আল কুরআন


সূরা ফাতির (আয়াত: 10)

সূরা ফাতির (আয়াত: 10)



হরকত ছাড়া:

من كان يريد العزة فلله العزة جميعا إليه يصعد الكلم الطيب والعمل الصالح يرفعه والذين يمكرون السيئات لهم عذاب شديد ومكر أولئك هو يبور ﴿١٠﴾




হরকত সহ:

مَنْ کَانَ یُرِیْدُ الْعِزَّۃَ فَلِلّٰهِ الْعِزَّۃُ جَمِیْعًا ؕ اِلَیْهِ یَصْعَدُ الْکَلِمُ الطَّیِّبُ وَ الْعَمَلُ الصَّالِحُ یَرْفَعُهٗ ؕ وَ الَّذِیْنَ یَمْکُرُوْنَ السَّیِّاٰتِ لَهُمْ عَذَابٌ شَدِیْدٌ ؕ وَ مَکْرُ اُولٰٓئِکَ هُوَ یَبُوْرُ ﴿۱۰﴾




উচ্চারণ: মান কা-না ইউরীদুল ‘ইযযাতা ফালিল্লা-হিল ‘ইযযাতুজামী‘আন ইলাইহি ইয়াস‘আদুল কালিমুততাইয়িবুওয়াল ‘আমালুসসা-লিহুইয়ারফা‘উহূ ওয়াল্লাযীনা ইয়ামকুরূনাছ ছাইয়িআ-তি লাহুম ‘আযা-বুন শাদীদুওঁ ওয়া মাকরূউলাইকা হুওয়া ইয়াবূর।




আল বায়ান: কেউ যদি সম্মান চায় (তবে তা যেন আল্লাহর কাছেই চায়) কেননা সকল সম্মান আল্লাহরই। তাঁরই পানে উত্থিত হয় ভাল কথা* আর নেক আমল তা উন্নীত করে। আর যারা মন্দকাজের চক্রান্ত করে তাদের জন্য রয়েছে কঠিন আযাব আর ওদের ষড়যন্ত্র তো নস্যাৎ হবে।




আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ১০. যে কেউ সম্মান-প্রতিপত্তি চায়, তবে সকল সম্মান-প্রতিপত্তির মালিক তো আল্লাহই।(১) তাঁরই দিকে পবিত্র বাণীসমূহ হয় সমুত্থিত এবং সৎকাজ, তিনি তা করেন উন্নীত।(২) আর যারা মন্দ কাজের ফন্দি আঁটে তাদের জন্য আছে কঠিন শাস্তি। আর তাদের ষড়যন্ত্র, তা ব্যর্থ হবেই।




তাইসীরুল ক্বুরআন: কেউ সম্মান-সুখ্যাতি চাইলে (আল্লাহকে উপেক্ষা করে তা লাভ করা যাবে না), সে জেনে নিক যাবতীয় সম্মান-সুখ্যাতির অধিকারী হলেন আল্লাহ। তাঁরই দিকে উত্থিত হয় পবিত্র কথাগুলো আর সৎকাজ সেগুলোকে উচ্চে তুলে ধরে। যারা মন্দ কাজের চক্রান্ত করে তাদের জন্য আছে কঠিন শাস্তি। তাদের চক্রান্ত নিষ্ফল হবে।




আহসানুল বায়ান: (১০) কেউ ক্ষমতা (ইজ্জত-সম্মান) চাইলে (সে জেনে রাখুক) সকল ক্ষমতা (ইজ্জত-সম্মান) তো আল্লাহরই।[1] সৎবাক্য তাঁর দিকে আরোহণ করে[2] এবং সৎকর্ম তিনি তুলে (গ্রহণ করে) নেন।[3] আর যারা মন্দ কাজের ফন্দি আঁটে[4] তাদের জন্য আছে কঠিন শাস্তি। তাদের ফন্দি ব্যর্থ হবেই। [5]



মুজিবুর রহমান: কেহ ক্ষমতা চাইলে সে জেনে রাখুক যে, সমস্ত ক্ষমতাতো আল্লাহরই। তাঁরই দিকে পবিত্র বাণীসমূহ আরোহণ করে এবং সৎ কাজ ওকে উন্নীত করে, আর যারা মন্দ কর্মের ফন্দি আটে তাদের জন্য আছে কঠিন শাস্তি। তাদের ফন্দি ব্যর্থ হবেই।



ফযলুর রহমান: যে সম্মান চায় তার জানা উচিত, আল্লাহর জন্যই সকল সম্মান। তাঁরই দিকে সৎবাক্য আরোহণ করে এবং সৎকর্ম তাকে (সৎবাক্যকে) উঠিয়ে দেয়। (সৎকর্ম ব্যতীত শুধু সৎবাক্য আল্লাহর কাছে পৌঁছে না।) যারা খারাপ কাজের চক্রান্ত করে তাদের জন্য কঠিন শাস্তি রয়েছে। তাদের চক্রান্ত ব্যর্থ হবেই।



মুহিউদ্দিন খান: কেউ সম্মান চাইলে জেনে রাখুন, সমস্ত সম্মান আল্লাহরই জন্যে। তাঁরই দিকে আরোহণ করে সৎবাক্য এবং সৎকর্ম তাকে তুলে নেয়। যারা মন্দ কার্যের চক্রান্তে লেগে থাকে, তাদের জন্যে রয়েছে কঠোর শাস্তি। তাদের চক্রান্ত ব্যর্থ হবে।



জহুরুল হক: যে কেউ মানসম্মান চায় সমস্ত মানসম্মান তো আল্লাহ্‌র। তাঁরই দিকে উত্থিত হয় সকল খাঁটি বাক্যালাপ, আর পূণ্যময় কাজ -- তিনি তার উন্নতি সাধন করেন। আর যারা মন্দ কাজের ফন্দি আঁটে তাদের জন্য আছে কঠিন শাস্তি। আর এদের ফন্দি -- তা ব্যর্থ হবেই।



Sahih International: Whoever desires honor [through power] - then to Allah belongs all honor. To Him ascends good speech, and righteous work raises it. But they who plot evil deeds will have a severe punishment, and the plotting of those - it will perish.



