আল কুরআন


সূরা আস-সাফফাত (আয়াত: 163)

সূরা আস-সাফফাত (আয়াত: 163)



হরকত ছাড়া:

إلا من هو صال الجحيم ﴿١٦٣﴾




হরকত সহ:

اِلَّا مَنْ هُوَ صَالِ الْجَحِیْمِ ﴿۱۶۳﴾




উচ্চারণ: ইল্লা-মান হুওয়া সা-লিল জাহীম।




আল বায়ান: জ্বলন্ত আগুনে প্রবেশকারী ছাড়া।




আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ১৬৩. শুধু প্ৰজ্জলিত আগুনে যে দগ্ধ হবে সে ছাড়া।(১)




তাইসীরুল ক্বুরআন: পারবে কেবল তাকে, যে জ্বলন্ত আগুনে প্রবেশকারী।




আহসানুল বায়ান: (১৬৩) কেবল তাকে বিভ্রান্ত করতে পারবে, যে জাহান্নামে প্রবেশ করবে। [1]



মুজিবুর রহমান: শুধু প্রজ্জ্বলিত আগুনে প্রবেশকারীকে ব্যতীত।



ফযলুর রহমান: একমাত্র তাকে ছাড়া যে জাহান্নামে প্রবেশ করবে।



মুহিউদ্দিন খান: শুধুমাত্র তাদের ছাড়া যারা জাহান্নামে পৌছাবে।



জহুরুল হক: তাকে ব্যতীত যে জ্বলন্ত আগুনে পুড়তে চায়।



Sahih International: Except he who is to [enter and] burn in the Hellfire.



তাফসীরে যাকারিয়া

অনুবাদ: ১৬৩. শুধু প্ৰজ্জলিত আগুনে যে দগ্ধ হবে সে ছাড়া।(১)


তাফসীর:

(১) ইবনে আব্বাস বলেন, তোমরা কাউকে পথভ্রষ্ট করতে পারবে না, আর আমিও তোমাদের কাউকে পথভ্রষ্ট করব না। তবে যার জন্য আমার ফয়সালা হয়ে গেছে সে জাহান্নামে দগ্ধ হবে, তার কথা ভিন্ন। [তাবারী] কাতাদাহ বলেন, তোমরা তোমাদের বাতিল দিয়ে আমার বান্দাদের কাউকে পথভ্ৰষ্ট করতে পারবে না, তবে যে জাহান্নামের আমল করে তোমাদেরকে বন্ধু বানিয়েছে সে ছাড়া। [তাবারী]


তাফসীরে আহসানুল বায়ান

অনুবাদ: (১৬৩) কেবল তাকে বিভ্রান্ত করতে পারবে, যে জাহান্নামে প্রবেশ করবে। [1]


তাফসীর:

[1] অর্থাৎ, তোমরা ও তোমাদের বাতিল উপাস্য, তাদেরকে ছাড়া কাউকে পথভ্রষ্ট করার ক্ষমতা রাখো না, যারা আল্লাহর জ্ঞানে পূর্ব থেকেই জাহান্নামী এবং সে জন্যই তারা কুফর ও শিরকের উপর অটল আছে।


তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ


তাফসীর: ১৬১-১৭০ নম্বর আয়াতের তাফসীর :



আল্লাহ তা‘আলা মুশরিকদের লক্ষ্য করে বলছেন : তোমরা ও তোমাদের বাতিল উপাস্যগুলো, তাদেরকে ছাড়া কাউকে পথভ্রষ্ট করার ক্ষমতা রাখো না, যারা আল্লাহ তা‘আলার জ্ঞানে পূর্ব থেকেই জাহান্নামী এবং সে জন্যই তারা কুফর ও শির্কের ওপর অটল আছে। সৎ লোকদেরকে কখনো তোমরা তোমাদের র্শিকি মতবাদ গ্রহণ করাতে পারবে না। আল্লাহ তা‘আলার বাণী :



