আল কুরআন


সূরা আলে-ইমরান (আয়াত: 20)

সূরা আলে-ইমরান (আয়াত: 20)



হরকত ছাড়া:

فإن حاجوك فقل أسلمت وجهي لله ومن اتبعن وقل للذين أوتوا الكتاب والأميين أأسلمتم فإن أسلموا فقد اهتدوا وإن تولوا فإنما عليك البلاغ والله بصير بالعباد ﴿٢٠﴾




হরকত সহ:

فَاِنْ حَآجُّوْکَ فَقُلْ اَسْلَمْتُ وَجْهِیَ لِلّٰهِ وَ مَنِ اتَّبَعَنِ ؕ وَ قُلْ لِّلَّذِیْنَ اُوْتُوا الْکِتٰبَ وَ الْاُمِّیّٖنَ ءَاَسْلَمْتُمْ ؕ فَاِنْ اَسْلَمُوْا فَقَدِ اهْتَدَوْا ۚ وَ اِنْ تَوَلَّوْا فَاِنَّمَا عَلَیْکَ الْبَلٰغُ ؕ وَ اللّٰهُ بَصِیْرٌۢ بِالْعِبَادِ ﴿۲۰﴾




উচ্চারণ: ফাইন হাজ্জূকা ফাকুলআছলামতু ওয়াজহিইয়া লিল্লা-হি ওয়ামানিত তাবা‘আনি ওয়াকুল লিল্লাযীনা ঊতুল কিতা-বা ওয়াল উম্মিইয়ীনা আআছলামতুম ফাইন আছলামূ ফাকাদিহতাদাওঁ ওয়া ইন তাওয়াল্লাও ফাইন্নামা-‘আলাইকাল বালা-গু ওয়াল্লা-হু বাসীরুম বিল‘ইবা-দ।




আল বায়ান: যদি তারা তোমার সাথে বিতর্ক করে, তবে তুমি বল, ‘আমি আল্লাহর নিকট আত্মসমর্পণ করলাম এবং আমার অনুসারীরাও’। আর যাদেরকে কিতাব দেয়া হয়েছে তাদেরকে এবং নিরক্ষরদেরকে বল, ‘তোমরা কি ইসলাম গ্রহণ করেছ’? তখন যদি তারা ইসলাম গ্রহণ করে, তাহলে তারা অবশ্যই হিদায়াতপ্রাপ্ত হবে। আর যদি ফিরে যায়, তাহলে তোমার দায়িত্ব শুধু পৌঁছিয়ে দেয়া। আর আল্লাহ বান্দাদের সম্পর্কে সম্যক দ্রষ্টা।




আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ২০. সুতরাং যদি তারা আপনার সাথে বিতর্কে লিপ্ত হয় তবে আপনি বলুন, আমি আল্লাহ্‌র নিকট আত্মসমর্পণ করছি এবং আমার অনুসারিগণও। আর যাদেরকে কিতাব দেয়া হয়েছে তাদেরকে ও নিরক্ষরদেরকে বলেন, তোমরাও কি আত্মসমর্পণ করেছ? যদি তারা আত্মসমর্পণ করে তবে নিশ্চয় তারা হেদায়াত পাবে। আর যদি তারা মুখ ফিরিয়ে তবে আপনার কর্তব্য শুধু প্রচার করা। আর আল্লাহ্‌ বান্দাদের সম্পর্কে সম্যক দ্রষ্টা।(১)




তাইসীরুল ক্বুরআন: অতঃপর যদি (আহলে কিতাব) তোমার সাথে তর্ক করে তবে বলে দাও, ‘আমি আল্লাহর নিকট আত্মসমর্পণ করেছি আর আমার অনুসারীগণও আত্মসমর্পণ করেছে এবং আহলে কিতাব ও উম্মীগণকে বল, ‘তোমরা কি আত্মসমর্পণ করেছ’? অতঃপর যদি তারা আত্মসমর্পণ করে তবে নিশ্চয়ই তারা পথ পাবে আর তারা যদি মুখ ফিরিয়ে নেয়, তবে তোমার দায়িত্ব শুধু প্রচার করা। আল্লাহ বান্দাদের সম্পর্কে সম্যক দ্রষ্টা।




