আল কুরআন


সূরা আলে-ইমরান (আয়াত: 143)

সূরা আলে-ইমরান (আয়াত: 143)



হরকত ছাড়া:

ولقد كنتم تمنون الموت من قبل أن تلقوه فقد رأيتموه وأنتم تنظرون ﴿١٤٣﴾




হরকত সহ:

وَ لَقَدْ کُنْتُمْ تَمَنَّوْنَ الْمَوْتَ مِنْ قَبْلِ اَنْ تَلْقَوْهُ ۪ فَقَدْ رَاَیْتُمُوْهُ وَ اَنْتُمْ تَنْظُرُوْنَ ﴿۱۴۳﴾




উচ্চারণ: ওয়া লাকাদ কুনতুম তামান্নাওনাল মাওতা মিন কাবলি আন তালকাওহু ফাকাদ রাআইতুমূহু ওয়া আনতুম তানজুরুন।




আল বায়ান: আর তোমরা অবশ্যই মৃত্যু কামনা করতে, তার সাথে সাক্ষাতের পূর্বে। অতএব তোমরা তো তা দেখেছই এমতাবস্থায় যে, তোমরা তাকাচ্ছিলে ।




আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ১৪৩. মৃত্যুর সম্মুখীন হওয়ার আগে তোমরা তো তা কামনা করতে(১), এখনতো তোমরা তা স্বচক্ষে দেখলে।




তাইসীরুল ক্বুরআন: (শাহাদাতের) মৃত্যুর সাক্ষাৎ লাভের পূর্বে তোমরা তা কামনা করতে, এখন তো তোমরা তা দিব্যদৃষ্টিতে দেখলে।




আহসানুল বায়ান: (১৪৩) নিশ্চয় তোমরা মৃত্যুর সম্মুখীন হবার পূর্বে তা কামনা করতে,[1] এখন তোমরা তো তা স্বচক্ষে দেখলে?[2]



মুজিবুর রহমান: এবং নিশ্চয়ই তোমরা মৃত্যুর পূর্বেই ওর সাক্ষাৎ কামনা করছিলে, অনন্তর নিশ্চয়ই তোমরা এখন তা প্রত্যক্ষ করছ তোমাদের নিজেদের চোখে।



ফযলুর রহমান: মৃত্যুর সম্মুখীন হওয়ার পূর্বে তোমরা মৃত্যু কামনা করতে; এখন তোমরা তাকিয়ে তাকিয়ে সে মৃত্যু দেখলে।



মুহিউদ্দিন খান: আর তোমরা তো মৃত্যু আসার আগেই মরণ কামনা করতে, কাজেই এখন তো তোমরা তা চোখের সামনে উপস্থিত দেখতে পাচ্ছ।



জহুরুল হক: আর নিঃসন্দেহ তোমরা চেয়েছিলে মৃত্যুবরণ করতে -- তার সঙ্গে দেখা হবার আগে, এখন কিন্তু তোমরা তা দেখেছ, আর তোমরা দেখতে থাকো!



Sahih International: And you had certainly wished for martyrdom before you encountered it, and you have [now] seen it [before you] while you were looking on.



তাফসীরে যাকারিয়া

অনুবাদ: ১৪৩. মৃত্যুর সম্মুখীন হওয়ার আগে তোমরা তো তা কামনা করতে(১), এখনতো তোমরা তা স্বচক্ষে দেখলে।


তাফসীর:

(১) মৃত্যু বা বিপদ কামনা করা জায়েয নেই। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ “তোমরা শক্রর সাথে সাক্ষাত কামনা করো না; আল্লাহর কাছে নিরাপত্তা চাও, তবে যদি তারপরও সাক্ষাত হয়ে যায় তা হলে ধৈর্য ধারন কর এবং জেনে রাখ যে, জান্নাত তরবারীর ছায়ার নীচে’। [বুখারীঃ ২৯৬৬, মুসলিমঃ ১৭৪২]


