আল কুরআন


সূরা আস-সাফফাত (আয়াত: 146)

সূরা আস-সাফফাত (আয়াত: 146)



হরকত ছাড়া:

وأنبتنا عليه شجرة من يقطين ﴿١٤٦﴾




হরকত সহ:

وَ اَنْۢبَتْنَا عَلَیْهِ شَجَرَۃً مِّنْ یَّقْطِیْنٍ ﴿۱۴۶﴾ۚ




উচ্চারণ: ওয়া আমবাতনা ‘আলাইহি শাজারাতাম মিইঁ ইয়াকতীন।




আল বায়ান: আর আমি একটি ইয়াকতীন* গাছ তার উপর উদগত করলাম।




আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ১৪৬. আর আমরা তার উপর ইয়াকতীন(১) প্ৰজাতির এক গাছ উদগত করলাম,




তাইসীরুল ক্বুরআন: অতঃপর আমি তার উপর লাউ-কুমড়া জাতীয় লতা-পাতাযুক্ত একটা গাছ বের করে দিলাম।




আহসানুল বায়ান: (১৪৬) পরে আমি (তাকে ছায়া দেওয়ার জন্য) এক লাউগাছ উদগত করলাম; [1]



মুজিবুর রহমান: পরে আমি তার উপর এক লাউ গাছ উদগত করলাম।



ফযলুর রহমান: এবং (তাকে ছায়া দেবার জন্য) তার কাছে একটি লাউগাছ জন্মাই।



মুহিউদ্দিন খান: আমি তাঁর উপর এক লতাবিশিষ্ট বৃক্ষ উদগত করলাম।



জহুরুল হক: তখন তাঁর উপরে আমরা জন্মিয়েছিলাম লাউজাতীয় গাছ,



Sahih International: And We caused to grow over him a gourd vine.



তাফসীরে যাকারিয়া

অনুবাদ: ১৪৬. আর আমরা তার উপর ইয়াকতীন(১) প্ৰজাতির এক গাছ উদগত করলাম,


তাফসীর:

(১) ইয়াকতীন আরবী ভাষায় এমন ধরনের গাছকে বলা হয় যা কোন গুড়ির ওপর দাঁড়িয়ে থাকে না বরং লতার মতো ছড়িয়ে যেতে থাকে। যেমন লাউ, তরমুজ, শশা ইত্যাদি। মোটকথা সেখানে অলৌকিকভাবে এমন একটি লতাবিশিষ্ট বা লতানো গাছ উৎপন্ন করা হয়েছিল যার পাতাগুলো ইউনুসকে ছায়া দিচ্ছিল এবং ফলগুলো একই সংগে তার জন্য খাদ্য সরবরাহ করছিল এবং পানিরও যোগান দিচ্ছিল। [দেখুন: তাবারী]


তাফসীরে আহসানুল বায়ান

অনুবাদ: (১৪৬) পরে আমি (তাকে ছায়া দেওয়ার জন্য) এক লাউগাছ উদগত করলাম; [1]


তাফসীর:

[1] يَقْطِين ঐ সকল লতা গাছকে বলা হয়, যা নিজ কান্ডের উপর দাঁড়াতে পারে না, যেমন লাউ, কুমড়া ইত্যাদির গাছ। অর্থাৎ, সেই বালুচরে, যেখানে না কোন গাছ-পালা ছিল আর না ছিল কোন ঘর-বাড়ী । সেখানে একটি ছায়াবিশিষ্ট বৃক্ষ উদগত করে তাকে রক্ষা করলাম।


তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ


তাফসীর: ১৩৯-১৪৮ নম্বর আয়াতের তাফসীর :



অত্র আয়াতগুলোতে আল্লাহ তা‘আলা ইউনুস (আঃ) সম্পর্কে আলোচনা করেছেন।



ইউনুস (আঃ) সম্পর্কে কুরআনের ৬টি সূরার ১৮টি আয়াতে বর্ণনা এসেছে। সূরা ইউনুসের ৯৮ নম্বর আয়াতে তাঁর নাম ইউনুস, সূরা আম্বিয়ার ৮৭ নম্বর আয়াতে যুন-নূন (ذو النون) এবং সূরা কালামের ৪৮ নম্বর আয়াতে তাঁকে সাহেবুল হূত (صاحب الحوت) বলা হয়েছে। ‘নূন’ ও ‘হূত’ উভয় শব্দের অর্থ মাছ। যুন-নূন ও সাহেবুল হূত অর্থ মাছওয়ালা। একটি বিশেষ ঘটনার প্রেক্ষিতে তিনি উক্ত নামে পরিচিত হন।



