আল কুরআন


সূরা ইয়াসীন (আয়াত: 59)

সূরা ইয়াসীন (আয়াত: 59)



হরকত ছাড়া:

وامتازوا اليوم أيها المجرمون ﴿٥٩﴾




হরকত সহ:

وَ امْتَازُوا الْیَوْمَ اَیُّهَا الْمُجْرِمُوْنَ ﴿۵۹﴾




উচ্চারণ: ওয়াম তা-যুল ইয়াওমা আইয়ুহাল মুজরিমূন।




আল বায়ান: আর [বলা হবে] ‘হে অপরাধীরা, আজ তোমরা পৃথক হয়ে যাও’।




আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৫৯. আর হে অপরাধীরা! তোমরা আজ পৃথক হয়ে যাও।(১)




তাইসীরুল ক্বুরআন: (সে দিন বলা হবে) ‘হে অপরাধীরা! আজ তোমরা আলাদা হয়ে যাও।’




আহসানুল বায়ান: (৫৯) আর (বলা হবে,) ‘হে অপরাধিগণ! তোমরা আজ পৃথক হয়ে যাও।’ [1]



মুজিবুর রহমান: আর হে অপরাধীরা! তোমরা আজ পৃথক হয়ে যাও।



ফযলুর রহমান: আর (অপরাধীদেরকে বলা হবে:) হে অপরাধীরা! আজ তোমরা পৃথক হয়ে যাও।



মুহিউদ্দিন খান: হে অপরাধীরা! আজ তোমরা আলাদা হয়ে যাও।



জহুরুল হক: আর "আজ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাও, হে অপরাধিগণ!



Sahih International: [Then He will say], "But stand apart today, you criminals.



তাফসীরে যাকারিয়া

অনুবাদ: ৫৯. আর হে অপরাধীরা! তোমরা আজ পৃথক হয়ে যাও।(১)


তাফসীর:

(১) হাশরের ময়দানে প্রথমে মানুষ বিক্ষিপ্ত অবস্থায় সমবেত হবে। অন্য আয়াতে এ অবস্থার চিত্ৰ বৰ্ণনা করে বলা হয়েছে, “তারা হবে বিক্ষিপ্ত পঙ্গপালের মত” [সূরা আল কামার: ৭] কিন্তু পরে কর্মের ভিত্তিতে তাদের পৃথক পৃথক দলে বিভক্ত করা হবে। এর দু'টি অর্থ হতে পারে। একটি হচ্ছে, অপরাধীরা সৎকর্মশীল মুমিনদের থেকে ছাঁটাই হয়ে আলাদা হয়ে যাও। কারণ দুনিয়ায় তোমরা তাদের সম্প্রদায়, পরিবার ও গোষ্ঠির অন্তর্ভুক্ত থাকলে থাকতে পারো, কিন্তু এখানে এখন তোমাদের সাথে তাদের কোন সম্পর্ক নেই। ফলে কাফের, মুমিন, সৎকর্মী ও অসৎকর্মী লোকগণ পৃথক পৃথক জায়গায় অবস্থান করবে। অন্য আয়াতে বলা হয়েছে, “আর যখন আত্মাসমূহকে জোড়া জোড়া করা হবে।” [সূরা আত-তাকওয়ীর: ৭] আলোচ্য আয়াতেও এ পৃথকীকরণ ব্যক্ত হয়েছে।

অনুরূপভাবে এ পৃথকীকরণের কথা কুরআনের অন্যান্য সূরায়ও বর্ণিত হয়েছে, যেমন: সূরা ইউনুস: ৩৮, সূরা আর-রূম: ১৪, ৪৩, সূরা আস-সাফফাত: ২২–২৩। দ্বিতীয় অর্থ হচ্ছে, তোমরা নিজেদের মধ্যে আলাদা হয়ে যাও। এখন তোমাদের কোন দল ও জোট থাকতে পারে না। তোমাদের সমস্ত দল ভেঙ্গে দেয়া হয়েছে। তোমাদের সকল প্রকার সম্পর্ক ও আত্মীয়তা খতম করে দেয়া হয়েছে। তোমাদের প্রত্যেক ব্যক্তিকে এখন একাকী ব্যক্তিগতভাবে নিজের কৃতকর্মের জন্য জবাবদিহি করতে হবে। [দেখুন: কুরতুবী, ফাতহুল কাদীর]