তাফসীরে আহসানুল বায়ান

অনুবাদ: (১৪৩) নিশ্চয় তোমরা মৃত্যুর সম্মুখীন হবার পূর্বে তা কামনা করতে,[1] এখন তোমরা তো তা স্বচক্ষে দেখলে?[2]


তাফসীর:

[1] এখানে সেই সাহাবীদের প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে, যাঁরা বদর যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করতে না পারার কারণে নিজেদের হৃদয়ে এক প্রকার বঞ্চনা-ব্যথা অনুভব করতেন এবং চাইতেন যে, আবারও যুদ্ধের ময়দান উত্তপ্ত হলে তাঁরাও কাফেরদের শিরচ্ছেদ করে জিহাদের ফযীলত অর্জন করবেন। আর এই সাহাবীরাই উহুদের দিন জিহাদের উদ্দীপনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে মদীনার বাইরে গিয়ে যুদ্ধ করার পরামর্শ দিয়েছিলেন। কিন্তু যখন মুসলিমদের বিজয় কাফেরদের অভাবিত আক্রমণের ফলে পরাজয়ে পরিবর্তন হয়ে গেল (যার বিস্তারিত আলোচনা পূর্বে হয়েছে), তখন জিহাদের উদ্দীপনায় ভরপুর যাঁদের অন্তর এমন মুজাহিদরাও কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়েন এবং অনেকে তো পলায়নও করেন। (পরে এর আলোচনা আসবে) অতঃপর অল্প সংখ্যক লোক দৃঢ়তার সাথে ময়দানে টিঁকে থাকেন। (ফাতহুল ক্বাদীর) এই জন্যই হাদীসে এসেছে যে, ‘‘তোমরা শত্রুর মুখোমুখী হওয়ার আশা করো না এবং আল্লাহর নিকট নিরাপত্তা কামনা কর। তবে যদি শত্রুর সাথে মুখোমুখী হওয়ার পরিস্থিতি আপনা আপনিই এসে যায় এবং তোমাদেরকে তাদের সাথে লড়তে হয়, তাহলে তখন (ময়দানে) সুদৃঢ় ও অনড় থাকো। জেনে রাখো! জান্নাত হল তরবারির ছায়ার তলে।’’ (বুখারী-মুসলিম)

[2] رَأَيْتُمُوهُ  এবং تَنْظُرُوْنَ উভয়ের অর্থ একই। অর্থাৎ, দেখা। সুনিশ্চয়তা ও আধিক্য বুঝানোর জন্য উভয় শব্দ ব্যবহূত হয়েছে। অর্থাৎ, তরবারির চমকে, বর্শা-বল্লমের তীক্ষ্ণতায়, তীরের আঘাতে এবং বীরদের সারিবদ্ধতায় তোমরা মৃত্যুকে খুব ভালোভাবে দর্শন করেছ। (ইবনে কাসীর, ফাতহুল ক্বাদীর)


তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ


তাফসীর: ১৩৭-১৪৩ নং আয়াতের তাফসীর:



যে সকল মু’মিন উহুদের যুদ্ধে আহত ও শাহাদাত বরণ করেছে আল্লাহ তা‘আলা তাদেরকে সম্বোধন করে বলেন, তোমাদের পূর্বে অনেক নাবীর উম্মাত অতীত হয়ে গেছে যারা এমন বিপদাপদের সম্মুখীন হয়েছিল। কিন্তু মু’মিনদের ছিল শুভ পরিণতি আর কাফিরদের ছিল অশুভ পরিণতি। এজন্য আল্লাহ তা‘আলা পৃথিবীতে ভ্রমণ করার নির্দেশ দিয়েছেন যাতে মিথ্যুকদের পরিণতি দেখে শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে। অতঃপর আল্লাহ তা‘আলা মু’মিনদেরকে সান্ত্বনা দিয়ে বলেন, উহুদের দিন যা ঘটে গেছে সে জন্য মনবল হারাইও না। মূলতঃ তোমরাই বিজয়ী, তোমাদের জন্যই উত্তম পরিণতি, যদি তোমরা মু’মিন হও।



(أَمْ حَسِبْتُمْ أَنْ تَدْخُلُوا...)



