সূরা হা-মীম আস-সাজদা (ফুসসিলাত) (আয়াত: 54)
হরকত ছাড়া:
ألا إنهم في مرية من لقاء ربهم ألا إنه بكل شيء محيط ﴿٥٤﴾
হরকত সহ:
اَلَاۤ اِنَّهُمْ فِیْ مِرْیَۃٍ مِّنْ لِّقَآءِ رَبِّهِمْ ؕ اَلَاۤ اِنَّهٗ بِکُلِّ شَیْءٍ مُّحِیْطٌ ﴿۵۴﴾
উচ্চারণ: আলাইন্নাহুম ফী মিরইয়াতিম মিলিলকাই, রাব্বিহিম আলাইন্নাহূবিকুল্লি শাইয়িম মুহীত।
আল বায়ান: জেনে রাখ, নিশ্চয় তারা তাদের রবের সাক্ষাতের বিষয়ে সন্দেহে রয়েছে; জেনে রাখ, নিশ্চয় তিনি সবকিছুকে পরিবেষ্টন করে আছেন।
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৫৪. জেনে রাখুন, নিশ্চয় তারা তাদের রাবের সাথে সাক্ষাতের ব্যাপারে সন্দিহান। জেনে রাখুন যে, নিশ্চয় তিনি (আল্লাহ) সবকিছুকে পরিবেষ্টন করে রয়েছেন।
তাইসীরুল ক্বুরআন: শুনে রাখ, এরা তাদের প্রতিপালকের সঙ্গে সাক্ষাতের ব্যাপারে সন্দেহে পড়ে আছে। শুনে রাখ, তিনি সব কিছুকেই বেষ্টন করে আছেন।
আহসানুল বায়ান: (৫৪) জেনে রাখ, ওরা ওদের প্রতিপালকের সাথে সাক্ষাৎকারে সন্দিহান।[1] জেনে রাখ, সব কিছুকে আল্লাহ পরিবেষ্টন করে রয়েছেন।[2]
মুজিবুর রহমান: জেনে রেখ, এরা এদের রবের সাথে সাক্ষাৎকারে সন্ধিহান। জেনে রেখ, সব কিছুকে আল্লাহ পরিবেষ্টন করে রেখেছেন।
ফযলুর রহমান: জেনে রাখ, তারা তাদের প্রভুর সাথে সাক্ষাতের ব্যাপারে সন্দিহান। জেনে রাখ, তিনি সবকিছু পরিবেষ্টন করে আছেন।
মুহিউদ্দিন খান: শুনে রাখ, তারা তাদের পালনকর্তার সাথে সাক্ষাতের ব্যাপারে সন্দেহে পতিত রয়েছে। শুনে রাখ, তিনি সবকিছুকে পরিবেষ্টন করে রয়েছেন।
জহুরুল হক: এটি কি নয় যে তারা আলবৎ সন্দেহের মাঝে রয়েছে তাদের প্রভুর সাথে সাক্ষাৎকার সন্বন্ধে? এটি কি নয় যে তিনি নিশ্চয় সব- কিছুরই পরিবেষ্টনকারী?
Sahih International: Unquestionably, they are in doubt about the meeting with their Lord. Unquestionably He is, of all things, encompassing.
