সূরা সোয়াদ (আয়াত: 32)
হরকত ছাড়া:
فقال إني أحببت حب الخير عن ذكر ربي حتى توارت بالحجاب ﴿٣٢﴾
হরকত সহ:
فَقَالَ اِنِّیْۤ اَحْبَبْتُ حُبَّ الْخَیْرِ عَنْ ذِکْرِ رَبِّیْ ۚ حَتّٰی تَوَارَتْ بِالْحِجَابِ ﴿ٝ۳۲﴾
উচ্চারণ: ফাকা-লা ইন্নীআহবাবতুহুব্বাল খাইরি ‘আন যিকরি রাববী হাত্তা-তাওয়া-রাত বিলহিজা-ব।
আল বায়ান: তখন সে বলল, ‘আমি তো আমার রবের স্মরণ থেকে বিমুখ হয়ে ঐশ্বর্যের প্রেমে মগ্ন হয়ে পড়েছি, এদিকে সূর্য পর্দার আড়ালে চলে গেছে।*
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৩২. তখন তিনি বললেন, আমি তো আমার রবের স্মরণ হতে বিমুখ হয়ে ঐশ্বৰ্য প্রীতিতে মগ্ন হয়ে পড়েছি, এদিকে সূর্য পর্দার আড়ালে চলে গেছে;
তাইসীরুল ক্বুরআন: তখন সে বলল- আমি আমার প্রতিপালকের স্মরণ হতে ধন-সম্পদকে বেশি ভালবেসে ফেলেছি, এমনকি সূর্য (রাতের) পর্দায় লুকিয়ে গেছে।
আহসানুল বায়ান: (৩২) সে বলল, ‘আমি তো আমার প্রতিপালকের স্মরণের উপর সম্পদ-প্রীতিকে প্রাধান্য দিয়ে ফেলেছি --এদিকে সূর্য অস্ত গেছে;
মুজিবুর রহমান: তখন সে বললঃ আমিতো আমার রবের স্মরণ হতে বিমুখ হয়ে ঐশ্বর্য প্রীতিতে মগ্ন হয়ে পড়েছি, এদিকে সূর্য অস্তমিত হয়ে গেছে।
ফযলুর রহমান: তখন সে বলল, “আমি তো আমার প্রভুর স্মরণ (বিকেলের নামায) ভুলে সম্পদের (ঘোড়াগুলোর) মোহে আকৃষ্ট হয়েছি। যার ফলে সূর্য পর্দার আড়ালে লুকিয়ে গিয়েছে (এবং নামাযের সময় শেষ হয়ে গিয়েছে)।
মুহিউদ্দিন খান: তখন সে বললঃ আমি তো আমার পরওয়ারদেগারের স্মরণে বিস্মৃত হয়ে সম্পদের মহব্বতে মুগ্ধ হয়ে পড়েছি-এমনকি সূর্য ডুবে গেছে।
জহুরুল হক: তখন তিনি বললেন -- "আমি অবশ্য ভালবস্তুর ভাললাগাকে ভাল পেয়ে গেছি আমার প্রভুকে স্মরণ রাখার জন্যে," -- যে পর্যন্ত না তারা পর্দার আড়ালে অদৃশ্য হয়ে গেল।
Sahih International: And he said, "Indeed, I gave preference to the love of good [things] over the remembrance of my Lord until the sun disappeared into the curtain [of darkness]."
