আল কুরআন


সূরা আলে-ইমরান (আয়াত: 185)

সূরা আলে-ইমরান (আয়াত: 185)



হরকত ছাড়া:

كل نفس ذائقة الموت وإنما توفون أجوركم يوم القيامة فمن زحزح عن النار وأدخل الجنة فقد فاز وما الحياة الدنيا إلا متاع الغرور ﴿١٨٥﴾




হরকত সহ:

کُلُّ نَفْسٍ ذَآئِقَۃُ الْمَوْتِ ؕ وَ اِنَّمَا تُوَفَّوْنَ اُجُوْرَکُمْ یَوْمَ الْقِیٰمَۃِ ؕ فَمَنْ زُحْزِحَ عَنِ النَّارِ وَ اُدْخِلَ الْجَنَّۃَ فَقَدْ فَازَ ؕ وَ مَا الْحَیٰوۃُ الدُّنْیَاۤ اِلَّا مَتَاعُ الْغُرُوْرِ ﴿۱۸۵﴾




উচ্চারণ: কুল্লুনাফছিন যাইকাতুল মাওতি ওয়া ইন্নামা-তুওয়াফফাওনা উজূরাকুম ইয়াওমাল কিয়া-মাতি ফামান যুহযিহা ‘আনিন্না-রি ওয়া উদখিলাল জান্নাতা ফাকাদ ফা-যা ওয়ামাল হায়া-তুদ্দুনইয়া-ইল্লা-মাতা-‘উল গুরুর।




আল বায়ান: প্রতিটি প্রাণী মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবে। আর ‘অবশ্যই কিয়ামতের দিনে তাদের প্রতিদান পরিপূর্ণভাবে দেয়া হবে। সুতরাং যাকে জাহান্নাম থেকে দূরে রাখা হবে এবং জান্নাতে প্রবেশ করানো হবে সে-ই সফলতা পাবে। আর দুনিয়ার জীবন শুধু ধোঁকার সামগ্রী।




আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ১৮৫. জীবমাত্রই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবে। কেবলমাত্র কেয়ামতের দিনই তোমাদেরকে তোমাদের কর্মফল পূর্ণ মাত্রায় দেয়া হবে। অতঃপর যাকে আগুন থেকে দূরে রাখা হবে এবং জান্নাতে প্রবেশ করানো হবে সে-ই সফলকাম।(১) আর পার্থিব জীবন ছলনাময় ভোগ ছাড়া আর কিছু নয়।(২)




তাইসীরুল ক্বুরআন: প্রতিটি জীবন মৃত্যুর আস্বাদ গ্রহণ করবে এবং ক্বিয়ামাতের দিন তোমাদেরকে পূর্ণমাত্রায় বিনিময় দেয়া হবে। যে ব্যক্তিকে জাহান্নামের আগুন হতে রক্ষা করা হল এবং জান্নাতে দাখিল করা হল, অবশ্যই সে ব্যক্তি সফলকাম হল, কেননা পার্থিব জীবন ছলনার বস্তু ছাড়া আর কিছুই নয়।




আহসানুল বায়ান: (১৮৫) জীব মাত্রই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবে। আর কিয়ামতের দিনই তোমাদের কর্মফল পূর্ণমাত্রায় প্রদান করা হবে। সুতরাং যাকে আগুন (দোযখ) থেকে দূরে রাখা হবে এবং (যে) বেহেশ্তে প্রবেশলাভ করবে, সেই হবে সফলকাম। আর পার্থিব জীবন ছলনাময় ভোগ ব্যতীত কিছুই নয়।[1]



মুজিবুর রহমান: সমস্ত জীবই মৃত্যুর আস্বাদ গ্রহণ করবে; এবং নিশ্চয়ই উত্থান দিনে তোমাদেরকে পূর্ণ প্রতিদান দেয়া হবে; অতএব যে কেহ জাহান্নাম হতে বিমুক্ত হয় এবং জান্নাতে প্রবিষ্ট হয় - ফলতঃ নিশ্চয়ই সে সফলকাম; আর পার্থিব জীবন ছলনাময় ভোগ ব্যতীত আর কিছুই নয়।