তাফসীরে যাকারিয়া

অনুবাদ: ১০. যে কেউ সম্মান-প্রতিপত্তি চায়, তবে সকল সম্মান-প্রতিপত্তির মালিক তো আল্লাহই।(১) তাঁরই দিকে পবিত্র বাণীসমূহ হয় সমুত্থিত এবং সৎকাজ, তিনি তা করেন উন্নীত।(২) আর যারা মন্দ কাজের ফন্দি আঁটে তাদের জন্য আছে কঠিন শাস্তি। আর তাদের ষড়যন্ত্র, তা ব্যর্থ হবেই।


তাফসীর:

(১) অর্থাৎ সম্মান চাইলে কেবলমাত্র তাঁর কাছেই চাওয়া উচিত। আর তা চাইতে হবে তাঁর আনুগত্য করেই। কারণ, তিনি সম্মান প্রতিপত্তির মালিক। [বাগভী, মুয়াসসার] আসল ও চিরস্থায়ী মর্যাদা, দুনিয়া থেকে নিয়ে আখেরাত পর্যন্ত যা কখনো হীনতা ও লাঞ্ছনার শিকার হতে পারে না, তা কেবলমাত্র আল্লাহর বন্দেগীর মধ্যে পাওয়া যেতে পারে। তুমি যদি তাঁর হয়ে যাও, তাহলে তাঁকে পেয়ে যাবে এবং যদি তাঁর দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নাও, তাহলে অপমানিত ও লাঞ্ছিত হবে। [দেখুন: কুরতুবী; ফাতহুল কাদীর]


(২) ইবন আব্বাস বলেন, ভাল কথা হচ্ছে, আল্লাহর যিকির। আর সৎকাজ হচ্ছে, আল্লাহর ফরয আদায় করা, সুতরাং যে কেউ আল্লাহর ফরয আদায়ে আল্লাহর যিকির করবে তারই সে আমল উপরের দিকে উঠবে। আর যে কেউ যিকির করবে, কিন্তু আল্লাহর ফরয আদায় করবে না তার কথা তার আমলের দিকে প্রত্যাবর্তিত হবে, তখন সেটা তার ধ্বংসের কারণ হবে। [তাবারী] কাতাদাহ বলেন, আল্লাহ্ তা'আলা আমল ব্যতীত কোন কথা কবুল করেন না। যে ভাল বলল এবং ভাল আমল করল সেটাই শুধু আল্লাহ কবুল করেন। [তাবারী]


তাফসীরে আহসানুল বায়ান

অনুবাদ: (১০) কেউ ক্ষমতা (ইজ্জত-সম্মান) চাইলে (সে জেনে রাখুক) সকল ক্ষমতা (ইজ্জত-সম্মান) তো আল্লাহরই।[1] সৎবাক্য তাঁর দিকে আরোহণ করে[2] এবং সৎকর্ম তিনি তুলে (গ্রহণ করে) নেন।[3] আর যারা মন্দ কাজের ফন্দি আঁটে[4] তাদের জন্য আছে কঠিন শাস্তি। তাদের ফন্দি ব্যর্থ হবেই। [5]


তাফসীর:

[1] অর্থাৎ, যে ব্যক্তি দুনিয়া ও আখেরাতে সম্মানিত হতে চায়, সে যেন আল্লাহর আনুগত্য করে; আল্লাহর আনুগত্যেই তার এই উদ্দেশ্য পূরণ হবে। কারণ দুনিয়া ও আখেরাতের একমাত্র মালিক হচ্ছেন আল্লাহ, সকল সম্মান তাঁরই নিকটে, তিনি যাকে সম্মান দেবেন সেই সম্মানিত হবে, তিনি যাকে অপদস্থ করবেন তাকে পৃথিবীর কোন শক্তি সম্মান দিতে পারবে না। তিনি অন্য স্থানে বলেছেন, (الَّذِينَ يَتَّخِذُونَ الْكَافِرِينَ أَوْلِيَاءَ مِنْ دُونِ الْمُؤْمِنِينَ أَيَبْتَغُونَ عِنْدَهُمُ الْعِزَّةَ فَإِنَّ الْعِزَّةَ لِلَّهِ جَمِيعًا) অর্থাৎ, যারা বিশ্বাসীদের পরিবর্তে অবিশ্বাসীদেরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করে। তারা কি তাদের নিকট সম্মান অনুসন্ধান করে? অথচ সমস্ত সম্মান তো আল্লাহরই। (সূরা নিসা ১৩৯ আয়াত)

[2] اَلْكَلِمُ - كَلِمَةٌ এর বহুবচন। পবিত্র কালেমাসমূহের অর্থ হলঃ আল্লাহর তাসবীহ ও তাহমীদ (পবিত্রতা ও প্রশংসা বর্ণনা), কুরআন তেলাঅত, ভাল কাজের আদেশ এবং মন্দ কাজ থেকে নিষেধ। ‘আরোহণ করে’ (উপরে চড়ে বা উঠে) এর অর্থ হলঃ কবুল বা গ্রহণ করা। অথবা তা নিয়ে ফিরিশতাদের আকাশে উঠে যাওয়া যাতে আল্লাহ তাআলা তার সওয়াব প্রদান করেন।

