সূরা আলে-ইমরান (আয়াত: 74)
হরকত ছাড়া:
يختص برحمته من يشاء والله ذو الفضل العظيم ﴿٧٤﴾
হরকত সহ:
یَّخْتَصُّ بِرَحْمَتِهٖ مَنْ یَّشَآءُ ؕ وَ اللّٰهُ ذُو الْفَضْلِ الْعَظِیْمِ ﴿۷۴﴾
উচ্চারণ: ইয়াখতাসসুবিরাহমাতিহী মাইঁ ইয়াশাউ ওয়াল্লা-হু যুলফাদলিল ‘আজীম।
আল বায়ান: তিনি যাকে চান, তাঁর রহমত দ্বারা একান্ত করে নেন। আর আল্লাহ মহা অনুগ্রহের অধিকারী।
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৭৪. তিনি স্বীয় অনুগ্রহের জন্য যাকে ইচ্ছে একান্ত করে বেছে নেন(১)। আর আল্লাহ মহা অনুগ্রহশীল।
তাইসীরুল ক্বুরআন: তিনি যাকে ইচ্ছে নিজের দয়ার জন্য খাস করে বেছে নেন এবং আল্লাহ মহা কল্যাণের অধিকারী।
আহসানুল বায়ান: (৭৪) যাকে ইচ্ছা তিনি নিজ করুণা দ্বারা নির্বাচিত করেন। আর আল্লাহ মহা অনুগ্রহশীল।’ [1]
মুজিবুর রহমান: তিনি যার প্রতি ইচ্ছা করেন স্বীয় করুনা নির্দিষ্ট করেন এবং আল্লাহ মহান, অনুগ্রহশীল।
ফযলুর রহমান: তিনি যাকে চান স্বীয় অনুগ্রহের জন্য বেছে নেন। আল্লাহ মহা অনুগ্রহের অধিকারী।
মুহিউদ্দিন খান: তিনি যাকে ইচ্ছা নিজের বিশেষ অনুগ্রহ দান করেন। আর আল্লাহ মহা অনুগ্রহশীল।
জহুরুল হক: তিনি তাঁর করুণাবশতঃ নির্বাচিত করেন যাকে পছন্দ করেন, আর আল্লাহ্ বিপুল মহিমার অধিকারী।
Sahih International: He selects for His mercy whom He wills. And Allah is the possessor of great bounty.
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ৭৪. তিনি স্বীয় অনুগ্রহের জন্য যাকে ইচ্ছে একান্ত করে বেছে নেন(১)। আর আল্লাহ মহা অনুগ্রহশীল।
তাফসীর:
(১) অনুগ্রহ বলতে যাবতীয় অনুগ্রহই উদ্দেশ্য হতে পারে। তবে তাফসীরবিদ মুজাহিদের মতে, এখানে অনুগ্রহ বলে নবুওয়াত বোঝানো হয়েছে। কারণ, পূর্বের আয়াতে এ কারণেই ইয়াহুদীরা হিংসা করে ঈমান আনতে বিরত থাকছে বলে জানানো হয়েছে। [তাবারী]
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (৭৪) যাকে ইচ্ছা তিনি নিজ করুণা দ্বারা নির্বাচিত করেন। আর আল্লাহ মহা অনুগ্রহশীল।’ [1]
তাফসীর:
[1] এই আয়াতের দু’টি অর্থ করা হয়। একটি হল, ইয়াহুদীদের বড় বড় পন্ডিতরা যখন তাদের শিষ্যদেরকে শিখাত যে, তোমরা সকালে মুসলিম হয়ে আবার সন্ধ্যায় কাফের হয়ে যেও, যাতে যারা সত্যিকারে মুসলিম হয়ে গেছে, তারাও সন্দিহানে পড়ে ইসলাম থেকে ফিরে যায়, তখন সেই শিষ্যদেরকে অতিরিক্ত তাকীদ এও করত যে, সাবধান! তোমরা কেবল বাহ্যিক মুসলিম হয়ো; সত্যিকারের নয়। বরং সত্যিকারে