আল কুরআন


সূরা সাবা (আয়াত: 37)

সূরা সাবা (আয়াত: 37)



হরকত ছাড়া:

وما أموالكم ولا أولادكم بالتي تقربكم عندنا زلفى إلا من آمن وعمل صالحا فأولئك لهم جزاء الضعف بما عملوا وهم في الغرفات آمنون ﴿٣٧﴾




হরকত সহ:

وَ مَاۤ اَمْوَالُکُمْ وَ لَاۤ اَوْلَادُکُمْ بِالَّتِیْ تُقَرِّبُکُمْ عِنْدَنَا زُلْفٰۤی اِلَّا مَنْ اٰمَنَ وَ عَمِلَ صَالِحًا ۫ فَاُولٰٓئِکَ لَهُمْ جَزَآءُ الضِّعْفِ بِمَا عَمِلُوْا وَ هُمْ فِی الْغُرُفٰتِ اٰمِنُوْنَ ﴿۳۷﴾




উচ্চারণ: ওয়ামাআমওয়া-লুকুম ওয়ালাআওলা-দুকুম বিল্লাতী তুকাররিবুকুম ‘ইনদানা-যুলফা ইল্লামান আ-মানা ওয়া ‘আমিলা সা-লিহান ফাউলাইকা লাহুম জাযাউদ দি‘ফি বিমা‘আমিলূওয়াহুম ফিল গুরূফা-তি আ-মিনূন।




আল বায়ান: আর তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি এমন বস্তু নয় যা তোমাদেরকে আমার নিকটবর্তী করে দেবে। তবে যারা ঈমান আনে ও নেক আমল করে, তারাই তাদের আমলের বিনিময়ে পাবে বহুগুণ প্রতিদান। আর তারা (জান্নাতের) সুউচ্চ প্রাসাদে নিরাপদে থাকবে।




আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৩৭. আর তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি এমন কিছু নয় যা তোমাদেরকে মর্যাদায় আমাদের নিকটবর্তী করে দেবে; তবে যারা ঈমান আনে ও সৎকাজ করে, তারাই তাদের কাজের জন্য পাবে বহুগুণ প্রতিদান; আর তারা সুউচ্চ প্রাসাদে নিরাপদে থাকবে।




তাইসীরুল ক্বুরআন: ওটা না তোমাদের মাল-ধন, আর না তোমাদের সন্তান-সন্ততি যা তোমাদেরকে আমার নিকটবর্তী করবে। তবে যে কেউ ঈমান আনে আর সৎকাজ করে তাদেরই জন্য আছে বহুগুণ প্রতিদান তাদের কাজের জন্য। তারা সুউচ্চ প্রাসাদে নিরাপদে থাকবে।




আহসানুল বায়ান: (৩৭) তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি আমার নৈকট্য লাভের সহায়ক হবে না। [1] তবে (নৈকট্য লাভ করবে) তারাই যারা বিশ্বাস করে ও সৎকাজ করে[2] এবং তারা তাদের কাজের জন্য পাবে বহুগুণ পুরস্কার। [3] আর তারা প্রাসাদসমূহে নিরাপদে বসবাস করবে।



মুজিবুর রহমান: তোমাদের ধন সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি এমন কিছু নয় যা তোমাদেরকে আমার নিকটবর্তী করে দিবে; যারা ঈমান আনে ও সৎ কাজ করে তারাই তাদের কর্মের জন্য পাবে বহুগুণ পুরস্কার; আর তারা প্রাসাদে নিরাপদে থাকবে।



ফযলুর রহমান: তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি তোমাদেরকে আমার নিকটবর্তী করবে না, যারা ঈমান এনেছে ও সৎকাজ করেছে তারা ব্যতীত। তাদের জন্য রয়েছে তাদের কর্মের দ্বিগুণ প্রতিদান। এবং তারা সুউচ্চ বাসস্থানে (জান্নাতে) নিরাপদে থাকবে।



মুহিউদ্দিন খান: তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি তোমাদেরকে আমার নিকটবর্তী করবে না। তবে যারা বিশ্বাস স্থাপন করে ও সৎকর্ম করে, তারা তাদের কর্মের বহুগুণ প্রতিদান পাবে এবং তারা সুউচ্চ প্রাসাদে নিরাপদে থাকবে।



