সূরা সোয়াদ (আয়াত: 68)
হরকত ছাড়া:
أنتم عنه معرضون ﴿٦٨﴾
হরকত সহ:
اَنْتُمْ عَنْهُ مُعْرِضُوْنَ ﴿۶۸﴾
উচ্চারণ: আনতুম ‘আনহু মু‘রিদূন।
আল বায়ান: ‘তোমরা তা থেকে বিমুখ হয়ে আছ।’
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৬৮. যা থেকে তোমরা মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছ।
তাইসীরুল ক্বুরআন: যাত্থেকে তোমরা মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছ।
আহসানুল বায়ান: (৬৮) যা থেকে তোমরা মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছ।
মুজিবুর রহমান: যা হতে তোমরা মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছ।
ফযলুর রহমান: যা থেকে তোমরা মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছ।”
মুহিউদ্দিন খান: যা থেকে তোমরা মুখ ফিরিয়ে নিয়েছ।
জহুরুল হক: "এ থেকে তোমরা বিমুখ হচ্ছ।
Sahih International: From which you turn away.
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ৬৮. যা থেকে তোমরা মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছ।
তাফসীর:
-
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (৬৮) যা থেকে তোমরা মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছ।
তাফসীর:
-
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ৬৫-৭০ নম্বর আয়াতের তাফসীর :
সূরায় কয়েকজন নাবী ও তাঁদের মু‘জিযাহ আলোচনা করার পর নাবী মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর কথা নিয়ে এসেছেন, এটাই হল মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য। এসব ঘটনা থেকে সকল যুগের কাফিররা যেন জেনে নেয়, নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) একজন সত্য নাবী, অতএব যারা তাঁকে প্রত্যাখ্যান করবে তারা সুস্পষ্ট পথভ্রষ্ট। তাই অন্যান্য নাবীদের মত নাবী মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সকলকে আহ্বান করলেন- আল্লাহ তা‘আলাই একমাত্র প্রভু, তিনি ব্যতীত সঠিক কোন মা‘বূদ নেই। আল্লাহ তা‘আলা তাঁর রাসূলকে নির্দেশ দিচ্ছেন যে, তিনি যেন বলে দেন : তোমরা আমার ব্যাপারে যে ধারণা পোষণ করো তা সম্পূর্ণ ভুল। আমি তো শুধুমাত্র তোমাদেরকে সতর্ককারী। তা এ বিষয়ে যে, আল্লাহ তা‘আলা তিনিই একমাত্র উপাস্য, তিনি ব্যতীত ইবাদত পাওয়ার যোগ্য আর কেউ নেই। তিনি একক, তাঁর কোন শরীক নেই এবং তিনি সকল কিছুর ওপর ক্ষমতাবান। তিনি আকাশসমূহ ও জমিনের এবং এতদুভয়ের মধ্যে যা কিছু আছে সকল কিছুর মালিক। তোমরা তাঁরই ইবাদত করো।
(هُوَ نَبَؤٌا عَظِيْمٌ)
‘এটা এক মহা সংবাদ’ সুদ্দী বলেন : মহা সংবাদ হল কুরআন। সূরা নাবার শুরুতে উল্লেখ রয়েছে মহা সংবাদ হল কিয়ামত।
(بِالْمَلَإِ الْأَعْلٰي)
অর্থ উর্ধ্ব জগত, ঊর্ধ্ব জগতে রয়েছে ফেরেশতারা। তারা আদম (আঃ)-এর সৃষ্টি নিয়ে মন্তব্য করে বলেছিল :
( قَالُوْآ أَتَجْعَلُ فِيْهَا مَنْ يُّفْسِدُ فِيْهَا وَيَسْفِكُ الدِّمَا۬ءَ ج وَنَحْنُ نُسَبِّحُ بِحَمْدِكَ وَنُقَدِّسُ لَكَ)
তারা বলল আপনি এমন কাউকে সৃষ্টি করবেন, যারা সেখানে বিবাদ করবে এবং রক্তপাত ঘটাবে? অথচ আমরাই তো আপনার প্রশংসা-গুণগান করছি এবং আপনারই পবিত্রতা বর্ণনা করে থাকি। (সূরা বাকারাহ ২ : ৩০) এসব আমি জানলাম কিভাবে? এ কুরআন আমার প্রতি ওয়াহী করা না হলে এ খবর আমি জানতে পারতাম না। সুতরাং রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নবুওয়াতের উজ্জ্বল প্রমাণ হল তিনি এসব বিষয় জেনেছেন ওয়াহীর মাধ্যমে, যা জানার অন্য কোন উপায় নেই। তাই নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) একজন রাসূল ও স্পষ্ট সতর্ককারী।
