আল কুরআন


সূরা সোয়াদ (আয়াত: 57)

সূরা সোয়াদ (আয়াত: 57)



হরকত ছাড়া:

هذا فليذوقوه حميم وغساق ﴿٥٧﴾




হরকত সহ:

هٰذَا ۙ فَلْیَذُوْقُوْهُ حَمِیْمٌ وَّ غَسَّاقٌ ﴿ۙ۵۷﴾




উচ্চারণ: হা-যা- ফাল ইয়াযূকূহু হামীমুওঁগাছছা-ক।




আল বায়ান: এমনই, সুতরাং তারা এটি আস্বাদন করুক, ফুটন্ত পানি ও পুঁজ।




আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৫৭. এটাই। কাজেই তারা আস্বাদন করুক ফুটন্ত পানি ও পুঁজ।(১)




তাইসীরুল ক্বুরআন: সত্য বটে, এসব (আল্লাহদ্রোহীদের জন্য), কাজেই সেখানে তারা পান করুক ফুটন্ত পানি ও রক্ত পুঁজ।




আহসানুল বায়ান: (৫৭) এ হল ফুটন্ত পানি ও পুঁজ। সুতরাং ওরা তা আস্বাদন করুক।[1]



মুজিবুর রহমান: এটা সীমালংঘনকারীদের জন্য। সুতরাং তারা আস্বাদন করুক ফুটন্ত পানি ও পুঁজ।



ফযলুর রহমান: এটা (সীমালংঘনকারীদের জন্য); তারা তা আস্বাদন করুক: গরম পানি আর পুঁজ।



মুহিউদ্দিন খান: এটা উত্তপ্ত পানি ও পঁূজ; অতএব তারা একে আস্বাদন করুক।



জহুরুল হক: এই-ই! অতএব তারা এটি আস্বাদন করুক -- ফুটন্ত-গরম ও হিমশীতল, --



Sahih International: This - so let them taste it - is scalding water and [foul] purulence.



তাফসীরে যাকারিয়া

অনুবাদ: ৫৭. এটাই। কাজেই তারা আস্বাদন করুক ফুটন্ত পানি ও পুঁজ।(১)


তাফসীর:

(১) মূলে غساق শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। আভিধানিকগণ এর কয়েকটি অর্থ বর্ণনা করেছেন। এর একটি অর্থ হচ্ছে, শরীর থেকে বের হয়ে আসা রক্ত, পুঁজ ইত্যাদি জাতীয় নোংরা তরল পদার্থ এবং চোখের পানিও এর অন্তর্ভুক্ত। দ্বিতীয় অর্থ হচ্ছে, অত্যন্ত ও চরম ঠাণ্ডা জিনিস। তৃতীয় অর্থ হচ্ছে, চরম দুৰ্গন্ধযুক্ত পচা জিনিস। কিন্তু প্রথম অর্থেই এ শব্দটির সাধারণ ব্যবহার হয়, যদিও বাকি দু'টি অর্থও আভিধানিক দিক দিয়ে নির্ভুল। [তাবারী]


তাফসীরে আহসানুল বায়ান

অনুবাদ: (৫৭) এ হল ফুটন্ত পানি ও পুঁজ। সুতরাং ওরা তা আস্বাদন করুক।[1]


তাফসীর:

[1] حَمِيْمٌও غَسَّاقٌ هَذَا শব্দের খবর। অর্থাৎ, هَذَا حَمِيْمٌ وَ غَسَّاقٌ فَلْيَذُوْقُوْهُ এ হল উত্তপ্ত পানি ও পুঁজ; সুতরাং তারা তা আস্বাদন করুক। حَمِيْمٌ হল ফুটন্ত গরম পানি, যা তাদের নাড়ী-ভুঁড়ি কেটে দেবে। غَسَّاقٌ হল জাহান্নামীদের চর্ম থেকে নির্গত পুঁজ ও রক্ত। অথবা এমন ঠান্ডা পানি যা পান করা অত্যন্ত কঠিন হবে।


তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ


তাফসীর: ৫০-৬৪ নম্বর আয়াতের তাফসীর :



(جَنّٰتِ عَدْنٍ مُّفَتَّحَةً لَّھُمُ .... مَا لَھ۫ مِنْ نَّفَادٍﮅﺊ)



