুল্লাহ ইবনু আদী হামরা ইবনুল যুহরী (রাঃ) হতে বর্ণিত, একদা রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মক্কার এক বাজারে দাঁড়িয়েছিলেন। এমতাবস্থায় তিনি রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে বলতে শুনেন : হে মক্কাভূমি! আল্লাহ তা‘আলার শপথ! তুমি আল্লাহ তা‘আলার কাছে সবচেয়ে উত্তম এবং সবচেয়ে প্রিয় ভূমি। আল্লাহ তা‘আলার শপথ! যদি তোমার থেকে আমাকে বের করে দেয়া না হত তাহলে আমি কখনো তোমাকে ছেড়ে যেতাম না। (মুসনাদ আহমাদ ৪/৩০৫, আত্ তিরমিযী হা. ৩৯২৫, হাসান সহীহ, গরীব)



حَوْلَهَا দ্বারা প্রাচ্যের ও পাশ্চাত্যের সমস্ত শহর ও জনপদকে বুঝানো হয়েছে। অর্থাৎ সমস্ত মানব জাতি। এ আয়াত এটাও প্রমাণ করছে, নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) শুধু আরবদের নাবী নন; বরং সারা জাহানের নাবী।



(يَوْمَ الْجَمْعِ)



দ্বারা কিয়ামত দিবস বুঝানো হয়েছে। এ দিনের ব্যাপারে কোনই সন্দেহ সংশয় নেই। আল্লাহ তা‘আলার বাণী :



(يَوْمَ يَجْمَعُكُمْ لِيَوْمِ الْجَمْعِ ذٰلِكَ يَوْمُ التَّغَابُنِ)



“(স্মরণ কর!) যেদিন তিনি তোমাদেরকে সমবেত করবেন মহা সমাবেশ দিবসে সেদিন হবে লাভ লোকসানের দিন।” (সূরা তাগাবুন ৬৪ : ৯)



(فَرِيْقٌ فِي الْجَنَّةِ وَفَرِيْقٌ فِي السَّعِيْر)



‘(সেদিন) একদল জান্নাতে প্রবেশ করবে এবং একদল জাহান্নামে প্রবেশ করবে’ অর্থাৎ কিয়ামতের দিন বিচার ফায়সালা করার পর একদল হবে জান্নাতী আর একদল হবে জাহান্নামী। যারা দুনিয়াতে ভাল কাজ করবে তারা হবে জান্নাতী আর যারা খারাপ কাজ করবে তারা হবে জাহান্নামী। আল্লাহ তা‘আলা বলেন :



( يَوْمَ يَأْتِ لَا تَكَلَّمُ نَفْسٌ إِلَّا بِإِذْنِه۪ج فَمِنْهُمْ شَقِيٌّ وَّسَعِيْدٌ فَأَمَّا الَّذِيْنَ شَقُوْا فَفِي النَّارِ لَهُمْ فِيْهَا زَفِيْرٌ وَّشَهِيْقٌ)



“যখন সেদিন আসবে তখন আল্লাহর অনুমতি ব্যতীত কেউ কথা বলতে পারবে না; তাদের মধ্যে কেউ হবে হতভাগ্য ও কেউ ভাগ্যবান। অতঃপর যারা হতভাগ্য তারা থাকবে অগ্নিতে এবং সেথায় তাদের জন্য থাকবে চীৎকার ও আর্তনাদ। (সূরা হূদ ১১ : ১০৫-১০৬)



আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন :



(هُوَ الَّذِيْ خَلَقَكُمْ فَمِنْكُمْ كٰفِرٌ وَّمِنْكُمْ مُّؤْمِنٌ ط وَاللّٰهُ بِمَا تَعْمَلُوْنَ بَصِيْرٌ)



‏“তিনিই তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন, অতঃপর তোমাদের মধ্যে কেউ হয় কাফির এবং কেউ হয় মু’মিন। তোমরা যা কর আল্লাহ তার সম্যক দ্রষ্টা। (সূরা তাগাবুন ৬৪ : ২)



