সূরা আলে-ইমরান (আয়াত: 39)
হরকত ছাড়া:
فنادته الملائكة وهو قائم يصلي في المحراب أن الله يبشرك بيحيى مصدقا بكلمة من الله وسيدا وحصورا ونبيا من الصالحين ﴿٣٩﴾
হরকত সহ:
فَنَادَتْهُ الْمَلٰٓئِکَۃُ وَ هُوَ قَآئِمٌ یُّصَلِّیْ فِی الْمِحْرَابِ ۙ اَنَّ اللّٰهَ یُبَشِّرُکَ بِیَحْیٰی مُصَدِّقًۢا بِکَلِمَۃٍ مِّنَ اللّٰهِ وَ سَیِّدًا وَّ حَصُوْرًا وَّ نَبِیًّا مِّنَ الصّٰلِحِیْنَ ﴿۳۹﴾
উচ্চারণ: ফানা-দাতহুল মালাইকাতু ওয়া হুওয়া কাইমুইঁ ইউসাললী ফিল মিহরা-বি আন্নাল্লা-হা ইউবাশশিরুকা বিইয়াহইয়া-মুসাদ্দিকাম বিকালিমাতিম মিনাল্লা-হি ওয়া ছাইয়িদাওঁ ওয়াহাসূরাওঁ ওয়ানাবিইয়াম মিনাসসা-লিহীন।
আল বায়ান: অতঃপর ফেরেশতারা তাকে ডেকে বলল, সে যখন কক্ষে দাঁড়িয়ে সালাত আদায় করছিল, ‘নিশ্চয় আল্লাহ তোমাকে ইয়াহইয়া সম্পর্কে সুসংবাদ দিচ্ছেন, যে হবে আল্লাহর পক্ষ থেকে বাণীর সত্যায়নকারী, নেতা ও নারী সম্ভোগমুক্ত এবং নেককারদের মধ্য থেকে একজন নবী’।
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৩৯. অতঃপর যখন যাকারিয়্যা ইবাদত কক্ষে সালাতে দাঁড়িয়েছিলেন তখন ফেরেশতারা তাকে আহবান করে বলল, নিশ্চয় আল্লাহ আপনাকে ইয়াহইয়ার সুসংবাদ দিচ্ছেন, সে হবে আল্লাহর পক্ষ থেকে আগমনকৃত এক কালেমাকে সত্যায়নকারী(১), নেতা(২), ভোগ আসক্তিমুক্ত(৩) এবং পূণ্যবানদের অন্তর্ভুক্ত একজন নবী।
তাইসীরুল ক্বুরআন: যখন যাকারিয়া ‘ইবাদাত কক্ষে সলাতে দন্ডায়মান তখন ফেরেশতারা তাকে সম্বোধন করে বলল : আল্লাহ তোমাকে ইয়াহ্ইয়া’র সুসংবাদ দিচ্ছেন, সে হবে আল্লাহর পক্ষ হতে আগত কালেমার সত্যতার সাক্ষ্যদাতা, নেতা, গুনাহ হতে বিরত ও নেক বান্দাগণের মধ্য হতে একজন নাবী।
আহসানুল বায়ান: (৩৯) যখন (যাকারিয়া) মিহরাবে নামাযে রত ছিল, তখন ফিরিশতাগণ তাকে সম্বোধন করে বলল, ‘নিশ্চয় আল্লাহ তোমাকে ইয়াহয়্যার সুসংবাদ দিচ্ছেন,[1] সে হবে আল্লাহর এক বাণী (ঈসা)র সমর্থক,[2] সে হবে নেতা, জিতেন্দ্রিয় এবং পুণ্যবানদের মধ্যে একজন নবী।’
মুজিবুর রহমান: অতঃপর যখন সে মেহরাবের মধ্যে দাঁড়িয়ে প্রার্থনা করছিল তখন মালাইকা/ফেরেশতাগণ তাকে সম্বোধন করে বলেছিলঃ নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাকে ইয়াহইয়া সম্বন্ধে সুসংবাদ দিচ্ছেন - তার অবস্থা এই হবে যে, সে আল্লাহর একটি বাক্যের সত্যতা প্রকাশকারী হবে, নেতা হবে, স্বীয় প্রবৃত্তিকে দমনকারী হবে এবং সৎ কর্মশীলগণের মধ্যে নাবী হবে।
ফযলুর রহমান: অতঃপর সে যখন কামরার মধ্যে নামাযে দণ্ডায়মান ছিল তখন ফেরেশতারা তাকে সম্বোধন করে বলল, “আল্লাহ তোমাকে (তোমার সন্তান) ইয়াহইয়ার সুসংবাদ দিচ্ছেন, যে হবে আল্লাহর একটি কথার (মরিয়মপুত্র ঈসার) প্রতি বিশ্বাস স্থাপনকারী, নেতৃত্বসম্পন্ন, নারী-সংসর্গ থেকে বিরত ও একজন সৎকর্মশীল নবী।”
মুহিউদ্দিন খান: যখন তিনি কামরার ভেতরে নামাযে দাঁড়িয়েছিলেন, তখন ফেরেশতারা তাঁকে ডেকে বললেন যে, আল্লাহ তোমাকে সুসংবাদ দিচ্ছেন ইয়াহইয়া সম্পর্কে, যিনি সাক্ষ্য দেবেন আল্লাহর নির্দেশের সত্যতা সম্পর্কে, যিনি নেতা হবেন এবং নারীদের সংস্পর্শে যাবেন না, তিনি অত্যন্ত সৎকর্মশীল নবী হবেন।
জহুরুল হক: ফিরিশ্তারা তাঁকে ডেকে বললে আর তিনি তখন উপাসনাস্থলে নামাযে দাঁড়িয়েছিলেন -- "আল্লাহ্ নিশ্চয়ই আপনাকে সুসংবাদ দিচ্ছেন ইয়াহ্য়ার, আল্লাহ্র বাণীর সত্যতা প্রতিপন্ন করতে, আর সম্মানিত ও চরিত্রবান, আর সাধুপুরুষদের মধ্য থেকে একজন নবী।"
Sahih International: So the angels called him while he was standing in prayer in the chamber, "Indeed, Allah gives you good tidings of John, confirming a word from Allah and [who will be] honorable, abstaining [from women], and a prophet from among the righteous."
