আল কুরআন


সূরা আলে-ইমরান (আয়াত: 108)

সূরা আলে-ইমরান (আয়াত: 108)



হরকত ছাড়া:

تلك آيات الله نتلوها عليك بالحق وما الله يريد ظلما للعالمين ﴿١٠٨﴾




হরকত সহ:

تِلْکَ اٰیٰتُ اللّٰهِ نَتْلُوْهَا عَلَیْکَ بِالْحَقِّ ؕ وَ مَا اللّٰهُ یُرِیْدُ ظُلْمًا لِّلْعٰلَمِیْنَ ﴿۱۰۸﴾




উচ্চারণ: তিলকা আ-য়া-তুল্লা-হি নাতলূহা-‘আলাইকা বিলহাক্কি ওয়ামাল্লা-হু ইউরীদু জুলমাল লিল‘আ-লামীন।




আল বায়ান: এগুলো আল্লাহর নির্দশন, যা আমি তোমার উপর যথাযথভাবে তিলাওয়াত করছি। আর আল্লাহ সৃষ্টিকুলের প্রতি যুলম করতে চান না।




আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ১০৮. এগুলো আল্লাহ্‌র আয়াত, যা আমরা আপনার কাছে যথাযথভাবে তেলাওয়াত করছি। আর আল্লাহ সৃষ্টিজগতের প্রতি যুলুম করতে চান না।




তাইসীরুল ক্বুরআন: এসব আল্লাহর আয়াত, যা ঠিকভাবে আমি তোমাকে পড়ে শুনাচ্ছি এবং আল্লাহ বিশ্বজগতের প্রতি যুলম করতে চান না।




আহসানুল বায়ান: (১০৮) এগুলি আল্লাহর আয়াত, তোমার নিকট সত্যসহ আবৃত্তি করছি। আল্লাহ বিশ্ব-জগতের প্রতি অবিচার করার ইচ্ছা রাখেন না।



মুজিবুর রহমান: এগুলি হচ্ছে আল্লাহর নিদর্শন - যা আমি তোমার প্রতি সত্যসহ আবৃত্তি করছি এবং আল্লাহ বিশ্ব জগতের প্রতি অত্যাচারের ইচ্ছা করেননা।



ফযলুর রহমান: এগুলো আল্লাহর আয়াত যা তোমাকে সঠিকভাবে পাঠ করে শোনাচ্ছি। আল্লাহ বিশ্ববাসীর প্রতি অবিচার করতে চান না।



মুহিউদ্দিন খান: এগুলো হচ্ছে আল্লাহর নির্দেশ, যা তোমাদিগকে যথাযথ পাঠ করে শুনানো হচ্ছে। আর আল্লাহ বিশ্ব জাহানের প্রতি উৎপীড়ন করতে চান না।



জহুরুল হক: এইসব হছে আল্লাহ্‌র নির্দেশাবলী যা আমরা তোমার কাছে পাঠ করছি সত্যের সাথে। আর আল্লাহ্ কোনো প্রাণীর প্রতি অবিচার চান না।



Sahih International: These are the verses of Allah. We recite them to you, [O Muhammad], in truth; and Allah wants no injustice to the worlds.



তাফসীরে যাকারিয়া

অনুবাদ: ১০৮. এগুলো আল্লাহ্–র আয়াত, যা আমরা আপনার কাছে যথাযথভাবে তেলাওয়াত করছি। আর আল্লাহ সৃষ্টিজগতের প্রতি যুলুম করতে চান না।


তাফসীর:

-


তাফসীরে আহসানুল বায়ান

অনুবাদ: (১০৮) এগুলি আল্লাহর আয়াত, তোমার নিকট সত্যসহ আবৃত্তি করছি। আল্লাহ বিশ্ব-জগতের প্রতি অবিচার করার ইচ্ছা রাখেন না।


তাফসীর:

-


তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ


তাফসীর: ১০৪-১০৯ নং আয়াতের তাফসীর:



আল্লাহ তা‘আলা এখানে মুসলিম উম্মাহকে সম্বোধন করে বলছেন, তোমাদের এমন একটি দল থাকা আবশ্যক যারা কুরআন ও সুন্নাহর দিকে মানুষকে আহ্বান করবে। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন: خير বা কল্যাণ হল



