সূরা ইয়াসীন (আয়াত: 51)
হরকত ছাড়া:
ونفخ في الصور فإذا هم من الأجداث إلى ربهم ينسلون ﴿٥١﴾
হরকত সহ:
وَ نُفِخَ فِی الصُّوْرِ فَاِذَا هُمْ مِّنَ الْاَجْدَاثِ اِلٰی رَبِّهِمْ یَنْسِلُوْنَ ﴿۵۱﴾
উচ্চারণ: ওয়ানুফিখা ফিসসূরি ফাইযা-হুম মিনাল আজদা-ছিইলা-রাব্বিহিম ইয়ানছিলূন।
আল বায়ান: আর শিঙ্গায় ফুঁক দেয়া হবে, তৎক্ষণাৎ তারা কবর থেকে তাদের রবের দিকে ছুটে আসবে।
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৫১. আর যখন শিংগায় ফুঁক দেয়া হবে তখনই তারা কবর থেকে ছুটে আসবে তাদের রবের দিকে।(১)
তাইসীরুল ক্বুরআন: আর যখন শিঙ্গায় ফুঁক দেয়া হবে, তখনই তারা ক্ববর থেকে তাদের পালনকর্তার দিকে ছুটে আসবে।
আহসানুল বায়ান: (৫১) যখন শিঙ্গায় ফুৎকার দেওয়া হবে[1] তখন মানুষ কবর থেকে তাদের প্রতিপালকের দিকে ছুটে আসবে।
মুজিবুর রহমান: যখন শিঙ্গায় ফুৎকার দেয়া হবে তখনই তারা কাবর হতে ছুটে আসবে তাদের রবের দিকে।
ফযলুর রহমান: আর শিঙ্গায় ফুঁক দেওয়া হবে; অমনি তারা কবর থেকে (উঠে) তাদের প্রভুর দিকে ছুটে চলবে।
মুহিউদ্দিন খান: শিংগায় ফুঁক দেয়া হবে, তখনই তারা কবর থেকে তাদের পালনকর্তার দিকে ছুটে চলবে।
জহুরুল হক: আর শিঙায় ফুৎকার দেওয়া হবে, তখন দেখো! তারা কবরগুলো থেকে তাদের প্রভুর দিকে ছুটে আসবে।
Sahih International: And the Horn will be blown; and at once from the graves to their Lord they will hasten.
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ৫১. আর যখন শিংগায় ফুঁক দেয়া হবে তখনই তারা কবর থেকে ছুটে আসবে তাদের রবের দিকে।(১)
তাফসীর:
(১) صور শব্দের অর্থ শিঙ্গা। সঠিক মত অনুসারে কিয়ামতের শিঙ্গার ফুঁক দুটি। এক, ধ্বংসের ফুৎকার। যার কথা এ সূরারই ৪৯ নং আয়াতে বর্ণনা করা হয়েছে। দুই. পূনরুত্থানের জন্য ফুৎকার। এ আয়াতে এ ফুৎকারের কথাই আলোচনা করা হয়েছে। [আদওয়াউল বায়ান]। তখনকার অবস্থা বর্ণনা করে বলা হয়েছে যে, যখন শিংগায় ফুঁক দেয়া হবে তখনই তারা কবর থেকে ছুটে আসবে তাদের প্রতিপালকের দিকে। এখানে ينسلون শব্দটি نسلان থেকে উদ্ভূত। যার অর্থ দ্রুত চলা। [ইবন কাসীর]
অন্য এক আয়াতে এসেছে, “যেদিন তাদের উপরস্থ জমীন বিদীর্ণ হবে এবং মানুষ ত্ৰস্ত-ব্যস্ত হয়ে ছুটোছুটি করবে, এ সমবেত সমাবেশকরণ আমার জন্য সহজ।” [সূরা কাফ: ৪৪] আরও এসেছে, “সেদিন তারা কবর থেকে বের হবে দ্রুতবেগে, মনে হবে তারা যেন কোন উপাসনালয়ের দিকে ধাবিত হচ্ছে”। [সূরা মা'আরিজ: ৪৩] অপর আয়াতে বলা হয়েছে, “হাশরের সময় মানুষ কবর থেকে উঠে দেখতে থাকবে।” [সূরা আয-যুমার: ৬৮]