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ৩৯. অতঃপর যখন যাকারিয়্যা ইবাদত কক্ষে সালাতে দাঁড়িয়েছিলেন তখন ফেরেশতারা তাকে আহবান করে বলল, নিশ্চয় আল্লাহ আপনাকে ইয়াহইয়ার সুসংবাদ দিচ্ছেন, সে হবে আল্লাহর পক্ষ থেকে আগমনকৃত এক কালেমাকে সত্যায়নকারী(১), নেতা(২), ভোগ আসক্তিমুক্ত(৩) এবং পূণ্যবানদের অন্তর্ভুক্ত একজন নবী।
তাফসীর:
(১) এখানে কালেমা বলতে ঈসা আলাইহিস সালামকে বোঝানো হয়েছে। পবিত্র কুরআনের বিভিন্ন স্থানে ঈসা আলাইহিস সালামকে ‘কালেমাতুল্লাহ’ বা আল্লাহর বাণী বলা হয়েছে, কারণ, তিনি শুধু আল্লাহর কালেমা বা নির্দেশে চিরাচরিত প্রথার বিপরীতে পিতার মাধ্যম ছাড়াই জন্মগ্রহণ করেছিলেন। এখানে তাকে ‘আল্লাহর কালাম’ বলে বিশেষভাবে উল্লেখ করে সম্মানিত করাই উদ্দেশ্য। নতুবা সবকিছুই আল্লাহর কালেমার মাধ্যমেই হয়। তার কালেমা ব্যতীত কিছুই হয় না।
(২) কাতাদা বলেন, আল্লাহর শপথ তিনি ইবাদাত, সহিষ্ণুতা, জ্ঞান ও পরহেযগারীতে সবার শীর্ষ নেতা হিসেবে ছিলেন। পক্ষান্তরে মুজাহিদ বলেন, সাইয়্যেদ অর্থ হচ্ছে, তিনি আল্লাহর কাছে সম্মানিত ছিলেন। [তাবারী]
(৩) এটা ইয়াহইয়া আলাইহিস সালামের একটি গুরুত্বপূর্ণ গুণ। এর অর্থ, যিনি যাবতীয় কামনা-বাসনা থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখেন। উদাহরণতঃ উত্তম পানাহার, উত্তম পোষাক পরিধান এবং বিবাহ ইত্যাদি। এ গুণটি প্রশংসার ক্ষেত্রে উল্লেখ করায় বাহ্যতঃ মনে হয় যে, এটাই উত্তম পন্থা ৷ অথচ বিভিন্ন হাদীসে বিবাহিত জীবন-যাপন করাই যে উত্তম একথা প্রমাণিত আছে। এ সম্পর্কে সুচিন্তিত সিদ্ধান্ত এই যে, যদি কারো অবস্থা ইয়াহইয়া 'আলাইহিস সালামের মত হয়- অর্থাৎ অন্তরে আখেরাতের চিন্তা প্রবল হওয়ার কারণে স্ত্রীর প্রয়োজন অনুভুত না হয় এবং স্ত্রী ও সন্তানদের হক আদায় করার মত অবকাশ না থাকে, তবে তার পক্ষে বিবাহ না করাই উত্তম। এ কারণেই যে সব হাদীসে বিবাহের ফযীলত বর্ণিত হয়েছে, তাতে এ কথাও বলা হয়েছে, যে ব্যক্তি বিবাহের সামর্থ রাখে এবং স্ত্রীর হক আদায় করতে পারে, তার পক্ষেই বিবাহ করা উত্তম। [বুখারীঃ ১৮০৬, মুসলিমঃ ১৪০০] এতে বুঝা যাচ্ছে যে, এর ব্যতিক্রম হলে বিবাহ ওয়াজিব নয়।
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (৩৯) যখন (যাকারিয়া) মিহরাবে নামাযে রত ছিল, তখন ফিরিশতাগণ তাকে সম্বোধন করে বলল, ‘নিশ্চয় আল্লাহ তোমাকে ইয়াহয়্যার সুসংবাদ দিচ্ছেন,[1] সে হবে আল্লাহর এক বাণী (ঈসা)র সমর্থক,[2] সে হবে নেতা, জিতেন্দ্রিয় এবং পুণ্যবানদের মধ্যে একজন নবী।’
তাফসীর:
[1] অসময়ের ফল দেখে যাকারিয়া (আঃ)-এর অন্তরে (বার্ধক্যে পৌঁছে যাওয়া এবং স্ত্রী বাঁঝা হওয়া সত্ত্বেও) আশা জেগে উঠলো যে, তাঁকেও যেন মহান আল্লাহ এইভাবে (যেভাবে তিনি মারয়্যামকে অসময়ের ফল দিয়েছেন) কোন সন্তান দানে ধন্য করেন। সুতরাং মনের অজ্ঞাতসারে আল্লাহর সমীপে তাঁর দু’আর মুখ খুলে গেল। আল্লাহ তাঁর এই দু’আ কুবলও করলেন।
[2] আল্লাহর এক বাণীর সমর্থন ও সত্যায়ন করার অর্থ, ঈসা (আঃ)-কে সত্য বলে বিশ্বাস করা। অর্থাৎ, ইয়াহ্য়্যা (আঃ) ঈসা (আঃ)-এর চেয়ে বড় ছিলেন। তাঁরা আপোসে খালাতো ভাই ছিলেন। উভয়েই একে অপরকে সমর্থন করেছেন। سيِّد এর অর্থ সর্দার বা জননেতা। حَصور এর অর্থ পাপসমূহ থেকে পবিত্র; যে পাপের কাছেও ঘেঁষে না। অর্থাৎ তাঁকে যেন পাপ থেকে নিবারিত রাখা হবে। কেউ কেউ এর অর্থ করেছেন নপুংসক বা হিজড়া। কিন্তু তা সঠিক নয়। কারণ তা একটি দোষ, অথচ এখানে তাঁর উল্লেখ করা হয়েছে প্রশংসা ও ফযীলত হিসেবে। (অবশ্য জিতেন্দ্রিয় বা সংযমী অনুবাদ বেঠিক নয়।)
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ৩৫-৬০ নং আয়াতের তাফসীর:
এ আয়াতগুলোতে আল্লাহ তা‘আলা ঈসা (আঃ)-এর মা মারইয়াম (আলাইহাস সালাম) ও তাঁর নানী ইমরানের স্ত্রী, যার নাম হান্না বিনতে ফাকুজ ও তাঁর জন্ম, মৃত্যু, মু‘জিযাহ এবং সম্প্রদায়ের সাথে যে কার্যকলাপ ও আচরণ হয়েছিল সেসব বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছেন।
শাব্দিক ও প্রাসঙ্গিক আলোচনা:
