আল কুরআন


সূরা ইয়াসীন (আয়াত: 65)

সূরা ইয়াসীন (আয়াত: 65)



হরকত ছাড়া:

اليوم نختم على أفواههم وتكلمنا أيديهم وتشهد أرجلهم بما كانوا يكسبون ﴿٦٥﴾




হরকত সহ:

اَلْیَوْمَ نَخْتِمُ عَلٰۤی اَفْوَاهِهِمْ وَ تُکَلِّمُنَاۤ اَیْدِیْهِمْ وَ تَشْهَدُ اَرْجُلُهُمْ بِمَا کَانُوْا یَکْسِبُوْنَ ﴿۶۵﴾




উচ্চারণ: আলইয়াওমা নাখতিমু‘আলাআফওয়া-হিহিম ওয়াতুকালিলমুনা আইদীহিম ওয়া তাশহাদু আরজুলুহুম বিমা-কা-নূইয়াকছিবূন।




আল বায়ান: আজ আমি তাদের মুখে মোহর মেরে দেব এবং তাদের হাত আমার সাথে কথা বলবে ও তাদের পা সে সম্পর্কে সাক্ষ্য দেবে যা তারা অর্জন করত।




আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৬৫. আমরা আজ এদের মুখ মোহর করে দেব, এদের হাত কথা বলবে আমাদের সাথে এবং এদের পা সাক্ষ্য দেবে এদের কৃতকর্মের।(১)




তাইসীরুল ক্বুরআন: আজ আমি তাদের মুখে সীল মোহর লাগিয়ে দেব, তাদের হাত আমার সঙ্গে কথা বলবে, আর তারা যা করত সে সম্পর্কে তাদের পাগুলো সাক্ষ্য দেবে।




আহসানুল বায়ান: (৬৫) আমি আজ এদের মুখে মোহর মেরে দেব, এদের হাত আমার সঙ্গে কথা বলবে এবং এদের পা এদের কৃতকর্মের সাক্ষী দেবে।[1]



মুজিবুর রহমান: আমি আজ এদের মুখে মোহর লাগিয়ে দিব। এদের হাত কথা বলবে আমার সাথে এবং এদের পা সাক্ষ্য দিবে এদের কৃতকর্মের।



ফযলুর রহমান: আজ আমি তাদের মুখে মোহর মেরে দেব এবং তাদের হাত আমার সাথে কথা বলবে ও তাদের পা তাদের কৃতকর্মের সাক্ষ্য দেবে।



মুহিউদ্দিন খান: আজ আমি তাদের মুখে মোহর এঁটে দেব তাদের হাত আমার সাথে কথা বলবে এবং তাদের পা তাদের কৃতকর্মের সাক্ষ্য দেবে।



জহুরুল হক: সেইদিন আমরা তাদের মুখের উপর মোহর মেরে দেব, বরং তাদের হাত আমাদের সাথে কথা বলবে, আর তাদের পা সাক্ষ্য দেবে যা তারা অর্জন করত সে-সন্বন্ধে।



Sahih International: That Day, We will seal over their mouths, and their hands will speak to Us, and their feet will testify about what they used to earn.



তাফসীরে যাকারিয়া

অনুবাদ: ৬৫. আমরা আজ এদের মুখ মোহর করে দেব, এদের হাত কথা বলবে আমাদের সাথে এবং এদের পা সাক্ষ্য দেবে এদের কৃতকর্মের।(১)


তাফসীর:

(১) হাশরে হিসাব-নিকাশের জন্য উপস্থিতির সময় প্রথমে প্রত্যেকেই যা ইচ্ছা ওযর বর্ণনা করার স্বাধীনতা পাবে। মুশরিকরা সেখানে কসম করে কুফর ও শিরক অস্বীকার করবে। তারা বলবে, “আল্লাহর শপথ আমরা মুশরিক ছিলাম না” [সূরা আল-আন’আম: ২৩] তাদের কেউ বলবে, আমাদের আমলনামায় ফেরেশতা যা কিছু লিখেছে, আমরা তা থেকে মুক্ত। তখন আল্লাহ তাআলা তাদের মুখে মোহর এটে দেবেন, যাতে তারা কোন কিছুই বলতে না পারে। অতঃপর তাদেরই হাত, পা ও অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে রাজসাক্ষী করে কথা বলার যোগ্যতা দান করা হবে। তারা কাফেরদের যাবতীয় কার্যকলাপের সাক্ষ্য দেবে। আলোচ্য আয়াতে হাত ও পায়ের কথা উল্লিখিত হয়েছে। অন্য আয়াতে মানুষের কর্ণ, চক্ষু ও চার্মের সাক্ষ্য দানের উল্লেখিত রয়েছে। [যেমন, সূরা ফুসসিলাত: ২১–২২, সূরা নূর: ২৪]।