হাদীসে বলা হয়েছে, আবূ নাযরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আবূ আব্দুল্লাহ (রাঃ) নামক একজন সাহাবী রুগ্ন ছিলেন। সাহাবীগণ তাকে দেখতে যান। তারা দেখেন যে, তিনি ফুপিয়ে কাঁদছেন। তারা তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, আপনি কাঁদছেন কেন? অথচ রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আপনাকে শুনিয়েছেন : গোঁফ ছোট করে রাখবে যে পর্যন্ত না তুমি আমার সাথে মিলিত হবে। ঐ সাহাবী উত্তরে বললেন : এটা ঠিকই বটে। কিন্তু আমাকেতো ঐ হাদীসটি কাঁদাচ্ছে যে, আমি রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে বলতে শুনেছি, আল্লাহ তা‘আলা স্বীয় ডান মুষ্টির মধ্যে কিছু মাখলূক রাখেন অনুরূপভাবে অপর মুষ্টির মধ্যেও কিছু মাখলূক রাখেন, অতঃপর বলেন : এ লোকগুলো জান্নাতের জন্য এবং এ লোকগুলো জাহান্নামের জন্য, আর এতে আমি কোন পরোয়া করি না। সুতরাং আমার জানা নেই যে, আমি তাঁর কোন মুষ্টির মধ্যে আছি। (আহমাদ ৪/১৭৬) এটি তাকদীর প্রমাণকারী একটি হাদীস। তাকদীর প্রমাণ করার আরো বহু হাদীস আলী, ইবনু মাসঊদ ও আয়িশাহ (রাঃ) প্রমুখ সাহাবী থেকে সহীহ, সুনান এবং মুসনাদ গ্রন্থে বর্ণিত আছে।



এরপর আল্লাহ তা‘আলা বলেন : যদি আমি ইচ্ছা করতাম তাহলে সকল উম্মাতকে একই উম্মাতে পরিণত করতে পারতাম। অর্থাৎ সকলেই হিদায়াত লাভ করত, ফলে সকলেই জান্নাতে প্রবেশ করত। কিন্তু এটা তিনি করেননি এজন্য যে, যাতে তিনি সকলকে পরীক্ষা করতে পারেন। এ সম্পর্কে পূর্বে আলোচনা করা হয়েছে।



সুতরাং আমল বর্জন করে হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকার কোন সুযোগ নেই। বরং তাকদীরের ওপর বিশ্বাস রেখে সৎ আমলের প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে।



আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয় :



১. কুরআন পাপাচারীদের জন্য সতর্ককারী ও মু’মিনদের জন্য সুসংবাদবাহী একটি গ্রন্থ।

২. মানুষের মধ্যে একদল জান্নাতী এবং একদল জাহান্নামী হবে।

৩. মানুষকে সৃষ্টি করা হয়েছে মূলত পরীক্ষা করার জন্য- কে ভাল কাজ করে আর কে মন্দ কাজ করে।


তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)


তাফসীর: ৭-৮ নং আয়াতের তাফসীর:

আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ হে নবী (সঃ)! তোমার পূর্ববর্তী নবীদের উপর যেমন আল্লাহর অহী আসতো, অনুরূপভার তোমার উপরও এই কুরআন অহীর মাধ্যমে। অবতীর্ণ করা হয়েছে। এর ভাষা আরবী এবং এর বর্ণনা খুবই স্পষ্ট ও খোলাখুলি। যাতে তুমি মক্কাবাসী এবং ওর চতুর্দিকের জনগণকে সতর্ক করতে। পার। অর্থাৎ তাদেরকে ভয় প্রদর্শন করতে পার আল্লাহর আযাব হতে। দ্বারা প্রাচ্যের ও পাশ্চাত্যের সমস্ত শহরকে ও জনপদকে বুঝানো হয়েছে। মক্কা শরীফকে ‘উম্মুল কুরা’ বলার কারণ এই যে, এটা সমস্ত শহর হতে ভাল ও উত্তম। এর বহু দলীল প্রমাণ রয়েছে যেগুলো নিজ নিজ জায়গায় বর্ণিত হবে। এখানে একটি দলীল বর্ণনা করা হচ্ছে যা সংক্ষিপ্ত এবং স্পষ্টও বটে।

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আদী হামরা যুহরী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) মক্কার হাশূরাহ নামক বাজারে দাঁড়িয়েছিলেন এমতাবস্থায় তিনি তাঁকে বলতে শুনেনঃ “হে মক্কাভূমি! আল্লাহর কসম! তুমি আল্লাহর সবচেয়ে উত্তম ভূমি এবং আল্লাহর নিকট সবচেয়ে প্রিয় ভূমি। আল্লাহর কসম! যদি তোমার উপর হতে আমাকে বের করে দেয়া না হতো তবে আমি কখনো তোমাকে ছেড়ে যেতাম না।” (এ হাদীসটি ইমাম তিরমিযী (রঃ), ইমাম নাসাঈ (রঃ) এবং ইমাম ইবনে মাজাহ (রঃ) বর্ণনা করেছেন। ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে হাসান সহীহ বলেছেন)

