সূরা আশ-শূরা (আয়াত: 6)
হরকত ছাড়া:
والذين اتخذوا من دونه أولياء الله حفيظ عليهم وما أنت عليهم بوكيل ﴿٦﴾
হরকত সহ:
وَ الَّذِیْنَ اتَّخَذُوْا مِنْ دُوْنِهٖۤ اَوْلِیَآءَ اللّٰهُ حَفِیْظٌ عَلَیْهِمْ ۫ۖ وَ مَاۤ اَنْتَ عَلَیْهِمْ بِوَکِیْلٍ ﴿۶﴾
উচ্চারণ: ওয়াল্লাযীনাত্তাখাযূমিন দূ নিহীআওলিয়াআল্লা-হু হাফীজুন ‘আলাইহিম ওয়ামা আনতা ‘আলাইহিম বিওয়াকীল।
আল বায়ান: আর যারা তাঁর পরিবর্তে অন্যদেরকে অভিভাবকরূপে গ্রহণ করে, আল্লাহ তাদের প্রতি সম্যক দৃষ্টিদাতা এবং তুমি তাদের কর্মবিধায়ক নও।
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৬. আর যারা তাঁর পরিবর্তে অন্যদেরকে অভিভাবকরূপে(১) গ্ৰহণ করে, আল্লাহ্ তাদের প্রতি সম্যক দৃষ্টিদাতা। আর আপনি তো তাদের উপর কর্মবিধায়ক নন।
তাইসীরুল ক্বুরআন: যারা আল্লাহর পরিবর্তে অন্যদেরকে অভিভাবকরূপে গ্রহণ করে, আল্লাহ তাদের প্রতি নযর রাখছেন, তাদের (কাজের) দায়-দায়িত্ব তোমার উপর নেই।
আহসানুল বায়ান: (৬) যারা আল্লাহর পরিবর্তে অপরকে অভিভাবকরূপে গ্রহণ করে, আল্লাহ তাদের কার্যকলাপের প্রতি দৃষ্টি রাখেন।[1] আর তুমি তাদের কর্মবিধায়ক নও। [2]
মুজিবুর রহমান: যারা আল্লাহর পরিবর্তে অপরদেরকে অভিভাবক রূপে গ্রহণ করে, আল্লাহ তাদের প্রতি কঠোর দৃষ্টি রাখেন। তুমি তাদের কর্মবিধায়ক নও।
ফযলুর রহমান: যারা আল্লাহ ব্যতীত অন্যান্য অভিভাবক গ্রহণ করে, আল্লাহ তাদেরকে দেখে রাখেন। তুমি তাদের কর্মবিধায়ক নও।
মুহিউদ্দিন খান: যারা আল্লাহ ব্যতীত অপরকে অভিভাবক হিসাবে গ্রহণ করে, আল্লাহ তাদের প্রতি লক্ষ্য রাখেন। আপনার উপর নয় তাদের দায়-দায়িত্ব।
জহুরুল হক: আর যারা তাঁকে বাদ দিয়ে অন্যদের অভিভাবকরূপে গ্রহণ করে, -- আল্লাহ্ তাদের উপরে পর্যবেক্ষক, আর তুমি তাদের উপরে কর্ণধার নও।
Sahih International: And those who take as allies other than Him - Allah is [yet] Guardian over them; and you, [O Muhammad], are not over them a manager.
