সূরা আয-যুমার (আয়াত: 65)
হরকত ছাড়া:
ولقد أوحي إليك وإلى الذين من قبلك لئن أشركت ليحبطن عملك ولتكونن من الخاسرين ﴿٦٥﴾
হরকত সহ:
وَ لَقَدْ اُوْحِیَ اِلَیْکَ وَ اِلَی الَّذِیْنَ مِنْ قَبْلِکَ ۚ لَئِنْ اَشْرَکْتَ لَیَحْبَطَنَّ عَمَلُکَ وَ لَتَکُوْنَنَّ مِنَ الْخٰسِرِیْنَ ﴿۶۵﴾
উচ্চারণ: ওয়ালা কাদ ঊহিয়া ইলাইকা ওয়া ইলাল্লাযীনা মিন কাবলিকা লাইন আশরাকতা লাইয়াহবাতান্না ‘আমালুকা ওয়া লাতাকূনান্না মিনাল খা-ছিরীন।
আল বায়ান: আর অবশ্যই তোমার কাছে এবং তোমার পূর্ববর্তীদের কাছে ওহী পাঠানো হয়েছে যে, তুমি শির্ক করলে তোমার কর্ম নিষ্ফল হবেই। আর অবশ্যই তুমি ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে।
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৬৫. আর আপনার প্রতি ও আপনার পূর্ববর্তীদের প্রতি অবশ্যই ওহী হয়েছে যে, যদি আপনি শির্ক করেন তবে আপনার সমস্ত আমল তো নিস্ফল হবে এবং অবশ্যই আপনি হবেন ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত।
তাইসীরুল ক্বুরআন: কিন্তু তোমার কাছে আর তোমাদের পূর্ববর্তীদের কাছে ওয়াহী করা হয়েছে যে, তুমি যদি (আল্লাহর) শরীক স্থির কর, তাহলে তোমার কর্ম অবশ্য অবশ্যই নিস্ফল হয়ে যাবে, আর তুমি অবশ্য অবশ্যই ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে।
আহসানুল বায়ান: (৬৫) তোমার প্রতি ও তোমার পূর্ববর্তীদের প্রতি অবশ্যই অহী (প্রত্যাদেশ) করা হয়েছে যে, যদি তুমি আল্লাহর অংশী স্থির কর, তাহলে অবশ্যই তোমার কর্ম নিষ্ফল হবে এবং তুমি হবে ক্ষতিগ্রস্তদের শ্রেণীভুক্ত।[1]
মুজিবুর রহমান: তোমার প্রতি, তোমার পূর্ববর্তীদের প্রতি অবশ্যই অহী হয়েছে; তুমি আল্লাহর শরীক স্থির করলে তোমার কাজ নিস্ফল হবে এবং তুমি হবে ক্ষতিগ্রস্ত।
ফযলুর রহমান: তোমার প্রতি ও তোমার পূর্ববর্তীদের প্রতি অবশ্যই ওহী পাঠানো হয়েছে যে, যদি শির্ক (আল্লাহর সাথে কাউকে অংশীদার সাব্যস্ত) করো তাহলে অবশ্যই তোমার কর্মসমূহ নিষ্ফল হয়ে যাবে এবং তুমি ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে।
মুহিউদ্দিন খান: আপনার প্রতি এবং আপনার পূর্ববর্তীদের পতি প্রত্যাদেশ হয়েছে, যদি আল্লাহর শরীক স্থির করেন, তবে আপনার কর্ম নিষ্ফল হবে এবং আপনি ক্ষতিগ্রস্তদের একজন হবেন।
জহুরুল হক: আর তোমার কাছে ও তোমার আগে যারা ছিলেন তাঁদের কাছে নিশ্চয়ই ইতিপূর্বে প্রত্যাদিষ্ট হয়েছে -- "যদি তুমি শরিক কর তাহলে তোমার কাজকর্ম নিশ্চয়ই নিষ্ফল হয়ে যাবে এবং তুমি নিশ্চয়ই হয়ে যাবে ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যেকার।"
Sahih International: And it was already revealed to you and to those before you that if you should associate [anything] with Allah, your work would surely become worthless, and you would surely be among the losers."
