সূরা সাবা (আয়াত: 5)
হরকত ছাড়া:
والذين سعوا في آياتنا معاجزين أولئك لهم عذاب من رجز أليم ﴿٥﴾
হরকত সহ:
وَ الَّذِیْنَ سَعَوْ فِیْۤ اٰیٰتِنَا مُعٰجِزِیْنَ اُولٰٓئِکَ لَهُمْ عَذَابٌ مِّنْ رِّجْزٍ اَلِیْمٌ ﴿۵﴾
উচ্চারণ: ওয়াল্লাযীনা ছা‘আও ফী আয়া-তিনা- মু‘আজিযীনা উলাইকা লাহুম ‘আযা-বুম্মির রিজযিন আলীম।
আল বায়ান: আর যারা আমার আয়াতসমূহকে ব্যর্থ করে দেয়ার চেষ্টা চালায়, তাদেরই জন্য রয়েছে কঠোর পীড়াদায়ক আযাব।
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৫. আর যারা আমাদের আয়াতকে ব্যর্থ করার চেষ্টা করে, তাদেরই জন্য রয়েছে ভয়ংকর যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি।
তাইসীরুল ক্বুরআন: যারা আমার আয়াতকে ব্যর্থ করার চেষ্টা চালায় তাদেরই জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক ভয়াবহ শাস্তি।
আহসানুল বায়ান: (৫) যারা আমার বাক্যসমূহকে ব্যর্থ করার অপচেষ্টা করে[1] তাদের জন্য মর্মন্তুদ শাস্তি রয়েছে।
মুজিবুর রহমান: যারা আমার আয়াতসমূহকে ব্যর্থ করার চেষ্টা করে তাদের জন্য রয়েছে ভয়ংকর মর্মন্তুদ শাস্তি।
ফযলুর রহমান: তবে যারা আমার আয়াতসমূহকে ব্যর্থ প্রমাণের চেষ্টা করে তাদের জন্য রয়েছে এক ভয়ানক যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি।
মুহিউদ্দিন খান: আর যারা আমার আয়াত সমূহকে ব্যর্থ করার জন্য উঠে পড়ে লেগে যায়, তাদের জন্যে রয়েছে যন্ত্রনাদায়ক শাস্তি।
জহুরুল হক: আর যারা আমাদের নির্দেশাবলীকে ব্যর্থ করার প্রচেষ্টা চালায়, এরাই -- এদেরই জন্য রয়েছে এক মর্মন্তুদ দুর্দশার শাস্তি।
Sahih International: But those who strive against Our verses [seeking] to cause failure - for them will be a painful punishment of foul nature.
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ৫. আর যারা আমাদের আয়াতকে ব্যর্থ করার চেষ্টা করে, তাদেরই জন্য রয়েছে ভয়ংকর যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি।
তাফসীর:
-
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (৫) যারা আমার বাক্যসমূহকে ব্যর্থ করার অপচেষ্টা করে[1] তাদের জন্য মর্মন্তুদ শাস্তি রয়েছে।
তাফসীর:
[1] অর্থাৎ, আমার ঐ সকল আয়াতকে বাতিল ও মিথ্যা মনে করে, যা আমি আমার পয়গম্বরদের প্রতি অবতীর্ণ করেছি। مُعَاجِزِيْنَ (ব্যর্থ করার অপচেষ্টা করে) এই ভেবে যে, আমি তাদেরকে পাকড়াও করতে অপারগ। কারণ তাদের বিশ্বাস ছিল যে, মৃত্যুর পর যখন আমরা মাটিতে মিশে যাব, তখন কিভাবে পুনরায় জীবিত হয়ে কারো সামনে আপন কর্মের জন্য আমাদেরকে জবাবদিহি করতে হবে? তাদের এই মনোভাব এ কথারই ঘোষণা ছিল যে, আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে পাকড়াও করতে সক্ষম নন! অতএব আমাদের কিয়ামতের আর ভয় কি?