ফযলুর রহমান: প্রত্যেক প্রাণীই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবে। আর কেয়ামতের দিন তোমাদেরকে তোমাদের কর্মফল পুরোপুরি দেওয়া হবে। তখন যাকে জাহান্নাম থেকে দূরে সরিয়ে জান্নাতে প্রবেশ করানো হবে সে-ই সফলকাম। আর পার্থিব জীবন তো শুধু প্রতারণার সামগ্রী।



মুহিউদ্দিন খান: প্রত্যেক প্রাণীকে আস্বাদন করতে হবে মৃত্যু। আর তোমরা কিয়ামতের দিন পরিপূর্ণ বদলা প্রাপ্ত হবে। তারপর যাকে দোযখ থেকে দূরে রাখা হবে এবং জান্নাতে প্রবেশ করানো হবে, তার কার্যসিদ্ধি ঘটবে। আর পার্থিব জীবন ধোঁকা ছাড়া অন্য কোন সম্পদ নয়।



জহুরুল হক: প্রত্যেক সত্ত্বাকে মৃত্যু আস্বাদন করতে হবে। আর নিশ্চয়ই কিয়ামতের দিনে তোমাদের প্রাপ্য পুরোপুরি তোমাদের আদায় করা হবে। কাজেই যাকে আগুন থেকে বহুদূরে রাখা হবে ও স্বর্গোদ্যানে প্রবিষ্ট করা হবে, নিঃসন্দেহ সে হ’ল সফলকাম। আর এই দুনিয়ার জীবন ধোকার সন্বল ছাড়া কিছুই নয়।



Sahih International: Every soul will taste death, and you will only be given your [full] compensation on the Day of Resurrection. So he who is drawn away from the Fire and admitted to Paradise has attained [his desire]. And what is the life of this world except the enjoyment of delusion.



তাফসীরে যাকারিয়া

অনুবাদ: ১৮৫. জীবমাত্রই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবে। কেবলমাত্র কেয়ামতের দিনই তোমাদেরকে তোমাদের কর্মফল পূর্ণ মাত্রায় দেয়া হবে। অতঃপর যাকে আগুন থেকে দূরে রাখা হবে এবং জান্নাতে প্রবেশ করানো হবে সে-ই সফলকাম।(১) আর পার্থিব জীবন ছলনাময় ভোগ ছাড়া আর কিছু নয়।(২)


তাফসীর:

(১) পৃথিবীর এমন কোন মানুষ নেই যে সফলতা চায় না। এ সফলতা একেকজন একেক দৃষ্টিকোণ থেকে নির্ধারণ করে। কেউ দুনিয়ার প্রচুর সম্পদ, নারী, গাড়ী-বাড়ী, ক্ষমতা, প্রভাব-প্রতিপত্তি ইত্যাদির মাধ্যমে নির্ধারণ করে। কেউ আবার সুস্বাস্থ্যকে নির্ধারণ করে। কেউ আবার অন্যকিছু। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে মানুষের সফলতা কিসে তা আল্লাহ তা'আলা এ আয়াতে বলে দিয়েছেন। তিনি বলছেন যে, যাকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দিয়ে জান্নাতে প্রবেশ করানো হয়েছে সেই সফলকাম। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “জান্নাতে এক বেত পরিমান জায়গা দুনিয়া ও তাতে যা আছে তার থেকে উত্তম”। তারপর তিনি উপরোক্ত আয়াত তেলাওয়াত করলেন। [তিরমিযী: ৩০১৩]