জহুরুল হক: আর না তোমাদের ধনদৌলত ও না তোমাদের সন্তানসন্ততি এমন জিনিস যা আমাদের কাছে তোমাদের মর্যাদায় নৈকট্য দেবে, বরং যে ঈমান এনেছে ও সৎকাজ করেছে। সুতরাং এরাই -- এদেরই জন্য রয়েছে দ্বিগুণ পুরস্কার যা তারা করেছে সেজন্য, আর তারা বাগান-বাড়িতে নিরাপদে রইবে।



Sahih International: And it is not your wealth or your children that bring you nearer to Us in position, but it is [by being] one who has believed and done righteousness. For them there will be the double reward for what they did, and they will be in the upper chambers [of Paradise], safe [and secure].



তাফসীরে যাকারিয়া

অনুবাদ: ৩৭. আর তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি এমন কিছু নয় যা তোমাদেরকে মর্যাদায় আমাদের নিকটবর্তী করে দেবে; তবে যারা ঈমান আনে ও সৎকাজ করে, তারাই তাদের কাজের জন্য পাবে বহুগুণ প্রতিদান; আর তারা সুউচ্চ প্রাসাদে নিরাপদে থাকবে।


তাফসীর:

-


তাফসীরে আহসানুল বায়ান

অনুবাদ: (৩৭) তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি আমার নৈকট্য লাভের সহায়ক হবে না। [1] তবে (নৈকট্য লাভ করবে) তারাই যারা বিশ্বাস করে ও সৎকাজ করে[2] এবং তারা তাদের কাজের জন্য পাবে বহুগুণ পুরস্কার। [3] আর তারা প্রাসাদসমূহে নিরাপদে বসবাস করবে।


তাফসীর:

[1] অর্থাৎ, এই ধন-সম্পদ এই কথার প্রমাণ নয় যে, তোমাদের সাথে আমার ভালবাসা আছে এবং আমার নিকট তোমাদের বিশেষ মর্যাদা আছে।

[2] অর্থাৎ, আমার ভালবাসা ও নৈকট্য লাভ করার পন্থাই হচ্ছে ঈমান ও নেক আমল। যেমন হাদীসে মহানবী (সাঃ) বলেছেন ‘‘আল্লাহ তাআলা তোমাদের আকার-আকৃতি ও ধন-সম্পদ দেখেন না; বরং তিনি তোমাদের অন্তর ও আমল দেখে থাকেন।’’ (মুসলিমঃ কিতাবুল বির্র)

[3] মহান আল্লাহ একটি নেকীর বদলা কমপক্ষে দশ গুণ এবং ঊর্ধ্বপক্ষে সাতশ’ গুণ; বরং তার চেয়েও অধিক গুণ বর্ধিত করে থাকেন।


তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ


তাফসীর: ৩৪-৩৯ নং আয়াতের তাফসীর:



যুগে যুগে প্রত্যেক জনপদবাসীর বিত্তবান ও ক্ষমতাসীন ব্যক্তিরাই রাসূলদের দাওয়াত বর্জন করতঃ তাদের সাথে কুফরী করেছে। মক্কার মুশরিকরাও এর ব্যতিক্রম ছিল না। তাই পূর্ববর্তী সেসব কাফিরদের ইতিহাস উল্লেখ করে আল্লাহ তা‘আলা স্বীয় নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে সান্ত্বনা প্রদান করছেন। কিয়ামত পর্যন্তও এ শ্রেণির লোকেই ইসলাম ও মুসলিমদের সাথে এমন আচরণ করবে। সুতরাং হে রাসূল! তোমাকেও অস্বীকার করাটাই স্বাভাবিক। এতে তুমি মনক্ষুণœ হয়ো না। তাদের কথা তুলে ধরে আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(قَالَ الْمَلَأُ الَّذِيْنَ اسْتَكْبَرُوْا مِنْ قَوْمِه۪ لِلَّذِيْنَ اسْتُضْعِفُوْا لِمَنْ اٰمَنَ مِنْهُمْ أَتَعْلَمُوْنَ أَنَّ صَالِحًا قَالَ الَّذِيْنَ اسْتَكْبَرُوْآ إِنَّا بِالَّذِيْٓ اٰمَنْتُمْ بِه۪ كٰفِرُوْنَ)‏



