সূরা আলে-ইমরান (আয়াত: 71)
হরকত ছাড়া:
يا أهل الكتاب لم تلبسون الحق بالباطل وتكتمون الحق وأنتم تعلمون ﴿٧١﴾
হরকত সহ:
یٰۤاَهْلَ الْکِتٰبِ لِمَ تَلْبِسُوْنَ الْحَقَّ بِالْبَاطِلِ وَ تَکْتُمُوْنَ الْحَقَّ وَ اَنْتُمْ تَعْلَمُوْنَ ﴿۷۱﴾
উচ্চারণ: ইয়াআহলাল কিতা-বি লিমা তালবিছূনাল হাক্কাবিলবা-তিলি ওয়া তাকতুমূনাল হাক্কাওয়া আনতুম তা‘লামূন।
আল বায়ান: হে কিতাবীরা, কেন তোমরা সত্যকে মিথ্যার সাথে মিশ্রিত করছ এবং সত্যকে গোপন করছ, অথচ তোমরা তা জান?
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৭১. হে কিতাবীরা! তোমরা কেন সত্যকে মিথ্যার সাথে মিশ্রিত কর(১) এবং সত্য গোপন কর, যখন তোমরা জান।(২)
তাইসীরুল ক্বুরআন: হে আহলে কিতাব! কেন তোমরা সত্যকে মিথ্যার সঙ্গে মিশ্রিত করছ আর জেনে বুঝে সত্যকে গোপন করছ।
আহসানুল বায়ান: (৭১) হে আহলে কিতাব (ঐশীগ্রন্থধারীরা)! তোমরা কেন সত্যকে মিথ্যার সাথে মিশ্রিত কর এবং জেনে-শুনে সত্য গোপন কর? [1]
মুজিবুর রহমান: হে কিতাবীরা! তোমরা কেন সত্যের সঙ্গে মিথ্যাকে মিলিয়ে নিচ্ছ এবং সত্যকে গোপন করছ? অথচ তোমরাতো অবগত আছ।
ফযলুর রহমান: হে কিতাবধারীরা! তোমরা কেন সত্যকে মিথ্যার সাথে মিশ্রিত করো এবং জেনেশুনে সত্য গোপন করো?
মুহিউদ্দিন খান: হে আহলে কিতাবগণ, কেন তোমরা সত্যকে মিথ্যার সাথে সংমিশ্রণ করছ এবং সত্যকে গোপন করছ, অথচ তোমরা তা জান।
জহুরুল হক: হে গ্রন্থধারিগণ! কেন তোমরা সত্যকে মিথ্যার পোশাক পরিয়ে দিচ্ছ, আর তোমরা জেনেশুনে সত্যকে লুকোচ্ছ?
Sahih International: O People of the Scripture, why do you confuse the truth with falsehood and conceal the truth while you know [it]?
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ৭১. হে কিতাবীরা! তোমরা কেন সত্যকে মিথ্যার সাথে মিশ্রিত কর(১) এবং সত্য গোপন কর, যখন তোমরা জান।(২)
তাফসীর:
(১) ইবনে আব্বাস বলেন, আব্দুল্লাহ ইবনুছ ছাইফ, আদী ইবন যায়দ ও হারেস ইবন আওফ পরস্পর পরস্পরকে বললঃ আস, যা মুহাম্মাদ ও তার সাথীদের উপর নাযিল হয়েছে আমরা সেটার উপর সকালবেলায় ঈমান আনয়ন করি এবং সন্ধ্যা বেলা সেটার সাথে কুফর করি। যাতে করে মুসলিমরা তাদের দ্বীনের ব্যাপারে সন্দেহে ঘুরপাক খেতে থাকে। ফলে আমরা যে রকম করেছি তারাও সে রকম করবে। আর এতে করেই তারা তাদের দ্বীন থেকে সরে আসবে। তখন আল্লাহ তা'আলা এ আয়াতটি নাযিল করেন। [তাবারী]
কাতাদা রাহিমাহুল্লাহ বলেন, এখানে ‘তোমরা কেন হককে বাতিলের বা সত্যকে মিথ্যার সাথে মিশ্রিত কর’ এর অর্থ হচ্ছে, তোমরা কেন ইসলামের সাথে ইয়াহুদী মতবাদ ও খ্রীস্টানদের মতবাদকে মিলিয়ে মিশিয়ে দেখছ? অথচ তোমরা ভাল করেই জান যে, যে দ্বীন ব্যতীত আর কোন কিছু আল্লাহ কবুল করবেন না, আর কোন প্রতিফল কেউ পাবে না, সেটি হচ্ছে ইসলাম। [তাবারী]
