আল কুরআন


সূরা আয-যুমার (আয়াত: 4)

সূরা আয-যুমার (আয়াত: 4)



হরকত ছাড়া:

لو أراد الله أن يتخذ ولدا لاصطفى مما يخلق ما يشاء سبحانه هو الله الواحد القهار ﴿٤﴾




হরকত সহ:

لَوْ اَرَادَ اللّٰهُ اَنْ یَّتَّخِذَ وَلَدًا لَّاصْطَفٰی مِمَّا یَخْلُقُ مَا یَشَآءُ ۙ سُبْحٰنَهٗ ؕ هُوَ اللّٰهُ الْوَاحِدُ الْقَهَّارُ ﴿۴﴾




উচ্চারণ: লাও আরাদাল্লা-হু আইঁ ইয়াত্তাখিযা ওয়ালাদাল্লাসতাফা-মিম্মা-ইয়াখলুকূমা ইয়াশাউ ছুবহা-নাহূ হুওয়াল্লা-হুল ওয়া-হিদুল কাহহা-র।




আল বায়ান: আল্লাহ যদি সন্তান গ্রহণ করতে চাইতেন, তাহলে তিনি যা সৃষ্টি করেছেন তা থেকে যাকে ইচ্ছা বেছে নিতেন; কিন্তু তিনি পবিত্র মহান। তিনিই আল্লাহ, তিনি এক, প্রবল পরাক্রান্ত।




আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৪. আল্লাহ সন্তান গ্রহণ করতে চাইলে তিনি তাঁর সৃষ্টির মধ্যে যাকে ইচ্ছে বেছে নিতেন। পবিত্র ও মহান তিনি! তিনি আল্লাহ, এক, প্রবল প্রতাপশালী।




তাইসীরুল ক্বুরআন: আল্লাহ সন্তান গ্রহণ করার ইচ্ছে করলে তিনি তার সৃষ্টিকুল থেকে নিজ পছন্দ মত বেছে নিতেন। এসব থেকে তিনি পবিত্র। অপ্রতিরোধ্য ক্ষমতার অধিকারী তিনি এক ও একক আল্লাহ।




আহসানুল বায়ান: (৪) আল্লাহ সন্তান গ্রহণ করতে ইচ্ছা করলে তিনি তাঁর সৃষ্টির মধ্যে যাকে ইচ্ছা মনোনীত করতে পারতেন। পবিত্র ও মহান তিনি![1] তিনিই আল্লাহ, এক, পরাক্রমশালী।



মুজিবুর রহমান: আল্লাহ সন্তান গ্রহণ করতে ইচ্ছা করলে তিনি তাঁর সৃষ্টির মধ্যে যাকে ইচ্ছা মনোনীত করতে পারতেন। পবিত্র ও মহান তিনি। তিনিই আল্লাহ এক, প্রবল পরাক্রমশালী।



ফযলুর রহমান: আল্লাহ যদি সন্তান গ্রহণ করতে চাইতেন তাহলে তিনি যা সৃষ্টি করেন তা থেকে অবশ্যই যা ইচ্ছা বেছে নিতেন। তিনি পবিত্র ও মহান! তিনি একক ও পরম প্রতাপশালী আল্লাহ।



মুহিউদ্দিন খান: আল্লাহ যদি সন্তান গ্রহণ করার ইচ্ছা করতেন, তবে তাঁর সৃষ্টির মধ্য থেকে যা কিছু ইচ্ছা মনোনীত করতেন, তিনি পবিত্র। তিনি আল্লাহ, এক পরাক্রমশালী।



জহুরুল হক: আল্লাহ্ যদি কোনো সন্তান গ্রহণ করতে চাইতেন তাহলে তিনি যাদের সৃষ্টি করেছেন তাদের থেকে যাকে তিনি ইচ্ছা করেন তাকেই তো তিনি পছন্দ করতে পারতেন। সকল মহিমা তাঁরই। তিনিই আল্লাহ্‌, -- একক, সর্ববিজয়ী।



Sahih International: If Allah had intended to take a son, He could have chosen from what He creates whatever He willed. Exalted is He; He is Allah, the One, the Prevailing.