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ৩২. তখন তিনি বললেন, আমি তো আমার রবের স্মরণ হতে বিমুখ হয়ে ঐশ্বৰ্য প্রীতিতে মগ্ন হয়ে পড়েছি, এদিকে সূর্য পর্দার আড়ালে চলে গেছে;
তাফসীর:
-
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (৩২) সে বলল, ‘আমি তো আমার প্রতিপালকের স্মরণের উপর সম্পদ-প্রীতিকে প্রাধান্য দিয়ে ফেলেছি --এদিকে সূর্য অস্ত গেছে;
তাফসীর:
-
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ৩০-৪০ নম্বর আয়াতের তাফসীর :
এ আয়াতগুলোতে আল্লাহ তা‘আলা তাঁর প্রিয় নাবী দাঊদ (আঃ)-এর সন্তান সুলাইমান (আঃ) ও তাঁকে প্রদত্ত মু‘জিযাহ সম্পর্কে আলোচনা করেছেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন : সে ছিল উত্তম বান্দা এবং অতিশয় আল্লাহ তা‘আলা অভিমুখী। তাই সূরা নামলের ১৫-৪৪ নম্বর আয়াতের তাফসীরে দেখেছি তিনি এসব ক্ষমতা, জীব-জন্তুর ভাষা বুঝতে পারা ইত্যাদি নেয়ামত পেয়েও কোনরূপ গর্ব-অহঙ্কার করেননি বরং তিনি আল্লাহ তা‘আলার কাছে এসব নেয়ামতের কৃতজ্ঞতার তাওফীক চেয়ে দু‘আ করলেন যাতে তিনি সৎআমল করতে পারেন এবং তাকে সৎ বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত করেন।
- صَافِنَاتٌ صافن বা صافناة
এর মানে এমন অশ্বরাজি যা তিন পায়ে ভর করে দাঁড়ায়। جياد- جواد এর বহুবচন, অর্থ হল দ্রুতগামী অশ্বরাজি। অর্থাৎ সুলাইমান (আঃ)-এর সামনে জিহাদের জন্য পালিত উৎকৃষ্ট দ্রুতগামী অশ্বরাজি পরিদর্শনের জন্য পেশ করা হলো। بِالْعَشِيِّ যোহর বা আসর থেকে সূর্য অস্তমিত হওয়া পর্যন্ত সময়কে বলা হয়, আমরা যাকে বিকাল বলে থাকি।
أَحْبَبْتُ (ভালবেসে ফেলেছি) এর অর্থ اثرت (প্রাধান্য দিয়ে ফেলেছি) আর عن এখানে علي এর অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। (এর দ্বিতীয় অর্থ হলো : আমি তো আমার প্রতিপালকের স্মরণ হতে বিমুখ হয়ে সম্পদ-প্রীতিতে মগ্ন হয়ে পড়েছি।) আর تَوَارَتْ এর স্ত্রী লিঙ্গ কর্তৃকারক হলো الشمس (সূর্য), যা আয়াতে পূর্বে উল্লেখ করা হয়নি; কিন্তু বাগধারায় তা অনুমেয়। সারমর্ম এই যে, অশ্বরাজি পরিদর্শন করতে গিয়ে সুলাইমান (আঃ) আসর সালাতের সময় অতিবাহিত করে ফেলেন অথবা তখন তিনি যে অযীফা পাঠ করতেন তা ছুটে যায়। যার জন্য তিনি অনুতপ্ত হলেন এবং বলতে লাগলেন যে, আমি অশ্বরাজির মহব্বতে এমন মগ্ন হয়ে গেছি যে, সূর্য অস্তমিত হয়ে গেল এবং আমি আল্লাহ তা‘আলার স্মরণ, সালাত বা অযীফা থেকে অমনোযোগী হয়ে থেকে গেলাম। সুতরাং তার প্রায়শ্চিত্তস্বরূপ তিনি সমস্ত অশ্বরাজি আল্লাহ তা‘আলার রাস্তায় কুরবানি করে দিয়েছিলেন। ইমাম শাওকানী ও ইবনু কাসীর (রহঃ) এ তাফসীরকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন। অনেকে এ বর্ণনাকেও যুক্তিযুক্ত মনে করে না। তাই এসব থেকে বিরত থাকাই ভাল।
