সূরা আস-সাফফাত (আয়াত: 22)
হরকত ছাড়া:
احشروا الذين ظلموا وأزواجهم وما كانوا يعبدون ﴿٢٢﴾
হরকত সহ:
اُحْشُرُوا الَّذِیْنَ ظَلَمُوْا وَ اَزْوَاجَهُمْ وَ مَا کَانُوْا یَعْبُدُوْنَ ﴿ۙ۲۲﴾
উচ্চারণ: উহশুরুল্লাযীনা জালামূওয়া আযওয়া-জাহুম ওয়ামা-কা-নূইয়া‘বুদূন।
আল বায়ান: (ফেরেশতাদেরকে বলা হবে) ‘একত্র কর যালিম ও তাদের সঙ্গী-সাথীদেরকে এবং যাদের ইবাদাত তারা করত তাদেরকে।
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ২২. (ফেরেশতাদেরকে বলা হবে,) একত্র কর যালিম(১) ও তাদের সহচরদেরকে(২) এবং তাদেরকে, যাদের ইবাদাত করত তারা—
তাইসীরুল ক্বুরআন: (হুকুম দেয়া হবে) ‘একত্র কর যালিমদেরকে আর তাদের সঙ্গীদেরকে এবং তাদেরকেও, যাদের তারা ‘ইবাদাত করত
আহসানুল বায়ান: (২২) (ফিরিশতাদেরকে বলা হবে,) একত্র কর অত্যাচারীদেরকে,[1] ওদের সহচরদেরকে[2] এবং তাদেরকে যাদের ওরা উপাসনা করত;[3]
মুজিবুর রহমান: (মালাইকাকে বলা হবে) একত্রিত কর যালিম ও তাদের সহচরদেরকে এবং তাদেরকে যাদের ইবাদাত করত,
ফযলুর রহমান: (ফেরেশতাদেরকে বলা হবে,) “জালেমদেরকে, তাদের দোসরদেরকে ও তারা যাদের ইবাদত করত তাদেরকে একত্রিত করো;
মুহিউদ্দিন খান: একত্রিত কর গোনাহগারদেরকে, তাদের দোসরদেরকে এবং যাদের এবাদত তারা করত।
জহুরুল হক: "যারা অনাচার করেছিল তাদের একত্র করো, আর তাদের সহচরদের, আর তাদেরও যাদের তারা উপাসনা করত --
Sahih International: [The angels will be ordered], "Gather those who committed wrong, their kinds, and what they used to worship
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ২২. (ফেরেশতাদেরকে বলা হবে,) একত্র কর যালিম(১) ও তাদের সহচরদেরকে(২) এবং তাদেরকে, যাদের ইবাদাত করত তারা—
তাফসীর:
(১) আল্লামা শানকীতী বলেন, যালেম বলে এখানে কাফেরদেরকে বোঝানো হয়েছে। কারণ, পরবর্তী অংশ “আর যাদের ইবাদাত করত তারা আল্লাহর পরিবর্তে” থেকে এটাই সুস্পষ্ট। কুরআনের বিভিন্ন স্থানে যুলুম বলে শির্ক উদ্দেশ্য নেয়া হয়েছে। [আদওয়াউল বায়ান]
(২) ইবনে আব্বাস বলেন, এখানে أزواج বলে অনুরূপ ও সমমতের লোক বোঝানো হয়েছে। কাতাদাহ বলেন, এর দ্বারা তাদের মত অন্যান্য কাফের বোঝানো হয়েছে। [তাবারী]
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (২২) (ফিরিশতাদেরকে বলা হবে,) একত্র কর অত্যাচারীদেরকে,[1] ওদের সহচরদেরকে[2] এবং তাদেরকে যাদের ওরা উপাসনা করত;[3]
তাফসীর:
[1] অর্থাৎ, যারা কুফর, শিরক এবং নাফরমানী করেছে। এটা হবে আল্লাহর আদেশ।
[2] এর অর্থ কুফর, শিরক এবং রসূলগণকে অস্বীকারকারীদের সহচর ও সাথিগণ থেকে উদ্দেশ্য অনেকের নিকট জ্বিন ও শয়তানগণ। আবার অনেকে বলেন যে, ঐ সকল স্ত্রীগণ যারা কুফর ও শিরক করাতে তাদের সাথী হয়েছিল।