(إِنَّكُمْ لَفِيْ قَوْلٍ مُّخْتَلِفٍ -‏ يُّؤْفَكُ عَنْهُ مَنْ أُفِكَ)



“নিশ্চয়ই তোমরা পরস্পর বিরোধী কথায় লিপ্ত। যে ব্যক্তি সত্যভ্রষ্ট সে-ই তা পরিত্যাগ করে” (সূরা যা-রিয়া-ত ৫১ : ৮-৯)



এরপর আল্লাহ তা‘আলা ফেরেশতাদের কথা তুলে ধরে বলেন, তারা বলে- আমাদের প্রত্যেকের নির্ধারিত স্থান ও কর্ম রয়েছে, যা অতিক্রম করা বা সীমালঙ্ঘন করা আমাদের সমীচীন নয়। আমরা তাঁর সম্মুখে সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে তাঁর তাসবীহ তাহলীল পাঠ করি। অর্থাৎ উদ্দেশ্য হল- ফেরেশতারা আল্লাহ তা‘আলার সৃষ্টি এবং একনিষ্ঠ বান্দা। যারা সর্বদা তাঁর ইবাদত এবং তাসবীহ-তাহলীল পাঠে রত। তারা আল্লাহ তা‘আলার কন্যা নন যেমন মুশরিকরা ধারণা করে থাকে। আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন, “তারা বলে, ‘দয়াময় আল্লাহ সন্ত‎ান গ্রহণ করেছেন।’ তিনি পবিত্র, মহান! বরং তারা তো তাঁর সম্মানিত বান্দা। তারা আগে বেড়ে কথা বলে না; তারা তো তাঁর আদেশ অনুসারেই কাজ করে থাকে। তাদের সম্মুখে ও পশ্চাতে যা কিছু আছে তা তিনি অবগত। তারা সুপারিশ করে শুধুমাত্র তাদের জন্য যাদের প্রতি তিনি সন্তুষ্ট এবং তারা তাঁর ভয়ে ভীত-সন্ত্রস্ত। তাদের মধ্যে যে বলবে, ‘আমিই মা‘বূদ তিনি ব্যতীত’, তাকে আমি প্রতিফল দেব জাহান্নাম; এভাবেই আমি জালিমদেরকে শাস্তি‎ দিয়ে থাকি।” (সূরা ‘আম্বিয়া- ২১ : ২৬-২৯)



এরপর আল্লাহ তা‘আলা বর্ণনা করেন যে, মক্কার মুশরিকরা আকাক্সক্ষা করে বলত, যদি আমাদের নিকট কোন নাবী-রাসূল আসত তাহলে আমরা অবশ্যই পূর্বের লোকদের চেয়ে বেশী সঠিক পথের অনুসারী হতাম, আমরা একেবারে আল্লাহ তা‘আলার একনিষ্ঠ বান্দা হয়ে যেতাম। এখানে ذِكْرًا অর্থ আল্লাহ তা‘আলার কোন গ্রন্থ বা নাবী, যেমন পূর্বে অনেক গ্রন্থ ও নাবী প্রেরণ করা হয়েছে। যথা তাওরাত, ইনজিল ইত্যাদি। কিন্তু যখনই তাদের নিকট নাবী-রাসূল সত্য-দীন নিয়ে এসেছেন তখনই তারা তাঁর সাথে কুফরী করেছে। এ সম্পর্কে পূর্বে সূরা আল আন‘আম-এর ১০৯, ১৫৬-১৫৭ ও সূরা আল ফা-ত্বির-এর ৪২ নম্বর আয়াতে আলোচনা করা হয়েছে।



আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয় :



১. পথভ্রষ্ট লোক ব্যতীত সৎ ও মু’মিন ব্যক্তিরা কখনো শয়তানের অনুসরণ করে না।

২. মানুষের মতো ফেরেশতারাও আল্লাহ তা‘আলার তাসবীহ পাঠ করে।

৩. একশ্রেণির লোক- যারা বলে সত্য পেলে অনুসরণ করব, কিন্ত যখন সত্য তুলে ধরা হয় আর তাদের মনঃপূত না হয় তখন তারা তা বর্জন করে।


তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)


তাফসীর: ১৬১-১৭০ নং আয়াতের তাফসীর:

আল্লাহ তাআলা মুশরিকদেরকে জানাচ্ছেনঃ তোমাদের পথভ্রষ্টতা ও অংশীবাদী শিক্ষা শুধু তারাই গ্রহণ করবে যাদেরকে জাহান্নামের জন্যেই সৃষ্টি করা হয়েছে। যারা অন্তর থাকা সত্ত্বেও বুঝে না, চক্ষু থাকা সত্ত্বেও দেখে না এবং কান থাকা সত্ত্বেও শুনে না, তারা চতুষ্পদ জন্তুর ন্যায়, বরং তার চেয়েও নিকৃষ্ট এবং তারা বেখেয়াল।” অপর জায়গায় বলা হয়েছেঃ “তাতে তারাই পথভ্রষ্ট হয় যাদের বোধশক্তি রহিত ও যারা মিথ্যার বেশাতি চড়ায়।”

অতঃপর মহান আল্লাহ্ ফেরেশতাদের নিষ্কলুষিতা, তাদের আত্মসমর্পণ, ঈমানে সন্তুষ্টি এবং আনুগত্যের বর্ণনা দিচ্ছেন যে, তারা নিজেরাই বলেঃ আমাদের প্রত্যেকের জন্যেই নির্ধারিত স্থান রয়েছে এবং ইবাদতের জন্যে বিশেষ জায়গা আছে। সেখান থেকে আমরা সরতে পারি না বা কমবেশীও করতে পারি না।'

হযরত সা'দ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) একদা তাঁর সাথীদেরকে বলেনঃ “আসমান চড় চড় শব্দ করছে এবং প্রকৃতপক্ষে ওর এরূপ শব্দ করাই উচিত। কেননা, ওর এমন কোন স্থান ফাকা নেই যেখানে ফেরেশতাদের কেউ না কেউ রুকূ' বা সিজদার অবস্থায় থাকেন না।” অতঃপর তিনি (আরবী) হতে (আরবী) পর্যন্ত আয়াত তিনটি তিলাওয়াত করেন। (এ হাদীসটি ইবনে আসাকির (রঃ) বর্ণনা করেছেন)

হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বলেছেনঃ “দুনিয়ার আকাশে এমন কোন স্থান নেই যেখানে কোন ফেরেশতা সিজদারত বা দণ্ডায়মান অবস্থায় না রয়েছেন।”

হযরত কাতাদা (রঃ) বলেন যে, প্রথমে নারী-পুরুষ সবাই মিলে একত্রে নামায পড়তো। অতঃপর (আরবী)-এ আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার পর পুরুষদেরকে সামনে বাড়িয়ে দেয়া হলো এবং নারীদেরকে পিছনে সরিয়ে দেয়া হলো।

“আমরা সব ফেরেশতা সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে আল্লাহর ইবাদত করে থাকি” এর বর্ণনা (আরবী)-এর তাফসীরে গত হয়েছে।

অলীদ ইবনে আবদিল্লাহ (রঃ) বলেনঃ এই আয়াত নাযিল হওয়ার পূর্বে নামাযের সারি ছিল না। এই আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার পর সারিবদ্ধভাবে নামায পড়া শুরু হয়। হযরত উমার (রাঃ) ইকামতের পর মানুষের দিকে মুখ করে বলতেনঃ “সারি ঠিক ও সোজা করে নাও এবং সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে যাও। আল্লাহ তা'আলা ফেরেশতাদের মত তোমাদেরকেও সারিবদ্ধ দেখতে চান। যেমন তারা বলেনঃ “আমরা তো সারিবদ্ধভাবে দণ্ডায়মান হই। হে অমুক! তুমি সামনে বেড়ে যাও এবং হে অমুক! তুমি পিছনে সরে যাও।” অতঃপর তিনি সম্মুখে অগ্রসর হয়ে নামায শুরু করতেন। (এটা ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)

