আল কুরআন


সূরা হা-মীম আস-সাজদা (ফুসসিলাত) (আয়াত: 33)

সূরা হা-মীম আস-সাজদা (ফুসসিলাত) (আয়াত: 33)



হরকত ছাড়া:

ومن أحسن قولا ممن دعا إلى الله وعمل صالحا وقال إنني من المسلمين ﴿٣٣﴾




হরকত সহ:

وَ مَنْ اَحْسَنُ قَوْلًا مِّمَّنْ دَعَاۤ اِلَی اللّٰهِ وَ عَمِلَ صَالِحًا وَّ قَالَ اِنَّنِیْ مِنَ الْمُسْلِمِیْنَ ﴿۳۳﴾




উচ্চারণ: ওয়া মান আহছানুকাওলাম মিম্মান দা‘আইলাল্লা-হি ওয়া‘আমিলা সা-লিহাওঁ ওয়াকা-লা ইন্নানী মিনাল মুছলিমীন।




আল বায়ান: আর তার চেয়ে কার কথা উত্তম, যে আল্লাহর দিকে দাওয়াত দেয়, সৎকর্ম করে এবং বলে, অবশ্যই আমি মুসলিমদের অন্তর্ভুক্ত’?




আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৩৩. আর তার চেয়ে কার কথা উত্তম যে আল্লাহর দিকে আহবান জানায় এবং সৎকাজ করে। আর বলে, অবশ্যই আমি মুসলিমদের অন্তর্ভুক্ত।(১)




তাইসীরুল ক্বুরআন: কথায় ঐ ব্যক্তি থেকে কে বেশি উত্তম যে (মানুষকে) আল্লাহর দিকে আহবান করে, আর সৎ কাজ করে এবং বলে, ‘আমি (আল্লাহর প্রতি) অনুগতদের অন্তর্ভুক্ত’।




আহসানুল বায়ান: (৩৩) যে ব্যক্তি আল্লাহর প্রতি মানুষকে আহবান করে, সৎকাজ করে এবং বলে, ‘আমি তো আত্মসমর্পণকারী (মুসলিম)’ তার অপেক্ষা কথায় উত্তম আর কোন্ ব্যক্তি? [1]



মুজিবুর রহমান: ঐ ব্যক্তি অপেক্ষা কথায় কে উত্তম যে আল্লাহর প্রতি মানুষকে আহবান করে, সৎ কাজ করে এবং বলেঃ আমিতো আত্মসমর্পনকারীদের অন্তর্ভুক্ত।



ফযলুর রহমান: তার চেয়ে ভাল কথা কে বলে, যে আল্লাহর দিকে (মানুষকে) ডাকে, সৎকাজ করে এবং বলে “আমি একজন মুসলিম (আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণ-কারী)”?



মুহিউদ্দিন খান: যে আল্লাহর দিকে দাওয়াত দেয়, সৎকর্ম করে এবং বলে, আমি একজন আজ্ঞাবহ, তার কথা অপেক্ষা উত্তম কথা আর কার?



জহুরুল হক: আর কে তার চাইতে কথাবার্তায় বেশী ভাল যে আল্লাহ্‌র প্রতি আহ্বান করে এবং সৎকর্ম করে আর বলে -- "আমি তো নিশ্চয়ই মুসলিমদের মধ্যেকার?"



Sahih International: And who is better in speech than one who invites to Allah and does righteousness and says, "Indeed, I am of the Muslims."



তাফসীরে যাকারিয়া

অনুবাদ: ৩৩. আর তার চেয়ে কার কথা উত্তম যে আল্লাহর দিকে আহবান জানায় এবং সৎকাজ করে। আর বলে, অবশ্যই আমি মুসলিমদের অন্তর্ভুক্ত।(১)


তাফসীর:

(১) এটা মুমিনদের দ্বিতীয় অবস্থা। তারা কেবল নিজেদের ঈমান ও আমল নিয়েই সস্তুষ্ট থাকে না, বরং অপরকেও দাওয়াত দেয়। বলা হয়েছে, যে ব্যক্তি মানুষকে আল্লাহর দিকে ডাকে, তার চেয়ে উত্তম কথা আর কার হতে পারে? মুমিনদের সান্ত্বনা দেয়া এবং মনোবল সৃষ্টির পর এখন তাদেরকে তাদের আসল কাজের প্রতি উৎসাহিত করা হচ্ছে। আগের আয়াতে তাদের বলা হয়েছিলো, আল্লাহর বন্দেগীর ওপর দৃঢ়পদ হওয়া এবং এই পথ গ্রহণ করার পর পুনরায় তা থেকে বিচ্যুত না হওয়াটাই এমন একটা মৌলিক নেকী যা মানুষকে ফেরেশতার বন্ধু এবং জান্নাতের উপযুক্ত বানায়। এখন তাদের বলা হচ্ছে, এর পরবর্তী স্তর হচ্ছে, তোমরা নিজে নেক কাজ করো, অন্যদেরকে আল্লাহর বন্দেগীর দিকে ডাকো এবং ইসলামের ঘোষণা দেয়াই যেখানে নিজের জন্য বিপদাপদ ও দুঃখ-মুসিবতকে আহবান জানানোর শামিল এমন কঠিন পরিবেশেও দৃঢ়ভাবে ঘোষণা করে: আমি মুসলিম। মানুষের জন্য এর চেয়ে উচ্চস্তর আর নেই।

কিন্তু আমি মুসলিম বলে কোন ব্যক্তির ঘোষণা করা, পরিণামের পরোয়া না করে সৃষ্টিকে আল্লাহর বন্দেগীর দিকে আহবান জানানো এবং কেউ যাতে ইসলাম ও তার ঝাণ্ডাবাহীদের দোষারোপ ও নিন্দাবাদ করার সুযোগ না পায় এ কাজ করতে গিয়ে নিজের তৎপরতাকে সেভাবে পবিত্র রাখা হচ্ছে পূর্ণ মাত্রার নেকী। এ থেকে বোঝা গেল যে, মানুষের সেই কথাই সর্বোত্তম ও সর্বোৎকৃষ্ট যাতে অপরকে সত্যের দাওয়াত দেয়া হয়। এতে মুখে, কলমে, অন্য কোনভাবে সর্বপ্রকার দাওয়াতই শামিল রয়েছে। আযানদাতাও এতে দাখিল আছে। কেননা, সে মানুষকে সালাতের দিকে আহবান করে। এ কারণেই আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন, আলোচ্য আয়াত মুয়াযযিন সম্পর্কে অবতীর্ণ হয়েছে। কোন কোন মুফাসসির বলেন, এখানে (دَعَا إِلَى اللَّهِ) বাক্যের পর (وَعَمِلَ صَالِحًا) বলে আযান-ইকামতের মধ্যস্থলে দুরাকাআত সালাত বোঝানো হয়েছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, আযান ও একমাতের মাঝখানে যে দোআ হয়, তা প্রত্যাখ্যাত হয় না। [আবু দাউদ: ৫২১]


তাফসীরে আহসানুল বায়ান

অনুবাদ: (৩৩) যে ব্যক্তি আল্লাহর প্রতি মানুষকে আহবান করে, সৎকাজ করে এবং বলে, ‘আমি তো আত্মসমর্পণকারী (মুসলিম)” তার অপেক্ষা কথায় উত্তম আর কোন্ ব্যক্তি? [1]


তাফসীর:

[1] অর্থাৎ, মানুষকে আল্লাহর দিকে দাওয়াত দেওয়ার সাথে সাথে সে নিজেও হিদায়াতপ্রাপ্ত, দ্বীন-পালনে যত্নবান এবং আল্লাহর নিকট আত্মসমর্পণকারী অনুগত বান্দা।


তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ


তাফসীর: ৩৩-৩৬ নম্বর আয়াতের তাফসীর :



(الْمُسْلِمِيْنَ...... وَمَنْ أَحْسَنُ قَوْلًا مِّمَّنْ)