সংক্ষিপ্ত ঘটনা : আল্লাহ তা‘আলা ইউনুস (আঃ)-কে ইরাকের নীনাওয়া (বর্তমান মুসেল) নামক শহরের নিকটবর্তী জনপদের অধিবাসীদের প্রতি নাবী হিসেবে প্রেরণ করেন। এখানে আশুরীদের শাসন ছিল, যারা এক লক্ষ্য বানী ইসরাঈলকে বন্দী করে রেখেছিল, সুতরাং তাদের হিদায়াত ও পথপ্রদর্শনের জন্য ইউনুস (আঃ)-কে নাবী করে প্রেরণ করা হয়। তিনি যথারীতি তাঁর সম্প্রদায়কে তাওহীদের দিকে আহ্বান করলেন। কিন্তু তারা তাঁর কথায় কর্ণপাত করল না এবং ঈমানও আনল না। বারংবার দাওয়াত দিয়ে প্রত্যাখ্যাত হলে আল্লাহ তা‘আলার হুকুমে তিনি এলাকা ত্যাগ করে চলে যান। ইতোমধ্যে তাঁর জাতির ওপর আযাব নাযিল হওয়ার পূর্বাভাস দেখা দিল। তিনি জনপদ ছেড়ে চলে যাওয়ার সময় বলেছিলেন, তিনদিন পর তোমাদের ওপর আযাব আসতে পারে। তারা ভাবল নাবী কখনো মিথ্যা বলেন না। ফলে তাঁর জাতি ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে দ্রুত কুফর ও শির্ক হতে তাওবা করে এবং সকলকে নিয়ে জঙ্গলে পালিয়ে গেল। সেখানে গিয়ে আসন্ন গযব হতে আল্লাহ তা‘আলার দরবারে আশ্রয় প্রার্থনা করে, ফলে আল্লাহ তা‘আলা তাদের তাওবা কবূল করেন এবং আযাব তুলে নেন। এ সম্পর্কে আল্লাহ তা‘আলা বলেন :



(فَلَوْلَا کَانَتْ قَرْیَةٌ اٰمَنَتْ فَنَفَعَھَآ اِیْمَانُھَآ اِلَّا قَوْمَ یُوْنُسَﺋ لَمَّآ اٰمَنُوْا کَشَفْنَا عَنْھُمْ عَذَابَ الْخِزْیِ فِی الْحَیٰوةِ الدُّنْیَا وَمَتَّعْنٰھُمْ اِلٰی حِیْنٍ)



“অতএব কোন জনপদবাসী কেন এমন হল না যে, তারা এমন সময় ঈমান আনত যখন ঈমান আনলে তাদের উপকারে আসত? তবে ইউনুসের সম্প্রদায় ব্যতীত। তারা যখন ঈমান আনল তখন আমি তাদের হতে পার্থিব জীবনের অপমানজনক শাস্তি তুলে নিলাম এবং তাদেরকে কিছু কালের জন্য জীবনোপকরণ ভোগ করতে দিলাম।” (সূরা ইউনুস ১০ : ৮৬)



ওদিকে ইউনুস (আঃ) ভেবেছিলেন যে, তাঁর জাতি আল্লাহ তা‘আলার গজবে ধ্বংস হয়ে গেছে। কিন্তু পরে জানতে পারলেন যে, আদৌ গযব আসেনি। তখন তিনি চিন্তায় পড়ে গেলেন যে, এখন তাঁর জাতি তাকে মিথ্যাবাদী ভাববে এবং মিথ্যাবাদীর শাস্তি হিসেবে তৎকালীন প্রথানুযায়ী তাকে হত্যা করবে। তখন তিনি জনপদে ফিরে না গিয়ে এমনকি আল্লাহ তা‘আলার হুকুমেরও অপেক্ষা না করে রাগান্বিত হয়ে অন্যত্র হিজরতের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়লেন। এ কথাই অত্র সূরার ১৪০ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে।