(২) এ আয়াতে বলে দেয়া হয়েছে যে, প্রত্যেক প্রাণীই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবে। আর আখেরাতে নিজের কৃতকর্মের প্রতিদান ও শাস্তি প্রাপ্ত হবে, যা কঠিনও হবে আবার দীর্ঘও হবে। সুতরাং বুদ্ধিমানের পক্ষে সে চিন্তা করাই উচিত। এ পরিপ্রেক্ষিতে সে লোকই সত্যিকার কৃতকার্য, যে জাহান্নাম থেকে অব্যাহতি লাভ করবে এবং জান্নাতে প্রবিষ্ট হবে। তা প্রাথমিক পর্যায় হোক- যেমন, সৎকর্মশীল আবেদগণের সাথে যেরূপ আচরণ করা হবে- অথবা কিছু শাস্তি ভোগের পরেই হোক- যেমন, পাপী মুসলিমদের অবস্থা। কিন্তু সমস্ত মুসলিমই শেষ পর্যন্ত জাহান্নাম থেকে অব্যাহতি লাভ করে অনন্ত কালের জন্য জান্নাতের আরাম-আয়েশ ও সুখ-শান্তির অধিকারী হবে।

পক্ষান্তরে কাফেরদের চিরস্থায়ী ঠিকানা হবে জাহান্নাম। কাজেই তারা যদি সামান্য কয়েকদিনের পার্থিব সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের কারণে গর্বিত হয়ে ওঠে, তবে সেটা একান্তই ধোঁকা। সেজন্যই আয়াতে বলা হয়েছে “দুনিয়ার জীবন তো হলো ধোঁকার উপকরণ।” তার কারণ এই যে, সাধারণতঃ এখানকার ভোগ-বিলাসই হবে আখেরাতের কঠিন যন্ত্রণার কারণ। পক্ষান্তরে এখানকার দুঃখ-কষ্ট হবে আখেরাতের সঞ্চয়।


তাফসীরে আহসানুল বায়ান

অনুবাদ: (১৮৫) জীব মাত্রই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবে। আর কিয়ামতের দিনই তোমাদের কর্মফল পূর্ণমাত্রায় প্রদান করা হবে। সুতরাং যাকে আগুন (দোযখ) থেকে দূরে রাখা হবে এবং (যে) বেহেশ্তে প্রবেশলাভ করবে, সেই হবে সফলকাম। আর পার্থিব জীবন ছলনাময় ভোগ ব্যতীত কিছুই নয়।[1]


তাফসীর:

[1] এই আয়াতে কয়েকটি বিষয় বর্ণিত হয়েছে। প্রথমতঃ মৃত্যু এমন ধ্রুব সত্য বিষয় যে, তা থেকে নিষ্কৃতির কোন পথ নেই। দ্বিতীয়তঃ দুনিয়াতে ভাল-মন্দ যে যা-ই করুক না কেন, তাকে তার পরিপূর্ণ প্রতিদান পরকালে দেওয়া হবে। তৃতীয়তঃ প্রকৃত সফলতা সেই অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে, যে দুনিয়াতে থাকাকালীন স্বীয় প্রতিপালককে সন্তুষ্ট করে নিয়েছে এবং যার ফল স্বরূপ তাকে জাহান্নাম থেকে দূর করে জান্নাতে প্রবেশ করিয়ে দেওয়া হয়েছে। চতুর্থতঃ পার্থিব জীবন হল ধোঁকার সম্পদ। এই ধোঁকা থেকে যে নিজেকে বাঁচিয়ে নিতে পারবে, সেই হবে ভাগ্যবান। আর যে এই ধোঁকার জালে ফেঁসে যাবে, সেই হবে ব্যর্থ ও হতভাগা।


তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ


তাফসীর: ১৮৫-১৮৬ নং আয়াতের তাফসীর:



زُحْزِحَ যাকে নাজাত দেয়া হল।



আল্লাহ তা‘আলা সারা জাহানের মাখলুকাতকে জানিয়ে দিচ্ছেন যে, প্রত্যেক আত্মা মৃত্যু বরণ করবে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,



(كُلُّ مَنْ عَلَيْهَا فَانٍ)



‘ভূপৃষ্টে যা কিছু আছে সমস্তই ধ্বংসশীল।’ (সূরা আর রহমান ৫৫:২৬)



