সূরা সাবা (আয়াত: 48)
হরকত ছাড়া:
قل إن ربي يقذف بالحق علام الغيوب ﴿٤٨﴾
হরকত সহ:
قُلْ اِنَّ رَبِّیْ یَقْذِفُ بِالْحَقِّ ۚ عَلَّامُ الْغُیُوْبِ ﴿۴۸﴾
উচ্চারণ: কুল ইন্না রাববী ইয়াকযিফুবিলহাক্কি‘আল্লা-মুল গুয়ুব।
আল বায়ান: বল, ‘আমার রব সত্য পাঠিয়েছেন। তিনি যাবতীয় গায়েব সম্পর্কে পরিজ্ঞাত।’
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৪৮. বলুন, নিশ্চয় আমার রব সত্য দিয়ে আঘাত করেন(১); যাবতীয় গায়েবের সম্যক জ্ঞানী।
তাইসীরুল ক্বুরআন: বল- আমার প্রতিপালক সত্য ছুঁড়ে দেন (অসত্যকে আঘাত করার জন্যে)। (যাবতীয়) অদৃশ্য সম্পর্কে তিনি পূর্ণরূপে অবগত।
আহসানুল বায়ান: (৪৮) বল, ‘আমার প্রতিপালক সত্য অবতারণ করেন;[1] তিনি অদৃশ্যের পরিজ্ঞাতা।’
মুজিবুর রহমান: বলঃ আমার রাবব সত্য নিক্ষেপ করেন; তিনি অদৃশ্যের পরিজ্ঞাতা।
ফযলুর রহমান: বল, “আমার প্রভু সত্য (ওহী) প্রেরণ করেন। তিনি অদৃশ্য বিষয়সমূহ ভাল করে জানেন।”
মুহিউদ্দিন খান: বলুন, আমার পালনকর্তা সত্য দ্বীন অবতরণ করেছেন। তিনি আলেমুল গায়ব।
জহুরুল হক: তুমি বলো -- "নিঃসন্দেহ আমার প্রভু সত্য ছুঁড়ে থাকেন, তিনি অদৃশ্য বিষয়ে পরিজ্ঞাত।"
Sahih International: Say, "Indeed, my Lord projects the truth. Knower of the unseen."
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ৪৮. বলুন, নিশ্চয় আমার রব সত্য দিয়ে আঘাত করেন(১); যাবতীয় গায়েবের সম্যক জ্ঞানী।
তাফসীর:
(১) অর্থাৎ আমার আলেমুল-গায়ব পালনকর্তা সত্যকে মিথ্যার উপর ছুড়ে মারেন। ফলে মিথ্যা চুরমার হয়ে যায়। উদ্দেশ্য, মিথ্যার মোকাবেলায় সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করা। মিথ্যার উপর সত্যের আঘাতের গুরুতর প্রভাব সৃষ্টি হয়। এটা একটা উপমা। কোন ভারী বস্তুকে হালকা বস্তুর উপর নিক্ষেপ করলে যেমন তা চুরমার হয়ে যায়, তেমনিভাবে সত্যের মোকাবিলায় মিথ্যাও চুরমার হয়ে যায়। তাই এরপর বলা হয়েছে, সত্যের মোকাবিলায় মিথ্যা এমন পর্যুদস্ত হয়ে যায় যে, তা কোন বিষয়ের সুচনা বা পুনরাবৃত্তির যোগ্য থাকে না।
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (৪৮) বল, ‘আমার প্রতিপালক সত্য অবতারণ করেন;[1] তিনি অদৃশ্যের পরিজ্ঞাতা।”
তাফসীর:
[1] قَََََذَفَ এর অর্থ হল, (নিক্ষেপ করা) তীর চালানো, পাথর ছুঁড়া এবং কথা বলাও হয়। এখানে শেষোক্ত অর্থে ব্যবহার হয়েছে। অর্থাৎ, আল্লাহ হক কথা বলেন, নিজ রসূলগণের প্রতি অহী অবতীর্ণ করেন এবং তাঁদের মাধ্যমে মানুষের জন্য হক স্পষ্ট করে থাকেন। যেমন অন্য স্থানে বলেছেন (يُلْقِي الرُّوحَ مِنْ أَمْرِهِ عَلَى مَنْ يَشَاءُ مِنْ عِبَادِهِ) অর্থাৎ, তিনি তাঁর বান্দাদের মধ্যে যার প্রতি ইচ্ছা স্বীয় আদেশসহ অহী প্রেরণ করেন। (সূরা মু’মিন ১৫ আয়াত)
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ৪৭-৫০ নং আয়াতের তাফসীর:
আল্লাহ তা‘আলা প্রথমত বর্ণনা করেছেন যে, দীন প্রচারে নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নিজের কোনই স্বার্থ নেই এবং তাঁর পার্থিব ধন-সম্পদের প্রতি কোন লোভ নেই। সে কথা মহান আল্লাহ তা‘আলা এ আয়াতে সুস্পষ্টভাবে প্রকাশ করে দিয়েছেন। তাদের মনে যাতে করে এ সন্দেহের সৃষ্টি হয়ে তারা দূরে সরে না যায় যে, উক্ত দা‘ওয়াতের পিছনে তাঁর পার্থিব কোন পদ, মর্যাদা, ক্ষমতা বা ধন-সম্পদ উপার্জনের উদ্দেশ্য আছে। যদি তা উপার্জন করা উদ্দেশ্য থাকত তাহলে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মক্কার কুরাইশদেরকে এ কথা বলতেন না যখন তারা মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে আরবের রাজত্ব দিতে চেয়েছিলন যদি তোমরা আমার এক হাতে চাঁদ এবং সূর্য এনে দাও তবুও আমি আল্লাহ তা‘আলার দীন থেকে একটুও পিছপা হব না। মূলত তাঁর উদ্দেশ্য ছিল সঠিক ধর্ম প্রচার করা এবং মানুষকে জাহান্নাম থেকে রক্ষা করে জান্নাতের পথ দেখানো। এরপর আল্লাহ তা‘আলা বলেন যে, তিনি সত্যই অবতীর্ণ করেন। অর্থাৎ আল্লাহ তা‘আলা হক্ব কথা বলেন, নিজ রাসূলগণের প্রতি ওয়াহী অবতীর্ণ করেন এবং তাদের মাধ্যমে মানুষের জন্য হক্ব কথা ও বিষয় স্পষ্ট করে থাকেন এবং হক্ব দ্বারা মিথ্যা ও বাতিলকে বিদূরিত করেন। মিথ্যা কখনো সত্যের ওপর বিজয়ী হতে পারে না।
আল্লাহ তা‘আলার বাণী:
(يُلْقِي الرُّوْحَ مِنْ أَمْرِه۪ عَلٰي مَنْ يَّشَا۬ءُ مِنْ عِبَادِه۪ لِيُنْذِرَ يَوْمَ التَّلَاقِ)
“তিনি তাঁর বান্দাদের মধ্যে যার প্রতি ইচ্ছা রূহ (ওয়াহী) প্রেরণ করেন স্বীয় আদেশ সহ, যাতে সে সতর্ক করতে পারে সাক্ষাত (কিয়ামত) দিবস সম্পর্কে।” (সূরা মু’মিন ৪০:১৫)
হাদীসে বলা হয়েছে, ইবনু মাস‘ঊদ (رضي الله عنه) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন: নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মক্কায় প্রবেশ করলেন তখন বায়তুল্লাহর চারদিকে ৩৬০টি মূর্তি ছিল। তিনি তাঁর হাতের লাঠি দ্বারা সেগুলোকে খোঁচা মারছিলেন আর নিম্ন আয়াত পড়ছিলেন।
(وَقُلْ جَا۬ءَ الْحَقُّ وَزَهَقَ الْبَاطِلُ ط إِنَّ الْبَاطِلَ كَانَ زَهُوْقًا)
“এবং বল: ‘সত্য এসেছে এবং মিথ্যা বিলুপ্ত হয়েছে’; নিশ্চয়ই মিথ্যা তো বিলুপ্ত হবারই।” (সূরা বানী ইসরাঈল ১৭:৮১)
সুতরাং সত্য যেখানে সমাগত মিথ্যা সেখানে বিতাড়িত হবেই। মিথ্যা কখনো বিজয়ী হতে পারে না।
এরপর আল্লাহ তা‘আলা বলেন: হে রাসূল! তুমি বলো: যদি আমি পথভ্রষ্ট হই তাহলে তার পরিণাম আমাকেই ভোগ করতে হবে। আর যদি হিদায়াত প্রাপ্ত হই তাহলে আমার প্রতিপালক আমার প্রতি সত্যসহ ওয়াহী করেছেন। অর্থাৎ সর্বপ্রকার কল্যাণ আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ থেকে। আল্লাহ তা‘আলা যে ওয়াহী ও স্পষ্ট সত্য অবতীর্ণ করেছেনন তাতে সঠিক পথ ও হিদায়াত নিহিত আছে। মানুষ তাতেই সঠিক পথের দিশা পায়। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি পথভ্রষ্ট হয়, তাতে মানুষের নিজের ত্র“টি এবং প্রবৃত্তির খেয়াল-খুশি থাকে। এ জন্য তার কুফলও তাকেই ভোগ করতে হবে।
তারপর আল্লাহ তা‘আলা বলেন, তিনি হচ্ছেন সর্বশ্রোতা ও সন্নিকটবর্তী। হাদীসে বলা হয়েছে, আবূ মূসা থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন: তোমরা এমন কাউকে আহ্বান করছো না যিনি বধির ও অনুপস্থিত। বরং তোমরা আহ্বান করছ এমন সত্তাকে যিনি সর্বশ্রোতা, সন্নিকটবর্তী ও তোমাদের আহ্বানে সাড়া দানকারী। (সহীহ বুখারী হা: ২৯৯২, সহীহ মুসলিম হা: ২৭০৪)
আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:
১. আল্লাহ তা‘আলা সদা-সর্বদা সত্য জিনিসই অবতীর্ণ করেন।
২. সত্যের মোকাবেলায় মিথ্যা সর্বদা পরাভূত হয়। মিথ্যা কখনো বিজয়ী হতে পারে না।
