সূরা আস-সাফফাত (আয়াত: 10)
হরকত ছাড়া:
إلا من خطف الخطفة فأتبعه شهاب ثاقب ﴿١٠﴾
হরকত সহ:
اِلَّا مَنْ خَطِفَ الْخَطْفَۃَ فَاَتْبَعَهٗ شِهَابٌ ثَاقِبٌ ﴿۱۰﴾
উচ্চারণ: ইল্লা-মান খাতিফাল খাতফাতা ফাআতবা‘আহূশিহা-বুন ছাকিব।
আল বায়ান: তবে কেউ সন্তর্পণে কিছু শুনে নিলে তাকে পিছু তাড়া করে জ্বলন্ত উল্কাপিন্ড।
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ১০. তবে কেউ হঠাৎ কিছু শুনে ফেললে জ্বলন্ত উল্কাপিণ্ড তার পশ্চাদ্ধাবন করে।
তাইসীরুল ক্বুরআন: তবে কেউ ছোঁ মেরে কিছু শুনে ফেললে জ্বলন্ত উল্কাপিন্ড তার পিছু নেয়।
আহসানুল বায়ান: (১০) তবে কেউ গোপনে হঠাৎ কিছু শুনে ফেললে জ্বলন্ত ঊল্কাপিন্ড তার পশ্চাদ্ধাবন করে।
মুজিবুর রহমান: তবে কেহ হঠাৎ কিছু শুনে ফেললে জ্বলন্ত উল্কাপিন্ড তার পশ্চাদ্ধাবন করে।
ফযলুর রহমান: তবে কেউ (চুরি করে) হঠাৎ কিছু শুনে ফেললে জ্বলন্ত উল্কা তার পেছনে ছোটে।
মুহিউদ্দিন খান: তবে কেউ ছোঁ মেরে কিছু শুনে ফেললে জ্বলন্ত উল্কাপিন্ড তার পশ্চাদ্ধাবন করে।
জহুরুল হক: সে ব্যতীত যে ছিনিয়ে নেয় একটুকুন ছিনতাই, কিন্তু তাকে অনুসরণ করে একটি জ্বলন্ত অগ্নিশিখা।
Sahih International: Except one who snatches [some words] by theft, but they are pursued by a burning flame, piercing [in brightness].
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ১০. তবে কেউ হঠাৎ কিছু শুনে ফেললে জ্বলন্ত উল্কাপিণ্ড তার পশ্চাদ্ধাবন করে।
তাফসীর:
-
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (১০) তবে কেউ গোপনে হঠাৎ কিছু শুনে ফেললে জ্বলন্ত ঊল্কাপিন্ড তার পশ্চাদ্ধাবন করে।
তাফসীর:
-
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ৬-১০ নম্বর আয়াতের তাফসীর :
উক্ত আয়াতে তারকা সৃষ্টির লক্ষ্য-উদ্দেশ্য এবং শয়তান ঊর্ধ্বাকাশে কোন কথা শ্রবণ করতে গেলে যে পরিস্থিতির মুখোমুখি হয় সে সম্পর্কে বলা হয়েছে। আল্লাহ তা‘আলা তারকার সৌন্দর্য দ্বারা দুনিয়ার আকাশকে সুশোভিত করেছেন। আল্লাহ তা‘আলার বাণী :
(وَلَقَدْ زَيَّنَّا السَّمَا۬ءَ الدُّنْيَا بِمَصَابِيْحَ وَجَعَلْنٰهَا رُجُوْمًا لِّلشَّيٰطِيْنِ وَأَعْتَدْنَا لَهُمْ عَذَابَ السَّعِيْرِ)
“আমি নিকটবর্তী আকাশকে সুশোভিত করেছি প্রদীপমালা (তারকারাজী) দ্বারা আর ওগুলো শয়তানদেরকে প্রহার করার উপকরণ করেছি এবং তাদের জন্য প্রস্তুত রেখেছি জাহান্নামের আযাব।” (সূরা মুল্ক ৬৭ : ৫)