তাফসীরে যাকারিয়া

অনুবাদ: ৪. আল্লাহ সন্তান গ্রহণ করতে চাইলে তিনি তাঁর সৃষ্টির মধ্যে যাকে ইচ্ছে বেছে নিতেন। পবিত্র ও মহান তিনি! তিনি আল্লাহ, এক, প্রবল প্রতাপশালী।


তাফসীর:

-


তাফসীরে আহসানুল বায়ান

অনুবাদ: (৪) আল্লাহ সন্তান গ্রহণ করতে ইচ্ছা করলে তিনি তাঁর সৃষ্টির মধ্যে যাকে ইচ্ছা মনোনীত করতে পারতেন। পবিত্র ও মহান তিনি![1] তিনিই আল্লাহ, এক, পরাক্রমশালী।


তাফসীর:

[1] অর্থাৎ, মুশরিকদের বিশ্বাস মত, তাঁর সন্তান হওয়ার প্রয়োজনই বা কি? বরং তিনি আপন সৃষ্টির মধ্য থেকে যাকে পছন্দ করতেন, তাকেই সন্তানরূপে গ্রহণ করতে পারতেন। তাদেরকে নয় যাদেরকে তারা তাঁর সন্তান বলে আখ্যায়িত করে থাকে। কিন্তু আসলে আল্লাহ তো এই ত্রুটি থেকে পবিত্র। (ইবনে কাসীর)


তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ


তাফসীর: নামকরণ ও ফাযীলাত :



(الزُّمَرُ) যুমার শব্দের অর্থ দল, গ্রুপ ইত্যাদি। এ সূরাতে জান্নাতী ও জাহান্নামী দু’টো দলের কথা বিশেষভাবে আলোচনা করায় উক্ত নামে সূরার নামকরণ করা হয়েছে।





‘আয়িশাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন : রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) (নফল) সিয়াম এমন পর্যায়ক্রমে পালন করতেন যে, আমরা মনে করতাম তিনি যেন আর সিয়াম ভঙ্গই করবেন না। আবার কখনো পর্যায়ক্রমে সিয়াম পালনই করতেন না। আমরা মনে করতাম, তিনি যেন আর সিয়াম পালন করবেন না। আর তিনি প্রতি রাত্রে সূর্ াবানী ইসরাঈল ও সূরা আয্ যুমার পাঠ করতেন। (মুসনাদ আহমাদ হা. ২৫৬৬৪, নাসায়ী হা. ২৩৪৬, ইবনু কাসীর, অত্র আয়াতের তাফসীর)



সূরা যুমার একটি গুরুত্বপূর্ণ সূরা। এ সূরার শুরুতে আল্লাহ তা‘আলার এককত্ব, যারা আল্লাহ তা‘আলা ছাড়া অন্যের ইবাদত করে তাদের ভ্রান্ত দাবী, দুনিয়ার সব কিছু আল্লাহ তা‘আলার ইচ্ছায় হয় কিন্তু বান্দা তাঁর সাথে কুফরী করুক তিনি তা পছন্দ করেন না, মানুষ বিপদে পড়লে আল্লাহ তা‘আলাকে ডাকে কিন্তু বিপদ থেকে মুক্তি পেলে আল্লাহ তা‘আলাকে ভুলে যায়, আবার অনেকে তাঁর সাথে শির্ক করে, যে কোন কথা শুনলেই মানা যাবে না বরং উত্তম কথা মানতে হবে, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ইনতেকাল করেছেন, সর্বাবস্থায় আল্লাহ তা‘আলাই বান্দার জন্য যথেষ্ট, মক্কার মুশরিকদের তাওহীদে রুবুবিয়্যাহর স্বীকারোক্তি, যারা নিজেদের ওপর জুলুম করেছে তাদের নিরাশ না হওয়ার সুসংবাদ, মুশরিকরা আল্লাহ তা‘আলাকে চিনলেও যথাযথ মর্যাদা দিতো না এবং সূরার শেষে জাহান্নামীদেরকে দলে দলে জাহান্নামে ও জান্নাতীদেরকে দলে দলে জান্নাতের নিয়ে যাওয়া হবে ও প্রহরীদের সম্ভাষণ জানানো ইত্যাদি বিষয় সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে।