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ৬. আর যারা তাঁর পরিবর্তে অন্যদেরকে অভিভাবকরূপে(১) গ্ৰহণ করে, আল্লাহ্ তাদের প্রতি সম্যক দৃষ্টিদাতা। আর আপনি তো তাদের উপর কর্মবিধায়ক নন।
তাফসীর:
(১) মূল আয়াতে أَوْلِيَاءَ শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে। আরবী ভাষায় যার অর্থ অত্যন্ত ব্যাপক। বাতিল উপাস্যদের সম্পর্কে পথভ্রষ্ট মানুষদের বিভিন্ন আকীদা-বিশ্বাস এবং ভিন্ন ভিন্ন অনেক কর্মপদ্ধতি আছে। কুরআন মজীদে এগুলোকেই “আল্লাহ ছাড়া অন্যদের ওলী বা অভিভাবক বানানো” বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। কুরআন মজীদে অনুসন্ধান করলে ‘ওলী’ শব্দটির কয়েকটি অর্থ জানা যায়। একঃ মানুষ যার কথামত কাজ করে, যার নির্দেশনা মেনে চলে এবং যার রচিত নিয়ম-পস্থা, রীতিনীতি এবং আইনকানুন অনুসরণ করে [সূরা আন নিসা: ১১৮–১২০; সূরা আল-আ’রাফ: ৩, ২৭–৩০] দুইঃ যার দিকনির্দেশনার ওপর মানুষ আস্থা স্থাপন করে এবং মনে করে সে তাকে সঠিক রাস্তা প্রদর্শনকারী এবং ভ্রান্তি থেকে রক্ষাকারী। [সূরা আল বাকারাহ: ২৫৭; সূরা আল-ইসরা: ৯৭; সূরা আল-কাহাফ: ১৭, ও সূরা আল-জাসিয়া: ১৯] তিনঃ যার সম্পর্কে মানুষ মনে করে, আমি পৃথিবীতে যাই করি না কেন সে আমাকে তার কুফল থেকে রক্ষা করবে।
এমনকি যদি আল্লাহ থাকেন এবং আখেরাত সংঘটিত হয় তাহলে তার আযাব থেকেও রক্ষা করবেন [সূরা আন- নিসা: ১২৩–১৭৩; সূরা আল-আন’আম: ৫১; সূরা আর-রাদ: ৩৭; সূরা আল-আনকাবুত: ২২; সূরা আল-আহযাব: ৬৫; সূরা আয-যুমার: ৩] চারঃ যার সম্পর্কে মানুষ মনে করে, পৃথিবীতে তিনি অতি প্রাকৃতিক উপায়ে তাকে সাহায্য করেন, বিপদাপদে তাকে রক্ষা করেন। রুজি-রোজগার দান করেন, সন্তান দান করেন, ইচ্ছা পূরণ করেন এবং অন্যান্য সব রকম প্রয়োজন পূরণ করেন [সূরা হূদ: ২০; সূরা আর-রা’দ-১৬, সূরা আল-আনকাবূত: ৪১]
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (৬) যারা আল্লাহর পরিবর্তে অপরকে অভিভাবকরূপে গ্রহণ করে, আল্লাহ তাদের কার্যকলাপের প্রতি দৃষ্টি রাখেন।[1] আর তুমি তাদের কর্মবিধায়ক নও। [2]
তাফসীর:
[1] অর্থাৎ, তাদের আমলগুলো পর্যবেক্ষণ করে সুরক্ষিত করে রাখেন, যাতে তাদেরকে তার প্রতিফল দান করেন।
[2] অর্থাৎ, তোমার এ দায়িত্ব নয় যে, তুমি তাদেরকে সৎপথে পৌঁছে দেবে অথবা তাদের পাপের কারণে তাদেরকে পাকড়াও করবে। বরং এ কাজ কেবল আমার। তোমার কাজ শুধু পৌঁছে দেওয়া।
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: নামকরণ :
الشوري শব্দের অর্থ হলো- পরামর্শ করা, উপদেশ দেয়া ইত্যাদি। এ সূরাতে পরামর্শ করে কাজ করা মু’মিনদের একটি অন্যতম বৈশিষ্ট্য বলে উল্লেখ করা হয়েছে। সূরার ৩৮ নম্বর আয়াতে শূরা শব্দটি উল্লেখ আছে। সেখান থেকেই এ নামে সূরার নামকরণ করা হয়েছে।
১-৬ নম্বর আয়াতের তাফসীর :