এ আয়াতগুলোতে আল্লাহ তা‘আলা তাঁর সৎ বান্দাদের জন্য পরকালে যে উত্তম পুরস্কার ও সুন্দর সুন্দর বাসস্থান ও চিরস্থায়ী জান্নাত তৈরী করে রেখেছেন সে সম্পর্কে আলোচনা করছেন। জান্নাতের দরজাগুলো তাদের জন্য সর্বদা খোলা থাকবে। তারা সেখানে আসনে হেলান দিয়ে থাকবে এবং বিভিন্ন প্রকার ফলমূলের জন্য তাদেরকে নির্দেশ প্রদান করবেন যারা তাদের নিকট পান পাত্র নিয়ে তাদেরকে প্রদক্ষিণ করবে। তাদের জন্য সেখানে আনতনয়না হুরগণ থাকবে এবং তাদেরকে সেখানে এমন রিযিক দান করা হবে যা কোন দিন শেষ হবে না। এ সম্পর্কে সূরা আস্ সা-ফ্ফা-ত-সহ অন্যান্য সূরাতেও আলোচনা করা হয়েছে।



(ذَاﺚ وَاِنَّ لِلطّٰغِیْنَ لَشَرَّ مَاٰ.... لَحَقٌّ تَخَاصُمُ اَھْلِ النَّارِﮏﺟ)



আলোচ্য আয়াতগুলোতে জাহান্নামীদের অবস্থা, জাহান্নামে কেমন হবে এবং তারা যে সেখানে পরস্পর তর্ক-বিতর্ক করবে সে কথা আলোচনা করা হয়েছে।



যারা আল্লাহ তা‘আলার বিরুদ্ধাচরণ করবে ও সীমালঙ্ঘন করবে তারা নিকৃষ্টতম স্থান জাহান্নামে প্রবেশ করবে। এটা হবে তাদের আবাসস্থল, আর তা খুবই নিকৃষ্ট একটি জায়গা। তারা সেখানে পান করবে ফুটন্ত পানি ও পুঁজ, এরূপ আরো কঠিন শাস্তি তারা সেখানে ভোগ করবে। এ সম্পর্কে সূরা আস্ সা-ফ্ফা-ত, সূরা ইউনুস-সহ অন্যান্য সূরাতেও আলোচনা করা হয়েছে।



এরপর আল্লাহ তা‘আলা বর্ণনা দিচ্ছেন যে, জাহান্নামীরা জাহান্নামে পরস্পর বিতর্ক ও ঝগড়ায় লিপ্ত হবে। নেতারা অনুসারীদেরকে বলবে, এতো তোমাদের মতো আরেকটি দল যারা তোমাদের মতই জাহান্নামে দগ্ধ হবে, এদের জন্য কোন অভিনন্দন নেই। তখন অনুসারীরাও তাদের নেতাদেরকে অনুরূপ কথা বলবে। এভাবে তারা পরস্পর কথা কাটাকাটি করবে। তারা নেতাদের জন্য দ্বিগুণ শাস্তি দাবী করবে।



(كُنَّا نَعُدُّهُمْ مِّنَ الْأَشْرَارِ)



‘আমরা যেসব লোককে খারাপ বলে গণ্য করতাম’ অর্থাৎ কাফির-মুশরিকরা জাহান্নামে প্রবেশ করার পর বলবে : আমরা যাদেরকে দুনিয়াতে খারাপ মনে করতাম তথা মুহাম্মাদের সাথী, যারা ঈমান এনেছিল, তারা দুর্বল ছিল, সমাজে তাদেরকে গণ্যই করতাম না তাদেরকে তো আমরা জাহান্নামী মনে করতাম। কারণ তারা মুহাম্মাদের অনুসরণ করে পথভ্রষ্ট হয়ে গেছে বলে বিশ্বাস করতাম, তারা কোথায়? আল্লাহ তা‘আলা তাদেরকে তিরস্কার করে বলবেন : তাদেরকে কি জাহান্নামে দেখতে পাচ্ছ? জাহান্নামীরা বলবে, তাহলে কি দুনিয়াতে তাদেরকে নিয়ে ঠাট্টাই করেছি, নাকি আমাদের দৃষ্টিতে সমস্যা যে কারণে আমরা তাদেরকে দেখতে পাচ্ছি না।



আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয় :



১. জান্নাতের দরজা রয়েছে এ কথা জানা গেল।

২. জান্নাতের অফুরন্ত নেয়ামত কোনদিন শেষ হবে না।

৩. জাহান্নাম একটি অতি নিকৃষ্ট আবাসস্থল, যা কাফির-মুশরিকদের জন্য প্রস্তুত করে রাখা হয়েছে।

৪. জাহান্নামীদের খাদ্য হিসেবে থাকবে গরম পানি, পুঁজ ইত্যাদি।

৫. যারা মু‘মিনদেরকে নিয়ে দুনিয়াতে ঠাট্টা করত যে, এরা পথভ্রষ্ট তারা জাহান্নামে প্রকৃত সত্য অনুধাবন করতে পারবে।


তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)


তাফসীর: ৫৫-৬৪ নং আয়াতের তাফসীর:

আল্লাহ তা'আলা পূর্ববর্তী আয়াতগুলোতে সৎলোকদের অবস্থা বর্ণনা করেছেন। এখানে তিনি অসৎ ও পাপী লোকদের অবস্থার বর্ণনা দিচ্ছেন, যারা আল্লাহর হুকুম অমান্য করতো। তিনি বলেন যে, এই সব সীমালংঘনকারীর জন্যে রয়েছে জাহান্নাম এবং তা অতি নিকৃষ্টতম স্থান। সেখানে তাদেরকে আগুন চতুর্দিক থেকে পরিবেষ্টন করবে। সুতরাং ওটা খুবই নিকৃষ্ট বিশ্রামস্থল।

(আরবী) ঐ পানিকে বলা হয় যার উষ্ণতা ও তাপ শেষ সীমায় পৌঁছে গেছে। আর (আরবী) হলো এর বিপরীত। অর্থাৎ যার শীতলতা চরমে পৌঁছে গেছে। সুতরাং একদিকে আগুনের তাপের শাস্তি এবং অন্য দিকে শীতলতার শাস্তি! এই ধরনের নানা প্রকারের জোড়া জোড়া শাস্তি তারা ভোগ করবে যা একে অপরের বিপরীত হবে।

হযরত আবু সাঈদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যদি এক বালতি গাসসাক দুনিয়ায় বইয়ে দেয়া হয় তবে সমস্ত দুনিয়াবাসী দুর্গন্ধময় হয়ে যাবে।”( এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)

হযরত কা'ব আহবার (রাঃ) বলেন যে, গাসসাক নামক জাহান্নামে একটি নহর রয়েছে যাতে সর্প, বৃশ্চিক ইত্যাদির বিষ জমা হয় এবং ওগুলো গরম করা হয়। ওর মধ্যে জাহান্নামীদের ডুব দেয়ানো হবে। ফলে তাদের দেহের সমস্ত চামড়া ও গোশত অস্থি হতে খসে পড়বে এবং পদনালী পর্যন্ত লটকে যাবে। তারা তাদের ঐ চামড়া ও গোশতগুলোকে এমনভাবে হেঁচড়িয়ে টানতে থাকবে যেমনভাবে কেউ তার কাপড়কে হেঁচড়িয়ে টেনে থাকে। (এটা ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন) মোটকথা ঠাণ্ডার শাস্তি আলাদাভাবে হবে এবং গরমের শাস্তি আলাদাভাবে হবে। কখনো গরম পানি পান করানো হবে এবং কখনো যাককুম বৃক্ষ ভক্ষণ করানো হবে। কখনো আগুনের পাহাড়ের উপর চড়ানো হবে, আবার কখনো আগুনের গর্তে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেয়া হবে।