এখানে এ প্রশ্ন দেখা দেয় যে, একদিকে আল্লাহ বলেন, আমি এদের কণ্ঠ রুদ্ধ করে দেবো এবং অন্যদিকে সূরা নূরের আয়াতে বলেন, এদের কণ্ঠ সাক্ষ্য দেবে এ দু'টি বক্তব্যের মধ্যে কিভাবে সামঞ্জস্য বিধান করা যাবে? এর জবাব হচ্ছে, কণ্ঠ রুদ্ধ করার অর্থ হলো, তাদের কথা বলার ক্ষমতা কেড়ে নেয়া। এরপর তারা স্বেচ্ছায় নিজেদের মর্জি মাফিক কথা বলতে পারবে না। আর কণ্ঠের সাক্ষ্যদানের অর্থ হচ্ছে, পাপিষ্ঠ লোকেরা তাদেরকে কোন কোন কাজে লাগিয়েছিল, তাদের মাধ্যমে কেমন সব কুফরী কথা বলেছিল, কোন ধরনের মিথ্যা উচ্চারণ করেছিল, কতপ্রকার ফিতনা সৃষ্টি করেছিল এবং কোন কোন সময় তাদের মাধ্যমে কোন কোন কথা বলেছিল। সেসব বিবরণ তাদের কণ্ঠ স্বতস্ফূৰ্তভাবে দিয়ে যেতে থাকবে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বিভিন্ন হাদীসে এ ভয়াবহ অবস্থার বর্ণনা এসেছে।

আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, আমরা একবার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর কাছে ছিলাম। এমন সময় তিনি এমনভাবে হাসলেন যে, তার মাড়ির দাঁত দেখা গেল। তারপর তিনি বললেন, তোমরা কি জানো আমি কেন হাসছি? আমরা বললাম: আল্লাহ ও তাঁর রাসূলই ভাল জানেন। তিনি বললেনঃ কিয়ামতের দিন বান্দা তার প্রভুর সাথে যে ঝগড়া করবে তা নিয়ে হাসছি। সে বলবে, হে রব, আমাকে কি আপনি যুলুম থেকে নিরাপত্তা দেননি? তিনি বলবেন, হ্যাঁ, তখন সে বলবে, আমি আমার বিরুদ্ধে নিজের ছাড়া অন্য কারও সাক্ষ্য গ্ৰহণ করবো না। তখন আল্লাহ্ বলবেন, তুমি নিজেই তোমার হিসেবের জন্য যথেষ্ঠ। আর সম্মানিত লেখকবৃন্দকে সাক্ষ্য বানাব। তারপর তার মুখের উপর মোহর মেরে দেয়া হবে এবং তার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে কথা বলার নির্দেশ দেয়া হবে। ফলে সেগুলো তাদের কাজের বিবরণ দিবে। তারপর তাদেরকে কথা বলার অনুমতি দেয়া হবে তখন তারা বলবে, তোমাদের ধ্বংস হোক, তোমাদের জন্যই তো আমি প্রতিরোধ করছিলাম। [মুসলিম: ২৯৬৯]

অন্য হাদীসে এসেছে, তোমাদেরকে মূক করে ডাকা হবে। তারপর প্রথম তোমাদের উরু এবং দু’হাতকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। [মুসনাদে আহমাদ: ৪/৪৪৬, ৪৪৭, ৫/৪–৫] অন্য হাদীসে এসেছে। ... তারপর তৃতীয় জনকে ডাকা হবে। আর তাকে জিজ্ঞাসা করা হবে, তুমি কে? সে বলবে: আমি আপনার বান্দা, আপনার প্রতি ঈমান এনেছি এবং আপনার নবী ও কিতাবাদির প্রতিও। আর আপনার জন্য সালাত, সাওম, সাদাকাহ ইত্যাদি ভাল কাজের প্রশংসা করে তা আদায় করার দাবী করবে। তখন তাকে বলা হবে, আমরা কি তোমার জন্য আমাদের সাক্ষীকে উপস্থাপন করব না? তখন সে চিন্তা করবে যে, এমন কে আছে যে, তার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেয়? আর তখনই তার মুখের উপর মোহর এটে দেয়া হবে এবং তার উরুকে বলা হবে, কথা বল। তখন তার উরু, গোস্ত, হাঁড় যা করেছে তার সাক্ষ্য দিবে। আর এটাই হলো মুনাফিক। এটা এজন্যই যাতে তিনি (আল্লাহ) নিজের ওজর পেশ করতে পারেন এবং তার উপরই আল্লাহ অসন্তুষ্ট। [মুসলিম: ২৯৬৮]