حٰمٓ (হা-মীম) এবং عٓسٓقٓ (আইন-সীন-ক্বফ) এ জাতীয় “হুরুফুল মুক্বাত্বআত” বা বিচ্ছিন্ন অক্ষর সম্পর্কে পূর্বে সূরা বাকারাতে আলোচনা করা হয়েছে। এগুলোর সঠিক উদ্দেশ্য ও অর্থ একমাত্র আল্লাহ তা‘আলাই ভাল জানেন।
আল্লাহ তা‘আলা বলেন, এ পবিত্র কুরআন যেভাবে তোমার প্রতি অবতীর্ণ হয়েছে সেভাবেই তোমার পূর্ববর্তী নাবীদের প্রতিও ওয়াহী করা হয়েছে। “ওয়াহী” হলো আল্লাহ তা‘আলার সেই বাণী, যা তিনি ফেরেশতার মাধ্যমে নাবী-রাসূলদের নিকট পাঠিয়েছেন। হাদীসে ওয়াহী অবতীর্ণ হওয়ার ধরণ সম্পর্কে বলা হয়েছে।
‘আয়িশাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত, হারিস ইবনু হিশাম রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে জিজ্ঞাসা করলেন : হে আল্লাহ তা‘আলার রাসূল! আপনার কাছে কিভাবে ওয়াহী আসে? রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তার উত্তরে বলেন : কখনো আমার নিকট তা ঘন্টা ধ্বনির ন্যায় আসে, যা আমার কাছে খুব কঠিন ও ভারী মনে হয়। আর এ অবস্থা শেষ হয়ে গেলেই আমি তা মুখস্ত করে নেই। আবার কখনো ফেরেশতা আমার নিকট মানুষের আকৃতিতে আসে এবং আমার সাথে কথা বলেন : তিনি যা বলেন আমি তা মুখস্ত করে নেই। (সহীহ বুখারী হা. ৩২১৫, সহীহ মুসলিম হা. ১৬০, ১৬১)
এতে বুঝা যাচ্ছে নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কোন নতুন নাবী নন, তাঁর পদ্ধতি ও পূর্ববর্তী নাবীদের পদ্ধতি একই, তিনি যা নিয়ে এসেছেন তা পূর্ববর্তী নাবীদের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
এরপর আল্লাহ তা‘আলা তাঁর বড়ত্ব, শ্রেষ্ঠত্ব ও মহত্ত্বের কথা বর্ণনা করছেন।
تَكَادُ ক্রিয়াটি নিকটতম অবস্থা বুঝানো জন্য ব্যবহৃত হয়। অর্থাৎ আকাশসমূহ উপর থেকে ভেঙ্গে পড়ার সময় যেন খুব কাছে এসে গেছে। আকাশসমূহ ভেঙ্গে পড়ার উপক্রম হওয়ার কারণ কী তা নিয়ে আলেম সমাজের দু’টি মত রয়েছে :
(১) আল্লাহ তা‘আলার ভয় ও মহত্ত্বের কারণে তা ভেঙ্গে পড়ার উপক্রম। এ কথার উপর প্রমাণ করে পূর্বের আয়াতের অংশ
(وَهُوَ الْعَلِيُّ الْعَظِيْمُ)
‘তিনি সর্বোচ্চ, মহান’।
(২) কাফিররা আল্লাহকে যে সব অপবাদ দিয়ে থাকে যেমন তারা বলে আল্লাহর সন্তান রয়েছে, স্ত্রী রয়েছে ইত্যাদি এসব কারণে আকাশসমূহ ভেঙ্গে পড়ার উপক্রম। যেমন আল্লাহ বলেন :
(وَقَالُوا اتَّخَذَ الرَّحْمٰنُ وَلَدًا لَقَدْ جِئْتُمْ شَيْئًا إِدًّا تَكَادُ السَّمٰوٰتُ يَتَفَطَّرْنَ مِنْهُ وَتَنْشَقُّ الْأَرْضُ وَتَخِرُّ الْجِبَالُ هَدًّا)
“তারা বলে, ‘দয়াময় সন্তান গ্রহণ করেছেন।’ তোমরা এমন এক বীভৎস বিষয়ের অবতারণা করেছ যাতে আকাশসমূহ বিদীর্ণ হবে, পৃথিবী খণ্ড-বিখণ্ড হবে ও পর্বতগুলো চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে পতিত হবে” (সূরা মারইয়াম ১৯ : ৮৮-৯০)
এরপর আল্লাহ তা‘আলা বলেন : ফেরেশতাগণ তাঁর প্রশংসা করে এবং পৃথিবীবাসীর জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে। এ সম্পর্কে সূরা আল মু’মিন-এর ৭ নম্বর আয়াতে আলোচনা করা হয়েছে।