[3] يَرْفَعُهُ ক্রিয়ার কর্তা কে? অনেকে বলেন, الكلم الطيب অর্থাৎ, সৎকর্ম সৎবাক্যকে (আল্লাহর দিকে) উঠিয়ে থাকে। আর তার মানে, শুধু মুখে আল্লাহর যিকর (তাসবীহ ও তাহমীদে) কোন কাজ হবে না; যতক্ষণ না তার সাথে সৎকর্ম অর্থাৎ আহ্কাম ও ফরয আমল আদায় করা হবে। অনেকে বলেন, يرفعه ক্রিয়ার কর্তা মহান আল্লাহ। উদ্দেশ্য হল, আল্লাহ তাআলা সৎকর্মকে সৎবাক্যের উপর প্রধান্য দেন। কারণ সৎকর্ম দ্বারাই এই কথা প্রমাণ হয় যে, সৎবাক্য (তাসবীহ, তাহমীদ ইত্যাদি) আবৃত্তিকারী প্রকৃতপক্ষে তাতে আন্তরিক ও একনিষ্ঠ। (ফাতহুল ক্বাদীর) ঠিক যেন আল্লাহর নিকট আমল ছাড়া কেবল মুখের কথার কোন মূল্য নেই।

[4] গোপনভাবে কারোর ক্ষতি সাধন করার চেষ্টাকে مكر (চক্রান্ত, ষড়যন্ত্র বা ফন্দি অাঁটা) বলে। কুফর ও শিরকের কাজ করাও এক প্রকার চক্রান্তের কাজ। যেহেতু তাতে আল্লাহর পথের ক্ষতি সাধন করা হয়। মক্কার কাফেররা নবী (সাঃ)-এর বিরুদ্ধে হত্যা ইত্যাদির যে প্রচেষ্টা চালিয়েছে তাকেও চক্রান্ত বলা হয়েছে। লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে কোন কাজ করাকেও চক্রান্ত বলা যায়। এখানে উক্ত শব্দটি সাধারণ অর্থে ব্যবহার হয়েছে; অর্থাৎ এখানে সকল প্রকার চক্রান্ত ও ফন্দির নিন্দা করা হয়েছে।

[5] অর্থাৎ, তাদের চক্রান্তও ব্যর্থ হবে এবং তার শাস্তিও তাদেরকেই ভোগ করতে হবে যে চক্রান্ত করবে। যেমন বলেছেন, (وَلا يَحِيقُ الْمَكْرُ السَّيِّئُ إِلا بِأَهْلِه) অর্থাৎ, কূট ষড়যন্ত্র ষড়যন্ত্রকারীদেরই পরিবেষ্টন করে। (সূরা ফাত্বির ৪৩ আয়াত)


তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ


তাফসীর: ৯-১১ নং আয়াতের তাফসীর:



যারা পুনরুত্থানকে অস্বীকার করে অথবা পুনরুত্থান হওয়া অসম্ভব মনে করে, তাদের জন্য আল্লাহ তা‘আলা একটি অতি বোধগম্য দৃষ্টান্ত প্রদান করছেন। জমিন শুকিয়ে ধু-ধু মরুভূমিতে পরিণত হয়ে যায়, এমন ভূমি থেকে ফসল উৎপন্ন হবে তা অসম্ভব মনে হয়। কিন্তু বাতাসের মাধ্যমে আকাশের মেঘমালাকে সে ধু-ধু মরুভূমির দিকে নিয়ে আসেন। তারপর বৃষ্টি নাযিল করে সে ধু-ধু মরুভূমিকে সজিব ও উর্বর করে তোলেন, আর সেখান থেকে ফসল হয়। এসব তো তোমাদের চোখের সামনে হচ্ছে, প্রতিনিয়ত তোমরা তা প্রত্যক্ষ করছ। আল্লাহ তা‘আলা বলছেন, এ প্রাণহীন ধু-ধু মরুভূমি যেমন জীবিত করি তেমন তোমাদেরও জীবিত করব যদিও তোমরা মারা যাওয়ার পর নিশ্চিহ্ন হয়ে যাও। সুতরাং এত সুন্দর ও স্পষ্ট দৃষ্টান্ত দিয়ে বোঝানোর পরেও কি পুনরুত্থানকে অস্বীকার করার কোন সুযোগ আছে? না, কক্ষনো নয়, বরং সকলকে পুনরুত্থিত হতে হবেই।



(مَنْ كَانَ يُرِيْدُ الْعِزَّةَ فَلِلهِ الْعِزَّةُ جَمِيْعًا)



‘যে ব্যক্তি সম্মান লাভ করতে চায় (সে জেনে রাখুক!), সকল সম্মান আল্লাহরই জন্য’ অত্র আয়াতে বলা হচ্ছে যে, সমস্ত সম্মান একমাত্র আল্লাহ তা‘আলার জন্য। আর তাঁর থেকে সম্মান নিতে হলে তাঁর আনুগত্য করতে হবে এবং তাঁর ইবাদত করতে হবে। যে তাঁর আনুগত্য করে তিনি তাকে দুনিয়া ও আখিরাত উভয় জগতে সম্মানীত করবেন। পক্ষান্তরে যারা তাঁকে ব্যতীত অন্যের ইবাদত করার মাধ্যমে সম্মান অর্জন করতে চায়, কাফির-মুশরিকদেরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করে সম্মান অর্জন করতে চায়, মু’মিনদেরকে অপছন্দ করে তারা কোন দিন সম্মান খুঁজে পাবে না। কেননা তারা উদ্দিষ্ট জায়গা ব্যতীত অন্য জায়গায় সম্মান অন্বেষণ করে। অথচ সম্মান মূলত আল্লাহ তা‘আলার নিকট। আল্লাহ তা‘আলার বাণী:



(الَّذِيْنَ يَتَّخِذُوْنَ الْكٰفِرِيْنَ أَوْلِيَا۬ءَ مِنْ دُوْنِ الْمُؤْمِنِيْنَ ط أَيَبْتَغُوْنَ عِنْدَهُمُ الْعِزَّةَ فَإِنَّ الْعِزَّةَ لِلّٰهِ جَمِيْعًا) ‏



“মু’মিনগণের পরিবর্তে যারা কাফিরদেরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করে তারা কি তাদের নিকট ইযযত চায়? বরং সমস্ত ইযযত তো আল্লাহরই।” (সূরা নিসা ৪:১৩৯)



আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন:



(وَلِلّهِ الْعِزَّةُ وَلِرَسُوْلِه۪ وَلِلْمُؤْمِنِيْنَ وَلٰكِنَّ الْمُنَافِقِيْنَ لَا يَعْلَمُوْنَ)



“মান-সম্মান তো আল্লাহরই, তাঁর রাসূল এবং মু’মিনদের; কিন্তু মুনাফিকরা তা জানে না।” (সূরা মুনাফিকূন ৬৩:৮)



সুতরাং কেউ যদি দুনিয়া ও আখিরাতে সম্মান অর্জন করতে চায় তাহলে অবশ্যই আল্লাহ তা‘আলার আনুগত্য করার মাধ্যমে তাঁর নিকটই সম্মান অন্বেষণ করতে হবে। কাফির-মুশরিকদের আনুগত্য করে, তাদের ক্ষমতাকে ভয় করে ও তাদের সাথে সুসম্পর্ক রেখে সম্মান পাওয়া যাবে না।



(إِلَيْهِ يَصْعَدُ الْكَلِمُ الطَّيِّبُ)



-অর্থাৎ পবিত্র বাণীসমূহ তাঁরই দিকে আরোহন করে। এখানে পবিত্র বাণী দ্বারা উদ্দেশ্য হলো আল্লাহ তা‘আলার তাসবীহ-তাহমীদ, যিকির-আযকার ও তেলাওয়াতসহ সকল ভাল কথা। অনুরূপভাবে সকল “সৎ আমল” চাই সে আমল অন্তরের হোক আর অঙ্গ-প্রতঙ্গের হোক সবই তাঁর দিকে আরোহন করে। আরোহন করার অর্থ হলো এ সকল ভাল কথা ও কাজ ফেরেশ্তারা ঊর্ধ্বাকাশে আল্লাহ তা‘আলার কাছে নিয়ে যায়। আল্লাহ তা‘আলা তা কবুল করতঃ সওয়াব প্রদান করেন। পক্ষান্তরে অসৎ আমল সৎ আমলের বিপরীত। তাছাড়া এ আয়াত দ্বারা বোঝা যায়, আল্লাহ তা‘আলা ওপরে রয়েছেন। তিনি সর্বত্র বিরাজমান হলে এসকল উত্তম কথা ও সৎআমল ওপরে আরোহন করে নিয়ে যাওয়ার কোন অর্থই হয় না। সুতরাং আল্লাহ তা‘আলা সর্বত্র বিরাজমান নয়, বরং তিনি ওপরে রয়েছেন।



এরপর আল্লাহ তা‘আলা বলেন, যারা অসৎ কর্ম করার চক্রান্ত করে তাদের জন্য রয়েছে কঠিন শাস্তি। আর তাদের এ চক্রান্ত কখনো সফল হবে না, বরং তা ব্যর্থ হবেই।



অন্যত্র আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(فَانْظُرْ كَيْفَ كَانَ عَاقِبَةُ مَكْرِهِمْ أَنَّا دَمَّرْنٰهُمْ وَقَوْمَهُمْ أَجْمَعِيْنَ) ‏



“অতএব দেখ, তাদের চক্রান্তে‎র পরিণাম কী হয়েছেন আমি অবশ্যই তাদেরকে ও তাদের সম্প্রদায়ের সকলকে ধ্বংস করেছি।” (সূরা নামল ২৭:৫১)



আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন:



(وَقَدْ مَكَرُوْا مَكْرَهُمْ وَعِنْدَ اللّٰهِ مَكْرُهُمْ ط وَإِنْ كَانَ مَكْرُهُمْ لِتَزُوْلَ مِنْهُ الْجِبَالُ)‏



“তারা ভীষণ চক্রান্ত‎ করেছিল, কিন্তু তাদের চক্রান্ত‎ আল্লাহর সামনেই ছিল যদিও তাদের চক্রান্ত‎ এমন ছিল, যাতে পর্বত টলে যেত।” (সূরা ইবরাহীম ১৩:৪৬)