তাফসীরে আহসানুল বায়ান

অনুবাদ: (৬৫) আমি আজ এদের মুখে মোহর মেরে দেব, এদের হাত আমার সঙ্গে কথা বলবে এবং এদের পা এদের কৃতকর্মের সাক্ষী দেবে।[1]


তাফসীর:

[1] এই মোহর লাগানোর প্রয়োজন এই জন্য হবে যে, কিয়ামতের দিন প্রথম দিকে মুশরিকরা মিথ্যা বলবে এবং বলবে, (واللهِ رَبِّنَا مَا كُنَّا مُشْرِكِيْنَ) অর্থাৎ, ঐ আল্লাহর শপথ যিনি আমাদের প্রভু, আমরা মুশরিক ছিলাম না। (সূরা আনআম ২৩ আয়াত) সুতরাং আল্লাহ তাআলা তাদের মুখে মোহর লাগিয়ে দেবেন, ফলে তারা কথা বলার শক্তি থেকে বঞ্চিত হয়ে যাবে। তবে আল্লাহ তাআলা মানুষের শরীরের অন্য অঙ্গকে কথা বলার শক্তি প্রদান করবেন। সুতরাং হাত বলবে, ‘আমার দ্বারা সে এই এই কর্ম করেছিল’ এবং পা তার সাক্ষী দেবে। ঠিক এইভাবে স্বীকার ও সাক্ষী, উভয় পর্যায় পার হয়ে যাবে। এ ছাড়া কথা বলতে সক্ষম বস্তুর মোকাবেলায় কথা বলতে অক্ষম বস্তুর কথা বলে সাক্ষ্য দেওয়া, দলীল ও প্রমাণ হিসাবে অধিক প্রভাবশালী হয়; যেহেতু তাতে অলৌকিক বিষয় পাওয়া যায়। (ফাতহুল ক্বাদীর) মুখ ছাড়া অন্য অঙ্গের কথা বলার বিষয়টি হাদীসসমূহেও বর্ণিত হয়েছে। (দেখুন সহীহ মুসলিমঃ কিতাবুয্ যুহদ)


তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ


তাফসীর: ৫৯-৬৭ নম্বর আয়াতের তাফসীর :



পূর্বের আয়াতগুলোতে জান্নাতীদের আরাম-আয়েশের বর্ণনা দেয়ার পর এ আয়াতগুলোতে কিয়ামতের মাঠে জাহান্নামীদের কিরূপ অবস্থা হবে তা বর্ণনা করেছেন। কিয়ামতের মাঠে জাহান্নামীদেরকে বলা হবে- হে আদম সন্তান! আমি কি তোমাদের সতর্ক করিনি যে, তোমরা শয়তানের ইবাদত করবে না, সে তোমাদের প্রকাশ্য শত্র“, তোমরা একমাত্র আমার ইবাদত করবে? কিন্তু তোমরা তা মাননি, নিষেধ করার পরও তোমরা আমার সাথে শয়তানের ইবাদত করেছ। সুতরাং আজ তোমরা সৎ লোকদের থেকে পৃথক হয়ে যাও। আল্লাহ তা‘আলার বাণী :



(وَيَوْمَ تَقُوْمُ السَّاعَةُ يَوْمَئِذٍ يَّتَفَرَّقُوْنَ)‏



“আর যেদিন কিয়ামত অনুষ্ঠিত হবে, সেদিন মানুষ আলাদা আলাদা হয়ে যাবে।” (সূরা রূম ৩০ : ১৪)



আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন :



(وَيَوْمَ نَحْشُرُهُمْ جَمِيْعًا ثُمَّ نَقُوْلُ لِلَّذِيْنَ أَشْرَكُوْا مَكَانَكُمْ أَنْتُمْ وَشُرَكَآؤُكُمْ ج فَزَيَّلْنَا بَيْنَهُمْ وَقَالَ شُرَكَآؤُهُمْ مَّا كُنْتُمْ إِيَّانَا تَعْبُدُوْنَ)