اتباع القران وسنتي



কুরআন ও সুন্নাহর অনুসরণ করা। (সহীহ বুখারী হা: ৬৪৬৪, সহীহ মুসলিম হা: ২১৭১)



আবুল আলিয়া বলেন: কুরআনে যে সকল আয়াতে



امر بالمعروف



বা সৎ কাজের আদেশ এসেছে সেসকল সৎ কাজ দ্বারা উদ্দেশ্য হল ইসলাম, আর যেখানে



نهي عن المنكر



বা অসৎ কাজ থেকে নিষেধের কথা এসেছে সে সকল অসৎ কাজ দ্বারা মূর্তি পূজা ও শয়তানকে বুঝানো হয়েছে। (ফাতহুল কাদীর, ১/ ৪৯৯)



রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন: যে ব্যক্তি কোন অসৎ কাজ প্রত্যক্ষ করবে, সে যেন তা হাত দ্বারা তা প্রতিহত করে। তাতে সক্ষম না হলে জবান দ্বারা প্রতিহত করবে, তাতেও সক্ষম না হলে অন্তর দ্বারা ঘৃণা করবে। এটা সবচেয়ে দুর্বল ঈমান। (সহীহ মুসলিম হা: ৪৯, আবূ দাঊদ হা: ১১৪০, তিরমিযী হা: ২১৭৬)



যারা দীনের এ মহতী কাজে আত্মনিয়োগ করবে তারাই সফলকাম হবে।



এরপর আল্লাহ তা‘আলা তাদের মত হতে নিষেধ করেছেন যারা দলে দলে বিভক্ত হয়ে গেছে। আর তারা হল ইয়াহূদী ও খ্রিস্টানরা। কেউ কেউ বলেন, তারা হল বিদআতীরা। তবে প্রথম উক্তিটিই উত্তম। (আইসারুত তাফাসীর, ১/২৭৯, অত্র আয়াতের তাফসীর)



রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, ইয়াহূদীরা ৭১ দলে বিভক্ত হয়েছে, খ্রিস্টানরা ৭২ দলে বিভক্ত হয়েছে আর আমার উম্মত ৭৩ দলে বিভক্ত হবে। সবাই জাহান্নামে যাবে তবে একটি দল ছাড়া। জিজ্ঞাসা করা হল, তারা কারা? রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, তারা হল এ সমস্ত লোক যারা আজ আমি ও আমার সাহাবাগণ যে আকীদাহ ও আমলের ওপর প্রতিষ্ঠিত আছি তার উপর প্রতিষ্ঠিত থাকবে। (আবূ দাঊদ হা: ৪৫৯৬, ৪৫৯৭, তিরমিযী হা: ২৬৪০-৪১, ইবনু মাযাহ হা: ৩৯৯১, ৩৯৯৩, সহীহ)



সুতরাং রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কোন সুনির্দিষ্ট দলকে ফিরকাহ নাজীয়া বলে উল্লেখ করেননি। সে অনুযায়ী যে সকল মু’মিন-মুসলিম ব্যক্তিরা রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ও সাহাবীদের আমল ও আকীদাহর ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকবে তারাই ফিরকাহ নাজীয়া বা মুক্তিপ্রাপ্ত দল।



যারা সত্য জানার পরেও দলে দলে বিভক্ত হয়েছে তাদের জন্য রয়েছে মহাশাস্তি।



কিয়ামতের দিন কতক ব্যক্তির চেহারা হবে উজ্জ্বল, ইবনু আব্বাস বলেন, তারা হল: আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামায়াহ। আর কতক ব্যক্তির চেহারা মলিন হবে। তিনি (রাঃ) বলেন, তারা হল: বিদ‘আতী ও যারা দলে দলে বিভক্ত হয়েছে। হাসান বসরী (রহঃ) বলেন: তারা হল মুনাফিক। (তাফসীর ইবনে কাসীর, ২/১০০, ফাতহুল কাদীর, ১/৫০০)। সুতরাং দলে দলে বিভক্ত হবার কোন সুযোগ নেই। যারা দলে দলে বিভক্ত হবে তারা ইসলাম বহির্ভূত।