শাহর বিন হাওশাব এ আয়াতের তাফসীরে বলেন: এসব লোকেরা হল তারা যারা মানুষকে দেখানোর জন্য আমল করে। ইবনু আব্বাসসহ প্রমুখ বলেন: যারা নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে হত্যা করার জন্য দারুন নাদওয়াতে একত্রিত হয়েছিল (কুরতুবী)। তবে সঠিক কথা হচ্ছেন এখানে খারাপ কাজের চক্রান্ত করার অর্থ হল- আল্লাহ তা‘আলার সাথে কুফরী করা এবং স্বীয় অনুসারীদেরকে তা করার নির্দেশ দেয়া। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(وَقَالَ الَّذِيْنَ اسْتُضْعِفُوْا لِلَّذِيْنَ اسْتَكْبَرُوْا بَلْ مَكْرُ اللَّيْلِ وَالنَّهَارِ إِذْ تَأْمُرُوْنَنَآ أَنْ نَّكْفُرَ بِاللّٰهِ وَنَجْعَلَ لَه۫ٓ أَنْدَادًا)



“যাদেরকে দুর্বল মনে করা হত তারা অহঙ্কারীদেরকে বলবে: প্রকৃতপক্ষে তোমরাই তো দিবা-রাত্র চক্রান্তে লিপ্ত ছিলে, আমাদেরকে নির্দেশ দিয়েছিলে যেন আমরা আল্লাহকে অমান্য করি এবং তাঁর শরীক স্থাপন করি।” (সূরা সাবা ৩৪:৩৩, আযওয়াউল বায়ান)



(وَاللّٰهُ خَلَقَكُمْ.... أَزْوَاجًا)



‘আর আল্লাহ তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন, মাটি থেকে, তারপর শুক্র থেকে, তারপর তোমাদেরকে করেছেন জোড়া জোড়া।’ এ সম্পর্কে সূরা আল হাজ্জ-এর ৫ নং আয়াতসহ অন্যান্য স্থানেও আলোচনা করা হয়েছে।



(وَمَا تَحْمِلُ مِنْ أُنْثٰي وَلَا تَضَعُ إِلَّا بِعِلْمِه)



অর্থাৎ কোন মহিলা কী গর্ভধারণ করে এবং কখন তা প্রসব করে তা আল্লাহ তা‘আলার জ্ঞানায়াত্ত্ব। তিনি সে সম্পর্কে অবগত আছেন অর্থাৎ সৃষ্টিকূলের মধ্যে যা কিছু হয় সবই আল্লাহ তা‘আলা দেখেন, শুনেন এবং সবই তাঁর জ্ঞানায়ত্ত্বে। এ বিষয়ে সূরা র্আ রা‘দ-এর ৮ নং আয়াতে আলোচনা করা হয়েছে।



এরপর আল্লাহ তা‘আলা বলেন, কোন ব্যক্তির আয়ু বৃদ্ধি করা হোক অথবা হ্রাস করা হোক তা মূলত পূর্ব থেকেই লাওহে মাহফুযে লিপিবদ্ধ রয়েছে। তবে সৎ আমলের মাধ্যমে আয়ু বৃদ্ধি পায়, যেমন আত্মীয়তার বন্ধন বজায় রাখা।



আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে বলতে শুনেছি “যে ব্যক্তি চায় তার রিযিক বৃদ্ধি করা হোক এবং তার আয়ু বৃদ্ধি করা হোক সে যেন আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখে।” (সহীহ বুখারী হা: ২০৬৮, সহীহ মুসলিম হা: ২৫৫৭)



আর আয়ু কমে যাওয়ার একটি কারণ হলো বেশি বেশি পাপ কাজ করা। তবে এ হ্রাস-বৃদ্ধিও লাওহে মাহফুযে লিপিবদ্ধ রয়েছে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



( يَمْحُوا اللّٰهُ مَا يَشَا۬ءُ وَيُثْبِتُ ﺸ وَعِنْدَه۫ٓ أُمُّ الْكِتٰبِ)



“আল্লাহ যা ইচ্ছা তা নিশ্চিহ্ন করেন এবং যা ইচ্ছা তা প্রতিষ্ঠিত রাখেন এবং তাঁরই নিকট আছে উম্মুল কিতাব (লাওহে মাহফূজ)।” (সূরা রাদ ১৩:৩৯)



সৎ আমলের মাধ্যমে আয়ু বৃদ্ধি পাওয়া আর অসৎ আমলের মাধ্যমে আয়ু কমে যাওয়া উভয়টাই লাওহে মাহফুজে লিপিবদ্ধ রয়েছে। সুতরাং যে ব্যক্তি চায় তার আয়ু ও রিযিক বৃদ্ধি পাক সে যেন ভাল আমল করে।



আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:



১. পুনরুত্থান দিবস অবশ্যই বাস্তবায়িত হবে। এতে কোনই সন্দেহ নেই।

২. আল্লাহ তা‘আলা ব্যতীত কেউ কাউকে সম্মান দান করতে পারে না।

৩. ভাল কথা ও সৎ আমলসমূহ আল্লাহ তা‘আলার দিকে নিয়ে যাওয়া হয়।

৪. প্রত্যেকটি কাজ আল্লাহর জ্ঞানায়ত্বে। তিনি জানেন না এমন কোন কাজ সংঘটিত হয় না।

৫. আত্মীয়তার সম্পর্কের মাধ্যমে আয়ু বৃদ্ধি পায় আর পাপাচারের কারণে আয়ু কমে যায়।

৬. আল্লাহ তা‘আলা ঊর্ধ্বে আছেন, তাই ফেরেশতারা সৎ আমলসমূহকে ওপরে আল্লাহ তা‘আলার কাছে নিয়ে যায়।


তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)


তাফসীর: ৯-১১ নং আয়াতের তাফসীর:

মৃত্যুর পর পুনজীবনের উপর কুরআন কারীমে প্রায় মৃত ও শুষ্ক জমি পুনরুজ্জীবিত হওয়াকে দলীল হিসেবে পেশ করা হয়েছে। যেমন সূরায়ে হাজ্ব প্রভৃতিতে রয়েছে। এতে বান্দার জন্যে পূর্ণ উপদেশ ও শিক্ষণীয় বিষয় আছে এবং মৃতদের জীবিত হওয়ার পূর্ণ দলীল এতে বিদ্যমান রয়েছে যে, জমি সম্পূর্ণরূপে শুকিয়ে গিয়েছে এবং তাতে সজীবতা মোটেই পরিলক্ষিত হয় না। কিন্তু যখন মেঘ উঠে ও বৃষ্টি হয় তখন ঐ জমির শুষ্কতা সজীবতায় এবং মরণ জীবনে পরিবর্তিত হয়। কারো ধারণাও ছিল না যে, এমন শুষ্ক ও মৃত জমি পুনর্জীবন ও সজীবতা লাভ করবে। এভাবেই বানী আদমের উপকরণ করে বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়ে আছে। কিন্তু আরশের নীচে থেকে, আল্লাহর হুকুমের বৃষ্টির সাথে সাথে সবগুলো একত্রিত হয়ে কবর থেকে উদাত হতে শুরু করবে। যেমন মাটি হতে গাছ বের হয়ে আসে ও মাটি হতে চারা বের হয়। সহীহ্ হাদীসে আছে যে, সমস্ত আদম সন্তান মাটিতে গলে পচে যায়। কিন্তু তার একটি হাড় আছে যাকে বলা হয় রেড় বা জন্ম হাড়, সেটা পচেও না, নষ্টও হয় না। এ হাড়ের দ্বারা সৃষ্টি করা হয়েছে এবং আবার সৃষ্টি করা হবে। এখানে একটি চিহ্নের উল্লেখ করে বলা হয়েছে। ঠিক তেমনই বলা হচ্ছে যে, মৃত্যুর পর আবার জীবন আছে। সূরায়ে হাজ্বের তাফসীরে হাদীস গত হয়েছে যে, হযরত আবু রাযীন (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আল্লাহ্ কিভাবে মৃতকে জীবিত করবেন? আর তাঁর সৃষ্টিজগতে এর কি নিদর্শন আছে?” উত্তরে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বলেনঃ “হে আবু রাযীন (রাঃ)! তুমি কি তোমার আশে-পাশের যমীনের উপর দিয়ে ঘুরে ফিরে বেড়াওনি? তুমি কি দেখোনি যে, জমিগুলো শুষ্ক ও ফসলবিহীন অবস্থায় পড়ে আছে? অতঃপর যখন তুমি পুনরায় সেখান দিয়ে গমন কর তখন কি তুমি দেখতে পাও না যে, ঐ জমি সবুজ-শ্যামল হয়ে উঠেছে? সজীবতা লাভ করেছে এবং তাতে ফসল ঢেউ খেলছে?” হযরত আৰূ রাযীন (রাঃ) উত্তর দিলেনঃ “হ্যা, এমন তো প্রায়ই চোখে পড়ে।” তখন রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বললেনঃ “এভাবেই আল্লাহ্ তা'আলা মৃতকে জীবিত করবেন।`

মহা প্রতাপান্বিত আল্লাহ্ বলেনঃ “কেউ ক্ষমতা চাইলে সে জেনে রাখুক যে, সব ক্ষমতা তো আল্লাহরই। অর্থাৎ যারা দুনিয়া ও আখিরাতে সম্মানিত থাকতে চায় তাকে আল্লাহর আনুগত্য স্বীকার করে চলতে হবে। তিনিই তার এ উদ্দেশ্যকে সফলতা দান করবেন। দুনিয়া ও আখিরাতে আল্লাহই একমাত্র সত্তা যার হাতে সমস্ত ক্ষমতা, ইযযত ও সম্মান বিদ্যমান রয়েছে।

অন্য আয়াতে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “যারা কাফিরদেরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করে মুমিনদেরকে ছেড়ে, তারা কি তাদের কাছে ইয্যত তালাশ করে? তাদের জেনে রাখা উচিত যে, সমস্ত ইয্যত তো আল্লাহর হাতে।”(৪:১৩৯)

আর এক জায়গায় আছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “তাদের কথা যেন তোমাকে চিন্তিত ও দুঃখিত না করে, নিশ্চয়ই। সমস্ত ইয্যত তো আল্লাহরই জন্যে।” (১০:৬৫)

মহামহিমান্বিত আল্লাহ আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “ইয্যত তো আল্লাহরই, আর তাঁর রাসূল (সঃ) ও মুমিনদের। কিন্তু মুনাফিকরা এটা জানে না।” (৬৩:৮)। | মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, প্রতিমা পূজায় ইয্যত নেই, ইতের অধিকারী তো একমাত্র আল্লাহ্। ভাবার্থ এই যে, ইযষত অনুসন্ধানকারীর আল্লাহর হুকুম মেনে চলার কাজে লিপ্ত থাকা উচিত। আর এটাও বলা হয়েছে যে, কার জন্যে ইয্যত তা যে জানতে চায় সে যেন জেনে নেয় যে, সমস্ত ইযত আল্লাহরই জন্যে।

যিকর, তিলাওয়াত, দু'আ ইত্যাদি সবই আল্লাহ্ তা'আলার নিকট পৌছে থাকে। এগুলো সবই পাক কালেমা।