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ৩-৬ নং আয়াতের তাফসীর:
অত্র আয়াতে বস্তুবাদী নাস্তিকদের বিশ্বাসে কুঠারাঘাত করে তাদের বিশ্বাসের মূলোৎপাটন করা হয়েছে। তাদের বিশ্বাসন আমরা দুনিয়াতে আছি, মারা যাব, পরে আর কিছু হবে না। কিসের কিয়ামত কিসের হাশর-নাশর। তাই তাদের ভাষাটা যেন এমন যে, খাও-দাও ফূর্তি কর, গরীবদের ওপর জুলুম কর। এসব কঠিন বেঈমানদের কঠিন উত্তর দেয়ার জন্য আল্লাহ তা‘আলা নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে তাঁর রবের শপথ করে বলতে বললেন বল: আমার রবের শপথ কিয়ামত অবশ্যই সংঘঠিত হবে। কিয়ামত সংঘটিত হওয়ার নিশ্চয়তার ব্যাপারে এরকম আরো দু’জায়গায় নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে আল্লাহ তা‘আলা তা’আলা তাঁর নিজ সত্ত্বার নামে শপথ করার নির্দেশ দিয়েছেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
(وَيَسْتَنْۭبِئُوْنَكَ أَحَقٌّ هُوَ ط ل قُلْ إِيْ وَرَبِّيْٓ إِنَّه۫ لَحَقٌّ ط ل وَمَآ أَنْتُمْ بِمُعْجِزِيْنَ)
“তারা তোমার নিকট (কিয়ামতের আযাব সম্পর্কে) জানতে চায়, ‘তা কি সত্য?’ বল: ‘হ্যাঁ, আমার প্রতিপালকের শপথ! তা অবশ্যই সত্য। এবং তোমরা এটা ব্যর্থ করতে পারবে না।’ (সূরা ইউনুস ১০:৫৩)
আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন,
(زَعَمَ الَّذِيْنَ كَفَرُوْآ أَنْ لَّنْ يُّبْعَثُوْا ط قُلْ بَلٰي وَ رَبِّيْ لَتُبْعَثُنَّ ثُمَّ لَتُنَبَّؤُنَّ بِمَا عَمِلْتُمْ ط وَذٰلِكَ عَلَي اللّٰهِ يَسِيْرٌ)
“কাফিররা ধারণা করে যে, তারা কখনো পুনরুত্থিত হবে না। বল: নিশ্চয়ই হবে, আমার প্রতিপালকের শপথ! তোমরা অবশ্যই পুনরুত্থিত হবে। অতঃপর তোমরা যা করতে তোমাদেরকে সে সম্বন্ধে অবশ্যই অবহিত করা হবে। এটা আল্লাহর পক্ষে অতি সহজ।” (সূরা তাগাবুন ৬৪:৭)
সুতরাং কিয়ামত দিবসকে অস্বীকার করার কিছুই নেই। এটা অবশ্যই বাস্তবায়িত হবে। আর তখন কেউই এটা প্রতিহত করতে পারবে না।
তারপর আল্লাহ তা‘আলা বলেন: তিনি হলেন, আলিমুল গাইব। তিনি সমস্ত অদৃশ্যের খবর জানেন। আকাশে ও জমিনে ছোট-বড়, প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য এমন কোন জিনিস নেই যা তিনি জানেন না। তিনি প্রত্যেক জিনিসের যথাযথ খবর রাখেন। তাঁর দৃষ্টিকে ফাঁকি দিবে এমন কিছুই নেই।
এরপর আল্লাহ তা‘আলা কিয়ামত সংঘটিত হওয়ার হিকমত বর্ণনা করছেন যে, দুনিয়াতে মানুষ ভাল কাজ করে কিন্তু সবাই তার যথার্থ মূল্যায়ন পায় না। আর অনেক অপরাধী অপরাধ করে, তাকে কেউ শাস্তি দিতে পারে না। তাই ভাল আমলকারীদের যথাযথ প্রতিদান ও অপরাধীদের জন্য উপযুক্ত শাস্তি দেয়ার জন্য কিয়ামত বা বিচার ব্যবস্থার প্রয়োজন অনস্বীকার্য। সে জন্য আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘যেন তিনি পুরস্কৃত করেন তাদেরকে যারা ঈমান এনেছে এবং সৎ কাজ করেছে।’