এ সম্পর্কে সূরা বাকারাহর ২১৪ নং আয়াতে আলোচনা করা হয়েছে।



تَمَنَّوْنَ الْمَوْتَ



শত্র“দের সাথে মুখোমুখী হবার ও মৃত্যু কামনা করা নিষেধ। তবে যদি শত্র“রা মুখোমুখী হয়েই যায় তা হলে পিছপা হওয়া হারাম।



রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন: তোমরা শত্র“দের সম্মুখীন হবার আকাক্সক্ষা করো না, আল্লাহ তা‘আলার নিকট নিরাপত্তার জন্য প্রার্থনা কর। যখন শত্র“দের সম্মুখীন হয়েই যাবে তখন ধৈর্যধারণ করবে। জেনে রেখ! জান্নাত তরবারীর ছায়াতলে। (সহীহ বুখারী হা: ২৯৬৫, ২৯৬৬)



সুতরাং মু’মিনরা মারবে এবং মরবে, হীনবল হবার কিছু নেই, কারণ তারা (কাফিররা) মারা গেলে জাহান্নামে যাবে আর মু’মিনরা মারা গেলে জান্নাতে যাবে।



আয়াত থেকে শিক্ষণীয় বিষয়:



১. মিথ্যুকদের পরিণতি সর্বদা খারাপ হয়, তারা সফলকাম হতে পারে না।

২. কুরআনের প্রত্যেক আয়াতে হিদায়াত ও উপদেশ রয়েছে।

৩. ঈমানদারগণ দুনিয়া ও আখিরাত উভয় জগতে সফলকাম।

৪. কোন অবস্থাতেই মৃত্যু কামনা করা যাবে না, তবে এভাবে দু‘আ করা যাবে যে, হে আল্লাহ! আমার বেঁচে থাকা যদি মঙ্গল হয় তা হলে জীবিত রাখ, আর যদি মৃত্যু মঙ্গল হয় তা হলে মৃত্যু দাও।


তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)


তাফসীর: ১৩৭-১৪৩ নং আয়াতের তাফসীর:

যেহেতু উহুদের যুদ্ধে সত্তরজন মুসলমান শহীদ হয়েছিলেন, তাই আল্লাহ পাক মুসলমানদেরকে সান্ত্বনা ও উৎসাহ দিয়ে বলছেনঃ “তোমাদের পূর্ববর্তী ধর্মভীরু লোকদেরকেও জান ও মালের ক্ষতি স্বীকার করতে হয়েছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বিজয় লাভ তাদেরই হয়েছে। তোমরা তোমাদের পূর্ববর্তী ঘটনাবলীর প্রতি একটু দৃষ্টিপাত করলেই তোমাদের উপর এ রহস্য উৎঘাটিত হয়ে যাবে। এ পবিত্র কুরআনের মধ্যে তোমাদের শিক্ষার জন্যে তোমাদের পূর্ববর্তী উম্মতদের বর্ণনাও রয়েছে। অর্থাৎ তোমাদের অন্তরের হিদায়াতের জন্যে এবং তোমাদেরকে ভাল-মন্দ সম্বন্ধে সজাগকারী এ কুরআন পাকই বটে। মুসলমানদেরকে ঐ ঘটনাবলী স্মরণ করিয়ে দিয়ে তাদেরকে আরও বেশী সান্তনা দেয়ার জন্য বলছেন- “তোমরা এ যুদ্ধের ফলাফল দেখে মন খারাপ করো না এবং চিন্তিত হয়ে বসে পড়ো না। এ যুদ্ধে যদি তোমরা আহত হয়ে থাক এবং তোমাদের লোক শহীদ হয়ে থাকে তাতে কি হয়েছে; কেননা, এর পূর্বে তো তোমাদের শত্রুরাও আহত ও নিহত হয়েছিল। এরূপ উত্থান-পতন ততা পৃথিবীতে চলেই আসছে। হ্যা, তবে প্রকৃত কৃতকার্য ওরাই যারা পরিণামে বিজয়ী হয়, আর আমি তো তোমাদের জন্যে এ বিজয় নির্দিষ্ট করেই রেখেছি। তোমাদের কোন কোন বারে পরাজয় এবং বিশেষ করে এ উহুদ যুদ্ধের পরাজয়ের কারণ ছিল তোমাদের মধ্যকার ধৈর্যশীল ও অধৈর্যশীলদেরকে পরীক্ষা করা। আর যারা বহুদিন হতে শাহাদাত লাভের আকাংখী ছিল তাদের আকাংখা পূর্ণ করাও ছিল একটি কারণ। তারা যেন স্বীয় জান ও মাল আমার পথে ব্যয় করার সুযোগ লাভ করতে পারে। আল্লাহ তা'আলা অত্যাচারীদেরকে ভালবাসেন। না। এর আরও কারণ এই যে, ঈমানদারদের পাপ থাকলে তা মোচন হয়ে যাবে, আর পাপ না থাকলে তাদের মর্যাদা বেড়ে যাবে এবং এর দ্বারা কাফিরদেরকে ধ্বংস করারও উদ্দেশ্য রয়েছে। কেননা, তারা বিজয়ী হয়ে গর্বিত হয়ে যাবে এবং তাদের অবাধ্যতা ও অহংকার আরও বৃদ্ধি পাবে। আর এটাই তাদের ধ্বংসের কারণ হয়ে দাঁড়াবে এবং শেষে তারা সমূলে বিধ্বস্ত হয়ে যাবে। এসব কঠিন বিপদ-আপদ ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়া কেউ জান্নাত লাভ করতে পারে না। যেমন সূরা-ই-বাকারায় রয়েছে- ‘তোমরা কি এটা জান যে, তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদেরকে যেভাবে পরীক্ষা করা হয়েছিল সেভাবে তোমাদেরকে পরীক্ষা করা হবে না এবং তোমরা জান্নাতে চলে যাবে? এটা হতে পারে না। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছে (আরবী) অর্থাৎ মানুষ কি মনে করেছে যে, তারা-‘আমরা ঈমান এনেছি’ একথা বললেই তাদেরকে ছেড়ে দেয়া হবে এবং তাদেরকে পরীক্ষা করা হবে না? (২৯:২) এখানেও ঐ কথাই বলা হচ্ছে যে, যে পর্যন্ত ধৈর্যশীলদেরকে জানা না যায়, অর্থাৎ তারা পৃথিবীতে প্রকাশিত না হয় সে পর্যন্ত তারা জান্নাত লাভ করতে পারে না। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “তোমরা এর পূর্বে তো এরূপ সুযোগেরই আকাংখা করছিলে যে, নিজেদের ধৈর্য ও দৃঢ়তা মহান আল্লাহকে প্রদর্শন করবে এবং তার পথে শাহাদাত বরণ করবে। কাজেই এস, আমি তোমাদেরকে ঐ সুযোগ প্রদান করলাম, তোমরা এখন তোমাদের দুঃসাহস ও দৃঢ়তা প্রদর্শন কর।' হাদীস শরীফে রয়েছে, রাসুলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “তোমরা শত্রুদের সম্মুখীন হওয়ার আকাঙ্খ করো না, আল্লাহ তাআলার নিকট নিরাপত্তার জন্যে প্রার্থনা কর এবং যখন যুদ্ধক্ষেত্রে উপস্থিত হও তখন লৌহস্তম্ভের মত অটল ও স্থির থাক এবং জেনে রেখো যে, জান্নাত তরবারীর ছায়ার নীচে রয়েছে। এরপর আল্লাহ পাক বলেনঃ “তোমরা স্বচক্ষে এ দৃশ্য দেখেছ যে, তরবারী কচ্ শব্দ করছে, বর্শা তীব্র বেগে বের হচ্ছে, তীর বর্ষিত হচ্ছে, ভয়াবহ যুদ্ধ চলছে এবং এদিকে-ওদিকে মৃতদেহ পড়তে রয়েছে।





সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।