মুখারিক ইবনে সালীম (রঃ) বলেন, হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) আমাদেরকে বলেনঃ “আমি তোমাদের কাছে যতগুলো হাদীস বর্ণনা করি সবগুলোরই সত্যতা আল্লাহর কিতাব হতে পেশ করতে পারি। জেনে রেখো যে, মুসলমান বান্দা যখন (আরবী) এই কালেমাগুলো পাঠ করে তখন ফেরেশতারা এগুলো তাদের ডানার নীচে নিয়ে আসমানের উপরে উঠে যান। এগুলো নিয়ে তাঁরা ফেরেশতাদের যে দলের পার্শ্ব দিয়ে গমন করেন তখন ঐ দলটি এই কালেমাগুলো পাঠকারীদের জন্যে আল্লাহ তা'আলার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করেন। শেষ পর্যন্ত জগতসমূহের প্রতিপালক মহামহিমান্বিত আল্লাহর সামনে এই কালেমাগুলো পেশ করা হয়।” অতঃপর হযরত আবদুল্লাহ্ ইবনে মাসউদ (রাঃ) (আরবী)-এই আয়াতটি তিলাওয়াত করেন। (এটা ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন)

হযরত কা'ব আহ্বার (রঃ) বলেন যে, (আরবী)-এই কালেমাগুলো আরশের চতুপার্শ্বে মৌমাছির ভন্ ভন্ শব্দের মত বের হয় এবং যারা এগুলো পাঠ করে তাদের কথা আল্লাহর সামনে আলোচিত হয় এবং সৎ কার্যাবলী খানা খানায় সংরক্ষিত থাকে।

হযরত নুমান ইবনে বাশীর (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বলেছেনঃ “যারা আল্লাহর বুযর্গী, তার তাসবীহ, তাঁর হাদ, তার শ্রেষ্ঠত্ব এবং তার একত্বের যিক্র করে, তাদের জন্যে এই কালেমাগুলো আরশের আশে-পাশে আল্লাহর সামনে তাদের কথা আলোচনা করে। তোমরা কি পছন্দ কর না যে, সদা-সর্বদা তোমাদের যি আল্লাহর সামনে হতে থাকুক?” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) ও ইমাম ইবনে মাজাহ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)

হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, পাক কালাম দ্বারা উদ্দেশ্য আল্লাহর যিকর এবং সকর্ম দ্বারা উদ্দেশ্য ফরয কাজসমূহ আদায় করা। সুতরাং যে ব্যক্তি আল্লাহর যিকর ও ফরযসমূহ আদায় করে তার আমল তার যিকরকে আল্লাহর নিকট উঠিয়ে দেয়। কিন্তু যে আল্লাহর যিক্র করে কিন্তু ফরযসমূহ আদায় করে না, তার কালাম তার আমলের উপর ফিরিয়ে দেয়া হয়।

অনুরূপভাবে হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, কালেমায়ে তায়্যিবকে আমলে সালেহ্ নিয়ে যায়। অন্যান্য গুরুজন হতেও অনুরূপ বর্ণিত আছে। এমনকি কাযী আইয়াস ইবনে মুআবিয়া (রঃ) বলেন যে, আমলে সালেহ্ বা ভাল আমল না থাকলে কালেমায়ে তায়্যিব বা উত্তম কথা উপরে উঠে না। হযরত হাসান (রঃ) ও হযরত কাতাদা (রঃ) বলেন যে, আমল ছাড়া কথা প্রত্যাখ্যাত হয়।

যারা মন্দ কর্মের ফন্দি আঁটে তারা হলো ঐসব লোক যারা ফাঁকিবাজি ও রিয়াকারী বা লোক দেখানো কাজ করে থাকে। বাহ্যিকভাবে যদিও এটা লোকদের কাছে প্রকাশিত হয় যে, তারা আল্লাহর আদেশ মেনে চলছে, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তারা আল্লাহর নিকট সবচেয়ে নিকৃষ্ট। তারা ভাল কাজ যা কিছু করে সবই লোক দেখানো করে। তারা আল্লাহর যিক্র খুব কমই করে। আব্দুর রহমান (রঃ) বলেন যে, এর দ্বারা মুশরিককে বুঝানো হয়েছে। কিন্তু সঠিক কথা এই যে, আয়াতটি সাধারণ। মুশরিকরা যে বেশী এর অন্তর্ভুক্ত এটা বলাই বাহুল্য।

মহা-প্রতাপান্বিত আল্লাহ্ বলেন যে, তাদের জন্যে রয়েছে কঠিন শাস্তি। তাদের ফন্দি ও চক্রান্ত ব্যর্থ হবেই। তাদের মিথ্যাবাদিতা আজ না হলেও কাল প্রকাশ পাবেই। জ্ঞানীরা তাদের চক্রান্ত ধরে ফেলবে। কোন লোক যে কাজ করে তার লক্ষণ তার চেহারায় প্রকাশিত হয়ে থাকে। তার ভাষা ও কথা ঐ রঙেই রঞ্জিত হয়ে থাকে। ভিতর যেমন হয় তেমনিভাবে তার প্রতিচ্ছায়া বাইরেও প্রকাশ পায়। রিয়াকারীর বে-ঈমানী বেশীদিন গোপন থাকে না। নির্বোধরা তাদের চক্রান্তের জালে আবদ্ধ হয়ে থাকে সেটা অন্য কথা। মুমিন ব্যক্তি পুরোমাত্রায় জ্ঞানী ও বিবেকবান হয়ে থাকে। তারা তাদের ধোকাবাজি হতে বেশ সতর্ক থাকে।