“তার সম্প্রদায়ের দাম্ভিক প্রধানেরা সে সম্প্রদায়ের ঈমানদার যাদেরকে দুর্বল মনে করা হত তাদেরকে বলল: ‘তোমরা কি জান যে, সালেহ ‘আল্লাহ কর্তৃক প্রেরিত?’ তারা বলল: ‘তার প্রতি যে বাণী প্রেরিত হয়েছে আমরা তাতে বিশ্বাসী।’ তখন অহংকারীরা বললো, তোমরা যা বিশ্বাস কর আমরা তা অবিশ্বাস করি।” (সূরা আ‘রাফ ৭:৭৫-৭৬)



আর গরীব লোকেরাই নবী-রাসূলদের বেশি অনুসরণ করত। আল্লাহ তা‘আলার বাণী,



(قَالُوْآ أَنُؤْمِنُ لَكَ وَاتَّبَعَكَ الْأَرْذَلُوْنَ)



“তারা বলল:‎ ‘আমরা কি তোমার প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করব অথচ নিচু শ্রেণির লোকেরা তোমার অনুসরণ করছে?’’ (সূরা শুআরা:২৬:১১১)



হিরাকল আবূ সুফিয়ানকে জিজ্ঞেস করল: সমাজের বিত্তশালী ও উচুঁ বংশের লোকজন তাঁর (মুহাম্মাদের) অনুসরণ করে, না দুর্বলরা? তিনি বললেন: দুর্বলরা। হিরাকল বলল: দুর্বলরাই রাসূলদের অনুসারী হয়। (সহীহ বুখারী হা: ৭)



এরপর আল্লাহ বলেন: তারা বলত, আমরা ধনে-জনে সমৃদ্ধশালী, সুতরাং আমরা শাস্তি প্রাপ্ত হব না। আমরা আল্লাহ তা‘আলার শাস্তিযোগ্য হলে আমাদরেকে এ বিপুল ধনৈশ্বর্য কেন দিলেন? নিশ্চয়ই আমরা আল্লাহ তা‘আলার প্রিয়পাত্র, তিনি আমাদেরকে আযাব দেবেন না। আল্লাহ নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে বলছেন বলে দাও; এ ধারণা সঠিক নয়। আল্লাহ যাকে ইচ্ছা অপরিমেয় ধন-সম্পদ, সন্তান-সন্তুতি দিতে থাকেন। পার্থিব ধন-সম্পদ ও সম্মানকে আল্লাহ তা‘আলার প্রিয়পাত্র হওয়ার কারণ মনে করো না। বরং এসব সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি যা তোমাদেরকে আল্লাহ তা‘আলার নিকটে পৌঁছে দিবে বলে বিশ্বাস কর তারা তা করতে পারবে না। আল্লাহর বাণী,



(أَيَحْسَبُوْنَ أَنَّمَا نُمِدُّهُمْ بِه۪ مِنْ مَّالٍ وَّبَنِيْنَ لا‏ نُسَارِعُ لَهُمْ فِي الْخَيْرَاتِ ط بَلْ لَّا يَشْعُرُوْنَ)‏



“তারা কি মনে করে যে, আমি তাদেরকে ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি দ্বারা সাহায্য করি। তাদের জন্য সকল প্রকার মঙ্গল ত্বরান্বিত করছি? না, তারা বুঝে না।” (সূরা মু’মিনূন ২৩:৫৫-৫৬)



আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন,



(فَلَا تُعْجِبْكَ أَمْوَالُهُمْ وَلَآ أَوْلَادُهُمْ ط إِنَّمَا يُرِيْدُ اللّٰهُ لِيُعَذِّبَهُمْ بِهَا فِي الْحَيٰوةِ الدُّنْيَا وَتَزْهَقَ أَنْفُسُهُمْ وَهُمْ كٰفِرُوْنَ)