যারা আল্লাহ তা‘আলার পথে মানুষকে আহ্বান করে ও সাথে সাথে নিজে সৎ আমল করে এবং বলে আমি আল্লাহ তা‘আলার বিধানের কাছে আত্মসমর্পণকারী, সে ব্যক্তির কথা পৃথিবীর বুকে সর্বশ্রেষ্ঠ- এ কথাই এখানে প্রতীয়মান হয়েছে। ইবনু কাসীর (রহঃ) বলেন : এ আয়াতটি ঐ সকল ব্যক্তিদের জন্য যারা নিজেরা সৎ পথে চলে এবং অন্যদেরকে দাওয়াত প্রদান করে। এ দাওয়াতী কাজে মানুষকে দীন শিক্ষা দেয়া, ওয়াজ নসিহত করা, দীনের ওপর অটল থাকতে উৎসাহ প্রদান করা সব কিছুই শামিল (তাফসীর সাদী, অত্র আয়াতের তাফসীর)। এ আয়াতে মূলত এটাই সাব্যস্ত হয় যে, নিজে ভাল কাজ করতে হবে এবং সাথে সাথে মানুষকে ভাল কাজ করার জন্য, আল্লাহ তা‘আলার একত্বের দিকে তাঁর ইবাদত করার জন্য আহ্বান করতে হবে। শুধু নিজে করলেই চলবে না বরং সকলকে এ কাজের দিকে দা‘ওয়াত দিতে হবে। যেমনভাবে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মানুষকে ইসলাম ও দীনের পথে দা‘ওয়াত দিয়েছিলেন। সুতরাং যারা ভাল কাজ করে এবং অন্যকে উদ্বুদ্ধ করে সে হলো সর্বাপেক্ষা উৎকৃষ্ট এবং সম্মানিত ব্যক্তি।



এরপর আল্লাহ তা‘আলা ইসলামের দা‘ওয়াত দেয়ার পদ্ধতি এবং উপকারিতা সম্পর্কে বর্ণনা করছেন যে, যারা আল্লাহর পথে মানুষকে আহ্বান করবে তারা যেন নম্র-ভদ্রভাবে এবং সুন্দরভাবে আল্লাহ তা‘আলার পথে আহ্বান করে। মন্দকে দূরীভূত করে ভাল দ্বারা। যা উৎকৃষ্ট তা দিয়ে মন্দকে প্রতিহত করতে হবে। অর্থাৎ অন্যায়ের বদলা নিতে হবে ন্যায় প্রতিষ্ঠা করার দ্বারা, জুলুমের বদলা নিতে হবে ক্ষমা করে, ক্রোধের বদলা নিতে হবে ধৈর্য ধারণ করে।



আল্লাহ তা‘আলার বাণী : “মন্দের মুকাবিলা কর‎ যা উত্তম তা দ্বারা; তারা যা বলে আমি সে সম্বন্ধে সবিশেষ অবহিত। বল : ‎ ‘হে আমার প্রতিপালক! আমি তোমার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করি শয়তানের প্ররোচনা হতে, আর ‘হে আমার প্রতিপালক! আমি তোমার আশ্রয় প্রার্থনা করি আমার নিকট তাদের উপস্থিতি হতে।’ (সূরা মু’মিনূন ২৩ : ৯৬-৯৮)



ফলে এতে করে উপকারিতা হলো : শত্র“ বন্ধুতে পরিণত হয়ে যাবে, তোমার থেকে দূরে দূরে থাকত এমন ব্যক্তি নিকটতম হয়ে যাবে। আর এ গুণটা অর্থাৎ মন্দকে ভাল দ্বারা পরিবর্তন করার অভ্যাস সকল মানুষের মধ্যে থাকে না, শুধুমাত্র ঐ ব্যক্তিই এটা করতে সক্ষম যারা ধৈর্য ধারণ করতে পারে, রাগকে দমন করতে পারে এবং অপছন্দনীয় কথা-বার্তা সহ্য করতে পারে। এটা তাদের দ্বারাই সম্ভব, অন্য কারো পক্ষে এটা সম্ভব নয়।