মহান আল্লাহ বলেনঃ আল্লাহ্ তোমাদের আদম (আঃ)-কে মাটি দ্বারা সৃষ্টি করেছেন এবং তাঁর বংশকে এক ফোঁটা নিকৃষ্ট পানির (শুক্র বিন্দুর) মাধ্যমে জারী রেখেছেন। অতঃপর তিনি তোমাদেরকে জোড়া জোড়া বানিয়েছেন অর্থাৎ নর ও নারী। এটাও আল্লাহর এক বড় দয়া ও মেহেরবানী যে, তিনি নরদের জন্যে নারী বানিয়েছেন, যারা তাদের শান্তি ও আরামের উপকরণ। আল্লাহর অজ্ঞাতসারে কোন নারী গর্ভধারণ করে না এবং সন্তান প্রসব করে না। অর্থাৎ এসব খবর তিনি রাখেন। এমনকি প্রত্যেক ঝরে পড়া পাতা, অন্ধকারে পড়ে থাকা বীজ এবং প্রত্যেক সিক্ত ও শুষ্কের খবরও তিনি রাখেন। তাঁর কিতাবে এসব লিপিবদ্ধ রয়েছে।

নিম্নের আয়াতগুলোও এ আয়াতের অনুরূপঃ (আরবী) অর্থাৎ “প্রত্যেক নারী যা গর্ভে ধারণ করে এবং জরায়ুতে যা কিছু কমে ও বাড়ে আল্লাহ্ তা জানেন এবং তাঁর বিধানে প্রত্যেক বস্তুরই এক নির্দিষ্ট পরিমাণ আছে। যা অদৃশ্য ও যা দৃশ্যমান তিনি তা অবগত। তিনি মহান, সর্বোচ্চ মর্যাদাবান।” (১৩:৮-৯) এর পূর্ণ তাফসীর সেখানে বর্ণিত হয়েছে।

আল্লাহ্ তা'আলা বলেনঃ কোন দীর্ঘায়ু ব্যক্তির আয়ু বৃদ্ধি করা হয় না অথবা তার আয়ু হ্রাস করা হয় না, কিন্তু তা তো রয়েছে কিতাবে।

(আরবী) তে (আরবী) সর্বনামটির ফিরবার স্থান (আরবী) অর্থাৎ মানব। কেননা, দীর্ঘায়ু কিতাবে রয়েছে এবং আল্লাহ তাআলার জ্ঞানে তার আয়ু হতে কম করা হয় না। (আরবী) -এর দিকেও সর্বনাম ফিরে থাকে। যেমন আরবে বলা হয়ঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমার কাছে একটি কাপড় আছে এবং অন্য কাপড়ের অর্ধেক আছে।”

হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, আল্লাহ্ তা'আলা যে ব্যক্তির জন্যে দীর্ঘায়ু নির্ধারণ করে রেখেছেন সে তা পুরো করবেই। কিন্তু ঐ দীর্ঘায়ু তাঁর কিতাবে লিপিবদ্ধ রয়েছে। সে ঐ পর্যন্ত পৌছবে। আর যার জন্যে তিনি স্বল্পায় নির্ধারণ করেছেন তার জীবন ঐ পর্যন্তই পৌছবে। এ সবকিছু আল্লাহর কিতাবে পূর্ব হতেই লিপিবদ্ধ রয়েছে। আর এটা আল্লাহ তাআলার কাছে খুবই সহজ। আয়ু কম হওয়ার একটি ভাবার্থ এও হতে পারে যে, যে শুক্র পূর্ণতাপ্রাপ্ত হওয়ার পূর্বেই পড়ে যায় সেটাও আল্লাহর অবগতিতে রয়েছে। কোন কোন মানুষ শত শত বছর বেঁচে থাকে। আবার কেউ কেউ ভূমিষ্ট হওয়ার পরেই মারা যায়। ষাট বছরের কমে মৃত্যুবরণকারীও স্বল্পায়ু বিশিষ্ট।

এ কথা বলা হয়েছে যে, মায়ের পেটে দীর্ঘায়ু বা স্বল্পায় লিখে নেয়া হয়। সারা সৃষ্টজীবের আয়ু সমান হয় না। কারো আয়ু দীর্ঘ হয় কারো স্বল্প হয়। এগুলো আল্লাহ্ তা'আলার কাছে লিখিত রয়েছে। আর ওটা অনুযায়ীই প্রকাশ হতে রয়েছে।

কেউ কেউ বলেন যে, এর অর্থ হচ্ছেঃ যে নির্ধারিত কাল লিখিত হয়েছে এবং ওর মধ্য হতে যা কিছু অতিবাহিত হয়েছে, সবই আল্লাহর অবগতিতে আছে এবং তাঁর কিতাবে লিপিবদ্ধ রয়েছে।

সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিম প্রভৃতি হাদীস গ্রন্থে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে চায় যে, তার রিযক ও বয়স বেড়ে যাক সে যেন আত্মীয়তার সম্পর্ক যুক্ত রাখে।”

মুসনাদে ইবনে আবি হাতিমে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বলেছেনঃ “কারো নির্ধারিত সময় এসে যাওয়ার পর তাকে অবকাশ দেয়া হয় না।”

বয়স বৃদ্ধি পাওয়া দ্বারা উদ্দেশ্য হলো সৎ সন্তান জন্মগ্রহণ করা, যার দু'আ তার মৃত্যুর পর তার কবরে পৌঁছতে থাকে। বয়স বৃদ্ধি পাওয়ার অর্থ এটাই। এটা আল্লাহর নিকট খুবই সহজ। এটা তাঁর অবগতিতে রয়েছে। তাঁর জ্ঞনি সমস্ত সৃষ্টজীবকে পরিবেষ্টন করে আছে। তিনি সব কিছুই জানেন। কিছুই তাঁর কাছে গোপন নেই।





সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।