তারপর আল্লাহ তা‘আলা কাফির-মুশরিকদের হুশিয়ার করছেন : যারা أَوْلِيَا۬ءَ বা অন্য কিছুকে আল্লাহ তা‘আলার সাথে অংশী স্থাপন করে, অতঃপর আল্লাহ তা‘আলাকে বাদ দিয়ে তাদের ইবাদত করে ও তাদেরকে অভিভাবক হিসেবে গ্রহণ করে, তিনি তাদের সকল কাজ প্রত্যক্ষ করছেন, তদনুযায়ী তাদের প্রতিদান দেবেন।
সুতরাং হে নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)! তুমি তাদের কর্মবিধায়ক নও; বরং সকল কিছুর কর্ম-বিধায়ক হলাম আমি আল্লাহ তা‘আলা। তোমার দায়িত্ব শুধু সঠিকভাবে পৌঁছে দেয়া। যারা আমাকে বাদ দিয়ে অন্যদেরকে ওলী তথা তাদের অভিভাবক ও মা‘বূদ বানিয়ে নিয়েছে তাদের জন্য আমিই যথেষ্ট। মূলত একথার মধ্যে ধমক প্রকাশ পেয়েছে। আল্লাহ তা‘আলাকে বাদ দিয়ে যারা অন্যদেরকে মা‘বূদ বানিয়ে নেবে তাদের পরিণতি খুবই খারাপ।
আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয় :
১. আল্লাহ তা‘আলার মহত্ত্বের কথা জানতে পারলাম।
২. আকাশ-জমিনে যা কিছু রয়েছে সকল কিছুর মালিক একমাত্র আল্লাহ তা‘আলা।
৩. রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর দায়িত্ব ছিল শুধু সত্যের বাণী পৌঁছে দেয়া। অনুরূপ বর্তমান ‘আলিমদের দায়িত্ব হলো সঠিক বিধানসমূহ জনগণকে জানিয়ে দেয়া।
৪. ফেরেশতারাও আল্লাহর তাসবীহ পাঠ করেন এবং তারা জমিনবাসীর জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করেন।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: ১-৬ নং আয়াতের তাফসীর:
হুরূফে মুকাত্তাআ'ত বা বিচ্ছিন্ন অক্ষরগুলোর আলোচনা পূর্বে গত হয়েছে। ইমাম ইবনে জারীর এখানে একটি বিস্ময়কর, অদ্ভুত ও অস্বীকার্য আসার আনয়ন করেছেন। তাতে রয়েছে যে, একটি লোক হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর নিকট আগমন করে। ঐ সময় তাঁর নিকট হযরত হুযাইফা ইবনে ইয়ামানও (রাঃ) ছিলেন। ঐ আগন্তুক হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-কে এই অক্ষরগুলোর তাফসীর জিজ্ঞেস করলো। তিনি তখন কিছুক্ষণ মাথা নীচু করে রইলেন। লোকটি দ্বিতীয়বার ঐ প্রশ্নই করলো। তিনি এবারও মুখ ফিরিয়ে নিলেন এবং তার প্রশ্নকে মন্দ মনে করলেন। লোকটি তৃতীয়বার ঐ একই প্রশ্ন করলো। তিনি এবারও কোন উত্তর দিলেন না। তখন হযরত হুযাইফা (রাঃ) লোকটিকে বললেনঃ “আমি তোমাকে এর তাফসীর বলে দিচ্ছি এবং হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) এটাকে কেন অপছন্দ করছেন সেটাও আমার জানা আছে। তাঁর আহলে বায়েতের একটি লোকের ব্যাপারে এটা অবতীর্ণ হয়েছে, যাকে আবদুল ইলাহ এবং আবদুল্লাহ বলা হবে। সে প্রাচ্যের নদীসমূহের একটি নদীর পার্শ্বে অবতরণ করবে এবং তথায় দু'টি শহর বসাবে। নদী কেটে ঐ দু'টি শহরের মধ্যে নিয়ে যাবে। অতঃপর যখন আল্লাহ তা'আলা তাদের