তারপর আল্লাহ তা‘আলা বলেন : যদি ভাল কাজ করতে গিয়ে শয়তান তোমাকে কুমন্ত্রণা দেয় তাহলে তুমি মহান আল্লাহর নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করো। কেননা শয়তানের কুমন্ত্রণা থেকে রক্ষা করার ক্ষমতা এক আল্লাহ তা‘আলা ব্যতীত অন্য কারো নেই। এ সম্পর্কে সূরা আল আ‘রাফ-এর ২০০ নম্বর আয়াতেও আলোচনা করা হয়েছে।



আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয় :



১. আল্লাহ তা‘আলার রাস্তায় মানুষকে আহ্বান করার পদ্ধতি ও ফযীলত জানতে পারলাম।

২. সত্য দ্বারা বাতিলকে, ভাল দ্বারা মন্দকে প্রতিহত করতে হবে।

৩. সত্য ও মিথ্যা কখনো সমান হতে পারে না।

৪. বিপদে ধৈর্য ধারণ করতে হবে, বিচলিত হওয়া যাবে না।

৫. শয়তানের অনিষ্ট থেকে বাঁচার জন্য একমাত্র আল্লাহ তা‘আলার নিকটই আশ্রয় চাইতে হবে।


তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)


তাফসীর: ৩৩-৩৬ নং আয়াতের তাফসীর:

আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ যারা আল্লাহর বান্দাদেরকে তাঁর পথে আহ্বান করে। এবং নিজেও সকর্মশীল হয় ও ইসলাম গ্রহণ করে, তার চেয়ে উত্তম কথা আর কার হতে পারে? এ হলো সেই ব্যক্তি যে নিজেরও উপকার সাধন করেছে এবং আল্লাহর সৃষ্টজীবেরও উপকার করেছে। ঐ ব্যক্তি এর মত নয় যে মুখে বড় বড় কথা বলে, কিন্তু নিজেই তা পালন করে না। পক্ষান্তরে, এ লোকটি তো নিজেও ভাল কাজ করে এবং অন্যদেরকেও ভাল কাজ করতে বলে।

এ আয়াতটি আম বা সাধারণ। রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-ই সর্বোত্তমরূপে এর আওতায় পড়েন। কেউ কেউ বলেন যে, এর দ্বারা মুআযযিনকে বুঝানো হয়েছে যিনি সকর্মশীলও বটে। যেমন সহীহ মুসলিমে রয়েছেঃ “কিয়ামতের দিন মুআযযিনগণ সমস্ত লোকের মধ্যে সর্বাপেক্ষা উচ্চ গ্রীবা বিশিষ্ট হবে।” সুনানে মারফু’রূপে বর্ণিত আছেঃ “ইমাম যামিন এবং মুআযিন আমানতদার। আল্লাহ ইমামদেরকে সুপথ প্রদর্শন করুন এবং মুআযযিনদেরকে ক্ষমা করে দিন!”

হযরত সা’দ ইবনে আবি অক্কাস (রাঃ) বলেনঃ “কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা'আলার নিকট মুআযিনদের অংশ তাঁর পথে জিহাদকারীদের অংশের মত হবে। আযান ও ইকামতের মধ্যভাগে মুআযযিনদের অবস্থা ঐরূপ, যেমন কোন মুজাহিদ আল্লাহর পথে যুদ্ধ করে রক্তে রঞ্জিত হয়।” (এটা ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)

হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেনঃ “আমি যদি মুআযযিন হতাম তবে আমি হজ্ব, উমরা ও জিহাদকে এতো বেশী পরোয়া করতাম না।”