সিংহাসনের ওপর একটি নিষ্প্রাণ দেহ প্রাপ্তির ঘটনা :
আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
(وَلَقَدْ فَتَنَّا سُلَيْمٰنَ)
‘সুলাইমান (আঃ)-কে আমি পরীক্ষা করেছিলাম।’ এ পরীক্ষা কী ছিল, সিংহাসনে রাখা নি®প্রাণ দেহটি কিসের ছিল? তা সিংহাসনে রাখার অর্থ কী? এসব বিবরণ কুরআন বা সহীহ হাদীসে বিদ্যমান নেই। তবে কোন কোন মুফাসসির সহীহ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত একটি ঘটনাকে আলোচ্য আয়াতের তাফসীর বলে সাব্যস্ত করেছেন।
একবার সুলাইমান (আঃ) স্বীয় মনোভাব ব্যক্ত করলেন যে, আজ রাতে আমি আমার (৯০ বা ১০০ জন) সকল স্ত্রীর সঙ্গে সহবাস করব যাতে প্রত্যেকের গর্ভে একটি সন্তান জন্মগ্রহণ করে, যারা আল্লাহ তা‘আলার রাস্তায় জিহাদ করবে। কিন্তু তিনি এ মনোভাব ব্যক্ত করে ইনশাআল্লাহ তা‘আলা বলেননি। ফলে স্ত্রীদের মধ্যে কেবল একজন গর্ভবতী হলেন এবং তার গর্ভ থেকে একটি মৃত এবং অসম্পূর্ণ সন্তান ভূমিষ্ট হলো। নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলছেন : যদি সুলাইমান (আঃ) ইনশাআল্লাহু তা‘আলা বলতেন তাহলে তার প্রত্যেক স্ত্রীর গর্ভে সন্তান আসতো। (সহীহ বুখারী হা. ৩৪২৪, সহীহ মুসলিম হা. ১৬৫৪) ইনশাআল্লাহ তা‘আলা না বলাই ছিল সুলাইমান (আঃ)-এর ফিতনা, আর সিংহাসনের ওপর নিক্ষিপ্ত দেহ হলো ঐ অসম্পূর্ণ বাচ্চা। তবে এ আয়াতের সাথে উক্ত হাদীসকে তাফসীর হিসেবে উল্লেখ করা অনুমানভিত্তিক। হাদীসটি সহীহ বুখারীর, কিন্তু ইমাম বুখারী একবারও তা অত্র আয়াতের তাফসীরে নিয়ে আসেননি। অথচ জিহাদ, নাবীদের বর্ণনা, শপথসমূহ ইত্যাদি অধ্যায়ে বার বার নিয়ে এসেছেন। সুতরাং যদি উক্ত পরীক্ষা দ্বারা হাদীসে বর্ণিত ঘটনা উদ্দেশ্য হত তাহলে তিনি একবার হলেও নিয়ে আসতেন।
ইস্রাঈলী বর্ণনাগুলোতে আরো সাজিয়ে উল্লেখ করা হয় যে, সুলাইমান (আঃ) একটি আংটি দিয়ে রাজ্য পরিচালনা করতেন। একদা শয়তান আংটি হাতিয়ে নিয়ে নিজেই সুলাইমান সেজে সিংহাসনে বসে। ৪০ দিন পর সুলাইমান (আঃ) আংটি উদ্ধার করে সিংহাসন ফিরে পান। সিংহাসনে বসা ঐ শয়তানের রাখা কোন বস্তুকে এখানে নি®প্রাণ দেহ বলা হয়েছে।
বস্তুত এসবই বানোয়াট কাহিনী। ইবনু কাসীর (রহঃ) বলেন : আহলে কিতাবের একটি দল সুলাইমান (আঃ)-কে নাবী বলে স্বীকারই করতে চায় না। তাহলে তাদের দ্বারা কী আশা করা যায়।