مُحَرَّرًا একনিষ্ঠভাবে শুধু ইবাদত করার জন্য এবং খিদমত করার জন্য উৎসর্গ করে দেয়া। অর্থাৎ পূর্ববর্তী নাবীদের শরীয়তে প্রচলিত ইবাদত-পদ্ধতির মধ্যে আল্লাহ তা‘আলার নামে সন্তান উৎসর্গ করার রেওয়াজও চালু ছিল। এসব উৎসর্গিত সন্তানদের পার্থিব কোন কাজকর্মে নিযুক্ত করা হত না। এ পদ্ধতি অনুযায়ী ঈসার নানী অর্থাৎ ইমরানের স্ত্রী নিজের গর্ভস্থ সন্তান সম্পর্কে মানত করলেন যে, তাকে বিশেষভাবে আল্লাহ তা‘আলার ঘর বায়তুল মুক্বাদ্দাসের খেদমতে নিয়োজিত করা হবে।
(وَإِنِّيْ أُعِيْذُهَا بِكَ وَذُرِّيَّتَهَا)
‘আমি তাকে ও তার সন্তানদেরকে আপনার আশ্রয়ে সমর্পণ করছি’ হান্না এ দু‘আ করেছিলেন, আল্লাহ তা‘আলা তাঁর এ দু‘আ কবূল করেছিলেন। ফলে মারইয়ামকে জন্মের সময় শয়তান স্পর্শ করতে পারেনি। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন: প্রত্যেক শিশুকেই তার জন্মের সময় শয়তান আঘাত করে, এর কারণে সে চীৎকার করে কেঁদে উঠে; কিন্তু মারইয়াম (আলাইহাস সালাম) ও তাঁর ছেলে ঈসা (আঃ) এটা হতে রক্ষা পেয়েছিলেন। (সহীহ বুখারী হা: ৩৪৩১)
অন্য বর্ণনায় রয়েছে শয়তান যখন ঈসা (আঃ)-কে আঘাত করতে গেল তখন ঈসা (আঃ)-কে আঘাত করতে না পেরে পর্দায় আঘাত করল। (সহীহ বুখারী হা: ৩২৮৬)
المحراب মিহরাব বলা হয় ছোট একটি কামরাকে। এ ছোট কক্ষে মারইয়াম (আলাইহাস সালাম) থাকতেন। আর মাঝে মধ্যে তার খালু যাকারিয়া (আঃ) তাকে দেখতে যেতেন।
(مُصَدِّقًۭا بِکَلِمَةٍ مِّنَ اللہِ وَسَیِّدًا وَّحَصُوْرًا)
‘তিনি হবেন আল্লাহর বাণীর সত্যায়নকারী, নেতা, প্রবৃত্তি দমনকারী’ ইয়াহইয়া (আঃ) ছিলেন ঈসা (আঃ)-এর সত্যায়নকারী। “কালিমা” দ্বারা ঈসা (আঃ)-কে বুঝানো হয়েছে। ইয়াহইয়া (আঃ) ঈসা (আঃ)-এর বড় ছিলেন। হাদীসেও ঈসা (আঃ)-এর ব্যাপারে কালিমা শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন:
مَنْ شَهِدَ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ وَأَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُهُ وَرَسُولُهُ وَأَنَّ عِيسَى عَبْدُ اللَّهِ وَرَسُولُهُ وَكَلِمَتُهُ أَلْقَاهَا إِلَى مَرْيَمَ وَرُوحٌ مِنْهُ وَالْجَنَّةُ حَقٌّ وَالنَّارُ حَقٌّ أَدْخَلَهُ اللَّهُ الْجَنَّةَ عَلَى مَا كَانَ مِنْ الْعَمَلِ
যে ব্যক্তি এ সাক্ষ্য দেবে যে, আল্লাহ তা‘আলা ছাড়া সত্য কোন মা‘বূদ নেই, মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আল্লাহ তা‘আলার বান্দা ও রাসূল। ঈসা (আঃ) আল্লাহ তা‘আলার বান্দা ও রাসূল এবং আল্লাহ তা‘আলার একটি কালিমা যা মারইয়াম (আলাইহাস সালাম) এর প্রতি ছুড়ে দিয়েছিলেন এবং তাঁর একটি রূহ। জান্নাত সত্য, জাহান্নাম সত্য। তার (ঈসা (আঃ)-এর যে আমল থাকুক না কেন আল্লাহ তা‘আলা তাকে জান্নাত দিবেন। (সহীহ বুখারী হা:৩৪৩৫)
سَيِّدٌ এর অর্থ সরদার, নেতা, জননেতা।
حَصُوْرٌ ইবনু আব্বাস (রাঃ)-সহ প্রমুখ মুফাসসিরগণ বলেন: حَصُوْرٌ অর্থ হল ইয়াহইয়া-এর মহিলাদের প্রতি কোন আগ্রহ ছিল না। কেউ বলেন, তার সন্তান জন্ম দেয়ার ক্ষমতা ছিল না। কেউ বলেন, حَصُوْرٌ অর্থ হল পাপ থেকে মুক্ত, যে পাপকাজের ধারে কাছেও যায় না।
তাফসীর মুয়াসসার-এ বলা হয়েছে: “তিনি পাপ কাজ করেন না এবং কোন ক্ষতিকর প্রবৃত্তির কাজেও জড়িত হন না। (তাফসীর মুয়াসসার পৃ. ৫৫)
সঠিক কথা হল: তিনি পাপ কাজ হতে পূত ও পবিত্র, তার দ্বারা কোন অপরাধ সংঘটিত হবে না। আর যারা এ অর্থ নিয়েছেন যে, তার নারীর প্রতি কোন আসক্তি ছিল না, সন্তান জন্ম দেয়ার কোন ক্ষমতা ছিল না ইত্যাদি, তাদের এ তাফসীর সঠিক নয়; কারণ এটি একটি দোষ, যা প্রশংসার সময় বলা যায় না।
(يٰمَرْيَمُ إِنَّ اللّٰهَ اصْطَفٰكِ)
‘হে মারইয়াম! নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাকে মনোনীত করেছেন’ অর্থাৎ আল্লাহ তা‘আলা যে ক’জন নারীকে পৃথিবীর বুকে মর্যাদাপূর্ণ করেছেন ও শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন তাদের মধ্যে মারইয়াম (আঃ) অন্যতম একজন। সহীহ হাদীসে মারইয়ামের সাথে খাদীজা (রাঃ)-কেও শ্রেষ্ঠ নারী বলে উল্লেখ করা হয়েছে। (সিলসিলা সহীহাহ হা: ১৫০৮)
নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন: অনেক পুরুষ পরিপূর্ণতা লাভ করেছে, নারীদের মধ্যে কেবল মারইয়াম, আসিয়া (ফির‘আউনের স্ত্রী) পরিপূর্ণতা লাভ করেছে। আর সকল নারীদের ওপর আয়িশার মর্যাদা তেমন সকল খাবারের ওপর সারীদের মর্যাদা যেমন (সারীদ হল, রুটি, গোশত ও ঝোল মিশিয়ে তৈরি করা এক প্রকার মূল্যবান পুষ্টিকর খাবার)। (ইবনে কাসীর, অত্র আয়াতের তাফসীর)
(وَمَا كُنْتَ لَدَيْهِمْ إِذْ يُلْقُوْنَ أَقْلَامَهُمْ)
‘তুমি তো সে সময় তাদের কাছে ছিলে না যখন মারইয়ামের অভিভাবক কে হবে এজন্য তারা লটারী করেছিল’ অর্থাৎ মারইয়াম (আলাইহাস সালাম)-এর দায়িত্ব কে নেবে এ নিয়ে লটারী করা হয়েছিল। কারণ সবাই তার লালন-পালনের দায়িত্বভার নিতে আগ্রহী ছিল। আল্লাহ তা‘আলার নামে উৎসর্গিত সন্তান পালন করাকে তখনকার সময়ে খুবই পুণ্যের কাজ মনে করা হত। সে কারণে মারইয়ামকে প্রতিপালনের দায়িত্ব নেয়ার জন্য রীতিমত প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে গেল। তাই সকলে জর্ডান নদীতে গিয়ে তাদের কলমগুলো নিক্ষেপ করল। বিধান ছিল যার কলম স্রোতে ভেসে যাবে না, স্থির থাকবে সেই মারইয়ামের দায়িত্বভার গ্রহণ করবে। কলম নদীতে নিক্ষেপ করার পর শুধু যাকারিয়ার কলম স্থির ছিল। তিনি তার দায়িত্ব নেন। তাছাড়া তিনি ছিলেন মারইয়ামের খালু। (তাফসীর তাবারী, হা: ৬৯০৯)
আল্লাহ তা‘আলা আমাদের নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে সম্বোধন করে বলছেন: এসব গায়েবের খবর তোমার কাছে ওয়াহী করে জানিয়ে দিয়েছি। এর মাধ্যমে নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সত্য নবুওয়াতের প্রমাণ মেলে এবং এ কথাও প্রমাণিত হয় যে, নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) গায়েব জানেন না; বরং আল্লাহ তা‘আলা যতটুকু গায়েবের খবর ওয়াহীর মাধ্যমে জানান ততটুকুই জানেন।
(بِكَلِمَةٍ مِّنْهُ)
‘তাঁর পক্ষ থেকে এক কালিমার’ ঈসা (আঃ)-কে কালিমাতুল্লাহ বলা হয়; কারণ আল্লাহ তা‘আলা তাঁকে শুধু “কুন” (হও) কালিমা দ্বারা সৃষ্টি করেন। মানুষ সৃষ্টির সাধারণ নিয়ম বহির্ভূত অর্থাৎ বিনা পিতায়।
ঈসা (আঃ)-কে الْمَسِيْحُ মাসীহ বলা হয়; কারণ ঈসা (আঃ) রোগীদের ওপর হাত দ্বারা মাসাহ বা বুলিয়ে দিলে আল্লাহ তা‘আলার নির্দেশে রোগ ভাল হয়ে যেত। অপরপক্ষে দাজ্জালকেও “মাসীহ” বলা হয়। কারণ তার এক চোখ চেহারার সাথে সমান থাকবে।
(الْحَوَارِيُّوْنَ) حَوَارِيْ
শব্দটি حَوَرٌ ধাতু থেকে উৎপত্তি। অর্থ দেয়ালে চুনকাম করার মত ধবধবে সাদা। পারিভাষিক অর্থে ঈসা (আঃ)-এর খাঁটি অনুসারী শীর্ষস্থানীয় ভক্ত ও সাহায্যকারী ব্যক্তিগণকে ‘হাওয়ারী’ বলা হত। কোন কোন তাফসীরবিদ বলেন, তাদের সংখ্যা ছিল ১২ জন। ঈসা (আঃ)্-এর অনুসারী ও সাহায্যকারী সহচরদেরকে ‘হাওয়ারী’ বলা হয়। নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন: প্রত্যেক নাবীর একজন বিশেষ সাহায্যকারী (হাওয়ারী) ছিল। আমার বিশেষ সাহায্যকারী হল যুবাইর (রাঃ)। (সহীহ বুখারী হা: ২৮৪৭, সহীহ মুসলিম হা: ২৪১৫)
ঘটনার সারসংক্ষেপ:
ঈসা (আঃ)-এর নানী হান্না গর্ভাবস্থায় মানত করেছিলেন যে, আমার গর্ভে যে সন্তান হবে তাকে উপাসনালয়ের জন্য উৎসর্গ করে দেব। তাঁর আশা ছিল নিশ্চয়ই আমার একটি ছেলে হবে। আল্লাহ তা‘আলা তাকে দিলেন একজন কন্যা। তখন তিনি আফসোস করে বললেন, হে আল্লাহ! চাইলাম কী আর হল কী! কেননা কন্যা সন্তান তো উপাসনালয়ে দেয়া যাবে না।
আল্লাহ তা‘আলা সান্ত্বনা দিয়ে বললেন: কন্যা সন্তানের মত কোন পুত্রই যে হয় না। আমি এ কন্যা সন্তানের নাম রাখলাম মারইয়াম।
আল্লাহ তা‘আলা তাকে উত্তমভাবে লালন-পালন করার জন্য তার খালু যাকারিয়া (আঃ)-এর তত্ত্বাবধানে দিলেন। মারইয়াম মিহরাবের নিজ কক্ষে থাকতেন। যাকারিয়া (আঃ) যখনই মারইয়াম (আলাইহাস সালাম)-এর কক্ষে প্রবেশ করতেন তখন তার কাছে বিভিন্ন অমৌসুমী ফল-ফলাদি দেখতে পেতেন।
গ্রীষ্মের ফল শীতকালে আর শীতকালের ফল গ্রীষ্মে। এ ফলমূল দেখে জাকারিয়া (আঃ) আশ্চর্য হয়ে যেতেন; কারণ তিনি নিজে এ ফল এনে দিতেন না এবং অন্য কেউও এনে দিত না।