হযরত উমার ইবনে খাত্তাব (রাঃ) বলেনঃ “আমি যদি মুআখ্যাযিন হতাম তবে আমার আশা-আকাঙ্ক্ষা পূর্ণ হতো এবং আমি রাত্রে দাঁড়িয়ে নফল ইবাদত এবং দিবসের নফল রোযার প্রতি এতো বেশী গুরুত্ব দিতাম না। আমি রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-কে বলতে শুনেছিঃ “হে আল্লাহ্! আপনি মুআযযিনদেরকে ক্ষমা করুন!” এটা তিনবার বলেন। আমি তখন বললামঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনি দু'আতে আমাদের কথা উল্লেখ করলেন না? অথচ আমরা আপনার হুকুম পাওয়া মাত্র তরবারী টেনে নেই (অর্থাৎ আল্লাহর পথে জিহাদের জন্যে প্রস্তুত হয়ে যাই)!” উত্তরে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বললেনঃ “হ্যা, তা ঠিকই বটে। কিন্তু হে উমার (রাঃ)! এমন এক যুগ আসবে যখন আযান দেয়ার কাজটি শুধুমাত্র গরীব-মিসকীনদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে। হে উমার (রাঃ)! জেনে রেখো যে, যেসব লোকের দেহের গোশত জাহান্নামের উপর হারাম, মুআযিনরাও তাদের অন্তর্ভুক্ত।”

হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেন যে, ... (আরবী)-এ আয়াতে মুআযিনেরই প্রশংসা করা হয়েছে। তার (আরবী) বলাটাই আল্লাহর পথে আহ্বান করা বুঝায়। হযরত ইবনে উমার (রাঃ) ও হযরত ইকরামা (রাঃ) বলেন যে, এ আয়াতটি মুআযযিনদের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়। আর এখানে যে বলা হয়েছে এবং সে ভাল কাজ করে। এর দ্বারা আযান ও ইকামতের মাঝে দুই রাকআত নামায পড়াকে বুঝানো হয়েছে। যেমন রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বলেছেনঃ “প্রত্যেক দুই আযানের (আযান ও ইকামতের) মাঝে নামায রয়েছে।”

তৃতীয়বারে তিনি বলেনঃ “যে ব্যক্তি (দুই রাকআত নামায পড়ার) ইচ্ছা করে।” একটি হাদীসে আছে যে, আযান ও ইকামতের মধ্যভাগের দু'আ প্রত্যাখ্যাত হয় না।

সঠিক কথা এটাই যে, আয়াতটি সাধারণ হওয়ার দিক দিয়ে মুআযযিন ও গায়ের মুআযিন সবকেই শামিল করে। যে কেউই আল্লাহর পথে ডাক দেয় সেই এর অন্তর্ভুক্ত।

এটা স্মরণ রাখার বিষয় যে, এ আয়াতটি অবতীর্ণ হওয়ার সময় আযান দেয়ার প্রচলনই হয়নি। কেননা, এ আয়াত অবতীর্ণ হয় মক্কায়। আর আযান দেয়ার পদ্ধতি শুরু হয় মদীনায় হিজরতের পর, যখন আবদুল্লাহ্ ইবনে যায়েদ আবদি রাব্বিহ্ (রাঃ) স্বপ্নে আযান দিতে দেখেন ও শুনেন এবং তা রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর নিকট বর্ণনা করেন। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁকে বলেনঃ “আযানের শব্দগুলো হযরত বিলাল (রাঃ)-কে শিখিয়ে দাও, কেননা তার কণ্ঠস্বর উচ্চ।” অতএব, সঠিক কথা এই যে, আয়াতটি আম বা সাধারণ এবং মুআযযিনও এর অন্তর্ভুক্ত।

হযরত হাসান বসরী (রঃ) এই আয়াতটি পাঠ করে বলেনঃ “এই লোকগুলোই আল্লাহর বন্ধু। এরাই আল্লাহর আউলিয়া। আল্লাহ্ তা'আলার নিকট এরাই সবচেয়ে বেশী পছন্দনীয় এবং সবচেয়ে বেশী প্রিয়। কেননা, তারা নিজেরা আল্লাহর কথা মেনে নেয় এবং অন্যদেরকেও মানাবার চেষ্টা করে। আর সাথে সাথে তারা নিজেরা ভাল কাজ করে এবং ঘোষণা করে যে, তারা আত্মসমর্পণকারীদের অন্তর্ভুক্ত। এরাই আল্লাহর প্রতিনিধি।”

মহামহিমান্বিত আল্লাহ্ বলেনঃ ভাল ও মন্দ সমান হতে পারে না, বরং এ দু’য়ের মধ্যে বহু পার্থক্য রয়েছে। যে তোমার সাথে মন্দ ব্যবহার করে তুমি তার সাথে ভাল ব্যবহার কর। এভাবে মন্দকে ভাল দ্বারা প্রতিহত কর।