(২) কাতাদা বলেন, জেনে-বুঝে সত্য গোপন করার অর্থ হচ্ছে, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বিষয়টি তারা গোপন করছে। অথচ তারা মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সম্পর্কে তাদের তাওরাত ও ইঞ্জীলে আলোচনা ও গুণাগুণ দেখতে পায়। যিনি সৎকাজের আদেশ করবেন এবং অসৎকাজ থেকে নিষেধ করবেন। [তাবারী]
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (৭১) হে আহলে কিতাব (ঐশীগ্রন্থধারীরা)! তোমরা কেন সত্যকে মিথ্যার সাথে মিশ্রিত কর এবং জেনে-শুনে সত্য গোপন কর? [1]
তাফসীর:
[1] এখানে ইয়াহুদীদের দু’টি অতি বড় অপরাধের প্রতি ইঙ্গিত করে তাদেরকে তা থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দান করা হচ্ছে। প্রথম অপরাধ হল, ন্যায়-অন্যায় এবং সত্য ও মিথ্যার মধ্যে মিশ্রিত করণ; যাতে মানুষের কাছে সত্য ও মিথ্যা পরিষ্কার না হয়। দ্বিতীয় অপরাধ হল, সত্যকে গোপন করা। অর্থাৎ, নবী করীম (সাঃ)-এর যে নিদর্শন ও গুণাবলী তাওরাতে লিপিবদ্ধ হয়েছে, তা মানুষ থেকে গোপন করা, যাতে কমসে-কম এই নিদর্শনাদির দিক থেকে যেন তাঁর সত্যতা প্রকাশ না হয়ে পড়ে। আর এই উভয় অপরাধ তারা জেনে-শুনেই করত। যার কারণে তারা বড়ই দুর্দশার শিকার হয়েছিল। তাদের অপরাধের কথা সূরা বাক্বারাতেও (৪২ আয়াতে) উল্লেখ হয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন, [وَلا تَلْبِسُوا الْحَقَّ بِالْبَاطِلِ وَتَكْتُمُوا الْحَقَّ وَأَنْتُمْ تَعْلَمُونَ] অর্থাৎ, ‘‘তোমরা সত্যকে মিথ্যার সাথে মিশিয়ে দিও না এবং জানা সত্ত্বেও সত্যকে গোপন করো না।’’ ‘আহলে কিতাব’ (ঐশীগ্রন্থধারী) শব্দটি কোন কোন মুফাসসিরের নিকট ব্যাপক; যা ইয়াহুদী ও খ্রিষ্টান উভয়কেই শামিল। অর্থাৎ, তাদের উভয়কেই এই অপরাধ থেকে বিরত থাকতে বলা হয়েছে। আবার কেউ বলেছেন, ‘আহলে কিতাব’ বলতে ইয়াহুদীদের সেই কয়েকটি গোত্রকে বুঝানো হয়েছে, যারা মদীনায় বসবাস করত। যেমন, বানী ক্বুরাইযা, বানী নায্বীর এবং বানী ক্বাইনুক্বা। আর এই উক্তিকেই সঠিক বলে মনে হচ্ছে। কারণ, (বিভিন্ন কার্যকলাপের তাকীদে) মুসলিমদের সরাসরি সম্পর্ক এদের সাথেই ছিল এবং নবী করীম (সাঃ)-এর সাথে বিরোধিতায় এরাই ছিল অগ্রণী।
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ৬৯-৭১ নং আয়াতের তাফসীর:
ঈমানদারদের সাথে ইয়াহূদীরা যে হিংসা ও বিদ্বেষ পোষণ করত এবং যার কারণে তারা মুসলিমদেরকে পথভ্রষ্ট করতে চাইত, সে কথাই এ আয়াতে তুলে ধরা হয়েছে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: এভাবে তারা নিজেরাই নিজেদেরকে ভ্রষ্টতার মধ্যে ঠেলে দিচ্ছে। কিন্তু তারা বুঝতে পারে না।
