সূরা সোয়াদ (আয়াত: 3)
হরকত ছাড়া:
كم أهلكنا من قبلهم من قرن فنادوا ولات حين مناص ﴿٣﴾
হরকত সহ:
کَمْ اَهْلَکْنَا مِنْ قَبْلِهِمْ مِّنْ قَرْنٍ فَنَادَوْا وَّ لَاتَ حِیْنَ مَنَاصٍ ﴿۳﴾
উচ্চারণ: কাম আহলাকনা-মিন কাবলিহিম মিন কারনিন ফানা-দাওঁ ওয়ালা-তাহীনা মানা-স।
আল বায়ান: তাদের পূর্বে আমি কত প্রজন্মকে ধ্বংস করেছি; তখন তারা আর্তচিৎকার করেছিল, কিন্তু তখন পলায়নের কোন সময় ছিল না।
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৩. এদের আগে আমরা বহু জনগোষ্ঠী ধ্বংস করেছি; তখন তারা আর্ত চীৎকার করেছিল। কিন্তু তখন পরিত্রাণের কোনই সময় ছিল না।
তাইসীরুল ক্বুরআন: তাদের পূর্বে আমি কত মানবগোষ্ঠীকে ধ্বংস করে দিয়েছি, অবশেষে তারা (ক্ষমা লাভের জন্য) আর্তচিৎকার করেছিল, কিন্তু তখন পরিত্রাণ লাভের আর কোন অবকাশই ছিল না।
আহসানুল বায়ান: (৩) এদের পূর্বে আমি কত জনপদ ধ্বংস করেছি;[1] তখন ওরা সাহায্যের জন্য চীৎকার করেছিল। কিন্তু ওদের পরিত্রাণের কোনই উপায় ছিল না।[2]
মুজিবুর রহমান: এদের পূর্বে আমি কত জনগোষ্ঠী ধ্বংস করেছি, তখন তারা আর্ত চিৎকার করেছিল। কিন্তু তখন পরিত্রাণের কোনই উপায় ছিলনা।
ফযলুর রহমান: তাদের পূর্বে আমি কত জনগোষ্ঠীকে ধ্বংস করে দিয়েছি! তখন তারা চিৎকার করেছে, কিন্তু পলায়নের কোন সময় ছিল না।
মুহিউদ্দিন খান: তাদের আগে আমি কত জনগোষ্ঠীকে ধ্বংস করেছি, অতঃপর তারা আর্তনাদ করতে শুরু করেছে কিন্তু তাদের নিষ্কৃতি লাভের সময় ছিল না।
জহুরুল হক: এদের পূর্বে মানবগোষ্ঠীর কতকে যে আমরা ধ্বংস করেছি! তখন তারা চীৎকার করেছিল। কিন্ত সেই সময়ে পরিত্রাণের আর উপায় ছিল না।
Sahih International: How many a generation have We destroyed before them, and they [then] called out; but it was not a time for escape.
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ৩. এদের আগে আমরা বহু জনগোষ্ঠী ধ্বংস করেছি; তখন তারা আর্ত চীৎকার করেছিল। কিন্তু তখন পরিত্রাণের কোনই সময় ছিল না।
তাফসীর:
-
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (৩) এদের পূর্বে আমি কত জনপদ ধ্বংস করেছি;[1] তখন ওরা সাহায্যের জন্য চীৎকার করেছিল। কিন্তু ওদের পরিত্রাণের কোনই উপায় ছিল না।[2]
তাফসীর:
[1] যারা এদের থেকে অনেক পরাক্রমশালী ও শক্তিশালী ছিল। কিন্তু অবিশ্বাস ও অস্বীকার করার জন্য তাদেরকে মন্দ ফল ভোগ করতে হয়।
[2] অর্থাৎ, তারা আল্লাহর শাস্তি প্রত্যক্ষ করার পর সাহায্যের জন্য ডেকেছিল এবং তওবা করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিল। কিন্তু তখন না ছিল তওবা কবুল হওয়ার সময়, আর না ছিল পালানোর কোন পথ। ফলে না তাদের ঈমান উপকারে আসে, আর না পালিয়ে শাস্তি থেকে রক্ষা পায়। لات শব্দটি আসলে কেবল لا এখানে ت অক্ষরটি বাড়তি সংযুক্ত হয়েছে; যেমন ثَمَّ তে যুক্ত হয়ে ثَمَّةَ বলা হয়। مَنَاص - نَاصَ يَنُوْصُ এর ক্রিয়ামূল, যার অর্থ হল পলায়ন করা ও পিছে হটা।