তোমরা ইয়াহুদীই থাকবে এবং কখনোও এ কথা মনে করো না যে, যে অহী ও শরীয়ত এবং যে জ্ঞান ও মর্যাদা তোমরা লাভ করেছ, তা অন্য কেউ লাভ করতে পারে অথবা তোমরা ব্যতীত অন্য কেউ সত্যের উপর আছে, যে তোমাদের বিরুদ্ধে আল্লাহর কাছে হুজ্জত কায়েম করে তোমাদেরকে মিথ্যা সাব্যস্ত করতে পারবে। এই অর্থের দিক দিয়ে মাঝে স্বতন্ত্র বাক্যটি ছাড়া عِنْدَ رَبِّكُمْ পর্যন্ত সম্পূর্ণটাই ইয়াহুদীদের কথা। দ্বিতীয় অর্থ হল, হে ইয়াহুদ সম্প্রদায়! তোমরা সত্যকে দাবানো ও মিটানোর জন্য যেসব পদক্ষেপ গ্রহণ করেছ এবং যেসব চক্রান্ত চালিয়ে যাচ্ছ, তা কেবল এই জন্যই যে, প্রথমতঃ এ ব্যাপারে তোমরা দুঃখ ও হিংসা-জ্বালায় ভুগছ যে, যে জ্ঞান ও মর্যাদা, অহী ও শরীয়ত এবং যে দ্বীন তোমাদেরকে দেওয়া হয়েছিল, তদ্রূপ জ্ঞান ও মর্যাদা এবং দ্বীন অন্যদেরকে কেন দেওয়া হল? দ্বিতীয়তঃ তোমরা আশঙ্কা কর যে, সত্যের এই দাওয়াত যদি অগ্রগতি লাভ করে এবং তার শিকড় যদি মজবুত হয়ে যায়, তাহলে শুধু যে দুনিয়া থেকে তোমাদের মান-মর্যাদা চলে যাবে তা নয়, বরং যে সত্যকে তোমরা গোপন করে রেখেছ, তাও মানুষের কাছে প্রকাশ হয়ে যাবে। আর এ কারণেই মানুষ আল্লাহর কাছে তোমাদের বিরুদ্ধে হুজ্জত খাড়া করবে। অথচ তোমাদের জানা উচিত যে, দ্বীন ও শরীয়ত হল আল্লাহর অনুগ্রহ। এটা কারো উত্তরাধিকার সূত্রে লব্ধ জিনিস নয়, বরং তিনি তাঁর অনুগ্রহ যাকে ইচ্ছা দান করেন এবং এ অনুগ্রহ কাকে দেওয়া উচিত তাও তিনিই জানেন।
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ৭২-৭৪ নং আয়াতের তাফসীর:
পূর্বের আয়াতে উল্লেখ করা হয়েছে ইয়াহূদীরা সর্বক্ষণ কামনা করত মুসলিমগণ পথভ্রষ্ট হয়ে যাক, সূরা নিসার ৮৯ নং আয়াতে (আসবে) উল্লেখ করা হয়েছে তারা চায় মুসলিমরা আবার কাফির হয়ে যাক।
তাদের এ নিকৃষ্ট পরিকল্পনা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে অপকৌশল করত। তাদের সাথীদের বলতো দিনের প্রথমভাগে মুসলিমদের প্রতি যে কিতাব নাযিল হয়েছে তার প্রতি ঈমান আন, আর বিকাল বেলা কুফরী কর। ফলে সাধারণ মুর্খ মানুষেরা মনে করবে মুহাম্মাদের দীন ত্র“টিপূর্ণ তাই এরা ঈমান আনার পর আবার ফিরে এসেছে।
তারা পরিকল্পনা অনুযায়ী সকালে ঈমান এনে মুসলিমদের সাথে জামাআতে সালাত আদায় করত আবার বিকালে সব ত্যাগ করে নিজ ধর্মে ফিরে যেত। ইয়াহূদীরা আজও মুসলিমদেরকে নিধন ও ধর্ম ত্যাগ করার জন্য সুদূর প্রসারী পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে। সুতরাং আমাদের সর্বদা সতর্ক থাকা উচিত কোন ক্রমেই যেন তাদের ষড়যন্ত্রের জালে নিজেরা আবদ্ধ না হই।