তাফসীরে আহসানুল বায়ান

অনুবাদ: (৫৯) আর (বলা হবে,) ‘হে অপরাধিগণ! তোমরা আজ পৃথক হয়ে যাও।” [1]


তাফসীর:

[1] অর্থাৎ, মু’মিনদের থেকে আলাদা হয়ে দাঁড়াও। অর্থাৎ, হাশরের ময়দানে মু’মিন ও অনুগত এবং কাফের ও অবাধ্যকে আলাদা আলাদা করে দেওয়া হবে। যেমন অন্য স্থানে মহান আল্লাহ বলেন

(وَيَوْمَ تَقُوْمُ السَّاعَةُ يَوْمَئِذٍ يَّتَفَرَّقُوْنَ (يَوْمَئِذٍ يَّصَّدَّعُوْنَ) أي :يَصِيْرُوْنَ صَدْعَيْنِ فِرْقَتَيْنِ

অর্থাৎ, সেই দিন মানুষ দুই দলে বিভক্ত হয়ে যাবে। (সূরা রূম ১৪, ৪৩ আয়াত) দ্বিতীয় উদ্দেশ্য হল যে, পাপীদেরকেই বিভিন্ন দলে বিভক্ত করে দেওয়া হবে। যেমন ইয়াহুদীদের দল, খ্রিষ্টানদের দল, বেদ্বীনদের দল, অগ্নিপূজকদের দল, ব্যভিচারীদের দল, মদ্যপায়ীদের দল ইত্যাদি ইত্যাদি।


তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ


তাফসীর: ৫৯-৬৭ নম্বর আয়াতের তাফসীর :



পূর্বের আয়াতগুলোতে জান্নাতীদের আরাম-আয়েশের বর্ণনা দেয়ার পর এ আয়াতগুলোতে কিয়ামতের মাঠে জাহান্নামীদের কিরূপ অবস্থা হবে তা বর্ণনা করেছেন। কিয়ামতের মাঠে জাহান্নামীদেরকে বলা হবে- হে আদম সন্তান! আমি কি তোমাদের সতর্ক করিনি যে, তোমরা শয়তানের ইবাদত করবে না, সে তোমাদের প্রকাশ্য শত্র“, তোমরা একমাত্র আমার ইবাদত করবে? কিন্তু তোমরা তা মাননি, নিষেধ করার পরও তোমরা আমার সাথে শয়তানের ইবাদত করেছ। সুতরাং আজ তোমরা সৎ লোকদের থেকে পৃথক হয়ে যাও। আল্লাহ তা‘আলার বাণী :



(وَيَوْمَ تَقُوْمُ السَّاعَةُ يَوْمَئِذٍ يَّتَفَرَّقُوْنَ)‏



“আর যেদিন কিয়ামত অনুষ্ঠিত হবে, সেদিন মানুষ আলাদা আলাদা হয়ে যাবে।” (সূরা রূম ৩০ : ১৪)



আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন :



(وَيَوْمَ نَحْشُرُهُمْ جَمِيْعًا ثُمَّ نَقُوْلُ لِلَّذِيْنَ أَشْرَكُوْا مَكَانَكُمْ أَنْتُمْ وَشُرَكَآؤُكُمْ ج فَزَيَّلْنَا بَيْنَهُمْ وَقَالَ شُرَكَآؤُهُمْ مَّا كُنْتُمْ إِيَّانَا تَعْبُدُوْنَ)



“এবং সেদিন আমি তাদের সকলকে একত্র করে যারা মুশরিক তাদেরকে বলব, ‘তোমরা এবং তোমরা যাদেরকে শরীক করেছিলে তারা স্ব স্ব স্থানে অবস্থান কর‎’; আমি তাদেরকে পরস্পর হতে পৃথক করে দিব এবং তারা যাদেরকে শরীক করেছিল তারা বলবে, ‘তোমরা তো আমাদের ‘ইবাদত করতে না।” (সূরা ইউনুস ১০ : ২৮)