[3] ما (যাদের) শব্দটি ব্যাপকার্থে ব্যবহার করে সকল উপাস্যকে বুঝানো হয়েছে। সে উপাস্য মূর্তি হোক বা আল্লাহর কোন নেক বান্দা, সকলকে লজ্জিত করার জন্য একত্রিত করা হবে। নেক ব্যক্তিদের তো আল্লাহ তাআলা জাহান্নাম থেকে দূরে রাখবেন, তবে অন্য উপাস্যগুলিকে তাদের সাথেই জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে, যাতে তারা দেখতে পায় যে, এরা কারো উপকার বা অপকার করতে অক্ষম।
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ১১-২৬ নম্বর আয়াতের তাফসীর :
এখানে আল্লাহ তা‘আলা ঐ সকল কাফির-মুশরিকদের কথা বর্ণনা করছেন যারা কিয়ামত ও পুনরুত্থান দিবসকে বিশ্বাস করে না, আল্লাহ তা‘আলার কোন নিদর্শন দেখলে হাসি-তামাশা ছলে বর্জন করে এবং সাথে সাথে মানুষের সৃষ্টিতত্ত্ব সম্পর্কেও। আল্লাহ তা‘আলা এখানে পুনরুত্থানের দুটি দলীল পেশ করেছেন।
(১) (فَاسْتَفْتِهِمْ أَهُمْ أَشَدُّ خَلْقًا أَمْ مَّنْ خَلَقْنَا)
অর্থাৎ আল্লাহ তা‘আলা মানুষ ব্যতীত অন্যান্য যে-সকল মাখলুকাত সৃষ্টি করেছেন যেমন আকাশ, জমিন, পাহাড়, সমুদ্র, চন্দ্র-সূর্য ও ফেরেশতা ইত্যাদি। এসব বিশাল বিশাল সৃষ্টি পুনরায় সৃষ্টি করা কঠিন, নাকি মানুষকে সৃষ্টি করা কঠিন? প্রশ্নের কোন উত্তর নেই, কেবল একটি কথা ছাড়া যে, আল্লাহ তা‘আলা বিশাল বিশাল মাখলুক সৃষ্টিতে সক্ষম হলে তিনি মানুষকেও সৃষ্টি করতে সক্ষম, তাতে কোন সন্দেহ নেই। অন্যত্র আল্লাহ তা‘আলা বলেন :
(أَوَلَمْ يَرَوْا أَنَّ اللّٰهَ الَّذِيْ خَلَقَ السَّمٰوٰتِ وَالْأَرْضَ وَلَمْ يَعْيَ بِخَلْقِهِنَّ بِقَادِرٍ عَلٰٓي أَنْ يُّحْيِيَ الْمَوْتٰي ط بَلٰٓي إِنَّه۫ عَلٰي كُلِّ شَيْءٍ قَدِيْرٌ)
“তারা কি এটুকুও বোঝে না, যে আল্লাহ জমিন ও আসমান সৃষ্টি করলেন এবং এগুলো সৃষ্টি করতে তিনি ক্লান্ত হননি, সেই আল্লাহ মৃতকে অবশ্যই জীবিত করার ক্ষমতা রাখেন। কেন নয়? নিশ্চয়ই তিনি সব কিছুর ওপর শক্তিশালী।” (সূরা আহকাফ ৪৬ : ৩৩)
(২) (إِنَّا خَلَقْنٰهُمْ مِّنْ طِيْنٍ لَّازِبٍ)
এ কথার এক অর্থ এই যে, তাদের আদি পিতা আদম (আঃ)-কে মাটি দ্বারা সৃষ্টি করা হয়েছিল। দ্বিতীয় অর্থ প্রত্যেক মানুষই মাটি দ্বারা সৃষ্টি। কারণ, প্রত্যেকের সৃষ্টির মূল উপাদান হল মাটি। যে আল্লাহ তা‘আলা মানুষকে মাটি থেকে সৃষ্টি করতে পারলেন তিনি পুনরায় তাদের সৃষ্টি করতে সক্ষম। কারণ অন্যান্য বস্তু অপেক্ষা মানুষের সৃষ্টি অধিকতর সহজ। তাকে সৃষ্টি করা হয়েছে আঠাল মৃত্তিকা হতে। এ সৃষ্টি সম্পর্কে পূর্বে সূরা হাজ্জ-এর ৫ নম্বর আয়াতসহ একাধিক স্থানে আলোচনা করা হয়েছে।