এখানে কেবল এতটুকুই বলা উদ্দেশ্য নয় যে, এই তারকাশোভিত আকাশ দেখতে সুন্দর লাগবে এবং দৃষ্টিনন্দন পরিবেশ সৃষ্টি হবে ইত্যাদি। বরং উদ্দেশ্য হল- তারকাশোভিত আকাশ সাক্ষ্য দেয় যে, এগুলো আপনা-আপনি অস্তিত্ব লাভ করেনি। এগুলো একজন স্রষ্টা সৃষ্টি করেছেন। যে সত্তা এসব বস্তুকে অস্তিত্ব দান করেছেন তাঁর কোন শরীক বা অংশীদারের প্রয়োজন নেই। এ ছাড়া মুশরিকদের কাছেও এ কথা স্বীকৃত যে, সমগ্র সৌরজগতের স্রষ্টাই আল্লাহ তা‘আলা। অতএব আল্লাহ তা‘আলাকে স্রষ্টা ও মালিক জেনেও অন্যের ইবাদত করা সত্যি সত্যি মহা অবিচার ও জুলুম।
(وَحِفْظًا مِّنْ كُلِّ شَيْطَانٍ مَّارِدٍ)
অর্থাৎ আকাশে কোন কথা বা ফায়সালা হলে শয়তান যেন তা শুনে নিতে না পারে সে জন্য এ তারকাগুলোকে বিতাড়িত শয়তানের জন্য ক্ষেপণাস্ত্রস্বরূপ বানিয়ে আকাশকে সংরক্ষণ করা হয়েছে। ফলে শয়তানরা ঊর্ধ্ব জগতের কোন কথাই চুরি করে শুনতে পারে না।
যখন তারা সেখানে কান পেতে শুনতে যায় তখনই তাদেরকে আগুনের উল্কাপিণ্ড নিক্ষেপ করে আঘাত করা হয়। যেমন সূরা জিনের শানে নুযূলে বলা হবে- ইবনু আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত তিনি বলেন : রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) একদল সাহাবীকে নিয়ে উকায বাজারের দিকে রওনা হলেন। এ সময়ই জিনদের আসমানী খবরাদি শোনার ব্যাপারে বাধা দেয়া হয়েছে এবং ছুঁড়ে মারা হয়েছে তাদের বিরুদ্ধে লেলিহান অগ্নিশিখা। ফলে জিন শয়তানরা ফিরে আসলে অন্য জিনরা তাদেরকে বলল : তোমাদের কী হয়েছে? তারা বলল : আসমানী খবরাদি সংগ্রহ করার ক্ষেত্রে আমাদের ওপর বাধা দেওয়া হয়েছে এবং আমাদের প্রতি লেলিহান অগ্নিশিখা ছুঁড়ে মারা হয়েছে। তখন শয়তান বলল : আসমানী খবরাদি সংগ্রহের ব্যাপারে তোমাদের প্রতি যে বাধা সৃষ্টি হয়েছে তা অবশ্যই নতুন কোন ঘটনা ঘটার কারণে হয়েছে। উল্কাপিন্ড বা অগ্নিশিখা সম্পর্কে প্রাচীন গ্রীক দার্শনিকদের মত হল- তা ভূ-ভাগে উৎপন্ন এক প্রকার উপাদান, যা বাষ্পের সাথে ওপরে উত্থিত হয় এবং অগ্নিমণ্ডলের নিকটে পৌঁছে বিস্ফোরিত হয়। কিন্তু কুরআনের বাহ্যিক ভাষা থেকে প্রতীয়মান হয় যে, উল্কাপিণ্ড ভূ-ভাগে উৎপন্ন কোন উপাদান নয়, বরং তা ঊর্ধ্বজগতেই উৎপন্ন হয়। উল্কাপিন্ড সম্পর্কে প্রাচীন গ্রীকদের ধারণা নিছক অনুমান ও আন্দাজের ওপর নির্ভরশীল। আধুনিক বিজ্ঞান বলে : উল্কাপিণ্ড অসংখ্য তারকারাজিরই ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অংশ যা সাধারণতঃ বড় আকারের হয়ে থাকে। এগুলো মহাশূন্যে অবস্থান করে এবং ৩৩ বছরে একবার সূর্যকে প্রদক্ষিণ করে। এগুলোর সমষ্টিকেই উল্কা (ংযড়ড়ঃরহম ংঃধৎ) বলা হয়। পৃথিবীর নিকটবর্তী হলে এরা পৃথিবীর মধ্যাকর্ষণ দ্বারাও আকৃষ্ট হয়। তখন প্রচণ্ড বেগে এ উল্কা ভূ-পৃষ্ঠের দিকে ছুটে আসে। বায়ূমন্ডলের নিম্নস্তরে ৬০ মাইল দূরত্বে পৌঁছলে তা বাতাসের ঘর্ষণে প্রজ্জ্বলিত ও ভষ্মীভূত হয়। ঊর্ধ্বাকাশে পরিলক্ষিত অধিকাংশ উল্কাই বায়ুমণ্ডলে জ্বলে নিঃশেষ হয়ে যায়। ইংরেজিতে এগুলোকে (গবঃবড়ৎড়ফ) বলা হয়।