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: নামকরণ :
প্রত্যেকটি সূরার নামকরণের পেছনে একটি কারণ থাকে। যে নামে নামকরণ করা হয় হয়তো সে সম্পর্কে উক্ত সূরাতে আলোচনা করা হয়েছে নতুবা ঐ শব্দটি ঐ সূরাতে ব্যবহার হয়েছে। এ সূরার শুরুতেই সোয়াদ শব্দটি ব্যবহার হয়েছে। ফলে একে সোয়াদ নামে নামকরণ করা হয়েছে।
অত্র সূরায় পূর্ববর্তী কয়েকটি অবাধ্য জাতির ধ্বংসের বিবরণ, সকল বাতিল মা‘বূদ বর্জন করত এক আল্লাহর ইবাদত করাটা কাফিরদের কাছে আর্শ্চযের মনে হওয়া, পূর্বের নাবীদের মত নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে ধৈর্য ধারণ করার নির্দেশ, দাঊদ (আঃ) ও তাঁর সাথে সংশ্লিষ্ট একটি বিচারের ঘটনা, সুলাইমান (আঃ) ও তাঁর পরীক্ষার কথা, আইয়ুব (আঃ), ইবরাহীম, ইসহাক, ইয়া‘কূব, ইয়াসা‘ ও যুলকিফালসহ অনেক নাবীর বিষয়ে আলোচনা করা হয়েছে। সূরার শেষে মানব জাতির পিতা আদম (আঃ)-কে সকল ফেরেশতা দ্বারা সিজদা করার নির্দেশ ও ইবলিসের অমান্য করা প্রসঙ্গ আলোচনা করা হয়েছে।
১-৩ নম্বর আয়াতের তাফসীর :
صٓ (সোয়াদ)- এ জাতীয় “হুরূফুল মুক্বাত্বআত” বা বিচ্ছিন্ন অক্ষর সম্পর্কে পূর্বে সূরা বাকারার শুরুতে আলোচনা করা হয়েছে। এগুলোর আসল উদ্দেশ্য একমাত্র আল্লাহ তা‘আলাই ভাল জানেন।
আল্লাহ তা‘আলা এখানে কুরআনের শপথ করে বলছেন : কুরআন উপদেশে পরিপূর্ণ। এতে তোমাদের জন্য সর্বপ্রকার নসীহত ও এমন কথা আলোচনা করা হয়েছে যার দ্বারা তোমাদের ইহকাল ও পরকাল উভয়ই শুধরে যাবে।
আবার কেউ ذي الذكر-এর অর্থ বলেছেন : কুরআন মর্যাদা ও মাহাত্ম্যের অধিকারী। ইমাম ইবনু কাসীর বলেন, দু’টি অর্থই ঠিক। কারণ কুরআন মর্যাদারও অধিকারী এবং মু’মিন ও মুত্তাক্বীদের জন্য উপদেশ ও শিক্ষণীয় গ্রন্থও বটে। আল্লাহর বাণী :
(لَقَدْ أَنْزَلْنَآ إِلَيْكُمْ كِتٰبًا فِيْهِ ذِكْرُكُمْ ط أَفَلَا تَعْقِلُوْنَ)
“আমি তোমাদের প্রতি অবতীর্ণ করেছি কিতাব যাতে আছে তোমাদের জন্য উপদেশ, তবুও কি তোমরা বুঝবে না?” (সূরা ‘আম্বিয়া ২১ : ১০)
আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা যে শপথ করেছেন তার উত্তর হলো যে, মক্কার কাফিররা বলে যে, মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) জাদুকর, কবি, পাগল এবং মিথ্যুক, তা সঠিক নয়। বরং তিনি আল্লাহ তা‘আলার সত্য রাসূল; তাঁর ওপর এ মর্যাদাপূর্ণ কুরআন অবতীর্ণ হয়েছে।
(فِيْ عِزَّةٍ وَّشِقَاقٍ)