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ৬৫. আর আপনার প্রতি ও আপনার পূর্ববর্তীদের প্রতি অবশ্যই ওহী হয়েছে যে, যদি আপনি শির্ক করেন তবে আপনার সমস্ত আমল তো নিস্ফল হবে এবং অবশ্যই আপনি হবেন ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত।
তাফসীর:
-
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (৬৫) তোমার প্রতি ও তোমার পূর্ববর্তীদের প্রতি অবশ্যই অহী (প্রত্যাদেশ) করা হয়েছে যে, যদি তুমি আল্লাহর অংশী স্থির কর, তাহলে অবশ্যই তোমার কর্ম নিষ্ফল হবে এবং তুমি হবে ক্ষতিগ্রস্তদের শ্রেণীভুক্ত।[1]
তাফসীর:
[1] ‘‘যদি তুমি শিরক (আল্লাহর অংশী স্থির) কর’’ এর অর্থ হল, যদি তোমার মৃত্যু শিরকের উপরেই আসে এবং তা থেকে তওবা না কর। সম্বোধন নবী করীম (সাঃ)-কে করা হয়েছে, যিনি ছিলেন শিরক থেকে পাক ও পবিত্র এবং আগামীতে যে তাঁর দ্বারা শিরক হবে না, সে ব্যাপারেও নিশ্চয়তা ছিল। কেননা, নবী আল্লাহর হিফাযত ও তাঁর সংরক্ষণে থাকেন। তাঁর দ্বারা শিরক হওয়ার কোন সম্ভাবনাই নেই। আসলে এখানে উদ্দেশ্য হচ্ছে, পরোক্ষভাবে উম্মতকে বুঝানো, (যদিও সম্বোধন নবীকে করা হয়েছে)।
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ৬২-৬৬ নম্বর আয়াতের তাফসীর :
আল্লাহ তা‘আলা তাঁর মহত্ব ও বড়ত্বের সংবাদ দিয়ে বলছেন, তিনিই আকাশ-জমিন, মানুষ-জিন, ফেরেশতা, গাছ-পালাসহ সবকিছুর স্রষ্টা, এমনকি সবকিছুর পরিচালকও তিনি।
এ আয়াত থেকে অনেকে বলতে চায় আল্লাহ তা‘আলার কথা মাখলুক, কুরআন মাখলুক যা মু‘তাযিলাদের বিশ্বাস। এরূপ বিশ্বাস মূর্খতার পরিচয় বহন করে, কারণ কুরআন আল্লাহ তা‘আলার কালাম বা কথা, আল্লাহ তা‘আলার কালাম তাঁর একটি গুণ বা সিফাত। আর আল্লাহ তা‘আলার সিফাত কখনো মাখলূক হতে পারে না, বরং আল্লাহ তা‘আলার মতই চিরস্থায়ী অবিনশ্বর। সুতরাং আল্লাহ তা‘আলা ও তাঁর সিফাত ছাড়া যা কিছু আছে সবকিছু মাখলূক তথা ধ্বংসশীল।
আকাশ ও জমিনের জ্ঞান-বিজ্ঞান, কল্যাণ-অকল্যাণসহ সবকিছুর চাবি-কাঠি তাঁরই হাতে। তিনি যা চান তাই হয়, আর যা চান না তা হয় না। সকল কিছুর ওপর তিনিই ক্ষমতাবান। যারা এতে বিশ্বাসী তারা পরকালে সফলকাম হবে, আর যারাই অস্বীকার করবে তারাই হবে ক্ষতিগ্রস্ত। আল্লাহ তা‘আলা বলেন :
(مَا يَفْتَحِ اللّٰهُ لِلنَّاسِ مِنْ رَّحْمَةٍ فَلَا مُمْسِكَ لَهَا ج وَمَا يُمْسِكْ فَلَا مُرْسِلَ لَه۫ مِنْۭ بَعْدِه۪ ط وَهُوَ الْعَزِيْزُ الْحَكِيْمُ)