“সুতরাং তাদের সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি তোমাকে যেন আশ্চর্য না করে, আল্লাহ তার দ্বারাই তাদেরকে পার্থিব জীবনে শাস্তি দিতে চান। তারা কাফির থাকা অবস্থায় তাদের আত্মা দেহত্যাগ করবে।” (সূরা তাওবাহ ৯:৫৫) তবে যদি ঈমান আনয়ন করে ও সৎ আমল করে এবং এসব সম্পদ সৎ পথে উপার্জন ও ব্যয় করতে পারে তাহলে উপকারে আসবে।



রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন: মৃত ব্যক্তির সাথে তিনটি জিনিস যায়, দুটি জিনিস ফিরে আসে, একটি জিনিস সাথে থাকে। তার পরিবার, সম্পদ ও আমল সাথে যায়, এর মধ্যে পরিবার ও সম্পদ ফিরে আসে, আর আমল তার সাথে থেকে যায়। (তিরমিযী হা: ২৩৭৯, সহীহ)



হাদীসে এসেছে, আবূ হুরাইরাহ্ (رضي الله عنه) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন: “নিশ্চয়ই আল্লাহ তা‘আলা তোমাদের চেহারা ও তোমাদের সম্পদের দিকে দেখবেন না। বরং তোমাদের অন্তর ও ‘আমালের দিকে দেখবেন। (সহীহ মুসলিম হা: ৩৪)



তাই ধন-সম্পদ, সন্তান-সন্ততি কোন কিছুই বিন্দু পরিমাণ উপকার করার ক্ষমতা রাখে না। যারা সৎ কর্ম করবে তারা ভাল প্রতিদান পাবে আর যারা অসৎ কর্ম করবে তারা মন্দ প্রতিদান পাবে।



রিযিকের মালিক আল্লাহ তা‘আলা, তিনি যাকে খুশি রিযিক বর্ধিত করে দেন। আবার যার জন্য ইচ্ছা সীমিত করে দেন। কেউ চাইলেই সে তার রিযক বর্ধিত করতে পারে না।



তারপর আল্লাহ তা‘আলা বলেন যে, তোমরা যা কিছুই আল্লাহ তা‘আলার রাস্তায় ব্যয় করো না কেন তার প্রতিদান তোমরা পাবে। দানের ফযীলত ও দানকারীর মর্যাদা সম্পর্কে হাদীসে বলা হয়েছে।



আবূ হুরাইরাহ্ (رضي الله عنه) হতে বর্ণিত, নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন: “প্রত্যহ সকালে দু’জন ফেরেশ্তা অবতরণ করে। একজন দু‘আ করে হে আল্লাহ তা‘আলা! খরচকারীকে উত্তম প্রতিদান দাও। অন্যজন দু‘আ করে হে আল্লাহ তা‘আলা! কৃপণের মালকে ধ্বংস করে দাও।” (সহীহ বুখারী, হা: ১৪৪২, সহীহ মুসলিম হা: ১০১০)

অন্য এক হাদীসে বলা হয়েছে যে, আবূ হুরাইরাহ্ (رضي الله عنه) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, আল্লাহ তা‘আলা বলেন: “তুমি খরচ করো, তোমার প্রতি খরচ করা হবে। তিনি আরো বলেন: আল্লাহ তা‘আলার হাত পরিপূর্ণ। দিবা-রাত্রির খরচ তাতে কোন কিছুই কমায় না।” (সহীহ বুখারী হা: ৪৬৮৪, সহীহ মুসলিম হা: ৯৯৩)



সুতরাং আল্লাহ তা‘আলার রাস্তায় ব্যয় করলে কোন কিছু কমে না বরং তা বৃদ্ধি পায় এবং আখিরাতে তা আল্লাহ তা‘আলা মানুষকে দান করবেন।



আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:



১. গরীব লোকদের মর্যাদা সম্পর্কে জানা গেল যে, তারাই মূলত নাবী-রাসূলদের বেশি অনুসরণ করে, আর ধনীরা বিরোধিতাই বেশি করে।

২. ধন-সম্পদ, সন্তান-সন্ততি শাস্তি থেকে বাঁচাতে পারে না, যদি সঠিক ঈমান ও সৎ আমল না থাকে।