“তোমাদেরকে পূর্ণ প্রতিদান দেয়া হবে” মু’মিনদের প্রতিদান হলো জান্নাত আর কাফিরদের প্রতিদান হলো জাহান্নাম। নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন: যে ব্যক্তিকে আনন্দ দেয় যে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে এবং জাহান্নাম থেকে মুক্তি পাবে সে যেন সাক্ষ্য দেয়- আল্লাহ তা‘আলা ছাড়া সত্য কোন মা‘বূদ নেই এবং মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর (বান্দা ও) রাসূল। আর সে যা নিজের জন্য পছন্দ করে তা অপরের জন্যও পছন্দ করবে। (তিরমিযী হা: ৩২৯২, সহীহ)



আয়াতে কয়েকটি বিষয় বর্ণিত হয়েছে:



১. মৃত্যু এমন ধ্র“ব সত্য বিষয় যে, তা থেকে নিস্কৃতির কোন উপায় নেই।

২. দুনিয়াতে ভালমন্দ যে যাই করুক না কেন, তাকে তার পরিপূর্ণ প্রতিদান পরকালে প্রদান করা হবে।

৩. প্রকৃত সফলতা সেই অর্জন করতে পেরেছে যে দুনিয়াতে থাকাকালীন সময়ে স্বীয় প্রতিপালককে সন্তুষ্ট করতে পেরেছে। যার ফলস্বরূপ তাকে জাহান্নাম থেকে রক্ষা করে জান্নাতে প্রবেশ করিয়ে দেয়া হয়েছে।

৪. পার্থিব জীবন হল ধোঁকার জীবন। এ ধোঁকা থেকে যে নিজেকে বাঁচিয়ে নিতে পারবে, সেই হবে সবচেয়ে ভাগ্যবান।



অতএব যখন মৃত্যুবরণ করতেই হবে, সকল কর্মের হিসাব দিতেই হবে তখন আমাদের পরকালের নাজাতের যথাযথ পাথেয় অর্জন করা উচিত।



তারপর আল্লাহ তা‘আলা হুশিয়ার করে দিয়েছেন যে, মু’মিনদের জানে ও মালে পরীক্ষা করবেন।



আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(وَلَنَبْلُوَنَّکُمْ بِشَیْءٍ مِّنَ الْخَوْفِ وَالْجُوْعِ وَنَقْصٍ مِّنَ الْاَمْوَالِ وَالْاَنْفُسِ وَالثَّمَرٰتِﺚ وَبَشِّرِ الصّٰبِرِیْنَ)



“এবং নিশ্চয়ই আমি পরীক্ষা করব তোমাদেরকে ভয়, ক্ষুধা, ধন, প্রাণ ও শস্যের ঘাটতি কোন একটি দ্বারা। আর তুমি ধৈর্যশীলদের সুসংবাদ প্রদান কর।” (সূরা বাকারাহ ২:১৫৫)



(وَلَتَسْمَعُنَّ مِنَ الَّذِيْنَ أُوْتُوا الْكِتٰبَ....)



আহলে কিতাব তথা ইয়াহূদী ও খ্রিস্টানগণ বিভিন্নভাবে নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ও সাহাবাদেরকে নিন্দা ও গালিগালাজ করত। মুশরিকরাও এরূপ জঘন্য কাজে লিপ্ত ছিল। তাছাড়া নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যখন মদীনায় আগমন করলেন মুনাফিকরা বিশেষত তাদের সর্দার আবদুল্লাহ বিন উবাই রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর ব্যাপারে তাচ্ছিল্য প্রদর্শন করে বেড়াত।



রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মদীনায় আগমনের পূর্বে মদীনাবাসী তাদের সর্দার ইবনু উবাই এর মাথায় সর্দারীর মুকুট পরানোর সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করে নিয়েছিল। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর আগমনের কারণে তার এ স্বপ্ন ভেঙ্গে গেল। এতে সে চরমভাবে আঘাত পায়। তাই প্রতিশোধ গ্রহণের নিমিত্তে এ লোকটি সুযোগ পেলে তা হাত-ছাড়া করত না। এরূপ পরিস্থিতিতে মুসলিমদেরকে ক্ষমা ও ধৈর্য এবং আল্লাহভীরুতার পথ অবলম্বন করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। (সহীহ বুখারী হা: ৪৫৬৬)



আয়াত থেকে শিক্ষণীয় বিষয়:



১. দুনিয়ার জীবন প্রতিদানের জীবন নয় বরং আমলের জীবন।

২. প্রকৃত সফলতার পরিচয় জানতে পারলাম।

৩. পরীক্ষায় নিপতিত হলে ধৈর্য ধারণ করা মু’মিনের বৈশিষ্ট্য।


তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)


তাফসীর: ১৮৫-১৮৬ নং আয়াতের তাফসীর:

সাধারণভাবে সমস্ত সৃষ্টজীবকে জানানো হচ্ছে যে, প্রত্যেক জীবই মরণশীল। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছে (আরবী) অর্থাৎ এ পৃথিবীর যত কিছু রয়েছে সবই ধ্বংসশীল। শুধু তোমার প্রভুর মুখমণ্ডলই চির বিদ্যমান থাকবে যিনি মহা সম্মানিত ও মহান দাতা। (৫৫:২৬-২৭) সুতরাং একমাত্র সেই এক আল্লাহই চিরস্থায়ী জীবনের অধিকারী। তিনি কখনও ধ্বংস হবেন না। দানব ও মানব প্রত্যেকেই মৃত্যুর স্বাদ। গ্রহণকারী। অনুরূপভাবে ফেরেশতামণ্ডলী ও আরশ বহনকারীগণও মরণশীল। শুধুমাত্র এক অদ্বিতীয় আল্লাহই চিরকাল বাকী থাকবেন। তাঁর কোন লয় ও ক্ষয় নেই। প্রথমেও তিনিই এবং শেষেও তিনিই থাকবেন। যখন সবাই মরে যাবে, দীর্ঘ মেয়াদী সময় শেষ হয়ে যাবে, হযরত আদম (আঃ)-এর পৃষ্ঠ হতে যত সন্তান হবার ছিল হয়ে যাবে, অতঃপর সকলেই মৃত্যুর ঘাটে অবতরণ করবে এবং সমস্ত সৃষ্টজীব ধ্বংস হয়ে যাবে, সে সময় আল্লাহ তা'আলার হুকুমে কিয়ামত সংঘটিত হবে। সেদিন তিনি সকলকেই তাদের ছোট বড় সমস্ত কার্যের প্রতিদান প্রদান করবেন। কারও উপর অণুপরিমাণও অত্যাচার করা হবে না। এ কথাই পরবর্তী বাক্যে বর্ণনা করা হয়েছে। হযরত আলী (রাঃ) বর্ণনা করেনঃ রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর ইতেকালের পর আমাদের নিকট এরূপ অনুভূত হয় যে, যেন কেউ আসছেন। পায়ের শব্দ শুনা যাচ্ছে, কিন্তু কোন লোককে দেখা যায় না। তিনি এসে বলেনঃ “হে নবী পরিবারের লোকগণ! আপনাদের উপর শান্তি এবং আল্লাহর করুণা ও আশীর্বাদ বর্ষিত হোক! প্রত্যেক জীবই মৃত্যুর আশ্বাদ গ্রহণকারী। কিয়ামতের পর আপনাদের সকলকেই সমস্ত কার্যের পূর্ণ প্রতিদান দেয়া হবে। বিপদে যারা ধৈর্য ধারণ করেছে তাদের পুরস্কার মহান