“আল্লাহ মানুষের জন্য যে রহমত উন্মুক্ত করে দেন তা কেউ প্রতিরোধ করতে পারে না; আর যা তিনি বন্ধ করে দেন তা বন্ধ করার পরে কেউ উন্মুক্ত করতে পারে না। তিনি প্র্রতাপশালী ও মহাপ্রজ্ঞাময়।” (সূরা ফাতির ৩৫ : ২)
مَقَالِيْدُ হলো, مقلد এবং مقلاد-এর বহুবচন। কেউ এর অর্থ করেছেন চাবিসমূহ, আবার কেউ এর অর্থ করেছেন- ধন-ভাণ্ডার।
সুতরাং যে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এসব কিছুর মালিক তাঁকে ব্যতীত আমরা কি অন্যের ইবাদত করব? না, কখনো নয়; সর্বদা একমাত্র আল্লাহ তা‘আলারই ইবাদত করব, জাহেলরা যতই অন্যের ইবাদতের দিকে আহ্বান করুক তারা মূলত ইবাদতের হকদার নয়। এমনকি তারা ইবাদতের কোন অংশেরও হকদার নয়, যদি কেউ তাদের জন্য ইবাদতের কিছু অংশও সম্পাদন করে তাহলে তারাও মুশরিক। যারা শির্ক করবে আল্লাহ তা‘আলা তাঁর নাবীকে সম্বোধন করে উম্মাতকে সতর্ক করে বলেন : তুমিও যদি কোন প্রকার শির্কে লিপ্ত হও আর তাওবা না করে শির্কের ওপরই মৃত্যু বরণ করো তাহলে তোমার সমস্ত আমল বাতিল হয়ে যাবে এবং তুমি হবে জাহান্নামী।
আল্লাহ তা‘আলার বাণী :
(ذٰلِكَ هُدَي اللّٰهِ يَهْدِيْ بِه۪ مَنْ يَّشَا۬ءُ مِنْ عِبَادِه۪ ط وَلَوْ أَشْرَكُوْا لَحَبِطَ عَنْهُمْ مَّا كَانُوْا يَعْمَلُوْنَ)
“এটা আল্লাহর হিদায়াত, স্বীয় বান্দাদের মধ্যে যাকে ইচ্ছা তিনি হিদায়াত দ্বারা সৎ পথে পরিচালিত করেন। তারা যদি শির্ক করত তবে তাদের কৃতকর্ম নিষ্ফল হত।” (সূরা আন‘আম ৬ : ৮৮)
সুতরাং শির্ক ও এ জাতীয় আমল থেকে আমাদেরকে অবশ্যই বেঁচে থাকতে হবে।
আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয় :
১. একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর ইবাদত করতে হবে। তাঁর সাথে কোন কিছুকে শরীক করা যাবে না।
২. শির্ক করলে পূর্ববর্তী সকল ভাল আমল নষ্ট হয়ে যায়।
৩. আল্লাহর নেয়ামতের শুকরিয়া আদায় করতে হবে। তাঁর প্রতি অকৃতজ্ঞ হওয়া যাবে না।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: ৬২-৬৬ নং আয়াতের তাফসীর:
আল্লাহ তা'আলা সংবাদ দিচ্ছেন যে, সমস্ত প্রাণী এবং নির্জীব বস্তুর সৃষ্টিকর্তা, মালিক, প্রতিপালক এবং ব্যবস্থাপক আল্লাহ তা'আলা একাই। সব জিনিসই তাঁর অধীনস্থ ও অধিকারভুক্ত। সব কিছুর কর্মবিধায়ক তিনিই। আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর চাবিকাঠি তারই নিকট রয়েছে। সমুদয় প্রশংসার যোগ্য এবং সমস্ত জিনিসের উপর ক্ষমতাবান একমাত্র তিনিই। কুফরী ও অস্বীকারকারীরা বড়ই ক্ষতিগ্রস্ততার মধ্যে রয়েছে।
ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) এখানে একটি হাদীস এনেছেন, যদিও এটা সনদের দিক দিয়ে খুবই গরীব, এমনকি এর সত্যতার ব্যাপারেও বাক-বিতণ্ডা রয়েছে, তথাপি আমরা এখানে ওটা বর্ণনা করছি। তাতে রয়েছে যে, হযরত উসমান (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে এই আয়াতের ভাবার্থ জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেনঃ “হে উসমান (রাঃ)! তোমার পূর্বে কেউই আমাকে এই আয়াতের ভাবার্থ জিজ্ঞেস করেনি। এর তাফসীর হচ্ছে নিম্নের কালেমাগুলোঃ (আরবী) অর্থাৎ “আল্লাহ ছাড়া কোন মাবুদ নেই, আল্লাহ সবচেয়ে বড়। আমি আল্লাহর পবিত্রতা বর্ণনা করছি ও তার প্রশংসা করছি। আল্লাহর নিকট আমি ক্ষমা প্রার্থনা করছি। আল্লাহ ছাড়া কারো কোন শক্তি নেই। তিনিই প্রথম এবং তিনিই শেষ। তিনিই প্রকাশ্য এবং তিনিই গোপনীয়। সমস্ত মঙ্গল তাঁরই হাতে। তিনিই জীবিত করেন এবং তিনিই মৃত্যু ঘটান এবং তিনি প্রত্যেক জিনিসের উপর ক্ষমতাবান”। হে উসমান (রাঃ)! যে ব্যক্তি সকালে এটাকে দশবার পড়বে তাকে আল্লাহ তা'আলা ছয়টি ফযীলত দান করবেন। (এক) সে শয়তান ও তার সেনাবাহিনী হতে বেঁচে যাবে। (দুই) সে এক কিনতার বিনিময় লাভ করবে। (তিন) জান্নাতে তার এক ধাপ মান উঁচু হবে। (চার) বড় বড় চক্ষু বিশিষ্ট হূরের সাথে তার বিয়ে হবে। (পাঁচ) তার কাছে বারোজন ফেরেশতা আসবেন। (ছয়) তাকে এই পরিমাণ সওয়াব দেয়া হবে যেমন সওয়াব দেয়া হয় ঐ ব্যক্তিকে যে কুরআন, তাওরাত, ইনজীল ও যবূর পাঠ করে। তাছাড়া তাকে এক ককূল হজ্ব ও ককূল উমরার সওয়াব দেয়া হবে। ঐদিন যদি তার মৃত্যু হয়ে যায় তবে সে শহীদের মর্যাদা লাভ করবে।” (এ হাদীসটি খুবই গরীব এবং এটা স্বীকৃত নয়। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন)
হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তাকে মুশরিকরা বলেঃ “এসো, তুমি আমাদের মাবুদগুলোর ইবাদত কর এবং আমরা তোমাদের প্রতিপালকের ইবাদত করি।” তখন (আরবী) হতে (আরবী) পর্যন্ত আয়াত অবতীর্ণ হয়। এটা আল্লাহ তা'আলার (আরবী)-এই উক্তির মতই। অর্থাৎ “যদি তারা শিরক করে তবে তারা যা আমল করতো সবই নষ্ট হয়ে যাবে।” (৬:৮৯) এখানেও মহান আল্লাহ বলেনঃ (হে নবী সঃ!) তোমার প্রতি ও তোমার পূর্ববর্তীদের প্রতি অবশ্যই অহী করা হয়েছেঃ তুমি আল্লাহর শরীক স্থির করলে তোমার কর্ম নিষ্ফল হবে এবং তুমি হবে ক্ষতিগ্রস্ত। অতএব, তোমার উচিত যে, তুমি আন্তরিকতার সাথে আল্লাহরই ইবাদত করবে এবং তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞ হবে। এটা তোমার এবং তোমার অনুসারীদের অবশ্য কর্তব্য।
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।