৩. সর্ব প্রকার কল্যাণ আল্লাহ তা‘আলার হাতে। তিনি কখনো কারো অকল্যাণ করেন না।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: ৪৭-৫০ নং আয়াতের তাফসীর:
আল্লাহ তা'আলা স্বীয় রাসূল (সঃ)-কে নির্দেশ দিচ্ছেন যে, তিনি যেন মুশরিকদেরকে বলেনঃ আমি তোমাদের মঙ্গল কামনা করি। তোমাদের কাছে আমি দ্বীনী আহকাম পৌছিয়ে দিচ্ছি। তোমাদেরকে উপদেশ ও পরামর্শ দিচ্ছি। এর জন্যে আমি তোমাদের কাছে কোন বিনিময় চাচ্ছি না। বিনিময় তো আমাকে আল্লাহ তাআলাই দিবেন। তিনি সবকিছুর রহস্য অবগত আছেন। আমার ও তোমাদের অবস্থা প্রকাশিত হয়ে আছে। নিম্নের আয়াতটিও এই আয়াতের অনুরূপ আয়াতঃ (আরবী) অর্থাৎ “আল্লাহ তা'আলা নিজের নির্দেশে হযরত জিবরাঈল (আঃ)-কে স্বীয় বান্দাদের যার উপর ইচ্ছা নিজের অহীসহ পাঠিয়ে থাকেন।”(৪০:১৫) তিনি সত্যসহ ফেরেশতা অবতীর্ণ করেন। তিনি অদৃশ্যের পরিজ্ঞাতা। তাঁর কাছে আসমান যমীনের কিছুই গোপন নেই। আল্লাহর নিকট হতে হক এবং মুবারক শরীয়ত এসে গেছে। আর বাতিল ধ্বংস হয়ে গেছে। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি বাতিলের উপর হককে নাযিল করে বাতিলকে উড়িয়ে বা মিটিয়ে দিই এবং তার তুষ উড়ে যায়।”(২১:১৮)
মক্কা বিজয়ের দিন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বায়তুল্লাহর মধ্যে প্রবেশ করে তথাকার মূর্তিগুলোকে স্বীয় কামানের কাঠ দ্বারা ফেলে দিচ্ছিলেন এবং মুখে উচ্চারণ করছিলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “(হে নবী সঃ)! তুমি বলে দাও যে, সত্য এসে গেছে এবং বাতিল দূরীভূত হয়েছে, আর বাতিল দূরীভূত হয়েই থাকে।”(১৭:৮১)। (এ হাদীসটি সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে)
কোন কোন তাফসীরকার হতে বর্ণিত আছে যে, এখানে বাতিল দ্বারা ইবলীসকে বুঝানো হয়েছে। অর্থাৎ সে না পূর্বে কাউকেও সৃষ্টি করেছে, না ভবিষ্যতে কাউকেও সৃষ্টি করতে পারবে। সে মৃতকেও জীবিত করতে পারে না এবং এ ধরনের কোন ক্ষমতাই তার নেই। কথা তো এটাও সত্য। কিন্তু এখানে উদ্দেশ্য তা নয়। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।
আল্লাহ তাআলা সত্য সত্যই অহী পাঠিয়ে থাকেন। তাঁর হিদায়াত ও বর্ণনা খুবই সহজ ও সরল। যারা পথভ্রষ্ট হচ্ছে তারা নিজে থেকেই পথভ্রষ্ট হচ্ছে এবং তারা নিজেদেরই ক্ষতি সাধন করছে। যেমন হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ)-কে সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেনঃ “আমি এটা আমার নিজের চিন্তা প্রসূত কথা বলছি। যদি তা সঠিক হয় তবে জানবে যে, এটা আল্লাহর পক্ষ হতে। আর যদি ভুল হয় তাহলে জানবে যে, এটা শয়তানের পক্ষ হতে। আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ) এটা হতে সম্পূর্ণরূপে দায়িত্বমুক্ত।
আল্লাহ তা'আলা স্বীয় বান্দাদের কথা শুনে থাকেন, তিনি খুব নিকটেই আছেন। আহ্বানকারীর আহ্বানে তিনি সদা সাড়া দিয়ে থাকেন।
সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে হযরত আবু মূসা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) স্বীয় সাহাবীদেরকে বলেনঃ “তোমরা কোন বধিরকেও ডাকছো না এবং কোন অনুপস্থিতকেও ডাকছো না, বরং তোমরা ডাকছো এমন সত্তাকে যিনি শ্রবণকারী, যিনি নিকটেই রয়েছেন এবং যিনি তোমাদের আহ্বানে সাড়া দানকারী এবং তোমাদের প্রার্থনা কবুলকারী।”
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।