৩. রিযক বাড়ানো বা কমানো আল্লাহ তা‘আলার হাতে, কোন মানুষের হাতে নয়।

৪. খরচ করলে ধন-সম্পদ কমে না বরং তা আল্লাহ তা‘আলার নিকট জমা থাকে ও আখিরাতে তার বিনিময়ে জান্নাত লাভ করা যায়।


তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)


তাফসীর: ৩৪-৩৯ নং আয়াতের তাফসীর:

আল্লাহ তা'আলা স্বীয় নবী (সঃ)-কে সান্ত্বনা দিচ্ছেন এবং পূর্ববর্তী নবীদের ন্যায় চরিত্র গড়ে তোলার উপদেশ দান করেছেন। যে লোকালয়েই তারা গিয়েছেন সেখানেই তাদের বিরোধিতা করা হয়েছে। ধনী ও প্রভাবশালী লোকেরা তাঁদেরকে অমান্য করেছে। তবে গরীবেরা তাঁদের অনুগত হয়েছে। যেমন হযরত নূহ (আঃ)-এর কওম তাকে বলেছিলঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমরা কি তোমার উপর ঈমান আনবো, অথচ নিম্নশ্রেণীর লোকেরাই শুধু তোমার অনুসরণ করেছে?”(২৬:১১১) আর এক জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমরা তো দেখছি যে, আমাদের মধ্যে যারা নিম্নশ্রেণীর লোক তারাই শুধু তোমার অনুসরণ করেছে।”(১১:২৭) হযরত সালেহ (আঃ)-এর কওমের প্রভাবশালী অহংকারী লোকেরা যাদেরকে দুর্বল মনে করা হতো এবং যারা ঈমান এনেছিল তাদেরকে বলেছিলঃ (আরবী) অর্থাৎ “তোমরা কি জান যে, সালেহ (আঃ) তাঁর প্রতিপালকের পক্ষ হতে রাসূলরূপে প্রেরিত হয়েছেন? তারা উত্তরে বললোঃ যা সহ তিনি প্রেরিত হয়েছেন আমরা ওর উপর ঈমান আনয়নকারী। তখন অহংকারীরা বললো:তোমরা যার উপর ঈমান এনেছো আমরা তাকে অস্বীকারকারী।”(৭:৭৫-৭৬)

মহামহিমান্বিত আল্লাহ অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “এভাবেই আমি তাদের এককে অপরের দ্বারা ফিনায় ফেলে থাকি যাতে তারা বলেঃ এরাই কি তারা যাদের উপর আমাদের মাঝে হতে আল্লাহ অনুগ্রহ করেছেন? কৃতজ্ঞদেরকে কি আল্লাহ অবগত নন?”(৬:৫৩) আর এক জায়গায় রয়েছেঃ “প্রত্যেক জনপদে তথাকার বড় ও প্রভাবশালী লোকেরা পাপী ও চক্রান্তকারী হয়ে থাকে। অন্য এক জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “কোন জনপদকে যখন আমি ধ্বংস করার ইচ্ছা করি তখন তথাকার উদ্ধত ও অবাধ্য লোকদেরকে কিছু আদেশ প্রদান করি, তারা সেগুলো অমান্য করে তখন আমি তাদেরকে ধ্বংস করে দিই।”(১৭:১৬)।

মহামহিমান্বিত আল্লাহ এখানে বলেনঃ যখন আমি কোন লোকালয়ে সতর্ককারী অর্থাৎ নবী বা রাসুল প্রেরণ করেছি তখনই ওর বিত্তশালী, ধনাঢ্য এবং প্রভাবশালী অধিবাসীরা বলেছেঃ তোমরা যা সহ প্রেরিত হয়েছে আমরা তা প্রত্যাখ্যান করি।