আর তাদেরকে বলা হবে, তোমরা জাহান্নামে প্রবেশ করো যার ওয়াদা তোমাদেরকে দেয়া হয়েছিল এবং তোমরা যার প্রতি মিথ্যা আরোপ করেছিলে। ফেরেশতাদেরকে বলা হবে, তাদেরকে জাহান্নামের দিকে নিয়ে যাওয়ার জন্য। আল্লাহ তা‘আলার বাণী :



(اُحْشُرُوا الَّذِيْنَ ظَلَمُوْا وَأَزْوَاجَهُمْ وَمَا كَانُوْا يَعْبُدُوْنَ لا - مِنْ دُوْنِ اللّٰهِ فَاهْدُوْهُمْ إِلٰي صِرَاطِ الْجَحِيْمِ )



“(ফেরেশতাদেরকে বলা হবে : ) একত্র কর যালিমদেরকে এবং তাদের সাথীদেরকে আর তাদেরকে যাদের তারা ‘ইবাদত করত আল্লাহ ব্যতীত। অতএব তাদেরকে হাঁকিয়ে নিয়ে যাও জাহান্নামের পথে।” (সূরা সফফাত ৩৭ : ২২-২৩)



এ অঙ্গীকার হলো সে অঙ্গীকার যা আদম (আঃ)-এর পিঠ থেকে সন্তানদেরকে বের করার পর নেওয়া হয়েছিল। অথবা ঐ অসিয়ত যা নাবীদের মুখে মানুষকে করা হয়েছে।



এরপর আল্লাহ তা‘আলা বলেন : হাশরের হিসাব-নিকাশের জন্য উপস্থিতির সময় প্রথমে প্রত্যেকে ওযর পেশ করতে থাকবে। মুশরিকরা কসম করে বলবে, আমরা শির্ক করিনি। আল্লাহ তা‘আলা মুশরিকদের সম্পর্কে বলেন :



(وَاللّٰهِ رَبِّنَا مَا كُنَّا مُشْرِكِينَ)



“আল্লাহর শপথ! হে আমাদের রব, আমরা মুশরিক ছিলাম না।” কেউ বলবে, আমাদের আমলনামায় ফেরেশতারা যা কিছু লিখেছে তা থেকে আমরা মুক্ত। তখন আল্লাহ তা‘আলা তাদের মুখে মোহর মেরে দেবেন। তাদের হাত, পা তাদের কৃতকর্মের সাক্ষ্য দিবে। এ সম্পর্কে সূরা নূর-এর ২৪ নম্বর আয়াতে আলোচনা করা হয়েছে।



অতঃপর আল্লাহ তা‘আলা বলেন : আমি যদি ইচ্ছা করতাম তাহলে তাদের চক্ষুগুলোকে নষ্ট করে দিতে পারতাম। তখন তারা সৎ পথে চলতে চাইলে কি করে দেখতে পেত? আর যদি ইচ্ছা করতাম তাহলে তাদেরকে তাদের নিজেদের স্থানে বিকৃত করে দিতে পারতাম। তাদের চেহারা পরিবর্তন করে দিয়ে তাদেরকে ধ্বংস করে দিতাম। ফলে তারা চলতে পারত না। অর্থাৎ তারা সামনেও যেতে পারত না এবং পেছনেও ফিরে আসতে পারত না। বরং মূর্তির মতো একই জায়গায় বসে থাকত।



অতত্রব সকল প্রকার শয়তানী কর্মকান্ড ছেড়ে দিয়ে একমাত্র আল্লাহ তা‘আলার ইবাদত করে আখেরাতের সফলতা অর্জনের চেষ্টা করা উচিত।



আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয় :



১. শয়তানের অনুসরণ করা যাবে না, কারণ সে ভ্রান্ত পথের নির্দেশ দেয়।

২. কিয়ামতের মাঠে অপরাধীদের মুখে মোহর মেরে দেয়া হবে এবং তাদের হাত, পা, কর্ণ তাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিবে।


তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)


তাফসীর: ৫৯-৬২ নং আয়াতের তাফসীর:

আল্লাহ তা'আলা খবর দিচ্ছেন যে, সৎ লোকদেরকে অসৎ লোকদের থেকে পৃথক করে দেয়া হবে। কাফিরদেরকে বলা হবেঃ তোমরা মুমিনদের থেকে দূর হয়ে যাও। মহান আল্লাহ বলেনঃ অতঃপর আমি কাফিরদেরকে মুমিনদের হতে পৃথক করে দিবো। আল্লাহ তা'আলা অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “যেই দিন কিয়ামত সংঘটিত হবে সেই দিন তারা পৃথক পৃথক হয়ে যাবে।`(৩০:১৪) আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “(ফেরেশতাদেরকে বলা হবে) একত্রিত কর যালিম ও তাদের সহচরদেরকে এবং তাদেরকে যাদের ইবাদত করতো তারা আল্লাহর পরিবর্তে এবং তাদেরকে পরিচালিত কর জাহান্নামের পথে।”(৩৭:২২-২৩)

জান্নাতীদের উপর যেমনভাবে নানা প্রকারের দয়া-দাক্ষিণ্য করা হবে তেমনই কাফিরদের উপর নানা প্রকারের কঠোরতা করা হবে। ধমক ও শাসন গর্জনের সুরে তাদেরকে বলা হবেঃ আমি কি তোমাদেরকে নির্দেশ দিইনি যে, তোমরা শয়তানের দাসত্ব করো না, কারণ সে তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু? কিন্তু এতদসত্ত্বেও তোমরা পরম দয়ালু আল্লাহর অবাধ্যাচরণ করেছে এবং শয়তানের আনুগত্য করেছে। সৃষ্টিকর্তা, অধিকর্তা এবং আহার্যদাতা হলাম আমি, আর আনুগত্য করা হবে আমার দরবার হতে বিতাড়িত শয়তানের? আমি তো বলে দিয়েছিলাম যে, তোমরা শুধু আমাকেই মানবে এবং শুধুমাত্র আমারই ইবাদত করবে। আমার কাছে পৌঁছবার সঠিক, সরল ও সোজা পথ এটাই। কিন্তু তোমরা চলেছে উল্টো পথে। সুতরাং এখানেও উল্টোভাবেই থাকো। সৎ লোকদের ও তোমাদের পথ পৃথক হয়ে গেল। তারা জান্নাতী এবং তোমরা জাহান্নামী।

(আরবী) দ্বারা বহু সৃষ্টিকে বুঝানো হয়েছে। অভিধানে (আরবী) এবং (আরবী)-এই। উভয়রূপেই বলা হয়ে থাকে।

অর্থাৎ শয়তান তোমাদের বহু লোককে বিভ্রান্ত করেছে ও সঠিক পথ হতে সরিয়ে দিয়েছে। তোমাদের কি এটুকু জ্ঞান ছিল না যে, তোমরা এর ফায়সালা করতে পারতে যে, পরম দয়ালু আল্লাহকে মানবে, না শয়তানকে মানবে? সৃষ্টিকর্তার ইবাদত করবে, না সৃষ্টের উপাসনা করবে?

হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা'আলার নির্দেশক্রমে জাহান্নাম তার ঘাড় বের করবে, যা হবে অন্ধকারময়ও প্রকাশমান। সে বলবেঃ “হে আদম সন্তান! আল্লাহ তা'আলা কি তোমাদেরকে নির্দেশ দেননি যে, তোমরা শয়তানের দাসত্ব করবে না, কারণ সে তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু? আর শুধু তাঁরই ইবাদত করবে, এটাই সরল পথ? শয়তান তো তোমাদের বহু দলকে বিভ্রান্ত করেছিল, তবুও কি তোমরা বুঝনি? হে পাপী ও অপরাধীরা! আজ তোমরা পৃথক হয়ে যাও।` প্রত্যেকেই তখন হাঁটুর ভরে পড়ে যাবে। প্রত্যেককেই তার আমলনামার দিকে ডাকা হবে। মহান আল্লাহ বলবেনঃ “আজ তোমাদেরকে তারই প্রতিফল দেয়া হবে যা তোমরা করতে। (এটা ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন)





সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।