এরপর আল্লাহ তা‘আলা বলেন, যারা উপদেশ গ্রহণ করে না, যারা আল্লাহ তা‘আলার বিধানের সাথে ঠাট্টা-বিদ্রুপ করে এবং পুনরুত্থান দিবসকে অস্বীকার করে তাদেরকে কিয়ামতের মাঠে লাঞ্চিত অবস্থায় পুনরুত্থিত করা হবে। আল্লাহ তা‘আলার বাণী :
(وَأَلْقَوْا إِلَي اللّٰهِ يَوْمَئِذِ نِالسَّلَمَ وَضَلَّ عَنْهُمْ مَّا كَانُوْا يَفْتَرُوْنَ)
“সেদিন তারা আল্লাহর নিকট আত্মসমর্পণ করবে এবং তারা যে মিথ্যা উদ্ভাবন করত তা তাদের থেকে উধাও হয়ে যাবে।” (সূরা নাহ্ল ১৬ : ৮৭)
زَجْرَةٌ অর্থ ধমক দেয়া, এখানে ফুঁৎকার বা বিকট আওয়াজকে বুঝানো হয়েছে। কারণ এর উদ্দেশ্য হল কাফিরদের মনে আতঙ্ক সৃষ্টি করা এবং তাদেরকে ধমক দেয়া। অর্থাৎ পুনরুত্থানকে অস্বীকারকারী কাফির-মুশরিকরা যখন কিয়ামতের ভয়াবহ অবস্থা দেখবে এবং কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখী হবে তখন তারা আফসোস করে বলবে : এটাই হচ্ছে কর্মফল দিবস। তাদের আফসোস বৃদ্ধি ও তিরস্কার করে বলা হবে : ‘এটাই সেই ফায়সালার দিন, যাকে তোমরা অস্বীকার করতে।’
কিয়ামতের দিন ফেরেশতাদেরকে নির্দেশ দেয়া হবে- যারা জালিম তথা কাফির তাদেরকে এবং তাদের সাথী ও তারা আল্লাহ তা‘আলা ব্যতীত যাদের ইবাদত করত তাদের সবাইকে জাহান্নামের পথে পরিচালিত কর। وَأَزْوَاجَهُمْ বা তাদের সাথী বলতে : অধিকাংশ বিদ্বানদের মতে- তাদের মত ও তাদের সদৃশ।
সুতরাং যারা মূর্তিপূজা করে অনুরূপ মূর্তিপূজকদেরকে একত্রে জাহান্নামে নিয়ে যাওয়া হবে, চোর চোরের সাথে জাহান্নামে যাবে, ব্যভিচার ব্যভিচারীর সাথে জাহান্নামে যাবে, এভাবে একই ধরণের অপরাধীরা সহচর হয়ে জাহান্নামে যাবে।
(وَمَا كَانُوْا يَعْبُدُوْنَ)
(যাদের) শব্দটি ব্যাপকার্থে ব্যবহার করে সকল উপাস্যকে বুঝানো হয়েছে। সে উপাস্য মূর্তি হোক বা নিজের ইবাদতের দিকে আহ্বানকারী আল্লাহ তা‘আলার কোন নেক বান্দা, সকলকে লজ্জিত করার জন্য একত্রিত করা হবে। নেক বান্দাদের তো আল্লাহ তা‘আলা জাহান্নাম থেকে দূরে রাখবেন, তবে অন্য উপাস্যগুলোকে তাদের সাথেই জাহান্নামে নিয়ে যাওয়া হবে। পথিমধ্যে ফেরেশতাদেরকে বলা হবে তাদেরকে থামাও! তাদেরকে জিজ্ঞাসা করি। আল্লাহ তা‘আলা জিজ্ঞাসা করে বলবেন : তোমাদের কী হল যে, পরস্পর সাহায্য করছ না? তাদের কোন জবাব থাকবে না, বরং সবাই আত্মসমর্পণ করবে।
আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয় :
১. মানুষকে আঁঠাল মাঠি থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে।
২. কিয়ামতের মাঠে কেউ কাউকে কোন প্রকার সাহায্য করতে পারবে না।