মহান আল্লাহ বলেনঃ আর এই কুরআন আমি তোমার প্রতি এজন্যে অবতীর্ণ করেছি যে, যেন তুমি মানুষকে সতর্ক করতে পার কিয়ামত দিবস সম্পর্কে যাতে কোন সন্দেহ নেই। যেদিন কিছু লোক জান্নাতে প্রবেশ করবে এবং কিছু লোক জাহান্নামে যাবে। এটা এমন দিন হবে যে, জান্নাতীরা লাভবান হবে এবং জাহান্নামীরা হবে ক্ষতিগ্রস্ত। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “স্মরণ কর, যেদিন তিনি তোমাদেরকে সমবেত করবেন সমাবেশ দিবসে সেদিন হবে লাভ লোকসানের দিন।”(৬৪:৯) অন্য এক জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “এতে নিশ্চয়ই ঐ ব্যক্তির জন্যে নিদর্শন রয়েছে যে আখিরাতের আযাবকে ভয় করে। ওটা হলো ঐ দিন যেই দিন সমস্ত মানুষকে একত্রিত করা হবে এবং (সবারই) উপস্থিতির দিন। আমি এটাকে নির্দিষ্ট সময়ের জন্যে বিলম্বিত করছি। ঐদিন কেউই আল্লাহর অনুমতি ছাড়া কথা বলতে পারবে না। তাদের মধ্যে কেউ হবে হতভাগ্য এবং কেউ হবে ভাগ্যবান।”(১১:১০৩-১০৫)।

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাদের নিকট আগমন করেন। ঐ সময় তার হাতে দু'টি কিতাব ছিল। তিনি আমাদেরকে জিজ্ঞেস করেনঃ “এ কিতাব দু’টি কি তা তোমরা জান কি?” আমরা উত্তরে বললামঃ আমাদের এটা জানা নেই। হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমাদেরকে এর খবর দিন। তখন তিনি তার ডান হাতের কিতাবটির দিকে ইঙ্গিত করে বলেনঃ “এটা রাব্বল আলামীন আল্লাহ তাআলার কিতাব। এতে জান্নাতীদের এবং তাদের পিতাদের ও গোত্রসমূহের নাম রয়েছে। শেষে হিসেব করে সর্বমোট করে দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে আর কম বেশী হতে পারে না।” অতঃপর তিনি তার বাম হাতের কিতাবটির দিকে ইঙ্গিত করে বলেনঃ “এটা হলো জাহান্নামীদের নামের তালিকা বহি। এতেও তাদের নাম, তাদের পিতাদের নাম এবং তাদের গোত্রসমূহের নাম রয়েছে। শেষে হিসেব করে সর্বমোট করে দেয়া হয়েছে। সুতরাং এর মধ্যে আর কম বেশী হবে না।” তখন তার সাহাবীগণ বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! তাহলে আমাদের আমলের আর প্রয়োজন কি?” রাসূলুল্লাহ (সঃ) জবাবে বললেনঃ “ঠিকভাবে থাকো। মঙ্গল ও কল্যাণের কাছে কাছে থাকো। জান্নাতীদের পরিসমাপ্তি ভাল কাজের উপরই হবে, তারা যে কাজই করতে থাকুক না কেন। আর জাহান্নামীদের পরিসমাপ্তি মন্দ আমলের উপরই হবে, তারা যে কাজই করতে থাকুক না কেন।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) স্বীয় হস্তদ্বয় মুষ্টিবদ্ধ করলেন এবং বললেনঃ “মহামহিমান্বিত আল্লাহ স্বীয় বান্দাদের ফায়সালা শেষ করে ফেলেছেন। একদল যাবে জান্নাতে এবং একদল যাবে জাহান্নামে।” এর সাথে সাথেই রাসূলুল্লাহ (সঃ) স্বীয় ডান ও বাম হাত দ্বারা ইশারা করেন যেন তিনি কোন জিনিস নিক্ষেপ করছেন। (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ), ইমাম তিরমিযী (রঃ) এবং ইমাম নাসাঈ (রঃ) বর্ণনা।
করেছেন এবং ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে হাসান গারীব বলেছেন)

ইমাম বাগাভীর (রঃ) তাফসীরে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রাঃ) হতে অনুরূপ বর্ণনা রয়েছে এবং তাতে কিছু বেশী আছে। তাতে আছে যে, একদল যাবে জান্নাতে এবং একদল যাবে জাহান্নামে। আর মহামহিমান্বিত আল্লাহর পক্ষ হতে আদল আর আদল বা ন্যায় আর ন্যায়ই থাকবে।