১-৪ নম্বর আয়াতের তাফসীর :



মক্কার কাফির-মুশরিকরা মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নবুওয়াতকে অস্বীকার, তাঁর প্রতি অবতীর্ণ কিতাবকে অবিশ্বাস, বরং এটা মানব রচিত একটি কিতাব বলে বিশ্বাস করার কথা খণ্ডন করে আল্লাহ তা‘আলা বলেন : এ কুরআন পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময় আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ থেকে অবতারিত। এর বিধি-বিধান সত্য, এতে কোন প্রকার সন্দেহ সংশয় নেই।



আল্লাহ তা‘আলা বলেন,



(وَإِنَّه۫ لَكِتٰبٌ عَزِيْزٌ لا ‏- لَّا يَأْتِيْهِ الْبَاطِلُ مِنْمبَيْنِ يَدَيْهِ وَلَا مِنْ خَلْفِه۪ ط تَنْزِيْلٌ مِّنْ حَكِيْمٍ حَمِيْدٍ)‏



“এবং এটা অবশ্যই এক মহিমাময় গ্রন্থ। কোন মিথ্যা এতে অনুপ্রবেশ করবে না- অগ্র হতেও নয়, পশ্চাত হতেও নয়। এটা প্রজ্ঞাময়, প্রশংসনীয় আল্লাহর নিকট হতে অবতীর্ণ।” (সূরা হা-মীম আস্ সাজদাহ্ ৪১ : ৪১-৪২)



আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন,



(وَاِنَّھ۫ لَتَنْزِیْلُ رَبِّ الْعٰلَمِیْنَﰏﺚنَزَلَ بِھِ الرُّوْحُ الْاَمِیْنُﰐﺫعَلٰی قَلْبِکَ لِتَکُوْنَ مِنَ الْمُنْذِرِیْنَﰑﺫبِلِسَانٍ عَرَبِیٍّ مُّبِیْنٍﰒ)



“নিশ্চয়ই এ কুরআন জগতসমূহের প্রতিপালক হতে অবতীর্ণ। জিব্রাঈল এটা নিয়ে অবতরণ করেছে তোমার হৃদয়ে, যাতে তুমি সতর্ককারী হতে পার। (অবতীর্ণ করা হয়েছে) সুস্পষ্ট আরবি ভাষায়।” (সূরা আশ্ শু‘আরা- ২৬ : ১৯২-১৯৫)



(فَاعْبُدِ اللّٰهَ.... الْخَالِصُ)



এখানে আল্লাহ তা‘আলা তাঁর বান্দাদেরকে এ নির্দেশ প্রদান করছেন যে, তারা যেন একনিষ্ঠভাবে বিশুদ্ধচিত্তে একমাত্র তাঁরই ইবাদত করে এবং তাঁর সাথে অন্য কাউকে শরীক বা অংশীদার না করে। কেননা তিনি ব্যতীত ইবাদতের যোগ্য আর কেউ নেই। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,



(وَمَآ أُمِرُوْآ إِلَّا لِيَعْبُدُوا اللّٰهَ مُخْلِصِيْنَ لَهُ الدِّيْنَ)



“তাদেরকে এছাড়া কোন নির্দেশ করা হয়নি যে, তারা বিশুদ্ধচিত্তে একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর এবাদত করবে।” (সূরা আল বাইয়্যিনাহ ৯৮ : ৫)



সুতরাং আল্লাহ তা‘আলা ব্যতীত আর কারো ইবাদত করা যাবে না। এমনকি নাবী-রাসূলগণেরও না। বরং নাবী-রাসূলগণের দেখানো পদ্ধতিতে আল্লাহ তা‘আলার ইবাদত করতে হবে। এটা মূলত আল্লাহ তা‘আলারই ইবাদত। আল্লাহ তা‘আলার বাণী :



(قُلْ إِنْ كُنْتُمْ تُحِبُّوْنَ اللّٰهَ فَاتَّبِعُوْنِيْ يُحْبِبْكُمُ اللّٰهُ)



“তুমি বলে দাও, যদি তোমরা আল্লাহকে ভালবাস তবে আমার অনুসরণ কর। তাহলে আল্লাহ তোমাদেরকে ভালবাসবেন ।” (সূরা আলি ইমরান ৩ : ৩১)