এ সম্পর্কে সূরা বাকারার ১০৯ নং আয়াতে উল্লেখ করা হয়েছে।
আহলে কিতাবগণ জেনেশুনে আল্লাহ তা‘আলার নিদর্শনসমূহকে প্রত্যাখ্যান করত অর্থাৎ নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সত্যবাদিতা ও সততা সম্পর্কে জানত, তা সত্ত্বেও কুফরী করত।
অতঃপর ৭১ নং আয়াতে ইয়াহূদীদের দু’টি বড় অপরাধের কথা তুলে ধরা হয়েছে:
১. সত্যের সাথে মিথ্যার সংমিশ্রণ করত; যাতে সাধারণ মানুষ সত্য ও মিথ্যা নির্ণয় করতে না পারে।
২. সত্যকে গোপন করত। অর্থাৎ নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর যে সকল নিদর্শন ও গুণাবলী তাওরাতে বর্ণিত হয়েছে তা মানুষ থেকে গোপন করত, যাতে মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সত্যতা প্রকাশ না পেয়ে যায়। এ সম্পর্কে সূরা বাকারার ৪২ নং আয়াতে উল্লেখ করা হয়েছে। আমাদের উচিত এহেন ঘৃণিত আচরণ থেকে নিজেদের মুক্ত করা।
আয়াত থেকে শিক্ষণীয় বিষয়:
১. মুসলিমদের প্রধান শত্র“ ইয়াহূদীরা, তারপর মুশরিকরা।
২. মন্দ কর্মের পরিণতি নিজের ওপর বর্তায়।
৩. যে কোন ক্ষেত্রেই সত্য গোপন করা হারাম।
৪. সত্যের সাথে মিথ্যা সংমিশ্রণ করা মারাত্মক অপরাধ।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: ৬৯-৭৪ নং আয়াতের তাফসীর:
এখানে আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “ঐ ইয়াহূদীদের অবস্থার প্রতি লক্ষ্য কর যে, তারা কিভাবে মুসলমানদের প্রতি হিংসায় জ্বলে পুড়ে মরে যাচ্ছে। তাদেরকে পথভ্রষ্ট করার জন্য তারা কতইনা গোপন ষড়যন্ত্রের জাল বিস্তার করছে এবং তাদেরকে প্রতারিত করছে। অথচ প্রকৃতপক্ষে এসব অন্যায় কার্যের শাস্তি স্বয়ং তাদেরকেই ভোগ করতে হবে। কিন্তু তারা তা মোটেই বুঝছে না।
অতঃপর তাদেরকে তাদের এ জঘন্য কার্যের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়া হচ্ছে যে, তারা সত্য জেনে শুনে আল্লাহর আয়াত সমূহকে অস্বীকার করছে। তাদের বদভ্যাস এও আছে যে, তারা পূর্ণ জ্ঞান থাকা সত্ত্বেও সত্য ও মিথ্যাকে মিলিয়ে দিচ্ছে। তাদের কিতাবসমূহে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর গুণাবলী বর্ণিত আছে, তারা তা গোপন করছে। মুসলমানদেরকে পথভ্রষ্ট করার যেসব পন্থা তারা বের করেছে তার মধ্যে একটি কথা আল্লাহ তা'আলা বর্ণনা করেছেন যে, তারা পরস্পর পরামর্শ করে- “তোমরা দিনের প্রথমাংশে ঈমান আনবে এবং মুসলমানদের সাথে নামায পড়বে এবং শেষাংশে কাফির হয়ে যাবে। তাহলে মূর্খদেরও এ ধারণা হবে যে, এরা এ ধর্মের ভেতর কিছু ত্রুটি বিচ্যুতি পেয়েছে। বলেই এটা গ্রহণ করার