আল্লাহর নিকট রয়েছে। আল্লাহ তাআলার উপরই ভরসা করুন এবং তারই নিকট মঙ্গলের আশা রাখুন। জেনে রাখুন যে, প্রকৃতপক্ষে বিপদগ্রস্ত ঐ ব্যক্তি যে পুণ্য লাভ হতে বঞ্চিত হয়ে যায়। আপনাদের উপর আল্লাহ পাকের পক্ষ হতে শান্তি, করুণা ও বরকত নাযিল হোক।' (মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিম) হযরত আলী (রাঃ)-এর ধারণা মতে তিনি ছিলেন হযরত খিযির (আঃ)। সারকথা এই যে, সফলকাম হচ্ছে ঐ ব্যক্তি যে জাহান্নাম হতে মুক্তি লাভ করতঃ জান্নাতে প্রবেশ লাভ করে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ ‘জান্নাতের মধ্যে একটি চাবুক বরাবর জায়গা পেয়ে যাওয়া দুনিয়া ও তন্মধ্যকার সমস্ত জিনিস হতে উত্তম। তোমাদের ইচ্ছে পাঠ কর- (আরবী) অর্থাৎ যে কেউ অগ্নি হতে বিমুক্ত হয়েছ ও জান্নাতে প্রবিষ্ট হয়েছে, ফলতঃ সেই সফলকাম হয়েছে। এ পরবর্তী বেশীটুকু ছাড়া এ হাদীসটি সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমেও রয়েছে। আর বেশীটুকু সহ মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিম ও ইবনে মিরদুওয়াই-এর মধ্যেও রয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ‘জাহান্নামের অগ্নি হতে মুক্তি পাওয়ার ও জান্নাতে প্রবেশ করার যার ইচ্ছে রয়েছে সে যেন মৃত্যু পর্যন্ত আল্লাহর উপর ও কিয়ামতের উপর বিশ্বাস রাখে এবং জনগণের সাথে সেই ব্যবহার করে, যে ব্যবহার সে নিজের জন্যে পছন্দ করে। এ হাদীসটি। (আরবী) (৩:১০২) এ আয়াতের তাফসীরে বর্ণিত হয়েছে। মুসনাদ-ই-আহমাদে এবং আকী ইবনে জাররাহের তাফসীরেও এই হাদীসটি রয়েছে। এরপর দুনিয়ার নিকৃষ্টতা ও তুচ্ছতার কথা বর্ণিত হচ্ছে যে, দুনিয়া অত্যন্ত নিকৃষ্ট, ধ্বংসশীল ও ক্ষণস্থায়ী জিনিস। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছে (আরবী) অর্থাৎ তোমরা ইহলৌকিক জীবনকেই প্রাধান্য দিচ্ছ অথচ পারলৌকিক জীবন উত্তম ও স্থায়ী।' (৭৮:১৬-১৭) অন্য জায়গায় রয়েছে-“তোমাদেরকে যা কিছু দেয়া হয়েছে তা তো শুধুমাত্র ইহলৌকিক জীবনের উপকারের বস্তু ও সৌন্দর্য; উত্তম ও স্থায়ী তো ওটাই যা আল্লাহর নিকট রয়েছে। হাদীস শরীফে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহর শপথ! কোন লোক সমুদ্রে অঙ্গুলী ডুবালে তার অঙ্গুলীর অগ্রভাগে যে পানি উঠে সেই পানির সঙ্গে সমুদ্রের পানির যে তুলনা পরকালের তুলনায় দুনিয়া ঠিক তদ্রুপ'। হযরত কাতাদাহ (রঃ) বলেন, দুনিয়া প্রতারণার একটা বেড়া ছাড়া আর কি? যাকে ছেড়ে তোমাদেরকে বিদায় হতে হবে। যে আল্লাহ ছাড়া কোন মাবুদ নেই তাঁর শপথ! এ তো অতিসত্বরই তোমাদের হতে পৃথক হয়ে যাবে ও ধ্বংস হয়ে যাবে। সুতরাং এখানে বুদ্ধিমত্তার পরিচয় প্রদান করতঃ আল্লাহর আনুগত্যের কাজে লেগে পড় এবং