আর ইবাদত কবূল হওয়ার জন্য প্রধানত দুটি শর্ত রয়েছে। এ দুটি শর্ত সঠিকভাবে আদায় না করলে ইবাদত কবূল হবে না।



১. إخلاص العبادة لله وحده



একনিষ্ঠভাবে একমাত্র আল্লাহ তা‘আলার উপাসনা করা। অর্থাৎ ইবাদত কেবলমাত্র আল্লাহ তা‘আলার জন্যই হতে হবে, অন্য কারো জন্য নয়। আল্লাহ তা‘আলা ব্যতীত যত মা‘বূদ রয়েছে সকলেই ভ্রান্ত।



২. متابعة لسنة الرسول



ইবাদত রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর দেখানো পদ্ধতিতে হতে হবে। অর্থাৎ রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যেভাবে ইবাদত করেছেন ও করতে বলেছেন ঠিক সেভাবেই আল্লাহ তা‘আলার ইবাদত করতে হবে।



আয়াতে دين অর্থ ইবাদত ও আনুগত্য এবং إخلاص অর্থ বিশুদ্ধচিত্তে একমাত্র আল্লাহ তা‘আলার সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে নেক আমল করা। এ আয়াতটি নিয়্যাত ওয়াজিব ও তাতে ইখলাস থাকা জরুরী হওয়ার একটি দলীল। হাদীসেও খালেস নিয়্যাতের গুরুত্ব সম্পর্কে বলা হয়েছে। প্রত্যেক আমলের ফলাফল নিয়্যাতের ওপর নির্ভরশীল। (সহীহ বুখারী হা. ১) আর এ নিয়্যাত হবে মনে মনে, মুখে উচ্চারণ করে নয়। কেননা মুখে উচ্চারণ করে নিয়্যাত করার কোন প্রমাণ নেই। তবে হাজ্জের নিয়্যাত ব্যতীত, কেননা হাজ্জের নিয়্যাত সশব্দে মুখে উচ্চারণ করে বলতে হয়।



এরপর আল্লাহ তা‘আলা মক্কার মুশরিকদের গাইরুল্লাহর ইবাদত করার কারণ বর্ণনা করছেন, যে কারণ আমাদের দেশের একশ্রেণির মুসলিম নামধারী মাযার পূজারীদের মাঝে বিদ্যমান। তাদেরকে অন্যান্য মা‘বূদের ইবাদত করার কারণ জিজ্ঞাসা করা হলে তারা বলত : আমরা মূলত এদের ইবাদত করি না, আমরা কেবল এদের মাধ্যমে আল্লাহ তা‘আলার নৈকট্য লাভ করতে চাই। যার ফলে আমরা তাদের উপাসনা করি। তাই আল্লাহ তা‘আলা ও ইবাদতের মাঝে কোন মাযারে শায়িত ব্যক্তি, পীর, দরবেশ ও ওলী-আওলিয়ার মধ্যস্থতা স্থাপন করা যাবে না, বরং সরাসরি আল্লাহ তা‘আলার ইবাদত করতে হবে এবং সরাসরি তাঁর কাছে চাইতে হবে।



এরপর আল্লাহ তা‘আলা ঐ সকল মুশরিকদের কথার উত্তর দিচ্ছেন যারা বলে- আল্লাহ তা‘আলার সন্তান রয়েছে। যেমন মুশরিকরা বলত- ফেরেশতারা আল্লাহ তা‘আলার কন্যা। ইয়াহূদীরা বলত, উযায়ের (আঃ) আল্লাহ তা‘আলার পুত্র। তাদের এ কথা খণ্ডন করতে গিয়ে আল্লাহ তা‘আলা বলেন : আল্লাহ তা‘আলা সন্তান গ্রহণ করার ইচ্ছা করলে তাঁর সৃষ্টির মধ্য থেকে যাকে ইচ্ছা তিনি সন্তান মনোনীত করতেন অর্থাৎ তারা যা নির্বাচন করে এমনটি নয় বরং তিনি চাইলে তাঁর পছন্দ মতো সন্তান গ্রহণ করতে পারতেন।



আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন :



(قُلْ اِنْ کَانَ لِلرَّحْمٰنِ وَلَدٌﺣ فَاَنَا اَوَّلُ الْعٰبِدِیْنَ)



“বল : দয়াময় আল্লাহর কোন সন্তান থাকলে আমিই হতাম তাঁর উপাসকগণের সর্বপ্রথম।” (সূরা যুখরুফ ৪৩ : ৮১)



সুতরাং আল্লাহ তা‘আলা সন্তান-সন্ততি, স্ত্রী-পরিজন গ্রহণ করা থেকে সম্পূর্ণ পবিত্র। তিনি এক ও তাঁর কোনই অংশীদার নেই।



আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয় :



১. কুরআন আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ থেকে অবতারিত কিতাব। এর বিধি-বিধান সত্য।

২. আল্লাহ তা‘আলা ব্যতীত অন্য কারো ইবাদত করা যাবে না।

৩. ইবাদত হতে হবে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর দেখানো পদ্ধতিতে।

৪. আল্লাহ তা‘আলা সর্বপ্রকার সন্তান-সন্ততি, স্ত্রী-পরিজন ও অংশীদার থেকে সম্পূর্ণ পবিত্র।

৫. আল্লাহ তা‘আলা ও তাঁর ইবাদত করার মাঝে কোন মধ্যস্থতা অবলম্বন করা যাবে না।


তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)


তাফসীর: হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “রাসূলুল্লাহ (সঃ) নফল রোযা এমন পর্যায়ক্রমে রেখে চলতেন যে, আমরা ধারণা করতাম, তিনি বুঝি রোযা রাখা বন্ধ আর করবেনই না। আবার কখনো কখনো এমনও হতো যে, তিনি পরপর বেশ কিছু দিন রোযা রাখতেনই না। শেষ পর্যন্ত আমরা ধারণা করতাম যে, তিনি বুঝি (নফল) রোযা আর রাখবেনই না। আর তিনি প্রতি রাত্রে সূরায়ে বানী ইসরাঈল ও সূরায়ে যুমার পাঠ করতেন। (এ হাদীসটি ইমাম নাসাঈ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)

১-৪ নং আয়াতের তাফসীর:

আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা খবর দিচ্ছেন যে, এই কুরআন কারীম তাঁরই কালাম এবং তিনিই এটা অবতীর্ণ করেছেন। এটা যে সত্য এতে সন্দেহের কোন অবকাশ নেই। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ ... (আরবী) অর্থাৎ “এটা জগতসমূহের প্রতিপালকের পক্ষ হতে অবতারিত। যা বিশ্বস্ত আত্মা (হযরত জিবরাঈল আঃ) আনয়ন করেছে এবং তোমার (নবীর সঃ) অন্তরের উপর অবতীর্ণ করেছে, যাতে তুমি সতর্ককারী হয়ে যাও। এটা স্পষ্ট আরবী ভাষায় অবতারিত।” মহামহিমান্বিত আল্লাহ আরো বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “অবশ্যই এটা মহা সম্মানিত কিতাব। এর সামনে হতে ও পিছন হতে বাতিল বা মিথ্যা আসতে পারে না। এটা বিজ্ঞানময়, প্রশংসিত (আল্লাহ)-এর পক্ষ হতে অবতারিত।` (৪১:৪১-৪২)।

মহান আল্লাহ এখানে বলেনঃ এই কিতাব অবতীর্ণ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময় আল্লাহর নিকট হতে, যিনি তাঁর কথায়, কাজে, শরীয়তে, তকদীর ইত্যাদি সব কিছুতেই মহা বিজ্ঞানময়।

আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ হে নবী (সঃ)! আমি তোমার নিকট এই কিতাব যথাযথভাবে অবতীর্ণ করেছি। সুতরাং তুমি নিজে আল্লাহর ইবাদত কর এবং তার আনুগত্যে বিশুদ্ধ চিত্ত হয়ে যাও। আর সারা দুনিয়াবাসীকে তুমি এদিকেই আহ্বান কর। কেননা, আল্লাহ ছাড়া ইবাদতের যোগ্য আর কেউই নেই। তিনি অংশীবিহীন ও অতুলনীয়। দ্বীনে খালেস অর্থাৎ তাওহীদের সাক্ষ্যদানের মোগ্য তিনিই। অবিমিশ্র আনুগত্য তাঁরই প্রাপ্য।