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (৫১) যখন শিঙ্গায় ফুৎকার দেওয়া হবে[1] তখন মানুষ কবর থেকে তাদের প্রতিপালকের দিকে ছুটে আসবে।
তাফসীর:
[1] প্রথম মত অনুযায়ী এটা দ্বিতীয় ফুৎকার এবং দ্বিতীয় মত অনুযায়ী এটা তৃতীয় ফুৎকার হবে, যাকে نَفْخَةُ الْبَعْثِ وَالنُّشُوْرِ বলা হয়। এতে মানুষ কবর থেকে জীবিত হয়ে উঠে দাঁড়াবে। (ইবনে কাসীর)
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ৪৫-৫৪ নম্বর আয়াতের তাফসীর :
পূর্বের আয়াতগুলোতে আল্লাহ তা‘আলা তা’আলা কয়েকটি নির্দশন বর্ণনা করার পর এখানে তিনি বলছেন : তাওহীদ ও রিসালতের সত্যতা প্রমাণে যে কোন নির্দশন তাদের কাছে এসেছে তারা সকল নির্দশন নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করেছে এবং মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে।
(مَا بَيْنَ أَيْدِيْكُمْ وَمَا خَلْفَكُمْ)
‘যা তোমাদের সামনে রয়েছে এবং যা তোমাদের পিছনে আছে’ অর্থাৎ যে আমলগুলো তোমরা অতীতে করেছ এবং তোমাদের সামনে যে কবর, জাহান্নাম রয়েছে সে জন্য ভয় কর।
(وَإِذَا قِيْلَ لَهُمْ أَنْفِقُوْا)
অর্থাৎ তাদেরকে যখন বলা হয়- অভাবী গরীব মিসকীনদেরকে দান কর এবং আল্লাহ তা‘আলার রাস্তায় ব্যয় করো ঐ সকল জীবিকা হতে যা আল্লাহ তা‘আলা তোমাদেরকে দান করেছেন। তখন তারা বলে যে, আল্লাহ তা‘আলার ইচ্ছা হলে তিনি নিজেই তো তাদেরকে খেতে দিতে পারতেন? সুতরাং তিনি যেহেতু তাদেরকে খাওয়াননি তাহলে আমরা কেন তাদেরকে খাওয়াব? অতএব তোমরা আমাদের এ গরীব-মিসকিনদেরকে খাওয়ানোর কথা বলে অন্যায় কাজ করছ। আমরা তাদের পিছনে অর্থ-সম্পদ খরচ করব না।
(مَتٰي هٰذَا الْوَعْدُ)
‘এ প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন কখন হবে?’ অর্থাৎ কাফির-মুশরিকরা কিয়ামত সংঘঠিত হওয়াকে অসম্ভব মনে করে জিজ্ঞাসা করে কিয়ামত কখন হবে? আল্লাহ তা‘আলা বলছেন, মূলত তারা একটি মহা গর্জনের অপেক্ষা করছে।
অর্থাৎ মানুষ বাজারে কেনা-বেচা এবং স্বাভাবিক অভ্যাস অনুযায়ী কথাবার্তা ও বাক-বিতণ্ডায় লিপ্ত থাকবে, এমন সময় হঠাৎ শিঙ্গায় ফুঁৎকার দেয়া হবে এবং কিয়ামত সংঘঠিত হয়ে যাবে। এটা হবে প্রথম ফুঁৎকার, যাকে نفخة الفزع বলা হয়। বলা হয়েছে যে, এর পরে দ্বিতীয় ফুঁৎকার হবে, যাকে نفخة الصعق বলা হয়। যাতে আল্লাহ তা‘আলা ছাড়া সমস্ত জীব মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়বে।
وَنُفِخَ فِي الصُّوْر
অর্থাৎ প্রথম মত অনুযায়ী এটা দ্বিতীয় ফুঁৎকার এবং দ্বিতীয় মত অনুযায়ী এটা তৃতীয় ফুৎকার হবে, যাকে
نفخة البعث و النشور