আয়াত থেকে শিক্ষণীয় বিষয়:



১. উম্মাতে মুহাম্মাদীর এমন একটি দল থাকা আবশ্যক যারা কুরআন ও সহীহ সুন্নাহর আলোকে ইসলামের দিকে আহ্বান করবে।

২. দলে দলে বিভক্ত হওয়া হারাম।

৩. কিয়ামাতের দিন বিদ‘আতী ও যারা প্রবৃত্তি পূজারী তাদেরকে মলিন চেহারায় দেখা যাবে।

৪. আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আত তারাই যারা রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ও সাহাবাগণ যে আকীদাহ ও আমালের ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিলেন তার ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকবে।

৫. সংখ্যাগরিষ্ঠতা সত্যের মাপকাঠি নয় বরং কুরআন ও সহীহ সুন্নাহ-ই হলো সত্যের মাপকাঠি।


তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)


তাফসীর: ১০৪-১০৯ নং আয়াতের তাফসীর:

হযরত যাহ্হাক (রঃ) বলেন যে, এই দল’ হতে ভাবার্থ হচ্ছে বিশিষ্ট সাহাবা ও বিশিষ্ট হাদীসের বর্ণনাকারী। অর্থাৎ মুজাহিদ এবং আলেমগণ। ইমাম আবু যাফর বাকের (রঃ) বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) এ আয়াতটি পাঠ করেন, অতঃপর বলেনঃ (আরবী) শব্দের ভাবার্থ হচ্ছে কুরআন ও হাদীসের অনুসরণ। এটা অবশ্যই স্মরণ রাখার বিষয় যে, প্রত্যেকের উপরেই স্বীয় ক্ষমতা অনুযায়ী সত্যের প্রচার ফরয। কিন্তু তথাপিও একটি বিশেষ দল এ কার্যে লিপ্ত থাকা প্রয়োজন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “তোমাদের মধ্যে যে কেউ কাউকে কোন অন্যায় কাজ করতে দেখে, সে যেন তাকে হাত দ্বারা বাধা দেয়, যদি এতে তার ক্ষমতা না থাকে তবে যেন জিহ্বা (কথা) দ্বারা বাধা প্রধান করে, যদি এটাও করতে না পারে তবে যেন অন্তর দ্বারা তাকে ঘৃণা করে এবং এটাই হচ্ছে সবচেয়ে দুর্বল ঈমান। অন্য একটি বর্ণনায় এর পরে এও রয়েছে - ‘ওর পরে সরিষার বীজ পরিমাণও ঈমান নেই'। (সহীহ মুসলিম) মুসনাদ-ই-আহমাদে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে সত্তার হাতে আমার প্রাণ রয়েছে তাঁর শপথ! তোমরা সৎকার্যের আদেশ ও মন্দকার্য হতে নিষেধ করতে থাক, নতুবা সত্বরই আল্লাহ তা'আলা তোমাদের উপর স্বীয় শাস্তি অবতীর্ণ করবেন। অতঃপর তোমরা প্রার্থনা করবে কিন্তু তা গৃহীহ তবে না।' এ বিষয়ের আরও হাদীস রয়েছে সেগুলো ইনশাআল্লাহ অন্য স্থলে বর্ণিত হবে।