আগস্টের ১০ তারিখ এবং নভেম্বরের ২৭ তারিখে এগুলো অধিক পরিলক্ষিত হয় এবং ২০ শে এপ্রিল, ২৮ শে নভেম্বর, ১৮ ই অক্টোবর ও ৬, ৯, ও ১৩ ই ডিসেম্বর রাতে হ্রাস পায়। (আল জাওয়াজাহির)
সুতরাং বুঝা গেল, উল্কাপিন্ড ভূ-ভাগে সৃষ্ট নয়, বরং ঊর্ধ্বাকাশেই উৎপন্ন হয়। এসব উল্কাপিন্ড সৃষ্টির অনেক রহস্য রয়েছে। তার মধ্যে অন্যতম হল দুনিয়ার আকাশকে সুশোভিত করা, আল্লাহ তা‘আলার এককত্বের প্রমাণ বহন ও শয়তানের বিরুদ্ধে ক্ষেপণাস্ত্রস্বরূপ।
আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয় :
১. পৃথিবীর আকাশকে তারকা দ্বারা সুশোভিত করা হয়েছে।
২. তারকারাজি সৃষ্টির উদ্দেশ্য সম্পর্কে অবগত হলাম।
৩. কোন শয়তান আসমানী খবর চুরি করে আনতে সক্ষম হয় না, কখনো একটি চুরি করতে পারলে তার সাথে শতটা মিথ্যা সংমিশ্রণ করে।
৪. উল্কাপিন্ড সম্পর্কে কুরআনের তথ্য অবগত হলাম।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: ৬-১০ নং আয়াতের তাফসীর:
আল্লাহ্ তা'আলা খবর দিচ্ছেন যে, দুনিয়ার আকাশকে তারকামণ্ডলী দ্বারা তিনি সুশোভিত করেছেন। (আরবী) ও (আরবী) উভয়ভাবেই পড়া হয়েছে। উভয় অবস্থাতেই একই অর্থ হবে। আকাশের নক্ষত্ররাজি এবং ওর সূর্যের কিরণ যমীনকে আলোকোজ্জ্বল করে তুলে। যেমন অন্য আয়াতে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি নিকটবর্তী আকাশকে সুশোভিত করেছি প্রদীপমালা দ্বারা এবং ওগুলোকে করেছি শয়তানের প্রতি নিক্ষেপের উপকরণ এবং তাদের জন্যে প্রস্তুত রেখেছি জ্বলন্ত অগ্নির শাস্তি।” (৬৭:৫) আর এক জায়গায় বলেছেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি আকাশে রাশিচক্র বানিয়েছি এবং ওকে দর্শকদের চোখে সৌন্দর্যময় জিনিস করেছি। প্রত্যেক বিতাড়িত শয়তান হতে ওকে রক্ষিত রেখেছি। যে কেউ কোন কথা চুরি করে শুনবার চেষ্টা করে তার পশ্চাদ্ধাবন করে এক তীক্ষ্ণ অগ্নিশিখা।” (১৫:১৬-১৮) মহান আল্লাহ বলেনঃ আমি আসমানকে হিফাযত করেছি প্রত্যেক দুষ্ট ও উদ্ধত শয়তান হতে। ফলে তারা উধ্বজগতের কিছু শ্রবণ করতে পারে না। চুরি করে শুনবার চেষ্টা করলে এবং হঠাৎ কিছু শুনে ফেললে তাদেরকে তাড়ানোর জন্যে জ্বলন্ত উল্কাপিণ্ড তাদের পশ্চাদ্ধাবন করে। তারা আকাশ পর্যন্ত পৌঁছতেই পারে না। আল্লাহ্ শরীয়ত ও তকদীর বিষয়ের কোন আলাপ-আলোচনা তারা শুনতেই পারে না। এ ব্যাপারে বর্ণিত হাদীসগুলো আমরা ... (আরবী) (৩৪:২৩) এই আয়াতের তাফসীরে বর্ণনা করে দিয়েছি।