أَبَقَ শব্দের অর্থ প্রভুর নিকট থেকে কোন গোলাম পালিয়ে যাওয়া। ইউনুস (আঃ)-এর জন্য এ শব্দ ব্যবহার করার কারণ এই যে, তিনি আল্লাহ তা‘আলার অনুমতি না নিয়েই নিজ এলাকা থেকে চলে গিয়েছিলেন। নাবীরা আল্লাহ তা‘আলার নৈকট্যপ্রাপ্ত বান্দা। তাঁদের সামান্য পদস্খলনও বিরাটাকারে ধরপাকড়ের কারণ হয়ে যায়। এ কারণেই এ কঠোর ভাষা ব্যবহার করা হয়েছে।



মাছের পেটে ইউনুস (আঃ) :



হিজরতকালে নদী পার হওয়ার সময় মাঝ নদীতে হঠাৎ নৌকা ডুবে যাবার উপক্রম হলে মাঝি বলল, একজনকে নদীতে ফেলে দিতে হবে। নইলে সবাইকে ডুবে মরতে হবে।



سَاهَمَ অর্থ লটারী করা। অর্থাৎ কাকে নদীতে ফেলবে এ জন্য লটারী করা হয়। লটারীতে পরপর তিনবার ইউনুস (আঃ) এর নাম আসে। ফলে তিনি নদীতে নিক্ষিপ্ত হন।



ادحاض অর্থ কাউকে অকৃতকার্য করে দেয়া, পরাজিত হওয়া। অর্থাৎ বারবার লটারীতে তিনবার ইউনুস (আঃ) এর নাম উঠতে থাকে ফলে পরাজিত ব্যক্তির ন্যায় সাগরে নিক্ষেপ করা হয়।



নদীতে ফেলে দেয়ার সাথে সাথে আল্লাহ তা‘আলার হুকুমে একটি বিরাটকার মাছ তাঁকে গলধঃকরণ করে। কিন্তু তিনি মাছের পেটে হযম হননি বরং এটা ছিল তাঁর জন্য নিরাপদ কয়েদখানা। মাওয়ার্দী বলেন : মাছের পেটে অবস্থান করাটা তাঁকে শাস্তি দানের উদ্দেশ্যে ছিল না বরং আদব শিক্ষাদানের উদ্দেশ্যে ছিল। যেমন পিতা তার শিশু সন্তানকে শাসন করে শিক্ষা দিয়ে থাকে। (কুরতুবী, সূরা আম্বিয়ার ৮৭ নম্বর আয়াতের তাফসীর)



ইউনুস (আঃ)-এর মুক্তি :



আল্লাহ তা‘আলা বলেন :



(فَلَوْلَآ أَنَّه۫ كَانَ مِنَ الْمُسَبِّحِيْنَ)



অর্থাৎ যদি মাছের পেটে যাওয়ার পূর্ব থেকেই তাঁর অধিক ইবাদত ও সৎআমল না থাকত এবং মাছের পেটে যাওয়ার পর তাওবা ইস্তিগফার ও তাসবীহ পাঠ না করত তাহলে মাছের পেটেই থেকে যেতো, সেখানেই তার কবর হতো এবং সেখান হতেই কিয়ামতের দিন পুনরুত্থান হতো। তাওবাহ-ইস্তিগফার ও তাসবীহ দ্বারা বিপদাপদ দূর হয় এবং তা বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। সূরা আম্বিয়ায় বর্ণিত হয়েছে যে, ইউনুস (আঃ) মাছের পেটে থাকাবস্থায় বিশেষভাবে এ কালেমা পাঠ করতেন-



( لَّآ إِلٰهَ إِلَّآ أَنْتَ سُبْحٰنَكَ ﺣ إِنِّيْ كُنْتُ مِنَ الظّٰلِمِيْنَ)



‘তুমি ব্যতীত কোন সত্যিকার মা‘বূদ নেই; তুমি পবিত্র, মহান! আমি তো সীমা লঙ্ঘনকারীদের অন্তর্ভুক্ত।’ (সূরা আম্বিয়া ২১ : ৮৭)



তাঁর অধিক পরিমাণ ইবাদত ও সৎ আমল এবং তাওবা ইস্তিগফারের ফলে আল্লাহ তা‘আলা তাঁর তাওবা কবূল করত মাছের পেট থেকে জীবিত অবস্থায় নদীর তীরে তরুলতাহীন শূন্য এলাকায় রেখে যাওয়ার ব্যবস্থা করেন। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন :



(فَنَبَذْنٰهُ بِالْعَرَا۬ءِ) العراء



অর্থ গাছ-পালা তরুলতা শূন্য এলাকা। অর্থাৎ মাছের পেট থেকে নিক্ষেপিত হয়ে এক মরু এলাকায় পতিত হলেন, যেখানে কোন গাছ পালা কিছুই ছিল না। তখন ইউনুস (আঃ) স্বাভাবিকভাবেই রুগ্ন ছিলেন। ঐ অবস্থায় সেখানে উদ্গত লাউ জাতীয় গাছের পাতা খেয়ে জীবন ধারণ করেছিলেন যা পুষ্টিগুণ সমৃদ্ধ ছিল।



يَّقْطِيْنٌ ঐ সকল গাছকে বলা হয়, যা নিজ কান্ডের ওপর দাঁড়াতে পারে না। যেমন লাউ, কুমড়া ইত্যাদি গাছ। কোন বর্ণনাতে লাউ গাছের কথা উল্লেখ রয়েছে। ছায়া ও অন্য উপকার নেয়ার জন্য এ ব্যবস্থা করা হয়েছিল।



অতঃপর সুস্থ হয়ে আল্লাহ তা‘আলার হুকুমে নিজ জাতির কাছে ফিরে আসেন। জাতির লোকেরা তাঁর প্রতি ঈমান আনল এবং শির্ক থেকে মুক্ত হয়ে এক আল্লাহ তা‘আলা ইবাদত করতে লাগল, ফলে আল্লাহ তা‘আলা তাদেরকে দুনিয়ার সুখসম্পদ ভোগ করার সুযোগ করে দেন।



(وَأَرْسَلْنٰهُ إِلٰي مِائَةِ) এখান থেকে কোন কোন মুফাসসিরগণ বলতে চেয়েছেন যে, ইউনুস (আঃ) মাছের পেটে যাওয়ার পর নবুওয়াত পেয়েছেন। আল্লামা বাগাভী (রহঃ) বলেন : এ ঘটনার পরে তাঁকে অন্য এক জাতির কাছে প্রেরণ করা হয়েছিল। তাদের সংখ্যা ছিল এক লাখ অথবা ততোধিক। কিন্তু কুরআন ও হাদীস থেকে এ উক্তির কোন সমর্থন পাওয়া যায় না। এখানে ঘটনার শুরুতেই ইউনুস (আঃ)-এর রিসালাত উল্লেখ করা হয়েছে। এতে বুঝা যায় যে, মাছের ঘটনা নাবী হওয়ার পর ঘটেছে। অতঃপর এখানে বাক্যটির পুনরাবৃত্তি করার কারণ এই যে, সুস্থ হওয়ার পর তাঁকে পুনরায় সেখানেই প্রেরণ করা হয়েছিল। এতে ব্যক্ত করা হয়েছে যে, তারা অল্পসংখ্যক লোক ছিল না, বরং তাদের সংখ্যা ছিল লাখেরও ওপরে।



সুতরাং প্রত্যেক ব্যক্তির উচিত নাবীদের দাওয়াত কবূল করে নেয়া। তাহলে দুনিয়ার শাস্তি হতে রক্ষা ও পরকালে মুক্তি পাওয়া সম্ভব। আর ইউনুস (আঃ)-এর উক্ত দু‘আ দু‘আয়ে ইউনুস নামে পরিচিত।



রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন : বিপদগ্রস্ত কোন মুসলিম যদি (নেক মকসূদ হাসিলে নিয়তে)



( لَّآ إِلٰهَ إِلَّآ أَنْتَ سُبْحٰنَكَ ﺣ إِنِّيْ كُنْتُ مِنَ الظّٰلِمِيْنَ)



দু‘আ পাঠ করে, তবে আল্লাহ তা কবূল করবেন। (তিরমিযী হা. ৩৫০৫, মিশকাত হা. ২২৯২, সহীহ)



রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন : কোন মানুষের জন্য এ কথা বলা সমীচীন নয় যে, সে বলবে : আমি “ইউনুস ইবনু মাত্ত্বা” থেকে উত্তম। (সহীহ বুখারী হা. ৩৩৯৫-৩৪১৩, সহীহ মুসলিম হা. ১৬৭) অর্থাৎ নির্দিষ্ট কোন নাবীর মর্যাদার ওপর নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর মর্যাদা বর্ণনা করা যাবে না, সমষ্টিগতভাবে বর্ণনা করা যাবে।



আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয় :



১. বিভ্রান্ত জাতির দুর্ব্যবহারে অতিষ্ট হয়ে তাদেরকে ছেড়ে চলে যাওয়া কোন সমাজ সংস্কারকে উচিত নয়।

২. কঠিন মুহূর্তেও কেবল আল্লাহ তা‘আলার কাছে সাহায্য চাইতে হবে।

৩. খালেস তাওবা ও সৎ আমলের কারণে অনেক সময় আল্লাহ তা‘আলা গযব উঠিয়ে নেন।

৪. আল্লাহ তা‘আলার নির্দেশনা ব্যতীত যেহেতু কোন নাবীর জন্যও কোন কিছু করা সমীচীন নয় অতএব সাধারণ মানুষের উচিত আল্লাহ তা‘আলার বিধান যথাযথভাবে পালন করা।


তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)


তাফসীর: ১৩৯-১৪৮ নং আয়াতের তাফসীর:

হযরত ইউনুস (আঃ)-এর ঘটনা সূরায়ে ইউনুসে বর্ণিত হয়েছে। সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “কারো একথা বলা উচিত নয় যে, সে হযরত ইউনুস ইবনে মাত্তা (আঃ) হতে উত্তম।” মাত্তা সম্ভবতঃ হযরত ইউনুস (আঃ)-এর মাতার নাম। আর এটা তাঁর পিতার নামও হতে পারে।

মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ স্মরণ কর, যখন সে পলায়ন করে বোঝাই নৌযানে পৌঁছলো। অর্থাৎ যখন তিনি পালিয়ে গিয়ে মালভর্তি জাহাজে আরোহণ করেন তখন জাহাজ চলতে শুরু করা মাত্রই ঝড় এসে গেল এবং চারদিক থেকে ঢেউ উঠতে লাগলো এবং জাহাজ দোল খেয়ে ডুবে যাওয়ার উপক্রম হলো। অবস্থা এমনই দাড়িয়ে গেল যে, সবাই মৃত্যুর আশংকা করতে লাগলো।

(আরবী) অর্থাৎ লটারী করা হলো এবং তিনি পরাজিত হলেন। আরোহীরা বললোঃ যাকে লটারীতে পাওয়া গেল তাকে সমুদ্রে নিক্ষেপ কর তাহলেই জাহাজ

ঝটিকা মুক্ত হবে। তিনবার লটারী করা হলো এবং প্রতিবারই নবী (আঃ)-এর নাম উঠলো। তবে আরোহীরা তাঁকে সমুদ্রে নিক্ষেপ করতে ইতস্ততঃ করছিল। কিন্তু নিজেই তিনি কাপড় চোপড় ছেড়ে সমুদ্রে ঝাপিয়ে পড়লেন। মহান আল্লাহ সবুজ সাগরের (সবুজ সাগর বলতে আরবরা আরব উপকূল হতে ভারতের মধ্যবর্তী জলরাশিকে বুঝে) এক বৃহৎ মাছকে আদেশ করলেন যে, সে যেন নবী (আঃ)-কে গলাধঃকরণ করে। উক্ত মাছটি তাঁকে গিলে ফেলে। তবে এতে নবী (আঃ)-এর দেহে কোন আঘাত লাগেনি। মাছটি সমুদ্রে চলাফেরা করতে লাগলো। যখন হযরত ইউনুস (আঃ) সম্পূর্ণরূপে মাছের পেটের মধ্য চলে গেলেন তখন তিনি মনে করলেন যে, তিনি মরে গেছেন। কিন্তু মাথা, হাত, পা প্রভৃতি অঙ্গ প্রত্যঙ্গগুলোকে নড়তে দেখে তিনি বুঝতে পারলেন যে তিনি বেঁচে আছেন। তখন তিনি সেখানেই দাঁড়িয়ে নামায শুরু করে দেন। অতঃপর তিনি আল্লাহর দরবারে প্রার্থনা করেনঃ “হে আমার প্রতিপালক! আপনার জন্যে এমন এক স্থানে আমি মসজিদ বানিয়েছি যেখানে কেউই কখনো পৌঁছবে না।”