বলা হয়। এতে মানুষকে কবর থেকে জীবিত করা হবে। (ইবনু কাসীর)
الْأَجْدَاثِ শব্দটি جدث এর বহুবচন, অর্থ কবর। يَنْسِلُوْنَ শব্দটি نسلان থেকে উদ্ভূত। অর্থ দ্রুত চলা। অর্থাৎ তারা দ্রুত কবর থেকে বের হবে। অন্য আয়াতে রয়েছে : হাশরের সময় মানুষ কবর থেকে উঠে দেখতে থাকবে। এ বক্তব্য পূর্ববর্তী বক্তব্যের পরিপন্থী নয়, কারণ প্রথমাবস্থায় বিস্মিত হয়ে দন্ডায়মান অবস্থায় দেখতে থাকবে এবং পরে দ্রুতগতিতে হাশরের দিকে দৌড়াতে থাকবে।
(مَنْۭ بَعَثَنَا مِنْ مَّرْقَدِنَا)
‘কে আমাদেরকে আমাদের কবর থেকে উঠাল?’ অর্থাৎ মু’মিনরা কবরে যে আরাম-আয়েশে ছিল কিয়ামত সংঘটিত হলে তা বর্জন করে উঠতে হবে আর কাফিররা কবরের আযাবের চেয়ে আরো কঠিন আযাবের সম্মুখিন হবে তাই তারা সবাই এ কথা বলবে। ফেরেশতারা তাদের কথার জবাবে বলবে :
(هٰذَا مَا وَعَدَ الرَّحْمٰنُ وَصَدَقَ الْمُرْسَلُوْنَ)
‘দয়াময় আল্লাহ তো এরই ওয়াদা দিয়েছিলেন এবং রাসূলগণ সত্যই বলেছিলেন।’
অতঃপর আল্লাহ তা‘আলা বলেন, কিয়ামতের দিবসে কারো প্রতি কোন প্রকার জুলুম করা হবে না। প্রত্যেকে যা আমল করবে তাকে তারই প্রতিদান দেয়া হবে। সুতরাং যে যা আমল করবে কিয়ামতের দিন সে তা-ই পাবে।
আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয় :
১. আল্লাহ তা‘আলার বিধানের প্রতি ঠাট্টা-বিদ্রূপ করা যাবে না।
২. আল্লাহ তা‘আলার রাস্তায় বেশি বেশি ব্যয় করা উচিত, এতে নেকীর পাল্লা ভারী হবে।
৩. কিয়ামত মানুষের নিকট হঠাৎ চলে আসবে। তারা বুঝতেও পারবে না। সুতরাং সর্বদা ভাল কাজ করতে হবে মন্দ কাজ করা যাবে না।
৪. বিচারের মাঠে কারো প্রতি কোন জুলুম করা হবে না, প্রত্যেকে আপন-আপন কর্মের ফল পাবে।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: ৫১-৫৪ নং আয়াতের তাফসীর:
এই আয়াতগুলোতে দ্বিতীয় ফুৎকারের বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যার দ্বারা মৃতরা জীবিত হয়ে যাবে। (আরবী) ক্রিয়া পদটির (আরবী) হলো (আরবী) এবং এর অর্থ হচ্ছে দ্রুত গতিতে চলা। যেমন আল্লাহ্ তা'আলা অন্য আয়াতে বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “সেদিন তারা কবর হতে বের হবে দ্রুত বেগে, মনে হবে তারা কোন একটি লক্ষ্যস্থলের দিকে ধাবিত হচ্ছে।” (৭০:৪৩) যেহেতু দুনিয়ায় তারা কবর হতে জীবিতাবস্থায় উত্থিত হওয়াকে অবিশ্বাস করতো, সেই হেত সেদিন তারা বলবেঃ ‘হায়! দুর্ভোগ আমাদের! কে আমাদেরকে আমাদের নিদ্ৰাস্থল হতে উঠালো।' এর দ্বারা কবরে আযাব না হওয়া প্রমাণিত হয় না। কেননা, ঐ সময় তারা যে ভীষণ কষ্ট ও বিপদের সম্মুখীন হবে তার তুলনায় কবরের শাস্তি তাদের কাছে খুবই হালকা অনুভূত হবে। তারা যেন কবরে আরামেই ছিল।