হযরত হুযাইফা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেনঃ “তিনটি বিষয়ে আমাদেরকে লোকদের উপর (অন্যান্য উম্মতের উপর) ফযীলত বা মর্যাদা দান করা হয়েছে। যেমনঃ আমাদের (নামাযের) সারিসমূহ ফেরেশ্তাদের সারির ন্যায় করা হয়েছে, আমাদের জন্যে সমগ্র যমীনকে সিজদার স্থান বানানো হয়েছে এবং ওর মাটিকে আমাদের জন্যে পবিত্র করা হয়েছে।” (এ হাদীসটি সহীহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে)

আল্লাহ্ পাক ফেরেশতাদের উক্তি উদ্ধৃত করেনঃ “আমরা অবশ্যই আল্লাহর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণাকারী। আমরা তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব বর্ণনা করে থাকি। আমরা স্বীকার করি যে, তিনি সর্বপ্রকারের ক্ষয়-ক্ষতি হতে পবিত্র। আমরা সকল ফেরেশতা তাঁর আজ্ঞাবহ এবং তাঁর মুখাপেক্ষী। তাঁর সামনে আমরা আমাদের নম্রতা ও অপারগতা প্রকাশ করে থাকি।” এই তিনটি হলো ফেরেশতাদের বিশেষণ। কাতাদা (রঃ) বলেন যে, তাসবীহ্ পাঠের অর্থ হচ্ছে নামায আদায় করা। অন্য আয়াতে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “কাফিররা বলেঃ আল্লাহর সন্তান রয়েছে, অথচ তিনি তা হতে সম্পূর্ণরূপে পবিত্র, অবশ্য ফেরেশতারা তাঁর সম্মানিত বান্দা। তারা তাঁর আজ্ঞাবহ। তার হুকুমের উপর তারা আমল করে থাকে। তিনি তাদের সামনের ও পিছনের খবর রাখেন। তারা কারো জন্যে সুপারিশ করারও অধিকার রাখে না। তবে তিনি সম্মত হয়ে যাকে অনুমতি দেন সেটা স্বতন্ত্র কথা। তারা আল্লাহ্ ভয়ে সদা প্রকম্পিত থাকে। তাদের মধ্যে যারা আল্লাহ্ ছাড়া নিজেদেরকে ইবাদতের যোগ্য মনে করবে, আমি তাদেরকে জাহান্নামে প্রবিষ্ট করবো। এভাবেই আমি যালিম ও সীমালংঘন কারীদেরকে প্রতিফল দিয়ে থাকি।”(২১:২৬-২৯)

প্রবল প্রতাপান্বিত আল্লাহ্ বলেনঃ তারাই তো বলে এসেছে যে, পূর্ববর্তীদের কিতাবের মত যদি তাদের কোন কিতাব থাকতো তবে অবশ্যই তারা আল্লাহর একনিষ্ঠ বান্দা হয়ে যেতো। যেমন অন্য আয়াতে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ তারা খুব কঠিন শপথ করে করে বলতোঃ যদি আমাদের বিদ্যমানতায় আল্লাহর কোন নবী এসে পড়েন তবে আমরা তাঁর আনুগত্য স্বীকার করে নেবো এবং হিদায়াতের পথে সর্বাগ্রে দৌড়িয়ে যাবো। কিন্তু যখন আল্লাহর নবী এসে গেলেন তখন তাদের বিমুখতাই বৃদ্ধি পেলো।”(৬:১০৯)

এখানে বলা হয়েছে যে, যখন তাদের এ আকাঙ্ক্ষা পুরো করা হলো তখন তারা কুফরী করতে লাগলো। আল্লাহর সাথে কুফরী করা এবং নবী (সঃ)-কে মিথ্যা প্রতিপন্ন করার পরিণতি কি তা তারা অতি সত্বরই জানতে পারবে।'





সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।