মহামহিমান্বিত আল্লাহ্ বলেনঃ যেই দিক থেকে তারা আকাশে উঠতে চায় সেই দিক থেকেই তাদের উপর অগ্নি নিক্ষেপ করা হয়। তাদেরকে বিতাড়িত ও লজ্জিত করার উদ্দেশ্যে বাধা দেয়া ও আসতে না দেয়ার জন্যে এই শাস্তির ব্যবস্থা করা হয়েছে। আর তাদের জন্যে পরকালের স্থায়ী শাস্তি তো বাকী রয়েছেই যা হবে খুবই যন্ত্রণাদায়ক। যেমন মহামহিমান্বিত আল্লাহ্ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি তাদের জন্যে প্রস্তুত রেখেছি জ্বলন্ত অগ্নির শাস্তি।”(৬৭:৫)
প্রবল প্রতাপান্বিত আল্লাহ বলেনঃ হ্যা, তবে যদি কোন জ্বিন ফেরেশতাদের কোন কথা শুনে তার নীচের কাউকেও বলে দেয় তবে দ্বিতীয়জন তার নীচের অপরজনকে তা বলার পূর্বেই জ্বলন্ত অগ্নি তার পিছনে ধাবিত হয়। আর কখনো কখনো তারা সে কথা অপরের কানে পৌছিয়ে দিতে সক্ষম হয় এবং এ কথাই যাদুকররা বর্ণনা করে থাকে।
(আরবী) শব্দের অর্থ অত্যন্ত তে এবং অত্যধিক উজ্জ্বল ও জ্যোতির্ময়। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, পূর্বে শয়তানরা আকাশে গিয়ে বসতো এবং অহী শুনতো। ঐ সময় তাদের উপর তারকা নিক্ষিপ্ত হতো না। সেখানকার কথা নিয়ে তারা একের জায়গায় দশটি কথা বেশী করে বানিয়ে নিয়ে যাদুকরদেরকে বলে দিতো। অতঃপর যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) নবুওয়াত লাভ করলেন তখন তাদের আকাশে যাওয়া বন্ধ হয়ে গেল। তখন থেকে তারা সেখানে গিয়ে কান পাতলে তাদের উপর অগ্নিশিখা নিক্ষিপ্ত হতো। যখন তারা এই নতুন ঘটনা অভিশপ্ত ইবলীসকে জানালো তখন সে বললোঃ “নতুন বিশেষ কোন জরুরী ব্যাপারে এরূপ সতর্কতা অবলম্বন করা হয়েছে। সুতরাং সংবাদ জানার জন্যে সে তার দলবলকে পৃথিবীতে পাঠিয়ে দিলো। ঐ দলটি হিজাযের দিকে গেল। তারা দেখলো যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) নাখলার দু'টি পাহাড়ের মাঝে নামাযে রত আছেন। তারা এ খবর ইবলীস শয়তানকে জানালে সে বললোঃ “এই কারণেই তোমাদের আসমানে যাতায়াত বন্ধ হয়ে গেছে।” এর পূর্ণ বিবরণ ইনশাআল্লাহ্ নিম্নের আয়াতগুলোর তাফসীরে আসবে যেগুলোতে জ্বিনদের উক্তি উদ্ধৃত হয়েছ। আয়াতগুলো হলোঃ (আরবী) অর্থাৎ “এবং আমরা চেয়েছিলাম আকাশের তথ্য সংগ্রহ করতে; কিন্তু আমরা দেখতে পেলাম কঠোর প্রহরী ও উল্কাপিণ্ড দ্বারা আকাশ পরিপূর্ণ। আর পূর্বে আমরা আকাশের বিভিন্ন ঘাঁটিতে সংবাদ শুনার জন্যে বসতাম, কিন্তু এখন কেউ সংবাদ শুনতে চাইলে সে তার উপর নিক্ষেপের জন্য প্রস্তুত জ্বলন্ত উল্কাপিণ্ডের সম্মুখীন হয়। আমরা জানি না যে, জগতবাসীর অমঙ্গলই অভিপ্রেত, না তাদের প্রতিপালক তাদের মঙ্গল চান।”(৭২:৮-১০)
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।