আদম (আঃ)-কে সৃষ্টির ব্যাপারে ফেরেশতারা যে মন্তব্য করেছে সে কথাকে এখানে اختصام বলে ব্যক্ত করা হয়েছে। যার শাব্দিক অর্থ ‘ঝগড়া করা’ অথচ বাস্তব ঘটনা হল ফেরেশতারা কোন ঝগড়া করেনি তারা কেবল পূর্ব অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেছে। এসব কথা ও উত্তর ঝগড়ার মত হয়ে গিয়েছিল বলে একে اختصام বলা হয়েছে। মুআয (রাঃ) হতে বর্ণিত তিনি বলেন : একদা রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমাদেরকে ফজরের সালাত আদায় করতে আটকিয়ে রাখলেন। এমনকি সূর্যের শিং উদয় হওয়ার উপক্রম এমন দেখতে পেলাম। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) দ্রুত আমাদের কাছে বেরিয়ে আসলেন, সালাতের ইকামত দেয়া হল, সালাত সংক্ষিপ্ত করে পড়লেন। সালাম ফেরানোর পর বললেন : তোমরা কাতারবন্দি হয়েই থাক। অতঃপর তিনি আমাদের দিকে মুখ ফিরিয়ে বললেন : ফজরের সালাত থেকে কেন আটকে রেখেছিলাম তার সংবাদ তোমাদেরকে অচিরেই দেব। আমার যতটুকু তাকদীরে ছিল ততটুকু সালাত গত রাতে আদায় করেছি। সালাতে ঘুমিয়ে গিয়েছিলাম তারপর সজাগ হয়ে দেখলাম উত্তম আকৃতিতে আমি রবের পাশে। তিনি বললেন : হে মুহাম্মাদ! ঊর্ধ্ব জগতে কী বিষয়ে বিবাদ করে জানো? আমি বললাম : হে আল্লাহ তা‘আলা আমি জানি না, এরূপ তিনবার বললাম। আমি দেখলাম, আল্লাহ তা‘আলার হাতের তালু আমার কাঁধের ওপর এবং আমার বুকে তাঁর হাতের আঙ্গুলের শিতলতা অনুভব করতে পারছি। আমার কাছে সব প্রকাশ পেয়ে গেল এবং আমি সব জেনে নিলাম। তিনি বললেন : হে মুহাম্মাদ! কী বিষয়ে ঊর্ধ্ব জগতে বিবাদ করেছে? আমি বললাম, গুনাহ মোচনের ব্যাপারে। ......(পূর্ণ হাদীস) (তিরমিযী হা. ৩২৩৫, মুসনাদে আহমাদ হা. ১৬৬২১, সহীহ)
আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয় :
১. রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) একজন সতর্ককারী।
২. আদম (আঃ)-কে সৃষ্টির ক্ষেত্রে ফেরেশতারা নিষেধ করেনি, বরং পূর্ব অভিজ্ঞতা থেকে মন্তব্য করেছে।
৩. সঠিক পথের অনুসরণ করতে হবে। সত্য থেকে বিমুখ থাকা যাবে না।
৪. আল্লাহ তা‘আলার হাত রয়েছে, তার প্রমাণ পেলাম।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: ৬৫-৭০ নং আয়াতের তাফসীর:
আল্লাহ্ তা'আলা স্বীয় নবী (সঃ)-কে নির্দেশ দিচ্ছেন যে, তিনি যেন কাফির ও মূশরিকদেরকে বলেনঃ আমার সম্পর্কে তোমাদের ধারণা সম্পূর্ণ ভুল। আমি তো তোমাদেরকে শুধু সতর্ককারী। আল্লাহ্, যিনি এক ও শরীক বিহীন, তিনি ছাড়া ইবাদতের যোগ্য আর কেউই নেই। তিনি একক। তিনি সব কিছুর উপরই পূর্ণ ক্ষমতাবান। সব কিছুই তার অধীনস্থ। তিনি যমীন, আসমান এবং এতদুভয়ের মধ্যস্থিত সব জিনিসেরই মালিক। সমস্ত ব্যবস্থাপনা তাঁরই হাতে। তিনি বড় মর্যাদাবান এবং মহা পরাক্রমশালী। তাঁর এই শ্রেষ্ঠত্ব, বড়ত্ব এবং মহাপরাক্রম সত্ত্বেও তিনি মহা ক্ষমাশীলও বটে।
মহান আল্লাহ্ বলেনঃ হে নবী (সঃ)! তুমি বলঃ এটা এক মহা সংবাদ। তা হলো আল্লাহ্ তা'আলার আমাকে তোমাদের নিকট রাসূলরূপে প্রেরণ করা। কিন্তু হে উদাসীনের দল! এরপরেও তোমরা আমার বর্ণনাকৃত প্রকৃত ও সত্য বিষয়গুলো হতে বিমুখ হয়ে রয়েছো! এটাও বলা হয়েছে যে, “এটা বড় জিনিস” দ্বারা কুরআন কারীমকে বুঝানো হয়েছে।
মহামহিমান্বিত আল্লাহ্ বলেন, হে নবী (সঃ)! তুমি তাদেরকে আরো বলঃ “হযরত আদম (আঃ)-এর ব্যাপারে ফেরেশতাদের মধ্যে যে বাদানুবাদ হয়েছিল, যদি আমার কাছে অহী না আসতো তবে সে ব্যাপারে আমি কিছু জানতে পারতাম কি? ইবলীসের হযরত আদম (আঃ)-কে সিজদা না করা, মহামহিমান্বিত আল্লাহর সামনে শয়তানের বিরুদ্ধাচরণ করা এবং নিজেকে বড় মনে করা ইত্যাদির খবর আমি কি করে দিতে পারতাম?”