“এবং সেদিন আমি তাদের সকলকে একত্র করে যারা মুশরিক তাদেরকে বলব, ‘তোমরা এবং তোমরা যাদেরকে শরীক করেছিলে তারা স্ব স্ব স্থানে অবস্থান কর‎’; আমি তাদেরকে পরস্পর হতে পৃথক করে দিব এবং তারা যাদেরকে শরীক করেছিল তারা বলবে, ‘তোমরা তো আমাদের ‘ইবাদত করতে না।” (সূরা ইউনুস ১০ : ২৮)



আর তাদেরকে বলা হবে, তোমরা জাহান্নামে প্রবেশ করো যার ওয়াদা তোমাদেরকে দেয়া হয়েছিল এবং তোমরা যার প্রতি মিথ্যা আরোপ করেছিলে। ফেরেশতাদেরকে বলা হবে, তাদেরকে জাহান্নামের দিকে নিয়ে যাওয়ার জন্য। আল্লাহ তা‘আলার বাণী :



(اُحْشُرُوا الَّذِيْنَ ظَلَمُوْا وَأَزْوَاجَهُمْ وَمَا كَانُوْا يَعْبُدُوْنَ لا - مِنْ دُوْنِ اللّٰهِ فَاهْدُوْهُمْ إِلٰي صِرَاطِ الْجَحِيْمِ )



“(ফেরেশতাদেরকে বলা হবে : ) একত্র কর যালিমদেরকে এবং তাদের সাথীদেরকে আর তাদেরকে যাদের তারা ‘ইবাদত করত আল্লাহ ব্যতীত। অতএব তাদেরকে হাঁকিয়ে নিয়ে যাও জাহান্নামের পথে।” (সূরা সফফাত ৩৭ : ২২-২৩)



এ অঙ্গীকার হলো সে অঙ্গীকার যা আদম (আঃ)-এর পিঠ থেকে সন্তানদেরকে বের করার পর নেওয়া হয়েছিল। অথবা ঐ অসিয়ত যা নাবীদের মুখে মানুষকে করা হয়েছে।



এরপর আল্লাহ তা‘আলা বলেন : হাশরের হিসাব-নিকাশের জন্য উপস্থিতির সময় প্রথমে প্রত্যেকে ওযর পেশ করতে থাকবে। মুশরিকরা কসম করে বলবে, আমরা শির্ক করিনি। আল্লাহ তা‘আলা মুশরিকদের সম্পর্কে বলেন :



(وَاللّٰهِ رَبِّنَا مَا كُنَّا مُشْرِكِينَ)



“আল্লাহর শপথ! হে আমাদের রব, আমরা মুশরিক ছিলাম না।” কেউ বলবে, আমাদের আমলনামায় ফেরেশতারা যা কিছু লিখেছে তা থেকে আমরা মুক্ত। তখন আল্লাহ তা‘আলা তাদের মুখে মোহর মেরে দেবেন। তাদের হাত, পা তাদের কৃতকর্মের সাক্ষ্য দিবে। এ সম্পর্কে সূরা নূর-এর ২৪ নম্বর আয়াতে আলোচনা করা হয়েছে।



অতঃপর আল্লাহ তা‘আলা বলেন : আমি যদি ইচ্ছা করতাম তাহলে তাদের চক্ষুগুলোকে নষ্ট করে দিতে পারতাম। তখন তারা সৎ পথে চলতে চাইলে কি করে দেখতে পেত? আর যদি ইচ্ছা করতাম তাহলে তাদেরকে তাদের নিজেদের স্থানে বিকৃত করে দিতে পারতাম। তাদের চেহারা পরিবর্তন করে দিয়ে তাদেরকে ধ্বংস করে দিতাম। ফলে তারা চলতে পারত না। অর্থাৎ তারা সামনেও যেতে পারত না এবং পেছনেও ফিরে আসতে পারত না। বরং মূর্তির মতো একই জায়গায় বসে থাকত।



অতত্রব সকল প্রকার শয়তানী কর্মকান্ড ছেড়ে দিয়ে একমাত্র আল্লাহ তা‘আলার ইবাদত করে আখেরাতের সফলতা অর্জনের চেষ্টা করা উচিত।



আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয় :



১. শয়তানের অনুসরণ করা যাবে না, কারণ সে ভ্রান্ত পথের নির্দেশ দেয়।

২. কিয়ামতের মাঠে অপরাধীদের মুখে মোহর মেরে দেয়া হবে এবং তাদের হাত, পা, কর্ণ তাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিবে।


তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)


তাফসীর: ৬৩-৬৭ নং আয়াতের তাফসীর:

জাহান্নাম জ্বলন্ত, শিখাযুক্ত ও বিকট চীৎকার করা অবস্থায় সামনে আসবে এবং কাফিরদেরকে বলা হবেঃ “এটা ঐ জাহান্নাম আল্লাহর রাসূলগণ যার বর্ণনা দিতেন। যার থেকে তারা ভয় দেখাতেন এবং তোমরা তাদেরকে অবিশ্বাস করতে ও মিথ্যাবাদী বলতে। সুতরাং এখন তোমরা তোমাদের কুফরীর স্বাদ গ্রহণ কর। ওঠো, এর মধ্যে ঝাঁপিয়ে পড়।” যেমন মহিমান্বিত আল্লাহ অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “যেই দিন তাদেরকে জাহান্নামের আগুনের দিকে ধাক্কা দিয়ে নিয়ে যাওয়া হবে এবং বলা হবেঃ এটা ঐ জাহান্নাম যাকে তোমরা অবিশ্বাস করতে। বল তো, এটা কি যাদু, না তোমরা কিছুই দেখতে পাও না?”(৫২:১৩-১৫)

কিয়ামতের দিন যখন কাফির ও মুনাফিকরা নিজেদের পাপ অস্বীকার করবে এবং ওর উপর শপথ করবে তখন আল্লাহ তা'আলা তাদের মুখ বন্ধ করে দিবেন এবং তাদের দেহের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলো সত্য সাক্ষ্য দিতে শুরু করবে।

হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ একদা আমরা নবী (সঃ)-এর নিকট ছিলাম, হঠাৎ তিনি হেসে উঠলেন, এমন কি তাঁর দাঁতের মাড়ি পর্যন্ত দেখা গেল। অতঃপর তিনি বললেনঃ “আমি কেন হাসলাম তা তোমরা জান কি?` উত্তরে আমরা বললামঃ আল্লাহ ও তাঁর রাসূলই (সঃ) খুব ভাল জানেন। তিনি তখন বললেনঃ কিয়ামতের দিন বান্দার তার প্রতিপালকের সাথে বিতর্কে লিপ্ত হওয়ার ব্যাপারটাই আমাকে হাসিয়েছে। সে বলবেঃ “হে আমার প্রতিপালক! আপনি কি আমাকে যুলুম হতে রক্ষা করেননি?” আল্লাহ তা'আলা উত্তর দিবেনঃ “হ্যা, অবশ্যই। বান্দা তখন বলবেঃ “তাহলে আমার বিপক্ষে কোন সাক্ষ্যদানকারীর সাক্ষ্য আমি স্বীকার করবো না। আমার দেহ শুধু আমার নিজের। বাকী সবাই আমার শত্রু।` তখন আল্লাহ তা'আলা বলবেনঃ “আচ্ছা, ঠিক আছে, তাই হবে। তুমি নিজেই তোমার সাক্ষী হবে এবং আমার সম্মানিত লিপিকর ফেরেশতারা সাক্ষী হবে।” লাগিয়ে দেয়া হবে এবং তার দেহের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলোকে বলা হবেঃ তোমরা নিজেরাই সাক্ষ্য দাও যা সে করেছে। তারা তখন স্পষ্টভাবে খুলে খুলে সত্য সত্যভাবে প্রত্যেক কাজের কথা বলে দিবে। তারপর তার মুখ খুলে দেয়া হবে। সে তখন নিজের দেহের জোড় এবং অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলোকে বলবেঃ তোমাদের জন্যে অভিশাপ! তোমরাই আমার শত্রু হয়ে গেলে? তোমাদেরকে বাঁচাবার জন্যেই তো আমি চেষ্টা করেছিলাম এবং তোমাদেরই উপকারার্থে তর্ক-বিতর্ক করছিলাম।” (এ হাদীসটি ইবনে আবি হাতিম (রঃ), ইমাম মুসলিম (রঃ) এবং ইমাম নাসাঈ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)

হযরত বাহ ইবনে হাকীম (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি তাঁর পিতা হতে এবং তিনি তাঁর দাদা হতে বর্ণনা করেছেন যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “নিশ্চয়ই তোমাদেরকে তোমাদের প্রতিপালকের সামনে আহ্বান করা হবে যখন তোমাদের মুখ বন্ধ থাকবে। সর্বপ্রথম উরু ও স্কন্ধকে প্রশ্ন করা হবে।` (এ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন ইমাম নাসাঈ (রঃ))