সুতরাং কিয়ামত সংঘটনের মাধ্যমে ভাল ও মন্দের বিচার করা হবে এবং তাদেরকে তাদের প্রতিদান দেয়া হবে।
এরপর আল্লাহ তা‘আলা জ্ঞানী লোকদের মর্যাদা বর্ণনা করছেন যে, তারা তাদের সঠিক জ্ঞান ার্জনের দ্বারা সত্যকে সত্য ও মিথ্যাকে মিথ্যা বলে বুঝতে পেরেছে এবং এ সঠিক জ্ঞানের কারণে তারা সৎ ‘আমাল করতে সক্ষম হয়েছে এবং তারা কিয়ামত সংঘটিত হওয়ার ওপর পূর্ণ বিশ্বাসী। ফলে তারা কিয়ামতের দিন বলবেন (هٰذَا مَا وَعَدَ الرَّحْمٰنُ وَصَدَقَ الْمُرْسَلُوْنَ) “দয়াময় আল্লাহ তো এরই ওয়াদা দিয়েছিলেন এবং রাসূলগণ সত্যই বলেছিলেন।” (সূরা ইয়াসীন ৩৬:৫২) আল্লাহ তা‘আলা বলেন: তারা আরো বলবে,
(وَقَالَ الَّذِيْنَ أُوْتُوا الْعِلْمَ وَالْإِيْمَانَ لَقَدْ لَبِثْتُمْ فِيْ كِتٰبِ اللّٰهِ إِلٰي يَوْمِ الْبَعْثِ ز فَهٰذَا يَوْمُ الْبَعْثِ وَلٰكِنَّكُمْ كُنْتُمْ لَا تَعْلَمُوْنَ)
“কিন্তু যাদেরকে জ্ঞান ও ঈমান দেয়া হয়েছে তারা বলবে: তোমরা তো আল্লাহর নির্ধারিত দিবস অনুযায়ী অবস্থান করেছ; এটাই হল পুনরুত্থান দিবস, কিন্তু তোমরা জানতে না।” (সূরা রূম ৩০:৫৬)
আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:
১. কিয়ামত অবশ্যই সংঘটিত হবে, তা অস্বীকার করার কোনই সুযোগ নেই।
২. কিয়ামত সংঘটিত হওয়ার হিকমত সম্পর্কে জানতে পারলাম।
৩. সৎ লোকেরা জান্নাতে এবং অসৎ লোকেরা জাহান্নামে প্রবেশ করবে।
৫. যারা কুরআন ও হাদীসের সঠিক জ্ঞান অর্জন করে তাদের মর্যাদা সম্পর্কে জানতে পারলাম।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: ৩-৬ নং আয়াতের তাফসীর:
সম্পূর্ণ কুরআন কারীমে তিনটি আয়াত রয়েছে যেখানে কিয়ামত আগমনের উপর শপথ করা হয়েছে। একটি সূরায়ে ইউনুসের আয়াত। তা হলোঃ (আরবী) অর্থাৎ “তারা তোমার কাছে জানতে চায়ঃ এটা কি সত্য? তুমি বলঃ হ্যা, আমার প্রতিপালকের শপথ! এটা অবশ্যই সত্য এবং তোমরা এটা ব্যর্থ করতে পারবে না।”(১০:৫৩) দ্বিতীয় হলো এই সূরায়ে সাবার। (আরবী)-এই আয়াতটি। আর তৃতীয় হলো সূরায়ে তাগাবুনের নিম্নের আয়াতটিঃ (আরবী) অর্থাৎ “কাফিররা ধারণা করে যে, তারা কখনো পুনরুত্থিত হবে না। বলঃ নিশ্চয়ই হবে, আমার প্রতিপালকের শপথ! তোমরা নিশ্চয়ই পুনরুত্থিত হবে। অতঃপর তোমরা যা করতে তোমাদেরকে সে সম্বন্ধে অবশ্যই অবহিত করা হবে। এটা আল্লাহর পক্ষে সহজ।”