হযরত মুআয (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ একদা রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) ফজরের নামাযে আসতে খুবই বিলম্ব করেন। এমনকি সূর্যোদয়ের প্রায় সময় হয়ে আসে। অতঃপর তিনি খুব তাড়াহুড়া করে বেরিয়ে আসেন। নামাযের ইকামত দেয়া হয় এবং তিনি খুব হালকাভাবে নামায পড়িয়ে দেন। সালাম ফিরানোর পর বলেনঃ “তোমরা যেভাবে আছ ঐ ভাবেই বসে থাকো।” তারপর আমাদের দিকে মুখ করে তিনি বলেনঃ “রাত্রে আমি তাহাজ্জুদের নামাযের জন্যে উঠেছিলাম। নামায পড়তে পড়তে আমাকে তন্দ্রা পেয়ে বসে। শেষ পর্যন্ত আমি জেগে উঠি এবং আমার প্রতিপালককে সুন্দর আকৃতিতে দেখতে পাই। তিনি আমাকে বলেন, “ঊর্ধ্বলোকে ফেরেশতারা এ সময় কি নিয়ে বাদানুবাদ করছে তা জান কি?” আমি উত্তর দিলামঃ হে আমার প্রতিপালক! না, আমি জানি না। এভাবে তিনবার প্রশ্ন ও উত্তর হলো। অতঃপর মহামহিমান্বিত আল্লাহ আমার দুই কাঁধের মাঝে হাত রাখলেন। এমন কি আমি তাঁর অঙ্গুলীসমূহের শীতলতা অনুভব করলাম এবং এরপর আমার কাছে সব কিছু উজ্জ্বল হয়ে গেল। আবার আমাকে জিজ্ঞেস করা হলোঃ “আচ্ছা, এখন বলতো, ঊর্ধ্বলোকে কি নিয়ে বাদানুবাদ হচ্ছে?” আমি উত্তরে বললামঃ গুনাহর কাফফারা সম্বন্ধে আলাপ আলোচনা চলছে। পুনরায় তিনি প্রশ্ন করলেনঃ “বলতো কাফফারা (পাপ মোচনের পন্থা) কি কি?” আমি জবাব দিলামঃ জামাআতে নামায পড়ার জন্যে পা উঠিয়ে চলা, নামাযের পরে মসজিদে বসে থাকা এবং মনে না চাওয়া সত্ত্বেও পূর্ণভাবে অযু করা। মহান আল্লাহ্ আবার জিজ্ঞেস করলেনঃ “কিভাবে মর্যাদা বৃদ্ধি পায়?” আমি উত্তরে বললামঃ (দরিদ্রদেরকে) খাদ্য খেতে দেয়া, নম্রভাবে কথা বলা এবং রাত্রে যখন লোকেরা ঘুমিয়ে থাকে তখন উঠে নামায পড়া। তখন আমার প্রতিপালক আমাকে বললেনঃ “কি চাইবে চাও।” আমি বললামঃ আমি আপনার কাছে ভাল কাজ করার, মন্দ কাজ পরিত্যাগ করার এবং দরিদ্রদেরকে ভালবাসার তাওফীক প্রার্থনা করছি। আর এই প্রার্থনা করছি যে, আপনি আমাকে ক্ষমা করবেন, আমার প্রতি সদয় হবেন এবং যখন কোন কওমকে ফিত্নায় ফেলার ইচ্ছা করবেন, ঐ ফিতায় আমাকে না ফেলেই উঠিয়ে নিবেন। আর আমি আপনার কাছে আপনার মহব্বত, যে আপনাকে মহব্বত করে তার মহব্বত এবং এমন কাজের মহব্বত প্রার্থনা করছি যা আমাকে আপনার মহব্বতের নিকটবর্তী করে। এরপর রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বলেনঃ “এটা সম্পূর্ণরূপে সত্য। এটা তোমরা নিজেরা পড়বে ও অন্যদেরকে শিখাবে।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন এবং এটা বিখ্যাত স্বপ্নের হাদীস। কেউ কেউ বলেন যে, এটা জাগ্রত অবস্থার ঘটনা। কিন্তু এটা ভুল কথা। সঠিক কথা এই যে, এটা স্বপ্নের ঘটনা)
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।