সাধ্যনুসারে পুণ্য অর্জন কর। আল্লাহ প্রদত্ত ক্ষমতা ছাড়া কোন কাজ সাধিত হয় না। অতঃপর মানুষের পরীক্ষার কথা বর্ণনা করা হচ্ছে। যেমন এক জায়গায় রয়েছে- (আরবী) অর্থাৎ ‘আমি অবশ্যই তোমাদেরকে ভয়, ক্ষুধা ইত্যাদি দিয়ে পরীক্ষা করবো।' (২:১৫৫) ভাবার্থ এই যে, মুমিনের পরীক্ষা অবশ্যই হয়ে থাকে। কখনো জীবনের উপর, কখনো অর্থের উপর, কখনো পরিবারের উপর এবং কখনো অন্য কিছুর উপর, মুত্তাকীর তারতম্য অনুযায়ী পরীক্ষা হয়ে থাকে। যে খুব বেশী ধর্মভীরু তার পরীক্ষা বেশী কঠিন হয়। আর যার ঈমানে দুর্বলতা রয়েছে তার পরীক্ষা হালকা হয়। এরপর আল্লাহ তাআলা সাহাবা-ই-কিরাম (রাঃ)-কে সংবাদ দিচ্ছেন-বদরের যুদ্ধের পূর্বে গ্রন্থধারী ও অংশীবাদীদের নিকট হতে তোমাদেরকে বহু দুঃখজনক কথা শুনতে হবে। তারপর তাদেরকে সান্ত্বনা। দিয়ে বলেছেন- সে সময় তোমাদেরকে ধৈর্যধারণ করতে হবে ও সংযমী হতে হবে এবং মুত্তাকী হওয়ার উপর এটা খুব কঠিন কাজই বটে'। হযরত উসামা ইবনে যায়েদ (রাঃ) বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) এবং তাঁর সাহাবীবর্গ মুশরিক ও আহলে কিতাবের অপরাধ প্রায়ই ক্ষমা করে দিতেন এবং তাদের কষ্টদায়ক কথার উপর ধৈর্যধারণ করতেন ও আল্লাহ তা'আলার এ নির্দেশের উপর আমল করতেন। অবশেষে জিহাদের আয়াত অবতীর্ণ হয়। সহীহ বুখারী শরীফে এ আয়াতের তাফসীরে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) স্বীয় গাধার উপর আরোহণ করতঃ হযরত উসামা (রাঃ)-কে পিছনে বসিয়ে নিয়ে রোগাক্রান্ত হযরত সা'দ ইবনে উবাদা (রাঃ)-কে দেখবার জন্যে বানূ হারিস খাযরাজের গোত্রের মধ্যে গমন করেন। এটা বদর যুদ্ধের পূর্বের ঘটনা। পথে একটি জনসমাবেশ দেখা যায়, যেখানে মুসলমান, ইয়াহূদী ও মুশরিক সবাই উপস্থিত ছিল। ওর মধ্যে আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই ইবনে সালও ছিল। তখন পর্যন্ত সে প্রকাশ্যভাবে কুফরীর রঙ্গেই রঞ্জিত ছিল। মুসলমানদের মধ্যে হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে রাওয়াহাও (রাঃ) বিদ্যমান ছিলেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সোয়ারী হতে ধূলোবালি উড়তে থাকলে আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই নাকে কাপড় দিয়ে বলেঃ ‘ধূলা উড়াবেন না।' রাসূলুল্লাহ (সঃ) নিকটে পৌঁছেই গিয়েছিলেন। সোয়ারী হতে নেমে তিনি সালাম করেন এবং তাদেরকে ইসলামের দিকে আহ্বান করেন। তাদেরকে তিনি কুরআন কারীমের কয়েকটি আয়াতও শুনিয়ে দেন। তখন আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই বলে, “শুনুন জনাব, আপনার এ পন্থা আমাদের নিকট মোটেই পছন্দনীয় নয়। আপনার কথা সত্যই বা হলো, কিন্তু তাই বলে এটা উচিত নয় যে, আপনি আপনার সমাবেশে এসে আমাদেরকে