হযরত আবু রাযীন (রঃ) বর্ণনা করেছেন যে, দু'টি লোক একে অপরের (সাথে ব্যবসায়ে) অংশীদার ছিল। একজন সাগর পারে চলে গেল এবং অপরজন সেখানেই রয়ে গেল। যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) প্রেরিত হলেন তখন সাগর পারের লোকটি তার ঐ সাথীকে পত্রের মাধ্যমে জিজ্ঞেস করলোঃ “রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর অবস্থা কি?” সে জবাবে লিখলোঃ “নিম্নশ্রেণীর লোকেরাই তার কথা শুনছে ও মানছে। কিন্তু কুরায়েশ বংশের সম্ভ্রান্ত লোকেরা তাঁকে মানছে না।” পত্র পাঠ করে সে ব্যবসা ছেড়ে দিয়ে চলে আসলো এবং তার ঐ সাথীর নিকট হাযির হলো। সে লেখা পড়া জানতো। আসমানী কিতাবগুলোতে তার ভাল জ্ঞান ছিল। সে তার সাথী থেকে রাসূলুল্লাহ (সঃ) এখন কোথায় তা জেনে নিয়ে তার। খিদমতে হাযির হলো। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে সে জিজ্ঞেস করলোঃ “আপনি মানুষকে কিসের দিকে আহ্বান করেন?” রাসূলুল্লাহ (সঃ) জবাবে বললেনঃ “আমি মানুষকে এরূপ এরূপের দিকে আহ্বান করে থাকি।” এটা শুনেই সে বললোঃ “আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আপনি আল্লাহর রাসূল।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) প্রশ্ন করলেনঃ “তুমি এটা কি করে জানলে?” উত্তরে সে বললোঃ “যে নবীই প্রেরিত হয়েছেন, তাঁর অনুসারী হয়েছে শুধুমাত্র নিম্নশ্রেণীর ও দরিদ্র শ্রেণীর লোকেরা।” বর্ণনাকারী বলেন যে, তখন এই আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন ঐ লোকটিকে জানিয়ে দেন যে, তার উক্তির সত্যতায় আল্লাহ তা'আলা আয়াত নাযিল করেছেন।

অনুরূপ উক্তি রোমক সম্রাট হিরাক্লিয়াসও করেছিল, যখন সে আবু সুফিয়ানকে তাঁর অজ্ঞতার অবস্থায় জিজ্ঞেস করেছিলঃ “সম্ভ্রান্ত লোকেরা তাঁর অনুসরণ করছে, না দুর্বল ও নিম্নশ্রেণীর লোকেরা?” উত্তরে তিনি বলেছিলেনঃ “দুর্বল ও নিম্নশ্রেণীর লোকেরাই তাঁর অনুসারী হচ্ছে। ঐ সময় হিরাক্লিয়াস মন্তব্য করেছিল যে, প্রত্যেক রাসূলেরই অনুসারী হয়েছে দুর্বল ও নিম্নশ্রেণীর লোকেরাই।

এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেন যে, কাফিররা ও মুশরিকরা বলতোঃ আমরা ধনে-জনে সমৃদ্ধশালী, সুতরাং আমাদেরকে কিছুতেই শাস্তি দেয়া হবে না। এ কথা তারা ফখর করে বলতো যে তারা আল্লাহর প্রিয় বান্দা। যদি তাদের উপর তার বিশেষ মেহেরবানী না হতো তবে তিনি তাদেরকে এসব নিয়ামত দা করতেন না। আর দুনিয়ায় যখন তিনি তাদের উপর মেহেরবানী করেছেন তখন আখিরাতেও তাদের উপর মেহেরবানী করবেন। আল্লাহ তাআলা প্রত্যেক জায়গাতেই তাদের এ দাবী খণ্ডন করেছেন। যেমন তিনি এক জায়গায় বলেছেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তারা কি মনে করে যে, ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততির প্রাচুর্যই তাদের বড় হওয়া ও উত্তম হওয়ার মাপকাঠি? না, এগুলোই তাদের জন্যে মন্দের কারণ, কিন্তু তারা বুঝে না।” (২৩:৫৫) অন্য আয়াতে আছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “তাদের মাল ও তাদের সন্তান-সন্ততি যেন তোমাকে বিস্মিত না করে, আল্লাহ পার্থিব জীবনেও তাদেরকে শাস্তি দিতে চান এবং তাদের মৃত্যুও কুফরীর অবস্থাতেই হবে।”(৯:৫৫) মহামহিমান্বিত আল্লাহ আরো বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমাকে ছেড়ে দাও এবং তাকে আমি সৃষ্টি করেছি অসাধারণ করে। আমি তাকে দিয়েছি বিপুল ধন-সম্পদ এবং নিত্যসঙ্গী পুত্রগণ। আর তাকে দিয়েছি স্বচ্ছন্দ জীবনের প্রচুর উপকরণ। এরপরও সে কামনা করে যে, আমি তাকে আরো অধিক দিই। না, তা হবে না, সে তো আমার নিদর্শন সমূহের উদ্ধত বিরুদ্ধাচারী। আমি অচিরেই তাকে ক্রমবর্ধমান শাস্তি দ্বারা আচ্ছন্ন করবো।”(৭৪:১১-১৭)।