আল্লাহ তা‘আলা সুলাইমান (আঃ)-কে অনেক মু‘জিযাহ তথা বৈশিষ্ট্য দান করেছেন। তন্মধ্যে বায়ু প্রবাহ, পক্ষীকুল ও জিন-শয়তানকে অনুগত করে দেয়া, পিপীলিকার ভাষা বুঝতে পারা ইত্যাদি সূরা সাবার ১২-১৪ নম্বর, নামলের ১৫-৪৪ নম্বর আয়াতে মোট পাঁচটি মু‘জিযাহ উল্লেখ করা হয়েছে। আলোচ্য আয়াতগুলোতের সাথে সম্পৃক্ত বাকী দুটি উল্লেখ করা হল-
(৬) আল্লাহ তা‘আলা তাকে এমন সাম্রাজ্য দান করেছিলেন যা পৃথিবীর আর কাউকে দান করেননি। যেমন ৩৫ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে। উল্লেখ্য যে, নাবীদের কোন দু‘আ আল্লাহ তা‘আলার অনুমতি ব্যতিরেখে হয় না। সে হিসেবে সুলাইমান (আঃ)-এর এ দু‘আটি আল্লাহ তা‘আলার অনুমতিক্রমেই হয়েছিল। কেবল ক্ষমতা লাভের উদ্দেশ্যে তিনি এ দু‘আ করেননি বরং এর পেছনে আল্লাহ তা‘আলার বিধানাবলী বাস্তবায়ান করা এবং তাওহীদ প্রতিষ্ঠা করাই ছিল মূল উদ্দেশ্য। সহীহ হাদীসে এসেছে, আবূ হুরাইরাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত, নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন : একটি দুষ্ট জিন গতরাত্রে আমার ওপর বাড়াবাড়ি করেছিল সালাতে বাধা দেয়ার জন্য। আল্লাহ তা‘আলা আমাকে তার ওপর ক্ষমতা দান করেছিলেন তখন আমি ইচ্ছা করেছিলাম যে, মাসজিদের খুটির সাথে তাকে বেঁধে রাখি যাতে সকালে তোমরা তাকে দেখতে পাও। তখন আমার ভাই সুলাইমান যে দু‘আ করেছিল সে কথা আমার মনে পড়ে গেল। তিনি দু‘আ করেছিলেন,
(قَالَ رَبِّ اغْفِرْ لِيْ وَهَبْ لِيْ مُلْكًا لَّا يَنْۭبَغِيْ لِأَحَدٍ مِّنْۭ بَعْدِيْ)
“হে আমার রব! আমাকে ক্ষমা করুন এবং এমন এক রাজ্য দান করুন যার অধিকারী আমি ছাড়া আর কেউ না হয়।” (সহীহ বুখারী হা. ৪৮০৮, সহীহ মুসলিম হা. ৫৪১)
(৭) প্রাপ্ত অনুগ্রহরাজির হিসাব রাখা বা না রাখার অনুমতি প্রদান করা হয়েছে। সুলাইমান (আঃ)-এর রাজত্ব লাভের দু‘আ কবূল করার পরে তার প্রতি বায়ু, জিন, পক্ষীকুল ও জীব-জন্তুকে অনুগত করে দেন। অতঃপর বলেন : ‘এগুলো আমার অনুগ্রহ, অতএব তুমি (তা থেকে) কাউকে দান কর কিংবা নিজের জন্য রেখে দাও, তজ্জন্যে তোমাকে জবাবদিহি করতে হবে না।’ বস্তুত এটি ছিল সুলাইমান (আঃ)-এর আমানতদারী ও বিশ্বস্ততার প্রতি আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ থেকে প্রদত্ত একপ্রকার সনদ। পৃথিবীর কোন ব্যক্তির জন্য সরাসরি আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ থেকে এ ধরনের সত্যায়নপত্র নাযিল হয়েছে বলে জানা যায় না। অথচ এ মহান নাবী সম্পর্কে ইসলামের শত্রু ইয়াহূদ-খ্রিস্টানরা বাজে কথা রটনা করে থাকে।
আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয় :
১. আল্লাহ তা‘আলার ইবাদত বাদ দিয়ে দুনিয়ার কোন কাজ নিয়ে ব্যস্ত হওয়া যাবে না।
২. আল্লাহ তা‘আলার সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে কোন জিনিস পরিত্যাগ করলে আল্লাহ তা‘আলা তাঁর চেয়ে আরো উত্তম জিনিস দান করেন।
৩. একজন মু’মিন সকাল-সন্ধ্যায় আল্লাহ তা‘আলার ইবাদতে মশগুল থাকবে।
৪. এ আয়াতগুলোকে কেন্দ্র করে সুলাইমান (আঃ)-এর সম্পর্কে অনেক মিথ্যা ও বানোয়াট কাহিনী পাওয়া যায়, সে বিষয়ে আমাদের সতর্ক থাকা উচিত।
৫. আল্লাহ তা‘আলা তাঁর অনুগত বান্দাদেরকে দুনিয়াতেও মর্যাদার সাথে প্রতিষ্ঠিত রাখেন।
৬. সুলাইমান (আঃ) একজন নাবী ছিলেন, সেই সাথে বাদশাহও ছিলেন। তিনি যা ইচ্ছা তাই করতে পারতেন কিন্তু তারপরেও ন্যায় ছাড়া অন্যায় কিছু করেননি।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: ৩০-৩৩ নং আয়াতের তাফসীর:
আল্লাহ তা'আলা হযরত দাউদ (আঃ)-কে যে একটি বড় নিয়ামত দান করেছিলেন এখানে তারই বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যে, তিনি হযরত সুলাইমান (আঃ)-কে তাঁর নবুওয়াতের উত্তরাধিকারী করেছিলেন। এজন্যেই হযরত সুলাইমান (আঃ)-এর উল্লেখ করা হয়েছে। নচেৎ হযরত দাউদ (আঃ)-এর তো। আরো বহু সন্তান ছিল। দাসীরা ছাড়াও তার একশজন স্ত্রী ছিল। সুতরাং হযরত সুলাইমান (আঃ) হযরত দাউদ (আঃ)-এর নবুওয়াতের ওয়ারিশ হয়েছিলেন। যেমন মহান আল্লাহ অন্য আয়াতে বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “সুলাইমান (আঃ) দাউদ (আঃ)-এর ওয়ারিশ হলো।” (২৭:১৬) অর্থাৎ নবুওয়াতের ওয়ারিশ হলেন। হযরত দাউদ (আঃ)-এর পর হযরত সুলাইমান (আঃ) নবুওয়াত লাভ করেন।
মহান আল্লাহ বলেনঃ ‘সে ছিল উত্তম বান্দা এবং অতিশয় আল্লাহ অভিমুখী। অর্থাৎ তিনি বড়ই ইবাদতগুয়ার ছিলেন এবং খুব বেশী আল্লাহর দিকে ঝুঁকে পড়েছিলেন।
হযরত মাকহুল (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, যখন আল্লাহ তা'আলা হযরত দাউদ (আঃ)-কে দান করলেন সুলাইমান (আঃ)-কে তখন হযরত দাউদ (আঃ) হযরত সুলাইমান (আঃ)-কে প্রশ্ন করলেনঃ “হে আমার প্রিয় বৎস! আচ্ছা বল তোঃ সবচেয়ে উত্তম জিনিস কি?” তিনি জবাব দিলেনঃ “আল্লাহর পক্ষ হতে আগত চিত্ত-প্রশান্তি এবং ঈমান।” আবার জিজ্ঞেস করলেনঃ “সবচেয়ে মন্দ জিনিস কি?” উত্তরে তিনি বললেনঃ “ঈমানের পর কুফরী।” পুনরার প্রশ্ন করলেনঃ “সবচেয়ে মিষ্টি জিনিস কি?” তিনি উত্তর দিলেনঃ “আল্লাহর রহমত বা করুণা।` আবার প্রশ্ন করলেনঃ “সবচেয়ে শীতল জিনিস কি?” তিনি জবাবে বললেনঃ “আল্লাহ তা'আলার মানুষকে ক্ষমা করে দেয়া এবং মানুষের একে অপরকে মাফ করা।” তখন হযরত দাউদ (আঃ) হযরত সুলাইমান (আঃ)-কে বললেনঃ “তাহলে তুমি নবী।” (এটা ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)