হযরত উমার (রাঃ) বলেনঃ “তোমার ব্যাপারে যে আল্লাহর অবাধ্যচরণ করে, তার ব্যাপারে তুমি আল্লাহর আনুগত্য কর। এর চেয়ে বড় জিনিস আর কিছুই নেই।”

মহান আল্লাহ্ বলেনঃ এর ফলে তোমার সাথে যার শত্রুতা আছে সে হয়ে যাবে তোমার অন্তরঙ্গ বন্ধুর মত। এই গুণের অধিকারী করা হয় শুধু তাদেরকেই যারা ধৈর্যশীল এবং এই গুণের অধিকারী শুধু তাদেরকেই করা হয় যারা মহা ভাগ্যবান।

হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ মুমিনদেরকে নির্দেশ দেয়া হচ্ছে যে, তারা যেন ক্রোধের সময় ধৈর্য ধারণ করে এবং অন্যদের অজ্ঞতা ও নির্বুদ্ধিতার উপর নিজেদের সহনশীলতার পরিচয় দেয়। তারা যেন অপরের অপরাধকে ক্ষমার চোখে দেখে। এরূপ লোককে আল্লাহ তাআলা শয়তানের আক্রমণ হতে রক্ষা করে থাকেন এবং তাদের শত্রুরা তাদের অন্তরঙ্গ বন্ধুতে পরিণত হয়ে যায়। এতো হলো মানবীয় অনিষ্ট হতে বাঁচবার পন্থা। এখন মহান আল্লাহ্ শয়তানী অনিষ্ট হতে বাঁচবার পন্থা বলে দিচ্ছেনঃ যদি শয়তানের কুমন্ত্রণা তোমাকে প্ররোচিত করে তবে তুমি আল্লাহর শরণাপন্ন হবে এবং তার দিকে ঝুঁকে পড়বে। তিনিই শয়তানকে শক্তি দিয়ে রেখেছেন যে, সে মানুষের অন্তরে কুমন্ত্রণা দিবে। তার অনিষ্ট হতে রক্ষা করার ক্ষমতা তাঁরই রয়েছে। আল্লাহর নবী (সঃ) নামাযে বলতেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ আল্লাহর নিকট বিতাড়িত শয়তানের প্ররোচনা, ফুকার এবং অনিষ্ট হতে আশ্রয় প্রার্থনা করছি।”

আমরা পূর্বেই বর্ণনা করেছি যে, কুরআন কারীমের মধ্যে এই স্থানের সাথে তুলনীয় সূরায়ে আরাফের একটি স্থান এবং সূরায়ে মুমিনূনের একটি স্থান ছাড়া আর কোন স্থান নেই। সূরায়ে আ'রাফের স্থানটি হচ্ছে আল্লাহ্ তা'আলার নিম্নের উক্তিঃ (আরবী) অর্থাৎ “তুমি ক্ষমাপরায়ণতা অবলম্বন কর, সৎ কাজের নির্দেশ দাও এবং অজ্ঞদেরকে উপেক্ষা কর। যদি শয়তানের কুমন্ত্রণা তোমাকে প্ররোচিত করে তবে আল্লাহর শরণ নিবে, তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।”(৭:১৯৯-২০০) সূরায়ে মুমিনূনের স্থানটি হলো মহান আল্লাহর নিম্নের উক্তিঃ (আরবী) অর্থাৎ “মন্দের মুকাবিলা কর যা উত্তম তা দ্বারা; তারা যা বলে আমি সে সম্বন্ধে সবিশেষ অবহিত। বলঃ হে আমার প্রতিপালক! আমি আপনার আশ্রয় প্রার্থনা করি শয়তানের প্ররোচনা হতে। হে আমার প্রতিপালক! আমি আপনার আশ্রয় প্রার্থনা করি আমার নিকট তাদের উপস্থিতি হতে।”(২৩:৯৬-৯৮)





সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।