দেশের পতন ঘটাবার এবং তাদের ধন-দৌলত ধ্বংস করে দেয়ার ইচ্ছা করবেন তখন ঐ শহর দুটির একটির উপর রাত্রিকালে আগুন আসবে এবং ঐ শহরকে জ্বালিয়ে ভষ্ম করে দিবে। তথাকার লোক সকালে ঐ অবস্থা দেখে অত্যন্ত বিস্ময়বোধ করবে। মনে হবে যেন সেখানে কিছুই ছিল না। অতঃপর সকাল সকালই তথাকার সমস্ত বড় বড় উদ্ধত, অহংকারী এবং সত্য বিরোধী লোক তথায় একত্রিত হবে। তৎক্ষণাৎ আল্লাহ তাআলা তাদের সবকেই ঐ শহর সহ ধ্বংস করে দিবেন। (আরবী)-এর অর্থ এটাই। অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হতে এটা সিদ্ধান্ত ও ফায়সালা হয়ে গেছে। (আরবী) দ্বারা আদল বা ন্যায়পরায়ণতা বুঝানো হয়েছে। (আরবী) দ্বারা বুঝানো হয়েছে (আরবী) অর্থাৎ সত্বরই হবে এবং (আরবী) দ্বারা অর্থ নেয়া হয়েছে, ঐ দুই শহরে যা সংঘটিত হবে।”
এর চেয়ে বেশী বিস্ময়কর আর একটি রিওয়াইয়াত রয়েছে যা হাফিয আবু ইয়ালা মুসিলী (রঃ) মুসনাদে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর দ্বিতীয় জিলদ হতে বর্ণনা করেছেন। এটা হযরত আবূ যার (রাঃ) নবী (সঃ) হতে বর্ণনা করেছেন। কিন্তু এর ইসনাদ খুবই দুর্বল এবং ছেদ কাটা। এতে রয়েছে যে, হযরত উমার ইবনে খাত্তাব (রাঃ) মিম্বরের উপর উঠে বলেনঃ “হে জনমণ্ডলী!
তোমাদের মধ্যে কেউ কি (আরবী)-এর তাফসীর রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) হতে শুনেছে?” তখন হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) লাফিয়ে উঠে বলেন, হ্যা, আমি (শুনেছি)। তিনি (রাসূলুল্লাহ সঃ) বলেছেনঃ (আরবী) হলো আল্লাহ তা'আলার নামসমূহের মধ্যে একটি নাম। (আরবী) দ্বারা অর্থ নেয়া হয়েছেঃ (আরবী) (অর্থাৎ বদরের দিন পৃষ্ঠ প্রদর্শন করে পলায়নকারীরা শাস্তি আস্বাদন করেছে)। (আরবী) দ্বারা উদ্দেশ্য হলোঃ (আরবী) অর্থাৎ যালিমরা তাদের পরিণাম কি তা সত্বরই জানতে পারবে।”(২৬:২২৭) হযরত উমার (রাঃ) হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-কে (আরবী)-এর অর্থ জিজ্ঞেস করলে তিনি নীরব থাকেন। তখন হযরত আবু যার (রাঃ) দাড়িয়ে যান এবং হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর মতই তাফসীর করেন এবং বলেন যে, (আরবী)-এর অর্থ হলো (আরবী) অর্থাৎ (লোকদের উপর) আসমানী আযাব আসবে।
এরপর মহান আল্লাহ বলেন, হে নবী (সঃ) ! তোমার উপর যেমন এই কুরআনের অহী অবতীর্ণ হচ্ছে, অনুরূপভাবে তোমার পূর্ববর্তী নবী-রাসূলদের প্রতিও কিতাব ও সহীফাসমূহ অবতীর্ণ হয়েছিল। এগুলো সবই অবতীর্ণ হয়েছিল আল্লাহ তাআলার নিকট হতে যিনি স্বীয় প্রতিশোধ গ্রহণের ব্যাপারে পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।
হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত হারিস ইবনে হিশাম (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনার নিকট অহী কিভাবে আসে?” তিনি উত্তরে বলেনঃ “কখনো ঘন্টার অবিরত শব্দের ন্যায়, যা আমার কাছে খুব কঠিন ও ভারী বোধ হয়। যখন ওটা শেষ হয়ে যায়। তখন আমাকে যা কিছু বলা হয় সবই আমার মুখস্থ হয়ে যায়। আর কখনো। ফেরেশতা মানুষের আকৃতিতে আমার নিকট আগমন করেন। আমার সাথে তিনি কথা বলেন এবং যা কিছু তিনি বলেন সবই আমি মনে করে নিই। হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেন যে, কঠিন শীতের সময় যখন তাঁর প্রতি অহী অবতীর্ণ হতো তখন তিনি অত্যন্ত ঘেমে যেতেন, এমনকি তাঁর কপাল মুবারক হতে টপ টপ করে ঘাম ঝরে পড়তো। (এ হাদীসটি সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে)
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে অহীর অবস্থা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তিনি উত্তরে বলেনঃ “জিঞ্জিরের ঝন্ ঝন্ শব্দের মত একটা শব্দ শুনতে পাই। অতঃপর আমি ওর প্রতি কান। লাগিয়ে দিই। এরূপ অহী আমার কাছে খুবই কঠিন বোধ হয়। মনে হয় যেন আমার প্রাণবায়ু নির্গত হয়ে যাবে। (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) স্বীয় মুসনাদে বর্ণনা করেছেন) শরহে বুখারীর শুরুতে আমরা অহীর অবস্থা সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করেছি। সুতরাং সমুদয় প্রশংসা আল্লাহরই প্রাপ্য।
মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ যমীন ও আসমানের সমুদয় সৃষ্টজীব তাঁরই দাস এবং তাঁরই কর্তৃত্বাধীন। তার সামনে সবাই বিনীত ও বাধ্য। তিনি সমুন্নত, মহান। তার শ্রেষ্ঠত্ব, বড়ত্ব ও মাহাত্ম্যের অবস্থা এই যে, আকাশমণ্ডলী ঊর্ধ্বদেশ হতে ভেঙ্গে পড়ার উপক্রম হয় এবং ফেরেশতারা তাঁদের প্রতিপালকের সপ্রশংস পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করেন এবং মর্তবাসীদের জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করেন। যেমন মহামহিমান্বিত আল্লাহ আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আরশ বহনকারী ফেরেশতামণ্ডলী এবং ওর চতুষ্পর্শ্বের ফেরেশতারা তাদের প্রতিপালকের সপ্রশংস পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করে এবং যারা তার প্রতি ঈমান রাখে তাদের জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করতে থাকে (এবং বলে), হে আমাদের প্রতিপালক! আপনি আপনার রহমত ও জ্ঞান দ্বারা প্রত্যেক জিনিসকে ঘিরে রেখেছেন। সুতরাং যারা তাওবা করেছে এবং আপনার পথের অনুসারী হয়েছে তাদেরকে ক্ষমা করে দিন এবং তাদেরকে জাহান্নামের শাস্তি হতে রক্ষা করুন।”(৪০:৭)
অতঃপর মহান আল্লাহ বলেনঃ যারা আল্লাহর পরিবর্তে অপরকে অভিভাবকরূপে গ্রহণ করে, আল্লাহ তাদের প্রতি কঠোর দৃষ্টি রাখেন। তিনি স্বয়ং তাদেরকে পুরোপুরি শাস্তি প্রদান করবেন। তোমার (নবীর সঃ) কাজ শুধু তাদেরকে সতর্ক করে দেয়া। তুমি তাদের কর্মবিধায়ক নও, বরং সবকিছুর কর্মবিধায়ক হলেন আল্লাহ।
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।