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ৫৪. জেনে রাখুন, নিশ্চয় তারা তাদের রাবের সাথে সাক্ষাতের ব্যাপারে সন্দিহান। জেনে রাখুন যে, নিশ্চয় তিনি (আল্লাহ) সবকিছুকে পরিবেষ্টন করে রয়েছেন।
তাফসীর:
-
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (৫৪) জেনে রাখ, ওরা ওদের প্রতিপালকের সাথে সাক্ষাৎকারে সন্দিহান।[1] জেনে রাখ, সব কিছুকে আল্লাহ পরিবেষ্টন করে রয়েছেন।[2]
তাফসীর:
[1] এই জন্য এ বিষয়ে না তারা চিন্তা-ভাবনা করে। আর না তার জন্য আমল করে। আর না সেই দিনের কোন ভয় তাদের অন্তরে আছে।
[2] আর এ জন্যই কিয়ামত সংঘটিত হওয়া কোন কঠিন ও অসম্ভব বিষয় নয়। কেননা, সমস্ত সৃষ্টির উপর তাঁর প্রভাব, কর্তৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণ-ক্ষমতা রয়েছে। তিনি যেমনভাবে চান সকল কিছু নিয়ন্ত্রণ করেন এবং তাতে কেউ তাঁকে বাধা প্রদান করতে পারে না।
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ৫২-৫৪ নম্বর আয়াতের তাফসীর :
কুরআনুল কারীম প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ তা‘আলার বাণী। জিবরীল (আঃ) তা যথোচিত সংরক্ষণের সাথে নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর ওপর অবতীর্ণ করেছেন। আল্লাহ তা‘আলা নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে মুশরিকদের বলে দিতে নির্দেশ দিয়ে বলেন : হে মুশরিকরা! তোমরা কি একটু চিন্তা করে দেখেছ, এ কুরআন যদি সত্যিকার আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ হতে এসে থাকে (আর তা অবশ্যই সত্য) এরপরেও তোমরা অস্বীকার করলে পথভ্রষ্ট বলে গণ্য হবেন? অর্থাৎ তোমাদের চেয়ে অধিক পথভ্রষ্ট আর কেউ নেই। কারণ তোমরা শত্র“তা ও বিরোধিতায় শেষ প্রান্তে পৌঁছে গেছ।
আল্লাহ তা‘আলা বলেন : এ কুরআন প্রকৃতপক্ষেই আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ হতে অবতীর্ণ। সুতরাং যারা একে অস্বীকার ও এর বিরোধিতা করবে তারা হলো সবচেয়ে বড় পথভ্রষ্ট। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, যারা এরূপ অস্বীকার করে আমি তাদের বিরুদ্ধে নিদর্শনাবলী ব্যক্ত করব ফলে তাদের নিকট এ কথা স্পষ্ট হয়ে যাবে যে এ কুরআন প্রকৃতই সত্য। এতে মিথ্যা কিছুই নেই। তাদের এরূপ মনে করার কারণ এই যে, তারা মূলত তাদের রবের ব্যাপারে সন্দেহ পোষণ করে থাকে। যার ফলে তারা বলে- এ কুরআন সত্য নয়, এটা মিথ্যা।
এর দ্বারা কুরআনের সত্যতা এবং এ কুরআন যে আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ থেকে এসেছে তা সুস্পষ্ট হয়ে যায়। الْاٰفَاقِ শব্দটি افق এর বহুবচন, অর্থ হলো কিনারা (দিকচক্রবাল), দিগন্ত। উদ্দেশ্য হলো, আমি নিজ নিদর্শনাবলী বিশ্বজাহানের দিকচক্রবালেও দেখাবো, আর মানুষের নিজ দেহের ভেতরেও। কেননা, আকাশ ও পৃথিবীর প্রান্তে-প্রান্তেও তার বড় বড় নিদর্শন বিদ্যমান রয়েছে। যেমন