তিনি কত দিন মাছের পেটে ছিলেন এ ব্যাপারে মতানৈক্য রয়েছে। কেউ বলেন তিন দিন, কেউ বলেন সাত দিন, কেউ বলেন চল্লিশ দিন এবং কেউ বলেন এক দিনেরও কিছু কম অথবা শুধুমাত্র এক রাত মাছের পেটের মধ্যে অবস্থান করেছিলেন। এ সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান রাখেন একমাত্র আল্লাহ। কবি উমাইয়া ইবনে আবিস সালাতের কবিতায় রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “আপনি (আল্লাহ) স্বীয় অনুগ্রহে ইউনুস (আঃ)-কে মুক্তি দিয়েছেন যিনি কতিপয় রাত্রি মাছের পেটে যাপন করেছিলেন।”

মহান আল্লাহ বলেনঃ “সে যদি আল্লাহর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা না করতো।” অর্থাৎ যখন তিনি সুখ সুবিধা ও স্বচ্ছলতার মধ্যে ছিলেন তখন যদি তিনি সৎ কাজ না করে থাকতেন তাহলে তাকে পুনরুত্থান দিবস পর্যন্ত থাকতে হতো ওর উদরে।

হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ “আরাম-আয়েশ ও সুখ ভোগের সময় আল্লাহর ইবাদত বন্দেগী করো, তাহলে ক্লেশে ও চিন্তাক্লিষ্ট সময়ে আল্লাহ তোমাদের সাহায্য করবেন।” একথাও বলা হয় যে, যদি তিনি নামাযের নিয়মানুবর্তী না হতেন বা মাছের পেটে নামায না পড়তেন অথবা (আরবী) (২১:৮৭)-এ কালেমাটি পাঠ না করতেন (তবে কিয়ামত পর্যন্ত মাছের পেটের মধ্যেই থাকতেন)। মহান আল্লাহ অন্য জায়গায় এ কথাই বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “সে অন্ধকারে ডাক দিয়ে বলেঃ আপনি ছাড়া কোন মা'বুদ নেই, আপনি মহান ও পবিত্র এবং নিশ্চয়ই আমি যালিমদের অন্তর্ভুক্ত হয়েছি। তখন আমি তার ডাকে সাড়া দিলাম এবং তাকে দুঃখ-দুর্দশা ও দুশ্চিন্তা হতে মুক্তি দিলাম আর এভাবেই আমি মুমিনদেরকে মুক্তি দিয়ে থাকি।”(২১:৮৭-৮৮)

হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “হযরত ইউনুস (আঃ) মাছের পেটে যখন (আরবী) এ কালেমা পাঠে রত ছিলেন তখন এই কালেমা আল্লাহর আরশের আশে পাশে ঘুরতে থাকে। তা শুনে ফেরেশতারা বলেনঃ “হে আল্লাহ! এটা তো বহু দূরের শব্দ, কিন্তু এটা তো আমাদের নিকট পরিচিত বলে মনে হচ্ছে (ব্যাপার কিঃ)” উত্তরে আল্লাহ তা'আলা বলেন:“বলতো এটা কার শব্দ?” ফেরেশতারা জবাব দিলেনঃ “তা তো বলতে পারছি না!” তখন মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ “এটা আমার বান্দা ইউনুস (আঃ)-এর শব্দ।` ফেরেশতারা একথা শুনে আরয করলেনঃ “তাহলে কি তিনি ঐ ইউনুস যার সকার্যাবলী এবং প্রার্থনা সদা আকাশ মার্গে উঠে থাকতো! হে আমাদের প্রতিপালক! আপনি তাঁর প্রতি করুণা বর্ষণ করুন! তার প্রার্থনা কবুল করুন। তিনি তো সুখ স্বচ্ছন্দের সময়ও আপনার নাম নিতেন। সুতরাং তাকে এই বিপদ হতে মুক্তি দান করুন!` হান আল্লাহ বললেনঃ “হ্যা, অবশ্যই আমি তাকে মুক্তি দান করবো। অতঃপর তিনি মাছকে নির্দেশ দিলেন এবং সে তাকে এক তৃণহীন প্রান্তরে নিক্ষেপ করলো। সেখানে মহান আল্লাহ হযরত ইউনুস (আঃ)-এর অসুস্থতা ও দুর্বলতার কারণে তার উপর এক লাউ গাছ উদাত করলেন। একটি বন্য গাভী বা হরিণী সকাল-সন্ধ্যা তাঁর নিকট এসে তাঁকে দুধ পান করাতো। (এ হাদীসটি ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন) আমরা ইতিপূর্বে হযরত আবূ হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত হাদীসটি সূরায়ে আম্বিয়ার তাফসীরে লিপিবদ্ধ করেছি।