আহসানুল বায়ান: (২০) অতঃপর যদি তারা তোমার সাথে বিতর্কে লিপ্ত হয়, তাহলে তুমি বল, ‘আমি ও আমার অনুসারিগণ আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণ করেছি।’ আর যাদেরকে কিতাব দেওয়া হয়েছে, তাদেরকে ও নিরক্ষরদেরকে[1] বল, ‘তোমরা কি আত্মসমর্পণ করেছ?’ সুতরাং যদি তারা আত্মসমর্পণ করে, তাহলে নিশ্চয় তারা সুপথ পাবে। আর যদি তারা মুখ ফিরিয়ে নেয়, তাহলে তোমার কর্তব্য কেবল প্রচার করা। বস্তুতঃ আল্লাহ তার দাসদের সম্বন্ধে সম্যক অবহিত।



মুজিবুর রহমান: অতঃপর যদি তারা তোমার সাথে কলহ করে তাহলে তুমি বলঃ আমি ও আমার অনুসারীগণ আল্লাহর উদ্দেশ্যে আত্মসমর্পণ করেছি এবং যাদেরকে গ্রন্থ প্রদত্ত হয়েছে ও যারা নিরক্ষর তাদেরকে বলঃ তোমরাও কি আত্মসমর্পণ করেছ? অতঃপর যদি তারা ‌আত্মসমর্পণ করে তাহলে নিশ্চয়ই তারা সুপথ পেয়ে যাবে, আর যদি ফিরে যায় তাহলে তোমার উপর দায়িত্ব হচ্ছে প্রচার করা মাত্র এবং আল্লাহ বান্দাদের প্রতি লক্ষ্যকারী।



ফযলুর রহমান: যদি তারা তোমার সাথে বিতর্ক করে তাহলে তুমি বলবে, “আমি আল্লাহর কাছে নিজেকে সমর্পণ করেছি, আমার অনুসারীরাও (তাই করেছে)।” কিতাবধারী ও অশিক্ষিতদেরকে (মক্কার মুশরিকদেরকে) বল, “তোমরা কি আত্মসমর্পণ করেছো?” যদি তারাও আত্মসমর্পণ করে তাহলে তারা হেদায়েত পাবে; আর যদি অস্বীকৃতি জানায় তাহলে (মনে রাখবে,) তোমার দায়িত্ব কেবল বার্তা পৌঁছে দেওয়া। আল্লাহ বান্দাদের সবকিছু দেখেন।



মুহিউদ্দিন খান: যদি তারা তোমার সাথে বিতর্কে অবতীর্ণ হয় তবে বলে দাও, "আমি এবং আমার অনুসরণকারীগণ আল্লাহর প্রতি আত্নসমর্পণ করেছি।" আর আহলে কিতাবদের এবং নিরক্ষরদের বলে দাও যে, তোমরাও কি আত্নসমর্পণ করেছ? তখন যদি তারা আত্নসমর্পণ করে, তবে সরল পথ প্রাপ্ত হলো, আর যদি মুখ ঘুরিয়ে নেয়, তাহলে তোমার দায়িত্ব হলো শুধু পৌছে দেয়া। আর আল্লাহর দৃষ্টিতে রয়েছে সকল বান্দা।



জহুরুল হক: কিন্তু যদি তারা তোমার সাথে হুজ্জত করে, তবে বলো -- "আমি সম্পূর্ণরূপে আল্লাহ্‌র দিকে আমার মুখ রুজু করেছি, আর যারা আমায় অনুসরণ করে।" আর তাদের বলো যাদের কিতাব দেয়া হয়েছে আর নিরক্ষরদের, "তোমরা কি আ‌ত্মসমর্পণ করেছ?" অতএব যদি তারা আ‌ত্মসমর্পণ করে তবে অবশ্যই তারা হেদায়তপ্রাপ্ত হবে, আর যদি তারা ফিরে যায় তবে নিঃসন্দেহ তোমার উপরে হচ্ছে পৌঁছে দেয়া। আর আল্লাহ্ বান্দাদের দর্শক।



Sahih International: So if they argue with you, say, "I have submitted myself to Allah [in Islam], and [so have] those who follow me." And say to those who were given the Scripture and [to] the unlearned, "Have you submitted yourselves?" And if they submit [in Islam], they are rightly guided; but if they turn away - then upon you is only the [duty of] notification. And Allah is Seeing of [His] servants.