হযরত সুলাইমান (আঃ)-এর রাজত্বের আমলে তাঁর সামনে তার ঘোড়াগুলো হাযির করা হয় যেগুলো ছিল খুবই দ্রুতগামী এবং ওগুলো তিন পায়ের উপর দাঁড়িয়ে থাকতো। একটি উক্তি এও আছে যে, এগুলো ছিল উড়ন্ত ঘোড়া, যেগুলোর সংখ্যা ছিল বিশ। ইবরাহীম তাইমী (রঃ) ঘোড়াগুলোর সংখ্যা বিশ হাজার বলেছেন। এসব ব্যাপারে সর্বাধিক সঠিক জ্ঞানের অধিকারী একমাত্র আল্লাহ।
সুনানে আবি দাউদে হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাবুক অথবা খায়বারের যুদ্ধ হতে ফিরে এসেছিলেন। তিনি বাড়ীতে প্রবেশ করেছেন এমন সময় প্রচণ্ড বেগে বাতাস বইতে শুরু করে। ফলে ঘরের এক কোণের পর্দা সরে যায়। ঐ জায়গায় হযরত আয়েশা (রাঃ)-এর খেলনার পুতুলগুলো রাখা ছিল। ওগুলোর প্রতি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর দৃষ্টি পড়লে তিনি হযরত আয়েশা (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করলেনঃ “ওগুলো কি?” তিনি জবাবে বললেনঃ “ওগুলো আমার পুতুল।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) দেখতে পান যে, মধ্যভাগে একটি ঘোড়ার মত কি যেন বানানো রয়েছে যাতে কাপড়ের তৈরী দুটি ডানাও লাগানো আছে। তিনি জিজ্ঞেস করলেনঃ “এটা কি?` উত্তরে হযরত আয়েশা (রাঃ) বললেনঃ “এটা ঘোড়া। তিনি আবার জিজ্ঞেস করলেনঃ “কাপড়ের তৈরী ওর উপরে দুই দিকে ও দুটো কি?” তিনি জবাব দিলেনঃ “এ দুটো ওর ডানা।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “ঘোড়াও ভাল এবং ডানা দুটিও উত্তম।” তখন হযরত আয়েশা (রাঃ) বললেনঃ “আপনি কি শুনেননি যে, হযরত সুলাইমান (আঃ)-এর ডানা বিশিষ্ট ঘোড়া ছিল?` একথা শুনে রাসূলুল্লাহ (সঃ) হেসে উঠলেন। এমনকি তাঁর শেষ দাঁতটিও দেখা গেল।
হযরত সুলাইমান (আঃ) ঘোড়াগুলোর দেখা শোনায় এমন ব্যস্ত হয়ে পড়লেন যে, তাঁর আসরের নামাযের খেয়ালই থাকলো না। নামাযের কথা তিনি সম্পূর্ণরূপে বিস্মরণ হয়ে গেলেন। যেমন রাসূলুল্লাহ (সঃ) খন্দকের যুদ্ধের সময় একদিন যুদ্ধে মগ্ন থাকার কারণে আসরের নামায পড়তে পারেননি। মাগরিবের নামাযের পর ঐ নামায আদায় করেন।
সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে রয়েছে যে, সূর্য ডুবে যাওয়ার পর হযরত উমার (রাঃ) কুরায়েশ কাফিরদেরকে মন্দ বলে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট আসলেন এবং বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমি তো আসরের নামায পড়তে পারিনি?` রাসূলুল্লাহ (সঃ) উত্তরে বললেনঃ “এখন পর্যন্ত আমিও নামায আদায় করতে সক্ষম হইনি।” অতঃপর তারা বাতহান নামক স্থানে গিয়ে অযু করলেন এবং সূর্য অস্তমিত হওয়ার পর আসরের নামায আদায় করলেন এবং পরে মাগরিবের নামায পড়লেন।
এটাও হতে পারে যে, হযরত সুলাইমান (আঃ)-এর দ্বীনে যুদ্ধ-ব্যস্ততার কারণে নামাযকে বিলম্বে আদায় করা জায়েয ছিল। তাঁর ঘোড়াগুলো হয়তো যুদ্ধের ঘোড়া ছিল যেগুলোকে একমাত্র ঐ উদ্দেশ্যেই রাখা হয়েছিল। যেমন কোন কোন আলেম একথাও বলেছেন যে, সালাতে খাওফ (ভয়ের সময়ের নামায) জারী হওযার পূর্বে এই অবস্থাই ছিল। যখন তরবারী চৰ্চ করে ওঠে এবং শত্রু সৈন্য এসে ভিড়ে যায়, আর নামাযের জন্যে রুকু-সিজদা করার সুযোগই হয় না তখন এই হুকুম রয়েছে। যেমন সাহাবীগণ (রাঃ) তাসতির’ বিজয়ের সময় এরূপ করেছিলেন। কিন্তু আমাদের প্রথম উক্তিটিই সঠিক। কেননা, এরপরেই হযরত সুলাইমান (আঃ)-এর এই ঘোড়াগুলোকে পুনরায় তলব করা ইত্যাদির বর্ণনা রয়েছে। তিনি ওগুলোকে কেটে ফেলার নির্দেশ দেন এবং বলেনঃ “এগুলো তো আমাকে আমার প্রতিপালকের ইবাদত হতে উদাসীন করে ফেলেছে। সুতরাং এগুলো রাখা চলবে না।` অতঃপর ঐ ঘোড়াগুলোর পা ও গলদেশ কেটে ফেলা হয়। কিন্তু হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, হযরত সুলাইমান (আঃ) শুধু ঘোড়াগুলোর কপালের লোমগুলো ইত্যাদির উপর হাত ফিরিয়েছিলেন। ইমাম ইবনে জারীরও (রঃ) এই উক্তিটি গ্রহণ করেছেন যে, বিনা কারণে জন্তুকে কষ্ট দেয়া অবৈধ। ঐ জন্তুগুলোর কোনই দোষ ছিল না যে, তিনি ওগুলো কেটে ফেলবেন। কিন্তু আমি বলি যে, হয়তো তাদের শরীয়তে এ কাজ বৈধ ছিল, বিশেষ করে ঐ সময়, যখন ঐগুলো আল্লাহর স্মরণে বাধা সৃষ্টি করলো এবং নামাযের ওয়াক্ত সম্পূর্ণরূপে চলেই গেল। তাহলে তার ঐ ক্রোধ আল্লাহর জন্যেই ছিল। আর এর ফলে আল্লাহ তা'আলা তাঁকে ওগুলোর চেয়ে দ্রুতগামী ও হালকা জিনিস দান করেছিলেন। অর্থাৎ বাতাসকে তিনি তার অনুগত করে দিয়েছিলেন।
হ্যরত কাতাদা (রঃ) ও হযরত আবুদ দাহমা (রঃ) প্রায়ই হজ্ব করতেন। তারা বলেন, একবার এক গ্রামে একজন বেদুইনের সঙ্গে আমাদের সাক্ষাৎ হয়। সে বলে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমার হাত ধরে আমাকে বহু কিছু দ্বীনী শিক্ষা দিয়েছিলেন। তাতে এও ছিলঃ “তুমি আল্লাহকে ভয় করে যে জিনিস ছেড়ে দিবে, আল্লাহ তা'আলা তোমাকে তদপেক্ষা উত্তম জিনিস দান করবেন।` (এটা ইমাম আহমাদ (রঃ) স্বীয় মুসনাদে বর্ণনা করেছেন)
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।