দজলার তীরে অথবা ইয়ামনের সুজলা, সুফলা ও শস্য-শ্যামলা ভূমিতে তাঁকে রাখা হয়েছিল। ঐ সময় তিনি পাখীর ছানার ন্যায় অত্যন্ত দুর্বল ছিলেন। তাঁর শুধু নিঃশ্বাসটুকু বের হচ্ছিল। সম্পূর্ণরূপে চলৎশক্তি রহিত ছিলেন।

(আরবী) শব্দের অর্থ হলো কদুর গাছের লতা অথবা সেই গাছ যার শাখা হয়। এছাড়া ঐ সব গাছকেও (আরবী) বলা হয় যেগুলোর বয়স এক বছরের বেশী হয় না। এ গাছ তাড়াতাড়ি জন্মে এবং পাতা ঘন ছায়াযুক্ত হয়। তাতে মাছি বসে না। এটা খাদ্য হিসেবেও ব্যবহৃত হয়। উপরের ছালসহ খাওয়া চলে। সহীহ হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) লাউ বা কদু খেতে খুবই ভালবাসতেন এবং পাত্র থেকে বেছে বেছে নিয়ে তা খেতেন।

মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ তাকে আমি লক্ষ বা ততোধিক লোকের প্রতি প্রেরণ করেছিলাম। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, ইতিপূর্বে হযরত ইউনুস (আঃ) নবী ছিলেন না। হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, মাছের পেটে যাওয়ার পূর্ব হতেই তিনি নবী ছিলেন। এই দ্বিমতের সমাধান এভাবে হতে পারে যে, প্রথমে তাকে তাদের প্রতি প্রেরণ করা হয়েছিল। এখন দ্বিতীয়বার আবার তাঁকে তাদেরই প্রতি প্রেরণ করা হয় এবং তারা সবাই ঈমান আনে ও তাঁর সত্যতা স্বীকার করে। বাগাবী (রঃ) বলেন যে, মাছের পেট হতে মুক্তি পাওয়ার পর তিনি অন্য কওমের নিকট প্রেরিত হয়েছিলেন। এখানে শব্দটি বরং অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। তাদের সংখ্যা ছিল এক লক্ষ ত্রিশ হাজার বা এর চেয়েও কিছু বেশী বা সত্তর হাজারের বেশী অথবা এক লক্ষ দশ হাজার। একটি মারফু’ হাদীসের বর্ণনা হিসেবে তাদের সংখ্যা ছিল এক লক্ষ বিশ হাজার। এ ভাবার্থও বর্ণনা করা হয়েছে যে, মানুষের অনুমান এক লক্ষের অধিকই ছিল। ইবনে জারীর (রঃ)-এর মত এটাই। অন্য আয়াতসমূহে যে (আরবী) রয়েছে, এগুলোর ক্ষেত্রেও তার ঐ একই মত। অর্থাৎ এর চেয়ে কম নয়, বরং বেশী। মোটকথা, হয়রত ইউনুস (আঃ)-এর কওমের সবাই আল্লাহর উপর ঈমান আনয়ন করে এবং তাকে সত্য নবী বলে স্বীকার করে নেয়।

এরপর মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ আমি তাদেরকে কিছু কালের জন্যে অর্থাৎ মৃত্যু পর্যন্ত সময়ের জন্যে পার্থিব জীবনোপভোগ করতে দিলাম। অন্য আয়াতে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “কোন গ্রামবাসীর উপর আযাব এসে যাওয়ার পর তাদের ঈমান আনয়ন তাদের কোন উপকারে আসেনি, ইউনুস (আঃ)-এর কওম ছাড়া, তারা যখন ঈমান আনলো তখন আমি তাদের থেকে লাঞ্ছনাজনক আযাব উঠিয়ে নিলাম এবং কিছু কালের জন্যে তাদেরকে জীবনোপভোগ করতে দিলাম।` (১০:৯৮)





সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।