অতঃপর আল্লাহ তা'আলা জাহান্নামীদের পরস্পর ঝগড়া করার বর্ণনা দিচ্ছেন যে তারা একে অপরকে খারাপ বলবে ও তিরস্কার করবে। যেমন অন্য জায়গায় আল্লাহ্ তা'আলা বলেনঃ ... (আরবী) অর্থাৎ যখনই কোন দল জাহান্নামে প্রবেশ করবে তখন অপর দলকে তারা সালামের পরিবর্তে লানত দিবে। (৭:৩৮) এইভাবে এক দল অন্য দলের উপর দোষ চাপাবে। যে দলটি প্রথমে জাহান্নামে চলে গেছে ঐ দলটি দ্বিতীয় দলকে জাহান্নামের দারোগার সাথে আসতে দেখে দারোগাকে বলবেঃ “তোমাদের সাথে যে দলটি রয়েছে তাদের জন্যে অভিনন্দন নেই, তারা তো জাহান্নামে জ্বলবে। তখন আগমনকারী অনুসারীরা বলবেঃ “তোমাদের জন্যেও তো অভিনন্দন নেই। তোমরাই তো আমাদেরকে মন্দ কাজের দিকে আহ্বান করতে, যার ফল এই দাড়ালো? কত নিকৃষ্ট এই আবাসস্থল!'

তারা আরো বলবেঃ “হে আমাদের প্রতিপালক! যে এটা আমাদের সম্মুখীন করেছে জাহান্নামে, তার শাস্তি আপনি দ্বিগুণ বর্ধিত করুন!' যেমন অন্য জায়গায় মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “পরের দুষ্কর্মশীলরা পূর্বের দুষ্কর্মশীলদের সম্পর্কে আরয করবেঃ হে আমাদের প্রতিপালক! এরাই আমাদেরকে পথভ্রষ্ট করেছিল, সুতরাং আপনি তাদেরকে দ্বিগুণ শাস্তি প্রদান করুন! আল্লাহ্ তা'আলা উত্তরে বলবেনঃ প্রত্যেকের জন্যে দ্বিগুণ শাস্তি রয়েছে, কিন্তু তোমরা জান না।” (৭:৩৮)

কাফিররা জাহান্নামে মুমিনদেরকে দেখতে না পেয়ে পরস্পর বলাবলি করবেঃ ‘আমাদের কি হলো যে, আমরা যেসব লোককে মন্দ বলে গণ্য করতাম তাদেরকে দেখতে পাচ্ছি না?' হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, আবু জেহেল বলবেঃ “বিলাল (রাঃ), আম্মার (রাঃ), সুহায়েব (রাঃ) প্রমুখ লোকগুলো কোথায়? তাদেরকে তো দেখতে পাচ্ছি না?” মোটকথা, প্রত্যেক কাফির এ কথাই বলবেঃ “আমাদের কি হলো যে, আমরা যাদেরকে মন্দ বলে গণ্য করতাম তাদেরকে দেখছি না? তবে কি আমরা তাদেরকে অহেতুক ঠাট্টা-বিদ্রুপের পাত্র মনে করতাম? না, বরং তাদের ব্যাপারে আমাদের দৃষ্টি বিভ্রম ঘটেছে। তাদের সম্পর্কে আমাদের ধারণা ঠিকই ছিল। তারা জাহান্নামের মধ্যেই রয়েছে। কিন্তু এমন কোন দিকে রয়েছে যেখানে আমাদের দৃষ্টি পড়ছে না।” তৎক্ষণাৎ জান্নাতীদের পক্ষ থেকে উত্তর আসবে, যেমন মহা মহিমান্বিত আল্লাহ্ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “জান্নাতবাসীরা জাহান্নামীদেরকে সম্বোধন করে বলবেঃ আমাদের প্রতিপালক আমাদেরকে যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন আমরা তো তা সত্য পেয়েছি। তোমাদের প্রতিপালক তোমাদেরকে যা বলেছিলেন তোমরাও তা সত্য পেয়েছে। কি? তারা বলবেঃ হ্যা। অতঃপর জনৈক ঘোষণাকারী তাদের মধ্যে ঘোষণা করবেঃ আল্লাহর লানত যালিমদের উপর। (৭:৪৪-৪৯)

এরপর মহান আল্লাহ্ বলেনঃ হে নবী (সাঃ)! আমি যে তোমাকে খবর দিচ্ছি যে, জাহান্নামীরা পরস্পর ঝগড়া ও বাদ-প্রতিবাদ করবে এটা নিশ্চিত সত্য। এতে সন্দেহের কোন অবকাশই নেই।





সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।