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রাঃ) বলেন যে, আল্লাহ তা'আলা যখন হযরত আদম (আঃ)-কে সৃষ্টি করেন এবং তার মধ্য হতে তাঁর সন্তানদেরকে বের করেন, আর তারা পিপড়ার মত হয়ে ময়দানে ছড়িয়ে পড়ে। তখন তাদেরকে তিনি স্বীয় দুই মুষ্টির মধ্যে নিয়ে নেন এবং বলেনঃ “এগুলোর একটি অংশ পুণ্যবান এবং অপর অংশ পাপী।” আবার তাদেরকে ছড়িয়ে দেন এবং পুনরায় একত্রিত করেন এবং আবার তিনি তাদেরকে মুষ্টির মধ্যে করে নেন। একটি অংশ জান্নাতী ও আর একটি অংশ জাহান্নামী। (এ রিওয়াইয়াতটি মাওকুফ হওয়াই সঠিক কথা। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জানেন)

হযরত আবু নাযরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, আবু আবদিল্লাহ (রাঃ) নামক রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর একজন সাহাবী রুগ্ন ছিলেন। সাহাবীগণ (রাঃ) তাঁকে দেখতে যান। তারা দেখেন যে, তিনি ক্রন্দন করছেন। তাঁরা তাঁকে বলেন, আপনি কাঁদছেন কেন? অথচ রাসূলুল্লাহ (সঃ) তো আপনাকে শুনিয়েছেনঃ “গোঁফ ছোট করে রাখবে যে পর্যন্ত না তুমি আমার সাথে মিলিত হবে। ঐ সাহাবী (রাঃ) উত্তরে বললেন, এটা ঠিকই বটে। কিন্তু আমাকে তো ঐ হাদীসটি কাঁদাচ্ছে যে, আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলতে শুনেছি, আল্লাহ তা'আলা স্বীয় ডান মুষ্টির মধ্যে কিছু মাখলুক রাখেন এবং অনুরূপভাবে বাম মুষ্টির মধ্যেও কিছু মাখলুক রাখেন, অতঃপর বলেনঃ “এ লোকগুলো এর জন্যে অর্থাৎ জান্নাতের জন্যে এবং এ লোকগুলো এর জন্যে অর্থাৎ জাহান্নামের জন্যে। আর এতে আমি কোন পরোয়া করি না। সুতরাং আমার জানা নেই যে, আমি তার কোন মুষ্টির মধ্যে ছিলাম। (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন) তকদীর প্রমাণ করার আরো বহু হাদীস রয়েছে।

এরপর আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলেনঃ আল্লাহ ইচ্ছা করলে মানুষকে একই উম্মত করতে পারতেন, অর্থাৎ হয় সকলকেই হিদায়াত দান করতেন, না হয় সকলকেই পথভ্রষ্ট করতেন। কিন্তু আল্লাহ এদের মধ্যে পার্থক্য রেখে দিয়েছেন। কাউকেও তিনি হিদায়াতের উপর রেখেছেন এবং কাউকেও সুপথ হতে ফিরিয়ে দিয়েছেন। তার হিকমত বা নিপুণতা তিনিই জানেন। তিনি যাকে ইচ্ছা স্বীয় অনুগ্রহের অধিকারী করেন। আর যালিমদের কোন অভিভাবক নেই, নেই কোন সাহায্যকারী।

ইবনে হাজীরাহ (রঃ)-এর নিকট এ খবর পৌঁছেছে যে, হযরত মূসা (আঃ) আরয করেনঃ “হে আমার প্রতিপালক! আপনি আপনার মাখলুককে সৃষ্টি করেছেন, অতঃপর তাদের কতকগুলোকে নিয়ে যাবেন জান্নাতে এবং কতকগুলোকে নিয়ে যাবেন জাহান্নামে। যদি সবকেই জান্নাতে প্রবিষ্ট করতেন তবে কতই না ভাল হতো!” তখন আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা বলেনঃ “হে মূসা (আঃ)! তোমার জামাটি উঁচু কর।” তিনি তখন তাঁর জামাটি উচু করলেন। মহান আল্লাহ আবার বললেনঃ “আরো উঁচু করে ধর। হযরত মূসা (আঃ) বললেনঃ “হে আল্লাহ! আমি আমার সারা দেহ হতে তো আমার জামাটি উঁচু করেছি, শুধু ঐ জায়গাটুকু বাকী রয়েছে যার উপর হতে সরানোর মধ্যে কোন কল্যাণ নেই।” তখন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “হে মূসা (আঃ)! এরূপভাবেই আমি আমার সমস্ত মাখলুককেই জান্নাতে প্রবিষ্ট করবো, শুধু তাদেরকে নয় যারা সম্পূর্ণরূপে কল্যাণ শূন্য হবে।” (এটা ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন)





সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।