তাফসীরে যাকারিয়া

অনুবাদ: ২০. সুতরাং যদি তারা আপনার সাথে বিতর্কে লিপ্ত হয় তবে আপনি বলুন, আমি আল্লাহ্–র নিকট আত্মসমর্পণ করছি এবং আমার অনুসারিগণও। আর যাদেরকে কিতাব দেয়া হয়েছে তাদেরকে ও নিরক্ষরদেরকে বলেন, তোমরাও কি আত্মসমর্পণ করেছ? যদি তারা আত্মসমর্পণ করে তবে নিশ্চয় তারা হেদায়াত পাবে। আর যদি তারা মুখ ফিরিয়ে তবে আপনার কর্তব্য শুধু প্রচার করা। আর আল্লাহ্– বান্দাদের সম্পর্কে সম্যক দ্রষ্টা।(১)


তাফসীর:

(১) আয়াতে বর্ণিত أَسْلَمْتُمْ শব্দটির মূল অর্থের প্রতি লক্ষ্য রেখে ‘আত্মসমর্পণ করা’ অনুবাদ করা হয়েছে। এর আরেক অনুবাদ এভাবেও করা যায় যে, যদি তারা আপনার সাথে বিতর্কে লিপ্ত হয় তবে আপনি বলুন, আমি ইসলামকে কবুল করেছি এবং আমার অনুসারিগণও। এর মাধ্যমে অপরাপর ধর্মের অনুসারীরা মুসলিমদের ব্যাপারে হতাশ হয়ে যাবে যে, তাদেরকে আবার বিভ্রান্ত করার সুযোগ নেই। [সা’দী] আর যাদেরকে কিতাব দেয়া হয়েছে অর্থাৎ ইয়াহুদী ও নাসারাদেরকে ও নিরক্ষর অর্থাৎ মক্কার কুরাইশ ও তাদের অনুসারীদেরকে বলুন, ‘তোমরাও কি ইসলামকে গ্রহণ করে নিয়েছ? যদি তারা তোমরা যেভাবে ইসলাম গ্রহণ করে নিয়েছ সেভাবে ইসলামকে কবুল করে তবে নিশ্চয় তারা হেদায়াত পাবে এবং তারা তোমাদের ভাই-বন্ধুতে পরিণত হবে। আর যদি তারা ইসলাম থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয় এবং তাদের পূর্ববর্তী ধর্ম নিয়েই সন্তুষ্ট থাকে, তবে আপনার কর্তব্য শুধু প্রচার করা। প্রচারের সওয়াব আপনি অবশ্যই পাবেন। তাদের উপরও আল্লাহর পক্ষ থেকে যাতে করে তাদের শাস্তি প্রদান করা সম্ভব হয়। [সা'দী]


তাফসীরে আহসানুল বায়ান

অনুবাদ: (২০) অতঃপর যদি তারা তোমার সাথে বিতর্কে লিপ্ত হয়, তাহলে তুমি বল, ‘আমি ও আমার অনুসারিগণ আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণ করেছি।’ আর যাদেরকে কিতাব দেওয়া হয়েছে, তাদেরকে ও নিরক্ষরদেরকে[1] বল, ‘তোমরা কি আত্মসমর্পণ করেছ?’ সুতরাং যদি তারা আত্মসমর্পণ করে, তাহলে নিশ্চয় তারা সুপথ পাবে। আর যদি তারা মুখ ফিরিয়ে নেয়, তাহলে তোমার কর্তব্য কেবল প্রচার করা। বস্তুতঃ আল্লাহ তার দাসদের সম্বন্ধে সম্যক অবহিত।


তাফসীর:

 [1] ‘নিরক্ষর’ বলতে আরবের মুশরিকদের বুঝানো হয়েছে। তারা আহলে কিতাবদের তুলনায় সাধারণভাবে নিরক্ষর ছিল।


তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ


তাফসীর: ১৮-২০ নং আয়াতের তাফসীর:



এ আয়াতদ্বয়ে আল্লাহ তা‘আলা নিজেই নিজের এককত্বের সাক্ষ্য দিচ্ছেন যে, তিনি ছাড়া আর কোন সত্য মা‘বূদ নেই। তিনিই সাক্ষী হিসেবে যথেষ্ট। তিনি সাক্ষ্য দানকারীদের মধ্যে অধিক সত্যবাদী ও ন্যায়পরায়ণ। অতঃপর তিনি নিজের সাক্ষ্যের সাথে ফেরেশতাদের সাক্ষ্যকে সম্পৃক্ত করেছেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(لٰکِنِ اللہُ یَشْھَدُ بِمَآ اَنْزَلَ اِلَیْکَ اَنْزَلَھ۫ بِعِلْمِھ۪ﺆ وَالْمَلٰ۬ئِکَةُ یَشْھَدُوْنَﺚ وَکَفٰی بِاللہِ شَھِیْدًا) ‏



“কিন্তু আল্লাহ তোমার প্রতি যা অবতীর্ণ করেছেন এর মাধ্যমে সাক্ষ্য দেন। তিনি তা নিজ জ্ঞানে নাযিল করেছেন নিজ জ্ঞানে এবং ফেরেশতাগণও সাক্ষ্য দিয়ে থাকে। আর সাক্ষী হিসেবে আল্লাহই যথেষ্ট।” (সূরা নিসা ৪:১৬৬)



অত্র আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা তাঁর এককত্বের ব্যাপারে নিজের সাক্ষ্যের সাথে শুধু ফেরেশতাদের সাক্ষ্য সম্পৃক্ত করেননি; বরং আলিম সমাজকেও স্বীয় সাক্ষ্যের সাথে সম্পৃক্ত করে মর্যাদাশীল করেছেন। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন: আলিমরা নাবীদের ওয়ারিশ। আমি তাদেরকে টাকা-পয়সার ওয়ারিশ বানিয়ে যাননি। তাদেরকে কেবল ইলম বা জ্ঞানের ওয়ারিশ বানিয়েছি। (তিরমিযী হা: ২৬৮২ আবূ দাঊদ হা: ৩৬৪১, সহীহ)



অতএব এ আয়াত ও হাদীস প্রমাণ করে যে, সেসব আলিমই সম্মানিত ও মর্যাদাশীল যারা তাওহীদের সাক্ষ্যে দৃঢ় থাকেন। আর যাদের তাওহীদের বিষয়ে পদস্খলন ঘটেছে, শির্কে লিপ্ত হয়েছে আকীদাহ-বিশ্বাস অথবা ইবাদত-বন্দেগীতে, তারা যতই জ্ঞানের সাগর হোক না কেন, তারা কখনও সম্মানিত নয়, তারা লাঞ্চিত ধিকৃত।



আল্লাহ তা‘আলা তাঁর এককত্বের সাক্ষ্য দেয়ার পর দীন ইসলামের কথা বলছেন। দীন-ইসলাম ছাড়া অন্য কোন দীন তিনি গ্রহণ করবেন না। জীবনের সর্বক্ষেত্রে সকলে এ দীনকে গ্রহণ করে নিতে বাধ্য। অন্যত্র আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(وَمَنْ يَّبْتَغِ غَيْرَ الْإِسْلَامِ دِيْنًا فَلَنْ يُّقْبَلَ مِنْهُ ج وَهُوَ فِي الْاٰخِرَةِ مِنَ الْخٰسِرِيْنَ)



“আর যে কেউ ইসলাম ব্যতীত অন্য কোন জীবন ব্যবস্থা তালাশ করবে তার কাছ থেকে কখনই তা কবূল করা হবে না এবং সে আখিরাতে ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে।” (সূরা আলি-ইমরান ৩:৮৫)



সকল নাবী-রাসূল এ দীন নিয়ে দুনিয়ায় আগমন করেছেন। সর্বশেষ আগমন করেছেন আমাদের রাসূল মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)। তিনি এ দীন-ইসলাম সারা জাহানের জন্য প্রেরিত হয়েছেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(قُلْ يٰٓأَيُّهَا النَّاسُ إِنِّيْ رَسُوْلُ اللّٰهِ إِلَيْكُمْ جَمِيْعَا)



“বল ‘হে মানুষ সকল! আমি তোমাদের সকলের জন্য আল্লাহ্র প্রেরিত রাসূল।” (সূরা আ‘রাফ ৭:১৫৮)



রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন: সেই সত্ত্বার শপথ যাঁর হাতে আমার প্রাণ! এ উম্মাতের মধ্যে ইয়াহূদী হোক বা খ্রিস্টান হোক যারাই আমার নবুওয়াতের কথা শুনেছে আর আমি যা নিয়ে প্রেরিত হয়েছি তার প্রতি ঈমান না এনে মারা যাবে সে অবশ্যই জাহান্নামী হবে। (সহীহ মুসলিম হা: ১৩৪, ২৪০)