মারইয়াম (আলাইহাস সালাম) বললেন: এসব ফলাদি আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ থেকে আসে।
মারইয়াম (আলাইহাস সালাম) এর এরূপ অমৌসুমী ফলমূল দেখে যাকারিয়া (আঃ) বুঝতে পারলেন, আল্লাহ তা‘আলা সবকিছুর ওপর ক্ষমতাবান। যাকারিয়া (আঃ) আল্লাহ তা‘আলার কাছে দু‘আ করলেন: “হে আল্লাহ! আমাকে একজন সৎ সন্তান দাও।”
যাকারিয়া (আঃ) এ দু‘আ করার পর যখন সালাতরত অবস্থায় মিহরাবে ছিলেন তখন আল্লাহ তা‘আলা ফেরেশতার মাধ্যমে তাঁকে সন্তান ইয়াহইয়া (আঃ)-এর শুভ সংবাদ দিলেন। যাকারিয়া (আঃ) বললেন: হে আল্লাহ! আমি বৃদ্ধ আর আমার স্ত্রী বন্ধ্যা। কিভাবে আমাদের সন্তান হবে। আল্লাহ তা‘আলা বললেন, তিনি যা ইচ্ছা করেন তাই করতে সক্ষম।
যাকারিয়া (আঃ) বললেন: আমাকে একটি নিদর্শন দিন। আল্লাহ তা‘আলা বললেন: তোমার নিদর্শন হল তিন দিন মানুষের সাথে কথা বলতে পারবে না। তুমি সুস্থ সবল থাকবে বটে কিন্তু মুখ দিয়ে কথা বের হবে না। শুধু ইশারা- ইঙ্গিতে কাজ চালাতে হবে। আল্লাহ তা‘আলা অন্যত্র বলেন:
(قَالَ اٰیَتُکَ اَلَّا تُکَلِّمَ النَّاسَ ثَلٰثَ لَیَالٍ سَوِیًّا)
“তিনি বললেন: ‘তোমার নিদর্শন এই যে, তুমি সুস্থ থাকা সত্ত্বেও কারও সাথে তিন রাত বাক্যালাপ করবে না।’’ (সূরা মারইয়াম ১৯:১০) আর আল্লাহ তা‘আলার তাসবীহ ও যিকির কর।
এরপর আল্লাহ তা‘আলা মারইয়াম (আলাইহাস সালাম)-কে সুসংবাদ দিলেন যে, আল্লাহ তা‘আলা তাকে চয়ণ করেছেন, পবিত্র করেছেন, বিশ্ববাসীর ওপর নির্বাচিত করেছেন, তাই আল্লাহ তা‘আলা তাকে বেশি বেশি রুকু-সিজদাহ করার নির্দেশ দিয়েছেন।
ফেরেশতা মারইয়াম (আলাইহাস সালাম)-কে বললেন, আল্লাহ তা‘আলা তোমাকে ঈসা (আঃ)-এর সুসংবাদ দিচ্ছেন। মারইয়াম (আলাইহাস সালাম)-বললেন, আশ্চর্য! কিভাবে আমার সন্তান হবে? আমাকে কোন পুরুষ স্পর্শ করেনি। ফেরেশতা বলল, এভাবেই হবে, আল্লাহ তা‘আলা যা ইচ্ছা তাই সৃষ্টি করেন। তিনি যা সৃষ্টি করার ইচ্ছা করেন শুধু বলেন, হয়ে যাও, সাথে সাথে তা হয়ে যায়।
এভাবে পিতা ছাড়াই ঈসা (আঃ)-এর জন্ম হয়। ঈসা (আঃ)-কে যখন হত্যা করার ষড়যন্ত্র করল, তখন আল্লাহ তা‘আলা তাকে তুলে নেন। ঈসা (আঃ) এখনো জীবিত অবস্থায় আকাশে আছেন। কিয়ামতের পূর্বে মুহাম্মাদী শরীয়তের শাসক হিসেবে পৃথিবীর বুকে আগমন করবেন এবং বেশ কিছু দিন থাকার পর মৃত্যুবরণ করবেন। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন: সে সত্তার শপথ যার হাতে আমার প্রাণ! অচিরেই তোমাদের মাঝে ন্যায়পরায়ণ শাসকরূপে ঈসা বিন মারইয়াম (আঃ) অবতরণ করবেন। তিনি ক্রুশ চিহ্ন ভেঙ্গে ফেলবেন, শূকর হত্যা করবেন এবং জিযিয়া কর উঠিয়ে দিবেন। মানুষের ধন-সম্পদ তখন এতো বেড়ে যাবে যে, তা গ্রহণ করার মত কেউ থাকবে না। তখন আল্লাহ তা‘আলার জন্য একটি সিজদা দুনিয়া ও তার মাঝে যা কিছু আছে তা থেকে উত্তম। (সহীহ বুখারী হা: ৩৪৪৮, সহীহ মুসলিম হা:১৫৫)
ঈসা (আঃ) যেসব নিদর্শন নিয়ে বানী ইসরাঈলের কাছে আগমন করেছিলেন:
(১) শিশু ও অপরিণত বয়সে মানুষের সাথে কথা বলা। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(فَاَشَارَتْ اِلَیْھِ ﺤ قَالُوْا کَیْفَ نُکَلِّمُ مَنْ کَانَ فِی الْمَھْدِ صَبِیًّاﭬقَالَ اِنِّیْ عَبْدُ اللہِﺨ اٰتٰٿنِیَ الْکِتٰبَ وَجَعَلَنِیْ نَبِیًّاﭭ)
“অতঃপর মারইয়াম সন্তানের প্রতি ইঙ্গিত করল। তারা বলল: ‘যে কোলের শিশু তার সাথে আমরা কেমন করে কথা বলব?’ সে বলল: ‘আমি আল্লাহর বান্দা। তিনি আমাকে কিতাব দিয়েছেন, আমাকে নাবী করেছেন” (সূরা মারইয়াম ১৯:২৯-৩০)
সহীহ হাদীসে এসেছে, তিনটি শিশু মায়ের কোলে থাকাবস্থায় কথা বলেছে: ১. ঈসা (আঃ), ২. বানী ইসরাঈলের জনৈক মহিলার সাথে একজন রাখাল ব্যভিচার করার ফলে সন্তান হয়েছিল কিন্তু মানুষ জুরাইয নামক একজন সৎ ব্যক্তির সাথে সে অপবাদ জড়িয়ে দেয় তখন জুরাইয ওযূ করে নফল সালাত আদায় করার পর মহিলার সন্তানকে তার বাবা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে সে সন্তান কথা বলে। ৩. বানী ইসরাঈলের জনৈক মহিলা তার বাচ্চাকে দুধ পান করাচ্ছিলেন এমন সময় একজন আরোহী পাশ দিয়ে অতিক্রম করলে মহিলা বলল: হে আল্লাহ! আমার সন্তানকে এ পুরুষের মত করিও। তখন সে বাচ্চা বলল, হে আল্লাহ! আমাকে এরূপ বানাইওনা। (সহীহ বুখারী হা: ৩৪৩৬)