ঐ ব্যক্তির কথাও বর্ণিত হয়েছে যে, যার দু'টি বাগান ছিল। সে ধনশালী ছিল, ফল-ফুলের মালিক ছিল, সন্তানাদিও ছিল। কিন্তু কোন জিনিসই তার উপকার করেনি। আল্লাহর আযাবে সবকিছুই ধ্বংস ও মাটি হয়ে গিয়েছিল আখিরাতের পূর্বেই। এজন্যেই আল্লাহ তা'আলা এখানে বলেনঃ আল্লাহ যার প্রতি ইচ্ছা তার রিযক বর্ধিত করেন অথবা এটা সীমিত করেন। দুনিয়াতে তিনি শত্রু-মিত্র সকলকেই দান করে থাকেন। গরীব বা ধনী হওয়া আল্লাহ তা'আলার সন্তুষ্টি বা অসন্তুষ্টির লক্ষণ নয়। বরং তাতে অন্য কোন হিকমত লুক্কায়িত থাকে। কিন্তু অধিকাংশ লোকই এটা জানে না।

মহান আল্লাহ বলেনঃ তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি এমন কিছু নয় যা তোমাদেরকে আমার নিকটবর্তী করে দিবে।

হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহ তা'আলা তোমাদের আকৃতি ও তোমাদের মালের দিকে দেখেন না, বরং তিনি দেখেন তোমাদের অন্তরের দিকে ও তোমাদের আমলের দিকে।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ), ইমাম মুসলিম (রঃ) এবং ইমাম ইবনে মাজাহ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)

আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ তবে যারা ঈমান আনে ও সৎকর্ম করে তারাই তাদের কর্মের জন্যে পাবে বহুগুণ পুরস্কার, তারা প্রাসাদে নিরাপদে থাকবে। তাদের এক একটি পুণ্য দশগুণ হবে এবং এভাবে বাড়াতে বাড়াতে সাতশ' গুণ পর্যন্ত করে দেয়া হবে। জান্নাতের বালাখানায় তারা নিরাপদে অবস্থান করবে। তাদের কোন ভয় ও চিন্তা থাকবে না।

হযরত আলী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “জান্নাতে এমন প্রাসাদ রয়েছে যার ভিতর থেকে বাহির এবং বাহির থেকে ভিতর দেখা যাবে।” তখন একজন বেদুঈন জিজ্ঞেস করলোঃ “এটা কার জন্যে?” উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “যে উত্তম ও নরম কথা বলে, গরীবকে খাদ্য খেতে দেয়, অধিক রোযা রাখে এবং লোকেরা যখন ঘুমিয়ে থাকে তখন উঠে (তাহাজ্জুদের) নামায পড়ে।” (এ হাদীসটি ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)

এরপর মহান আল্লাহ বলেনঃ যারা আমার আয়াতকে ব্যর্থ করবার চেষ্টা করবে, অন্যদেরকে আল্লাহর পথে বাধা দেবে এবং রাসূলদের অনুসরণ হতে জনগণকে ফিরিয়ে রাখবে তারা জাহান্নামে শাস্তি ভোগ করতে থাকবে।