তারা সাধারণ জনগণকে এ কথাও বলত, যারা তোমাদের ধর্মের অনুসারী তাদের ছাড়া অন্য কারো অনুসরণ করবে না।
আল্লাহ তা‘আলা নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে বলে দিচ্ছেন বল: আল্লাহ তা‘আলার হিদায়াতই সঠিক হিদায়াত। তোমরা ঈমান না আনলেও আমি ও আমার সাথে যারা ঈমান এনেছে আমরা আল্লাহ তা‘আলা প্রদত্ত সঠিক হিদায়াতের ওপর প্রতিষ্ঠিত আছি। আল্লাহ তা‘আলার হাতেই সকল অনুগ্রহ, তিনি যাকে ইচ্ছা তা দান করেন।
আয়াত থেকে শিক্ষণীয় বিষয়:
১. সাধারণ মুসলিমদেরকে বিভ্রান্ত করার জন্য ইয়াহূদীদের পরিকল্পনা সম্পর্কে জানলাম।
২. আল্লাহ তা‘আলা যাকে ইচ্ছা নবুওয়াত দেন। এতে কারো কোন হাত নেই এবং মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর পর নবুওয়াতের দাবী করার সুযোগ নেই, যেহেতু তিনি শেষ নাবী।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: ৬৯-৭৪ নং আয়াতের তাফসীর:
এখানে আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “ঐ ইয়াহূদীদের অবস্থার প্রতি লক্ষ্য কর যে, তারা কিভাবে মুসলমানদের প্রতি হিংসায় জ্বলে পুড়ে মরে যাচ্ছে। তাদেরকে পথভ্রষ্ট করার জন্য তারা কতইনা গোপন ষড়যন্ত্রের জাল বিস্তার করছে এবং তাদেরকে প্রতারিত করছে। অথচ প্রকৃতপক্ষে এসব অন্যায় কার্যের শাস্তি স্বয়ং তাদেরকেই ভোগ করতে হবে। কিন্তু তারা তা মোটেই বুঝছে না।
অতঃপর তাদেরকে তাদের এ জঘন্য কার্যের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়া হচ্ছে যে, তারা সত্য জেনে শুনে আল্লাহর আয়াত সমূহকে অস্বীকার করছে। তাদের বদভ্যাস এও আছে যে, তারা পূর্ণ জ্ঞান থাকা সত্ত্বেও সত্য ও মিথ্যাকে মিলিয়ে দিচ্ছে। তাদের কিতাবসমূহে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর গুণাবলী বর্ণিত আছে, তারা তা গোপন করছে। মুসলমানদেরকে পথভ্রষ্ট করার যেসব পন্থা তারা বের করেছে তার মধ্যে একটি কথা আল্লাহ তা'আলা বর্ণনা করেছেন যে, তারা পরস্পর পরামর্শ করে- “তোমরা দিনের প্রথমাংশে ঈমান আনবে এবং মুসলমানদের সাথে নামায পড়বে এবং শেষাংশে কাফির হয়ে যাবে। তাহলে মূর্খদেরও এ ধারণা হবে যে, এরা এ ধর্মের ভেতর কিছু ত্রুটি বিচ্যুতি পেয়েছে। বলেই এটা গ্রহণ করার পরেও তা হতে ফিরে গেল, কাজেই তারাও এ ধর্ম ত্যাগ করবে এতে বিস্ময়ের কিছুই নেই। মোটকথা তাদের এটা একটা কৌশল ছিল যে, দুর্বল ঈমানের লোকেরা ইসলাম হতে