অতঃপর বলা হচ্ছে- “তোমরা পূর্ববর্তী লোকদের মত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে মতবিরোধ সৃষ্টি করো না। ভাল কার্যের আদেশ ও মন্দ কার্য হতে নিষেধ করা তোমরা পরিত্যাগ করো না।' মুসনাদ-ই-আহমাদের মধ্যে রয়েছে যে, হযরত মুআবিয়া ইবনে আবু সুফইয়ান (রাঃ) হজ্বের উদ্দেশ্যে মক্কায় আগমন করেন। যোহরের নামাযের পর তিনি দাড়িয়ে বলেনঃ রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন-“কিতাব প্রাপ্তগণ তাদের ধর্মের ব্যাপারে মতভেদ সৃষ্টি করে ৭২টি দল হয়ে গেছে। আর আমার এ উম্মতের ৭৩টি দল হয়ে যাবে। অর্থাৎ সবাই প্রবৃত্তির বশীভূত হয়ে পড়বে। কিন্তু আরও একটি দল রয়েছে এবং আমার উম্মতের মধ্যে এমন লোকও হবে যাদের শিরায় শিরায় কুপ্রবৃত্তি এমনভাবে প্রবেশ করবে যেমন কুকুরে কাটা ব্যক্তির শিরায় শিরায় বিষক্রিয়া পৌঁছে যায়। হে আরববাসী! তোমরাই যদি তোমাদের নবী (সঃ) কর্তৃক আনয়নকৃত বস্তুর উপর প্রতিষ্ঠিত না থাক, তবে অন্যান্য লোক তো আরও বহু দূরে সরে পড়বে।' এ হাদীসটির বহু সনদ রয়েছে। এর পর আল্লাহ পাক বলেন- ‘সেদিন কতকগুলো লোকের মুখমণ্ডল শ্বেতবর্ণ ধারণ করবে এবং কতকগুলো লোক কৃষ্ণ চেহারা বিশিষ্টও হবে।' হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের মুখমণ্ডল শ্বেত বর্ণ ও আলোকোজ্জ্বল হবে এবং আহলে বিদ'আতের মুখমণ্ডল হবে কৃষ্ণ বর্ণের। হযরত হাসান বসরী (রঃ) বলেন যে, এ কৃষ্ণ বর্ণ বিশিষ্ট লোকেরা মুনাফিকের দল। তাদেরকে বলা হবে- তোমরা বিশ্বাস স্থাপনের পরিবর্তে অস্বীকার করেছিলে বলে আজকার স্বাদ গ্রহণ কর। আর শ্বেতবর্ণ বিশিষ্ট লোকগণ আল্লাহ তাআলার করুণার মধ্যে সদা অবস্থান। করবে। হযরত আবু উমামা (রাঃ) খারেজীদের মস্তকগুলো দামেশকের মসজিদের স্তম্ভে লটকানো দেখে বলেনঃ এরা নরকের কুকুর। এদের চেয়ে বেশী জঘন্য নিহত ব্যক্তি ভূ-পৃষ্ঠের কোথাও নেই। এদেরকে হত্যাকারীগণ উত্তম মুজাহিদ।' অতঃপর (আরবী)-এ আয়াতটি পাঠ করেন। আবূ গালিব (রঃ) তাকে জিজ্ঞেস করেনঃ “আপনি কি এটা স্বয়ং রাসূলুল্লাহ হতে শুনেছেনে?' তিনি বলেনঃ “একবার দু’বার নয় বরং সাতবার শুনেছি। এরূপ না হলে আমি এ শব্দগুলো আমার মুখ দ্বারা বেরই করতাম না। এখানে ইবনে মিরদুওয়াই (রঃ) হযরত আবু যার (রাঃ)-এর বর্ণনায় একটি সুদীর্ঘ হাদীস নকল করেছেন, যা অত্যন্ত বিস্ময়কর। কিন্তু সনদ হিসেবে এটা গারীব। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেন, “হে নবী (সঃ)! ইহকাল ও পরকালে এ কথাগুলো আমি তোমার নিকট প্রকাশ করে দিচ্ছি। আল্লাহ ন্যায় বিচারক, তিনি মোটেই অত্যাচারী নন। প্রত্যেক জিনিসকেই তিনি খুব ভালই জানেন। প্রত্যেক জিনিসের উপর তিনি ক্ষমতাবানও বটে। সুতরাং তিনি যে কারও উপর অত্যাচার করবেন এটা মোটেই সম্ভব নয়। আকাশ ও পৃথিবীর সমুদয় জিনিস তারই অধিকারে রয়েছে। সবই তাঁর দাসত্বের শৃংখলে আবদ্ধ। সমুদয় কৃতকর্ম তার দিকেই প্রত্যাবর্তিত হয়। ইহজগতের ও পরজগতের পূর্ণ ক্ষমতবান শাসক একমাত্র তিনিই।





সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।