মহামহিমান্বিত আল্লাহ এরপর বলেনঃ আল্লাহ তার পরিপূর্ণ হিকমত অনুযায়ী যাকে ইচ্ছা করেন দুনিয়ায় বহু কিছু দান করে থাকেন এবং যাকে ইচ্ছা খুব কম দেন। একজন সুখ-সাগরে ভেসে আছে এবং আর একজন অতি দুঃখ-কষ্টে কাল যাপন করছে। তার এ হিকমতের কথা কেউ বুঝতে পারবে না। এর গোপন রহস্য তিনিই জানেন। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “লক্ষ্য কর, আমি কিভাবে তাদের একদলকে অপর দলের উপর শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছিলাম, আখিরাত তো নিশ্চয়ই মর্যাদায় মহত্তর ও গুণে শ্রেষ্ঠতর।”(১৭:২১) অর্থাৎ আখিরাতের ফযীলত ও মর্যাদা সবচেয়ে বড়। এখানে যেমন ধনী ও গরীবের ভিত্তিতে মর্যাদার উঁচু ও নীচু আছে, ঠিক তেমনই আখিরাতেও আমলের ভিত্তিতে মর্যাদা কম-বেশী হবে। সৎ লোকেরা তো জান্নাতের উচ্চ প্রাসাদে অবস্থান করবে। আর অসৎ লোকেরা জাহান্নামের নিম্নস্তরে থাকবে মর্যাদাহীন অবস্থায়।

রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন যে, দুনিয়ায় সবচেয়ে উত্তম হলো ঐ ব্যক্তি যে খাঁটি মুসলমান হয় এবং প্রয়োজন মত রুযী পায়, আর আল্লাহর পক্ষ হতে যাকে অল্পে তুষ্ট রাখা হয়। (এ হাদীসটি সহীহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে)

আল্লাহর হুকুম এবং তাঁর বৈধ করা কাজের সীমার মধ্যে থেকে মানুষ যা কিছু খরচ করবে তার বিনিময় তিনি তাদেরকে দুই জাহানে প্রদান করবেন।

হাদীসে এসেছে যে, প্রত্যহ সকালে একজন ফেরেশতা দু'আ করেনঃ “হে আল্লাহ! কৃপণের মালকে ধ্বংস ও বরবাদ করে দিন।” আর একজন ফেরেশতা দু'আ করেনঃ “হে আল্লাহ! (আপনার পথে) খরচকারীকে উত্তম বিনিময় প্রদান করুন।”

একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত বিলাল (রাঃ)-কে বলেনঃ “হে বিলাল (রাঃ)! খরচ করে যাও এবং আরশের মালিকের পক্ষ হতে সংকীর্ণতার ধারণা করো না।”

হযরত হুযাইফা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমাদের এই যুগের পরে এমন এক যুগ আসছে যে মানুষকে কেটে খেয়ে ফেলবে। মালদার স্বচ্ছল ব্যক্তি তার হাতে যা থাকবে তা খরচ হয়ে যাবার ভয়ে ওর উপর কামড়াতে থাকবে।`

আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ তোমরা যা কিছু ব্যয় করবে তিনি তার প্রতিদান দিবেন। তিনিই শ্রেষ্ঠ রিযকদাতা।

আর একটি হাদীসে আছেঃ “লোকদের মধ্যে সেই হলো নিকৃষ্টতম লোক যে নিরুপায় ও অসহায় লোকের জিনিস কম দামে কিনে নেয়। মনে রেখো যে, এই ধরনের ক্রয়-বিক্রয় হারাম।” একথা তিনি দুই বার বললেন। অতঃপর তিনি বললেনঃ “এক মুসলমান অপর মুসলমানের ভাই। সে তার উপর যুলুম করবে না এবং তাকে লাঞ্ছিত ও অপমানিত করবে না। তুমি পারলে অন্যের সাথে উত্তম ব্যবহার কর ও তার কল্যাণ সাধন কর। আর তা না হলে অন্ততঃ তার কষ্ট ও বিপদ-আপদ আরো বাড়িয়ে দিয়ো না।” এই ধারায় এ হাদীসটি দুর্বল। এর সনদে দুর্বলতা রয়েছে) হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেছেনঃ “এই আয়াতের ভুল মতলব গ্রহণ করো না। নিজ মাল খরচ করার ব্যাপারে মধ্যম পন্থা অবলম্বন করবে। কেননা, রুযী ভাগ করে দেয়া হয়েছে বা রিযক বন্টিত হয়ে আছে।





সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।