ফিরে যাবে এই জেনে যে, এ বিদ্বান লোকগুলো যখন ইসলাম গ্রহণের পরেও তা হতে ফিরে গেলো তাহলে অবশ্যই এ ধর্মের মধ্যে কিছু দোষত্রুটি রয়েছে। ঐ লোকগুলো বলতো‘তোমরা নিজেদের লোক ছাড়া মুসলমানদেরকে বিশ্বাস করো না, তাদের নিকট নিজেদের গোপন তথ্য প্রকাশ করো না এবং নিজেদের গ্রন্থের কথা তাদেরকে বলো না, নচেৎ তারা ওর উপর বিশ্বাস স্থাপন করবে এবং আল্লাহ তা'আলার নিকটও তাদের জন্যে ওটা আমাদের উপর দলীল হয়ে যাবে।'
তাই আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “হে নবী (সঃ)! তুমি তাদেরকে বলে দাও যে, সুপথ প্রদর্শন তো আল্লাহরই অধিকারে রয়েছে। তিনি মুমিনদের অন্তরকে ঐ প্রত্যেক জিনিসের উপর বিশ্বাস স্থাপন করার জন্যে প্রস্তুত করে দেন যা তিনি অবতীর্ণ করেছেন। ঐ দলীলগুলোর উপর তাদের পূর্ণ বিশ্বাস রাখার সৌভাগ্য লাভ হয়। যদিও তোমরা নিরক্ষর নবী মুহাম্মাদ মোস্তফা (সঃ)-এর গুণাবলী গোপন রাখছো তথাপি যারা ভাগ্যবান ব্যক্তি, তাঁরা তাঁর নবুওয়াতের বাহ্যিক নিদর্শন একবার দেখেই চিনে নেবে। অনুরূপভাবে তারা তাদের লোককে বলতো- ‘তোমাদের নিকট যে বিদ্যা রয়েছে তা তোমরা মুসলমানদের নিকট প্রকাশ করো না, নতুবা তারা তা শিখে নেবে, এমনকি তাদের ঈমানী শক্তির কারণে তোমাদের চেয়েও বেড়ে যাবে কিংবা আল্লাহ তা'আলার নিকট তাদের প্রমাণ প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাবে। অর্থাৎ স্বয়ং তোমাদের গ্রন্থের মাধ্যমেই তারা তোমাদের উপর দোষারোপ করবে এবং তোমাদেরই উপর তোমাদেরই দলীল প্রতিষ্ঠিত করে বসবে। আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ তোমরা বলে দাও যে, অনুগ্রহ। আল্লাহর হাতে রয়েছে, তিনি যাকে ইচ্ছে করেন তাকেই দিয়ে থাকেন। সমস্ত কার্য তাঁরই অধিকারে রয়েছে। তিনিই প্রদানকারী। তিনি যাকে ইচ্ছে করেন ঈমান আমল এবং অনুগ্রহ রূপ সম্পদ পরিপূর্ণ রূপে দিয়ে থাকেন। আর যাকে ইচ্ছে করেন সত্যপথ হতে অন্ধ, ইসলামের কালেমা হতে বধির এবং সঠিক বোধ হতে বঞ্চিত করেন। তাঁর সমস্ত কাজই নিপুণতাপূর্ণ এবং তিনি প্রশস্ত জ্ঞানের অধিকারী। তিনি যাকে চান স্বীয় করুণার সাথে নির্দিষ্ট করে নেন। তিনি বড়ই অনুগ্রহশীল। হে মুসমলমানগণ! আল্লাহ তাআলা তোমাদের উপর সীমাহীন অনুগ্রহ করেছেন। তিনি তোমাদের নবী (সঃ)-কে সমস্ত নবী (আঃ)-এর উপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন এবং সর্বদিক দিয়ে পরিপূর্ণ শরীয়ত তোমাদেরকে প্রদান করেছেন।
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।