এরপর মহান আল্লাহ বলেনঃ যারা আল্লাহর পরিবর্তে অন্যকে অভিভাবকরূপে গ্রহণ করে, তারা বলেঃ আমরা তো তাদের পূজা এজন্যেই করি যে, তারা আমাদেরকে আল্লাহর সান্নিধ্যে এনে দিবে। যেমন তারা ফেরেশতাদেরকে আল্লাহর নৈকট্য লাভকারী মনে করে তাদের পূজা অর্চনা শুরু করে দেয়, এই মনে করে যে, তারা তাদেরকে আল্লাহর নৈকট্য লাভ করিয়ে দিবে। এর ফলে তাদের রুযী রোযগারে বরকত লাভ হবে। তাদের উদ্দেশ্য এটা নয় যে, কিয়ামতের দিন ফেরেশতারা তাদের মর্যাদা বাড়িয়ে দিবে এবং আল্লাহর নৈকট্য লাভ করাবে। কেননা, তারা তো কিয়ামতকে বিশ্বাসই করতো না। এটাও বলা হয়েছে যে, তারা তাদেরকে তাদের সুপারিশকারী মনে করতো। অজ্ঞতার যুগে তারা হজ্ব করতে যেতো এবং ‘লাব্বায়েক’ শব্দ উচ্চারণ করতে করতে বলতোঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে আল্লাহ! আমরা আপনার দরবারে হাযির আছি। আপনার কোন অংশীদার নেই, শুধু এক অংশীদার রয়েছে, তার মালিকও আপনিই এবং সে যত কিছুর মালিক সেগুলোরও প্রকৃত মালিক একমাত্র আপনিই।” পূর্বযুগীয় ও পরযুগীয় সমস্ত মুশরিকদের আকীদা বা বিশ্বাস এটাই ছিল এবং সমস্ত নবী এ বিশ্বাস খণ্ডন করে তাদেরকে এক আল্লাহর পথে আহ্বান করেছেন। এ আকীদা মুশরিকরা বিনা দলীল প্রমাণেই গড়ে নিয়েছিল, যাতে আল্লাহ তা'আলা অসন্তুষ্ট ছিলেন। আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি প্রত্যেক উম্মতের মধ্যে রাসূল পাঠিয়েছি এ ঘোষণা দেয়ার জন্যেঃ তোমরা আল্লাহরই ইবাদত করো ও তাগুত (শয়তান) হতে দূরে থাকো।” (১৬:৩৬) আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তোমার পূর্বে আমি যে রাসূলই পাঠিয়েছি তার কাছেই আমি অহী করেছিঃ আমি ছাড়া কোন মা'বূদ নেই, সুতরাং তোমরা আমারই ইবাদত কর।”(২১:২৫) সাথে সাথে আল্লাহ তা'আলা এ ঘোষণা দিয়েছেন যে, আকাশে যত ফেরেশতা রয়েছে, তারা যত বড়ই মর্যাদার অধিকারী হোক না কেন, তারা সবাই আল্লাহর সামনে সম্পূর্ণরূপে অসহায় ও শক্তিহীন। সবাই তাঁর দাস। তাদের তো এ অধিকারও নেই যে, তারা কারো সুপারিশের জন্যে মুখ খুলতে পারে। এটা তাদের সম্পূর্ণ ভুল আকীদা যে; ফেরেশতারা এ অধিকার রাখবেন, যেমন রাজা-বাদশাহদের দরবারে আমীর উমারা থাকে এবং তারা কারো জন্যে সুপারিশ করলে তার কাজ সফল হয়ে থাকে। আল্লাহ তা'আলা তাদের এ ভুল আকীদাকে এভাবে খণ্ডন করছেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তোমরা আল্লাহর জন্যে মিসাল বর্ণনা করো না।” (১৬:৭৪) তিনি তো বে-মিসাল বা অতুলনীয়। তার সাথে কারো তুলনা চলে না। তিনি এটা হতে বহু ঊর্ধ্বে রয়েছেন।