সূর্য, চন্দ্র, নক্ষত্ররাজি, দিবারাত্রি, বৃষ্টি, পাহাড়-পর্বত, নদী-নালা ইত্যাদি। ‘নিজেদের মধ্যে ’বলতে যে সকল মিশ্রিত উপাদান ও পদার্থ দ্বারা মানুষের অস্তিত্ব ও কাঠামো গঠিত তাই উদ্দেশ্য। কেউ কেউ বলেছেন : الْاٰفَاقِ (দিকচক্রবাল) থেকে পূর্ব ও পশ্চিমের সেই দূর-দূরান্ত এলাকা উদ্দেশ্য, যা জয় করা মুসলিমদের জন্য আল্লাহ তা‘আলা সহজ করে দিয়েছেন। আর وَفِيْٓ أَنْفُسِهِمْ (নিজেদের মধ্যে) থেকে নিজেদের অথবা ভুমির ওপর মুসলিমদের উন্নতি ও সাফল্য উদ্দেশ্য। যেমন বদর যুদ্ধ, মক্কা বিজয় প্রভৃতিতে মুসলিমদেরকে প্রভূত সম্মান ও মর্যাদা দান করা হয়েছে।
মূলত কুরআন ও মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সম্পর্কে কাফিরদের সন্দেহের কারণ হল তারা পুনরুত্থানের প্রতি সন্দিহান, তাদেরকে মৃত্যুর পর জীবিত করা হবে এটা তারা বিশ্বাস করতে পারে না।
আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয় :
১. কুরআন আল্লাহর কালাম, এটা তাঁর পক্ষ থেকে মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর ওপর অবতীর্ণ হয়েছে।
২. পৃথিবীর সবকিছু প্রমাণ করে আল্লাহ তা‘আলা এক ও অদ্বিতীয়।
৩. আখিরাতের প্রতি বিশ্বাস না থাকলে ঈমান থাকবে না।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: ৫২-৫৪ নং আয়াতের তাফসীর:
আল্লাহ তা'আলা স্বীয় নবী (সঃ)-কে বলছেনঃ তুমি কুরআন অমান্যকারী মুশরিকদেরকে বলে দাওঃ এই কুরআন সত্য সত্যই আল্লাহর পক্ষ হতে এসেছে, অথচ তোমরা একে অবিশ্বাস করছো! তাহলে আল্লাহ তাআলার নিকট তোমাদের কি অবস্থা হবে! যে ব্যক্তি স্বীয় কুফরী ও বিরোধিতার কারণে সত্য পথ হতে বহু দূরে সরে পড়েছে তার চেয়ে অধিক বিভ্রান্ত আর কে আছে?
এরপর মহান আল্লাহ বলেনঃ আমি তাদের জন্যে আমার নিদর্শনাবলী ব্যক্ত করবো বিশ্ব জগতে এবং তাদের নিজেদের মধ্যে। ইসলামপন্থীদেরকে আমি বিজয় দান করবো। তারা সাম্রাজ্যসমূহের সম্রাট হয়ে যাবে। সমস্ত দ্বীনের উপর দ্বীনে ইসলামের প্রাধান্য থাকবে।
বদর ও মক্কা বিজয়ের নিদর্শন স্বয়ং মুশরিকদের নিজেদের মধ্যেই রয়েছে যে, তারা সংখ্যায় অধিক হওয়া সত্ত্বেও অল্প সংখ্যক মুসলমানের নিকট লাঞ্ছনাজনক পরাজয় বরণ করে। ভাবার্থ এও হতে পারে যে, আল্লাহ তা'আলার হাজার হাজার নিদর্শন স্বয়ং মানব জাতির নিজেদের মধ্যেই বিদ্যমান রয়েছে। তাদের সষ্টি ও গঠন কৌশল, তাদের স্বভাব-প্রকৃতি, তাদের পৃথক পৃথক চরিত্র, পৃথক পৃথক রূপ ও রং ইত্যাদি তাদের সৃষ্টিকর্তার সৃষ্টি নৈপুণ্য এবং শিল্প চাতুর্যেরই পরিচায়ক, যেগুলো সদা তাদের চোখের সামনে রয়েছে, এমন কি স্বয়ং তাদের নিজেদের সত্তার মধ্যেই বিদ্যমান রয়েছে। তাদের জীবনের বিভিন্ন পর্যায় ও অবস্থা, যেমন বাল্যকাল, যৌবন, বার্ধক্য, তাদের রুগ্নতা ও সুস্থতা, দারিদ্র্য ও স্বচ্ছলতা, সুখ ও দুঃখ ইত্যাদি পরিষ্কারভাবে তাদের উপর প্রকাশমান। মোটকথা, আল্লাহ তাআলার বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ নিদর্শনাবলী এতো অধিক রয়েছে যে, মানুষ এগুলো দেখে তাঁর কথার সত্যতা স্বীকার করে নিতে বাধ্য হয়। আল্লাহ তা'আলার সাক্ষ্যই যথেষ্ট এবং তিনি স্বীয় বান্দাদের কথা ও কাজ সম্বন্ধে পূর্ণ ওয়াকিফহাল। তিনি যখন বলছেন যে, হযরত মুহাম্মাদ (সঃ) একজন সত্য নবী, তখন মানুষের এটা স্বীকার করে নিতে বাধা কিসের? যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “কিন্তু আল্লাহ সাক্ষ্য দিচ্ছেন যে, যা তিনি তোমার উপর অবতীর্ণ করেছেন তা তিনি তাঁর জ্ঞানের সাথেই অবতীর্ণ করেছেন।” (৪:১৬৬)
অতঃপর মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ জেনে রেখো যে, এরা এদের। প্রতিপালকের সাথে সাক্ষাঙ্কারে সন্দিহান অর্থাৎ কিয়ামত যে সংঘটিত হবে এটা তারা বিশ্বাসই করে না, আর এ কারণেই তারা নিশ্চিন্ত রয়েছে, পুণ্য অর্জনে রয়েছে উদাসীন এবং পাপ কার্য হতে বিরত থাকছে না। অথচ কিয়ামত সংঘটিত হওয়ার ব্যাপারে সন্দেহের লেশমাত্র নেই।
হযরত সাঈদ আনসারী (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত উমার ইবনে আবদিল আযীয (রঃ) একদা মিম্বরের উপর উঠে আল্লাহ তা'আলার হামদ ও সানার পর বলেনঃ “হে জনমণ্ডলী! আমি তোমাদেরকে কোন নতুন কথা বলার জন্যে একত্রিত করিনি, বরং এজন্যেই তোমাদেরকে আমি একত্রিত করেছি যে, বিচার দিবসের ব্যাপারে আমি খুব চিন্তা-ভাবনা করেছি, এতে আমি যা বুঝেছি তা তোমাদেরকে শুনাতে চাই। তা এই যে, যারা এটাকে সত্য বলে বিশ্বাস করে তারা নির্বোধ এবং যারা এটাকে মিথ্যা মনে করে তারা ধ্বংস প্রাপ্ত।” অতঃপর তিনি মিম্বর হতে নেমে পড়লেন। তাঁর যারা এটাকে সত্য বলে বিশ্বাস করে তারা নির্বোধ’ একথার ভাবার্থ এই যে, তারা এটাকে সত্য মনে করছে অথচ এর জন্যে কোন প্রস্তুতি গ্রহণ করছে না। এর অন্তর প্রকম্পিতকারী ও ভয়াবহ অবস্থা হতে সম্পূর্ণরূপে উদাসীন থাকছে, একে ভয় করে এমন আমল করে না যা তাকে ঐদিনের ভীতি হতে নিরাপত্তা দান করতে পারে। ঐ ব্যক্তি নিজেকে ওর সংঘটনের সত্যতা স্বীকারকারীও বলছে, আবার খেল-তামাশা, অবহেলা, কুপ্রবৃত্তি, পাপ এবং নির্বুদ্ধিতার মধ্যে নিমজ্জিত থাকছে, আর এদিকে কিয়ামত নিকটে চলে আসছে। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জানেন ।
এরপর আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা স্বীয় পূর্ণ ক্ষমতার বর্ণনা দিচ্ছেন যে, সবকিছুকে তিনি পরিবেষ্টন করে রয়েছেন। কিয়ামত ঘটানো তাঁর কাছে খুবই সহজ কাজ। সমস্ত সৃষ্টজীব ও সৃষ্ট বস্তু তাঁর অধিকারে রয়েছে। তিনি যা ইচ্ছা করেন তাই করতে পারেন। কেউই তাঁর হাত ধরে রাখতে পারে না। তিনি যা চেয়েছেন তা হয়েছে এবং যা চাইবেন তা অবশ্যই হবে। তিনি ছাড়া প্রকৃত হুকুমদাতা আর কেউ নেই। তিনি ছাড়া অন্য কারো সত্তা কোন প্রকারের ইবাদতের যোগ্য নয়।
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।