তারপর আল্লাহ তা‘আলা আহলে কিতাব তথা ইয়াহূদী ও খ্রিস্টানদের অবাধ্যতা ও হিংসার কথা বলেছেন, তাদের নিকট কিতাব ও রাসূলগণ আসার পরেও তারা মতভেদ করেছে একমাত্র তাদের হিংসার কারণে। তারা জানত মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সত্য নাবী এবং তিনি যা নিয়ে এসেছেন তাও সত্য; কিন্তু তারা জেনেশুনে অহংকারবশতঃ সে সত্য প্রত্যাখ্যান করেছে। যারা সত্য গ্রহণে অহংকারী হয়ে থাকে তারা কোন দিন সঠিক পথ পায় না।



الأُمِّيِّيْنَ



‘নিরক্ষর’ বলতে আরবের মুশরিকদেরকে বুঝানো হয়েছে।



অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে আল্লাহ তা‘আলা বলছেন- এরপরেও যদি তারা বাদানুবাদ করে তা হলে বলে দাও, আমি ও আমার অনুসারীগণ আল্লাহ তা‘আলার কাছে আত্মসমর্পণ করেছি। তাদেরকে আরো বলে দাও, তারা যদি আত্মসমর্পণ করে তা হলে তারা হিদায়াতপ্রাপ্ত হবে। অন্যথায় তুমি দৃষ্টি ফিরিয়ে নাও। অর্থাৎ রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ও তাঁর অনুসারীদের কাজ হল দাওয়াত প্রদান, মানা আর না মানার দায়িত্ব তাদের।



আয়াত থেকে শিক্ষণীয় বিষয়:



১. আহলে কিতাবগণ সঠিক তথ্য প্রমাণের ভিত্তিতে কোন কথা বললে তা গ্রহণযোগ্য হতে পারে; অন্যথায় নয়।

২. আল্লাহ তা‘আলার তাওহীদ প্রমাণের জন্য তাঁর কথাই যথেষ্ট।

৩. যারা কুরআন ও সহীহ হাদীসের কোন বিধানকে বিভিন্ন যুক্তি দিয়ে ত্যাগ করে তারা তা প্রত্যাখ্যানকারীদের অন্তর্ভুক্ত।

৪. ইসলাম ব্যতীত সকল দীন বাতিল।

৫. সত্যের পথে দাওয়াত দেয়া রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর প্রত্যেক অনুসারীর ওপর আবশ্যক।

৬. হিংসা মানুষের সঠিক পথ গ্রহণে অন্যতম অন্তরায়।


তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)


তাফসীর: ১৮-২০ নং আয়াতের তাফসীর:

আল্লাহ তা'আলা স্বয়ং সাক্ষ্য দিচ্ছেন, সুতরাং তাঁর সাক্ষ্যই যথেষ্ট। তিনি সর্বাপেক্ষা সত্যবাদী সাক্ষী এবং তারই কথা সবচেয়ে সত্য। তিনি বলেন যে, সমস্ত সৃষ্টজীব তার দাস এবং একমাত্র তাঁরই সৃষ্ট। সবাই তারই মুখাপেক্ষী এবং তিনি কারও মুখাপেক্ষী নন। মা’রূদ ও আল্লাহ হওয়ার ব্যাপারে তিনি। একাই, তার কোন অংশীদার নেই। তিনি ছাড়া আর কেউ ইবাদতের যোগ্য নয়। যেমনঃ কুরআন কারীমে ঘোষিত হচ্ছে কিন্তু আল্লাহ সজ্ঞানে তোমার প্রতি অবতীর্ণকৃত কিতাবের মাধ্যমে সাক্ষ্য প্রদান করছেন এবং ফেরেশতারাও সাক্ষ্য দিচ্ছে, আর আল্লাহর সাক্ষ্যই যথেষ্ট।' অতঃপর আল্লাহ পাক স্বীয় সাক্ষ্যের সাথে ফেরেশতাদের ও আলেমদের সাক্ষ্যকেও মিলিয়ে নিচ্ছেন। এখান হতে আলেমদের বড় মর্যাদা সাব্যস্ত হচ্ছে। (আরবী) শব্দটি এখানে (আরবী) হয়েছে বলে তার উপর (আরবী) দেয়া হয়েছে। অর্থাৎ সদা ও সর্বাবস্থায় এ রকমই। অতঃপর আরও বেশী গুরুত্ব দেয়ার জন্যে দ্বিতীয়বার ইরশাদ হচ্ছে যে, প্রকৃত মা'বুদ একমাত্র তিনিই। তিনি প্রবল পরাক্রান্ত এবং কথা ও কাজে বিজ্ঞানময়।