কষ্ট দেবেন। আপনার বাড়ীতে যে যাবে তাকেই আপনি শুনাবেন।' এ কথা শুনে হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা (রাঃ) বলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! অবশ্যই আপনি আমাদের সভায় আগমন করবেন। আপনার কথা শুনবার তো আমাদের চাহিদা আছেই। তাদের মধ্যে তখন হট্টগোলের সৃষ্টি হয়ে যায়। একে অপরকে ভাল-মন্দ বলতে থাকে। এমনকি তাদের মধ্যে যুদ্ধ বেঁধে যাবার উপক্রম হয়ে যায়। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর বুঝানোর ফলে অবশেষে পরিস্থিতি শান্ত হয় এবং সবাই নীরব হয়ে যায়। তিনি স্বীয় সোয়ারীর উপর আরোহণ করে হযরত সা'দ (রাঃ)-এর নিকট গমন করেন এবং তথায় গিয়ে হযরত সা'দ (রাঃ)-কে বলেনঃ “হে আবু হাব্বার! আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই তো আজকে এরূপ এরূপ করেছে।' হযরত সা'দ (রাঃ) বলেন, এরূপ হতে দিন! ক্ষমা করুন! যে আল্লাহ আপনার প্রতি পবিত্র কুরআন অবতীর্ণ করেছেন তার শপথ! আপনার সঙ্গে তো তার চরম শত্রুতা রয়েছে এবং এটা হওয়া স্বাভাবিক। কেননা, এখানকার মানুষ তাকে তাদের নেতা নির্বাচন করতে চেয়েছিল এবং তার জন্যে নেতৃত্বের পাগড়ী তৈরীরও পরামর্শ গ্রহণ করা হয়েছিল। ইতিমধ্যে আল্লাহ তা'আলা আপনাকে স্বীয় নবী করে পাঠিয়ে দেন। জনগণ আপনাকে নবী বলে স্বীকার করে নেয়। সুতরাং তার নেতৃত্ব চলে যায়। ফলে সে চরম দুঃখিত হয়। এ জন্যেই সে ক্রোধে ও হিংসায় জ্বলে পুড়ে মরছে। যা সে বলেছে বলেছেই। আপনি তার কথার উপর গুরুত্ব দেবেন না।' অতএব রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে ক্ষমা করে দেন এবং এটা তার অভ্যাসই ছিল। তার সাহাবীগণও ইয়াহূদী ও মুশরিকদের অপরাধ ক্ষমা করে দিতেন এবং উপরোক্ত আয়াতে প্রদত্ত নির্দেশের উপর আমল করতেন। এরপর রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিহাদের অনুমতি দেয়া হয় এবং প্রথম। বদরের যুদ্ধ সংঘটিত হয়, যে যুদ্ধে কাফিরদের নেতৃবৃন্দ নিহত ও ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। ইসলামের এই অগ্রগতি দেখে আব্দুল্লাহ ইবনে উবাইও তার সঙ্গীরা ভীত হয়ে পড়ে এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর হাতে বায়আত গ্রহণ ও নিজেদেরকে বাহ্যতঃ মুসলমানরূপে পরিচিত করা ছাড়া তাদের আর কোন উপায় থাকে না। সুতরাং এটা স্মরণ রাখা উচিত যে, প্রত্যেক পন্থী যারা মানুষকে সৎ কাজের আদেশ ও মন্দ কাজ হতে নিষেধ করে থাকে তাদের উপর অবশ্যই বিপদ-আপদ এসে থাকে। কাজেই আল্লাহর পথে এসব বিপদ-আপদ সহ্য করা, তার উপর পূর্ণ ভরসা রাখা, তারই নিকট সাহায্য প্রার্থনা করা মুমিনদের একান্ত কর্তব্য।





সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।