কিয়ামতের একটি দীর্ঘ হাদীসে আছে যে, ততীয়বারে তাকে বলা হবেঃ “তুমি কি?” সে জবাবে বলবেঃ “আমি আপনার বান্দা। আমি আপনার উপর আপনার নবী (সঃ)-এর উপর এবং আপনার কিতাবের উপর ঈমান এনেছিলাম। রোযা, নামায, যাকাত ইত্যাদির আমি পাবন্দ ছিলাম।” আরো বহু পুণ্যের কাজের কথা সে বলতে থাকবে। ঐ সময় তাকে বলা হবেঃ “আচ্ছা, থামো। আমি সাক্ষী হাযির করছি।” সে চিন্তা করবে যে, কাকেই বা সাক্ষীরূপে পেশ করা হবে। হঠাৎ তার মুখ বন্ধ করে দেয়া হবে। অতঃপর তার উরুকে বলা হবেঃ “তুমি সাক্ষ্য দাও।” তখন উরু, অস্থি এবং গোশত কথা বলে উঠবে এবং ঐ মুনাফিকের সমস্ত কপটতা ও গোপন কথা প্রকাশ করে দিবে। এসব এজন্যেই হবে যাতে তার কোন যুক্তি পেশ করার সুযোগ না থাকে এবং শাস্তি হতে সে রক্ষা না পায়। আল্লাহ তা'আলা তার প্রতি অসন্তুষ্ট ছিলেন বলেই পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে তার হিসাব নেয়া হবে। (এ হাদীসটি ইমাম আবু দাউদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)

অন্য একটি হাদীসে আছে যে, মুখের উপর মোহর লেগে যাওয়ার পর সর্বপ্রথম মানুষের বাম উরু কথা বলবে।

হযরত আবু মূসা আশআরী (রাঃ) বলেন যে, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলা মুমিনকে ডেকে তার সামনে তার পাপ পেশ করে বলবেনঃ “এটা কি ঠিক?” সে উত্তরে বলবেঃ “হে আমার প্রতিপালক! হ্যাঁ, অবশ্যই আমি এ কাজ করেছি।” তিনি বলেন যে, আল্লাহ তাআলা তার পাপরাশি মার্জনা করে দিবেন এবং তিনি এগুলো গোপন করে রাখবেন। তার একটি পাপও সৃষ্টজীবের কারো কাছে প্রকাশিত হবে না। অতঃপর তার পুণ্যগুলো আনয়ন করা হবে এবং সমস্ত মাখলুকের সামনে ওগুলো খোলাখুলিভাবে প্রকাশ করে দেয়া হবে। তারপর কাফির ও মুনাফিককে আহ্বান করা হবে। অতঃপর তাকে বলা হবে:“তুমি এসব কাজ করেছিলে কি?” তখন সে অস্বীকার করে বলবেঃ “হে আমার প্রতিপালক! আপনার মর্যাদার শপথ! আপনার এই ফেরেশতা এমন কিছু লিখেছেন যা আমি করিনি।” তখন ফেরেশতা বলবেনঃ “তুমি কি এটা অমুক দিন অমুক জায়গায় করনি?” সে জবাব দিবেঃ ‘না। হে আমার প্রতিপালক! আপনার ইযযতের কসম! আমি এটা করিনি।” যখন সে এ কথা বলবে তখন আল্লাহ তার মুখ বন্ধ করে দিবেন। হযরত আবু মূসা (রাঃ)-এর ধারণায়। সর্বপ্রথম তার ডান উরু তার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিবে। অতঃপর তিনি ... (আরবী)-এই আয়াতটি পাঠ করেন। (ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) এটা বর্ণনা করেছেন)

এরপর মহান আল্লাহ বলেনঃ আমি ইচ্ছা করলে তাদের চক্ষুগুলোকে লোপ করে দিতে পারতাম, তখন তারা পথ চলতে চাইলে কি করে দেখতে পেতো? আর যদি আমি ইচ্ছা করতাম তবে তাদেরকে তাদের নিজেদের স্থানে বিকৃত করে দিতে পারতাম। তাদের চেহারা পরিবর্তন করে দিয়ে তাদেরকে ধ্বংস করে দিতাম, তাদেরকে পাথর বানিয়ে দিতাম এবং তাদের পা ভেঙ্গে দিতাম। ফলে তখন তারা চলতে পারতো না। অর্থাৎ তারা সামনেও যেতে পারতো না এবং পিছনেও ফিরে আসতে পারতো না। বরং মূর্তির মত একই জায়গায় বসে থাকতো।





সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।