মুসনাদ-ই-আহমাদে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) আরাফায় এ আয়াতটি পাঠ করেন এবং (আরবী) পর্যন্ত পড়ে বলেন (আরবী) অর্থাৎ হে আমার প্রভু! আমিও ওর উপর সাক্ষীগণের মধ্যে একজন। মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিমের মধ্যে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) নিম্নরূপ পাঠ করেনঃ (আরবী) অর্থাৎ হে আমার প্রভু! আমিও সাক্ষ্য দিচ্ছি। তাবরানীর হাদীসে রয়েছে, হযরত গালিব কাৰ্তান (রঃ) বলেন, 'আমি ব্যবসা উপলক্ষে কুফায় গমন করতঃ হযরত আমাশ (রঃ)-এর নিকট অবস্থান করি। রাত্রে হযরত আমাশ (রঃ) তাহাজ্জুদ নামাযে দাঁড়িয়ে যান। পড়তে পড়তে যখন তিনি এ আয়াত পর্যন্ত পৌঁছেন এবং (আরবী) পাঠ করেন তখন বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমিও ওর সাক্ষ্য দিচ্ছি যার সাক্ষ্য স্বয়ং আল্লাহ দিয়েছেন এবং এ সাক্ষ্য আমি আল্লাহর নিকট সমর্পণ করছি। আল্লাহ তা'আলার নিকট এটা আমার আমানত।” অতঃপর তিনি কয়েকবার। (আরবী) পাঠ করেন। আমি মনে মনে ধারণা করি যে, সম্ভবতঃ এ সম্বন্ধে কোন হাদীস রয়েছে। অতি প্রত্যুষেই আমি তাঁর খিদমতে উপস্থিত হয়ে আরয করিঃ হে আবু মুহাম্মদ! আপনার বার বার এ আয়াতটি পড়ার কারণ কি? তিনি উত্তরে বলেনঃ “আপনার কি এ আয়াতের ফযীলত জানা নেই?” আমি বলিঃ জনাব আমি তো এক মাস ধরে আপনার এখানে অবস্থান করছি, কিন্তু আপনি তো কোন হাদীসই বর্ণনা করেননি। তিনি বলেনঃ “আল্লাহর শপথ! আমি তো এক বছর পর্যন্ত বর্ণনা করবো না।” তখন আমি এ হাদীসটি শুনবার জন্যে এক বছর কাল তথায় অবস্থান করি এবং তার দরজায় পড়ে থাকি। এক বছর পূর্ণ হলে আমি তাকে বলি, হে আবু মুহাম্মদ (রঃ)! এক বছর তো পূর্ণ হয়ে গেছে। তখন তিনি বলেনঃ “আচ্ছা শুনুন! আবূ অয়েল (রঃ) আমার নিকট হাদীসটি বর্ণনা করেছেন, তিনি হযরত আবদুল্লাহ (রঃ)-এর নিকট শুনেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ‘এর পাঠককে কিয়ামতের দিন আনয়ন করা হবে এবং মহা সম্মানিত আল্লাহ বলবেন ‘এ বান্দা আমার নিকট অঙ্গীকার নিয়েছে এবং আমি সবচেয়ে উত্তম অঙ্গীকার পূর্ণকারী, আমার এ বান্দাকে বেহেশতে নিয়ে যাও”।

অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেন-“তিনি শুধুমাত্র ইসলামকেই গ্রহণ করে থাকেন। সর্বযুগীয় নবীদের (আঃ) অহীর অনুসরণ করার নাম ইসলাম। সর্বশেষ এবং সমস্ত নবী (আঃ)-এর সমাপ্তকারী হচ্ছেন আমাদের নবী হযরত মুহাম্মদ মুস্তফা (সঃ)। তাঁর নবুওয়াতের পর সমস্ত পথ বন্ধ হয়ে গেছে। এখন যে কেউ তাঁর শরীয়ত ছাড়া অন্য কিছুর উপর আমল করবে সে মহান আল্লাহর নিকট ধার্মিক বলে গণ্য হবে না। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “যে ব্যক্তি ইসলাম ব্যতীত অন্য ধর্ম অনুসন্ধান করবে তা কখনও গ্রহণীয় হবে না।'(৩:৮৫) অনুরূপভাবে উপরোক্ত আয়াতেও ধর্মকে ইসলামের উপর সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর পঠনে (আরবী) রয়েছে। তাহলে অর্থ দাঁড়াবেঃ ‘আল্লাহ সাক্ষ্য দেন ও তার ফেরেশ্তামন্ডলী এবং জ্ঞানবান লোকেরাও সাক্ষ্য দেয় যে, আল্লাহর নিকট গ্রহণযোগ্য ধর্ম শুধুমাত্র ইসলাম। জমহুরের পঠনে ‘ইন্না রয়েছে এবং অর্থ হিসেবে দু'টোই ঠিক আছে। কিন্তু জমহুরের উক্তিটিই বেশী স্পষ্ট।

এরপর ইরশাদ হচ্ছে- ‘পূর্ববর্তী কিতাবধারীরা মহান আল্লাহর নবীদের (আঃ) আগমনের পর ও তাঁর কিতাবসমূহ অবতীর্ণ হওয়ার পর মতভেদ করেছিল এবং এরই কারণে তাদের পরস্পরের মধ্যে হিংসা-বিদ্বেষ ও শত্রুতা ছিল। একজন এক কথা বললে তা সত্য হলেও অন্যজন তার বিরোধিতা করতো। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেন-“আল্লাহর নিদর্শনাবলী অবতীর্ণ হওয়ার পরেও যারা ঐগুলো মিথ্যা প্রতিপন্ন করতঃ অমান্য করে, আল্লাহ তা'আলা সত্বরই তাদের হিসেব গ্রহণ করবেন এবং তাঁর কিতাবের বিরুদ্ধাচরণ করার কারণে তাদেরকে কঠিন শাস্তি প্রদান করবেন।

তারপর আল্লাহ তা'আলা বলেন-হে নবী (সঃ)! তারা যদি তোমার সাথে আল্লাহর একত্বের ব্যাপারে বিতর্কে লিপ্ত হয় তবে তাদেরকে বলে দাও-“আমি তো নির্ভেজালভাবে সেই আল্লাহরই ইবাদত করবো যার কোন অংশীদার নেই, যিনি অতুলনীয়, যার না আছে কোন সন্তান এবং না রয়েছে কোন পত্নী। আর যারা আমার অনুসারী, যারা আমার ধর্মের উপর রয়েছে তাদেরও এই একই কথা।' যেমন অন্য স্থানে রয়েছে- (আরবী) অর্থাৎ তুমি বল- এটাই আমার পথ। আমি খুব চিন্তা-গবেষণা করেই তোমাদেরকে আল্লাহর দিকে আহ্বান করছি, আমিও এবং আমার অনুসারীগণও।' (১২:১০৮)