এছাড়াও অন্যান্য বর্ণনায় পাওয়া যায় ইউসুফ (আঃ)-এর পক্ষে সাক্ষ্য দিয়েছিল একটি বাচ্চা এবং ফির‘আউনের স্ত্রীর খাদেমার বাচ্চা ছোট থাকতে কথা বলেছিল। (ইবনু কাসীর ৪/৩৯৩, তাবারী ১২/১১৫)
(২) কাদা-মাটি দ্বারা পাখি তৈরি করা: ঈসা (আঃ) মাটি দ্বারা পাখির মত আকৃতি তৈরি করে আল্লাহ তা‘আলার নামে ফুঁক দিতেন; ফলে আল্লাহ তা‘আলার অনুমতিক্রমে তা পাখি হয়ে উড়ে যেত। (সূরা আলি ইমরান ৩:৪৯)
(৩) জন্মান্ধ ও কুষ্ঠব্যাধিগ্রস্তকে নিরাময় করা: জন্মান্ধ ও কুষ্ঠব্যাধিগ্রস্ত ব্যক্তির চোখে ও গায়ে আল্লাহ তা‘আলার নামে হাত বুলিয়ে দিলে আল্লাহ তা‘আলার অনুমতিতে ভাল হয়ে যেত। (সূরা আলি ইমরান ৩:৪৯)
(৪) মৃতকে জীবিতকরণ: আল্লাহ তা‘আলার অনুমতিক্রমে মৃতকে তিনি জীবিত করতে পারতেন। (সূরা আলি ইমরান ৩:৪৯)
(৫) মানুষ যা আহার করে ও যা সঞ্চয় করে রাখে তা বলে দিতেন। (সূরা আলি ইমরান ৩:৪৯)
(৬) পূর্ববর্তী কিতাব তাওরাত সত্যায়নকারী এবং তাদের ওপর যেসব জিনিস হারাম করা হয়েছিল (তাদের শাস্তিস্বরূপ বা নিজেরা ইজতিহাদ করে হারাম করে নিয়েছিল) তা আল্লাহর পক্ষ থেকে হালাল করেছেন। (সূরা আলি ইমরান ৩:৫০)
(فَلَمَّآ أَحَسَّ عِيْسٰي)
যখন ঈসা (আঃ) বনু ইসরাঈলের স্বার্থবাদী নেতাদের বিরোধিতা ও চক্রান্ত বুঝতে পারলেন, তখন নিজের একনিষ্ঠ সাথীদের বাছাই করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করলেন এবং সবাইকে একত্রিত করে জিজ্ঞাসা করলেন, তোমাদের মধ্যে আমার সত্যিকারের ভক্ত ও অনুসারী কারা? কারা আল্লাহ তা‘আলার ওয়াস্তে আমাকে দীনের দাওয়াতী কাজে সাহায্য করবে?
বস্তুতঃ শত্র“দের উৎপীড়নে অতিষ্ঠ হয়ে ঈসা (আঃ) তাঁর অনুসারীগণের প্রতি উপরোক্ত আহ্বান জানাতে বাধ্য হয়েছিলেন। সাথে সাথে বারজন ভক্ত অনুসারী তাঁর ডাকে সাড়া দিয়েছিলেন এবং আনুগত্যের শপথ নিয়েছিলেন। এরপর ঈসা (আঃ)-কে আকাশে তুলে নেয়া হলে তারাই ঈসায়ী ধর্ম প্রচারে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখেন। যদিও পরবর্তীতে তাদের মধ্যে বহু দল-উপদল সৃষ্টি হয়েছে। আজও খ্রিস্টানরা রোমান ক্যাথলিক ও প্রটেষ্ট্যান্ট নামে প্রধান দু’দলে বিভক্ত।
(إِذْ قَالَ اللّٰهُ يٰعِيْسٰٓي إِنِّيْ مُتَوَفِّيْكَ)
‘স্মরণ কর, যখন আল্লাহ বললেন: হে ঈসা! নিশ্চয়ই আমি তোমাকে মৃত্যু দেব’ ঈসা (আঃ)-এর যামানায় শাম (সিরিয়া) অঞ্চল রোমানদের শাসনের অন্তর্ভুক্ত ছিল। এখানে তাদের যে শাসক নির্বাচিত হয়েছিল সে কাফির ছিল। ইমাম ইবনু কাসীর (রহঃ) যে বর্ণনা নিয়ে এসেছেন তাতে বলা হয়েছে, তিনি দামেস্কের বাদশা ছিলেন। সে বাদশা তারকাপূজক ছিল। (ইবনে কাসীর, অত্র আয়াতের তাফসীর)
ইয়াহূদীরা ঈসা (আঃ)-এর বিরুদ্ধে বিভিন্ন বানোয়াট কথাবার্তা বলে এ শাসকের কানভারী করল। যেমন, তিনি বিনা বাপের সন্তান, ফাসাদকারী, জনগণকে বিপথে নিয়ে যাচ্ছে ও জনগণের মধ্যে বিদ্রোহের আগুন প্রজ্জ্বলিত করছে। শাসক তাদের দাবী অনুযায়ী তাকে শূলিতে চড়ানোর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। শাসকের নির্দেশে একটি ইয়াহূদী দল ঈসা (আঃ) যে ঘরে ছিলেন তা ঘেরাও করল। আল্লাহ তা‘আলা তাঁকে তাদের হাত থেকে বাঁচিয়ে নেন এবং তাঁকে ঐ ঘরের ছিদ্র দিয়ে আকাশে তুলে নেন। আর তাঁর সদৃশ একজন লোককে তথায় নিক্ষেপ করে দেন যে সে ঘরেই অবস্থান করছিল। ঐ লোকগুলো রাত্রির অন্ধকারে তাকেই ঈসা (আঃ) মনে করে ধরে নিয়ে যায়। তাকে তারা কঠিন শাস্তি এবং তার মস্তকোপরি কাঁটার টুপি রেখে দিয়ে শূলে চড়িয়ে দেয়। এটাই ছিল তাদের সাথে মহান আল্লাহ তা‘আলার কৌশল। তাই আল্লাহ তা‘আলা বললেন:
(وَمَا قَتَلُوْهُ وَمَا صَلَبُوْهُ وَلٰكِنْ شُبِّهَ لَهُمْ)
“অথচ তারা তাকে হত্যা করেনি, ক্রশবিদ্ধও করেনি; কিন্তু তাদের জন্য (একলোককে) সাদৃশ্য করে দেয়া হয়েছিল।” (সূরা নিসা ৪:১৫৭) সুতরাং ঈসা (আঃ)-কে ক্রশবিদ্ধ করতে পারেনি এবং হত্যাও করতে পারেনি। তিনি এখনো আকাশে জীবিত অবস্থায় রয়েছেন। শেষ যুগে তিনি আগমন করবেন, সকল দীন বাতিল করে ইসলামের প্রচার করবেন। (ইবনু কাসীর, অত্র আয়াতের তাফসীর)
রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন: নাবীগণ পরস্পর সৎ ভাই। তাদের মা ভিন্ন। র্ধম এক ও অভিন্ন। আর আমিই ঈসা বিন মারইয়াম (আঃ)-এর সব চাইতে নিকটবর্তী ব্যক্তি। কারণ, আমি ও তাঁর মাঝে আর কোন নাবী নেই। তিনি নিশ্চয়ই (কিয়ামতের পূর্বে) দুনিয়াতে অবতরণ করবেন। তোমরা যখন তাঁকে দেখবে অতিসত্বর চিনতে পারবে। (মুসনাদ আহমাদ হা: ৯২৭০, সহীহ)
সাহাবী জাবের (রাঃ) হতে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে বলতে শুনেছি:আমার উম্মতের একটি দল সর্বদা সত্য প্রতিষ্ঠার জন্য যুদ্ধ করে যাবে। কিয়ামত পর্যন্ত তারা বিশ্বের বুকে নিজেদের মাথা উঁচু করে সম্মানের সাথে জীবন যাপন করবে। ইতোমধ্যে ঈসা বিন মারইয়াম (আঃ) দুনিয়াতে অবতরণ করবেন। তখন তাদের আমীর ঈসা (আঃ)-কে উদ্দেশ্য করে বলবেন: আসুন, আমাদেরকে সালাত পড়িয়ে দিন। তখন তিনি বলবেন: না, আমি সালাত পড়াব না। তোমরা একে অপরের আমীর। এটি হচ্ছে আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ থেকে এ উম্মতের জন্য এক বিশেষ সম্মান। (সহীহ মুসলিম হা: ১৫৬)
(وَجَاعِلُ الَّذِيْنَ اتَّبَعُوْكَ)
‘তোমার অনুসারীদেরকে কাফিরদের উপরে স্থান দেব’ অর্থাৎ যারা ঈসা (আঃ)-এর খাটি অনুসারী ছিল, তাঁর প্রতি ঈমান এনেছিল তাদেরকে আল্লাহ তা‘আলা কিয়ামত পর্যন্ত কাফিরদের উপরে স্থান দেবেন। নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আগমন করলে তারাই তাঁর প্রতি ঈমান এনেছিল।
অবশেষে আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ঈসা আদম-এর মতই মানুষ। আদম যেমন পিতা-মাতা ছাড়া সৃষ্টি। ঈসা (আঃ)-কেও তেমনি পিতা ছাড়া সৃষ্টি করা হয়েছে। অতএব সন্দেহের কিছু নেই। তাঁকে আল্লাহ তা‘আলার সন্তান বা তিনিই আল্লাহ তা‘আলা বলার কোন যৌক্তিকতা নেই।
আয়াত থেকে শিক্ষণীয় বিষয়:
১. মানত করা শরীয়ত সিদ্ধ; কিন্তু তা হতে হবে একমাত্র আল্লাহ তা‘আলা জন্য।
২. কিছু কিছু বৈশিষ্ট্যে কোন মহিলা কোন পুরুষ অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ হতে পারে।
৩. আল্লাহ তা‘আলার অলীদের কারামত প্রমাণিত হল, যেমন মারইয়াম (আলাইহাস সালাম) এর অমৌসুমী ফল প্রাপ্তি।
৪. কোন কল্যাণকর বস্তু হারিয়ে গেলে বা ছুটে গেলে আফসোস করা জায়েয। তবে ‘যদি এরূপ করতাম তাহলে এরূপ হত’ এ জাতীয় কথা বলা যাবে না বরং বিশ্বাস করতে হবে যে, এটাই তার তাকদীরে ছিল।
৫. আল্লাহ তা‘আলা যাকে ইচ্ছা বৃদ্ধা ও বন্ধ্যা হওয়া সত্ত্বেও সন্তান দিতে পারেন। তাই একমাত্র আল্লাহ তা‘আলার কাছেই সন্তান চাইতে হবে।
৬. ঈসা (আঃ)-এর মু‘জিযাহসমূহ জানতে পারলাম।
৭. যা মানুষের সাধারণ নিয়মের বহির্ভূত তার ব্যাখ্যা চাওয়া জায়েয।
৮. গায়েব একমাত্র আল্লাহ তা‘আলা জানেন। কোন নাবী-রাসূল তা জানেন না; তবে আল্লাহ তা‘আলা তাদেরকে যেটুকু জানিয়েছেন তারা সেটুকু জানতেন।
৯. ঈসা (আঃ) আল্লাহ তা‘আলার একজন নাবী। তিনি আল্লাহ তা‘আলাও নন, আল্লাহ তা‘আলার সন্তানও নন।
১০. প্রত্যেক নাবীর সহচর ছিল। আমাদের নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সহচর হল তাঁর সাহাবীগণ।
১১. ঈসা (আঃ) এখনো আকাশে জীবিত আছেন; তিনি শেষ যামানায় দুনিয়াতে পুনরায় আগমন করবেন।
১২. ঈসা (আঃ)-কে শূলিতে চড়ানো হয়নি এবং হত্যাও করেনি।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: ৩৮-৪১ নং আয়াতের তাফসীর:
হযরত যাকারিয়া (আঃ) দেখেন যে, আল্লাহ তা'আলা হযরত মারইয়াম (আঃ)-কে অসময়ের ফল দান করছেন। শীতকালে গ্রীষ্মকালের ফল এবং গ্রীষ্মকালে শীতকালের ফল তাঁর নিকট বিদ্যমান থাকছে। সুতরাং তিনিও স্বীয় বার্ধক্য ও স্বীয় সহধর্মিণীর বন্ধ্যাত্ব জানা সত্ত্বেও আল্লাহ তা'আলার নিকট অসময়ে ফল অর্থাৎ সুসন্তান লাভের প্রার্থনা জানাতে থাকেন। আর যেহেতু এটা বাহ্যতঃ অসম্ভব জিনিস ছিল, তাই তিনি অতি সন্তর্পণে এ প্রার্থনা জানান। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ ‘নেদায়ান খাফীয়া অর্থাৎ ‘গোপন প্রার্থনা।' তিনি তাঁর ইবাদতখানাতেই ছিলেন, এমন সময় ফেরেশতাগণ তাঁকে ডাক দিয়ে বলেনঃ আপনার একটি পুত্র সন্তান জন্মগ্রহণ করবে যার নাম ইয়াহইয়া রাখতে হবে।' সাথে সাথে তারা একথাও বলে দেনঃ ‘এ সুসংবাদ আমাদের পক্ষ থেকে নয়, বরং স্বয়ং আল্লাহর পক্ষ থেকে। ইয়াহইয়া নাম রাখার কারণ এই যে, তাঁর জীবন হবে ঈমানের সাথে। তিনি আল্লাহর কালেমা অর্থাৎ হযরত ঈসা ইবনে মারইয়াম (আঃ)-এর সত্যতা প্রকাশ করবেন। হযরত রাবী' ইবনে আনাস (রাঃ) বলেনঃ “হযরত ঈসা (আঃ)-এর নবুওয়াতের প্রথম স্বীকারকারীও হচ্ছেন হযরত ইয়াহইয়া (আঃ)'। হযরত কাতাদা (রঃ)-এর উক্তি এই যে, হযরত ইয়াহইয়া (আঃ) ঠিক হযরত ঈসা (আঃ)-এর পথের উপর ছিলেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এ দু’জন পরস্পর খালাতো ভাই ছিলেন। হযরত ইয়াহইয়া (আঃ)-এর মা প্রায়ই হযরত মারইয়াম (আঃ)-কে বলতেনঃ ‘আমি আমার গর্ভের জিনিসকে দেখতে পাচ্ছি যে, সে তোমার গর্ভের জিনিসকে সিজদা করছে। এটা ছিল হযরত ইয়াহইয়া (আঃ)-এর সত্যতা প্রকাশ তার দুনিয়ায় আগমনের পূর্বেই। সর্বপ্রথম তিনিই হযরত ঈসা (আঃ) -এর সত্যতা অবগত হয়েছিলেন। তিনি বয়সে হযরত ঈসা (আঃ) অপেক্ষা বড় ছিলেন। (আরবী) শব্দের অর্থ হচ্ছে ধৈর্যশীল, বিদ্যা ও ইবাদতে অগ্রবর্তী, মুত্তাকী, ধর্ম শাস্ত্রবিদ, চরিত্রে ও ধর্মে সর্বাপেক্ষা উত্তম, ক্রোধকে দমনকারী এবং ভদ্র। (আরবী) শব্দের অর্থ হচ্ছে যে স্ত্রীলোকদের নিকট আসতে পারে না, যার সন্তানাদি হয় না এবং যার মধ্যে কোন কামভাব থাকে না। এ অর্থের একটি মারফু হাদীসও মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিমের মধ্যে রয়েছে। তা এই যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) এ শব্দটি পাঠ করতঃ ভূমি হতে কিছু উঠিয়ে নিয়ে বলেন, তাঁর অঙ্গ ছিল এরূপ। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনে আস (রাঃ) বলেন, সমস্ত সৃষ্টজীবের মধ্যে শুধুমাত্র ইয়াহইয়া (আঃ) আল্লাহ তাআলার সাথে নিস্পাপরূপে সাক্ষাত করবেন। অতঃপর তিনি মাটি হতে কিছু উঠিয়ে নিয়ে বলেন, যার অঙ্গ এরূপ হয় তাকে (আরবী) বলে।' হযরত ইয়াহইয়া ইবনে সাঈদ আল কাত্তান (রঃ) অঙ্গুলি দ্বারা ইঙ্গিত করেন। উপরে বর্ণিত মারফু বর্ণনা অপেক্ষা এ মাওকুফ বর্ণনাটি সনদ হিসেবে অধিকতর সঠিক। মার' বর্ণনায় রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) কাপড়ের ঝালরের দিকে ইঙ্গিত করে বলেন, এরূপ ছিল। অন্য বর্ণনায় রয়েছে যে, তিনি মাটি হতে একটা খড়কুটা উঠিয়ে নিয়ে ওর দিকে ইঙ্গিত দিয়ে বলেন, তার অঙ্গ ছিল এই খড়কুটার মত।
এরপর হযরত যাকারিয়া (আঃ)-কে দ্বিতীয় শুভ সংবাদ দেয়া হচ্ছে যে, তাঁর পুত্র নবী হবেন। এ সুসংবাদ পূর্বের সুসংবাদ হতেও অগ্রগণ্য। এ সুসংবাদ প্রাপ্তির পর হযরত যাকারিয়া (আঃ)-এর ধারণা হয় যে, এর বাহ্যিক কারণগুলো তো অসম্ভব, তাই তিনি আল্লাহ তাআলার নিকট আরয করেন, “হে আমার প্রভু! আমি তো বার্ধক্যে পদার্পণ করেছি এবং আমার স্ত্রী বন্ধ্যা, কাজেই আমার সন্তান লাভ কিরূপে সম্ভব? ফেরেশতাগণ তৎক্ষণাৎ উত্তর দেন, আল্লাহর নির্দেশই সব চেয়ে বড়। তাঁর নিকট কোনকিছু অসম্ভবও নয় এবং কঠিনও নয়। তিনি কোন কাজে অসমর্থ নন। তিনি যেভাবেই ইচ্ছে করেন সৃষ্টি করে থাকেন। তখন হযরত যাকারিয়া (আঃ) আল্লাহ তা'আলার নিদর্শন যাজ্ঞা করলে মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে বলা হয়ঃ নিদর্শন এই যে, তুমি তিন দিন পর্যন্ত লোকের সাথে কথা বলতে পারবে না। তুমি সুস্থ সবল থাকবে বটে কিন্তু মুখ দিয়ে কথা বের হবে না। শুধুমাত্র ইশারা-ইঙ্গিতে কাজ চালাতে হবে। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছে (আরবী) অর্থাৎ ‘সুস্থতার সাথে তিন রাত'। (১৯:১০) এরপর বলা হচ্ছে- এ অবস্থায় খুব বেশী আল্লাহ তা'আলার যিক্রি করা এবং তার শ্রেষ্ঠত্ব ও পবিত্রতা বর্ণনা করা তোমার উচিত। সকাল-সন্ধ্যায় ঐ কাজেই লেগে থাকবে। এর দ্বিতীয় অংশ এবং পূর্ণ বর্ণনা সূরা-ই-মারইয়ামের মধ্যে বিস্তারিতভাবে আসবে ইনশাআল্লাহ।
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।