(৬৪:৭) এখানেও কাফিরদের কিয়ামতের অস্বীকৃতির উল্লেখ করে স্বীয় নবী (সঃ)-কে শপথমূলক উত্তর দিতে বলার পর আরো গুরুত্বের সাথে বলছেনঃ সেই আল্লাহ তিনি, যিনি আলেমুল গায়েব, যার অগোচর নয় আকাশ ও পৃথিবীতে অণু পরিমাণ কিছু কিংবা তদপেক্ষা ক্ষুদ্র অথবা বৃহৎ কিছু। যে হাড়গুলো পচে সড়ে যায়, মানুষের শরীরের জোড়গুলো যে খুলে বিক্ষিপ্ত হয়ে যায়, ওগুলো যায় কোথায় এবং ওগুলোর সংখ্যাই বা কত ইত্যাদি সবকিছুই আল্লাহ জ্ঞাত আছেন। তিনি এগুলো একত্রিত করতে সক্ষম, যেমন তিনি প্রথমে সৃষ্টি করেছিলেন। তিনি সমস্ত কিছুই জানেন। সবকিছুই তাঁর কিতাবে লিপিবদ্ধ আছে।
অতঃপর মহামহিমান্বিত আল্লাহ কিয়ামত আসার হিকমত বর্ণনা করতে গিয়ে বলেনঃ এটা এই জন্যে যে, যারা মুমিন ও সৎকর্মপরায়ণ তিনি তাদেরকে পুরস্কৃত করবেন। তাদেরই জন্যে রয়েছে ক্ষমা ও সম্মান জনক রিযক। পক্ষান্তরে যারা আল্লাহর আয়াত সমূহকে ব্যর্থ করবার চেষ্টা করে তাদের জন্যে রয়েছে ভয়ংকর মর্মন্তুদ শাস্তি। সৎকর্মশীল মুমিনরা পুরস্কৃত হবে এবং দুষ্ট ও পাপী কাফিররা হবে শাস্তিপ্রাপ্ত। যেমন মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “জাহান্নামের অধিবাসী ও জান্নাতের অধিবাসী সমান নয়। জান্নাতের অধিবাসীরাই সফলকাম।`(৫৯:২০) আর এক জায়গায় মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি কি ঈমানদার ও সৎকর্মশীলদেরকে ভূ-পৃষ্ঠে বিশৃংখলা সৃষ্টিকারীদের মত করবো অথবা আমি কি সংযমী ও আল্লাহভীরুদেরকে করবো পাপাসক্তদের মত?”(৩৮:২৮)।
এরপর আল্লাহ তা'আলা কিয়ামতের আর একটি হিকমত বর্ণনায় বলেনঃ কিয়ামতের দিন ঈমানদার লোকেরা সৎকর্মশীলদের পুরস্কৃত হতে এবং পাপীদেরকে শাস্তিপ্রাপ্ত হতে দেখে নিশ্চিত জ্ঞান দ্বারা চাক্ষুষ প্রত্যয় লাভ করবে। ঐ সময় তারা বলে উঠবেঃ আমাদের প্রতিপালকের রাসূলগণ সত্য আনয়ন করেছিলেন। আরো বলা হবেঃ (আরবী) অর্থাৎ “দয়াময় আল্লাহ্ তো এরই প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন এবং রাসূলগণ সত্য বলেছিলেন।”(৩৬:৫২) আর এক জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “আল্লাহ্ কিতাবে লিপিবদ্ধ ছিল যে, তোমরা পুনরুত্থান দিবস পর্যন্ত অবস্থান করবে, তাহলে পুনরুত্থান দিবস তো এটাই।”(৩০:৫৬)
আল্লাহ পরাক্রমশালী অর্থাৎ তিনি প্রবল পরাক্রান্ত, বড়ই মর্যাদা সম্পন্ন, মহাশক্তির অধিকারী, ক্ষমতাবান শাসক এবং পূর্ণ বিজয়ী। তার উপর কারো কোন আদেশ চলে না এবং কারো কোন জোরও খাটে না। প্রত্যেক বস্তুই তাঁর কাছে শক্তিহীন ও অপারগ। তাঁর কথা ও কাজ চাঞ্চল্য সৃষ্টিকারী। তাঁর সমুদয় সৃষ্টজীব তার প্রশংসায় পঞ্চমুখ।
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।