অতঃপর নির্দেশ হচ্ছে- হে নবী (সঃ)! কিতাবধারী ইয়াহুদী ও খ্রীষ্টানদেরকে এবং নিরক্ষর মুশরিকদেরকে বলে দাও-তোমাদের সবারই সুপথ প্রাপ্তি ইসলামের মধ্যেই রয়েছে। যদি তারা অমান্য করে তবে কোন কথা নেই। তোমার কর্তব্য শুধু প্রচার করা এবং তুমি তোমার এই কর্তব্য পালন করেছে। আল্লাহ তাদেরকে দেখে নেবেন। তাদের সবারই প্রত্যাবর্তন তার কাছেই। তিনি যাকে চান সুপথ প্রদর্শন করেন এবং যাকে চান পথভ্রষ্ট করেন। স্বীয় নৈপুণ্য তাঁরই ভাল জানা আছে। তিনি স্বীয় বান্দাদেরকে দেখতে রয়েছেন। কে সুপথ প্রাপ্তির যোগ্য এবং কে ভ্রান্তপথের পথিক তা তিনিই ভাল জানেন। তাঁর কার্যের হিসাব গ্রহণকারী কেউ নেই।' এ আয়াতে এবং এরই মত বহু আয়াতে এ কথা স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) সমস্ত সৃষ্টজীবের নিকট রাসূল হয়ে এসেছিলেন এবং তাঁর ধর্মের নির্দেশাবলী এর প্রকৃষ্ট প্রমাণ। কিতাব ও সুন্নাহর মধ্যে এ বিষয়ের বহু আয়াত ও হাদীস রয়েছে। কুরআন পাকের মধ্যে এক জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে মানবমণ্ডলী! নিশ্চয়ই আমি তোমাদের সবারই জন্যে আল্লাহর রাসূল।” (৭:১৫৮) অন্য আয়াতে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “সেই আল্লাহ কল্যাণময় যিনি স্বীয় বান্দার উপর কুরআন অবতীর্ণ করেছেন, যেন সে সারা দুনিয়াবাসীর জন্যে ভয় প্রদর্শক হয়ে যায়”। (২৫:১) সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিম প্রভৃতি হাদীস গ্রন্থে কয়েকটি ঘটনা ধারাবাহিক রূপে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) চতুম্পার্শ্বের সমস্ত বাদশাহর নিকট এবং অন্যান্য লোকদের নিকট পত্র পাঠিয়েছিলেন। ঐ পত্রগুলোর মাধ্যমে তিনি তাদেরকে আল্লাহর দিকে আহ্বান করেছিলেন। তারা আরবই হোক বা আজমীই হোক, কিতাবধারীই হোক বা অন্য কোন ধর্মের লোক হোক না কেন। এভাবে তিনি প্রচারের দায়িত্ব পূর্ণভাবে পালন করেছিলেন। মুসনাদ-ই-আবদুর রাজ্জাকের মধ্যে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে আল্লাহর হাতে আমার জীবন রয়েছে তাঁর শপথ! এ উম্মতের মধ্যে ইয়াহূদই হোক বা খ্রীষ্টানই হোক যারই কানে আমার নবুওয়াতের সংবাদ পৌছবে এবং আমার আনীত জিনিসের উপর সে বিশ্বাস স্থাপন করবে না, আর ঐ অবস্থাতেই মৃত্যুবরণ করবে সে অবশ্যই জাহান্নামী হবে।” সহীহ মুসলিম শরীফেও এ হাদীসটি রয়েছে এবং তাতে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিম্নের উক্তিও রয়েছেঃ “আমি প্রত্যেক লাল ও কৃষ্ণের নিকট নবীরূপে প্রেরিত হয়েছি।” অন্য একটি হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “প্রত্যেকে নবী (আঃ)-কে শুধুমাত্র তাঁর গোত্রের নিকট পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু আমি সমস্ত মানুষের নিকট নবীরূপে প্রেরিত হয়েছি।” মুসনাদ-ই-আহমাদের মধ্যে হযরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একটি ইয়াহূদীর ছেলে, যে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর অযুর পানি রাখতো এবং তাঁর জুতা এনে দিতো, সে রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়ে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) ছেলেটিকে বলেনঃ “হে অমুক! তুমি (আরবী) পাঠ কর।` সে তখন তার পিতার দিকে দৃষ্টিপাত করে এবং পিতাকে নীরব থাকতে দেখে সেও নীরব হয়ে যায়। রাসূলুল্লাহ (সঃ) দ্বিতীয়বার এ কথাই বলেন। সে পুনরায় তার পিতার দিকে তাকায়। তার পিতা বলেঃ “আবুল কাসিম (সঃ)-এর কথা মেনে নাও।” ছেলেটি তখন বলেঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া কেউ মা'বুদ নেই এবং নিশ্চয়ই আপনি আল্লাহর রাসূল।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) বেরিয়ে যাবার সময় বলেনঃ “সেই আল্লাহরই সমস্ত প্রশংসা যিনি আমার কারণে তাকে জাহান্নাম হতে রক্ষা করলেন।” এ হাদীসটি ইমাম বুখারী (রঃ) তাঁর সহীহ বুখারীর মধ্যে এনেছেন। এগুলো ছাড়াও আরও বহু বিশুদ্ধ হাদীস এবং কুরআন কারীমের বহু আয়াত এ সম্বন্ধে রয়েছে।





সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।