মহান আল্লাহ বলেনঃ তারা যে বিষয়ে নিজেদের মধ্যে মতভেদ করছে আল্লাহ তার ফায়সালা করে দিবেন। প্রত্যেককেই তিনি কিয়ামতের দিন তার কাজের প্রতিফল প্রদান করবেন।


আল্লাহ পাক বলেনঃ “ঐ দিন আমি সকলকে একত্রিত করবো, অতঃপর ফেরেশতাদেরকে বলবোঃ এরা কি তোমাদেরই ইবাদত করতে? তারা উত্তরে বলবেঃ আপনি তো মহান ও পবিত্র, আপনিই আমাদের অভিভাবক, তারা আমাদের নয়, বরং জ্বিনদের উপাসনা করতো। তাদের অধিকাংশই তাদেরই উপর ঈমান রাখতো।”

মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ যে মিথ্যাবাদী ও কাফির আল্লাহ তাকে সৎপথে পরিচালিত করেন না। অর্থাৎ যাদের উদ্দেশ্য হলো আল্লাহর উপর মিথ্যা আরোপ করা এবং যাদের অন্তরে আল্লাহর নিদর্শনাবলী এবং দলীল প্রমাণাদির উপর কুফরী দৃঢ়মূল হয়ে গেছে তাদেরকে তিনি সুপথে পরিচালিত করেন না।

এরপর আল্লাহ তা'আলা ঐ সব লোকের বিশ্বাসকে খণ্ডন করছেন যারা তার সন্তান সাব্যস্ত করে, যেমন মক্কার মুশরিকরা বলতো যে, ফেরেশতারা আল্লাহর কন্যা, ইয়াহূদীরা বলতো, উযায়ের (আঃ) আল্লাহর পুত্র এবং খৃষ্টানরা বলতো যে, ঈসা (আঃ) আল্লাহর পুত্র (নাউযুবিল্লাহ)। তাদের এ আকীদা খণ্ডন করতে গিয়ে আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ আল্লাহ সন্তান গ্রহণ করার ইচ্ছা করলে তাঁর সৃষ্টির মধ্যে যাকে ইচ্ছা তিনি সন্তান মনোনীত করতেন। অর্থাৎ তারা যা ধারণা করছে, বিষয়টি তার বিপরীত হতো। এখানে শর্ত ঘটনার জন্যেও নয় এবং সম্ভাবনার জন্যেও নয়। বরং এটা সম্ভবই নয় যে, আল্লাহর সন্তান হবে। এখানে উদ্দেশ্য হলো শুধু ঐ লোকদের অজ্ঞতার বর্ণনা দেয়া। যেমন তিনি অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “যদি আমি এই নিকৃষ্ট বিষয়ের (সন্তান গ্রহণের) ইচ্ছা করতাম তবে অবশ্যই আমার নিকটবর্তীদের (মধ্য) হতেই গ্রহণ করতাম, যদি আমাকে (সন্তান গ্রহণ) করতেই হতো।”(২১:১৭) আর এক আয়াতে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “যদি রহমানের (আল্লাহর) সন্তান হতো তবে সর্বপ্রথম আমিই হতাম ওর উত্তরাধিকারী।”(৪৩:৮১) সুতরাং এসব আয়াতে শর্ত ঘটে যাওয়াকে অসম্ভব বলা হয়েছে। এটা ঘটা বা ঘটে যাওয়ার সম্ভাবনাকে বুঝাবার জন্যে বলা হয়নি। ভাবার্থ এই যে, এটাও হতে পারে না এবং ওটাও হতে পারে না। আল্লাহ তা'আলা এসব হতে সম্পূর্ণরূপে মুক্ত ও পবিত্র। তিনি আল্লাহ এক, প্রবল পরাক্রমশালী। সব কিছুই তার অধীনস্থ। সবাই তার কাছে বাধ্য, অপারগ, মুখাপেক্ষী, অভাবী এবং শক্তিহীন। তিনি কারো মুখাপেক্ষী নন। সবারই উপর তাঁর কর্তৃত্ব ও আধিপত্য রয়েছে। যালিমদের এই আকীদা ও অজ্ঞতাপূর্ণ কথা হতে তার সত্তা সম্পূর্ণরূপে পবিত্র।





সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।