কোন কোন গুরুজন একথাও বলেছেন যে, কবর হতে উত্থিত হওয়ার কিছু পূর্বে সত্যি সত্যিই তাদের ঘুম এসে যাবে। হযরত কাতাদা (রঃ) বলেন যে, প্রথম ফুৎকার ও দ্বিতীয় ফুৎকারের মধ্যবর্তী সময়ে তারা ঘুমিয়ে পড়বে। তাই কবর হতে উঠার সময় তারা এ কথা বলবে। ঈমানদার লোকেরা এর জবাবে বলবেঃ দয়াময় আল্লাহ্ তো এরই প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন এবং তাঁর রাসূলগণ সত্যি কথাই বলতেন। একথাও বলা হয়েছে যে, ফেরেশতারা এই জবাব দিবেন। এ দু’টি উক্তির মধ্যে সামঞ্জস্য বিধানের উপায় এই যে, হয়তো এ জবাব মুমিনরাও দিবে এবং ফেরেশতারাও দিবেন। এসব ব্যাপারে সঠিক জ্ঞানের অধিকারী একমাত্র আল্লাহ্।
আব্দুর রহমান ইবনে যায়েদ (রঃ) বলেন যে, এগুলো সবই কাফিরদের উক্তি। কিন্তু সঠিক কথা ওটাই যা আমরা বর্ণনা করলাম। যেমন সূরায়ে সাফাতে আল্লাহ তা'আলা বলেছেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “এবং তারা বলবেঃ হায়! দুর্ভোগ আমাদের! এটাই তো কর্মফল দিবস। এটাই ফায়সালার দিন যা তোমরা অস্বীকার করতে।”(৩৭:২০-২১) অন্য জায়গায় আল্লাহ পাক বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “যেই দিন কিয়ামত সংঘটিত হবে সেই দিন পাপীরা কসম করে বলবে যে, তারা (দুনিয়ায় এক ঘন্টার বেশী অবস্থান করেনি। এভাবে তারা সদা সত্য হতে ফিরে থাকতো। ঐ সময় জ্ঞানীরা ও মুমিনরা বলবেঃ তোমরা আল্লাহর লিখন অনুযায়ী পুনরুত্থানের দিন পর্যন্ত অবস্থান করেছে, আর পুনরুত্থানের দিন এটাই, কিন্তু তোমরা জানতে না।”(৩০:৫৫-৫৬)
মহামহিমান্বিত আল্লাহ্ বলেনঃ ‘এটা হবে শুধুমাত্র এক মহানাদ, তখনই তাদের সকলকে হাযির করা হবে আমার সামনে।' যেমন তিনি বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “এটা তো শুধু এক বিকট আওয়ায়, তখনই ময়দানে তাদের আবির্ভাব হবে।”(৭৯:১৩-১৪) মহান আল্লাহ্ আরো বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “কিয়ামতের ব্যাপারটি তো শুধু চোখের পলক ফেলার মত, বরং তার চেয়েও নিকটতর।”(১৬:৭৭) মহিমান্বিত আল্লাহ আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “যেই দিন তিনি তোমাদেরকে আহ্বান করবেন তখন তোমরা তাঁর প্রশংসা করতে করতে তাঁর আহ্বানে সাড়া দিবে এবং তোমরা ধারণা করবে যে, তোমরা অল্পদিনই (দুনিয়ায়) অবস্থান করেছো।”(১৭:৫২) মোটকথা, হুকুমের সাথে সাথেই সবাই একত্রিত হয়ে যাবে।
মহান আল্লাহ বলবেনঃ ‘আজ কারো প্রতি যুলুম করা হবে না, বরং তোমরা যা করতে শুধু তারই প্রতিফল দেয়া হবে।'
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।