৩. যারা এক আল্লাহ তা‘আলা ছাড়া অন্যদের ইবাদত করে তাদের সকলকে একত্রে জাহান্নামে দেয়া হবে যাতে তারা এ কথা জেনে নিতে পারে যে, আল্লাহ তা‘আলা ছাড়া অন্যান্য উপাস্যরা কোন উপকার করতে পারে না।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: ২০-২৬ নং আয়াতের তাফসীর:
কিয়ামত অস্বীকারকারীরা বলবেঃ হায়, দুর্ভোগ আমাদের! এটাই তো প্রতিফল দিবস! মুমিন ও ফেরেশতারা তাদের লজ্জা আরো বাড়ানোর জন্যে বলবেনঃ হ্যা, এটাই ফায়সালার দিন যা তোমরা অবিশ্বাস করতে।
অতঃপর ফেরেশতাদেরকে আল্লাহ্ তা'আলা নির্দেশ দিবেনঃ তোমরা তাদের সহচরদেরকে, তাদের ভাই বন্ধুদেরকে এবং তাদের অনুরূপ ব্যক্তিবর্গকে এক জায়গায় একত্রিত কর। যেমন ব্যভিচারীকে ব্যভিচারীর সাথে, সুদখোরকে সুদখোরের সাথে, মদ্যপায়ীকে মদ্যপায়ীর সাথে ইত্যাদি। একটি উক্তি এও আছে যে, এর ভাবার্থ হচ্ছেঃ যালিমদেরকে ও তাদের স্ত্রীদেরকে একত্রিত কর। কিন্তু এটা খুবই দুর্বল উক্তি। সঠিক ভাবার্থ এটাই তাদের অনুরূপ লোকদেরকে এবং তাদের সাথে তাদের উপাস্যদেরকে একত্রিত কর যাদেরকে আল্লাহর শরীক হিসেবে গ্রহণ করেছিল। অতঃপর তাদেরকে জাহান্নামের পথে পরিচালিত কর। যেমন আল্লাহ তা'আলা অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি তাদেরকে কিয়ামতের দিন মুখের ভরে অন্ধ, মূক ও বধির করে একত্রিত করবো। তাদের আশ্রয়স্থল হবে জাহান্নাম, যার আগুন যখনই কিছুটা হালকা হবে তখনই আমি ঐ আগুনকে আরো বেশী প্রজ্বলিত করে দিবো।”(১৭:৯৭) আল্লাহ তা'আলা ফেরেশতাদেরকে আরো বলবেনঃ তাদেরকে জাহান্নামের নিকট কিছু সময়ের জন্যে দণ্ডায়মান রাখো। কেননা, আমি তাদেরকে কিছু প্রশ্ন করবো এবং তাদের হিসাব নিবো।
হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি কোন ব্যক্তিকে কোন জিনিসের দিকে ডাকবে, কিয়ামতের দিন তাকে তারই সাথে খাড়া করা হবে, বিশ্বাসঘাতকতাও হবে না এবং বিচ্ছিন্নতাও হবে না, যদিও একজন লোক একজন লোককেও ডেকে থাকে।” অতঃপর তিনি (আরবী)-এ আয়াতটি পাঠ করেন। (এ হাদীসটি ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)
হযরত উসমান ইবনে যায়েদাহ (রাঃ) বলেন যে, মানুষকে সর্বপ্রথম তার সঙ্গীদের সম্বন্ধে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। তারপর তাকে প্রশ্ন করা হবেঃ আজ কেন একে অপরকে সাহায্য করছো না? অথচ তোমরা দুনিয়ায় বলে বেড়াতে আমরা সবাই একত্রে রয়েছি এবং আমরা পরস্পরকে সাহায্য করবো? কিন্তু আজ তো তারা অস্ত্র-শস্ত্র ফেলে দিয়ে আল্লাহ্ তা'আলার নিকট আত্মসমর্পণ করেছে। না আজ তারা তার কোন বিরুদ্ধাচরণ করবে, না তারা তাঁর আযাব থেকে বাঁচতে পারবে, না পালাতে পারবে। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সর্বাধিক সঠিক জ্ঞানের অধিকারী।
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।