‘অহঙ্কার ও বিরোধিতায় লিপ্ত’ অর্থাৎ আল্লাহ তা‘আলা কুরআনকে উপদেশপূর্ণ করার পরেও কাফিররা তা হতে উপদেশ গ্রহণ করতে অহঙ্কার করছে ও ঈমান আনা হতে বিমুখ রয়েছে এবং সত্যকে বাতিল করার জন্য বিবাদে নিমজ্জিত।
আল্লাহ তা‘আলা বলেন :
(وَإِذَا قِيْلَ لَهَااِتَّقِ اللّٰهَ أَخَذَتْهُ الْعِزَّةُ بِالْإِثْمِ فَحَسْبُهُ جَهَنَّمُ ط وَلَبِئْسَ الْمِهَادُ)
“আর যখন তাকে বলা হয়, তুমি আল্লাহকে ভয় কর, তখন তার সম্মানের গরীমা তাকে অনাচারে লিপ্ত করে। অতএব জাহান্নামই তার জন্য যথেষ্ট, আর তা কতইনা নিকৃষ্ট বাসস্থান!” (সূরা বাকারাহ ২ : ২০৬)
(كَمْ أَهْلَكْنَا مِنْ قَبْلِهِمْ) ‘তাদের পূর্বে আমি বহু সম্প্রদায়কে ধ্বংস করেছি; অর্থাৎ পূর্ববর্তী জাতির মধ্যে যারা আল্লাহ তা‘আলা ও রাসূলকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছিল তাদেরকে তিনি ধবংস করেছিলেন। তারা যখন আযাব প্রত্যক্ষ করেছিল তখন আল্লাহ তা‘আলার কাছে সাহায্য কামনা করেছিল, কিন্তু তাদের এ কামনা কোন উপকারে আসেনি। অতএব যে-কেউ তাদের মত আল্লাহ তা‘আলা ও রাসূলের সাথে এরূপ আচরণ করে তাহলে তারাও শাস্তির সম্মুখিন হবে।
لات শব্দটি মূলত لا, এখানে ت অক্ষরটি অতিরিক্ত যুক্ত হয়েছে। যেমন ثم-তে ثمت এবং رب-তে ربت বলা হয়ে থাকে। এগুলোতেও ت অক্ষরটি অতিরিক্ত।
مناص-এর অর্থ হলো, পলায়ন করা, পিছু হটা ইত্যাদি। সুতরাং পূর্ববর্তী জাতিদের ইতিহাস অধ্যয়ন করত আমাদের সতর্ক হওয়া উচিত যে, আমরা আল্লাহ তা‘আলা ও তাঁর রাসূলের নাফরমান হব না বরং একমাত্র আল্লাহ তা‘আলার ইবাদত করব এবং রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর রেখে যাওয়া পন্থার অবলম্বন করব।
আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয় :
১. কুরআন একটি উপদেশ বাণী।
২. অহঙ্কার করা, কুরআন সুন্নাহর বিরোধিতা করা কাফির-মুশরিকদের কাজ।
৩. দুনিয়ার কোন শক্তিশালীর শক্তি আল্লাহ তা‘আলার শাস্তির বিপরীতে কোন কাজে আসবে না।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: ১-৩ নং আয়াতের তাফসীর:
হুরফে মুকাত্তা'আত যেগুলো সূরাসমূহের শুরুতে এসে থাকে, ওগুলোর পূর্ণ তাফসীর সূরায়ে বাকারার শুরুতে গত হয়েছে। এখানে মহান আল্লাহ কুরআন কারীমের শপথ করেছেন এবং ওকে শিক্ষা ও উপদেশপূর্ণ বলেছেন। কেননা এর কথার উপর আমলকারীদের দ্বীন ও দুনিয়া সুন্দর ও কল্যাণময় হয়ে থাকে। অন্য আয়াতে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “অবশ্যই আমি তোমাদের উপর কিতাব (কুরআন) অবতীর্ণ করেছি যার মধ্যে তোমাদের জন্যে উপদেশ রয়েছে।”