পরেও তা হতে ফিরে গেল, কাজেই তারাও এ ধর্ম ত্যাগ করবে এতে বিস্ময়ের কিছুই নেই। মোটকথা তাদের এটা একটা কৌশল ছিল যে, দুর্বল ঈমানের লোকেরা ইসলাম হতে ফিরে যাবে এই জেনে যে, এ বিদ্বান লোকগুলো যখন ইসলাম গ্রহণের পরেও তা হতে ফিরে গেলো তাহলে অবশ্যই এ ধর্মের মধ্যে কিছু দোষত্রুটি রয়েছে। ঐ লোকগুলো বলতো‘তোমরা নিজেদের লোক ছাড়া মুসলমানদেরকে বিশ্বাস করো না, তাদের নিকট নিজেদের গোপন তথ্য প্রকাশ করো না এবং নিজেদের গ্রন্থের কথা তাদেরকে বলো না, নচেৎ তারা ওর উপর বিশ্বাস স্থাপন করবে এবং আল্লাহ তা'আলার নিকটও তাদের জন্যে ওটা আমাদের উপর দলীল হয়ে যাবে।'
তাই আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “হে নবী (সঃ)! তুমি তাদেরকে বলে দাও যে, সুপথ প্রদর্শন তো আল্লাহরই অধিকারে রয়েছে। তিনি মুমিনদের অন্তরকে ঐ প্রত্যেক জিনিসের উপর বিশ্বাস স্থাপন করার জন্যে প্রস্তুত করে দেন যা তিনি অবতীর্ণ করেছেন। ঐ দলীলগুলোর উপর তাদের পূর্ণ বিশ্বাস রাখার সৌভাগ্য লাভ হয়। যদিও তোমরা নিরক্ষর নবী মুহাম্মাদ মোস্তফা (সঃ)-এর গুণাবলী গোপন রাখছো তথাপি যারা ভাগ্যবান ব্যক্তি, তাঁরা তাঁর নবুওয়াতের বাহ্যিক নিদর্শন একবার দেখেই চিনে নেবে। অনুরূপভাবে তারা তাদের লোককে বলতো- ‘তোমাদের নিকট যে বিদ্যা রয়েছে তা তোমরা মুসলমানদের নিকট প্রকাশ করো না, নতুবা তারা তা শিখে নেবে, এমনকি তাদের ঈমানী শক্তির কারণে তোমাদের চেয়েও বেড়ে যাবে কিংবা আল্লাহ তা'আলার নিকট তাদের প্রমাণ প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাবে। অর্থাৎ স্বয়ং তোমাদের গ্রন্থের মাধ্যমেই তারা তোমাদের উপর দোষারোপ করবে এবং তোমাদেরই উপর তোমাদেরই দলীল প্রতিষ্ঠিত করে বসবে। আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ তোমরা বলে দাও যে, অনুগ্রহ। আল্লাহর হাতে রয়েছে, তিনি যাকে ইচ্ছে করেন তাকেই দিয়ে থাকেন। সমস্ত কার্য তাঁরই অধিকারে রয়েছে। তিনিই প্রদানকারী। তিনি যাকে ইচ্ছে করেন ঈমান আমল এবং অনুগ্রহ রূপ সম্পদ পরিপূর্ণ রূপে দিয়ে থাকেন। আর যাকে ইচ্ছে করেন সত্যপথ হতে অন্ধ, ইসলামের কালেমা হতে বধির এবং সঠিক বোধ হতে বঞ্চিত করেন। তাঁর সমস্ত কাজই নিপুণতাপূর্ণ এবং তিনি প্রশস্ত জ্ঞানের অধিকারী। তিনি যাকে চান স্বীয় করুণার সাথে নির্দিষ্ট করে নেন। তিনি বড়ই অনুগ্রহশীল। হে মুসমলমানগণ! আল্লাহ তাআলা তোমাদের উপর সীমাহীন অনুগ্রহ করেছেন। তিনি তোমাদের নবী (সঃ)-কে সমস্ত নবী (আঃ)-এর উপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন এবং সর্বদিক দিয়ে পরিপূর্ণ শরীয়ত তোমাদেরকে প্রদান করেছেন।
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।