(২১:১০) ভাবার্থ এটাও যে, কুরআন ইযযত, সম্মান ও মর্যাদার অধিকারী। কারো কারো মতে কসমের উত্তর হলো ... (আরবী) অর্থাৎ “প্রত্যেকেই রাসূলদেরকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছে।” (৩৮:১৪) কেউ কেউ বলেন যে, কসমের জবাব হলোঃ (আরবী) অর্থাৎ “নিশ্চয়ই ওটা সত্য।” (৩৮:৬৪) কিন্তু এটা খুব সঠিক বলে মনে হচ্ছে না। কাতাদা (রঃ) বলেন যে, এর জবাব হলো এর পরবর্তী আয়াতটি। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) এটাকেই পছন্দ করেছেন। কোন কোন আরবী ভাষাবিদ বলেছেন যে, এই কসমের জবাব হলো (আরবী) এবং এর অর্থ হলো সভ্যতা। একটি উক্তি এও আছে যে, সম্পূর্ণ সূরাটির সারমর্মই হলো এই কসমের জবাব। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।
এরপর মহান আল্লাহ বলেনঃ এই কুরআন তো হলো সরাসরি শিক্ষা ও উপদেশ। কিন্তু এর দ্বারা উপকার শুধু সেই লাভ করতে পারে যার অন্তরে ঈমান রয়েছে। কাফির লোকেরা এটা হতে উপকার লাভে বঞ্চিত থাকে। কেননা, তারা অহংকারী এবং এর চরম বিরোধী। তাদের উচিত তাদের ন্যায় পূর্ববর্তী লোকদের পরিণাম চিন্তা করা এবং নিজেদের পরিণাম সম্পর্কে ভীত-সন্ত্রস্ত থাকা। পূর্ববর্তী উম্মতদেরকে এরূপই অপরাধের কারণে ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে। আল্লাহর আযাব এসে যাওয়ার পর তারা খুব কান্নাকাটি করেছিল। কিন্তু ঐ সময় সবই বৃথা হয়েছিল। যেমন আল্লাহ পাক বলেনঃ .... (আরবী) অর্থাৎ “যখন তারা আমার আযাব অনুভব করলো তখন তা থেকে বাঁচতে ও পালাতে ইচ্ছা করলো, কিন্তু তা কিরূপে সম্ভব ছিল?” (২১:১২) হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এখন পালাবারও সময় নয় এবং ফরিয়াদেরও সময় নয়। তখন ফরিয়াদ কেউ শুনবে না এবং কিছু উপকারও করতে পারবে না। যতই কান্নাকাটি ও চীৎকার করুক না কেন সবই বিফল হবে। ঐ সময় তাওহীদকে স্বীকার করলেও কোন লাভ হবে না এবং তাওবা করেও কোন উপকার হবে না। এটা হবে অসময়ের চীৎকার ও কান্না।
এখানে (আরবী) শব্দটি (আরবী)-এর অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। এখানে (আরবী) টি অতিরিক্ত। যেমন (আরবী) কে (আরবী) এবং (আরবী) কে বলা হয়ে থাকে। এই দুই স্থানেও (আরবী) টি অতিরিক্ত।
ইমাম ইবনে জারীর (রঃ)-এর উক্তি এই যে, এই (আরবী) টি (আরবী)-এর সাথে মিলিত রয়েছে। অর্থাৎ (আরবী) হবে। কিন্তু প্রথম উক্তিটিই সমধিক খ্যাত। জমহুর (আরবী)-কে যবরের সাথে পড়েছেন। ভাবার্থ হলোঃ এটা আক্ষেপ ও হা-হুতাশ করার সময় নয়। কেউ কেউ (আরবী)-কে যের দিয়ে পড়াকেও বৈধ বলেছেন। ভাষাবিদরা বলেন যে, (আরবী)-এর অর্থ হলো পিছনে সরে আসা এবং (আরবী) বলা হয় সম্মুখে অগ্রসর হওয়াকে। সুতরাং অর্থ হলোঃ এটা পালাবার ও বের হয়ে যাবার সময় নয়। এসব ব্যাপারে সঠিক জ্ঞানের অধিকারী একমাত্র আল্লাহ।
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।